📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 এরপর সে আর কোনোদিন চোখ তুলে তাকায়নি

📄 এরপর সে আর কোনোদিন চোখ তুলে তাকায়নি


বিয়ের পর চার বছর হয়ে গেছে। এখনো কোনো সন্তান হয়নি। চারদিকে তাদের নিয়ে ফিসফাস শুরু হয়েছে।
কিন্তু দোষটা কার, এটা তারা দুজনের কেউ জানে না। একদিন তারা দুজন মিলে হাসাপাতালে গেল। ডাক্তার কিছু টেস্ট দিলেন। তারা টেস্টগুলো করালেন। রিপোর্ট আসল। স্বামী রিপোর্ট হাতে নিয়ে দেখল, সমস্যা তার স্ত্রীর, সে সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। কিন্তু সে স্ত্রীকে বিষয়টি বললো না। তাকে বাইরে বসিয়ে রেখে ভেতরে গেলো। তারপর ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞাসা করল, কী অবস্থা ডাক্তার সাহেব?
ডাক্তার সাহেব সমস্ত রিপোর্ট দেখে বললেন, 'আপনার স্ত্রী গর্ভধারণ করতে পারবে না।'
এ কথা শুনে তিনি ঘাবড়ালেন না। আলহামদুলিল্লাহ বললেন। সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা। তারপর তিনি বললেন, ডাক্তার সাহেব, আমি বাইরে গিয়ে আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসছি। তবে আপনি তাকে বলবেন, সমস্যা আমার। তার না। এটা আপনার কাছে আমার অনুরোধ। সে ডাক্তার সাহেবকে খুব করে অনুরোধ করল। ডাক্তার সাহেব তার পীড়াপীড়িতে রাজি হলেন।
সে স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে এলো। ডাক্তার তাকে বললেন, আপনার স্বামী অক্ষম। আল্লাহ যদি না চান তাহলে তার ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
স্ত্রীর সামনে তার চোখে-মুখে কষ্টের ছাপ দেখা গেল। সে বাসায় এল। কয়েকদিন না যেতেই বিষয়টা সবাই জেনে গেল। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, সবাই।
এভাবে অনেক বছর কেটে গেল। তারা দুজনই সবর করে আছেন। স্ত্রী আর সইতে না পেরে একদিন বলেই বসল, দীর্ঘ নয় বছর আমি সহ্য করেছি। আর পারছি না। আমি ডিভোর্স চাই। আমি আবার বিয়ে করে সন্তানের মুখ দেখতে চাই।
তখন স্বামী বলল, এটা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা।
স্ত্রী তাকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিল, আমি সর্বোচ্চ আর একটি বছর দেখব। এর মধ্যে যদি তুমি সুস্থ হতে পার তো আলহামদুলিল্লাহ। অন্যথায়...।
স্বামী বলল, ঠিক আছে। তুমি যা বলবে তাই হবে। সে আল্লাহ তায়ালার রহমতের ব্যাপারে খুব আশাবাদী ছিল।
এদিকে মানুষের চোখে তার স্ত্রী অনেক মহান বনে গেল। সবাই বলতে লাগল, দেখো, স্বামী অক্ষম। তারপরও সে এত বছর সবর করে তার সঙ্গে সংসার করে যাচ্ছে। এমন মহিয়সী নারী আজকাল খুব কম পাওয়া যায়।
এরপর অল্প কদিন না যেতেই স্ত্রীর কিডনীতে সমস্যা দেখা দিল। ধীরে ধীরে তার অবস্থার অবনতি হলো। একপর্যায়ে তার একটি কিডনী ড্যামেজ হয়ে গেল।
তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হল। কয়েকদিন পর তার স্বামী তাকে জানাল যে, সে কিডনীর খোঁজে একটু দেশের বাইরে যাচ্ছে।
বাইরে গিয়ে স্ত্রীকে ফোন দিল যে, সে কিডনীর সন্ধান পেয়েছে। একজন দাতা তার কিডনী দিতে রাজি হয়েছে।
অপারেশনের একদিন আগে কিডনী দাতা এলো।
স্বামী তখন স্ত্রীর কাছে আবার সফরে যাওয়ার অনুমতি চাইল। তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ আছে। সেগুলো শেষ করতে হবে।
তখন স্ত্রী বলল, কাল আমার অপারেশন, আর আজ আপনি আমাকে রেখে চলে যাচ্ছেন? আপনি কি কোনো স্বামী?
অপারেশন সাকসেসফুল হল। কয়েকদিন পর স্বামী ফিরে এলো। তাকে দেখতে কেমন অসুস্থ মনে হচ্ছে। দুর্বল হয়ে পড়েছে। কারণ, সেই তার স্ত্রীকে কিডনী দান করেছে। এর কয়েক মাস পর স্ত্রী তার সেই কাঙ্ক্ষিত সুসংবাদ লাভ করল। সে গর্ভধারণ করল। সবার মাঝে খুশি ছড়িয়ে পড়ল। তার সুস্থ সুন্দর একটি বাচ্চা হল।
একদিন স্বামী তার ডায়েরিটা টেবিলের উপর রেখে বাহিরে গিয়েছিল। ঘর গোছাতে গিয়ে সেটা স্ত্রীর নজরে পড়ল। সে হাতে নিয়ে ডায়েরিটা খুলল। তারপর পড়ে দেখল। তখন সে সব জানতে পারল। সে জানত না, মূলত সমস্যা তার ছিল। সে সন্তান জন্মদানে অক্ষম ছিল। তার স্বামীর আসলে কোনো সমস্যা ছিল না এবং কিডনীও তাকে অন্য কোনো লোক নয়, তার স্বামীই তাকে দান করেছে।
ডায়েরিটা বন্ধ করে সে অনেকক্ষণ কাঁদল। নিজের প্রতি তার ভীষণ লজ্জা হল। এরপর লজ্জায় সে আর কোনোদিন তার স্বামীর দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। ১৮৩

টিকাঃ
* হামাসাতুন ফি উষুনি যাওযাইন।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 যে স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়

📄 যে স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা এমন নারীর দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকান না, যে স্বামীর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও তার কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।'১৮৪
হে নারী, আপনার স্বামী জীবিকা উপার্জনে, আপনাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন, নিরাপত্তা বিধান ও সমস্ত প্রয়োজনাদি পূরণ করতে কত পরিশ্রম করে। রাত-দিন এক করে খাটে।
সুতরাং আপনি তার প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। তার প্রতি কৃতজ্ঞতার আচরণ করুন।
এই প্রসঙ্গে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। একবার তিনি তার পুত্র ইসমাঈলকে দেখতে গেলেন। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে ইসমাঈলকে পেলেন না। শুধু তার স্ত্রীকে পেলেন। তিনি তাকে স্বামীর সঙ্গে তার অবস্থাদির কথা জিজ্ঞাসা করলেন। তখন সে বলল, অবস্থা ভালো না। এতে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বুঝে ফেললেন যে, তার এই পুত্রবধু তার পুত্রের সঙ্গে সংসার করে সন্তুষ্ট নয়। তখন তিনি তাকে বললেন, ইসমাঈল এলে তাকে আমার সালাম বলবে। আর বলবে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠটা পাল্টে নেয়। তারপর যখন তিনি এলেন, তখন তার স্ত্রী তাকে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন, সেই বৃদ্ধ লোক আমার পিতা। আর তুমি হচ্ছ দরজার চৌকাঠ। তুমি তোমার নিজ পরিবারে চলে যাও।
আর হাদিসেও নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে মানুষের শুকরিয়া আদায় করে না, সে আল্লাহর নেয়ামতেরও শুকরিয়া আদায় করে না।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। ভালোবাসার বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে। পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞতা পারস্পরিক ঘৃণা সৃষ্টি করে এবং ভালোবাসার বন্ধনকে ছিন্ন করে দেয়।
নারীদের উচিত কৃতজ্ঞ হওয়া। সন্তুষ্ট থাকা। স্বামীর সামান্য অসদাচরণ কিংবা ভুলের কারণে তার এতদিনের অনুগ্রহ ও সদাচারের কথা ভুলে না যাওয়া। তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তার মনে কষ্ট না দেওয়া। এতে আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হন। আর একজন মুমিন নারী তো স্বামীর অসন্তুষ্টির চেয়ে আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টিকে বেশি ভয় করবে এবং তা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে।
সবসময় অভিযোগ অনুযোগ করতে থাকা দাম্পত্য জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বোধকে নষ্ট করে দেয়। সংসার নামক স্বর্গোদ্যানকে নরকে পরিণত করে। পুরুষ তখন এই নরক ছেড়ে পালিয়ে বাঁচতে চায়। এভাবে একসময় শয়তান তাদের মাঝে বিচ্ছেদের দেয়াল তুলে দুজনকে পৃথক করে দেয়।

টিকাঃ
১৮৪ সহিহ আত-তারগিব।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 নারীর চাকরির বিধান

📄 নারীর চাকরির বিধান


নারী-পুরুষ উভয়কেই আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন। তারপর অবস্থা ও উপযোগিতা ভেদে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভাগ করে দিয়েছেন। পুরুষকে দিয়েছেন আয়-উপার্জন, নারীর ভরণ-পোষণ, নিরাপত্তা বিধান ও তার যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব। অর্থাৎ নারীর সমস্ত গুরুভার পুরুষের কাঁধে। তার কাজ বাহিরে। পুরুষদের সঙ্গে। সে চাকরি-বাকরি ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশ সফর করবে।
পক্ষান্তরে নারীকে দিয়েছেন মাতৃত্ব ও পরবর্তি প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব। তার কাজ গৃহাভ্যন্তরে। নারীদের সঙ্গে। সে নিজের সতীত্ব রক্ষা করবে। পর্দার সঙ্গে থাকবে। সন্তান লালন-পালন করবে। পরিবারের সার্বিক দিক লক্ষ রাখবে। ঘর-সংসার পরিচালনা করবে। সে তার সন্তানদের আশ্রয়। স্বামীর প্রশান্তি।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
'আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এজন্য যে, পুরুষ তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং সাধ্বী স্ত্রীরা অনুগতা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে তারা (নিজের সতীত্ব, স্বামীর সম্পদ ইত্যাদি) হিফাজত করে।'১৮৫
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নারী-পুরুষের দায়িত্বের বিষয়টি ব্যক্ত করেছেন। এখানে পুরুষকে নারীর ভরণপোষণ ও তার ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যা একটি বহির্মুখী দায়িত্ব। আর নারীকে দেওয়া হয়েছে লোকচক্ষুর অন্তরালে অর্থাৎ পর্দার হালতে থেকে সংসার পরিচালনার দায়িত্ব। যা একটি গৃহমুখী দায়িত্ব।
পুরুষের এই দায়িত্বের কথা হাদিস শরিফেও এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট স্ত্রীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,
'যখন তুমি খাবে তখন তাকেও খাওয়াবে, যখন তুমি বস্ত্র পরিধান করবে তখন তাকেও পরিধান করাবে...।'১৮৬
তাই চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে নারীর ঘর থেকে বের হওয়া উচিত নয়। আর এ কথা তো সুস্পষ্ট যে, একজন নারী যখন চাকরি-বাকরি, অফিস- আদালত নিয়ে ব্যস্ত থাকে তখন তার পক্ষে উপরিউক্ত দায়িত্বগুলো পালন করা সম্ভব হয় না। সেই সঙ্গে তার নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। আর বর্তমান সময়ে তো নারীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি অত্যন্ত প্রকট।
তাছাড়া একজন নারীর সবেচেয়ে বড় পরিচয় তো তার চাকরি-বাকরি নয়। ক্যারিয়ার নয়। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মাতৃত্ব। নিজের দীন, সতীত্ব, সংসার, সন্তান এসব তার কাছে সবচেয়ে বড়। মর্যাদার। তার মর্যাদা তো পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘরের বাইরে যাওয়া নয়। অফিস-আদালতে গিয়ে কাজ করা নয়।
একান্ত কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে ভিন্ন কথা। কিন্তু এটা স্বাভাবিক অবস্থা নয়। নারী যদি অপারগ হয়, তার দেখাশোনা করার মতো কেউ না থাকে, স্বামী উপার্জনে অক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে শরিয়াহ সম্মত পন্থায় অনুকূল পরিবেশে হালাল উপার্জনের যে কোনো পন্থা তার জন্য অবলম্বন করা জায়েজ। যেমন,
'হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী নিজ ঘরে বসে শিল্পকর্ম করতেন এবং তা বিক্রি করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতেন। একদিন তিনি নবিজির দরবারে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করলে তিনি বললেন, এভাবে উপার্জন করে তুমি তোমার সংসারের প্রয়োজন মেটাচ্ছ। এর প্রতিদানে তুমি বিরাট সওয়াব লাভ করবে।'১৮৭

টিকাঃ
১৮৫ সুরা নিসা: ৩৪।
১৮৬ সুনানে নাসাঈ; সুনানে আবু দাউদ: ১৮৩০।
১৮৭ মুসনাদে আহমাদ: ১৬১৩০, ১৬০৮৬।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 পর্দা : নারীর মাহরাম ও গায়রে মাহরাম

📄 পর্দা : নারীর মাহরাম ও গায়রে মাহরাম


নামাজ রোজা যেমন ফরজ, তেমনি পর্দাও ফরজ। পার্থক্য হলো, নামাজ রোজার কাযা আছে। কিন্তু পর্দার কোনো কাযা নেই। অতীতে পর্দা না করে থাকলে সেজন্য একনিষ্ঠ মনে আল্লাহর কাছে তওবা-ইস্তেগফার করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। নামাজ না পড়লে, রোজা না রাখলে যেমন মারাত্মক গুনাহ হয়, তেমনি পর্দা না করলেও মারাত্মক গুনাহ হয়। কুরআন শরিফের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নারীদের পর্দার আদেশ দিয়েছেন। এটি তাদের জন্য রক্ষাকবচ।
প্রাপ্তবয়স্কা একজন নারী কার কার সঙ্গে দেখা করতে পারবে সে ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। একজন নারীর যে সমস্ত পুরুষের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ তাদের মাহরাম বলা হয়। আর যাদের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ নেই তাদের গায়রে মাহরাম বলা হয়। নারীর মাহরাম পুরুষ কারা তা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করে দিয়েছেন।
অনেক নারী পর্দা প্রথা মেনে চললেও আত্মীয় মহলে মেনে চলে না। যেমন- দেবর, ভাসুর, স্বামীর চাচা-জ্যাঠা-খালু-ফুপা-মামা। নিজের খালু, ফুপা। অথচ বাইরের মানুষের চেয়ে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ বেশি হয়। এ ক্ষেত্রে পর্দার হুকুম অধিক লঙ্ঘিত হয়। এর চেয়ে ভয়ংকর কথা হলো, এ সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পর্দা না করাকে অনেকে গুনাহ মনে করে না। এদের ইমানহারা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
হযরত উকবা ইবনে আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'তোমরা পরনারী গমন করা থেকে বিরত থাক। একথা শুনে এক আনসারি সাহাবি জিজ্ঞাসা করল, বলল, হে আল্লাহর রাসুল, 'হামউন' সম্পর্কে আপনি কী বলেন? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হামউন' হলো মৃত্যু সমতুল্য। ১১৮৮
আরবি ভাষায় স্বামীপক্ষের আত্মীয় স্বজনকে 'হামউন' বলা হয়। যেমন-দেবর, ভাসুর, স্বামীর চাচা-খালু-মামা। এদের সঙ্গে পর্দা না করাকে মৃত্যু সমতুল্য বলা হয়েছে। তাই এদের ক্ষেত্রে পর্দাপ্রথাকে আরও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। অন্যথায় এর জন্য ভয়াবহ পরিণতির অপেক্ষা করতে হবে।
নারীর মাহরাম কারা, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তা বর্ণনা করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে,
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যারা যৌন কামনা-রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত অন্য কারো নিকট। তারা যেন তাদের গোপন আভরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। ১৮৯
যে সকল পুরুষের সঙ্গে নারীর দেখা করা জায়েজ, তাদের মধ্যে ঊর্ধ্বতন ও নিম্নস্তন সম্পর্কের পুরুষ আছে। যেমন, বাবা, চাচা, দাদা, নানা। এরা ঊর্ধ্বতন সম্পর্কের। আর পুত্র, পৌত্র, ভাগিনা, ভাতিজা এরা হচ্ছে নিম্নস্তন সম্পর্কের। যে সব পুরুষের সঙ্গে নারীর দেখা করা জায়েজ, তারা প্রথমত দু'প্রকার।
১. সার্বক্ষণিক বা চিরস্থায়ী জায়েজ। যেমন, বাবা, চাচা, দাদা, নানা, পুত্র।
২. সাময়িক জায়েজ। যেমন, স্বামীর পিতা অর্থাৎ শ্বশুর, দাদা শ্বশুর, নানা শ্বশুর। স্বামীর সঙ্গে যতদিন বিবাহ বন্ধন থাকবে, ততদিন তাদের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ। কখনো তালাক হয়ে গেলে তাদের সঙ্গে দেখা করা নাজায়েজ। অর্থাৎ বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে যে সব পুরুষের সঙ্গে দেখা করা জায়েজ হয়, বৈবাহিক সম্পর্ক না থাকলে তাদের সঙ্গে দেখা করা হারাম হয়ে যায়।
আসুন জেনে নেই নারীর মাহরাম পুরুষ কারা। কাদের সঙ্গে তার দেখা করা জায়েজ :
১. স্বামী, স্বামীর অন্য ঘরের পুত্র।
২. স্বামীর বাবা ও দাদা-নানা। অর্থাৎ শ্বশুর, দাদা শ্বশুর, নানা শশুর এবং তদূর্ধ্ব পুরুষগণ।
৩. পিতা।
৪. দাদা-চাচা এবং তদূর্ধ্ব পুরুষগণ।
৫. আপন ও সৎ মামা, নানা ও নানার ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ।
৬. আপন ছেলে ও ছেলের ঘরের পুত্ররা।
৭. আপন মেয়ের জামাই। তবে সৎ মেয়ের জামাই মাহরাম নয়। তার সঙ্গে দেখা করা জায়েজ নেই।
৮. আপন ভাই, সৎ ভাই।
৯. ভাতিজা। অর্থাৎ আপন ভাইয়ের ছেলে ও সৎ ভাইয়ের ছেলে।
১০. ভাগ্নে। অর্থাৎ আপন বোনের ছেলে। সৎ বোনের ছেলে।
১১. নাবালক ছেলে। তবে তাদের সামনে বিশেষ অঙ্গসমূহ ঢেকে রাখতে হবে। যদি এমন নাবালক হয়, সে এসবের কিছুই বুঝে না। নারীর সৌন্দর্য ও আকর্ষণ সম্পর্কে এখনও সে বেখবর তাহলে সমস্যা নেই।
১২. দুধ সম্পর্ক। অর্থাৎ দুধ ভাই ও দুধ ছেলে। এমনিভাবে দুধ ভাই ও দুধ বোনের ছেলে এবং তাদের নিম্নস্তন পুরুষ।
এ ছাড়া দুনিয়ার সমস্ত পুরুষ গায়রে মাহরাম। যত চাচাত, মামাত, খালাত, ফুফাত ভাই আছে, সবাই গায়রে মাহরাম। এককথায়, সমস্ত 'ত' ভাই গায়রে মাহরাম। তাদের সঙ্গে তার দেখা করা জায়েজ নেই। কথা বললেও কোমল কণ্ঠে বলা যাবে না। কিছু আদান-প্রদান করতে হলে পর্দার আড়াল থেকে করতে হবে।
উল্লেখ্য যে, যারা মাহরাম, তাদের সঙ্গে নারীর বিয়ে বৈধ নয়। তবে দেখা দেওয়া জায়েজ। দেখা দেওয়া জায়েজ হলেও তাদের সামনে শালীনভাবে থাকতে হবে। যারা গায়রে মাহরাম তাদের সঙ্গে বিয়ে বৈধ। তবে দেখা দেওয়া জায়েজ নেই। অর্থাৎ যাদের সঙ্গে দেখা দেওয়া জায়েজ, তাদের বিয়ে করা জায়েজ নেই। আর যাদের সঙ্গে দেখা দেওয়া জায়েজ নয়, তাদের বিয়ে করা জায়েজ। আপন দুলাভাই, খালু ও ফুফাও গায়রে মাহরাম। তবে বোন, খালা ও ফুফির জীবদ্দশায় তাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েজ নেই।

টিকাঃ
১৮৮ সহিহ বুখারি: ৫২৩২; সহিহ মুসলিম: ২১৭২।
* মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১৬৬৭১।
* আল মুহিতুল বুরহানি: ৪/১০৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00