📄 লেখকের ভূমিকা
اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِیْ جَعَلَ الدُّنْيَا دَارَ مَمَرٍّ وَالْاٰخِرَةَ دَارَ مَقَرٍّ وَالصَّلٰوةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى اَشْرَفِ الْاَنْبِيَاءِ وَالْمُرْسَلِيْنَ
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি দুনিয়াকে বানিয়েছেন পথ অতিক্রমণের সাঁকোস্বরূপ আর আখিরাতকে করেছেন অবস্থানের আবাস। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক শ্রেষ্ঠতম রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর।
দুনিয়ার প্রতি মানুষ চরম আসক্ত। পার্থিব ভোগ-বিলাস ও আনন্দ-উল্লাসে বিভোর তাদের জীবন। তুচ্ছ দুনিয়ার খড়কুটো আহরণে অবিরাম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত তারা। বড় আশ্চর্য লাগে এসব দেখে! মানুষের জীবনের লক্ষ্য কি এটাই? আসলে এটাই কি হওয়া উচিত তাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য? অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তাদের সৃষ্টিই যেন পার্থিব ভোগ-বিলাসে বিভোর থাকার জন্য। একদিন যে মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, এ বোধটুকুও যেন তাদের হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে! জীবনপথের চূড়ান্ত গন্তব্য তারা আজ ভুলে বসে আছে! ছুটে চলছে তারা আলেয়ার পেছনে! মিছে মরীচিকার পানে!
বক্ষ্যমাণ রচনাটি মূলত «أَيْنَ نَحْنُ مِنْ هٰؤُلَاءِ؟» (সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!) সিরিজের সপ্তম বই। এ অংশের নাম রাখা হয়েছে, «الدُّنْيَا ظِلُّ زَائِل» 'দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা'। দুনিয়ার ব্যাপারে কেমন ছিল সালাফে সালিহিনের দৃষ্টিভঙ্গি? দুনিয়াকে কীভাবে দেখতেন তারা? কেমন ছিল তাদের দৃষ্টিতে দুনিয়ার স্বরূপ? 'দুনিয়া এক ধূসর মরীচিকা' বইটিতে তারই চমৎকার বর্ণনা উঠে এসেছে।
দুনিয়াকে সালাফে সালিহিন মনে করতেন, সাময়িক যাত্রাবিরতির একটি স্থান মাত্র। এর পরই তো হিসাব-নিকাশ ও কর্মফলের মুখোমুখি হওয়ার পথে নিশ্চিত অভিযাত্রা। বক্ষ্যমাণ রচনাটি পুনরুত্থান দিবস ও পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণের উত্তম এক স্মারক এবং চিরস্থায়ী নিবাসের পানে ছুটে চলা মুসাফিরের এক উৎকৃষ্ট পাথেয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল আমলে ইখলাস ও নিষ্ঠা দান করুন। আমিন।
- আব্দুল মালিক বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আল-কাসিম
📄 পার্থিব জীবনের স্বরূপ
কুরআনের বয়ানে পার্থিব জীবন
পার্থিব জীবনের স্বরূপ ও প্রকৃতি বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা বলেন : ﴿إِنَّمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعُ وَإِنَّ الْآخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ﴾
'এই পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু। জেনে রেখো, আখিরাতই হলো চিরস্থায়ী আবাস।'১
দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততির ফিতনা থেকে সতর্ক করে আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ أَجْرُ عَظِيمٌ﴾
'জেনে রেখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি তো এক পরীক্ষা। আর আল্লাহর নিকটই রয়েছে মহাপুরস্কার।'২
দুনিয়ার ধন-সম্পদের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে নিষেধ করে আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ﴾
'আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেই সব বস্তুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না।'৩
ইমাম গাজালি রহ. বলেন:
'পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে দুনিয়া ও পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি নিন্দা বর্ণিত হয়েছে। কুরআনের বেশির ভাগ আয়াতে দুনিয়ার প্রতি নিন্দা ও সৃষ্টিকুলকে এর ব্যাপারে অনুৎসাহিত করে আখিরাতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এমন বহু আয়াত আমাদের চোখের সামনে ভাসে, তাই এ বিষয়ে আর বেশি উদ্ধৃতি উল্লেখের প্রয়োজন বোধ করছি না। '৪
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চোখে দুনিয়ার জীবন
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুপম ও অতুলনীয় এক মহামানব। তাঁর জীবনীর মধ্যেই রয়েছে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। তাঁর চোখে কেমন ছিল দুনিয়ার জীবন? দুনিয়ার ব্যাপারে কেমন ছিল তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি?
