📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 একটি চমকপ্রদ ঘটনা

📄 একটি চমকপ্রদ ঘটনা


একজন স্বামী কখন ডিভোর্সের পথে হাঁটে?
স্ত্রী যখন স্বামীর কঠিন সমালোচনা করে এবং তার ব্যক্তিত্বে আঘাত করে কথা বলে। যেমন, স্বামী নির্দিষ্ট সময়ে আসার কথা বলে দেরি করে আসলো। স্ত্রী তখন মেজাজ খিচিয়ে বলল, 'তুমি সবসময় স্বার্থপরের মতো আচরণ করো। শুধু নিজের দিকটা দেখো। অন্যের প্রতি তোমার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কাউকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্য তোমার কাছে নেই। আমি আসলে তোমার প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়েছি। আমার আর তোমার সঙ্গে থাকতে ভালো লাগছে না।'
দেখুন, স্ত্রী এখানে কী করল? স্বামীর কেন দেরি হয়েছে, সেই কারণটি সে জানার ও বোঝার চেষ্টা করল না। সরাসরি তার ব্যক্তিত্বে আঘাত করা শুরু করল। একটুও কসুর করল না।
এর চেয়ে নিকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে গালিগালাজ করা। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।
স্ত্রী এমন আচরণ করতে থাকলে, দিন দিন তাদের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটতে থাকে। তারা দুজন ভালোবাসার যে স্বচ্ছ জলাধারের পাশে বসে চা-কফি, স্যান্ডউইচ খেত, সেই জলাধারের পানি ঘোলা হতে থাকে। তখন স্বামীর মাথায় যে চিন্তাটা আসে তা হচ্ছে, আর না। একসঙ্গে থাকা আর সম্ভব না। দীর্ঘ দিন মাথায় এমন চিন্তা কাজ করতে করতে দাম্পত্য জীবনে মতানৈক্য ও দ্বন্ধ বিরাট আকার ধারন করে এবং একসময় তা বোম হয়ে ফুটে।
অথচ আল্লাহ তায়ালা নারীদের পুরুষকে বশে আনার এক আশ্চর্য ক্ষমতা দান করেছেন। পুরুষরা সাধারণত নারীদের প্রতি অনুরুক্ত থাকে। নারীরা তাদের এই ক্ষমতার যথা ব্যবহার করলে পুরুষকে আর ডিভোর্সের পথে হাঁটতে হতো না। সুখের চন্দ্রে গ্রহণ লাগত না।
নারীর সেই ক্ষমতার কথাই এখন বলব, তবে একটি গল্পের মাধ্যমে।
গ্রামের এক মহিলা হুজুরের কাছে গেল। তার ধারণা হুজুর কবিরাজ মানুষ। অসাধ্য সাধন করতে পারেন।
সে হুজুরকে বলল, এমন কোনো উপায় বাতলে দিন; যাতে আমার স্বামী শুধু আমাকে ভালোবাসে। অন্য কোনো ডাকিনির খপ্পরে না পড়ে।
হুজুর চিন্তায় পড়ে গেলেন। বলে কী সে? তবে তিনি খুব বিচক্ষণ ও জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, তুমি তো বিরাট কিছু দাবি করেছো। এর জন্য তোমাকে অনেক কষ্ট করতে হবে। বিরাট ঝুঁকি নিতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। তুমি পারবে?
-জি পারব হুজুর। আপনি বলুন কী করতে হবে?
-তোমাকে সিংহের তিনটি পশম নিয়ে আসতে হবে। তারপর আমি সেই পশম তিনটি দিয়ে আমার কবিরাজি শুরু করব।
-এটা কী করে সম্ভব? সিংহ তো ভয়ংকর হিংস্র প্রাণি। সে তো আমাকে মেরে ফেলতে পারে। সহজ কোনো উপায় নেই হুজুর?
