📘 দুজনার পাঠশালা 📄 ডিভোর্স সংক্রান্ত পুরুষদের কিছু ভুল

📄 ডিভোর্স সংক্রান্ত পুরুষদের কিছু ভুল


(ক) ঋতু চলাকালে স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়া
অনেক পুরুষকে এই ভুলটি করতে দেখা যায় যে, স্ত্রীকে তার ঋতু চলাকালে তালাক দিয়ে দেয়। এভাবে তার প্রতি কয়েকভাবে জুলুম করা হয়।
এক. এতে ইদ্দতের সময়সীমা দীর্ঘ হয়। পবিত্র কুরআনের সুরা তালাকে ইদ্দতের প্রতি লক্ষ রেখে তালাক দিতে বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ
'হে নবি, (উম্মতকে বলে দাও) তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীগণকে তালাক দিতে চাও, তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ রেখে তালাক (দিও)।' ২৪১
দুই. এই সময় শারীরিকভাবে সে খুবই দুর্বল ও অস্বস্তিতে থাকে। তার মন-মেজাজ অস্বাভাবিক থাকে। কেউ কেউ অসুস্থও হয়ে পড়ে। ব্যথার যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকে।
তাই পুরুষের উচিত অন্তত এই সময়টায় ধৈর্যধারণ করা। তার উপর অতিরিক্ত কোনা জুলুম না করা। কারণ এ সময় তালাক দিলে এটা তার মানসিক অবস্থার উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে ওমর তার স্ত্রীকে হায়েজগ্রস্তা অবস্থায় এক তালাক দিয়েছিলেন। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বিষয়টি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উল্লেখ করলে নবিজি ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, 'তুমি তাকে তার স্ত্রীকে এখনই ফিরিয়ে আনতে বলো, এরপর যে হায়েজে সে তাকে তালাক দিয়েছে সে হায়েজ নয়, বরং নতুন হায়েজ শুরু হোক। তখন সে তালাক দিতে চাইলে সেই হায়েজ শেষ হয়ে যখন স্ত্রী পবিত্র হবে, তখন তাকে স্পর্শ করা ব্যতীত তালাক দিক। এটিই ইদ্দতের জন্য শরিয়তসম্মত তালাক, যার নির্দেশ আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন।'
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তালাকের চারটি সূরত। দুটি সূরত হালাল, আর দুটি সূরত হারাম। হালাল সূরত দুটি হলো হায়েজ থেকে পবিত্র হওয়ার পর তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার পূর্বে তালাক দেওয়া কিংবা গর্ভধারণের পর তালাক দেওয়া। আর হারাম সূরত দুটি হলো, স্ত্রীর হায়েজ অবস্থায় তাকে তালাক দেওয়া কিংবা তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর তালাক দেওয়া, এই মিলনের কারণে স্ত্রীর গর্ভধারণ করবে কি না তার জানা নেই।'
সঠিক পদ্ধতি হলো হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক না দেওয়া এবং হায়েজ থেকে পবিত্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলিত হলে তখনও তাকে তালাক না দেওয়া। কারণ, স্ত্রী গর্ভধারণ করবে কি না বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।
দেখা গেল মিলনের পর সে স্ত্রীকে এক তালাক দিয়েছে, কিন্তু কিছুদিন পর স্ত্রী গর্ভধারণ করেছে, তখন সে হয়ত তার অনাগত সন্তানের কথা ভেবে তাকে ফিরিয়ে আনতে চাইবে। আর এর মাঝেই তাদের কল্যাণ ও মুসলিম পরিবারের কল্যাণ রয়েছে।
(খ) একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া
তালাক সংক্রান্ত এটি আরেকটি ভুল। এই ভুলটি অনেকেই করে থাকে। একসঙ্গে একসময়ে তিন তালাক দিলে ফিরিয়ে আনার আর কোনো পথ খোলা থাকে না। সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন শত আফসোস করলেও কোনো কাজ হয় না।
জমহুর উলামায়ে কেরামের মতানুযায়ী একসঙ্গে তিন তালাক দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকর হয়ে যায়। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেঈ, ইমাম মালেক এবং ইমাম আহমাদ, অর্থাৎ চার মাযহাবেরই ইমামদের একই অভিমত। যেমনটি ইমাম নববি শারহু সহিহ মুসলিম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
জমহুর উলামায়ে কেরামের মতের স্বপক্ষে দলিল হলো পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি,
وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْرًا
'যে আল্লাহর সীমালঙ্ঘন করে, সে নিজেরই উপর জুলুম করে। তুমি জানো না, হয়ত আল্লাহ এর পর কোনো উপায় বের করে দিবেন।' ২৪২
