📄 না বলা কথা
আনিস বলল, আমি আমার স্ত্রীকে সাফ জানিয়ে দিয়েছি যে, অফিসের এক মেয়েকে আমি ভালোবাসি। আমি তাকে বিয়ে করত যাচ্ছি। আর আমার পক্ষে দুজন স্ত্রী রাখা সম্ভব না।
আমি ভেবেছিলাম, আমার কথাগুলো শোনার পর সে প্রলয়কাণ্ড বাঁধাবে কিংবা হাউমাউ করে কেঁদে উঠবে। কিন্তু না। সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। আমি একটু বিস্মিত হলাম, কী ব্যাপার? এত সহজে মেনে নিল।
তবে সে বলল, আমাকে ডিভোর্স দিতে হলে তোমাকে আমার কিছু শর্ত মানতে হবে। আমি তোমার কাছে টাকা-পয়সা কিছুই চাই না। কিছুই না। শুধু সময় চাই। এক মাস সময়। কারণ, আমাদের একমাত্র সন্তানের এখন স্কুল-পরীক্ষা। আমি চাই না আমাদের জন্য ওর পরীক্ষাটা খারাপ হোক। ওর জীবনটা নষ্ট হোক।
-আচ্ছা ঠিক আছে। এক মাসই তো। সমস্যা নেই।
-আরেকটা শর্ত আছে, বিয়ের প্রথম দিন তুমি যেমন কোলে করে আমাকে এই ঘরে নিয়ে এসেছিলে, এই এক মাস তুমি প্রতিদিন আমাকে কোলে করে বাইরের দরজা পর্যন্ত নিয়ে যাবে।
-তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি? কী বলছ এসব?
-না। আমি পাগল হইনি। তুমি আমার এই শর্ত না মানলে আমি তোমার ডিভোর্স লেটারে সাইন করব না।
শর্তটি আমার কাছে অদ্ভূত ঠেকলেও আমি বাধ্য হয়ে রাজি হয়ে গেলাম। কারণ, শেষ সময়ে এসে কোনো ঝামেলা হোক, আমি তা চাচ্ছিলাম না।
তারপর আমি যে নারীকে বিয়ে করতে যাচ্ছি, তাকে সুসংবাদটা জানিয়ে দিলাম। আমার স্ত্রীর দেওয়া শর্তের কথা শুনে সেও খুব বিস্মিত হলো। আমি তাকে আর মাত্র একটা মাস ধৈর্য ধরতে বললাম।
আমি প্রতিদিন তাকে কোলে করে বেডরুম থেকে বাইরের দরজা পর্যন্ত নিয়ে যাই। সে তখন দুহাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে রাখে। আমাকে চুমু খায়।
আমার ছেলে আমাদের এই দৃশ্য দেখে খুব মজা পায়। সে দৌড়ে এসে আমাদের জড়িয়ে ধরে। আমরা তখন তিনজন একসঙ্গে খেলা করি। তাকে স্বস্নেহে কোলে টেনে নেই।
এভাবে তিন-চার দিন যাওয়ার পর আমি অনুভব করি যে, আমি তার মায়ায় পড়ে যাচ্ছি। তার প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি।
এভাবে একমাস যখন শেষ হলো, তখন তার প্রতি আমার অন্তরে গভীর ভালোবাসা।
কতটা গভীর?
