📄 নারীর চাকরির বিধান
নারী-পুরুষ উভয়কেই আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন। তারপর অবস্থা ও উপযোগিতা ভেদে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভাগ করে দিয়েছেন। পুরুষকে দিয়েছেন আয়-উপার্জন, নারীর ভরণ-পোষণ, নিরাপত্তা বিধান ও তার যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব। অর্থাৎ নারীর সমস্ত গুরুভার পুরুষের কাঁধে। তার কাজ বাহিরে। পুরুষদের সঙ্গে। সে চাকরি-বাকরি ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশ সফর করবে।
পক্ষান্তরে নারীকে দিয়েছেন মাতৃত্ব ও পরবর্তি প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব। তার কাজ গৃহাভ্যন্তরে। নারীদের সঙ্গে। সে নিজের সতীত্ব রক্ষা করবে। পর্দার সঙ্গে থাকবে। সন্তান লালন-পালন করবে। পরিবারের সার্বিক দিক লক্ষ রাখবে। ঘর-সংসার পরিচালনা করবে। সে তার সন্তানদের আশ্রয়। স্বামীর প্রশান্তি।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
'আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এজন্য যে, পুরুষ তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং সাধ্বী স্ত্রীরা অনুগতা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে তারা (নিজের সতীত্ব, স্বামীর সম্পদ ইত্যাদি) হিফাজত করে।'১৮৫
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নারী-পুরুষের দায়িত্বের বিষয়টি ব্যক্ত করেছেন। এখানে পুরুষকে নারীর ভরণপোষণ ও তার ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যা একটি বহির্মুখী দায়িত্ব। আর নারীকে দেওয়া হয়েছে লোকচক্ষুর অন্তরালে অর্থাৎ পর্দার হালতে থেকে সংসার পরিচালনার দায়িত্ব। যা একটি গৃহমুখী দায়িত্ব।
পুরুষের এই দায়িত্বের কথা হাদিস শরিফেও এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট স্ত্রীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,
'যখন তুমি খাবে তখন তাকেও খাওয়াবে, যখন তুমি বস্ত্র পরিধান করবে তখন তাকেও পরিধান করাবে...।'১৮৬
তাই চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে নারীর ঘর থেকে বের হওয়া উচিত নয়। আর এ কথা তো সুস্পষ্ট যে, একজন নারী যখন চাকরি-বাকরি, অফিস- আদালত নিয়ে ব্যস্ত থাকে তখন তার পক্ষে উপরিউক্ত দায়িত্বগুলো পালন করা সম্ভব হয় না। সেই সঙ্গে তার নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। আর বর্তমান সময়ে তো নারীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি অত্যন্ত প্রকট।
তাছাড়া একজন নারীর সবেচেয়ে বড় পরিচয় তো তার চাকরি-বাকরি নয়। ক্যারিয়ার নয়। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মাতৃত্ব। নিজের দীন, সতীত্ব, সংসার, সন্তান এসব তার কাছে সবচেয়ে বড়। মর্যাদার। তার মর্যাদা তো পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘরের বাইরে যাওয়া নয়। অফিস-আদালতে গিয়ে কাজ করা নয়।
একান্ত কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে ভিন্ন কথা। কিন্তু এটা স্বাভাবিক অবস্থা নয়। নারী যদি অপারগ হয়, তার দেখাশোনা করার মতো কেউ না থাকে, স্বামী উপার্জনে অক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে শরিয়াহ সম্মত পন্থায় অনুকূল পরিবেশে হালাল উপার্জনের যে কোনো পন্থা তার জন্য অবলম্বন করা জায়েজ। যেমন,
'হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী নিজ ঘরে বসে শিল্পকর্ম করতেন এবং তা বিক্রি করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতেন। একদিন তিনি নবিজির দরবারে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করলে তিনি বললেন, এভাবে উপার্জন করে তুমি তোমার সংসারের প্রয়োজন মেটাচ্ছ। এর প্রতিদানে তুমি বিরাট সওয়াব লাভ করবে।'১৮৭
টিকাঃ
১৮৫ সুরা নিসা: ৩৪।
১৮৬ সুনানে নাসাঈ; সুনানে আবু দাউদ: ১৮৩০।
১৮৭ মুসনাদে আহমাদ: ১৬১৩০, ১৬০৮৬।
📄 পর্দা : নারীর মাহরাম ও গায়রে মাহরাম
নামাজ রোজা যেমন ফরজ, তেমনি পর্দাও ফরজ। পার্থক্য হলো, নামাজ রোজার কাযা আছে। কিন্তু পর্দার কোনো কাযা নেই। অতীতে পর্দা না করে থাকলে সেজন্য একনিষ্ঠ মনে আল্লাহর কাছে তওবা-ইস্তেগফার করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। নামাজ না পড়লে, রোজা না রাখলে যেমন মারাত্মক গুনাহ হয়, তেমনি পর্দা না করলেও মারাত্মক গুনাহ হয়। কুরআন শরিফের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নারীদের পর্দার আদেশ দিয়েছেন। এটি তাদের জন্য রক্ষাকবচ।
প্রাপ্তবয়স্কা একজন নারী কার কার সঙ্গে দেখা করতে পারবে সে ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। একজন নারীর যে সমস্ত পুরুষের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ তাদের মাহরাম বলা হয়। আর যাদের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ নেই তাদের গায়রে মাহরাম বলা হয়। নারীর মাহরাম পুরুষ কারা তা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করে দিয়েছেন।
অনেক নারী পর্দা প্রথা মেনে চললেও আত্মীয় মহলে মেনে চলে না। যেমন- দেবর, ভাসুর, স্বামীর চাচা-জ্যাঠা-খালু-ফুপা-মামা। নিজের খালু, ফুপা। অথচ বাইরের মানুষের চেয়ে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ বেশি হয়। এ ক্ষেত্রে পর্দার হুকুম অধিক লঙ্ঘিত হয়। এর চেয়ে ভয়ংকর কথা হলো, এ সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পর্দা না করাকে অনেকে গুনাহ মনে করে না। এদের ইমানহারা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
হযরত উকবা ইবনে আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'তোমরা পরনারী গমন করা থেকে বিরত থাক। একথা শুনে এক আনসারি সাহাবি জিজ্ঞাসা করল, বলল, হে আল্লাহর রাসুল, 'হামউন' সম্পর্কে আপনি কী বলেন? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হামউন' হলো মৃত্যু সমতুল্য। ১১৮৮
আরবি ভাষায় স্বামীপক্ষের আত্মীয় স্বজনকে 'হামউন' বলা হয়। যেমন-দেবর, ভাসুর, স্বামীর চাচা-খালু-মামা। এদের সঙ্গে পর্দা না করাকে মৃত্যু সমতুল্য বলা হয়েছে। তাই এদের ক্ষেত্রে পর্দাপ্রথাকে আরও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। অন্যথায় এর জন্য ভয়াবহ পরিণতির অপেক্ষা করতে হবে।
নারীর মাহরাম কারা, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তা বর্ণনা করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে,
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যারা যৌন কামনা-রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত অন্য কারো নিকট। তারা যেন তাদের গোপন আভরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। ১৮৯
যে সকল পুরুষের সঙ্গে নারীর দেখা করা জায়েজ, তাদের মধ্যে ঊর্ধ্বতন ও নিম্নস্তন সম্পর্কের পুরুষ আছে। যেমন, বাবা, চাচা, দাদা, নানা। এরা ঊর্ধ্বতন সম্পর্কের। আর পুত্র, পৌত্র, ভাগিনা, ভাতিজা এরা হচ্ছে নিম্নস্তন সম্পর্কের। যে সব পুরুষের সঙ্গে নারীর দেখা করা জায়েজ, তারা প্রথমত দু'প্রকার।
১. সার্বক্ষণিক বা চিরস্থায়ী জায়েজ। যেমন, বাবা, চাচা, দাদা, নানা, পুত্র।
২. সাময়িক জায়েজ। যেমন, স্বামীর পিতা অর্থাৎ শ্বশুর, দাদা শ্বশুর, নানা শ্বশুর। স্বামীর সঙ্গে যতদিন বিবাহ বন্ধন থাকবে, ততদিন তাদের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ। কখনো তালাক হয়ে গেলে তাদের সঙ্গে দেখা করা নাজায়েজ। অর্থাৎ বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে যে সব পুরুষের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ হয়, বৈবাহিক সম্পর্ক না থাকলে তাদের সঙ্গে দেখা করা হারাম হয়ে যায়।
আসুন জেনে নেই নারীর মাহরাম পুরুষ কারা। কাদের সঙ্গে তার দেখা করা জায়েজ :
১. স্বামী, স্বামীর অন্য ঘরের পুত্র।
২. স্বামীর বাবা ও দাদা-নানা। অর্থাৎ শ্বশুর, দাদা শ্বশুর, নানা শশুর এবং তদূর্ধ্ব পুরুষগণ।
৩. পিতা।
৪. দাদা-চাচা এবং তদূর্ধ্ব পুরুষগণ।
৫. আপন ও সৎ মামা, নানা ও নানার ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ।
৬. আপন ছেলে ও ছেলের ঘরের পুত্ররা।
৭. আপন মেয়ের জামাই। তবে সৎ মেয়ের জামাই মাহরাম নয়। তার সঙ্গে দেখা করা জায়েজ নেই।
৮. আপন ভাই, সৎ ভাই।
৯. ভাতিজা। অর্থাৎ আপন ভাইয়ের ছেলে ও সৎ ভাইয়ের ছেলে।
১০. ভাগ্নে। অর্থাৎ আপন বোনের ছেলে। সৎ বোনের ছেলে।
১১. নাবালক ছেলে। তবে তাদের সামনে বিশেষ অঙ্গসমূহ ঢেকে রাখতে হবে। যদি এমন নাবালক হয়, সে এসবের কিছুই বুঝে না। নারীর সৌন্দর্য ও আকর্ষণ সম্পর্কে এখনও সে বেখবর তাহলে সমস্যা নেই।
১২. দুধ সম্পর্ক। অর্থাৎ দুধ ভাই ও দুধ ছেলে। এমনিভাবে দুধ ভাই ও দুধ বোনের ছেলে এবং তাদের নিম্নস্তন পুরুষ।
এ ছাড়া দুনিয়ার সমস্ত পুরুষ গায়রে মাহরাম। যত চাচাত, মামাত, খালাত, ফুফাত ভাই আছে, সবাই গায়রে মাহরাম। এককথায়, সমস্ত 'ত' ভাই গায়রে মাহরাম। তাদের সঙ্গে তার দেখা করা জায়েজ নেই। কথা বললেও কোমল কণ্ঠে বলা যাবে না। কিছু আদান-প্রদান করতে হলে পর্দার আড়াল থেকে করতে হবে।
উল্লেখ্য যে, যারা মাহরাম, তাদের সঙ্গে নারীর বিয়ে বৈধ নয়। তবে দেখা দেওয়া জায়েজ। দেখা দেওয়া জায়েজ হলেও তাদের সামনে শালীনভাবে থাকতে হবে। যারা গায়রে মাহরাম তাদের সঙ্গে বিয়ে বৈধ। তবে দেখা দেওয়া জায়েজ নেই। অর্থাৎ যাদের সঙ্গে দেখা দেওয়া জায়েজ, তাদের বিয়ে করা জায়েজ নেই। আর যাদের সঙ্গে দেখা দেওয়া জায়েজ নয়, তাদের বিয়ে করা জায়েজ। আপন দুলাভাই, খালু ও ফুফাও গায়রে মাহরাম। তবে বোন, খালা ও ফুফির জীবদ্দশায় তাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েজ নেই।
টিকাঃ
১৮৮ সহিহ বুখারি: ৫২৩২; সহিহ মুসলিম: ২১৭২।
* মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১৬৬৭১।
* আল মুহিতুল বুরহানি: ৪/১০৬।
📄 গৃহাভ্যন্তরে নারীর সাজসজ্জা গ্রহণ
অনেক নারী আছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সাজসজ্জা ও সৌন্দর্যের বিষয়ে উদাসীন। আবার অনেকে বিয়ের প্রথম দিকে এসব ব্যাপারে সচেতন থাকলেও পরে উদাসীন হয়ে যায়। তারা এই বলে যুক্তি দেখায়, 'এখন কী আর আমাদের সাজগোজ করার বয়স আছে। যৌবন নেই; তাই সাজগোজ করার আগ্রহও নেই।'
এটা মারাত্মক ভুল চিন্তা। এই চিন্তা দাম্পত্য জীবনকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
পুরুষ যখন বাহিরে যায়, তখন রাস্তায় অনেক 'বিউটি কুইনদের' দেখে। সে তখন মনে মনে তাদের সঙ্গে তার স্ত্রীকে তুলনা করে। তারপর বাসায় এসে যখন স্ত্রীকে কাজের বুয়ার বেশে দেখে, তখন তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। সে মনে মনে ভাবে, 'বিয়ে করে মনে হয় ভুল করলাম। রাস্তায় বের হলে দেখি কত সুন্দরী নারী আর আমি এটা কী বিয়ে করেছি!'
আমাদের যাদের ভেতর মোটামুটি আল্লাহর ভয় আছে, তারা এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ শুধু একটু আফসোস করবে। হারামের দিকে পা বাড়াবে না। কিন্তু হারামের দিকে অগ্রসর না হলেও যেটা হবে, স্ত্রীর প্রতি তার আচরণ পরিবর্তন হয়ে যাবে। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সে তখন স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি করবে। তার চাওয়া- পাওয়াগুলোকে তেমন গুরুত্ব দিবে না।
আর হঠাৎ করে স্বামীর আচরণে এমন পরিবর্তন দেখে স্ত্রী বিস্মিত বোধ করবে। কিন্তু সে বুঝতে পারবে না, কারণটা কী। তখন পাল্টা সেও স্বামীর সঙ্গে খারাপ আচরণ শুরু করবে। আর তখনই শয়তান তাদের দুজনকে নিয়ে খেলা শুরু করে দিবে। তারা উভয়ে শয়তানের ক্রীড়নকে পরিণত হবে।
অথচ নিজের প্রতি সামান্য একটু গুরুত্ব দিলে, একটু যত্ন নিলে, নিজেকে একটু গুছিয়ে সুন্দর করে রাখলে তাদেরকে এত বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হত না। তারা সমস্যার হাত থেকে বাঁচতে পারতো।
আর যে সমস্ত পুরুষের ভেতর আল্লাহর ভয় নেই, তারা যে কোন দিকে পা বাড়াবে সেটা আর নাই বললাম। আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন। যাবতীয় পাপ- পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত রাখুন।
ইমাম সুয়তি রহ. বলেন, ফুকাহায়ে কেরাম নারীদেরকে গৃহাভ্যন্তরে পূর্ণ সজ্জা গ্রহণ করার অনেক উপদেশ দিয়েছেন। যেমন, চুল পরিপাটি করে রাখা। পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা। সুগন্ধি ব্যবহার করা। মিষ্টি করে কথা বলা।
তবে সাজসজ্জা গ্রহণ করতে গিয়ে কুরআন-হাদিসে যেসব বিষয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেসব অবলম্বন করা যাবে না। যেমন উল্কি অঙ্কন, পরচুলা লাগানো, ভ্রু প্লাগ করা। সামনের দাঁত চিকন করা। যারা এসব করে তাদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হয়।
মহান সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, 'যেসব নারী শরীরে উল্কি অঙ্কন করে এবং যারা উল্কি অঙ্কন করায়, যেসব নারী ভ্রু উপড়ে দেয় এবং যারা ভ্রু উপড়াতে চায় এবং যেসব নারী (সৌন্দর্যের জন্য) সম্মুখের দাঁতের মধ্যে ফাঁক তৈরী করে ও যেসব নারী আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধন করে, তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত।'১৯১
টিকাঃ
১৯১ সহিহ বুখারি: ৪৮৮৬।
📄 নিজের প্রতি ও সংসারের প্রতি যত্নবান থাকা
স্বভাবগতভাবেই মানুষ সৌন্দর্যপ্রেমী। তাই পুরুষ তার স্ত্রীর মাঝে সৌন্দর্য খুঁজে বেড়ায়। তাকে সুন্দর ও পরিপাটিরূপে দেখতে চায়। হাদিসে সর্বোত্তম নারীর বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় এসেছে,
‘যে স্ত্রীর দিকে তাকালে স্বামীর মন আনন্দে ভরে যায়।’১৯২
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।’১৯৩
আলি ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নারী সেই, যার ঘ্রাণ উত্তম। স্বাদ উত্তম। যে নারী মিতব্যয়ী। কিন্তু ব্যয়কুণ্ঠ (হার কৃপণ) নয়।’
উমামা বিনতে হারেস তার মেয়ে উম্মে ইয়াসের বিয়ের সময় তাকে উপদেশ প্রদান করে বলেন,
‘স্বামীর চোখে যেন তোমার খারাপ কিছু ধরা না পড়ে। সে যেন তোমার উত্তম ঘ্রাণ লাভ করে।’
নারীদের ব্যক্তিগতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার ও নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
আর একজন নারীর সৌন্দর্য পূর্ণতা লাভের জন্য অবশ্যই তাকে নিজেকে পরিপাটি রাখার পাশাপাশি বাসাও সাজিয়ে গুছিয়ে, পরিপাটি করে রাখতে হবে। তাই তোমাকে বাসা-বাড়িও গুছিয়ে রাখতে হবে। বাসাবাড়ি অগোছালো ও অপরিচ্ছন্ন থাকলে সেটা তোমার সৌন্দর্যকেও ক্ষুন্ন করবে। নিজেকে সুন্দর পরিপাটি করে রাখলেও তোমাকে তখন মনে হবে কোনো বন্য ফুল।
বন্য ফুলের চেয়ে বাগানের ফুল অধিক নজরকাড়া ও মনোমুগ্ধকর হয়ে থাকে।
তুমি যদি বাগানের ফুল হতে চাও, তাহলে সর্বপ্রথম তোমার ঘরটাকে বাগানের মতো করে সাজাতে হবে। মনে রাখবে, বন-জঙ্গল আপনাআপনি গড়ে উঠলেও নিবিড় যত্ন ও পরিচর্যা ছাড়া কোনো বাগান গড়ে উঠে না।
টিকাঃ
১৯২ মুসনাদে আহমাদ।
** সহিহ মুসলিম।