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন:
اِضْطَجَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى حَصِيرٍ، فَأَثَرَ فِيْ جَنْبِهِ، فَلَمَّا اسْتَيْقَظَ جَعَلْتُ أَمْسَحُ جَنْبَهُ وَقُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَلَا آذَنْتَنَا حَتَّى نَبْسُطَ لَكَ عَلَى الْحَصِيرِ شَيْئًا ۚ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ما لِي وَلِلدُّنْيَا مَا أَنَا وَالدُّنْيَا إِنَّمَا مَثَلِي وَمَثَلُ الدُّنْيَا كَرَاكِبٍ ظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ، ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا-
'একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাটাইয়ের ওপর শুয়েছিলেন। ফলে তাঁর শরীরের পার্শ্বে এর ছাপ পড়ে গেল। তিনি জাগ্রত হলে আমি তাঁর শরীরের পার্শ্বে হাত বুলাতে লাগলাম। বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার চাটাইয়ের ওপর কিছু বিছিয়ে দেওয়ার অনুমতি কি আপনি আমাদের দেবেন না? আমার কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক?! আমার ও দুনিয়ার উপমা হচ্ছে, এমন এক মুসাফিরের ন্যায়, যে সামান্য সময় কোনো গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিল, তারপর সে স্থান ত্যাগ করে চলে গেল গন্তব্যের দিকে।""৫
দুনিয়া নিয়ে মানুষের ব্যস্ততার শেষ নেই! বাড়ি-গাড়ি, অর্থ-সম্পদ উপার্জনের পেছনে অবিরাম চলছে দৌড়ঝাঁপ আর ছোটাছুটি। অথচ, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেছেন মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য। বলেছেন পাথেয় জোগাড় করতে পরকালের সে চিরস্থায়ী জীবনের লক্ষ্যে।
আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. বলেন:
أَخَذَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَنْكِبِي، فَقَالَ : كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ، يَقُولُ : «إِذَا أَمْسَيْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ الصَّبَاحَ، وَإِذَا أَصْبَحْتَ فَلَا تَنْتَظِرِ المَسَاءَ، وَخُذْ مِنْ صِحَتِكَ لِمَرَضِكَ، وَمِنْ حَيَاتِكَ لِمَوْتِكَ
'একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কাঁধ ধরে বললেন, “দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করো, যেন তুমি কোনো ভিনদেশি বা মুসাফির।" ইবনে উমর রা. বলতেন, “তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হলে সকালের অপেক্ষা কোরো না। আর সকালে উপনীত হলে সন্ধ্যার অপেক্ষায় থেকো না। তোমার সুস্থতার সময় প্রস্তুতি গ্রহণ করো অসুস্থ অবস্থার জন্য। আর তোমার জীবিত অবস্থায় প্রস্তুতি গ্রহণ করো মৃত্যুর জন্য।""৬
ব্যাখ্যা:
'দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করো, যেন তুমি কোনো ভিনদেশি।' যে তার বাড়ি থেকে দূরে অবস্থান করছে। ভিনদেশি হওয়ার কারণে সে তার অবস্থানস্থলকে নিজের ঘর হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। বেশি সময় সেখানে বসবাসের কল্পনাও করতে পারে না। আইনি রহ. বলেন, 'হাদিসে ব্যবহৃত غریب শব্দটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শব্দ। এ একটি শব্দই ধারণ করেছে বহু উপদেশ। আরও সহজভাবে বললে, ভিনদেশিদের সাথে মানুষের তেমন একটা পরিচিতি থাকে না। ফলে কারও প্রতি তার অন্তরে কোনো হিংসা থাকে না; থাকে না শত্রুতা, কপটতা, ঝগড়ার মতো বিভিন্ন মন্দ স্বভাব। বস্তুত, মানুষের সাথে অধিক সম্পর্কের কারণে এসব মন্দ স্বভাবের প্রকাশ ঘটে। কেউ যখন ভিনদেশির মতো জীবনযাপন করে, তখন তার না কোনো স্থায়ী ঘর থাকে, আর না থাকে কোনো বাগান, চাষাবাদের জমি ও পরিবার-পরিজন। সর্বোপরি ভিনদেশি হওয়ার কারণে মানুষের সাথে তার সম্পর্ক খুব কম হয়ে থাকে আর আপন প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক থাকে মজবুত。
'বা তুমি কোনো মুসাফির।' মুসাফির আপন সফরে ব্যস্ত থাকে। ভিনদেশির মতো অন্য লোকদের সাথে তারও সম্পর্ক থাকে খুবই কম। মুসাফিরের মতো জীবনযাপন করলে মানুষের সাথে সম্পর্ক কম হয়ে আল্লাহর সাথে থাকা সম্পর্কে পূর্ণতা আসে。
)অন্যদিকে ইবনে উমরের কথা( خُذْ مِنْ صِحْتِكَ لِمَرَضِكَ এর অর্থ হলো, তোমার সুস্থ অবস্থায় এ পরিমাণ ইবাদতে মগ্ন হও, যেন তুমি রোগাক্রান্ত থাকার সময়ের কমতি ও ঘাটতিগুলো পূর্ণ করে নিতে পারো। আর حَيَاتِكَ لِمَوْتِكَ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, জীবনের এ সময়টা তোমার পুঁজি। কাজেই এ সময়কে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে ব্যয় করো; তাহলে মৃত্যুর পরে এ ইবাদত-বন্দেগিই তোমার কাজে আসবে।৭
দুনিয়ার প্রতি মানুষের অতিশয় আগ্রহ ও হালাল-হারামের বাছ-বিচার ছাড়া দুনিয়ার তুচ্ছ-নগণ্য বস্তু অর্জনে তাদের প্রতিযোগিতা দেখলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ হাদিসটি মনে পড়ে—
إِذَا رَأَيْتَ اللَّهَ يُعْطِي الْعَبْدَ مِنَ الدُّنْيَا عَلَى مَعَاصِيهِ مَا يُحِبُّ، فَإِنَّمَا هُوَ اسْتِدْرَاجُ ثُمَّ تَلَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : {فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلَّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُونَ}
'আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দাকে অবাধ্য হওয়া সত্ত্বেও তার পছন্দনীয় বস্তু দান করা দেখে অবাক হবে না। কেননা, এটা হলো ইসতিদরাজ বা ধীরে ধীরে পাকড়াও করা। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিলাওয়াত করলেন কুরআনের এই আয়াতটি :
“অতঃপর তাদের যা কিছু নসিহত করা হয়েছিল, যখন তারা তা ভুলে গেল, তখন আমি সুখ-শান্তির জন্য প্রতিটি বস্তুর দরজা উন্মুক্ত করে দিলাম। যখন তারা দানকৃত বস্তু লাভ করে খুব আনন্দিত ও উল্লসিত হলো, তখন সহসা একদিন আমি তাদের পাকড়াও করলাম, আর তারা সেই অবস্থায় নিরাশ হয়ে পড়ল।""৮
টিকাঃ
১. সূরা গাফির: ৩৯
২. সূরা আল-আনফাল: ২৮
৩. সূরা ত্বহা: ১৩১
৪. আল-ইহইয়া: ৩/২১৬ (ঈষৎ পরিমার্জিত)।
৫. ইবনু কাসির রহ. বলেন, এ হাদিসটি ইমাম আহমাদ রহ. তাঁর মুসনাদে (১/৩৯১) বর্ণনা করেন। সুনানুত তিরমিজি: ২৩৭৭; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১০৯; তিরমিজি রহ. বলেন, এ হাদিসটি হাসান সহিহ। দেখুন, তাফসিরু ইবনি কাসির: ৮/৪২৫।
৬. সহিহুল বুখারি : ৬৪১৬
৭. মুস্তফা দিব আল-বাগা কৃত শরহুল বুখারি : ৮/৮৯; হাদিস নং: ৬৪১৬
৮. মুসনাদু আহমাদ : ১৭৩১১; হাদিসটি হাসান।
📄 যখন দুনিয়া অর্জন করা ইবাদত
এ নিকৃষ্ট দুনিয়ার সাথে যে মুসলিমই সম্পর্ক রাখে এবং এর উপার্জনের পেছনে অত্যধিক মেহনত করে, দুনিয়ার সাথে রাখা এ সম্পর্ক তাকে অনেক ইবাদত-বন্দেগি থেকে বঞ্চিত করে। এই সম্পর্কের দরুন দ্বীনের অনেক আবশ্যকীয় বিধিবিধান পরিপূর্ণরূপে তো সে আদায় করতে পারেই না; বরং সময়মতোও সেগুলো আদায় করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَلَا يَزْدَادُ النَّاسُ عَلَى الدُّنْيَا إِلَّا حِرْضًا وَلَا يَزْدَادُونَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا بُعْدًا
‘কিয়ামত নিকটেই চলে এসেছে। আর দুনিয়ার প্রতি মানুষের লোভ দিনদিন বেড়েই চলেছে। ক্রমশ তারা আল্লাহ থেকে দূরেই সরে যাচ্ছে।’৯
হালাল পন্থায় দুনিয়ার ধন-সম্পদ অর্জন ও হালাল খাতে তা ব্যয় করা ইবাদত। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার অন্যতম মাধ্যম এটি। পক্ষান্তরে, হারাম পন্থায় দুনিয়া অর্জন বা হারাম খাতে তা ব্যয় করা জাহান্নামে পৌঁছারই অতি মন্দ পাথেয়।
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন :
‘আমি তোমাদের বলছি না যে, দুনিয়া পরিত্যাগ করো। বরং তোমরা গুনাহ পরিত্যাগ করো। অবশ্য দুনিয়া পরিত্যাগ করতে পারাটা এক ধরনের ফজিলত। কিন্তু গুনাহ পরিত্যাগ করা তো ফরজ। সুতরাং ফজিলত অর্জন করার চেয়ে ফরজ আদায় করাই তোমাদের জন্য অধিক জরুরি।
প্রিয় ভাই, দুনিয়াতে মানুষের কত কিছুরই প্রয়োজন। তবে এসব কিছু থেকে তিনটি জিনিস—অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের প্রয়োজন পূরণই মানুষের জন্য যথেষ্ট। এগুলো তাদেরও অবশ্য প্রয়োজন রয়েছে, যারা আল্লাহর পথে চলে। তবে আল্লাহ-নির্দেশিত পন্থায় কেবল এসব অর্জন করতে হবে। লোভ-লালসায় পড়ে কেউ যখন প্রয়োজনের চেয়েও অতিরিক্ত সম্পদ অর্জন করে বা আল্লাহ-নির্দেশিত পন্থার প্রতি তোয়াক্কা না করে ভিন্ন কোনো পন্থায় অর্জন করে, তখন সেটা অবশ্যই নিন্দনীয়। এ ক্ষেত্রে লোভ-লালসাকে প্রশ্রয় দিলেই সমস্যা। কেননা, লোভের কারণে মানুষকে কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়। যা চূড়ান্ত পরিণাম কল্যাণকর হওয়ার ক্ষেত্রেও অন্তরায়। এতে তো মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি তার সফরকালে উটের অপ্রয়োজনীয় খাবারদাবার ও পানি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রংবেরঙের কাপড়ে সে উটকে সাজাতে থাকে। ফলে সে টেরও পায়নি, কখন তার কাফেলা রওয়ানা করে ফেলেছে। তাকে ফেলে তার সফরসঙ্গীরা চলে গেছে অনেক দূরে। এখন যে সে আর তার উটটি হিংস্র প্রাণীর শিকার হবার উপক্রম!
দুনিয়া অতিরিক্ত পরিমাণ গ্রহণ করা যেমন উচিত নয়, তেমনই প্রয়োজনীয় বস্তু অর্জনে সংকীর্ণতা দেখানোও উচিত নয়। কেননা, প্রয়োজনীয় বস্তু সঙ্গে থাকলেই তো জীবনের এ সফরে মুসাফির তার বাহন নিয়ে পথ চলতে পারবে।
প্রকৃতপক্ষে মধ্যমপন্থা অবলম্বনই সঠিক ও যথার্থ। মধ্যমপন্থার স্বরূপ হলো, যে পরিমাণ সম্পদ দুনিয়ার এ সফরে কারও প্রয়োজন পড়বে, ঠিক সে পরিমাণই সে অর্জন করবে। এমনিভাবে অন্তরে কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলে, তাও অর্জন করা উচিত। এটি অবশ্য অন্তরের জন্য সহায়ক। কেননা, অন্তরেরও কিছু চাওয়া-পাওয়া রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তার ইচ্ছা পূরণ করাও জরুরি।'১০
আওন বিন আব্দুল্লাহ রহ. বলেন: 'দুনিয়া ও আখিরাত অন্তরে দাঁড়িপাল্লার দু'পাল্লার ন্যায়। এর একটিকে প্রাধান্য দিলে অপরটি অবশ্যই হালকা হয়ে যাবে।'১১
হাসান রহ.-কে কেউ জিজ্ঞেস করল, 'হে আবু সাইদ, কিয়ামতের দিন সর্বাধিক বিকট আওয়াজে চিৎকার করে ক্রন্দনকারী কে?' তিনি বললেন, 'যাকে আল্লাহ তাআলা নিয়ামত দান করেছেন। অথচ, সে এ নিয়ামতের ব্যবহার করে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়েছে।’১২
আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে সহায়ক হবে, এ উদ্দেশ্যে কেউ যদি দুনিয়া অর্জন করে; তবে তা মন্দ নয়, বরং উত্তম। কেননা, সম্পদ অর্জন করলেই তো সে এর থেকে সদাকা করতে পারবে। ব্যয় করতে পারবে দ্বীনি খাতসমূহে। ইলমের প্রচার-প্রসারে সে আর্থিক সহায়তা করতে পারবে। মসজিদ নির্মাণ করতে পারবে। এটি তো তার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত। আল্লাহ তাকে এ সম্পদের মাধ্যমেই তো আখিরাতে উপকৃত হবার মতো খাতে ব্যয় করার তাওফিক দান করেছেন। তাই সম্পদ তার জন্য নিয়ামত।
টিকাঃ
৯. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৪/৩২৪; হাদিসটি সহিহ।
১০. মুখতাসারু মিনহাজিল কাসিদিন: ২১১
১১. তাজকিয়াতুন নুফুস: ১২৯
১২. আল-হাসানুল বসরি : ৪৮
📄 দুনিয়ার ব্যাপারে সালাফের ভাবনা
মানুষের স্বভাবগত আসক্তি এমন যে, তারা সম্পদ ভালোবাসে। স্বর্ণ- রৌপ্য জমা করতে পছন্দ করে। আমৃত্যু স্বর্ণ-রৌপ্য ও ধন-সম্পদের পেছনে ছোটে। তবে এর দ্বারা আসলে তারা কিছুই অর্জন করতে পারে না। কেননা, আল্লাহ যাকে যতটুকু দিতে চান, সে ঠিক ততটুকুই লাভ করে। তবুও মানুষের এ ছোটাছুটি বন্ধ হয় না। আর কখন তার এ দৌড়ঝাঁপের অবসান ঘটবে, তা যে সে নিজেও জানে না!
দুনিয়া কখনো মুখ তুলে তাকায়। কখনো পালিয়ে বেড়ায় পিঠ দেখিয়ে। এখানে ধনী গরিব হয়। আনন্দ গড়ায় বেদনায়। মোটকথা, দুনিয়ার জীবন কখনো এক অবস্থায় স্থির থাকে না। অপরিবর্তিত থাকে না এক নিয়মে। সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে এটাই আল্লাহর সুন্নাহ। এটাই তাঁর কার্যপদ্ধতি। কিন্তু মানুষকে বোঝানো বড় দায়। অবিরাম তারা মরীচিকার পেছনে ছুটে চলে। এভাবে একদিন তার আয়ু ফুরিয়ে যায়। এসে যায় তার অন্তিম মুহূর্ত। ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন:
وَمَنْ يَّذُقِ الدُّنْيَا فَإِنِّي طَعِمْتُهَا وَسِيقَ إِلَيْنَا عَذْبُهَا وَعَذَابُهَا فَلَمْ أَرَهَا إِلَّا غُرُورًا وَبَاطِلاً كَمَا لَاحَ فِي ظَهْرِ الفَلَاةِ سَرَابُهَا
وَمَا هِيَ إِلَّا جِيْفَةٌ مُسْتَحِيْلَةٌ عَلَيْهَا كِلَابُ هَمُّهُنَّ اجْتِذَابُهَا فَإِنْ تَجْتَنِبُهَا كُنْتَ سِلْمًا لِأَهْلِهَا وَإِنْ تَجْتَذِبْهَا نَازَعَتْكَ كِلَابُهَا
'হৃদয়ে জাগে লালসা সাধের দুনিয়ার। আমিও দেখেছি চেখে জগতের স্বাদ! দুনিয়ার যত মিষ্টতা আর যত অনিষ্ট-ধরা পড়েছে আমার চোখে। দেখেছি আমি, দুনিয়া কেবল ধোঁকা আর প্রতারণা কিংবা ঊষর মরুর ঝিলমিলে ধূসর মরীচিকা। দুনিয়া ভাগাড়ে ছুঁড়ে ফেলা গলিত লাশ বৈ কিছু নয়। লোলুপ দৃষ্টি মেলে যাকে পাহারা দেয় কুকুরের দল-কখনো খুবলে খায় তার হাড়- মাংস। যদি মুখ ফিরিয়ে নাও এই পচা লাশ থেকে, তবে নিরাপদ তুমি। আর যদি আকৃষ্ট হও তার দিকে, তবে তুমিও লেগে যাও ঝগড়ায় কুকুরদের সাথে। '১৩
উমর বিন খাত্তাব রা. বলেন : 'দুনিয়া অর্জন নয়; দুনিয়াবিমুখতায়ই রয়েছে দেহ-মনের প্রশান্তি।'১৪
হাসান রহ. বলেন: 'আমি এমন অনেক লোককে দেখেছি, দুনিয়ার কিছু অর্জিত হলেও তারা আনন্দিত হতেন না; আবার দুনিয়ার কিছু হারিয়ে গেলেও আফসোস করতেন না। '১৫
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর ছোট্ট একটি বাণী দুনিয়াবিমুখতাকে যথার্থভাবে সংজ্ঞায়িত করে- 'দুনিয়াবিমুখতা হলো উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমন করা।'১৬
'মুমিনের জন্য কখনো সমীচীন নয় যে, দুনিয়াকে নিজের আরাম-আয়েশের আবাস বানিয়ে এখানে প্রশান্তির সাথে বসবাস করবে। বরং তার উচিত হলো, দুনিয়াতে সে এমনভাবে থাকবে, যেন অল্প সময়ের জন্য এখানে সে যাত্রাবিরতি করেছে। কিছুক্ষণ পর রওয়ানা করবে গন্তব্যের পানে।'১৭
ইয়াহইয়া বিন মুআজ রহ. বলেন : 'দুনিয়াকে আমি কেন ভালোবাসব না? আমার জন্য তো এখানে রিজিক নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে আমি সংগ্রহ করি আমার জীবনোপকরণ। যার মাধ্যমে আমি ইবাদত করতে পারি-লাভ করতে পারি জান্নাত।'১৮
দুনিয়া সম্পর্কে যাদের এমনই বোধ-উপলব্ধি, যারা একে গ্রহণ করেছেন আখিরাত অর্জনের মাধ্যম হিসেবে; তাদের প্রতিই কেবল ঈর্ষা চলে। সুউচ্চ দালানকোঠার মালিক যারা-কিন্তু ইবাদতে অলসতা করে এবং ইবাদত বিনষ্ট করে-তাদের প্রতি ঈর্ষা করাও বোকামি।
আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. বলেন : 'দুনিয়া কাফিরদের জন্য জান্নাত আর মুমিনদের জন্য কারাগার সমতুল্য। মৃত্যু যেন মুমিনের কারাগার থেকে মুক্তির পরোয়ানা। তাই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে খুব আনন্দিত হবে।'১৯
'হে লোকসকল, মৃত্যুর তির তাক করা আছে তোমাদের দিকে। আশা-আকাঙ্ক্ষার ফাঁদ পাতা রয়েছে চলার পথে। সুতরাং সতর্ক হও। তোমাদের বেষ্টন করে আছে দুনিয়ার ফিতনা। আজকের ভালো অবস্থা দেখে বিভ্রান্ত হয়ো না। অচিরেই বদলে যাবে পরিস্থিতি। দুনিয়া তোমাদের সংকীর্ণতায় নিপতিত করবে-ঠেলে দেবে বিলুপ্তির পথে।'২০
টিকাঃ
১৩. শাজারাতুজ জাহাব: ২০/১০
১৪. তারিখু উমর: ২৬
১৫. আজ-জুহদ, আহমাদ: ২৩০
১৬. মাদারিজুস সালিকিন: ২/১১
১৭. জামিউল উলুম : ৩৭৮
১৮. তাজকিয়াতুন নুফুস : ১২৮
১৯. শারহুস সুদুর : ১৩
২০. আল-আকিবাহ : ৬৯