📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 পাত্র নির্বাচন

📄 পাত্র নির্বাচন


দাম্পত্য জীবনের সফলতা সঠিক ও যথার্থ সঙ্গি নির্বাচনের উপর নির্ভরশীল। একটি মেয়ে যখন বিয়ের বয়সে উপনীত হয়, তখন তার অভিভাবকদের মনে একটা চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে, আমার মেয়ের জন্য কেমন পাত্র খুঁজবো? তার জীবনসঙ্গি কেমন হবে? যারা প্রস্তাব নিয়ে এসেছে তাদের মধ্য থেকে কীভাবে বাছাই করব? সবার মধ্যে তো সবদিক পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ ধনী হলে শিক্ষিত হয় না। শিক্ষিত হলে বংশীয় হয় না। বংশীয় হলে সুদর্শন হয় না। আরও অনেক সমস্যা।
বিষয়টি তাদের কাছে অনেক কঠিন মনে হয়। তারা চিন্তায় পড়ে যান। তাদের একেকজনের কাছে সু-পাত্রের সংজ্ঞা একেকরকম। কেউ লোভ-লালসাকে ও প্রাচুর্যকে গুরুত্ব দিয়ে সু-পাত্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। আর কেউ পারিবারিক ও সামাজিক রীতি-নীতিকে গুরুত্ব দিয়ে।
কিন্তু পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলামের দিক নির্দেশনা কী, ইসলাম কী কী বিষয় দেখে পাত্র নির্বাচন করতে বলেছে, কোন কোন বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছে, সে ব্যাপারে আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞ। যারা জানেন তাদের অনেকে আবার মানতে চান না। কেউ বা মানলেও আংশিক।
অনেকদিন দীনদার ফ্যামিলিও পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলেন না। সমাজ ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের দ্বারা তারা প্রভাবিত থাকেন। পরিবার ও সমাজের বিভিন্ন রীতি-নীতির শেকলে বন্দি থাকেন। সেই প্রভাব থেকে তারা বের হতে পারেন না। সেই শেকল তারা ভাঙতে পারেন না।
এভাবে আমরা সূচনাতেই মারাত্মক ভুল করে ফেলি। কন্যার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সুখ-শান্তিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে চিরস্থায়ী জীবনের সুখ-শান্তিকে বরবাদ করি।
এমন একটি পবিত্র ও মধুময় জীবন, হাদিসে পাকে যাকে অর্ধেক দীন বলা হয়েছে, তার সূচনাতেই যদি ভুল থাকে, দীন না থাকে, নবিজির সুন্নতের অনুসরণ না থাকে, তাহলে সে জীবনে আমরা কি করে বরকত লাভের আশা করতে পারি?
ইসলাম শুধু ধর্ম নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ইসলামের রয়েছে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা।
পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা যদি ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলি, রাসুলের সুন্নতের অনুসরণ করি, তাহলে কন্যার জীবন হবে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধপূর্ণ। রহমত ও বরকতপূর্ণ।
পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম দিকনির্দেশনাগুলোকে হচ্ছে:
১. মুসলমান হওয়া
পাত্র-পাত্রী উভয়কে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدُ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ
'আর তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। অবশ্যই একজন মুমিন দাসি একজন মুশরিক নারীর চেয়ে উত্তম। যদিও মুশরিক নারী তোমাদেরকে মুগ্ধ করে না কেন। আর তোমরা মুশরিক পুরুষদেরকে তারা ঈমান না আনা পর্যন্ত বিয়ে করোনা। অবশ্যই একজন মুমিন ক্রীতদাস একজন মুশরিকের চেয়ে উত্তম। যদিও মুশরিক পুরুষ তোমাদেরকে মুগ্ধ করে না কেন। তারা জাহান্নামের দিকে ডাকে আর আল্লাহ তোমাদেরকে আপন অনুগ্রহে জান্নাত ও মাগফিরাতের দিকে ডাকেন।' ১৫৫
একজন মুসলমান নারীর জন্য মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীকে বিয়ে করা হারাম। ইসলামে এটাকে মুসলমান নারীর মর্যাদার পরিপন্থী হিসেবে দেখে।