-না।
-নিরুপায় হয়ে মহিলা তখন বনে গেল। একটি সিংহ দেখতে পেল। সে তখন দূর থেকে তার দিকে গোশতের টুকরা ছুড়লো। প্রথমে এক টুকরো। তারপর আরেক টুকরো। তারপর আরেক টুকরো। এভাবে কয়েকদিন এমন করার পর সিংহের সঙ্গে তার ভাব জমে গেল।
প্রতিদিন মহিলা দূর থেকে একটু একটু করে কাছে আসতে থাকল। তারপর একদিন সিংহের কাছে গিয়ে বসল। সিংহের সঙ্গে এখন তার সে কী গলায় গলায় ভাব। সে তখন সিংহের পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ঘাড়ে গলায় আদর করছে। সিংহ খুব আরামবোধ করছে।
এভাবে সে সিংহকে বশ করে তার শরীর থেকে তিনটি পশম সংগ্রহ করল।
হুজুর যখন দেখলেন যে, সে সত্যি সত্যিই সিংহের পশম নিয়ে আসছে। তখন তিনি বিস্ময়ভরা কণ্ঠে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এটা কীভাবে করলে?
সে তখন বিস্তারিত সব বর্ণনা করল।
তখন হুজুর বললেন, হে আল্লাহর বান্দি, তোমার স্বামী নিশ্চয় সিংহের চেয়ে হিংস্র নয়। তুমি যদি সিংহকে জয় করতে পারো, তাহলে কি তুমি তোমার স্বামীকে জয় করতে পারবে না? তাকে বশে আনতে পারবে না? তার ভালোবাসা লাভ করতে পারবে না? ২৩৫

টিকাঃ
* হামাসাতুন ফি উয়ুনি যাওযাইন।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 নিকৃষ্ট হালাল (১)

📄 নিকৃষ্ট হালাল (১)


মাত্র একটি শব্দ। এই শব্দের ধাক্কায় কত অসংখ্য নারী-পুরুষ ছিটকে পড়েছে। আজীবন হৃৎপিণ্ডে ঝুলে থাকা বর্শার আঘাতের মতো ব্যথা বয়ে বেড়িয়েছে। এটি শুধু শব্দ নয়। যেন শব্দ বোমা। এ বোমার বিস্ফোরণে কত শত পরিবার, গোষ্ঠী ও সমাজ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে। কত সাধের সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেছে। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যত নষ্ট হয়েছে।
মাত্র একটি শব্দ। ছোট্ট একটি শব্দ। তালাক। সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল। আমরা জানি, যা কিছু হালাল, তার সবই আল্লাহ তায়ালার নিকট পছন্দনীয়। পছন্দনীয় বলেই তিনি তা হালাল করেছেন। কিন্তু হালাল কিছুও যে আল্লাহ তায়ালার নিকট অপছন্দনীয় ও ঘৃণিত হতে পারে, 'তালাক' তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
একজন সতী নারী যখন তালাক শব্দটি শুনতে পায়, তখন সেই মুহুর্তটি তার কাছে মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাময় মনে হয়। উদগত অশ্রুতে তার দু চোখ ভরে উঠে। আহা কত মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে সে এই সাজানো বাগান গড়ে তুলেছিল। হঠাৎ এক প্রলয়ংকারী ঝড় এসে সব তছনছ করে দিয়ে গেল।
স্বামী-সন্তান-সংসার নিয়েই তো একজন সতিসাধ্বী নারীর জীবন। এসব নিয়েই তার যত গর্ব। যত স্বপ্ন। সংসারই তার কাছে সব। বাঁচার অবলম্বন। শীতের হিমেল হাওয়ায় গায়ে জড়ানো ভালোবাসার উষ্ণ চাদর। তপ্ত রোদে ছড়িয়ে দেওয়া প্রশান্তির নির্মল ছায়া। আঁধার রাতে বিলানো জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো।
