📄 দীনের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা নাকি নমনীয়তা
দেখা যায় অনেক নারী বিয়ের আগে হয়ত ধর্মীয় কোনো অনুশাসন মেনে চলত। কিন্তু বিয়ের পর স্বামী তা পছন্দ না করায় সে তা ছেড়ে দেয়।
যেমন, কোনো নারী বিয়ের আগে পর্দা করত। কিন্তু বিয়ের পর স্বামী পর্দা করা পছন্দ করে না বিধায় সে তা ছেড়ে দেয়।
আবার অনেক নারীকে পুরুষদের সঙ্গে মিশতে হয়, স্বামীর বন্ধু-বান্ধব, অফিসের কলিগরা বাসায় এলে তাদের সামনে যেতে হয়, তাদের সঙ্গে দেখা করতে হয়, হাসি-মুখে কথা বলতে হয়। খাবার-পানীয় পরিবেশন করতে হয়। কারণ, তার স্বামী চায়। তার কাছে এগুলো আধুনিকতা। কালচারের অংশ।
এভাবে সেই নারী ধীরে ধীরে দীন থেকে দূরে সরে যায়। আল্লাহর ইবাদত ও তার আনুগত্য বর্জন করে পাপ ও গুনাহর কাজে কাজে জড়িয়ে যায়।
অনেক নারী এটাকে কোনো সমস্যাই মনে করে না। তার কাছে তার প্রভুর সন্তুষ্টির চেয়ে স্বামীর সন্তুষ্টি বড়। স্বামীর খুশির জন্য আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করতেও তার কোনো পরোয়া নেই। তার আজাব ডেকে আনতেও তার ভয় নেই।
আমাদের মাঝে কি আল্লাহর এমন কোনো প্রিয় বান্দি নেই, গুনাহর কাজ করতে বললে যে তার স্বামীকে রাসুলের নিম্নোক্ত হাদিসটি শুনিয়ে দিবে,
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوْقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ.
'স্রষ্টার নাফরমানির বিষয়ে সৃষ্টির কোনো আনুগত্য নেই।'১৭৭
কিংবা সে তার স্বামীকে বলবে, আপনি খুব মর্যাদাবান, কিন্তু আমার কাছে আমার দীন ও আমার রবের আনুগত্য আরও বেশি মর্যাদাবান।
আল্লাহ হুকুম অমান্য করতে বলায় এক নারী তার স্বামীকে কীভাবে লজ্জা দিচ্ছে দেখুন, 'আপনার কি মনে পড়ে, আমরা যখন বাইরে বেড়াতে গিয়েছিলাম, তখন আপনি আমাকে পর্দা করতে নিষেধ করেছিলেন? হিজাব খুলে ফেলতে
বলেছিলেন? কিংবা আপনার কি মনে পড়ে, আপনি আমাকে চেকাপ করাতে মহিলা ডাক্তারের পরিবর্তে পুরুষ ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন?'
আপনার স্বামীর মাঝে যদি নাটক, মুভি, সিরিয়াল ইত্যাদি দেখার বদঅভ্যাস থাকে; তাহলে আপনি চাইলেই তাকে তা থেকে ফেরাতে পারেন। এটা কোনো ব্যাপারই না। আপনাকে মনে রাখতে হবে, পুরুষ মাত্রই নারীর প্রতি অনুরুক্ত থাকে। নারী যা চায় তা-ই হয়। তাই একটু চেষ্টা করলেই আপনি তাকে বদলে দিতে পারেন। আপনার আত্মার আলোয় তাকেও আলোকিত করতে পারেন।
আপনি কি চান আপনার স্বামীর জীবনের ডায়েরি পাপ-পঙ্কিলতায় ভরা থাকুক? কেয়ামতের দিন আপনি জান্নাতে চলে যান আর আপনার স্বামী জাহান্নামের আগুনে জ্বলুক?
• অনেক পুরুষ আছে, বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার সময় ঠিকই জিজ্ঞাসা করে মেয়ে পর্দা করে কি না। কিন্তু বিয়ের পর তাকে পর্দা করতে দেয় না। কিংবা সে পর্দা না করলেও তাকে কিছু বলে না।
মনে রাখতে হবে, পর্দা একটি ফরজ বিধান। স্বামী স্ত্রীকে পর্দা করতে নিষেধ করলেও স্ত্রীর তা পালন করা আবশ্যক।
আপনার স্বামী আপনাকে যদি পর্দা করতে নিষেধ করে, তাহলে আপনি প্রথমেই তার সঙ্গে ঝগড়ায় জড়াবেন না। তবে তার নির্দেশ মানবেনও না। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
দ্বিতীয়তঃ আপনাকে সবর করতে হবে। আপনি সবর করুন।
তৃতীয়তঃ তাকে পর্দার সুফল ও পর্দা না করার কুফল সম্পর্কে অবিহত করুন।
চতুর্থতঃ পবিত্র কুরআন-হাদিসে পর্দার ফযিলত ও পর্দা না করার গুনাহ সংক্রান্ত যেসব কথা বর্ণিত হয়েছে, আপনি তাকে সেগুলো শোনান। পড়তে দিন। বিজ্ঞ কোনো আলেমের সঙ্গে তার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করুন।
পঞ্চম যে কাজটি আপনাকে করতে হবে, আল্লাহর কাছে তার হেদায়াতের জন্য দুআ করতে থাকুন।
আর স্বামীর জন্য কোনোভাবেই জায়েজ নেই, স্ত্রী যদি তার গুনাহর কাজের নির্দেশ না মানে, তাহলে তাকে তালাকের হুমকি দেওয়া।
টিকাঃ
১৭৭ মুসনাদে আহমাদ।
📄 মজার মজার খাবার রান্না করা
ক্ষুধা মানুষের দেহে একধরনের বিশৃঙ্খলা ও সমস্যা সৃষ্টি করে। এ সময় মানুষ সুস্থিরভাবে কোনো কিছু চিন্তা করতে পারে না। তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে।
এমন সময় যদি সে পছন্দের কোনো খাবার খেতে পায়, তখন সে খুবই খুশি ও আনন্দিত হয়। তার অন্তরে খাবার প্রস্তুতকারীর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।
উসামা বিনতে হারেস তার মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সময় উপদেশ প্রদান করতে গিয়ে বলেন,
'স্বামীর ঘুম ও খাবারের সময়ের ব্যাপারে সচেতন থাকো। কারণ ক্ষুধা মানুষকে উত্তেজিত করে। আর ঘুমের স্বল্পতা তাকে ক্রুদ্ধ করে তোলে।'
যে নারী স্বামীর খাওয়ার সময়ের প্রতি লক্ষ রাখে, তার জন্য মজাদার ও সুস্বাদু খাবার তৈরি করে, সে খুব সহজেই তার মন জয় করে ফেলে।
তবে আমার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, নারীরা খাবার তৈরি করতে অনেক দীর্ঘ সময় নষ্ট করবে। যার ফলে ঘরের অন্যান্য কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে। বরং অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সে স্বামীর জন্য সুস্বাদু খাবার তৈরি করবে।
তারপর স্বামী যখন ক্ষুধা নিয়ে বাসায় ফিরবে। আর এসে দেখবে তার পছন্দের খাবার রেডি। বাসার সবকিছু সাজানো-গোছানো। আর এদিকে স্ত্রীও তার অপেক্ষায় ছিল, সে আসলে একসঙ্গে খেতে বসবে। এমন প্রীতি ও ভালোবাসাপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশে আল্লাহ তায়ালা বরকত দান করেন। এমন ঈমানি পরিবেশকে আল্লাহ তায়ালা খুব পছন্দ করেন।
📄 স্বামীর আনুগত্য দাসবৃত্তি নয়, বরং সুখী দাম্পত্যের মূল ভিত
এক মহিলা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল,
'আমি নারীদের প্রতিনিধি হিসেবে আপনার কাছে এসেছি। আল্লাহ তায়ালা পুরুষের উপর জিহাদ ফরজ করেছেন। তারা যদি (যুদ্ধ করতে গিয়ে) আঘাত পায়, তাহলে সওয়াব লাভ করে। আর শহিদ হলে তারা আল্লাহর কাছে জীবিত থেকে রিজিক লাভ করতে থাকে। আমরা নারী সম্প্রদায়। তাদের সব কাজ করি। এসব কাজের কী প্রতিদান রয়েছে আমাদের জন্য? তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে সকল নারীদের সঙ্গে তোমার দেখা হবে তুমি তাদের 'লে দিও যে, স্বামীর আনুগত্য করা ও তার হক স্বীকার করে নেওয়া সেই আমলের সমান। আর তোমাদের মধ্যে খুব কম নারীই তা করে থাকে।'
এই হাদিসে স্বামীর আনুগত্যকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মতো মহান ইবাদতের সমকক্ষ বলা হয়েছে। অর্থাৎ যে নারী স্বামীর আনুগত্য করে এবং তার হক মেনে নেয়, সে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী মুজাহিদের সমান প্রতিদান লাভ করে। কিন্তু অধিকাংশ নারীই এ ফযিলতের কথা জানে না। জানলেও আমল করে না। কিংবা আংশিক আমল করে। অথচ স্বামীর আনুগত্যের দ্বারা একজন নারীর জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'কোনো নারী যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজানের রোজা রাখে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, স্বামীর আনুগত্য করে, তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।'১৭৮
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কোন নারী উত্তম? তিনি বললেন,
'যে নারীর দিকে তাকালে স্বামী আনন্দ লাভ করে। স্বামী কোনো আদেশ করলে তা মান্য করে এবং নিজের বিষয়ে ও স্বামীর সম্পদের ক্ষেত্রে তার অপছন্দনীয় কিছু করে না।'১৭৯
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'আমি যদি কাউকে সেজদা করার জন্য নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে তার স্বামীকে সেজদা করার নির্দেশ দিতাম। ১৮০
আমাদের সমাজের পরিবারগুলোর দিকে লক্ষ করলে দেখতে পাই, অধিকাংশ পারিবারিক সমস্যা স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর অবাধ্যতার কারণে হয়ে থাকে। অথচ একজন মুমিন নারী শরিয়ত নির্দেশিত পন্থায় স্বামীর আনুগত্য করলে শুধু ইহজীবনে নয়, পরকালিন জীবনেও সুখী হতে পারে। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্বামীর আনুগত্যকে মুমিন নারীদের সিফাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন,
فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ
'সুতরাং সাধ্বী স্ত্রীরা অনুগতা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে তারা আল্লাহ যা সংরক্ষিত করেছেন (অর্থাৎ স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সতীত্ব, স্বামীর সম্পদ ও তার যাবতীয় হক) তা হিফাজত করে। ১৮১
টিকাঃ
* সহিহ হাদিস, মুসনাদে বাযযার।
১৭৮ মুসনাদে আহমাদ।
১৭৯ সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা : ৩৪৯০।
১৮০ সুরা নিসা: ৩৪।
📄 নেতিবাচক অনুভূতিগুলো কীভাবে প্রকাশ করবেন?
