📄 সকল কল্যাণের রহস্য
বিলাল বিন সা'দ রহ. বলেন :
‘হে আল্লাহভীরুগণ, চিরতরে ধ্বংস করার জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়নি। তোমাদের তো কেবল স্থানান্তর করা হবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। যেভাবে তোমরা স্থানান্তরিত হয়েছ বাবার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের জরায়ুতে—জরায়ু থেকে দুনিয়াতে। তেমনিভাবে তোমরা ফের স্থানান্তরিত হবে দুনিয়া থেকে কবরে, কবর থেকে হাশরে-হাশর থেকে চিরস্থায়ী জান্নাত বা জাহান্নামে। ’২৭
সকল কল্যাণের রহস্য
কাকে ঘিরে আমাদের ব্যস্ততা? কী নিয়ে আমরা মগ্ন থাকি? বিষয়টি কি আসলে এমন, যেমনটা হাসান রহ. বলেছেন?
'এ দুনিয়া কর্মব্যস্ততায় পূর্ণ। ব্যস্ততার একটা দুয়ার খুললেই উন্মুক্ত হয়ে যায় আরও দশটা। তাই দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে বেঁচে থাকো।' ২৮
ইবনে সাম্মাক রহ. বলেন:
'দুনিয়ার জন্য পরিশ্রম করাও যেন আনন্দের। কেননা, আমরা যে দুনিয়ার প্রতিই আকৃষ্ট। পক্ষান্তরে আখিরাতের জন্য সাধনা করা কঠিন। কারণ, তা যে দুনিয়া থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ২৯
দুনিয়া নিয়েই কেন আমরা এত ব্যতিব্যস্ত? তবে কি আমরা মনে করি, দুনিয়াই সকল কল্যাণের উৎস? অথচ-
'আল্লাহ যা চান, কেবল তা-ই তো হয়। তিনি যা চান না, তা কখনোই হয় না। অন্তরে বদ্ধমূল এ বিশ্বাসই সকল কল্যাণের রহস্য। আর এ প্রত্যয় যখন তোমার অন্তরে থাকবে, তখন তুমি এটাও উপলব্ধি করবে যে, নেক আমল মূলত আল্লাহর নিয়ামত। তাই তুমি এর জন্য শুকরিয়া আদায় করবে এবং কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করবে—এ নিয়ামত যেন বন্ধ হয়ে না যায়। তোমার অন্তরে এ বিশ্বাস জন্মাবে যে, মন্দ আমল আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তিস্বরূপ। তাই এ আজাব থেকে বেঁচে থাকতে অবশ্যই তুমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবে। নেক আমল করা ও মন্দ আমল পরিত্যাগ করার ভার তোমার নিজের ওপর না দেওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করে আল্লাহর নিকট কান্নাকাটি করতে থাকবে।'৩০
ইবরাহিম বিন আদহাম রহ.-এর কাছে জানতে চাওয়া হলো, 'আপনি কেমন আছেন?' উত্তরে তিনি বলেন:
نُرَقَّعُ دُنْيَانَا بِتَمْزِيقِ دِينِنَا * فَلَا دِينُنَا يَبْقَى وَلَا مَا نُرَقَّعُ فَطُوبَى لِعَبْدٍ آثَرَ اللَّهَ رَبَّهُ * وَجَادَ بِدُنْيَاهُ لِمَا يَتَوَقَّعُ
'দ্বীনের কাঠামো বিচূর্ণ করে আমরা গড়ি দুনিয়ার প্রাসাদ। ফলে দিন শেষে আমরা না দ্বীন পাই, না দুনিয়া। সেই বান্দার জন্য সুসংবাদ যে প্রাধান্য দেয় তার রবকে—অনন্তের আশায় জলাঞ্জলি দেয় ক্ষণিকের লালসা।।'৩১
বিষয়টি আসলে এমনই—চিরস্থায়ী আবাসকে ধ্বংস করে ক্ষণিকের দুনিয়া নিয়ে বিভোর আমরা। তাই আমাদের চোখে আলো নেই—নেই সুন্দর কোনো আগামীর পয়গাম।
দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা জাগে দুনিয়াকে কল্যাণকর মনে করলে। তাই দুনিয়াপ্রীতির আলামত হলো, দুনিয়াদারদের ভালোবাসা, তাদের তোষামোদ করা এবং তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা। সুফইয়ান সাওরি রহ. বলেন:
'কারও অন্তরে দুনিয়াপ্রীতি আছে কি নেই, নিমিষেই আমি তা বুঝে ফেলি। দুনিয়াদারদের দেওয়া সালামের ধরন তাদের দুনিয়াপ্রীতির প্রমাণ বহন করে।'৩২
আমরা যে দুনিয়াদারদের প্রাধান্য দিয়ে থাকি, এটা কেন করি? দুনিয়াকে কল্যাণকর মনে করার কারণেই তো! বাস্তবতা হলো, নেককার ও সচ্চরিত্র গরিব লোকদের সাথে কেউ কথাই বলতে চায় না। তাদের সালাম করলেও তা হয় খুব অনাগ্রহের সাথে। দূরত্ব বজায় রেখে সালাম করে, যেন তার দারিদ্র্য আবার তাকে ধরে না ফেলে। মুসাফাহা করতে চাইলে শুধু আঙুলের অগ্রভাগ মিলায়। খোঁজখবর জিজ্ঞেস করার সময় কপাল থাকে কুঞ্চিত—চেহারায় প্রকাশ পায় ঘৃণার ছাপ।
পক্ষান্তরে, বিত্তশালী কেউ এলে তার সম্মানে মানুষ দাঁড়িয়ে যায়। তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। হোক সে বেনামাজি বা পাপিষ্ঠ কেউ। একজন দ্বীনদার দরিদ্রের কথা চিন্তা করুন। মানুষ তাকে মোটেও গ্রাহ্য করে না। তার খবরও নেয় না—সে বেঁচে আছে কি নেই। অপরদিকে একজন বদকার বিত্তশালী—আল্লাহর কাছে মশার ডানা পরিমাণও যার মূল্য নেই—তাকে মানুষ কত আদর-আপ্যায়ন করে! কত মাখামাখি তার সাথে! দুনিয়াপ্রেমী আর আখিরাতপ্রত্যাশীর মাঝে এটাই পার্থক্য। দ্বীনদারদের অগ্রাহ্য করে বদকার দুনিয়াদারদের প্রাধান্য দেওয়াই দুনিয়াপ্রীতির লক্ষণ।
দুনিয়াকে আমরা কল্যাণকর মনে করি। এ কারণে দুনিয়া নিয়ে আমাদের সকল ব্যস্ততা। এমনকি আমরা নিজেদের পুরো সময়টা দুনিয়ার জন্য উৎসর্গ করি। অথচ, আব্দুল্লাহ বিন আওন রহ. বলেন:
'পূর্বসূরিগণ আখিরাতের জন্য সময় ব্যয় করার পর হাতে থাকা অবশিষ্ট সময় দুনিয়ার জন্য বরাদ্ধ রাখতেন। কিন্তু তোমরা দুনিয়ার জন্য সময় ব্যয় করে অবশিষ্ট সময়টা নির্ধারণ করো আখিরাতের জন্য!'৩৩
