📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 যখন দুনিয়া অর্জন করা ইবাদত

📄 যখন দুনিয়া অর্জন করা ইবাদত


এ নিকৃষ্ট দুনিয়ার সাথে যে মুসলিমই সম্পর্ক রাখে এবং এর উপার্জনের পেছনে অত্যধিক মেহনত করে, দুনিয়ার সাথে রাখা এ সম্পর্ক তাকে অনেক ইবাদত-বন্দেগি থেকে বঞ্চিত করে। এই সম্পর্কের দরুন দ্বীনের অনেক আবশ্যকীয় বিধিবিধান পরিপূর্ণরূপে তো সে আদায় করতে পারেই না; বরং সময়মতোও সেগুলো আদায় করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَلَا يَزْدَادُ النَّاسُ عَلَى الدُّنْيَا إِلَّا حِرْضًا وَلَا يَزْدَادُونَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا بُعْدًا
‘কিয়ামত নিকটেই চলে এসেছে। আর দুনিয়ার প্রতি মানুষের লোভ দিনদিন বেড়েই চলেছে। ক্রমশ তারা আল্লাহ থেকে দূরেই সরে যাচ্ছে।’৯
হালাল পন্থায় দুনিয়ার ধন-সম্পদ অর্জন ও হালাল খাতে তা ব্যয় করা ইবাদত। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার অন্যতম মাধ্যম এটি। পক্ষান্তরে, হারাম পন্থায় দুনিয়া অর্জন বা হারাম খাতে তা ব্যয় করা জাহান্নামে পৌঁছারই অতি মন্দ পাথেয়।
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন :
‘আমি তোমাদের বলছি না যে, দুনিয়া পরিত্যাগ করো। বরং তোমরা গুনাহ পরিত্যাগ করো। অবশ্য দুনিয়া পরিত্যাগ করতে পারাটা এক ধরনের ফজিলত। কিন্তু গুনাহ পরিত্যাগ করা তো ফরজ। সুতরাং ফজিলত অর্জন করার চেয়ে ফরজ আদায় করাই তোমাদের জন্য অধিক জরুরি।
প্রিয় ভাই, দুনিয়াতে মানুষের কত কিছুরই প্রয়োজন। তবে এসব কিছু থেকে তিনটি জিনিস—অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের প্রয়োজন পূরণই মানুষের জন্য যথেষ্ট। এগুলো তাদেরও অবশ্য প্রয়োজন রয়েছে, যারা আল্লাহর পথে চলে। তবে আল্লাহ-নির্দেশিত পন্থায় কেবল এসব অর্জন করতে হবে। লোভ-লালসায় পড়ে কেউ যখন প্রয়োজনের চেয়েও অতিরিক্ত সম্পদ অর্জন করে বা আল্লাহ-নির্দেশিত পন্থার প্রতি তোয়াক্কা না করে ভিন্ন কোনো পন্থায় অর্জন করে, তখন সেটা অবশ্যই নিন্দনীয়। এ ক্ষেত্রে লোভ-লালসাকে প্রশ্রয় দিলেই সমস্যা। কেননা, লোভের কারণে মানুষকে কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়। যা চূড়ান্ত পরিণাম কল্যাণকর হওয়ার ক্ষেত্রেও অন্তরায়। এতে তো মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি তার সফরকালে উটের অপ্রয়োজনীয় খাবারদাবার ও পানি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রংবেরঙের কাপড়ে সে উটকে সাজাতে থাকে। ফলে সে টেরও পায়নি, কখন তার কাফেলা রওয়ানা করে ফেলেছে। তাকে ফেলে তার সফরসঙ্গীরা চলে গেছে অনেক দূরে। এখন যে সে আর তার উটটি হিংস্র প্রাণীর শিকার হবার উপক্রম!
দুনিয়া অতিরিক্ত পরিমাণ গ্রহণ করা যেমন উচিত নয়, তেমনই প্রয়োজনীয় বস্তু অর্জনে সংকীর্ণতা দেখানোও উচিত নয়। কেননা, প্রয়োজনীয় বস্তু সঙ্গে থাকলেই তো জীবনের এ সফরে মুসাফির তার বাহন নিয়ে পথ চলতে পারবে।
প্রকৃতপক্ষে মধ্যমপন্থা অবলম্বনই সঠিক ও যথার্থ। মধ্যমপন্থার স্বরূপ হলো, যে পরিমাণ সম্পদ দুনিয়ার এ সফরে কারও প্রয়োজন পড়বে, ঠিক সে পরিমাণই সে অর্জন করবে। এমনিভাবে অন্তরে কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলে, তাও অর্জন করা উচিত। এটি অবশ্য অন্তরের জন্য সহায়ক। কেননা, অন্তরেরও কিছু চাওয়া-পাওয়া রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তার ইচ্ছা পূরণ করাও জরুরি।'১০
আওন বিন আব্দুল্লাহ রহ. বলেন: 'দুনিয়া ও আখিরাত অন্তরে দাঁড়িপাল্লার দু'পাল্লার ন্যায়। এর একটিকে প্রাধান্য দিলে অপরটি অবশ্যই হালকা হয়ে যাবে।'১১
হাসান রহ.-কে কেউ জিজ্ঞেস করল, 'হে আবু সাইদ, কিয়ামতের দিন সর্বাধিক বিকট আওয়াজে চিৎকার করে ক্রন্দনকারী কে?' তিনি বললেন, 'যাকে আল্লাহ তাআলা নিয়ামত দান করেছেন। অথচ, সে এ নিয়ামতের ব্যবহার করে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়েছে।’১২
আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে সহায়ক হবে, এ উদ্দেশ্যে কেউ যদি দুনিয়া অর্জন করে; তবে তা মন্দ নয়, বরং উত্তম। কেননা, সম্পদ অর্জন করলেই তো সে এর থেকে সদাকা করতে পারবে। ব্যয় করতে পারবে দ্বীনি খাতসমূহে। ইলমের প্রচার-প্রসারে সে আর্থিক সহায়তা করতে পারবে। মসজিদ নির্মাণ করতে পারবে। এটি তো তার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত। আল্লাহ তাকে এ সম্পদের মাধ্যমেই তো আখিরাতে উপকৃত হবার মতো খাতে ব্যয় করার তাওফিক দান করেছেন। তাই সম্পদ তার জন্য নিয়ামত।