ডিভোর্সের পর স্বামী বিষন্ন মনে ঘরে প্রবেশ করে। আর স্ত্রী লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে শয়তান ও হিংসুকরা মুখ টিপে টিপে হাসে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'ইবলিশ পানির উপর তার সিংহাসン স্থাপন করে। তারপর তার বাহিনী প্রেরণ করে। তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি ফেতনা সৃষ্টিকারী সে তার সর্বাধিক নৈকট্য অর্জনকারী। তাদের একজন এসে বলে, আমি অমুক অমুক কাজ করেছি। উত্তরে সে বলে, তুমিই কিছুই করোনি। তারপর আরেকজন এসে বলে। আমি তার পেছনে লেগে থেকে তার এবং তার স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে সক্ষম হয়েছি। ইবলিশ তখন তাকে তার কাছে টেনে নিয়ে বলে, হাঁ, তুমি খুবই কাজের কাজ করেছ।'২০৬
আজকাল আমরা পত্রিকার পাতা খুললেই দেখতে পাই, গোটা সমাজে ডিভোর্স কত ভয়াবহভাবে তার কালো থাবা বিস্তার করেছে। কত আশঙ্কাজনক হারে তা বেড়ে গেছে। এর পেছনে অবশ্য অনেক কারণ রয়েছে। যেমন,
১. দায়িত্বশীল স্বামী খুঁজে না পাওয়া।
আজ যে যুবক কোনো মেয়েকে বিয়ে করে তার বাবার বাড়ি থেকে সসম্মানে উঠিয়ে নিয়ে আসছে; কিছুদিন পর সে তাকে তার ঘর থেকে ধুরধুর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। লাঞ্ছিত ও অপমানিত করে বের করে দিচ্ছে। বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে একদিন যে মেয়েটি এই সংসারে এসেছিল, সেখানেই সে তার সমস্ত স্বপ্ন দাফন করে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যাচ্ছে।
২. আমানতদার ও বিশ্বস্ত পুরুষের সংখ্যা কমে যাওয়া। যার ফলে সে তার স্ত্রী-সন্তানদের হক নষ্ট করছে। সমাজে হিংসুক ও চুগলখোর মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর আমরা এমন পুরুষকে হারিয়েছি যে তার স্ত্রীর দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে ও তা গোপন রাখে, আল্লাহকে ভয় করে এবং হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকে।
৩. নেককার, সতী ও বাধ্যগতা নারীদের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া।
৪. ছেলে-মেয়েদের সংসারে পিতা-মাতার অনধিকার চর্চা করা। তাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ করা।
অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা তার ছেলের সংসারের ছোট-বড় সকল বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছেন। মাও সবসময় পুত্রবধুর পিছনে লেগে আছেন। এমনও কিছু বাবা-মা আছেন, ছেলে-মেয়ের সংসারে কখন ঝামেলা বাধবে সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকেন। নাউযুবিল্লাহ।
৫. অকৃতজ্ঞতাবোধ বেড়ে যাওয়া। আজকাল কোনো কিছুতেই আমরা কেউ সন্তুষ্ট নই। আমাদের নেয়ামত যেমন বেড়েছে, তেমনি নেয়ামতের প্রতি আমাদের অকৃতজ্ঞতাবোধও বেড়েছে।
ধনী ব্যক্তি আজ বিয়ে করছে তো টাকার গরমে কাল ডিভোর্স দিয়ে দিচ্ছে। অথচ সে মনে করছে না, তাকে একদিন মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। তিনি তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।
৬. চরিত্র সংকট। রাজনীতিবিদরা বলে থাকেন, দেশে খাদ্য-সংকট, ওষুধ-সংকট, বস্ত্র-সংকট। আমি বলি, এসব সংকটের পাশাপাশি দেশে চরিত্র-সংকটও তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। মানুষের নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটেছে। মদ, নারী ইত্যাদি সহজলভ্য হয়ে গেছে। যে কারণে পাপের সাগরে তারা আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে আছে। লজ্জা-সম্ভ্রমের সমস্ত পর্দা তারা ছিন্ন করে ফেলেছে। ২৩৭

টিকাঃ
২০৬ মুসতাদরাকে হাকেম : ৮৭৪৭।
২৩৭ 'হামাসাতুন ফি উষুনি যাওযাইন।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 নিকৃষ্ট হালাল (২)

📄 নিকৃষ্ট হালাল (২)


যেহেতু একটি পরিবারকে সুন্দর ও সুখময় করে গড়ে তোলার জন্য স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য বেশি থাকে, তাই স্বামীকে বলছি।
আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে এই কথাগুলো আপনার জন্য।
এক, সবর করুন। সবরের পরিণাম বড় উত্তম। এর ফল বড় মিষ্টি।
আপনার স্ত্রী যদি আপনাকে একবার কষ্ট দিয়ে থাকে, তাহলে মনে করুন, সে আপনাকর জীবনে অসংখ্য আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছে। কিছু আনন্দ তো এমন, যেগুলোর ঋণ কখনো পরিশোধ করা সম্ভব নয়। যেগুলোর সঙ্গে পৃথিবীর কোনো কিছুর তুলনা হয় না।
দুই, তালাকের অশুভ পরিণতির কথা চিন্তা করুন।
স্ত্রীর আচরণ খারাপ হলে হতাশ হবেন না। হয়ত আল্লাহ তার গর্ভে এমন সন্তান দান করবেন, যে আপনার প্রশান্তির কারণ হবে। আপনার চোখে শীতলতা আনয়ন করবে।
কখনো এমন হয়, স্ত্রীর আচার-ব্যবহার খুব খারাপ। কিন্তু স্বামী বেচারা বড় ভালো মানুষ। গোবেচারা ধরনের। স্ত্রী তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। তাকে গালিগালাজ করে। আর সে আল্লাহর ওয়াস্তে ধৈর্যধারণ করে। আল্লাহর কাছে প্রতিদান লাভের আশা রাখে। কয়েক বছর না যেতেই দেখা যায় আল্লাহ তাকে চক্ষু শীতলকারী নেক সন্তান দান করেছেন।
কে জানে, আজ যে স্ত্রীকে আপনার নরক মনে হচ্ছে, কিছুদিন পর তাকে হয়ত আপনার স্বর্গ মনে হবে। শেষ বয়সে সে হয়ত আপনার হাতের লাঠি হবে। চোখের চশমা হবে। বেঁচে থাকার অবলম্বন হবে। কারণ একটু আগেই বলেছি, সবরের পরিণাম খুব উত্তম হয়।
আর অবশ্যই দুঃখের পর সুখ রয়েছে। এটি আমার কথা নয়। মহান আল্লাহর কথা। তিনি তাঁর পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا . إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
'নিশ্চয় কষ্টের পর সুখ রয়েছে। নিশ্চয় কষ্টের পর সুখ রয়েছে।’২৩৮
তিন, ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ইস্তেখারা করুন। সালাতুল ইস্তেখারা পড়ুন। উলামায়ে কেরাম ও বিজ্ঞজনদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। নেককারদের সাহায্য গ্রহণ করুন।
মনে রাখবেন, ডিভোর্স হচ্ছে দেহের কোনো একটি অঙ্গ কেটে ফেলার মতো। এটি সর্বশেষ চিকিৎসা। মানুষের শরীরে কোনো ব্যাধি হলে ডাক্তাররা প্রথমেই যেমন অপারেশন করে তার অঙ্গ কেটে ফেলেন না। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন, অঙ্গটিকে বাঁচানোর। ঠিক তেমনি তালাকও।
অঙ্গ যেন না কাটা যায়, এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা তিন তালাকের বিধান রেখেছেন। যেন একটি বা দুটি তালাক দিয়ে দিলেও অঙ্গটি বেঁচে থাকে। কাটা না যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الطَّاقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَكُ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحُ بِإِحْسَانٍ
'তালাক দু'বার। অতঃপর স্ত্রীকে হয় বিধিমত রেখে দিবে। কিংবা সদয়ভাবে মুক্ত করে দিবে।' ২৩৯
এই আয়াতে তালাকে রাজঈর কথা বলে হয়েছে, যেই তালাকের পর স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে তার ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে পুনরায় গ্রহণ করতে পারে।
কোনো কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া হারাম। কারণ, এতে যাকে তালাক দিবে তার ক্ষতি করা হয়।
তবে আফসোসের সঙ্গে বলতে হয়, আজকাল অনেক পুরুষকে তুচ্ছ কারণে স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে দেখা যায়। আল্লাহ তায়ালা যে তাকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দান করে সম্মানিত করেছেন, এর কোনো গুরুত্ব বা মূল্য তার কাছে নেই। সে তার ও তার-স্ত্রী সন্তানদের পরিণতির কথা না ভেবে ডিভোর্স দিয়ে বসে।
অনেকে রাগের মাথায় ডিভোর্স দিয়ে বসে। তারপর রাগ ঠাণ্ডা হলে সে তার ভুল বুঝতে পারে। অনুতাপের অনলে পুড়তে থাকে। স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার ফতোয়ার জন্য মুফতি সাহেবের কাছে দৌঁড়ায়।
উল্লেখ্য যে, রাগের মাথায় তালাক দিলেও তালাক কার্যকর হয়ে যায়। কেননা তালাক সাধারণত মানুষ রাগের মাথাতেই দেয়। কেউ ঠাণ্ডা মাথায় দেয় না। ২৪০

টিকাঃ
* সুরা আলাম নাশরাহ: ৫-৬।
২৩৯ সুরা বাকারা: ২২৯।
২৪০ হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 ডিভোর্স সংক্রান্ত পুরুষদের কিছু ভুল

📄 ডিভোর্স সংক্রান্ত পুরুষদের কিছু ভুল


(ক) ঋতু চলাকালে স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়া
অনেক পুরুষকে এই ভুলটি করতে দেখা যায় যে, স্ত্রীকে তার ঋতু চলাকালে তালাক দিয়ে দেয়। এভাবে তার প্রতি কয়েকভাবে জুলুম করা হয়।
এক. এতে ইদ্দতের সময়সীমা দীর্ঘ হয়। পবিত্র কুরআনের সুরা তালাকে ইদ্দতের প্রতি লক্ষ রেখে তালাক দিতে বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ
'হে নবি, (উম্মতকে বলে দাও) তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীগণকে তালাক দিতে চাও, তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ রেখে তালাক (দিও)।' ২৪১
দুই. এই সময় শারীরিকভাবে সে খুবই দুর্বল ও অস্বস্তিতে থাকে। তার মন-মেজাজ অস্বাভাবিক থাকে। কেউ কেউ অসুস্থও হয়ে পড়ে। ব্যথার যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকে।
তাই পুরুষের উচিত অন্তত এই সময়টায় ধৈর্যধারণ করা। তার উপর অতিরিক্ত কোনা জুলুম না করা। কারণ এ সময় তালাক দিলে এটা তার মানসিক অবস্থার উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে ওমর তার স্ত্রীকে হায়েজগ্রস্তা অবস্থায় এক তালাক দিয়েছিলেন। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বিষয়টি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উল্লেখ করলে নবিজি ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, 'তুমি তাকে তার স্ত্রীকে এখনই ফিরিয়ে আনতে বলো, এরপর যে হায়েজে সে তাকে তালাক দিয়েছে সে হায়েজ নয়, বরং নতুন হায়েজ শুরু হোক। তখন সে তালাক দিতে চাইলে সেই হায়েজ শেষ হয়ে যখন স্ত্রী পবিত্র হবে, তখন তাকে স্পর্শ করা ব্যতীত তালাক দিক। এটিই ইদ্দতের জন্য শরিয়তসম্মত তালাক, যার নির্দেশ আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন।'
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তালাকের চারটি সূরত। দুটি সূরত হালাল, আর দুটি সূরত হারাম। হালাল সূরত দুটি হলো হায়েজ থেকে পবিত্র হওয়ার পর তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার পূর্বে তালাক দেওয়া কিংবা গর্ভধারণের পর তালাক দেওয়া। আর হারাম সূরত দুটি হলো, স্ত্রীর হায়েজ অবস্থায় তাকে তালাক দেওয়া কিংবা তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর তালাক দেওয়া, এই মিলনের কারণে স্ত্রীর গর্ভধারণ করবে কি না তার জানা নেই।'
সঠিক পদ্ধতি হলো হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক না দেওয়া এবং হায়েজ থেকে পবিত্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলিত হলে তখনও তাকে তালাক না দেওয়া। কারণ, স্ত্রী গর্ভধারণ করবে কি না বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।
দেখা গেল মিলনের পর সে স্ত্রীকে এক তালাক দিয়েছে, কিন্তু কিছুদিন পর স্ত্রী গর্ভধারণ করেছে, তখন সে হয়ত তার অনাগত সন্তানের কথা ভেবে তাকে ফিরিয়ে আনতে চাইবে। আর এর মাঝেই তাদের কল্যাণ ও মুসলিম পরিবারের কল্যাণ রয়েছে।
(খ) একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া
তালাক সংক্রান্ত এটি আরেকটি ভুল। এই ভুলটি অনেকেই করে থাকে। একসঙ্গে একসময়ে তিন তালাক দিলে ফিরিয়ে আনার আর কোনো পথ খোলা থাকে না। সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন শত আফসোস করলেও কোনো কাজ হয় না।
জমহুর উলামায়ে কেরামের মতানুযায়ী একসঙ্গে তিন তালাক দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকর হয়ে যায়। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেঈ, ইমাম মালেক এবং ইমাম আহমাদ, অর্থাৎ চার মাযহাবেরই ইমামদের একই অভিমত। যেমনটি ইমাম নববি শারহু সহিহ মুসলিম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
জমহুর উলামায়ে কেরামের মতের স্বপক্ষে দলিল হলো পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি,
وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْرًا
'যে আল্লাহর সীমালঙ্ঘন করে, সে নিজেরই উপর জুলুম করে। তুমি জানো না, হয়ত আল্লাহ এর পর কোনো উপায় বের করে দিবেন।' ২৪২
আইম্মায়ে কেরাম এর ব্যাখ্যায় বলেন, তালাক প্রদানকারী ব্যক্তি কখনো কখনো লজ্জিত হয়, সে তখন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু একসঙ্গে তিন তালাক দিয়ে ফেললে তখন আর তার ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে না। অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। এভাবে সে নিজের উপর জুলুম করে। যদি একসঙ্গে তিন তালাক কার্যকর না হত, তাহলে আফসোস করার কোনো কারণ ছিল না। যেহেতু পরবর্তিতে ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে।
(গ) স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর সে ইদ্দত পালনকালে ঘর থেকে বের করে দেওয়া
এই ভুলটিও অনেকে করে থাকে। সাধারণভাবে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক বললেই স্ত্রী সব গুছিয়ে স্বামীর ঘর থেকে বের হয়ে যায়। ইসলামের নির্দেশনা এমন নয়। তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য স্বামীর ঘরে ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব। বিশেষ কারণ ছাড়া স্বামীর বাড়ি ছাড়া বা অন্য কোথাও গিয়ে ইদ্দত পালন করা জায়েজ নেই। তবে স্বামীর বাড়িতে থাকা যদি তার জন্য বেশি কষ্টকর হয়, কিংবা তার জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় অথবা তার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে সে বাবার বাড়ি কিংবা অন্য কোথাও গিয়ে ইদ্দত পালন করতে পারবে। ২৪৩
আর ইদ্দতের সময়সীমা হচ্ছে তিন তুহর। এই সময় স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। ইদ্দত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সে তার স্ত্রী। এই সময় তার স্বামী মারা গেলে সে তার সম্পত্তির ভাগ পাবে। আর স্ত্রী মারা গেলে স্বামী তার সম্পত্তির ভাগ পাবে। এক তালাক দিয়ে থাকলে ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে চাইলে ফিরিয়ে আনতে পারবে। নতুন করে বিয়ে পড়ানো লাগবে না। মোহরও দিতে হবে না। পবিত্র কুরআনে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে ঘর থেকে বের করে দিতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে স্ত্রী যদি ইদ্দত পালনের সময় যিনা কিংবা স্বামী ও তার পরিবারের লোকদের সঙ্গে মারাত্মক কোনো আচরণ করে, তাহলে বের করে দিতে পারবে। ২৪৪
উল্লেখ্য যে, তালাকপ্রাপ্তা মহিলার ইদ্দতের সময় তার স্বামী ভিন্ন ঘরে বসবাস করবে। মহিলার ঘরে নয়।
(ঘ) ডিভোর্সের পর স্ত্রীর নামে মন্দ কথা বলে বেড়ানো
এই ভুল কাজটি অনেক পুরুষ করে থাকে। ডিভোর্স দেওয়ার পর স্ত্রীর নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, তার সম্পর্কে মন্দ কথা বলা। মানুষের কাছে তাকে ও তার পরিবারকে হেয় করার চেষ্টা করা।
এটা নিঃসন্দেহে অভদ্রতা, মূর্খতা, অকৃতজ্ঞতা ও অধার্মিকতার পরিচায়ক। কোনো ব্যক্তি যদি ভদ্র, শিক্ষিত, ধার্মিক ও কৃতজ্ঞ হয়, তাহলে সে মানুষের এক মহূর্তের ভালোবাসা ও উপকারের কথাও স্মরণে রাখবে। অথচ স্ত্রীর সঙ্গে মানুষের কত অসংখ্য মধুর স্মৃতি থাকে। ভালোবাসার কত অসংখ্য রঙ ঘরের দেয়ালে দেয়ালে লেপ্টে থাকে।
কিন্তু আমরা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যাই। সে আমাদের দিয়ে এসব জঘন্য কাজ করায়। সুতরাং আমরা যেন শয়তানের ধোঁকায় না পড়ি। ডিভোর্সের পর স্ত্রীর নামে খারাপ কথা না ছড়াই। তার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা না করি। এগুলো কবিরা গুনাহ। ঘৃণা ও বিদ্বেষে আমরা যেন এতটা অন্ধ না হই। আমাদের সহনশীলতা, ভদ্রতার ও কৃতজ্ঞতার পরিচয় দেওয়া উচিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا تَنْسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
'আর পারস্পরিক সহানুভূতির কথা ভুলে যেও না। নিশ্চয় তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ সেসবই অত্যন্ত ভালো করে দেখেন।' ২৪৫
এমনিভাবে আমাদের উচিত না ডিভোর্স দেওয়ার সময় স্ত্রীর উপর জুলুম করা। তার হকসমূহ বুঝিয়ে না দেওয়া। মোহরানা বাকি থাকলে তা আদায় না করা। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের আল্লাহকে ভয় করা উচিত। ডিভোর্সের সময় স্ত্রীর মোহরানা ও অন্যান্য হকসমূহ সম্পূর্ণরূপে আদায় করে দেওয়া এবং সুন্দরভাবে তাকে বিদায় দেওয়া উচিত। আল্লাহ তো অবশ্যই আমাদের কৃতকর্ম দেখছেন। ২৪৬

টিকাঃ
২৪১ সুরা তালাক: ১।
২৪২ সুরা তালাক: ১।
২৪৩ বাদায়েউস সানায়ে : ৩/৩২৫; আদ্দুররুল মুখতার: ৩/৫৩৫।
২৪৪ ফাতাওয়া তাতারখানিয়া: ১২/১৪৫।
২৪৫ সুরা বাকারা: ২৩৭।
২৪৬ 'আদেল ফাতহি কৃত আখতাউন শাইয়াতুন তাকাউ ফি-হাল আযওয়ায।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00