ভাই আমার, 'দুনিয়ার জীবন নিতান্ত ক্ষণিকের। দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিও আসলে গরিব। একটু ভেবে দেখো তো—মৃত্যু তোমার দুয়ারে উপস্থিত, দুনিয়া থেকে বিদায়ের আগেই একাকিত্ব ও নির্জনতার ঘ্রাণ পেতে শুরু করছ তুমি। তোমার সন্তানদের চেহারায় ফুটে উঠেছে এতিম এতিম ভাব...। এমন অবস্থায় কীই-বা করার থাকবে তোমার? তাই এখনই জেগে ওঠো গাফিলতির নিদ্রা থেকে। ঝেড়ে ফেলো দুনিয়ার মত্ততা। অন্তর থেকে বের করে দাও দুনিয়াপ্রীতি। এখনো তোমার সামনে সুযোগ আছে। বান্দা যখন তার চোখ বুজবে, ফিরে যাবে আসল গন্তব্যে—দুনিয়াতে সে আবার আসতে চাইবে একটু আমল করার আশায়। কিন্তু তখন আর কোনো সুযোগ থাকবে না।'৩৪
তাই সময় থাকতেই দুনিয়া থেকে আমাদের মুখ ফিরিয়ে নিতে হবে। মনোযোগী হতে হবে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহে। কারণ, যে মৃত্যুর ব্যাপারে আমাদের ভাবনা, তা তো এখনো অনেক দূরে। সে মৃত্যু কিন্তু অচিরেই আমাদের নিকটে চলে আসবে। আজ তুমি অন্য কারও জানাজা দেখছ। কাল হয়তো অন্যরা তোমার জানাজা দেখবে। মৃত্যু সহসা সামনে উপস্থিত হয়। হঠাৎ আমরা আক্রান্ত হতে পারি এমন কোনো রোগে, যা মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের শয্যাশায়ী করে রাখবে। এসব নিছক ধারণা নয়, দুনিয়ার বুকে এ ধরনের বহু উদাহরণ আছে। তবুও কি আমরা আলস্যের নিদ্রায় বিভোর হয়ে থাকব? নিমজ্জিত থাকব গোমরাহির মত্ততায়?
تَبَا لِطَالِبِ دُنْيَا لَا بَقَاءَ لَهَا * كَأَنَّمَا هِيَ فِي تَصْرِيفِهَا حُلُمُ صَفَاؤُهَا كَدَرُ، وَسَرَاؤُهَا ضَرَرُ * أَمَانُهَا غَرَرُ، أَنْوَارُهَا ظُلَمُ شَبَابُهَا هَرَمٌ، رَاحَاتُهَا سَقَمُ * لَذَّاتُهَا نَدَمُ، وِجْدَانُهَا عَدَمُ
'দুনিয়াপূজারিদের ধ্বংস অনিবার্য। কেননা, পার্থিব জীবন ক্ষণিকের সুখস্বপ্ন বৈ কিছু নয়। দুনিয়ার বিশুদ্ধতায়ও থাকে দূষণের দৌরাত্ম্য—কল্যাণেও ওত পেতে থাকে অনিষ্টের মহামারি। নশ্বর এই জগতের স্বস্তিও যেন শঙ্কায় ছেয়ে থাকে— আলোতেও যেন চোখে পড়ে আঁধারের হাতছানি। যৌবনেও কখনো উঁকি দেয় বার্ধক্যের মলিন চেহারা, সুস্থতার পেছনেও শোনা যায় ব্যাধির নিষ্ঠুর পদধ্বনি। এর সুখ ও পুলক বয়ে আনে লাঞ্ছনা—অর্জনগুলোও কখনো রূপ নেয় বিসর্জনে।'৩৫
টিকাঃ
২৭. আস-সিয়ার: ৫/৯১
২৮. আজ-জুহদ, ইবনুল মুবারক: ১৮৯
২৯. শাজারাতুজ জাহাব: ১/৩০৪
৩০. আল-ফাওয়ায়িদ: ১২৭
৩১. প্রথম দু'ছত্র, আল-ইকদুল ফারিদ: ৩/১২৪
৩২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৭/৩৭
৩৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/১০১
৩৪. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩২৯
৩৫. ইমাম গাজালি রহ. কৃত মুকাশাফাতুল কুলুব: ৩২৯
📄 দুনিয়া একটি চোরাবালি
আবু হাজিম রহ. বলেন :
'দুনিয়ার স্বরূপ যে চিনতে পেরেছে, সে কখনো দুনিয়ার কোনো আনন্দে আনন্দিত হয় না, চিন্তিত হয় না দুনিয়ার কোনো বিপদে।'৩৬
আলি রা. বলেন :
'যার মধ্যে ছয়টি গুণ থাকবে, জান্নাতের আকাঙ্ক্ষায় এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য তাকে কোনো কসরত করতে হবে না। সে ছয়টি গুণ হলো:
১. আল্লাহ তাআলার পরিচয় জানা ও তাঁর আনুগত্য করা।
২. শয়তানকে চিনে নেওয়া ও তার বিরুদ্ধাচরণ করা।
৩. সত্যের পরিচয় জেনে তার অনুসরণ করা।
৪. বাতিলকে চিনে তার থেকে বেঁচে থাকা।
৫. দুনিয়ার স্বরূপ জেনে তা পরিত্যাগ করা।
৬. আখিরাতের পরিচয় জেনে নিয়ে তার অন্বেষণ করা।'৩৭
তাই দুনিয়াকে কাছে টানায় কোনো কল্যাণ নেই, বরং দুনিয়া পরিত্যাগ করতে পারাটাই সার্থকতা।
দুনিয়া একটি চোরাবালি
দুনিয়া নামক চোরাবালিতে দিন দিন আমরা তলিয়ে যাচ্ছি না তো! আসল লক্ষ্যকে উপেক্ষা করে মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে ক্রমশ আমরা মৃত্যুর দিকেই তো ধাবিত হচ্ছি। ফুজাইল রহ.-এর কথাটি শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দেয়。
টিকাঃ
৩৬. ইবনু আবিদ দুনিয়া রহ. কৃত আজ-জুহদ: ৫৪৪, ১/৫৪৪
৩৭. আল-ইহইয়া: ৩/২২১
📄 দুনিয়ার চোরাবালি থেকে বাঁচার উপায়
ফুজাইল বিন ইয়াজ রহ. বলেন : 'দুনিয়ামত্ততায় প্রবেশ করা খুব সহজ। কিন্তু তা থেকে বের হওয়া অনেক কঠিন।'৩৮
দুনিয়ার মোহ-মায়া থেকে বেঁচে থাকা আসলেই অনেক কঠিন ব্যাপার। নতুবা এত চিন্তা-পেরেশানি সত্ত্বেও মানুষ দুনিয়ার পেছনে এত দৌড়াত না, উন্মাদ হয়ে এত প্রতিযোগিতা করত না।
কবি বলেন:
أَرَى الدُّنْيَا لِمَنْ هِيَ فِي يَدَيْهِ * هُمُوْمًا كُلَّمَا كَثُرَتْ لَدَيْهِ تُهِيْنُ الْمُكْرِمِينَ لَهَا بِصُغْرٍ * وَتُكْرِمُ كُلَّ مَنْ هَانَتْ عَلَيْهِ إِذَا اسْتَغْنَيْتَ عَنْ شَيْءٍ فَدَعْهُ * وَخُذْ مَا أَنْتَ مُحْتَاجُ إِلَيْهِ
'দুনিয়ার সমৃদ্ধি কেবল দুশ্চিন্তাই বয়ে আনে—কেড়ে নেয় মানসিক প্রশান্তি। সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে পেরেশানির মাত্রা। যে দুনিয়াকে সম্মান করে, দুনিয়া তাকে লাঞ্ছিত করে। আর যে তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, সে তাকে সমীহ করে চলে। দুনিয়া থেকে তোমার যা প্রয়োজন, কেবল তা-ই গ্রহণ করো। অতিরিক্ত যা সামনে পড়ে, ছুঁড়ে ফেলো ময়লার ভাগাড়ে।'৩৯
প্রিয় ভাই, 'আখিরাতের সন্তান হও। দুনিয়ার সন্তান হয়ো না। কেননা, সন্তান তার মায়েরই অনুকরণ করে। দুনিয়ার জন্য তুমি যে এক পা পেছাবে, দুনিয়া তো এরও যোগ্য নয়! তাহলে কোন দুঃখে তুমি দুনিয়ার পেছনে ছুটবে?'৪০