ইসলাম কোনো মুসলমান পুরুষকে খ্রিষ্টান কিংবা ইহুদি (অর্থাৎ যারা আহলে কিতাব) নারীকে বিবাহের অনুমতি দিলেও কোনো খ্রিষ্টান কিংবা ইহুদি পুরুষকে মুসলমান নারী বিয়ে করার অনুমতি প্রদান করেনা।
এর কারণ, মুসলমানগণ খ্রিষ্টানদের নবি হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এবং ইহুদিদের নবি হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে নবি হিসেবে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করলেও তারা আমাদের নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবি হিসেবে বিশ্বাস করে না।
তাই তাদের কেউ কোনো মুসলমান নারীকে বিয়ে করলে প্রবল আশঙ্কা রয়েছে যে, সে তার ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করবে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে বেয়াদবি করবে।
যেহেতু সকল ধর্মেই পুরুষকে সংসারের কর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাই অমুসলিম পুরুষ কোনা মুসলিম নারীকে বিয়ে করলে সেই হবে তার কর্তা ও অভিভাবক। তাকে তার অধীনতা মেনে চলতে হবে।
অথচ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَلَنْ يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلًا
'আর আল্লাহ কখনো মুমিনদের বিরুদ্ধে কাফেরদের পথ করে দেবেন না'।১৫৬
এ কারণে ইসলামি শরিয়তে কোনো মুসলমান নারীর অমুসলমানকে বিয়ে করা জায়েজ নেই।
২. দীনদার হওয়া, উত্তম আখলাক-চরিত্রের অধিকারী হওয়া
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
أَفَمَنْ كَانَ مُؤْمِنًا كَمَنْ كَانَ فَاسِقًا لَا يَسْتَوُونَ
'যে মুমিন, সে কী কখনো ওই ব্যক্তির মতো হতে পারে যে পাপাচারী? তারা কখনো সমান হতে পারে না।' ১৫৭
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা সমপর্যায়ের দেখে বিয়ে করো এবং যারা সমপর্যায়ের তাদের কাছে বিয়ে দাও।'
নিঃসন্দেহে কোনা মন্দ, অসৎ, ফাসেক, পাপাচারী ব্যক্তি কোনো সতী-সাধ্বী, নেককার, পুণ্যবতী নারীর সমপর্যায়ের হতে পারে না। সে তার যোগ্য নয়।
আর এমন পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিলে কন্যার শুধু পার্থিব জীবন নয়, আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনও বরবাদ হয়ে যাবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে তাদের সন্তানদেরও পিতার মতো হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
স্ত্রী যেহেতু তার স্বামীর, সন্তানরা যেহেতু তাদের পিতার পরিচয় বহন করে বেঁচে থাকে, তাই সে ভালো না হলে তাদের মন্দ ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে বাঁচতে হবে, যা তাদের জন্য খুবই লজ্জা ও অপমানজনক।
অনেক সময় পিতার কারণে স্ত্রী-সন্তানরা সমাজে মুখ দেখাতে পারে না। তাছাড়া মন্দ ও ফাসেক ব্যক্তি স্ত্রীকে তার প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার প্রদান করে না। রাগের সময় তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে। মারধর করে। তাকে দিয়ে আল্লাহর নাফরমানি করায়।
'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৌহিত্র হাসান ইবনে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, অনেকেই আমার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, আমি কার সঙ্গে বিয়ে দিব? তিনি বললেন, 'তুমি তাকে এমন ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দাও, যে মুত্তাকি, আল্লাহকে ভয় করে। কারণ, সে তোমার মেয়েকে পছন্দ করলে প্রাপ্য সম্মান দিবে। আর যদি ঘৃণাও করে, তবুও তার প্রতি জুলুম করবে না।'