রাগের মাথায় আপনি আপনার স্বামীকে কিছু বলতে যাবেন না। আপনি সময় নিন। শান্ত ও স্থির হোন। তারপর বলুন। শান্ত ও স্থির হতে যদি আপনার দীর্ঘ সময় লেগে যায়, সমস্যা নেই।
যা বলার সুস্পষ্ট ভাষায় অল্প কথায় বলুন। বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বলুন।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করুন। তিরস্কার কিংবা ভর্ৎসনা করার সময় সরাসরি সম্বোধন করা থেকে বিরত থাকুন। যেমন, 'তুমি এটা করেছো। তোমার কারণে এমন হয়েছে। তুমিই তো বলেছো।'
এভাবে সরাসরি সম্বোধন করবেন না। কারণ, এতে পুরুষ উত্তেজিত হয়। সে অপমান বোধ করে। সে মনে করে, তাকে দোষারোপ করা হচ্ছে। তখন সে পাল্টা জবাব দেওয়া শুরু করে।
যেমন ধরুন, কোনোদিন আপনার স্বামীর বাসায় ফিরতে দেরি হলো। তখন আপনি তাকে 'তুমি কেন দেরি করলে' এভাবে না বলে বলুন, 'তোমার আসতে দেরি হওয়ায় আমি সেই কখন থেকে টেনশন করছি। তোমার কখনো দেরি হলে তুমি যদি একটা কল বা টেক্সট করে আমাকে জানিয়ে দাও...।'
• নিজেদের কোনো সমস্যা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করবেন না। এতে কিছুতেই সমস্যার সমাধান হবে না।
• সবসময় নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিরত থাকুন। যেমন, আপনি নিপীড়িত, এই সংসারে আপনি সুখী নন, আপনার কপাল মন্দ। বরং পজিটিভ চিন্তা করুন। আল্লাহ আপনাকে যেসব নেয়ামতের মধ্যে রেখেছেন, সেগুলোর শুকরিয়া আদায় করুন।
• সংসারের যে কোনো সমস্যা নিয়ে আপনি সরাসরি আপনার স্বামীর সঙ্গে কথা বলুন। অন্য কারও সঙ্গে নয়। এমনকি আপনার পিত্রালয়ের কারও সঙ্গে কিংবা বান্ধবীদের সঙ্গেও নয়।
• নিরবে কষ্ট সহ্য না করে তা দূর করার চেষ্টা করুন। এমন কিছু করুন যা আপনার বিষাদে ভরা জীবনকে আনন্দময় করে তুলবে।
• সবসময় মনে রাখবেন আপনার স্বামী কোনো ফেরেশতা না। সে একজন সাধারণ মানুষ। ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তার মাঝে পূর্ণতা খুঁজতে যাবেন না।
এক মহিলা ছিল, যখনই সে স্বামীর সঙ্গে বের হতো, তাদের পাশ দিয়ে কোনো যুবতী নারী যাওয়ার সময় সে তার স্বামীকে তার দিকে তাকাতে নিষেধ করত। অথচ তার স্বামী একজন দীনদার চরিত্রবান মানুষ ছিলেন।
আত্মমর্যাদাবোধ ভালো। তবে এতটা নয়। এটা দাম্পত্য জীবনের জন্য কবরস্বরূপ।
দুনিয়াবিমুখ এক বুজুর্গ ছিল, তার স্ত্রী একদিন তাকে জিজ্ঞাসা করল, রাস্তায় কয়জন নারীকে দেখেছেন?
বুজুর্গ বললেন, আল্লাহর কসম, আমি শুধু আমার পায়ের দিকে তাকিয়েছিলাম।
দেখুন, স্বামী বুজুর্গ হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রী তাকে এই প্রশ্ন করছে।
পরিশেষে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই বলছি, আল্লাহকে ভয় করুন।
এক আল্লাহর ওলি বলেন,
'মনের চিন্তা-ভাবনার ব্যাপারে যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তাকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভুল থেকে রক্ষা করেন।'
সুবহানাল্লাহ! বড় দামি কথা!
টিকাঃ
* হামাসাতুন ফি উয়ুনি যাওযাইন।