হাবিব বিন মুহাম্মাদ রহ.-এর স্ত্রী বলেন, 'আমার স্বামী বলতেন :
“আমি যদি আজ মারা যাই, তবে আমাকে গোসল করানোর জন্য অমুকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা কোরো। আর এই এই কাজ কোরো...।” তার স্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হলো, “আপনার স্বামী কি কোনো স্বপ্ন দেখলে এরূপ বলতেন?” তিনি উত্তরে বললেন, “না, এটা তার প্রতিদিনেরই কথা ছিল।”৪১
কোথায় কল্যাণ? দুনিয়ার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। দুনিয়ার বিত্তশালী ধনী নয়; আখিরাতের ধনীই আসল ধনী।
'মানুষ যদি দুনিয়ার সম্পদ অর্জন করে ধনী হয়, তুমি আল্লাহর নৈকট্যলাভ করে ধনী হও। তারা যদি আনন্দিত হয় দুনিয়াকে নিয়ে, তবে তুমি আনন্দিত হও আল্লাহকে নিয়ে (তাঁর আনুগত্য করে)। তারা যদি বন্ধুবান্ধব আর প্রিয়জনদের সঙ্গ পছন্দ করে, তবে তুমি আল্লাহর নৈকট্যশীল হওয়াকে ভালোবেসে নাও। তারা যদি সম্মান ও মর্যাদা লাভের আশায় দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের সাথে পরিচিত হয়ে তাদের নৈকট্য অর্জন করে, তবে তুমি পরিচিত হও আল্লাহ তাআলার সাথে, তাঁকে ভালোবাসতে শেখো, তাহলে তুমিই থাকবে সম্মান ও মর্যাদার উচ্চ আসনে।'৪২
একদা উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. তাঁর খুতবায় বলেন :
'প্রত্যেক সফরের জন্য পাথেয় প্রয়োজন। সুতরাং তোমরা দুনিয়া থেকে আখিরাতের সফরের জন্য তাকওয়ার পাথেয় সংগ্রহ করো। এমন হও, যেন তোমরা নিজ চোখে আল্লাহর প্রস্তুতকৃত শাস্তি ও পুরস্কার প্রত্যক্ষ করেছ। আর তোমরা পুরস্কার লাভের জন্য আগ্রহী এবং শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য ভীত-সন্ত্রস্ত। তোমরা এমন হয়ে যাও। তোমাদের কামনা-বাসনা যেন অধিক না হয়। অন্যথায় তোমাদের অন্তর কঠোর হয়ে যাবে, তোমরা তোমাদের শত্রুদের অনুগত হয়ে পড়বে। সে ব্যক্তির আশা-আকাঙ্ক্ষা বিস্তৃত করে কী লাভ, যার জানা নেই, সকালের পর তার জীবনে সন্ধ্যা আর আসবে কি না, অথবা আসবে কি না সন্ধ্যার পর তার জীবনের পরবর্তী সকাল? এ দুইয়ের মাঝে তার জন্য ওত পেতে বসে আছে মৃত্যু। সে কী করে আশ্বস্ত হতে পারে, আল্লাহর আজাব ও কিয়ামত দিবসের ভয়াবহ অবস্থার ব্যাপারে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার আঘাতের একটি ক্ষতের চিকিৎসা করতে না করতে অন্য দিক থেকে আবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, সে কীভাবে আশ্বস্ত হতে পারে?