হাসান বসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকেও অনুরূপ একটি কথা বর্ণিত আছে, তিনি এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন, দীনদার ছেলের কাছে তুমি তোমার মেয়েকে বিয়ে দাও। কারণ, সে তাকে পছন্দ করলে সম্মান দিবে, আর অপছন্দ করলে জুলুম করবে না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যদি তোমাদের কাছে এমন কেউ বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার দীনদারি ও নৈতিকতার ব্যাপারে তোমরা সন্তুষ্ট, তবে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দাও। যদি তা না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফেতনা-ফাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।' ১৬০
ইমাম শাবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, 'যে কোনো ফাসেক পাপাচারীকে বিয়ে দিয়ে দিল, সে যেন তার সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ককে ছিন্ন করল।'১৬১
আর একজন ব্যক্তি ভালো না মন্দ, এটা নির্বাচন করা যায়, সে যাদের সঙ্গে চলাফেরা করে বা মিশে, তাদের দেখে। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবদের চরিত্র দেখে।
কারণ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'মানুষ সাধারণত তার বন্ধুর চরিত্রের হয়। '১৬২
মেয়েকে যেন এমন কোনো ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া না হয়, যার কোনো বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ অভিভাবক নেই। যেমন ছেলের বাবা কিংবা চাচা, কিংবা বিজ্ঞ কোনো শিক্ষক, যাতে যে কোনো সমস্যা বা প্রয়োজনে তাদের দ্বারস্থ হওয়া যায়।
মোটকথা, যদি দেখেন যে, পাত্রের মাঝে ইসলামি শিক্ষা ও চিন্তা-চেতনা রয়েছে, সে নামাজের প্রতি যত্নবান, যারা মন্দ তাদের সঙ্গে তার উঠাবসা নেই, মুত্তাকি পরহেযগারদের সঙ্গে তার উঠাবসা। পাশাপাশি তার উপার্জনও হালাল, তাহলেই হল। এ পাত্র আপনি হাতাছাড়া করবেন না।
কিছু মানুষ আছে, যারা বিয়েকে সম্পদ লাভের উপায় মনে করে। তাদের কাছে বিয়ে একটি ব্যবসায়িক চুক্তি। কিন্তু এর যে ধ্বংসাত্মক ও অশুভ পরিণতি সেদিকে তাদের দৃষ্টি থাকে না।
এদের কাছে ছেলের ব্যাংক-ব্যালেন্স, সহায়-সম্পত্তিই সব। তার চরিত্র ও দীনদারীর ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন। এই বিষয়টি তাদের কাছে একেবারে গুরুত্বহীন। তারা বলে, পুরুষ মানুষের আবার চরিত্র কীসের?
ছেলের প্রতি তোমার ও তোমার অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি যেন এমন না হয়, তাহলে নিজেই নিজের ধ্বংস ডেকে নিয়ে আসবে এবং বিরাট ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তুমি বরং ছেলের আখলাক-চরিত্র, নীতি-নৈতিকতা, স্বভাব-প্রকৃতি, আচার-অভ্যাস ইত্যাদি বিষয়কে গুরুত্ব দাও। বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে ধোঁকা খেয়ো না।
কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, আমি তোমাকে দরিদ্র ছেলে বিয়ে করতে বলছি। বরং ধনী কিংবা দরিদ্র, সচ্ছল কিংবা অসচ্ছল যাকেই বিয়ে করো না কেন, সে যেন অবশ্যই সৎ হয়। মনে রাখবে, একজন সৎ দরিদ্র একজন অসৎ ধনীর চেয়ে উত্তম। তেমনিভাবে একজন পুরুষেরও উচিত দীনদার মেয়ে দেখে বিয়ে করা।
ইমাম গাজালি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তার মিনহাযুল কাসিদীন নামক গ্রন্থে লিখেন, পুরুষের যেমন নারীর দীনদারি যাচাই করে নেওয়া উচিত, তেমনি নারীর অভিভাবকদেরও উচিত পুরষের দীনদারি ও তার আখলাক-চরিত্র ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া। কারণ, বিবাহের মাধ্যমে একজন নারীকে ওয়াকফ করে দেওয়া হয়। তাই তার স্বামী যদি বদদীন ও বদ-আখলাকি হয়, তাহলে তার অভিভাবক তার প্রতি বড় অন্যায় করল।
শুধু আখলাক ও দীনদারির কারণেই বিখ্যাত তাবেয়ি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রহমাতুল্লাহি আলাইহি তার মেয়েকে বিয়ের জন্য বাদশাহর ছেলে ওলিদ বিন আবদুল মালেকের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তিতে তিনি তার এক মুত্তাকি, পরহেযগার ছাত্রের সঙ্গে মাত্র দুই কি তিন দিরহাম মোহরানার বিনিময়ে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন।
৩. সামর্থ্যবান হওয়া
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যাদের বিয়ের সামর্থ্য আছে তারা যেন বিয়ে করে নেয়। কারণ, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখতে সাহায্য করে
এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে রোজা রাখবে। কারণ, রোজা যৌন ক্ষমতাকে দমন করে। ১৬৩
হাদিসে বর্ণিত, ‘বিয়ের সামর্থ্য’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর মধ্যে আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্যের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আর্থিক সামর্থ্য
আর্থিক সামর্থ্য বলতে স্ত্রীকে পর্দার সঙ্গে রাখার মতো স্বামীর কোনো বাসস্থান থাকতে হবে। যদিও সাধারণ বাসস্থান হয়। সংসারে স্বাভাবিক ব্যয় নির্বাহের জন্য তার আর্থিক সঙ্গতি থাকতে হবে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
‘পুরুষরা নারীর উপর কর্তৃত্বশীল, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং পুরুষরা তাদের অর্থ সম্পদ ব্যয় করে।’ ১৬৪
শারীরিক সামর্থ্য
শারীরিক সামর্থ্য বলতে স্ত্রী-সন্তান প্রত্যেকের হক মাদায় ও তাদের যাবতীয় দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য থাকতে হবে।
অবশ্য শারীরিক সামর্থ্যের মাঝে মানসিক সামর্থ্যের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ ছেলেকে অবশ্যই মানসিকভাবে সুস্থ হতে হবে। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের প্রতি পূর্ণ সজাগ থাকেতে হবে।
কিন্তু মেয়ের পরিবার এসব বিষয় যাচাই করবে কী করে?
খুব সহজ। ছেলের পরিবার তো প্রথমে প্রস্তাব নিয়ে আসবে। তখন মেয়ের পরিবার ছেলের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার মাধ্যমে তার সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে যাবে।
যেমন ভবিষ্যৎ ফ্যামিলি নিয়ে তার চিন্তা-ভাবনা কী? তার জীবনের লক্ষ্য কী? স্ত্রী সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি কী? স্ত্রীর ও তার পরিবারের কাছ থেকে তার চাওয়া-পাওয়া কী ইত্যাদি।
প্রতিটি মানুষ তার মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। যখন সে কথা বলে, তখন তার ভেতরটা প্রকাশিত হতে থাকে। তাকে চিনতে পারা যায়।
আর নতুন সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সে বহন করতে পারবে কি না সেটা জানা যাবে তার বিবাহপূর্ব জীবনাচার থেকে। নিজেকে সে কীভাবে গড়েছে? বাবা-মার প্রতি সে কেমন দায়িত্বশীল ছিল? তাদের কারও অসুস্থতা কিংবা পরিবারের অভাবের সময় তার ভূমিকা কী ছিল? বিশেষ করে বাবা জীবিত না থাকলে তার মৃত্যুর পর পরিবারকে সে কীভাবে সাপোর্ট দিয়েছে ইত্যাদি।
পড়াশোনা কিংবা কর্মক্ষেত্রে সিরিয়াস ছেলে সাধারণত সাংসারিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়ে থাকে। কারণ, সিরিয়াসনেস হচ্ছে এমন একটি গুণ, যা মানুষকে নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে।
আর যে ছেলে বিয়ের আগে বাবা-মার দায়িত্ব পালন করেছে, তাদের দেখাশোনা করেছে, বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব পালন তার জন্য সহজ হয়ে যায়।
৪. সুপরিবার ও সুবংশের হওয়া
ছেলে সুপরিবার ও সুবংশের কিনা দেখে নেওয়া। সুপরিবার বলতে দীনদার, শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত পরিবার। নিজ এলাকায় যাদের আখলাক ও নৈতিকতার বেশ সুনাম আছে। ১৬৫