সাগরের মতো গভীর। যেন ভালোবাসা প্রথমে পুকুর থেকে খালে। তারপর খাল থেকে নদীতে। নদী থেকে সাগরে পরিণত হয়েছে।
আমি ভাবছি, এই মানুষটার প্রতি আমি কী অবহেলাই না করেছি। কত কষ্টই না আমি তাকে দিয়েছি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, সেই নারীকে জানিয়ে দিব, আমি আমার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিচ্ছি না। আমি যখন তাকে জানালাম, তখন সে সজোরে আমার গালে একটি চড় বসালো। তারপর রাগে গড়গড় করতে করতে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি দ্রুত আমার স্ত্রীকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য বাসায় চলে এলাম।
বাসায় এসে দেখি সে মেঝেতে পড়ে আছে। খুব অসুস্থ। অবশ্য কয়েকদিন ধরেই আমি তার চেহারার রুগ্ন ভাবটি লক্ষ করছিলাম।
তখন সে আমাকে বলল, কয়েক মাস হলো আমার ক্যান্সার ধরা পড়েছে। তুমি তো আমার কোনো খোঁজখবর নিতে না। তাই তুমি জানতে পারনি। তাছাড়া তুমি শুনলে কষ্ট পাবে তাই আমিও তোমাকে জানায়নি।
এর কিছুদিন পর সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। শুধু আমাকে নয়, আমাদের সবাইকে ছেড়ে। কোলাহলমুখর এই পৃথিবী ছেড়ে নিঃশব্দের পৃথিবীতে।
আমি তখন খুব অনুতপ্ত হলাম। ভীষণভাবে অনুভব করলাম, যে পৃথিবীতে সে নেই সেখানে বেঁচে থাকাটা ভীষণ কষ্টের!
এক লোক তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চায়, আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তালাক দিবে?
তখন সে বলল, আমি তাকে ভালোবাসি না।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সমস্ত ঘরগুলো কি ভালোবাসার উপর নির্মিত হয়েছে? মানুষের বিবেক ও লাজলজ্জা কোথায় গেল?'
বিখ্যাত আরব কবি ফারাযদাকের স্ত্রী খুব সুন্দরী ও দীনদার ছিল। তার নাম ছিল নাওয়ার। ফারাযদাক তাকে তিন তালাক দিয়েছিলেন। কিন্তু এ কারণে তিনি পরবর্তীতে খুব অনুতপ্ত হয়েছিলেন এবং তার স্ত্রীকে নিয়ে একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন:
'নাওয়ারকে তালাক দিয়ে আমি কুসাইয়ের মতো অনুতপ্ত হয়েছিলাম। সে ছিল আমার জান্নাত, যে জান্নাত থেকে আমি বহিষ্কৃত হয়েছিলাম। যেমন হযরত আদম আলাইহিস সালাম পরিস্থিতির শিকার হয়ে জান্নাত থেকে বের হয়েছিলেন।
যদি আমি আমার হাত ও অন্তরের মালিক হতাম, তাহলে আমার উপর ভাগ্যের ইচ্ছাধিকার থাকত।' ২৩৪
টিকাঃ
২৩৪ হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন।
📄 একটি চমকপ্রদ ঘটনা
একজন স্বামী কখন ডিভোর্সের পথে হাঁটে?
স্ত্রী যখন স্বামীর কঠিন সমালোচনা করে এবং তার ব্যক্তিত্বে আঘাত করে কথা বলে। যেমন, স্বামী নির্দিষ্ট সময়ে আসার কথা বলে দেরি করে আসলো। স্ত্রী তখন মেজাজ খিচিয়ে বলল, 'তুমি সবসময় স্বার্থপরের মতো আচরণ করো। শুধু নিজের দিকটা দেখো। অন্যের প্রতি তোমার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কাউকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্য তোমার কাছে নেই। আমি আসলে তোমার প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়েছি। আমার আর তোমার সঙ্গে থাকতে ভালো লাগছে না।'