টিকাঃ
৯. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৪/৩২৪; হাদিসটি সহিহ।
১০. মুখতাসারু মিনহাজিল কাসিদিন: ২১১
১১. তাজকিয়াতুন নুফুস: ১২৯
১২. আল-হাসানুল বসরি : ৪৮

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 দুনিয়ার ব্যাপারে সালাফের ভাবনা

📄 দুনিয়ার ব্যাপারে সালাফের ভাবনা


মানুষের স্বভাবগত আসক্তি এমন যে, তারা সম্পদ ভালোবাসে। স্বর্ণ- রৌপ্য জমা করতে পছন্দ করে। আমৃত্যু স্বর্ণ-রৌপ্য ও ধন-সম্পদের পেছনে ছোটে। তবে এর দ্বারা আসলে তারা কিছুই অর্জন করতে পারে না। কেননা, আল্লাহ যাকে যতটুকু দিতে চান, সে ঠিক ততটুকুই লাভ করে। তবুও মানুষের এ ছোটাছুটি বন্ধ হয় না। আর কখন তার এ দৌড়ঝাঁপের অবসান ঘটবে, তা যে সে নিজেও জানে না!
দুনিয়া কখনো মুখ তুলে তাকায়। কখনো পালিয়ে বেড়ায় পিঠ দেখিয়ে। এখানে ধনী গরিব হয়। আনন্দ গড়ায় বেদনায়। মোটকথা, দুনিয়ার জীবন কখনো এক অবস্থায় স্থির থাকে না। অপরিবর্তিত থাকে না এক নিয়মে। সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে এটাই আল্লাহর সুন্নাহ। এটাই তাঁর কার্যপদ্ধতি। কিন্তু মানুষকে বোঝানো বড় দায়। অবিরাম তারা মরীচিকার পেছনে ছুটে চলে। এভাবে একদিন তার আয়ু ফুরিয়ে যায়। এসে যায় তার অন্তিম মুহূর্ত। ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন:
وَمَنْ يَّذُقِ الدُّنْيَا فَإِنِّي طَعِمْتُهَا وَسِيقَ إِلَيْنَا عَذْبُهَا وَعَذَابُهَا فَلَمْ أَرَهَا إِلَّا غُرُورًا وَبَاطِلاً كَمَا لَاحَ فِي ظَهْرِ الفَلَاةِ سَرَابُهَا
وَمَا هِيَ إِلَّا جِيْفَةٌ مُسْتَحِيْلَةٌ عَلَيْهَا كِلَابُ هَمُّهُنَّ اجْتِذَابُهَا فَإِنْ تَجْتَنِبُهَا كُنْتَ سِلْمًا لِأَهْلِهَا وَإِنْ تَجْتَذِبْهَا نَازَعَتْكَ كِلَابُهَا
'হৃদয়ে জাগে লালসা সাধের দুনিয়ার। আমিও দেখেছি চেখে জগতের স্বাদ! দুনিয়ার যত মিষ্টতা আর যত অনিষ্ট-ধরা পড়েছে আমার চোখে। দেখেছি আমি, দুনিয়া কেবল ধোঁকা আর প্রতারণা কিংবা ঊষর মরুর ঝিলমিলে ধূসর মরীচিকা। দুনিয়া ভাগাড়ে ছুঁড়ে ফেলা গলিত লাশ বৈ কিছু নয়। লোলুপ দৃষ্টি মেলে যাকে পাহারা দেয় কুকুরের দল-কখনো খুবলে খায় তার হাড়- মাংস। যদি মুখ ফিরিয়ে নাও এই পচা লাশ থেকে, তবে নিরাপদ তুমি। আর যদি আকৃষ্ট হও তার দিকে, তবে তুমিও লেগে যাও ঝগড়ায় কুকুরদের সাথে। '১৩
উমর বিন খাত্তাব রা. বলেন : 'দুনিয়া অর্জন নয়; দুনিয়াবিমুখতায়ই রয়েছে দেহ-মনের প্রশান্তি।'১৪
হাসান রহ. বলেন: 'আমি এমন অনেক লোককে দেখেছি, দুনিয়ার কিছু অর্জিত হলেও তারা আনন্দিত হতেন না; আবার দুনিয়ার কিছু হারিয়ে গেলেও আফসোস করতেন না। '১৫
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর ছোট্ট একটি বাণী দুনিয়াবিমুখতাকে যথার্থভাবে সংজ্ঞায়িত করে- 'দুনিয়াবিমুখতা হলো উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমন করা।'১৬
'মুমিনের জন্য কখনো সমীচীন নয় যে, দুনিয়াকে নিজের আরাম-আয়েশের আবাস বানিয়ে এখানে প্রশান্তির সাথে বসবাস করবে। বরং তার উচিত হলো, দুনিয়াতে সে এমনভাবে থাকবে, যেন অল্প সময়ের জন্য এখানে সে যাত্রাবিরতি করেছে। কিছুক্ষণ পর রওয়ানা করবে গন্তব্যের পানে।'১৭
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন : 'দুনিয়াকে আমি কেন ভালোবাসব না? আমার জন্য তো এখানে রিজিক নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে আমি সংগ্রহ করি আমার জীবনোপকরণ। যার মাধ্যমে আমি ইবাদত করতে পারি-লাভ করতে পারি জান্নাত।'১৮
দুনিয়া সম্পর্কে যাদের এমনই বোধ-উপলব্ধি, যারা একে গ্রহণ করেছেন আখিরাত অর্জনের মাধ্যম হিসেবে; তাদের প্রতিই কেবল ঈর্ষা চলে। সুউচ্চ দালানকোঠার মালিক যারা-কিন্তু ইবাদতে অলসতা করে এবং ইবাদত বিনষ্ট করে-তাদের প্রতি ঈর্ষা করাও বোকামি।
আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. বলেন : 'দুনিয়া কাফিরদের জন্য জান্নাত আর মুমিনদের জন্য কারাগার সমতুল্য। মৃত্যু যেন মুমিনের কারাগার থেকে মুক্তির পরোয়ানা। তাই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে খুব আনন্দিত হবে।'১৯
'হে লোকসকল, মৃত্যুর তির তাক করা আছে তোমাদের দিকে। আশা-আকাঙ্ক্ষার ফাঁদ পাতা রয়েছে চলার পথে। সুতরাং সতর্ক হও। তোমাদের বেষ্টন করে আছে দুনিয়ার ফিতনা। আজকের ভালো অবস্থা দেখে বিভ্রান্ত হয়ো না। অচিরেই বদলে যাবে পরিস্থিতি। দুনিয়া তোমাদের সংকীর্ণতায় নিপতিত করবে-ঠেলে দেবে বিলুপ্তির পথে।'২০