টিকাঃ
১৫৫ সুরা বাকারা: ২২২১
১৫৬ সুরা নিসা: ৪১।
১৫৭ সুরা সাজদাহ: ১৮।
১৬০ সুনানে তিরমিযি।
১৬১ মুসান্নাফে ইবনে আবু শাইবা।
১৬২ 'সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিযি।
১৬০ সহিহ বুখারি: ৫০৬৬।
১৬৪ সুরা নিসা: ৩৪।
১৬৫ আদেল ফাতহি কৃত কাইফা তাকসিবিনা কালবা যাওযিকি ও তুরদিনা রাব্বাকি।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 স্বামীর হক

📄 স্বামীর হক


একজন স্ত্রীর উপর স্বামীর হকগুলো হচ্ছে,
♥ সবসময় তার মন জয় করার চেষ্টা করা।
♥ শরিয়তসম্মত সমস্ত কাজে তার অনুগত থাকা। অবাধ্য না হওয়া।
♥ নিজের ইজ্জত-আব্রু রক্ষা করা।
♥ অতিরিক্ত ভরণ-পোষণ দাবি না করা।
♥ তার অনুমতি ছাড়া কাউকে ঘরে প্রবেশ করতে না দেওয়া।
♥ তার অনুমতি ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়া।
♥ সে বিছানায় ডাকলে শরয়ি কোনো ওযর না থাকলে আপত্তি না করা।
♥ তার পরিবারের সকলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
♥ তার পিতা-মাতাকে সম্মান করা।
♥ সন্তানদের উত্তমরূপে লালন-পালন করা।
♥ স্বামীকে আল্লাহর নাফরমানি থেকে বিরত রাখা।
♥ পরপুরুষের সঙ্গে কথাবার্তা না বলা, মেলামেশা না করা।
♥ মানুষের কাছে তার বদনাম না করা।
♥ তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 প্রাণের চেয়ে প্রিয়

📄 প্রাণের চেয়ে প্রিয়


একজন স্ত্রীর কাছে আল্লাহ ও রাসুলের পর স্বামীই তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হওয়া উচিত। একজন স্বামীর কাছে আল্লাহ ও রাসুলের পর তার স্ত্রীই সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হওয়া উচিত।
সাহাবি হযরত আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এক বাহিনীর প্রধান করে যুদ্ধে প্রেরণ করলেন। সেই বাহিনীতে আবু বকর ও ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমাও ছিলেন। ফিরে এসে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে? তিনি বললেন, আয়েশা। আমি বললাম, আমার উদ্দেশ্য পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তার (আয়েশার) পিতা।'১৬৬
তাবেঈ কায়স বিন আবু হাজেম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত,
'আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহু কাঁদছিলেন। তখন তার স্ত্রীও কান্না শুরু করলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কাঁদছ কেন? স্ত্রী বলল, আপনি কাঁদছেন, তাই আপনাকে দেখে কাঁদছি।'১৬৭

টিকাঃ
১৬৬ সহিহ বুখারি: ৪৯৫৩।
১৬৭ মুসতাদরাকে হাকেম: ৮৭৪৭।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 চিরসাথী

📄 চিরসাথী


পুরুষ মানুষ সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট হয় তখন, যখন দেখে সে কোনো কষ্ট পেলে তার স্ত্রী খুশি হয়। আর সে খুশি হলে তার স্ত্রী কষ্ট পায়। এটি তার মনে স্ত্রীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে এবং এ কারণে পরবর্তিতে এত বড় বড় সমস্যা সৃষ্টি হয়, যার সীমা-পরিসীমা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না।
একজন স্ত্রী শুধু তার স্বামীর শয্যাসঙ্গিনীই নন। বরং সে তার চিন্তা-ভাবনা, আবেগ-অনুভূতি, হাসি-কান্না, স্থিরতা-অস্থিরতা, সফলতা-ব্যর্থতা, সুখ-দুঃখ, সুস্থতা-অসুস্থতা, সচ্ছলতা-অসচ্ছলতা, জয়-পরাজয়, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, সর্বাবস্থার সঙ্গিনী।
কতইনা সৌভাগ্যবতী সেই নারী, যে স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়েই তার অবস্থা বুঝতে পারে এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও তার অনুগামী করে নেয়। সে যে কোনো পরিস্থিতিতে তার পাশে থাকে, তাকে সহযোগিতা করে। কোনো কারণে স্বামীর মন খারাপ থাকলে সে তার স্বামীর কষ্টের বোঝা নিজ কাঁধে তুলে নেয় এবং তাকে মানসিক প্রশান্তি দান করে।
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাণপ্রিয়া স্ত্রী বিবি খাদিজা হলেন নারীদের আদর্শ। তার নিম্নোক্ত ঘটনাটি পড়লেই আমরা তা বুঝতে পারবে।
'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সর্বপ্রথম ওহি নাযিল হলো। ভয়ে তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরলেন। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, আমাকে চাদরাবৃত কর, চাদরাবৃত কর। খাদিজা, আমার কী হল? তারপর তিনি তাকে সব বর্ণনা করলেন এবং বললেন, আমি আমার নিজের ব্যাপারে আশঙ্কাবোধ করছি। তখন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকে বললেন, কখনো নয়। আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ তায়ালা কখনো আপনাকে অপদস্থ করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন। সত্য কথা বলেন। মেহমানকে আপ্যায়ন করেন। সত্যের পথে বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করেন। ১১৬৮
এর চেয়ে অভয় ও সান্ত্বনাবাণী আর কী হতে পারে?
এ কারনেই খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা জান্নাতি নারী হতে পেরেছিলেন। তিনি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেছিলেন এবং তার যাবতীয় কষ্টের ভার লাঘব করেছিলেন।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমাকে আদেশ করা হয়েছে, খাদিজাকে (জান্নাতে) মণিমুক্তা দ্বারা নির্মিত ঘরের সুসংবাদ দিতে। যেখানে কোনো হৈচৈ নেই, দুঃখ কষ্ট নেই।' ১৬৯
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্মৃতি মনে গেঁথে রেখেছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় আজীবন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর প্রায়ই তার কথা স্মরণ করতেন।
সাইয়্যিদা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজাকে অধিক স্মরণ করার কারণে আমি খাদিজাকে এত ঈর্ষা করতাম, যতটুকু ঈর্ষা আমি নবিজির অন্য কোনো স্ত্রীকে করিনি। অথচ আমি খাদিজাকে কখনো দেখিনি।
খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ইন্তেকালের তিন বছর পর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করেছিলেন। তার জীবদ্দশায় তিনি অন্য কাউকে বিয়ে করেননি।
আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, 'একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার কথা স্মরণ করলে আমি বললাম, লাল মাড়ি বিশিষ্টা এক বৃদ্ধা নারীকে আপনি কেন এত স্মরণ করেন? আল্লাহ কি আপনাকে তার পরিবর্তে উত্তম কাউকে দেননি? তখন নবিজি বললেন, আল্লাহর শপথ, আল্লাহ তায়ালা আমাকে তার পরিবর্তে উত্তম কাউকে দেননি। লোকেরা যখন আমাকে অস্বীকার করেছিল, তখন সে আমার প্রতি ঈমান এনেছিল। লোকেরা যখন আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল, তখন সে আমাকে বিশ্বাস করেছিল। লোকেরা যখন আমাকে বঞ্চিত করেছিল, তখন সে তার সমস্ত সম্পদ দিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা অন্য সকল স্ত্রীদের পরিবর্তে শুধু তার ঘরে আমাকে সন্তান দান করেছেন।' ১৭০

টিকাঃ
১৬৮ সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।
১৬৯ সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম।
১৪০ সহিহ বুখারি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00