দেখুন, স্ত্রী এখানে কী করল? স্বামীর কেন দেরি হয়েছে, সেই কারণটি সে জানার ও বোঝার চেষ্টা করল না। সরাসরি তার ব্যক্তিত্বে আঘাত করা শুরু করল। একটুও কসুর করল না।
এর চেয়ে নিকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে গালিগালাজ করা। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।
স্ত্রী এমন আচরণ করতে থাকলে, দিন দিন তাদের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটতে থাকে। তারা দুজন ভালোবাসার যে স্বচ্ছ জলাধারের পাশে বসে চা-কফি, স্যান্ডউইচ খেত, সেই জলাধারের পানি ঘোলা হতে থাকে। তখন স্বামীর মাথায় যে চিন্তাটা আসে তা হচ্ছে, আর না। একসঙ্গে থাকা আর সম্ভব না। দীর্ঘ দিন মাথায় এমন চিন্তা কাজ করতে করতে দাম্পত্য জীবনে মতানৈক্য ও দ্বন্ধ বিরাট আকার ধারন করে এবং একসময় তা বোম হয়ে ফুটে।
অথচ আল্লাহ তায়ালা নারীদের পুরুষকে বশে আনার এক আশ্চর্য ক্ষমতা দান করেছেন। পুরুষরা সাধারণত নারীদের প্রতি অনুরুক্ত থাকে। নারীরা তাদের এই ক্ষমতার যথা ব্যবহার করলে পুরুষকে আর ডিভোর্সের পথে হাঁটতে হতো না। সুখের চন্দ্রে গ্রহণ লাগত না।
নারীর সেই ক্ষমতার কথাই এখন বলব, তবে একটি গল্পের মাধ্যমে।
গ্রামের এক মহিলা হুজুরের কাছে গেল। তার ধারণা হুজুর কবিরাজ মানুষ। অসাধ্য সাধন করতে পারেন।
সে হুজুরকে বলল, এমন কোনো উপায় বাতলে দিন; যাতে আমার স্বামী শুধু আমাকে ভালোবাসে। অন্য কোনো ডাকিনির খপ্পরে না পড়ে।
হুজুর চিন্তায় পড়ে গেলেন। বলে কী সে? তবে তিনি খুব বিচক্ষণ ও জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, তুমি তো বিরাট কিছু দাবি করেছো। এর জন্য তোমাকে অনেক কষ্ট করতে হবে। বিরাট ঝুঁকি নিতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। তুমি পারবে?
-জি পারব হুজুর। আপনি বলুন কী করতে হবে?
-তোমাকে সিংহের তিনটি পশম নিয়ে আসতে হবে। তারপর আমি সেই পশম তিনটি দিয়ে আমার কবিরাজি শুরু করব।
-এটা কী করে সম্ভব? সিংহ তো ভয়ংকর হিংস্র প্রাণি। সে তো আমাকে মেরে ফেলতে পারে। সহজ কোনো উপায় নেই হুজুর?
-না।
-নিরুপায় হয়ে মহিলা তখন বনে গেল। একটি সিংহ দেখতে পেল। সে তখন দূর থেকে তার দিকে গোশতের টুকরা ছুড়লো। প্রথমে এক টুকরো। তারপর আরেক টুকরো। তারপর আরেক টুকরো। এভাবে কয়েকদিন এমন করার পর সিংহের সঙ্গে তার ভাব জমে গেল।
প্রতিদিন মহিলা দূর থেকে একটু একটু করে কাছে আসতে থাকল। তারপর একদিন সিংহের কাছে গিয়ে বসল। সিংহের সঙ্গে এখন তার সে কী গলায় গলায় ভাব। সে তখন সিংহের পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ঘাড়ে গলায় আদর করছে। সিংহ খুব আরামবোধ করছে।
এভাবে সে সিংহকে বশ করে তার শরীর থেকে তিনটি পশম সংগ্রহ করল।
হুজুর যখন দেখলেন যে, সে সত্যি সত্যিই সিংহের পশম নিয়ে আসছে। তখন তিনি বিস্ময়ভরা কণ্ঠে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এটা কীভাবে করলে?