টিকাঃ
১৩. শাজারাতুজ জাহাব: ২০/১০
১৪. তারিখু উমর: ২৬
১৫. আজ-জুহদ, আহমাদ: ২৩০
১৬. মাদারিজুস সালিকিন: ২/১১
১৭. জামিউল উলুম : ৩৭৮
১৮. তাজকিয়াতুন নুফুস : ১২৮
১৯. শারহুস সুদুর : ১৩
২০. আল-আকিবাহ : ৬৯

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 ক্ষণস্থায়ী এ দুনিয়া

📄 ক্ষণস্থায়ী এ দুনিয়া


কবি বলেন:
تُمُرُّ بِنَا الأَيَّامُ تَتْرَى وَإِنَّمَا نُسَاقُ إِلَى الْآجَالِ وَالْعَيْنُ تَنْظُرُ فلا عائدُ ذَاكَ السَّبَابُ الَّذِي مَضَى وَلَا زَائِلُ هَذَا الْمَشِيبُ الْمُكَدَّرُ
'পলে পলে ক্ষয়ে যায় সময়। পায়ে পায়ে শিয়রে এসে দাঁড়ায় মৃত্যুর হিম শীতল আঁধার। দৃষ্টির সামনে নিঃশব্দে খেলা করে পেছনের বিলীয়মান দৃশ্যরাজি। ফেলে আসা যৌবনের সোনালি দিনগুলোকে মনে হয় ক্ষণিকের সুখস্বপ্ন। জীর্ণ-শীর্ণ অনড় এই বার্ধক্যই কেবল এখনকার চরম বাস্তবতা।'২১
'সুতরাং যে দুনিয়ার পরিণতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে, মন্দ পরিণামফলের আশঙ্কায় সে ভীতসন্ত্রস্ত থাকে—সতর্কতা অবলম্বন করে। আর যে বিশ্বাস করে, সামনে দীর্ঘ পথ তাকে পাড়ি দিতে হবে, সফরের জন্য অবশ্যই সে প্রস্তুতি নেয় সঠিকভাবে। '২২
অথচ, আমরা দুনিয়ার কত সময় খেল-তামাশায় নষ্ট করেছি; লিপ্ত হয়েছি কত পাপাচারে; তার কোনো ইয়ত্তা নেই! একের পর এক গুনাহ করে চলেছি! পাথেয় সংগ্রহে আমাদের কোনো মনোযোগ নেই।
সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা? কোথায় তাঁদের আখিরাতমুখী জীবন আর কোথায় আমাদের আনুষ্ঠানিক দ্বীনদারি!
আনাস বিন ইয়াজ রহ. বলেন:
'সাফওয়ানকে আমি কাছ থেকে দেখেছি। যদি তাকে বলা হতো, আগামীকাল কিয়ামত সংঘটিত হবে। তবুও অতিরিক্ত আমল করার মতো কিছুই তিনি খুঁজে পেতেন না।'২৩
ভীষণ আশ্চর্যজনক আমাদের অবস্থা! আমরা অতিক্রম করে চলছি দুনিয়ার জীবন। আখিরাত আমাদের সামনে অপেক্ষমাণ। কিন্তু আমরা পড়ে আছি সেই পেছনের দুনিয়া নিয়ে! কেমন যেন ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের কোনো ভাবনা নেই। আখিরাতের মুখোমুখি যেন আমাদের হতেই হবে না।
উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. তাঁর খুতবায় বলতেন:
'দুনিয়া তোমাদের চিরস্থায়ী আবাস নয়। এর ধ্বংস অনিবার্য। দুনিয়াবাসীদের অবশ্যই এখান থেকে বিদায় নিতে হবে। শক্ত ভিতের ওপর নির্মিত দালানকোঠা ভেঙে পড়বে অচিরে। দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষগুলোও এক এক করে বিদায় নেবে। চলে যাওয়া সবারই সুনিশ্চিত। তাই উত্তম যাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। সময় থাকতেই সংগ্রহ করে নাও প্রয়োজনীয় সব উপকরণ। জেনে রেখো, সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া (আল্লাহভীতি)। দুনিয়া যেহেতু মুমিনদের স্থায়ী আবাস নয়; তাই এখানে থাকতে হবে হয়তো ভিনদেশির ন্যায়, যে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার চিন্তায় পাথেয় সংগ্রহে মশগুল থাকে কিংবা হতে হবে মুসাফিরের মতো, যে কোথাও অবস্থান করে না; বরং রাতদিন চলতে থাকে নিজের স্থায়ী আবাসের পথে। '২৪
فَمَا فَرِحَتْ نَفْسِي بِدُنْيَا أَخَذْتُهَا وَلكِنْ إِلَى الْمَلِكِ الْقَدِيرِ أَصِيرُ
'দুনিয়ার যে সুখ ও সমৃদ্ধি আমি অর্জন করেছি, এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আমার মন। তাই আমি চলেছি সর্বশক্তিমান রাজাধিরাজের পানে। '২৫
মানুষ আজ পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত। একে অপরের খুন-পিপাসায় উন্মত্ত। দুনিয়া অর্জনের নেশায় উন্মাদনায় মেতে উঠেছে তারা। কেউ হারাচ্ছে দ্বীন। কেউ ভুলে আছে সন্তানসন্ততিদের। শান্তি নেই আজ কারও মাঝে। হিংসা, ঘৃণা আর শত্রুতার আগুন ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। ফুজাইল রহ. বলেন :
'যতক্ষণ দুনিয়ার ভোগের পরোয়া করা তুমি ছেড়ে না দেবে, ততক্ষণ তোমার অন্তর অশান্তই থাকবে।'
কবি কত সুন্দরই না বলেছেন :
تَبَلَّغْ مِنَ الدُّنْيَا بِأَيْسَرِ زَادٍ فَإِنَّكَ عَنْهَا رَاحِلٌ لِمَعَادٍ وَغُضَّ عَنِ الدُّنْيَا وَزُخْرُفِ أَهْلِهَا جُفُوْنَكَ وَاكْحَلْهَا بِطِيْبِ سُهَادٍ وَجَاهِدْ عَلَى اللَّذَاتِ نَفْسَكَ جَاهِدًا فَإِنَّ جِهَادَ النَّفْسِ خَيْرُ جِهَادٍ وَمَا هِيَ إِلَّا دَارُ لَهْرٍ وَفِتْنَةٍ وَإِنَّ قُصَارَى أَهْلِهَا لَتَفَادُ
'স্বল্প পুঁজিতেই কাটিয়ে দাও ছোট্ট এ জীবন-খানিক বাদেই তো বেজে যাবে বিদায় ঘণ্টা-শুরু হবে যাত্রা তোমার অনন্ত জীবনের পথে। ব্যথিত হয়ো না ধনীদের ঐশ্বর্য দেখে, অবনত রেখো তোমার দৃষ্টি। সুষুপ্ত নিশীথে লুটিয়ে পড়ো রবের দরবারে। দুচোখে লাগাও দীর্ঘ অনিদ্রার পবিত্র সুরমা। দূরে রেখো হৃদয়কে প্রবৃত্তির লালসা থেকে-জীবন চলার পথে এটিই হবে তোমার পরম সাধনা। পার্থিব এ জীবন পরীক্ষা বৈ কিছু নয়। খেল-তামাশায় মগ্ন হয়ে বরবাদ করো না অমূল্য সময়গুলো। দুনিয়াপূজারিদের এই সমৃদ্ধি একদিন চিরতরে নিঃশেষিত হবে।'২৬

টিকাঃ
২১. শাজারাতুজ জাহাব: ৬/২৩১
২২. সাইদুল খাতির: ২৫
২৩. আস-সিয়ার: ৫/৩৬৬
২৪. জামিউল উলুম: ৩৭৯
২৫. শাজারাতুজ জাহাব: ২/১৯৯
২৬. আল-মুনতাখাব : ৪০১

📘 দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা > 📄 সকল কল্যাণের রহস্য

📄 সকল কল্যাণের রহস্য


বিলাল বিন সা'দ রহ. বলেন :
‘হে আল্লাহভীরুগণ, চিরতরে ধ্বংস করার জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়নি। তোমাদের তো কেবল স্থানান্তর করা হবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। যেভাবে তোমরা স্থানান্তরিত হয়েছ বাবার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের জরায়ুতে—জরায়ু থেকে দুনিয়াতে। তেমনিভাবে তোমরা ফের স্থানান্তরিত হবে দুনিয়া থেকে কবরে, কবর থেকে হাশরে-হাশর থেকে চিরস্থায়ী জান্নাত বা জাহান্নামে। ’২৭
সকল কল্যাণের রহস্য
কাকে ঘিরে আমাদের ব্যস্ততা? কী নিয়ে আমরা মগ্ন থাকি? বিষয়টি কি আসলে এমন, যেমনটা হাসান রহ. বলেছেন?
'এ দুনিয়া কর্মব্যস্ততায় পূর্ণ। ব্যস্ততার একটা দুয়ার খুললেই উন্মুক্ত হয়ে যায় আরও দশটা। তাই দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে বেঁচে থাকো।' ২৮
ইবনে সাম্মাক রহ. বলেন:
'দুনিয়ার জন্য পরিশ্রম করাও যেন আনন্দের। কেননা, আমরা যে দুনিয়ার প্রতিই আকৃষ্ট। পক্ষান্তরে আখিরাতের জন্য সাধনা করা কঠিন। কারণ, তা যে দুনিয়া থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ২৯
দুনিয়া নিয়েই কেন আমরা এত ব্যতিব্যস্ত? তবে কি আমরা মনে করি, দুনিয়াই সকল কল্যাণের উৎস? অথচ-
'আল্লাহ যা চান, কেবল তা-ই তো হয়। তিনি যা চান না, তা কখনোই হয় না। অন্তরে বদ্ধমূল এ বিশ্বাসই সকল কল্যাণের রহস্য। আর এ প্রত্যয় যখন তোমার অন্তরে থাকবে, তখন তুমি এটাও উপলব্ধি করবে যে, নেক আমল মূলত আল্লাহর নিয়ামত। তাই তুমি এর জন্য শুকরিয়া আদায় করবে এবং কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করবে—এ নিয়ামত যেন বন্ধ হয়ে না যায়। তোমার অন্তরে এ বিশ্বাস জন্মাবে যে, মন্দ আমল আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তিস্বরূপ। তাই এ আজাব থেকে বেঁচে থাকতে অবশ্যই তুমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবে। নেক আমল করা ও মন্দ আমল পরিত্যাগ করার ভার তোমার নিজের ওপর না দেওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করে আল্লাহর নিকট কান্নাকাটি করতে থাকবে।'৩০
ইবরাহিম বিন আদহাম রহ.-এর কাছে জানতে চাওয়া হলো, 'আপনি কেমন আছেন?' উত্তরে তিনি বলেন:
نُرَقَّعُ دُنْيَانَا بِتَمْزِيقِ دِينِنَا * فَلَا دِينُنَا يَبْقَى وَلَا مَا نُرَقَّعُ فَطُوبَى لِعَبْدٍ آثَرَ اللَّهَ رَبَّهُ * وَجَادَ بِدُنْيَاهُ لِمَا يَتَوَقَّعُ
'দ্বীনের কাঠামো বিচূর্ণ করে আমরা গড়ি দুনিয়ার প্রাসাদ। ফলে দিন শেষে আমরা না দ্বীন পাই, না দুনিয়া। সেই বান্দার জন্য সুসংবাদ যে প্রাধান্য দেয় তার রবকে—অনন্তের আশায় জলাঞ্জলি দেয় ক্ষণিকের লালসা।।'৩১
বিষয়টি আসলে এমনই—চিরস্থায়ী আবাসকে ধ্বংস করে ক্ষণিকের দুনিয়া নিয়ে বিভোর আমরা। তাই আমাদের চোখে আলো নেই—নেই সুন্দর কোনো আগামীর পয়গাম।
দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা জাগে দুনিয়াকে কল্যাণকর মনে করলে। তাই দুনিয়াপ্রীতির আলামত হলো, দুনিয়াদারদের ভালোবাসা, তাদের তোষামোদ করা এবং তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা। সুফইয়ান সাওরি রহ. বলেন:
'কারও অন্তরে দুনিয়াপ্রীতি আছে কি নেই, নিমিষেই আমি তা বুঝে ফেলি। দুনিয়াদারদের দেওয়া সালামের ধরন তাদের দুনিয়াপ্রীতির প্রমাণ বহন করে।'৩২
আমরা যে দুনিয়াদারদের প্রাধান্য দিয়ে থাকি, এটা কেন করি? দুনিয়াকে কল্যাণকর মনে করার কারণেই তো! বাস্তবতা হলো, নেককার ও সচ্চরিত্র গরিব লোকদের সাথে কেউ কথাই বলতে চায় না। তাদের সালাম করলেও তা হয় খুব অনাগ্রহের সাথে। দূরত্ব বজায় রেখে সালাম করে, যেন তার দারিদ্র্য আবার তাকে ধরে না ফেলে। মুসাফাহা করতে চাইলে শুধু আঙুলের অগ্রভাগ মিলায়। খোঁজখবর জিজ্ঞেস করার সময় কপাল থাকে কুঞ্চিত—চেহারায় প্রকাশ পায় ঘৃণার ছাপ।
পক্ষান্তরে, বিত্তশালী কেউ এলে তার সম্মানে মানুষ দাঁড়িয়ে যায়। তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। হোক সে বেনামাজি বা পাপিষ্ঠ কেউ। একজন দ্বীনদার দরিদ্রের কথা চিন্তা করুন। মানুষ তাকে মোটেও গ্রাহ্য করে না। তার খবরও নেয় না—সে বেঁচে আছে কি নেই। অপরদিকে একজন বদকার বিত্তশালী—আল্লাহর কাছে মশার ডানা পরিমাণও যার মূল্য নেই—তাকে মানুষ কত আদর-আপ্যায়ন করে! কত মাখামাখি তার সাথে! দুনিয়াপ্রেমী আর আখিরাতপ্রত্যাশীর মাঝে এটাই পার্থক্য। দ্বীনদারদের অগ্রাহ্য করে বদকার দুনিয়াদারদের প্রাধান্য দেওয়াই দুনিয়াপ্রীতির লক্ষণ।
দুনিয়াকে আমরা কল্যাণকর মনে করি। এ কারণে দুনিয়া নিয়ে আমাদের সকল ব্যস্ততা। এমনকি আমরা নিজেদের পুরো সময়টা দুনিয়ার জন্য উৎসর্গ করি। অথচ, আব্দুল্লাহ বিন আওন রহ. বলেন:
'পূর্বসূরিগণ আখিরাতের জন্য সময় ব্যয় করার পর হাতে থাকা অবশিষ্ট সময় দুনিয়ার জন্য বরাদ্ধ রাখতেন। কিন্তু তোমরা দুনিয়ার জন্য সময় ব্যয় করে অবশিষ্ট সময়টা নির্ধারণ করো আখিরাতের জন্য!'৩৩
ভাই আমার, 'দুনিয়ার জীবন নিতান্ত ক্ষণিকের। দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিও আসলে গরিব। একটু ভেবে দেখো তো—মৃত্যু তোমার দুয়ারে উপস্থিত, দুনিয়া থেকে বিদায়ের আগেই একাকিত্ব ও নির্জনতার ঘ্রাণ পেতে শুরু করছ তুমি। তোমার সন্তানদের চেহারায় ফুটে উঠেছে এতিম এতিম ভাব...। এমন অবস্থায় কীই-বা করার থাকবে তোমার? তাই এখনই জেগে ওঠো গাফিলতির নিদ্রা থেকে। ঝেড়ে ফেলো দুনিয়ার মত্ততা। অন্তর থেকে বের করে দাও দুনিয়াপ্রীতি। এখনো তোমার সামনে সুযোগ আছে। বান্দা যখন তার চোখ বুজবে, ফিরে যাবে আসল গন্তব্যে—দুনিয়াতে সে আবার আসতে চাইবে একটু আমল করার আশায়। কিন্তু তখন আর কোনো সুযোগ থাকবে না।'৩৪
তাই সময় থাকতেই দুনিয়া থেকে আমাদের মুখ ফিরিয়ে নিতে হবে। মনোযোগী হতে হবে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহে। কারণ, যে মৃত্যুর ব্যাপারে আমাদের ভাবনা, তা তো এখনো অনেক দূরে। সে মৃত্যু কিন্তু অচিরেই আমাদের নিকটে চলে আসবে। আজ তুমি অন্য কারও জানাজা দেখছ। কাল হয়তো অন্যরা তোমার জানাজা দেখবে। মৃত্যু সহসা সামনে উপস্থিত হয়। হঠাৎ আমরা আক্রান্ত হতে পারি এমন কোনো রোগে, যা মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের শয্যাশায়ী করে রাখবে। এসব নিছক ধারণা নয়, দুনিয়ার বুকে এ ধরনের বহু উদাহরণ আছে। তবুও কি আমরা আলস্যের নিদ্রায় বিভোর হয়ে থাকব? নিমজ্জিত থাকব গোমরাহির মত্ততায়?
تَبَا لِطَالِبِ دُنْيَا لَا بَقَاءَ لَهَا * كَأَنَّمَا هِيَ فِي تَصْرِيفِهَا حُلُمُ صَفَاؤُهَا كَدَرُ، وَسَرَاؤُهَا ضَرَرُ * أَمَانُهَا غَرَرُ، أَنْوَارُهَا ظُلَمُ شَبَابُهَا هَرَمٌ، رَاحَاتُهَا سَقَمُ * لَذَّاتُهَا نَدَمُ، وِجْدَانُهَا عَدَمُ
'দুনিয়াপূজারিদের ধ্বংস অনিবার্য। কেননা, পার্থিব জীবন ক্ষণিকের সুখস্বপ্ন বৈ কিছু নয়। দুনিয়ার বিশুদ্ধতায়ও থাকে দূষণের দৌরাত্ম্য—কল্যাণেও ওত পেতে থাকে অনিষ্টের মহামারি। নশ্বর এই জগতের স্বস্তিও যেন শঙ্কায় ছেয়ে থাকে— আলোতেও যেন চোখে পড়ে আঁধারের হাতছানি। যৌবনেও কখনো উঁকি দেয় বার্ধক্যের মলিন চেহারা, সুস্থতার পেছনেও শোনা যায় ব্যাধির নিষ্ঠুর পদধ্বনি। এর সুখ ও পুলক বয়ে আনে লাঞ্ছনা—অর্জনগুলোও কখনো রূপ নেয় বিসর্জনে।'৩৫

টিকাঃ
২৭. আস-সিয়ার: ৫/৯১
২৮. আজ-জুহদ, ইবনুল মুবারক: ১৮৯
২৯. শাজারাতুজ জাহাব: ১/৩০৪
৩০. আল-ফাওয়ায়িদ: ১২৭
৩১. প্রথম দু'ছত্র, আল-ইকদুল ফারিদ: ৩/১২৪
৩২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৭/৩৭
৩৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/১০১
৩৪. উদ্দাতুস সাবিরিন: ৩২৯
৩৫. ইমাম গাজালি রহ. কৃত মুকাশাফাতুল কুলুব: ৩২৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00