আমি নিজে যে আমল করা থেকে বিরত রয়েছি, সে আমলের জন্য তোমাদের নির্দেশ দেওয়ার ব্যাপারে আমি মহান আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তাহলে আমার চুক্তি অলাভজনক প্রমাণিত হবে, বরবাদ হয়ে যাবে আমার ঘর (জান্নাত) এবং ওই দিন আমার নিঃস্বতা প্রকাশ পেয়ে যাবে, যেদিন ন্যায় ও সত্য ছাড়া কোনো কিছু দ্বারা উপকৃত হওয়া যাবে না। '৪৩
টিকাঃ
৩৮. আল-ইহইয়া: ৩/২২৪
৩৯. আল-ইহইয়া: ২/৪৪
৪০. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬৮
৪১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/৩২০
৪২. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৫২
৪৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/২৮৩
📄 তাওয়াক্কুল
মুহাম্মাদ বিন আবু ইমরান রহ. বলেন:
'হাতিম আল-আসাম রহ.-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, “আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে আপনি ভিত্তি বানিয়েছেন?"
তিনি উত্তর দিলেন, “তাওয়াক্কুল অর্জনে আমি চারটি কাজ করি :
১. আমি বিশ্বাস করি, আমার রিজিক কেউ খেয়ে ফেলবে না; তাই এ ব্যাপারে আমি আশ্বস্ত থাকি।
২. আমি জানি, আমার কাজ আমাকেই করতে হবে, অন্য কেউ আমার কাজ করে দেবে না; তাই আমি আমার কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকি।
৩. আমি জানি, মৃত্যু সহসা এসে আমাকে পাকড়াও করবে; তাই সব সময় আমি তার আগমনের জন্য প্রস্তুত থাকি।
৪. আমি জানি, যেখানেই আমি থাকি না কেন, আল্লাহর দৃষ্টি থেকে আমি আড়ালে নই; তাই আমি সব সময় তাঁকে লজ্জা করি।'৪৪
আব্দুল্লাহ বিন মুবারক রহ. বলেন :
'হে আদমসন্তান, পরকালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আল্লাহর প্রতি তোমার যে পরিমাণ প্রয়োজন রয়েছে, সে পরিমাণ তুমি তাঁর আনুগত্য করো। আর যে পরিমাণ আগুনের তেজ তুমি সহ্য করতে পারবে বলে মনে করো, সে পরিমাণ তাঁর অবাধ্য হতে পারো।'৪৫
হে আল্লাহ, আপনি কত মহান ও পবিত্র! কখনো আমরা আপনার প্রশংসা করে শেষ করতে পারব না। আপনি তেমনই যেমনটি আপনি নিজের স্তুতি বর্ণনা করেছেন। আমরা না জেনে আপনার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়েছি। আর আপনি অনুগ্রহ করে আমাদের ক্ষমা করে চলেছেন।
ফুজাইল বিন ইয়াজ রহ. মুমিনের ইহজীবনের স্বরূপ বর্ণনা করে বলেন: 'দুনিয়াতে মুমিনগণ খুবই চিন্তিত থাকেন। তাদের একটাই চিন্তা, কীভাবে পরকালের পাথেয় অর্জন করা যায়। যাদের অন্তরে এমন মর্মবেদনা থাকে, প্রকৃত আবাসের জন্য উপকারী সম্বল অর্জনই হয় তাদের সার্বক্ষণিক চিন্তা। ক্ষণিকের সম্মান পাওয়ার পেছনে তারা ছোটেন না। তারা হন অপরিচিত-গুরাবা। দুনিয়ার নিন্দা-তিরস্কারের কোনো পরোয়া তারা করেন না।'৪৬
শাফিয়ি রহ. বলেন:
إِنَّمَا الدُّنْيَا فَنَاءُ * لَيْسَ لِلدُّنْيَا ثُبُوْتُ إِنَّمَا الدُّنْيَا كَبَيْتِ * نَسَجَتْهُ الْعَنْكَبُوْتُ
টিকাঃ
৪৪. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/৩৪০
৪৫. আজ-জাহরুল ফায়িহ ফি জিকরি মিনাত তানাজজুহি আনিজ জুনুবি ওয়াল কাবায়িহ: ১/৯৫
৪৬. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ৩৭৯