সে তখন বিস্তারিত সব বর্ণনা করল।
তখন হুজুর বললেন, হে আল্লাহর বান্দি, তোমার স্বামী নিশ্চয় সিংহের চেয়ে হিংস্র নয়। তুমি যদি সিংহকে জয় করতে পারো, তাহলে কি তুমি তোমার স্বামীকে জয় করতে পারবে না? তাকে বশে আনতে পারবে না? তার ভালোবাসা লাভ করতে পারবে না? ২৩৫
টিকাঃ
* হামাসাতুন ফি উয়ুনি যাওযাইন।
📄 নিকৃষ্ট হালাল (১)
মাত্র একটি শব্দ। এই শব্দের ধাক্কায় কত অসংখ্য নারী-পুরুষ ছিটকে পড়েছে। আজীবন হৃৎপিণ্ডে ঝুলে থাকা বর্শার আঘাতের মতো ব্যথা বয়ে বেড়িয়েছে। এটি শুধু শব্দ নয়। যেন শব্দ বোমা। এ বোমার বিস্ফোরণে কত শত পরিবার, গোষ্ঠী ও সমাজ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে। কত সাধের সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেছে। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যত নষ্ট হয়েছে।
মাত্র একটি শব্দ। ছোট্ট একটি শব্দ। তালাক। সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল। আমরা জানি, যা কিছু হালাল, তার সবই আল্লাহ তায়ালার নিকট পছন্দনীয়। পছন্দনীয় বলেই তিনি তা হালাল করেছেন। কিন্তু হালাল কিছুও যে আল্লাহ তায়ালার নিকট অপছন্দনীয় ও ঘৃণিত হতে পারে, 'তালাক' তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
একজন সতী নারী যখন তালাক শব্দটি শুনতে পায়, তখন সেই মুহুর্তটি তার কাছে মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাময় মনে হয়। উদগত অশ্রুতে তার দু চোখ ভরে উঠে। আহা কত মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে সে এই সাজানো বাগান গড়ে তুলেছিল। হঠাৎ এক প্রলয়ংকারী ঝড় এসে সব তছনছ করে দিয়ে গেল।
স্বামী-সন্তান-সংসার নিয়েই তো একজন সতিসাধ্বী নারীর জীবন। এসব নিয়েই তার যত গর্ব। যত স্বপ্ন। সংসারই তার কাছে সব। বাঁচার অবলম্বন। শীতের হিমেল হাওয়ায় গায়ে জড়ানো ভালোবাসার উষ্ণ চাদর। তপ্ত রোদে ছড়িয়ে দেওয়া প্রশান্তির নির্মল ছায়া। আঁধার রাতে বিলানো জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো।
ডিভোর্সের পর স্বামী বিষন্ন মনে ঘরে প্রবেশ করে। আর স্ত্রী লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে শয়তান ও হিংসুকরা মুখ টিপে টিপে হাসে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'ইবলিশ পানির উপর তার সিংহাসン স্থাপন করে। তারপর তার বাহিনী প্রেরণ করে। তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি ফেতনা সৃষ্টিকারী সে তার সর্বাধিক নৈকট্য অর্জনকারী। তাদের একজন এসে বলে, আমি অমুক অমুক কাজ করেছি। উত্তরে সে বলে, তুমিই কিছুই করোনি। তারপর আরেকজন এসে বলে। আমি তার পেছনে লেগে থেকে তার এবং তার স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে সক্ষম হয়েছি। ইবলিশ তখন তাকে তার কাছে টেনে নিয়ে বলে, হাঁ, তুমি খুবই কাজের কাজ করেছ।'২০৬
আজকাল আমরা পত্রিকার পাতা খুললেই দেখতে পাই, গোটা সমাজে ডিভোর্স কত ভয়াবহভাবে তার কালো থাবা বিস্তার করেছে। কত আশঙ্কাজনক হারে তা বেড়ে গেছে। এর পেছনে অবশ্য অনেক কারণ রয়েছে। যেমন,
১. দায়িত্বশীল স্বামী খুঁজে না পাওয়া।
