📄 সংসারের প্রতি বিরক্তি
খুব বেশিদিন হয়নি মেয়েটির বিয়ে হয়েছে। কিন্তু এখনই সংসারের প্রতি তার বিরক্তি চলে এসেছে। প্রতিদিন একই কাজ করতে করতে সে ক্লান্ত। এছাড়া তার আরও অনেক অভিযোগ। যেমন, স্বামীর সবসময় চুপচাপ থাকা। তার একের পর এক ফরমায়েশ শোনা। বাচ্চাদের চিৎকার চেঁচামেচি। একদণ্ড বিশ্রামের সুযোগ না পাওয়া। এত কষ্ট করেও সবার মন না পাওয়া।
এই মেয়েটি কি একদিনও সেই মায়ের কথা মনে করেছে, যে যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো মুসলিম দেশে বাস করে। প্রতিদিন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। অথচ সে তার সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে। যে স্বামীর প্রতি সে বিরক্ত ছিল সেই স্বামীকে হারিয়েছে। সে সন্তানদের চিৎকার চেঁচামেচিতে সে অতিষ্ট ছিল, তাদের হারিয়েছে। তার সমস্ত কামনা অবশেষে একটি দেয়ালে পরিণত হয়েছে, যে দেয়ালে সে এখন হেলান দিয়ে সারাদিন চুপচাপ বসে থাকে আর তার গণ্ডদেশ দিয়ে তাসবিহর মতো ফোটা ফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়তে থাকে।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করেও তুমি যেসব নেয়ামতে ডুবে আছ, তুমি কী কখনো তা অনুভব করেছো?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরিবার-পরিজনসহ নিরাপদে সকালে উপনীত হয়, সুস্থ শরীরে দিনাতিপাত করে এবং তার নিকট সারা দিনের খোরাকি থাকে, তবে তার জন্য যেন গোটা দুনিয়াটাই একত্রিত করা হলো।'
এই হাদিসে আল্লাহর রাসুল যেসব নেয়ামতের কথা বললেন, তুমি তো এর চেয়ে বড় বড় নেয়ামতে ডুবে আছ। তুমি তোমার চারপাশে তাকিয়ে দেখ, কত শত নারী তোমার চেয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম দেশগুলোর একাকিনী শোকাকুলা রমণীদের কথা চিন্তা করো, যারা তাদের স্বামী-সন্তান সবকিছু হারিয়েছে। তাদের কারও কি বসে বসে এমন চিন্তাবিলাস করার সময় আছে, প্রতিদিন একইরকম নাকি ভিন্ন রকম?
তুমি গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করো। অতদূর যাওয়া তোমার পক্ষে সম্ভব না হলে, তুমি বরং তোমার নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে যাও। তারপর বিছানায় পড়ে থাকা তোমারই মতো কোনো নারীকে কিংবা বিনা অপরাধে জেলখাটা কোনো মহিলাকে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো। নিজের অবস্থার সঙ্গে তাদের অবস্থা মিলিয়ে দেখো। তুমি বুঝতে পারবে তুমি কতটা সুখে আছ। কত বড় বড় নেয়ামতে ডুবে আছ।
তুমি কীভাবে প্রতিদিন আল্লাহর শোকর আদায় করো না? অথচ তিনি তোমাকে ঘর-সংসার, স্বামী-সন্তান সবই দান করেছেন, যা তোমার জীবনকে পূর্ণতায় ভরিয়ে রেখেছে।
একজন মুসলমান কখনো বিতৃষ্ণ ও বিরক্ত হতে পারে না। প্রতিদিন তার অনেক ব্যস্ততা। আল্লাহর ইবাদত করা, কোনো অভাবীকে সহায়তা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা অথবা কুরআনের কোনো অংশ মুখস্থ করা।
নিজেকে ব্যস্ত রাখতে তুমি সালাত আদায় করো। প্রতিদিনের ওযিফা পাঠ করো। কুরআন তেলাওয়াত করো। নবি ও সাহাবায়ে কেরামের সিরাত পাঠ করো। তালিম করো। সন্তানদের নিয়ে মুযাকারা করো। তাদের দীন শিক্ষা দাও। পড়া দেখিয়ে দাও। কল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করো। বিধবা, অভাবী ও দরিদ্র মহিলাদের সাহায্যার্থে কিছু করো।
তোমার স্বামী সবসময় চুপ থাকে, এর জন্য তুমি আল্লাহর শোকর আদায় করো। কারণ, অনেক স্বামী আছে স্ত্রীদের গালিগালাজ করে। সারাক্ষণ তাদের দোষ ধরতে থাকে, খোঁটা দিতে থাকে।
সন্তানদের চিৎকার চেঁচামেচির জন্য তুমি আলহামদুলিল্লাহ বলো। আল্লাহ তোমাকে সন্তান দান করেছেন। পৃথিবীতে এমন অসংখ্য নারী আছে, যারা একটি সন্তান লাভের বিনিময়ে সমগ্র পৃথিবী দিয়ে দিতে রাজি আছে।
টিকাঃ
* সুনানে তিরমিযি: ২৩৪৬।
📄 স্বামী যদি ভালো না বাসে
স্বামী ভালো না বাসলে স্ত্রীর ঘাবড়ানোর কিছু নেই এবং এটা মনে করারও কোনো কারণ নেই, এ জীবনে আর তার ভালোবাসা লাভ করা সম্ভব নয়।
আপনি একজন বুদ্ধিমতী নারী। আপনার পক্ষে সম্ভব নতুন করে স্বামীর মনে ভালোবাসার বীজ বপন করা।
কীভাবে?