আইম্মায়ে কেরাম এর ব্যাখ্যায় বলেন, তালাক প্রদানকারী ব্যক্তি কখনো কখনো লজ্জিত হয়, সে তখন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু একসঙ্গে তিন তালাক দিয়ে ফেললে তখন আর তার ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে না। অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। এভাবে সে নিজের উপর জুলুম করে। যদি একসঙ্গে তিন তালাক কার্যকর না হত, তাহলে আফসোস করার কোনো কারণ ছিল না। যেহেতু পরবর্তিতে ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে।
(গ) স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর সে ইদ্দত পালনকালে ঘর থেকে বের করে দেওয়া
এই ভুলটিও অনেকে করে থাকে। সাধারণভাবে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক বললেই স্ত্রী সব গুছিয়ে স্বামীর ঘর থেকে বের হয়ে যায়। ইসলামের নির্দেশনা এমন নয়। তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য স্বামীর ঘরে ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব। বিশেষ কারণ ছাড়া স্বামীর বাড়ি ছাড়া বা অন্য কোথাও গিয়ে ইদ্দত পালন করা জায়েজ নেই। তবে স্বামীর বাড়িতে থাকা যদি তার জন্য বেশি কষ্টকর হয়, কিংবা তার জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় অথবা তার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে সে বাবার বাড়ি কিংবা অন্য কোথাও গিয়ে ইদ্দত পালন করতে পারবে। ২৪৩
আর ইদ্দতের সময়সীমা হচ্ছে তিন তুহর। এই সময় স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। ইদ্দত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সে তার স্ত্রী। এই সময় তার স্বামী মারা গেলে সে তার সম্পত্তির ভাগ পাবে। আর স্ত্রী মারা গেলে স্বামী তার সম্পত্তির ভাগ পাবে। এক তালাক দিয়ে থাকলে ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে চাইলে ফিরিয়ে আনতে পারবে। নতুন করে বিয়ে পড়ানো লাগবে না। মোহরও দিতে হবে না। পবিত্র কুরআনে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে ঘর থেকে বের করে দিতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে স্ত্রী যদি ইদ্দত পালনের সময় যিনা কিংবা স্বামী ও তার পরিবারের লোকদের সঙ্গে মারাত্মক কোনো আচরণ করে, তাহলে বের করে দিতে পারবে। ২৪৪
উল্লেখ্য যে, তালাকপ্রাপ্তা মহিলার ইদ্দতের সময় তার স্বামী ভিন্ন ঘরে বসবাস করবে। মহিলার ঘরে নয়।
(ঘ) ডিভোর্সের পর স্ত্রীর নামে মন্দ কথা বলে বেড়ানো
এই ভুল কাজটি অনেক পুরুষ করে থাকে। ডিভোর্স দেওয়ার পর স্ত্রীর নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, তার সম্পর্কে মন্দ কথা বলা। মানুষের কাছে তাকে ও তার পরিবারকে হেয় করার চেষ্টা করা।
এটা নিঃসন্দেহে অভদ্রতা, মূর্খতা, অকৃতজ্ঞতা ও অধার্মিকতার পরিচায়ক। কোনো ব্যক্তি যদি ভদ্র, শিক্ষিত, ধার্মিক ও কৃতজ্ঞ হয়, তাহলে সে মানুষের এক মহূর্তের ভালোবাসা ও উপকারের কথাও স্মরণে রাখবে। অথচ স্ত্রীর সঙ্গে মানুষের কত অসংখ্য মধুর স্মৃতি থাকে। ভালোবাসার কত অসংখ্য রঙ ঘরের দেয়ালে দেয়ালে লেপ্টে থাকে।
কিন্তু আমরা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যাই। সে আমাদের দিয়ে এসব জঘন্য কাজ করায়। সুতরাং আমরা যেন শয়তানের ধোঁকায় না পড়ি। ডিভোর্সের পর স্ত্রীর নামে খারাপ কথা না ছড়াই। তার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা না করি। এগুলো কবিরা গুনাহ। ঘৃণা ও বিদ্বেষে আমরা যেন এতটা অন্ধ না হই। আমাদের সহনশীলতা, ভদ্রতার ও কৃতজ্ঞতার পরিচয় দেওয়া উচিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا تَنْسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
'আর পারস্পরিক সহানুভূতির কথা ভুলে যেও না। নিশ্চয় তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ সেসবই অত্যন্ত ভালো করে দেখেন।' ২৪৫
এমনিভাবে আমাদের উচিত না ডিভোর্স দেওয়ার সময় স্ত্রীর উপর জুলুম করা। তার হকসমূহ বুঝিয়ে না দেওয়া। মোহরানা বাকি থাকলে তা আদায় না করা। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের আল্লাহকে ভয় করা উচিত। ডিভোর্সের সময় স্ত্রীর মোহরানা ও অন্যান্য হকসমূহ সম্পূর্ণরূপে আদায় করে দেওয়া এবং সুন্দরভাবে তাকে বিদায় দেওয়া উচিত। আল্লাহ তো অবশ্যই আমাদের কৃতকর্ম দেখছেন। ২৪৬

টিকাঃ
২৪১ সুরা তালাক: ১।
২৪২ সুরা তালাক: ১।
২৪৩ বাদায়েউস সানায়ে : ৩/৩২৫; আদ্দুররুল মুখতার: ৩/৫৩৫।
২৪৪ ফাতাওয়া তাতারখানিয়া: ১২/১৪৫।
২৪৫ সুরা বাকারা: ২৩৭।
২৪৬ 'আদেল ফাতহি কৃত আখতাউন শাইয়াতুন তাকাউ ফি-হাল আযওয়ায।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية