📄 শ্বশুরবাড়ির মানুষের সঙ্গে আচরণ
মেয়েদের জন্মই যেহেতু স্বামীর ঘরে যাওয়ার জন্য। তাই প্রতিটি মেয়ের ও তার পরিবারের সকলের চিন্তা থাকে সে যে পরিবারে যাবে, সে পরিবারটি কেমন হবে। তারা তাকে কীভাবে গ্রহণ করবে। সে তাদের কীভাবে গ্রহণ করবে। তারা তার সঙ্গে কেমন আচরণ করবে। সে তাদের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিবে? এ ক্ষেত্রে উভয় পক্ষেরই কিছু দায়িত্ব কর্তব্য আছে। স্বামী ও তার পরিবারের উচিত নিজের পরিবার-পরিজন ও সব ছেড়ে আসা এই মেয়েটির সঙ্গে উত্তম আচরণ করা। তাকে মমতার পরশ বুলিয়ে দেওয়া। কোনো ভুল করলে ক্ষমা করে দেওয়া। সে কোনো কিছু না পারলে তাকে শেখার জন্য সময় দেওয়া। আকারে-ইঙ্গিতে হেয় না করা।
কিন্তু এরপরও অনেক পরিবারে কিছু না কিছু সমস্যা হয়েই যায়। কোনো না কোনোভাবে তাকে কষ্ট পেতেই হয়। কখনও তা সামান্য হয়। কখনও তা অসামান্য। দেখা যায় স্বামীর পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে স্বামীও তাকে কথা শোনানো শুরু করে। তখন অনেক মেয়ে এতে অস্থির হয়ে পড়ে। কী করবে বুঝতে পারে না। দুশ্চিন্তায় ভুগে।
শুনুন, আপনি যদি তাদের হৃদয় রাজ্য জয় করতে চান, তাদের কাছে আপনার মর্যাদাকে আরও সমুন্নত করতে চান, তাহলে আপনাকে এই পরিবারের বড়দের সম্মান করতে হবে ও ছোটদের আদর-স্নেহ করতে হবে। বিশেষ করে আপনার শ্বাশুড়িকে। আপনি তার প্রতি উত্তম আচরণ করুন। কোমল ভাষায় তার সঙ্গে কথা বলুন। তার সেবা করুন।
শুধু আপনি না, আপনার স্বামীকেও আপনি তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণে উদ্বুদ্ধ করুন। সে কখনো তাদের সঙ্গে মন্দ আচরণ করলে তাকে শুধরানোর চেষ্টা করুন।
স্বামীর কাছে কখনো তার মায়ের দোষ-ত্রুটির কথা আলোচনা করবেন না। এতে সে মনে আঘাত পাবে। শ্বাশুড়ির কোনো আচরণে কষ্ট পেলে সবর করুন। সবর, সবর এবং সবর। তারপর দেখুন, সবর আপনার মর্যাদা কত ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়।
মনে রাখবেন, আজ আপনি যেমন আচরণ করবেন, একদিন আপনার সঙ্গেও (যেদিন আপনি শ্বাশুড়ি হবেন সেদিন) তেমন আচরণ করা হবে। সুতরাং তার বয়স্ক পিতা-মাতার প্রতি আপনি দয়াশীল হোন। তাদের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে দিন।
পবিত্র কুরআনে সুরা বনি ইসরাঈলের এই আয়াতটির প্রতি লক্ষ করুন,
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا.
'তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে, তাদের 'উফ' বলো না এবং তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো।' ২১৬
এই আয়াতে কারিমায় যদিও স্বামীকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু স্ত্রীরও কর্তব্য তাকে এই দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা। তাদের হক আদায়ের ক্ষেত্রে স্বামীর সামনে বাধা হয়ে না দাঁড়ানো। স্ত্রী যদি শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সঙ্গে সমস্যা সৃষ্টি করে রাখে, তখন তা স্বামীকেও সমস্যায় ফেলে দেয়। সে বুঝতে পারে না উভয় পক্ষের মন রক্ষা করে কীভাবে চলবে। তাদের মাঝে মীমাংসা কীভাবে করবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় স্ত্রীকে সে তার পিতা-মাতার চেয়ে প্রাধান্য দিয়ে ফেলে কিংবা অন্যায়ভাবে পিতা-মাতার বিরুদ্ধাচরণ করে। এতে সে বিরাট ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং স্ত্রীও তার সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ, এসব মূলত স্ত্রীর কারণেই হয়েছে। তাই এর কুফল তাকেও ভোগ করতে হয়।
গুনাহর কাজের প্রতি যে আহ্বান করবে, সেই গুনাহর বোঝা এবং যারা সেই গুনাহ করবে, তাদের সকলের গুনাহর বোঝাও তার উপর বর্তায়।
আর পিতা-মাতার সঙ্গে অবাধ্যচরণ অনেক বড় কবিরা গুনাহ। এর ফলে মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।
সদাচারিণী স্ত্রী স্বামীকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণে সাহায্য করে। পিতামাতার সঙ্গে সে যদি কোনো অসদাচরণ করে, কিংবা তাদের হক নষ্ট করে, তখন সে তাকে উপদেশ দানের, সংশোধনের চেষ্টা করে। শয়তানের সাহায্যকারী হয় না।
টিকাঃ
২১৬ সুরা বনি ইসরাইল: ২৩।
📄 প্রতিবেশীর হকের প্রতি লক্ষ রাখা
একটি প্রবাদ আছে, বাসা দেখার আগে প্রতিবেশী দেখে নাও।
কারণ, প্রতিবেশী ভালো হলে বিপদাপদে সেই সবার আগে এগিয়ে আসে। আবার প্রতিবেশী খারাপ হলে সেই সবচেয়ে সমস্যা সৃষ্টি করে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মন্দ প্রতিবেশী থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতে বলেছেন। তিনি বলেন,
'মন্দ প্রতিবেশী থেকে তোমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে পানাহ চাও।' ২১৭
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি দুআ হলো,
'হে আল্লাহ! আমি আবাসস্থলের মন্দ প্রতিবেশী থেকে আপনার কাছে পানাহ চাচ্ছি।' ২১৮
এজন্য আমাদের যেটা করতে হবে, সর্বপ্রথম নিজেকে একজন উত্তম প্রতিবেশী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মানুষের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশতে হবে। সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
যেহেতু প্রয়োজনের সময় প্রতিবেশীই মানুষের সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে। তাদের সঙ্গে অবশ্যই আমরা যেন উত্তম আচরণ করি। মন্দ আচরণ পরিহার করি। কারণ, এমনটি মানুষকে জাহান্নামী এবং আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত করে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবেশীকে কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো,
'অধিক সালাত, রোজা এবং সদকা করার কারণে অমুক মহিলার আলোচনা হয়ে থাকে। তবে সে তার প্রতিবেশীদের মুখে কষ্ট দিয়ে থাকে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে জাহান্নামী।' ২১৯
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
'আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন নয়! আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন নয়। জিজ্ঞেস করা হলো, কোন ব্যক্তি ইয়া রাসুলাল্লাহ? তিনি বললেন, যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না।' ২২০
বিখ্যাত তাবেয়ি মুজাহিদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে ছিলাম। তার এক গোলাম বকরির চামড়া ছিলছিল। তখন তিনি বললেন, হে গোলাম, চামড়া ছিলে প্রথমে গোশত আমাদের ইহুদি প্রতিবেশীকে দিবে। এ কথাটি তিনি কয়েকবার বললেন। তখন গোলাম তাকে বলল, আপনি কতবার বলবেন? তিনি বললেন,
'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের জন্য আমাদের এত উপদেশ দিয়েছেন যে, আমরা ধারণা করে বসেছিলাম যে, তিনি হয়ত শীঘ্রই প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকার বানিয়ে দিবেন।' ২২১
তবে প্রতিবেশী যদি এমন হয় যে প্রকাশ্যে আল্লাহর নাফরমানি করে, পাপাচারী, কিংবা সে বিদআতি, তাহলে তার কাছ থেকে সতর্ক থাকা উচিত।
কারণ, এ ক্ষেত্রে আশঙ্কা আছে, সন্তানরা হয়ত তার সঙ্গে মিশে দীন ইসলামের পরিপন্থি কিছু শিখে ফেলবে।
তবে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা যাবে না। তার কোনো হক নষ্ট করা যাবে না। তার সঙ্গে কখনো তর্কে জড়াতে হলে ভদ্রতা বজায় রাখতে হবে, যাতে আল্লাহ তায়ালা তাকে হেদায়াত দান করেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'দীন হচ্ছে সম্পূর্ণ কল্যাণকামিতা।'
আজকাল তো এমন একটা কালচার সৃষ্টি হয়ে গেছে, দেখে যায় একই বিল্ডিংয়ে বছরের পর পর একসঙ্গে বসবাস করছে। কিন্তু কারও সঙ্গে কারও কোনো পরিচয় নেই। দেখা-সাক্ষাৎ, কথা-বার্তা নেই। আসা-যাওয়া নেই। সবাই নিজেকে নিয়ে আছে। আমরা এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছি।
অনেক নারীকে এমন একটা কথা বলতে শোনা যায়, আলহামদুলিল্লাহ আমার কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক নেই। আমি কারও বাসায় যাই না। আর কেউ আমার বাসায় আসে না। আমি আমার মতো থাকি। কারও সঙ্গে কোনো কথা বলি না। কেউ আমার সঙ্গে কথা বলে না। এটা ভালো না। নবিজির নির্দেশনা এমন নয়।
কাউকে চিনে না, জানে না বলে তার সঙ্গে একেবারে মিশবে না, তার প্রয়োজনের সময় এগিয়ে আসবে না, বিপদে সাহায্য করবে না, সে কোনো সমস্যায় পড়লে এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে পাশ কাটিয়ে যাবে, ইসলামি সমাজ এতটা স্বার্থপর নয়। সমস্ত মুসলমানরা হচ্ছে একটি দেহের ন্যায়।
ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘যে মুমিন মানুষের সঙ্গে মিশে এবং তাদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করে, সে ওই মুমিনের চেয়ে উত্তম যে মানুষের সঙ্গে মিশে না এবং তাদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করে না।’ ২২২
টিকাঃ
২১৭ সুনানে নাসাঈ: ৫৫০২।
২১৮ ইমাম বুখারিকৃত আল-আদাবুল মুফরাদ: ১১৬।
২১৯ মুসনাদে আহমাদ।
২২০ সহিহ বুখারি : ৬০১৬।
২২১ সহিহ বুখারি: ৬০১৬।
২২২ সুনানে তিরমিযি।
* দেখুন, কাইফা তাকসিবিনা কালবা যাওযিকি ওয়া তুরদিনা রাব্বাকি গ্রন্থটি।
📄 শ্বশুরবাড়ির লোকজন যদি ঘৃণা করে
এক বোন তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নিপীড়নের অভিযোগ করে লিখল—
আমি তাদের প্রতি সদাচরণ করি, কিন্তু তারা আমার সঙ্গে অসদাচরণ করে। আমি তাদের সমস্ত ভুল ক্ষমা করে দেই, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে।
আমার স্বামীর অনুপস্থিতিতে তারা যেমন আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, তেমনি তার উপস্থিতিতেও। তারা আমার স্বামীর কাছে আমার নামে মিথ্যা কথা লাগায়। তা সত্ত্বেও আমি সবসময় তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করি। সুখে-দুঃখে সবসময় তাদের পাশে থাকি। কিন্তু আমার কষ্টের সময়, আমার দুঃখের সময় তাদের কাউকে আমি পাশে পাই না। আমার খুশিতে তারা কখনো খুশি হয় না।
আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসি। আমার স্বামীও আমাকে ভালোবাসেন। তবে আমি তাদের এসব অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠেছি। আর নিতে পারছি না। এদিকে আমার স্বামীও তাদের বাধা দেয় না। সম্পর্ক খারাপ হয়ে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় সে তাদের কিছু বলে না।
আমার এই বোনটির উদ্দেশ্যে আমার কিছু পরামর্শ ছিল:
• আপনি তাদের সঙ্গে আরও বেশি সদাচরণ করুন। হাল ছেড়ে দিবেন না। অবশ্যই একদিন তাদের মাঝে পরিবর্তন আসবে।
♥ তাদের ভুলগুলো ক্ষমা করতে থাকুন।
♥ তবে তাদের আপনার সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন কিংবা আপনার মর্যাদাহানি করতে দিবেন না। এটা মেনে নিবেন না।
♥ আপনি যদি সত্যিকারার্থেই একজন ভালো নারী হয়ে থাকেন, তাহলে যারা মন্দ তাদের কথায় প্রভাবিত হবেন না। এসব নিয়ে ভাববেন না। দেখবেন, একদিন তারা ঠিকই লজ্জিত হবে। মন্দ আচরণের অশুভ পরিণতি একদিন তারা ঠিকই ভোগ করবে।
♥ আপনি আপনার ও আপনার শ্বাশুড়ির মাঝের দুয়ারটি সবসময় উন্মুক্ত রাখুন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
اِدْفَعْ بِالَّتِیْ هِیَ اَحْسَنُ فَاِذَا الَّذِیْ بَیْنَكَ وَ بَیْنَهُ عَدَاوَةٌ كَاَنَّهُ وَلِیٌّ حَمِیْمٌ
'আপনি মন্দের জবাবে তাই বলুন যা উত্তম। দেখবেন আপনার ও যার মাঝে শত্রুতা ছিল, সে অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে'। ২২৩
• শ্বাশুড়ির মুখ থেকে কখনো অপ্রীতিকর কিছু শুনলে না শোনার ভান করুন।
• মনে রাখবেন, মানুষ সদাচারের প্রতিদান না দিলেও আল্লাহ কিন্তু সদাচারের প্রতিদান নষ্ট করেন না। ২২৪
টিকাঃ
২২৩ সুরা ফুসসিলাত: ৩৪।
২২৪ দেখুন, হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন: ১৪৬ (সংক্ষেপিত)।
📄 সংসারের প্রতি বিরক্তি
খুব বেশিদিন হয়নি মেয়েটির বিয়ে হয়েছে। কিন্তু এখনই সংসারের প্রতি তার বিরক্তি চলে এসেছে। প্রতিদিন একই কাজ করতে করতে সে ক্লান্ত। এছাড়া তার আরও অনেক অভিযোগ। যেমন, স্বামীর সবসময় চুপচাপ থাকা। তার একের পর এক ফরমায়েশ শোনা। বাচ্চাদের চিৎকার চেঁচামেচি। একদণ্ড বিশ্রামের সুযোগ না পাওয়া। এত কষ্ট করেও সবার মন না পাওয়া।
এই মেয়েটি কি একদিনও সেই মায়ের কথা মনে করেছে, যে যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো মুসলিম দেশে বাস করে। প্রতিদিন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। অথচ সে তার সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে। যে স্বামীর প্রতি সে বিরক্ত ছিল সেই স্বামীকে হারিয়েছে। সে সন্তানদের চিৎকার চেঁচামেচিতে সে অতিষ্ট ছিল, তাদের হারিয়েছে। তার সমস্ত কামনা অবশেষে একটি দেয়ালে পরিণত হয়েছে, যে দেয়ালে সে এখন হেলান দিয়ে সারাদিন চুপচাপ বসে থাকে আর তার গণ্ডদেশ দিয়ে তাসবিহর মতো ফোটা ফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়তে থাকে।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করেও তুমি যেসব নেয়ামতে ডুবে আছ, তুমি কী কখনো তা অনুভব করেছো?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরিবার-পরিজনসহ নিরাপদে সকালে উপনীত হয়, সুস্থ শরীরে দিনাতিপাত করে এবং তার নিকট সারা দিনের খোরাকি থাকে, তবে তার জন্য যেন গোটা দুনিয়াটাই একত্রিত করা হলো।'
এই হাদিসে আল্লাহর রাসুল যেসব নেয়ামতের কথা বললেন, তুমি তো এর চেয়ে বড় বড় নেয়ামতে ডুবে আছ। তুমি তোমার চারপাশে তাকিয়ে দেখ, কত শত নারী তোমার চেয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম দেশগুলোর একাকিনী শোকাকুলা রমণীদের কথা চিন্তা করো, যারা তাদের স্বামী-সন্তান সবকিছু হারিয়েছে। তাদের কারও কি বসে বসে এমন চিন্তাবিলাস করার সময় আছে, প্রতিদিন একইরকম নাকি ভিন্ন রকম?
তুমি গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করো। অতদূর যাওয়া তোমার পক্ষে সম্ভব না হলে, তুমি বরং তোমার নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে যাও। তারপর বিছানায় পড়ে থাকা তোমারই মতো কোনো নারীকে কিংবা বিনা অপরাধে জেলখাটা কোনো মহিলাকে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো। নিজের অবস্থার সঙ্গে তাদের অবস্থা মিলিয়ে দেখো। তুমি বুঝতে পারবে তুমি কতটা সুখে আছ। কত বড় বড় নেয়ামতে ডুবে আছ।
তুমি কীভাবে প্রতিদিন আল্লাহর শোকর আদায় করো না? অথচ তিনি তোমাকে ঘর-সংসার, স্বামী-সন্তান সবই দান করেছেন, যা তোমার জীবনকে পূর্ণতায় ভরিয়ে রেখেছে।
একজন মুসলমান কখনো বিতৃষ্ণ ও বিরক্ত হতে পারে না। প্রতিদিন তার অনেক ব্যস্ততা। আল্লাহর ইবাদত করা, কোনো অভাবীকে সহায়তা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা অথবা কুরআনের কোনো অংশ মুখস্থ করা।
নিজেকে ব্যস্ত রাখতে তুমি সালাত আদায় করো। প্রতিদিনের ওযিফা পাঠ করো। কুরআন তেলাওয়াত করো। নবি ও সাহাবায়ে কেরামের সিরাত পাঠ করো। তালিম করো। সন্তানদের নিয়ে মুযাকারা করো। তাদের দীন শিক্ষা দাও। পড়া দেখিয়ে দাও। কল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করো। বিধবা, অভাবী ও দরিদ্র মহিলাদের সাহায্যার্থে কিছু করো।
তোমার স্বামী সবসময় চুপ থাকে, এর জন্য তুমি আল্লাহর শোকর আদায় করো। কারণ, অনেক স্বামী আছে স্ত্রীদের গালিগালাজ করে। সারাক্ষণ তাদের দোষ ধরতে থাকে, খোঁটা দিতে থাকে।
সন্তানদের চিৎকার চেঁচামেচির জন্য তুমি আলহামদুলিল্লাহ বলো। আল্লাহ তোমাকে সন্তান দান করেছেন। পৃথিবীতে এমন অসংখ্য নারী আছে, যারা একটি সন্তান লাভের বিনিময়ে সমগ্র পৃথিবী দিয়ে দিতে রাজি আছে।
টিকাঃ
* সুনানে তিরমিযি: ২৩৪৬।