প্রথমেই তাকদিরের ফায়সালাকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিন। সন্তুষ্ট থাকুন। আল্লাহর প্রশংসা করুন। কারণ, সন্তুষ্টি ও অল্পেতুষ্টি ইহ ও পরকালীন জীবনে সৌভাগ্যের চাবিকাঠি।
♥ আপনি জেনে রাখুন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য এই স্বামীকে আপনার জন্য নির্বাচন করেছেন। তিনি দেখতে চান আপনি তার ফায়সালায় ও নির্ধারণে সন্তুষ্ট হোন কি না।
মনে রাখবেন, আপনি যে সবর করছেন, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই এর বিনিময় আপনাকে প্রদান করবেন।
হয়ত এর মাঝে আপনার জন্য প্রভুত কল্যাণ রয়েছে যা আপনি জানেন না। যেমন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
'হয়ত তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করবে। অথচ তা তোমাদের জন্য উত্তম।'*
• স্বামীর আবেগ-অনুভূতি বোঝার এবং আপনি যে তাকে ভালোবাসেন এটা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। আপনি নিঃস্বার্থভাবে তাকে ভালোবাসতে থাকুন। একসময় ঠিকই তার বোধোদয় হবে। সে আপনার ভালোবাসার মূল্যায়ন করবে।
• আপনি তার বন্ধু হয়ে যান। তার সঙ্গে তার কাজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করুন।
• স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক উন্নয়ন বিষয়ক লেখা ও বিভিন্ন গ্রন্থাবলি পাঠ করুন।
• সে কোনো সমস্যায় পড়লে আপনি নিজে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করুন।
• বিশ্বস্ততার সঙ্গে তার সমস্ত কিছু হেফাজত করুন। টাকা-পয়সা আমানতদারির সঙ্গে রাখুন।
• তাকে প্রশান্তির ছায়া দান করুন।
• সে আপনার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি—এটা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
• সে আপনার কোনো সামান্য কাজ করে দিলেও আপনি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন।
টিকাঃ
* সুরা বাকারা: ২১৬।
📄 অর্থনৈতিক পরিকল্পনা
স্ত্রী স্বামীকে বলছে, আপনার কাছে সংসারের প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস চাইলে আপনি রেগে যান। দশ রকম প্রশ্ন করেন। কারণ কী?
লাল লাল চোখ করে তাকান। আপনার কপালের রগ ফুলে উঠে। গজগজ করতে থাকেন। সংসারের যাবতীয় খরচ আপনি দিবেন না তো কে দিবে? এটা কি আপনার উপর ওয়াজিব না?
আপনি যা দেন, আমি তো আপনার সংসারের কাজেই ব্যয় করি। আপনার জন্য, আপনার সন্তানদের জন্য। আপনার মেহমানদের জন্য।
আপনি হয়ত বলবেন, অর্থনৈতিকভাবে আমি এখন একটু খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
তাহলে আমি বলব, আমি তো অনেকবার আপনার কাছে আপনার অবস্থা জানতে চেয়েছি। কিন্তু আপনি কি কখনো আমার সঙ্গে শেয়ার করেছেন। শেয়ার করলে হয়ত আমি আপনাকে হেল্প করতে পারতাম।
সংসারের সমস্ত দায়িত্ব তো আপনার একার না। আমাদেরও তো দায়িত্ব আছে আপদে-বিপদে, সুখে-দুঃখে আপনার পাশে থাক।
আসুন, আমরা আমাদের মাসিক আয় অনুযায়ী ব্যয়ের খাতগুলো নির্ধারণ করি।
♥ আপনি তাকে নরম ও কোমলভাবে সংসারের পিছনে খরচ করার ফযিলতের কথা বলতে পারেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'একটি দিনার তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করলে, একটি দিনার গোলাম আযাদ করার জন্য এবং একটি দিনار মিসকিনদেরকে দান করলে এবং একটি তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করলে। এর মধ্যে (সওয়াবের দিক থেকে) ওই দিনারটি উত্তম, যা তুমি তোমার পরিবারের জন্য ব্যয় করেছো।'২২৭
বর্ণিত আছে, এক কৃপণ লোক স্ত্রী-সন্তানদের রেখে দূরে কোথাও চাকরির উদ্দেশ্যে গেল। মাস শেষে সে চিঠি লিখে পাঠাল-
প্রিয় বউ, এ মাসে বেতন পাঠাতে পারছি না। কাজের অবস্থা ভালো না। তবে তোমার জন্য বেতনের চেয়ে উত্তম কিছু পাঠাচ্ছি। একশটি চুমু।
ইতি তোমার স্বামী
আপনিই বলুন, এখন স্ত্রী তার স্বামীর পাঠানো এসব চুমু দিয়ে কী করবে?
সম্পদ জীবনের অন্যতম প্রয়োজন। শুধু ভালোবাসা দিয়ে তো আর জীবন চলে না। ক্ষুধা লাগলে কী ভালোবাসা খাওয়া যায়? খাওয়া যায় না।
এ কারণে এক নারী তার স্বামীকে চিঠি লিখেছিল, 'আমার প্রিয় স্বামী, শুধু ভালোবাসা না। ভালোবাসার সঙ্গে কিছু টাকা-পয়সাও পাঠিও।'
সংসারের পিছনে খরচ অবশ্যই করতে হবে এবং সে খরচে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। কোনো কার্পণ্য নয়। ব্যয়কুণ্ঠতা নয়। কোনো অপচয় নয়। অপব্যয়ও নয়।
আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
'আমি এমন পরিবারকে ঘৃণা করি, যারা কয়েকদিনের খরচ একদিনেই শেষ করে ফেলে।'
টিকাঃ
২২৭ সহিহ মুসলিম : ৯৯৪।
📄 নারীরা কেন স্বামীর ভালোবাসা হারায়?
• স্বামীকে সম্মান না করা। তাকে অপমান ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা। বিশেষ করে তার পরিবার ও সন্তানদের সামনে।
• অগোছালো, অপরিচ্ছন্ন ও নোংরাভাবে থাকা। তার যুক্তি হলো, স্বামী তাকে বিয়ে করেছে। ব্যস শেষ। এসব সাজগোজের কী প্রয়োজন?
• অতিরিক্ত আহার করে করে স্থূল হয়ে যাওয়া।
• খুব কৃপণ হওয়া। সমস্ত ক্ষেত্রে। এমনকি কথা বলার ক্ষেত্রেও।
• সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্বামীর কোনো সমস্যায় তাকে হেল্প না করা। বিশেষ করে তার যখন আর্থিক কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়।
• স্বামীকে অবহেলা করা। তাকে গুরুত্ব না দেওয়া। নিজের সন্তানদের নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকা।
• স্বামীর সঙ্গে মিথ্যা বলা। তার কাছ থেকে সবকিছু লুকানো।
• নিজের কোনো বদঅভ্যাস থাকলে সেটা পরিবর্তনের চেষ্টা না করা।
• দৈহিক চাহিদা অনুভব না করা।
• বই পড়ার অভ্যাস না থাকা। সবসময় টিভি-নাটক, মুভি, ফেইসবুক, ইন্সট্রাগ্রাম, ইউটিউব ইত্যাদি নিয়ে থাকা।
• স্বামীকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা।
• স্বার্থপর হওয়া।
• স্বামীর টাকা-পয়সা নষ্ট করা।
• অন্যদের দিকে দেখা। সে কী নেয়ামতের মধ্যে আছে তা ভুলে যাওয়া।
• সবসময় স্বামীকে ছোট করা।
উপরের যে কোনো একটি কাজ আপনার দাম্পত্য জীবন ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এগুলো ধীরে ধীরে স্বামীর মন থেকে সমস্ত ভালোবাসাকে শেষ করে ফেলে। তারপর একসময় সংসারে ভাঙন দেখা দেয়।