📄 পর্দা : নারীর মাহরাম ও গায়রে মাহরাম
নামাজ রোজা যেমন ফরজ, তেমনি পর্দাও ফরজ। পার্থক্য হলো, নামাজ রোজার কাযা আছে। কিন্তু পর্দার কোনো কাযা নেই। অতীতে পর্দা না করে থাকলে সেজন্য একনিষ্ঠ মনে আল্লাহর কাছে তওবা-ইস্তেগফার করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। নামাজ না পড়লে, রোজা না রাখলে যেমন মারাত্মক গুনাহ হয়, তেমনি পর্দা না করলেও মারাত্মক গুনাহ হয়। কুরআন শরিফের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নারীদের পর্দার আদেশ দিয়েছেন। এটি তাদের জন্য রক্ষাকবচ।
প্রাপ্তবয়স্কা একজন নারী কার কার সঙ্গে দেখা করতে পারবে সে ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। একজন নারীর যে সমস্ত পুরুষের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ তাদের মাহরাম বলা হয়। আর যাদের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ নেই তাদের গায়রে মাহরাম বলা হয়। নারীর মাহরাম পুরুষ কারা তা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করে দিয়েছেন।
অনেক নারী পর্দা প্রথা মেনে চললেও আত্মীয় মহলে মেনে চলে না। যেমন- দেবর, ভাসুর, স্বামীর চাচা-জ্যাঠা-খালু-ফুপা-মামা। নিজের খালু, ফুপা। অথচ বাইরের মানুষের চেয়ে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ বেশি হয়। এ ক্ষেত্রে পর্দার হুকুম অধিক লঙ্ঘিত হয়। এর চেয়ে ভয়ংকর কথা হলো, এ সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পর্দা না করাকে অনেকে গুনাহ মনে করে না। এদের ইমানহারা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
হযরত উকবা ইবনে আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'তোমরা পরনারী গমন করা থেকে বিরত থাক। একথা শুনে এক আনসারি সাহাবি জিজ্ঞাসা করল, বলল, হে আল্লাহর রাসুল, 'হামউন' সম্পর্কে আপনি কী বলেন? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হামউন' হলো মৃত্যু সমতুল্য। ১১৮৮
আরবি ভাষায় স্বামীপক্ষের আত্মীয় স্বজনকে 'হামউন' বলা হয়। যেমন-দেবর, ভাসুর, স্বামীর চাচা-খালু-মামা। এদের সঙ্গে পর্দা না করাকে মৃত্যু সমতুল্য বলা হয়েছে। তাই এদের ক্ষেত্রে পর্দাপ্রথাকে আরও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। অন্যথায় এর জন্য ভয়াবহ পরিণতির অপেক্ষা করতে হবে।
নারীর মাহরাম কারা, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তা বর্ণনা করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে,
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যারা যৌন কামনা-রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত অন্য কারো নিকট। তারা যেন তাদের গোপন আভরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। ১৮৯
যে সকল পুরুষের সঙ্গে নারীর দেখা করা জায়েজ, তাদের মধ্যে ঊর্ধ্বতন ও নিম্নস্তন সম্পর্কের পুরুষ আছে। যেমন, বাবা, চাচা, দাদা, নানা। এরা ঊর্ধ্বতন সম্পর্কের। আর পুত্র, পৌত্র, ভাগিনা, ভাতিজা এরা হচ্ছে নিম্নস্তন সম্পর্কের। যে সব পুরুষের সঙ্গে নারীর দেখা করা জায়েজ, তারা প্রথমত দু'প্রকার।
১. সার্বক্ষণিক বা চিরস্থায়ী জায়েজ। যেমন, বাবা, চাচা, দাদা, নানা, পুত্র।
২. সাময়িক জায়েজ। যেমন, স্বামীর পিতা অর্থাৎ শ্বশুর, দাদা শ্বশুর, নানা শ্বশুর। স্বামীর সঙ্গে যতদিন বিবাহ বন্ধন থাকবে, ততদিন তাদের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ। কখনো তালাক হয়ে গেলে তাদের সঙ্গে দেখা করা নাজায়েজ। অর্থাৎ বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে যে সব পুরুষের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ হয়, বৈবাহিক সম্পর্ক না থাকলে তাদের সঙ্গে দেখা করা হারাম হয়ে যায়।
আসুন জেনে নেই নারীর মাহরাম পুরুষ কারা। কাদের সঙ্গে তার দেখা করা জায়েজ :
১. স্বামী, স্বামীর অন্য ঘরের পুত্র।
২. স্বামীর বাবা ও দাদা-নানা। অর্থাৎ শ্বশুর, দাদা শ্বশুর, নানা শশুর এবং তদূর্ধ্ব পুরুষগণ।
৩. পিতা।
৪. দাদা-চাচা এবং তদূর্ধ্ব পুরুষগণ।
৫. আপন ও সৎ মামা, নানা ও নানার ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ।
৬. আপন ছেলে ও ছেলের ঘরের পুত্ররা।
৭. আপন মেয়ের জামাই। তবে সৎ মেয়ের জামাই মাহরাম নয়। তার সঙ্গে দেখা করা জায়েজ নেই।
৮. আপন ভাই, সৎ ভাই।
৯. ভাতিজা। অর্থাৎ আপন ভাইয়ের ছেলে ও সৎ ভাইয়ের ছেলে।
১০. ভাগ্নে। অর্থাৎ আপন বোনের ছেলে। সৎ বোনের ছেলে।
১১. নাবালক ছেলে। তবে তাদের সামনে বিশেষ অঙ্গসমূহ ঢেকে রাখতে হবে। যদি এমন নাবালক হয়, সে এসবের কিছুই বুঝে না। নারীর সৌন্দর্য ও আকর্ষণ সম্পর্কে এখনও সে বেখবর তাহলে সমস্যা নেই।
১২. দুধ সম্পর্ক। অর্থাৎ দুধ ভাই ও দুধ ছেলে। এমনিভাবে দুধ ভাই ও দুধ বোনের ছেলে এবং তাদের নিম্নস্তন পুরুষ।
এ ছাড়া দুনিয়ার সমস্ত পুরুষ গায়রে মাহরাম। যত চাচাত, মামাত, খালাত, ফুফাত ভাই আছে, সবাই গায়রে মাহরাম। এককথায়, সমস্ত 'ত' ভাই গায়রে মাহরাম। তাদের সঙ্গে তার দেখা করা জায়েজ নেই। কথা বললেও কোমল কণ্ঠে বলা যাবে না। কিছু আদান-প্রদান করতে হলে পর্দার আড়াল থেকে করতে হবে।
উল্লেখ্য যে, যারা মাহরাম, তাদের সঙ্গে নারীর বিয়ে বৈধ নয়। তবে দেখা দেওয়া জায়েজ। দেখা দেওয়া জায়েজ হলেও তাদের সামনে শালীনভাবে থাকতে হবে। যারা গায়রে মাহরাম তাদের সঙ্গে বিয়ে বৈধ। তবে দেখা দেওয়া জায়েজ নেই। অর্থাৎ যাদের সঙ্গে দেখা দেওয়া জায়েজ, তাদের বিয়ে করা জায়েজ নেই। আর যাদের সঙ্গে দেখা দেওয়া জায়েজ নয়, তাদের বিয়ে করা জায়েজ। আপন দুলাভাই, খালু ও ফুফাও গায়রে মাহরাম। তবে বোন, খালা ও ফুফির জীবদ্দশায় তাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েজ নেই।
টিকাঃ
১৮৮ সহিহ বুখারি: ৫২৩২; সহিহ মুসলিম: ২১৭২।
* মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১৬৬৭১।
* আল মুহিতুল বুরহানি: ৪/১০৬।
📄 গৃহাভ্যন্তরে নারীর সাজসজ্জা গ্রহণ
অনেক নারী আছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সাজসজ্জা ও সৌন্দর্যের বিষয়ে উদাসীন। আবার অনেকে বিয়ের প্রথম দিকে এসব ব্যাপারে সচেতন থাকলেও পরে উদাসীন হয়ে যায়। তারা এই বলে যুক্তি দেখায়, 'এখন কী আর আমাদের সাজগোজ করার বয়স আছে। যৌবন নেই; তাই সাজগোজ করার আগ্রহও নেই।'
এটা মারাত্মক ভুল চিন্তা। এই চিন্তা দাম্পত্য জীবনকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
পুরুষ যখন বাহিরে যায়, তখন রাস্তায় অনেক 'বিউটি কুইনদের' দেখে। সে তখন মনে মনে তাদের সঙ্গে তার স্ত্রীকে তুলনা করে। তারপর বাসায় এসে যখন স্ত্রীকে কাজের বুয়ার বেশে দেখে, তখন তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। সে মনে মনে ভাবে, 'বিয়ে করে মনে হয় ভুল করলাম। রাস্তায় বের হলে দেখি কত সুন্দরী নারী আর আমি এটা কী বিয়ে করেছি!'
আমাদের যাদের ভেতর মোটামুটি আল্লাহর ভয় আছে, তারা এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ শুধু একটু আফসোস করবে। হারামের দিকে পা বাড়াবে না। কিন্তু হারামের দিকে অগ্রসর না হলেও যেটা হবে, স্ত্রীর প্রতি তার আচরণ পরিবর্তন হয়ে যাবে। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সে তখন স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি করবে। তার চাওয়া- পাওয়াগুলোকে তেমন গুরুত্ব দিবে না।
আর হঠাৎ করে স্বামীর আচরণে এমন পরিবর্তন দেখে স্ত্রী বিস্মিত বোধ করবে। কিন্তু সে বুঝতে পারবে না, কারণটা কী। তখন পাল্টা সেও স্বামীর সঙ্গে খারাপ আচরণ শুরু করবে। আর তখনই শয়তান তাদের দুজনকে নিয়ে খেলা শুরু করে দিবে। তারা উভয়ে শয়তানের ক্রীড়নকে পরিণত হবে।
অথচ নিজের প্রতি সামান্য একটু গুরুত্ব দিলে, একটু যত্ন নিলে, নিজেকে একটু গুছিয়ে সুন্দর করে রাখলে তাদেরকে এত বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হত না। তারা সমস্যার হাত থেকে বাঁচতে পারতো।
আর যে সমস্ত পুরুষের ভেতর আল্লাহর ভয় নেই, তারা যে কোন দিকে পা বাড়াবে সেটা আর নাই বললাম। আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন। যাবতীয় পাপ- পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত রাখুন।
ইমাম সুয়তি রহ. বলেন, ফুকাহায়ে কেরাম নারীদেরকে গৃহাভ্যন্তরে পূর্ণ সজ্জা গ্রহণ করার অনেক উপদেশ দিয়েছেন। যেমন, চুল পরিপাটি করে রাখা। পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা। সুগন্ধি ব্যবহার করা। মিষ্টি করে কথা বলা।
তবে সাজসজ্জা গ্রহণ করতে গিয়ে কুরআন-হাদিসে যেসব বিষয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেসব অবলম্বন করা যাবে না। যেমন উল্কি অঙ্কন, পরচুলা লাগানো, ভ্রু প্লাগ করা। সামনের দাঁত চিকন করা। যারা এসব করে তাদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হয়।
মহান সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, 'যেসব নারী শরীরে উল্কি অঙ্কন করে এবং যারা উল্কি অঙ্কন করায়, যেসব নারী ভ্রু উপড়ে দেয় এবং যারা ভ্রু উপড়াতে চায় এবং যেসব নারী (সৌন্দর্যের জন্য) সম্মুখের দাঁতের মধ্যে ফাঁক তৈরী করে ও যেসব নারী আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধন করে, তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত।'১৯১
টিকাঃ
১৯১ সহিহ বুখারি: ৪৮৮৬।
📄 নিজের প্রতি ও সংসারের প্রতি যত্নবান থাকা
স্বভাবগতভাবেই মানুষ সৌন্দর্যপ্রেমী। তাই পুরুষ তার স্ত্রীর মাঝে সৌন্দর্য খুঁজে বেড়ায়। তাকে সুন্দর ও পরিপাটিরূপে দেখতে চায়। হাদিসে সর্বোত্তম নারীর বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় এসেছে,
‘যে স্ত্রীর দিকে তাকালে স্বামীর মন আনন্দে ভরে যায়।’১৯২
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।’১৯৩
আলি ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নারী সেই, যার ঘ্রাণ উত্তম। স্বাদ উত্তম। যে নারী মিতব্যয়ী। কিন্তু ব্যয়কুণ্ঠ (হার কৃপণ) নয়।’
উমামা বিনতে হারেস তার মেয়ে উম্মে ইয়াসের বিয়ের সময় তাকে উপদেশ প্রদান করে বলেন,
‘স্বামীর চোখে যেন তোমার খারাপ কিছু ধরা না পড়ে। সে যেন তোমার উত্তম ঘ্রাণ লাভ করে।’
নারীদের ব্যক্তিগতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার ও নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
আর একজন নারীর সৌন্দর্য পূর্ণতা লাভের জন্য অবশ্যই তাকে নিজেকে পরিপাটি রাখার পাশাপাশি বাসাও সাজিয়ে গুছিয়ে, পরিপাটি করে রাখতে হবে। তাই তোমাকে বাসা-বাড়িও গুছিয়ে রাখতে হবে। বাসাবাড়ি অগোছালো ও অপরিচ্ছন্ন থাকলে সেটা তোমার সৌন্দর্যকেও ক্ষুন্ন করবে। নিজেকে সুন্দর পরিপাটি করে রাখলেও তোমাকে তখন মনে হবে কোনো বন্য ফুল।
বন্য ফুলের চেয়ে বাগানের ফুল অধিক নজরকাড়া ও মনোমুগ্ধকর হয়ে থাকে।
তুমি যদি বাগানের ফুল হতে চাও, তাহলে সর্বপ্রথম তোমার ঘরটাকে বাগানের মতো করে সাজাতে হবে। মনে রাখবে, বন-জঙ্গল আপনাআপনি গড়ে উঠলেও নিবিড় যত্ন ও পরিচর্যা ছাড়া কোনো বাগান গড়ে উঠে না।
টিকাঃ
১৯২ মুসনাদে আহমাদ।
** সহিহ মুসলিম।
📄 সফল মিলনের সুফল
দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসার বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে সফল মিলনের ভূমিকা অপরিসীম। এর মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনে সৃষ্ট অনেক জটিল ও কঠিন সমস্যা নিমিষেই সমাধান হয়ে যায়। আবার ব্যর্থ ও অতৃপ্ত মিলনের দ্বারা অনেক জটিল ও কঠিন সমস্যা সৃষ্টি হয়।
তাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহিত দম্পতিদের সফল মিলনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ কাজটিকে তিনি দান সদকার মতো পূণ্য কাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি এর বিনিময়ে সওয়াব প্রাপ্তির ঘোষণাও দিয়েছেন।
সফল মিলনে বহুবিধ উপকারিতা নিহিত রয়েছে:
১. পূর্ণরূপে তৃপ্তি লাভ।
২. স্ত্রীর সন্তুষ্টি লাভ।
৩. প্রতিদান লাভ।
৪. ছদকার সওয়াব লাভ।
৫. ঈমানের হেফাজত।
৬. আত্মিক ও দৈহিক প্রশান্তি লাভ।
৭. সন্তান লাভ।
৮. কুচিন্তা থেকে মুক্তি লাভ।
৯. পরিতৃপ্ত নিদ্রা লাভ।
১০. পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাওয়া।
১১. দাম্পত্য বন্ধন সুদৃঢ় হওয়া।
এ ছাড়া আরও অসংখ্য পার্থিব-অপার্থিব উপকার নিহিত রয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা এ এমন এক তৃপ্তি, যার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো তৃপ্তির তুলনা হয় না। বিশেষ করে মিলন যখন সফল মিলন হয়। কারণ, এতে প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৃপ্তি লাভ করে থাকে। চোখ সঙ্গীকে দেখে তৃপ্ত হয়। কান তার কথা শ্রবণ করে। নাক তার ঘ্রাণ নিয়ে। মুখ চুম্বন করে। হাত স্পর্শ করে। এভাবে প্রতিটি অঙ্গই তৃপ্তি লাভ করে।
এ কারনেই পবিত্র কুরআনে নারীকে প্রশান্তি লাভের কারন বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا
'আর তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে হচ্ছে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন; যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে প্রশান্তি লাভ করতে পার। ১৯৪
একটি সফল ও পূর্ণ মিলন স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই এমন আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি দান করে যা মুহূর্তের জন্য হলেও তাদের সকল দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেয়। তারপর এক গভীর ও প্রশান্তিময় নিদ্রা আনয়ন করে।
মিলনের এই তৃপ্তি তারা অনুভব করে দীর্ঘক্ষণ। তাছাড়া এটি পরস্পরকে আরও গভীরভাবে ভালোবাসতে সাহায্য করে।
অনেক সময় মিলনের ব্যর্থতার জন্য নারীকে দায়ী করা হয়। পুরুষও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী থাকে। যেহেতু উইমেন চ্যাপ্টার; তাই নারীদের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি। বিনা কারণে স্বামীর ডাকে সাড়া না দেওয়া, কিংবা স্বামীকে তৃপ্তি লাভে সহযোগিতা না করা ইত্যাদি নানা কারণে নারীকে দায়ী করা হয়ে থাকে।
ইসলাম স্ত্রীর চাহিদা পূরণের বিষয়টিকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছে, তেমনি স্বামীরও। স্ত্রীকে স্বামীর ডাকে সাড়া দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। বিনা কারণে অনিহা প্রকাশ করার মন্দ পরিণতি সম্পর্কে সতর্কও করেছে। এতে স্বামীর গুনাহের পথে পা বাড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'স্বামী যখন স্ত্রীকে নিজ প্রয়োজনে ডাকবে, তখন সে যেন তাতে সাড়া দেয়, যদিও সে চুলার কাছে (রান্নার কাজে) থাকে।'১৯৫
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
'সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ। কোনো পুরুষ যদি তার স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে আর সে আসতে অস্বীকার করে। যে কারণে স্বামী তার প্রতি সারারাত অসন্তুষ্ট থাকে। তাহলে ফেরেশতারা ভোর পর্যন্ত সেই নারীকে অভিসম্পাত দিতে থাকেন।' ১৯৬
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন, 'যে নারী তার স্বামীর শয্যা ছেড়ে রাত্রি যাপন করে, ভোর পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে অভিশম্পাত দিতে থাকে।'১৯৭
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বামীর অনুমতি ব্যতীত কোনো স্ত্রীকে নফল রোজা রাখতেও নিষেধ করেছেন। কারণ, রোজা রাখার সময় শরীর দুর্বল থাকে। দুর্বলতার কারণে মিলনে আগ্রহ কম থাকে। এমতাবস্থায় স্বামী তাকে ডাকলে সে হয়ত সাড়া দিবে না। আগ্রহবোধ করবে না। যদি সাড়া দেয় তাহলে রোজাদার অবস্থায় মিলিত হওয়ার কারণে তার রোজা ভেঙে যাবে। আর নফল রোজা ভাঙলে তা কাযা করা ওয়াজিব হয়ে যায়। তখন অবশ্যই তাকে পরবর্তিতে সেই রোজাটি কাযা করতে হবে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ব্যতীত স্ত্রীর নফল রোজা রাখা জায়েজ নেই। এমনিভাবে স্বামীর অনুমতি ব্যতীত স্ত্রীর ঘর থেকে বের হওয়া জায়েজ নেই।'১৯৮
স্বামী যদি দূরে কোথাও থাকে। যেমন, বিদেশে বা অন্য কোথাও সফরে, তাহলে বিনা অনুমতিতে স্ত্রী নফল রোজা রাখতে পারবে।
এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন, দৈহিক চাহিদা সাধারণত স্ত্রীর তুলনায় পুরুষের বেশি থাকে। কারণ, বিভিন্ন কাজে সে বাহিরে থাকে। বাহিরে প্রলুব্ধ হওয়ার মতো অনেক ফেতনা থাকে। হারাম বিষয় থাকে। সেসব ফেতনা ও হারাম থেকে বাঁচার জন্য সে স্ত্রী গমন করে। এমতাবস্থায় স্ত্রী যদি কোনো শরঈ ওযর ব্যতীত তার ডাকে সাড়া না দেয়, তখন স্বামীর অনেক বড় ফেতনায় নিপতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এভাবে স্ত্রী যদি স্বামীকে অসন্তুষ্ট করে তখন আল্লাহও অসন্তুষ্ট হন। ১৯৯
টিকাঃ
১৯৪ সুরা রূম: ২১।
১৯৫ • জামে তিরমিযি: ১১৬০। সুনানে নাসাঈ : ৮৯৭১।
* সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।
১৯৭ সহিহ বুখারি।
১৯৮ সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।
১৯৯ দেখুন কাইফা তাকসিবিনা কালবা যাওযিকি ও তুরদিনা রাব্বাকি গ্রন্থটি।