আজ যে যুবক কোনো মেয়েকে বিয়ে করে তার বাবার বাড়ি থেকে সসম্মানে উঠিয়ে নিয়ে আসছে; কিছুদিন পর সে তাকে তার ঘর থেকে ধুরধুর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। লাঞ্ছিত ও অপমানিত করে বের করে দিচ্ছে। বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে একদিন যে মেয়েটি এই সংসারে এসেছিল, সেখানেই সে তার সমস্ত স্বপ্ন দাফন করে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যাচ্ছে।
২. আমানতদার ও বিশ্বস্ত পুরুষের সংখ্যা কমে যাওয়া। যার ফলে সে তার স্ত্রী-সন্তানদের হক নষ্ট করছে। সমাজে হিংসুক ও চুগলখোর মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর আমরা এমন পুরুষকে হারিয়েছি যে তার স্ত্রীর দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে ও তা গোপন রাখে, আল্লাহকে ভয় করে এবং হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকে।
৩. নেককার, সতী ও বাধ্যগতা নারীদের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া।
৪. ছেলে-মেয়েদের সংসারে পিতা-মাতার অনধিকার চর্চা করা। তাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ করা।
অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা তার ছেলের সংসারের ছোট-বড় সকল বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছেন। মাও সবসময় পুত্রবধুর পিছনে লেগে আছেন। এমনও কিছু বাবা-মা আছেন, ছেলে-মেয়ের সংসারে কখন ঝামেলা বাধবে সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকেন। নাউযুবিল্লাহ।
৫. অকৃতজ্ঞতাবোধ বেড়ে যাওয়া। আজকাল কোনো কিছুতেই আমরা কেউ সন্তুষ্ট নই। আমাদের নেয়ামত যেমন বেড়েছে, তেমনি নেয়ামতের প্রতি আমাদের অকৃতজ্ঞতাবোধও বেড়েছে।
ধনী ব্যক্তি আজ বিয়ে করছে তো টাকার গরমে কাল ডিভোর্স দিয়ে দিচ্ছে। অথচ সে মনে করছে না, তাকে একদিন মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। তিনি তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।
৬. চরিত্র সংকট। রাজনীতিবিদরা বলে থাকেন, দেশে খাদ্য-সংকট, ওষুধ-সংকট, বস্ত্র-সংকট। আমি বলি, এসব সংকটের পাশাপাশি দেশে চরিত্র-সংকটও তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। মানুষের নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটেছে। মদ, নারী ইত্যাদি সহজলভ্য হয়ে গেছে। যে কারণে পাপের সাগরে তারা আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে আছে। লজ্জা-সম্ভ্রমের সমস্ত পর্দা তারা ছিন্ন করে ফেলেছে। ২৩৭
টিকাঃ
২০৬ মুসতাদরাকে হাকেম : ৮৭৪৭।
২৩৭ 'হামাসাতুন ফি উষুনি যাওযাইন।
📄 নিকৃষ্ট হালাল (২)
যেহেতু একটি পরিবারকে সুন্দর ও সুখময় করে গড়ে তোলার জন্য স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য বেশি থাকে, তাই স্বামীকে বলছি।
আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে এই কথাগুলো আপনার জন্য।
এক, সবর করুন। সবরের পরিণাম বড় উত্তম। এর ফল বড় মিষ্টি।
আপনার স্ত্রী যদি আপনাকে একবার কষ্ট দিয়ে থাকে, তাহলে মনে করুন, সে আপনাকর জীবনে অসংখ্য আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছে। কিছু আনন্দ তো এমন, যেগুলোর ঋণ কখনো পরিশোধ করা সম্ভব নয়। যেগুলোর সঙ্গে পৃথিবীর কোনো কিছুর তুলনা হয় না।
দুই, তালাকের অশুভ পরিণতির কথা চিন্তা করুন।
স্ত্রীর আচরণ খারাপ হলে হতাশ হবেন না। হয়ত আল্লাহ তার গর্ভে এমন সন্তান দান করবেন, যে আপনার প্রশান্তির কারণ হবে। আপনার চোখে শীতলতা আনয়ন করবে।
কখনো এমন হয়, স্ত্রীর আচার-ব্যবহার খুব খারাপ। কিন্তু স্বামী বেচারা বড় ভালো মানুষ। গোবেচারা ধরনের। স্ত্রী তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। তাকে গালিগালাজ করে। আর সে আল্লাহর ওয়াস্তে ধৈর্যধারণ করে। আল্লাহর কাছে প্রতিদান লাভের আশা রাখে। কয়েক বছর না যেতেই দেখা যায় আল্লাহ তাকে চক্ষু শীতলকারী নেক সন্তান দান করেছেন।
কে জানে, আজ যে স্ত্রীকে আপনার নরক মনে হচ্ছে, কিছুদিন পর তাকে হয়ত আপনার স্বর্গ মনে হবে। শেষ বয়সে সে হয়ত আপনার হাতের লাঠি হবে। চোখের চশমা হবে। বেঁচে থাকার অবলম্বন হবে। কারণ একটু আগেই বলেছি, সবরের পরিণাম খুব উত্তম হয়।
আর অবশ্যই দুঃখের পর সুখ রয়েছে। এটি আমার কথা নয়। মহান আল্লাহর কথা। তিনি তাঁর পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا . إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
'নিশ্চয় কষ্টের পর সুখ রয়েছে। নিশ্চয় কষ্টের পর সুখ রয়েছে।’২৩৮
তিন, ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ইস্তেখারা করুন। সালাতুল ইস্তেখারা পড়ুন। উলামায়ে কেরাম ও বিজ্ঞজনদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। নেককারদের সাহায্য গ্রহণ করুন।
মনে রাখবেন, ডিভোর্স হচ্ছে দেহের কোনো একটি অঙ্গ কেটে ফেলার মতো। এটি সর্বশেষ চিকিৎসা। মানুষের শরীরে কোনো ব্যাধি হলে ডাক্তাররা প্রথমেই যেমন অপারেশন করে তার অঙ্গ কেটে ফেলেন না। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন, অঙ্গটিকে বাঁচানোর। ঠিক তেমনি তালাকও।
অঙ্গ যেন না কাটা যায়, এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা তিন তালাকের বিধান রেখেছেন। যেন একটি বা দুটি তালাক দিয়ে দিলেও অঙ্গটি বেঁচে থাকে। কাটা না যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الطَّاقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَكُ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحُ بِإِحْسَانٍ
'তালাক দু'বার। অতঃপর স্ত্রীকে হয় বিধিমত রেখে দিবে। কিংবা সদয়ভাবে মুক্ত করে দিবে।' ২৩৯
এই আয়াতে তালাকে রাজঈর কথা বলে হয়েছে, যেই তালাকের পর স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে তার ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে পুনরায় গ্রহণ করতে পারে।
কোনো কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া হারাম। কারণ, এতে যাকে তালাক দিবে তার ক্ষতি করা হয়।
তবে আফসোসের সঙ্গে বলতে হয়, আজকাল অনেক পুরুষকে তুচ্ছ কারণে স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে দেখা যায়। আল্লাহ তায়ালা যে তাকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দান করে সম্মানিত করেছেন, এর কোনো গুরুত্ব বা মূল্য তার কাছে নেই। সে তার ও তার-স্ত্রী সন্তানদের পরিণতির কথা না ভেবে ডিভোর্স দিয়ে বসে।
অনেকে রাগের মাথায় ডিভোর্স দিয়ে বসে। তারপর রাগ ঠাণ্ডা হলে সে তার ভুল বুঝতে পারে। অনুতাপের অনলে পুড়তে থাকে। স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার ফতোয়ার জন্য মুফতি সাহেবের কাছে দৌঁড়ায়।
উল্লেখ্য যে, রাগের মাথায় তালাক দিলেও তালাক কার্যকর হয়ে যায়। কেননা তালাক সাধারণত মানুষ রাগের মাথাতেই দেয়। কেউ ঠাণ্ডা মাথায় দেয় না। ২৪০
টিকাঃ
* সুরা আলাম নাশরাহ: ৫-৬।
২৩৯ সুরা বাকারা: ২২৯।
২৪০ হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন।