📄 একটি মারাত্মক গুনাহ : স্ত্রীকে বেদম প্রহার
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
'আর স্ত্রীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের প্রতি (স্বামীদের) অধিকার রয়েছে।'১৪১
অর্থাৎ স্ত্রীরও অধিকার রয়েছে পুরুষ তার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করবে। তার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাকে উত্তম সঙ্গ দান করবে। পবিত্র কুরআন আমাদেরকে এমন নির্দেশনা প্রদান করেছে।
মুআবিয়া বিন হায়দার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,
'এক ব্যক্তি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, স্বামীর উপর স্ত্রীর কী অধিকার রয়েছে? তিনি বলেন, স্বামী আহার করলে স্ত্রীকেও একই মানের আহার করাবে, স্বামী পরিধান করলে স্ত্রীকেও একই মানের পোশাক পরিধান করাবে। কখনও তার মুখমণ্ডলে আঘাত করবে না। অশ্লীল গালমন্দ করবে না এবং নিজ বাড়ি ছাড়া অন্যত্র তাকে একাকি ছাড়বে না।'১৪২
ইসলাম অবাধ্য নারীকে প্রহারের বৈধতা দিলেও তার চেহারায় আঘাত করার বৈধতা দেয় না। চেহারায় আঘাত করতে নিষেধ করে। অনেক সময় স্ত্রীর অবাধ্যচরণ এতটাই বেড়ে যায় যে, কোনো উপদেশ কিংবা তার সঙ্গে শয্যা ত্যাগেও সে সংশোধন হয় না। তখন প্রহারের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু প্রহার করলেও বেদম প্রহার করা যাবে না। এমনভাবে মারা যাবে না যে দেহের বিভিন্ন জায়গায় দাগ বসে যায়।
প্রথম কথা হলো তাকে প্রহারই করা যাবে না, অন্যান্য উপায়ে সংশোধনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন লোকের ব্যাপারে আশ্চর্য প্রকাশ করেছেন, যে স্ত্রীকে বেদম প্রহার করে আবার রাতে তার সঙ্গে সহবাস করে এবং এতে সে লজ্জাবোধ করে না।
বুখারি শরিফের হাদিস, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
'তোমাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে তার স্ত্রীকে ক্রীতদাসের মতো প্রহার করে, কিন্তু ওই দিনের শেষেই সে আবার তার সঙ্গে এক বিছানায় মিলিত হয়।' ১৪৩
একজন পুরুষ পরিবারের অভিভাবক। শ্রদ্ধার পাত্র। তার পক্ষে কীভাবে সম্ভব স্ত্রীকে এভাবে প্রহার করা? তাকে গো পেটানো পিটিয়ে হাতের রস মেটানো? তাকে না-খাইয়ে না পরিয়ে অনাদরে রাখা। এটা মারাত্মক অপরাধ। কোনো জ্ঞানী ও সম্ভ্রান্ত লোক এমন কাজ করতে পারে না।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো তার কোনো স্ত্রীকে প্রহার করেননি।
আম্মাজান হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোনো কিছুকে নিজ হাতে আঘাত করেননি। কোনো খাদেম বা কোনো নারীকেও কখনো প্রহার করেননি। অবশ্য আল্লাহর পথে জিহাদ করতে গেলে ভিন্ন কথা।' ১৪৪
টিকাঃ
১৪১ সুরা বাকারা: ২২৮।
১৪২ সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫০।
১৪৩ সহিহ বুখারি: ৪৯৪২।
১৪৪ সুনানে তিরমিযি, শামায়েলে মুহাম্মাদিয়্যাহ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
'আর স্ত্রীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের প্রতি (স্বামীদের) অধিকার রয়েছে।'১৪১
অর্থাৎ স্ত্রীরও অধিকার রয়েছে পুরুষ তার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করবে। তার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাকে উত্তম সঙ্গ দান করবে। পবিত্র কুরআন আমাদেরকে এমন নির্দেশনা প্রদান করেছে।
মুআবিয়া বিন হায়দার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,
'এক ব্যক্তি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, স্বামীর উপর স্ত্রীর কী অধিকার রয়েছে? তিনি বলেন, স্বামী আহার করলে স্ত্রীকেও একই মানের আহার করাবে, স্বামী পরিধান করলে স্ত্রীকেও একই মানের পোশাক পরিধান করাবে। কখনও তার মুখমণ্ডলে আঘাত করবে না। অশ্লীল গালমন্দ করবে না এবং নিজ বাড়ি ছাড়া অন্যত্র তাকে একাকি ছাড়বে না।'১৪২
ইসলাম অবাধ্য নারীকে প্রহারের বৈধতা দিলেও তার চেহারায় আঘাত করার বৈধতা দেয় না। চেহারায় আঘাত করতে নিষেধ করে। অনেক সময় স্ত্রীর অবাধ্যচরণ এতটাই বেড়ে যায় যে, কোনো উপদেশ কিংবা তার সঙ্গে শয্যা ত্যাগেও সে সংশোধন হয় না। তখন প্রহারের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু প্রহার করলেও বেদম প্রহার করা যাবে না। এমনভাবে মারা যাবে না যে দেহের বিভিন্ন জায়গায় দাগ বসে যায়।
প্রথম কথা হলো তাকে প্রহারই করা যাবে না, অন্যান্য উপায়ে সংশোধনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন লোকের ব্যাপারে আশ্চর্য প্রকাশ করেছেন, যে স্ত্রীকে বেদম প্রহার করে আবার রাতে তার সঙ্গে সহবাস করে এবং এতে সে লজ্জাবোধ করে না।
বুখারি শরিফের হাদিস, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
'তোমাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে তার স্ত্রীকে ক্রীতদাসের মতো প্রহার করে, কিন্তু ওই দিনের শেষেই সে আবার তার সঙ্গে এক বিছানায় মিলিত হয়।' ১৪৩
একজন পুরুষ পরিবারের অভিভাবক। শ্রদ্ধার পাত্র। তার পক্ষে কীভাবে সম্ভব স্ত্রীকে এভাবে প্রহার করা? তাকে গো পেটানো পিটিয়ে হাতের রস মেটানো? তাকে না-খাইয়ে না পরিয়ে অনাদরে রাখা। এটা মারাত্মক অপরাধ। কোনো জ্ঞানী ও সম্ভ্রান্ত লোক এমন কাজ করতে পারে না।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো তার কোনো স্ত্রীকে প্রহার করেননি।
আম্মাজান হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোনো কিছুকে নিজ হাতে আঘাত করেননি। কোনো খাদেম বা কোনো নারীকেও কখনো প্রহার করেননি। অবশ্য আল্লাহর পথে জিহাদ করতে গেলে ভিন্ন কথা।' ১৪৪
টিকাঃ
১৪১ সুরা বাকারা: ২২৮।
১৪২ সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫০।
১৪৩ সহিহ বুখারি: ৪৯৪২।
১৪৪ সুনানে তিরমিযি, শামায়েলে মুহাম্মাদিয়্যাহ।
📄 আল্লাহর নাফরমানির বিষয়ে ছাড় না দেওয়া
এ বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনার স্ত্রী-সন্তানরা যখন আল্লাহর হক আদায় করবে না, তখন আপনার হকও আদায় করবে না। আল্লাহর হকের ব্যাপারে যে যত্নবান নয়, স্বাভাবিকভাবেই সে বান্দার হকের ব্যাপারে যত্নবান থাকবে না। আর একজন অভিভাবক হিসেবে স্ত্রীর নাফরমানির গুনাহ আপনার উপর এসেও বর্তাবে। তাই তারা আল্লাহর হুকুমের খেলাফ কোনো কাজ করলে আপনার উচিত তাকে বাধা দেওয়া, বোঝানো, সতর্ক করা, শাসন করা আপনার অবশ্য কর্তব্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ. كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ.
'বনি ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে দাউদ ও মরিয়ম তনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা একারণে যে, তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমালঙ্ঘন করত। তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করত না, যা তারা করত। তারা যা করত তা কতইনা মন্দ ছিল!' ১৪৫
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَاراً وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلائِكَةٌ غِلاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ.
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনদের সেই অগ্নি থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হলো মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা আল্লাহ তায়ালা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তাদেরকে যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।' ১৪৬
সুরা নিসায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
'পুরুষরা নারীর উপর কর্তৃত্বশীল, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং পুরুষরা তাদের অর্থ সম্পদ ব্যয় করে।' ১৪৭
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমরা অনেকেই আমাদের এই দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন, অসচেতন। স্ত্রী-সন্তানদের ব্যাপারে আমরা আমাদের দ্বীনি গায়রাত তথা ধর্মীয় আত্মমর্যাদাবোধ বিসর্জন দিয়েছি। আমাদের পরিবারের নারীরা পর্দা প্রথাকে অবহেলা করছে। বেপর্দা হয়ে বাইরে বের হচ্ছে। কোনো মাহরাম ছাড়া শপিংয়ে যাচ্ছে। অনৈসলামিক জামা-কাপড় পড়ছে। পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলছে। ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের ছবি ছাড়ছে। এগুলো আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। কিন্তু আমরা তাদের নিষেধ করছি না। তাদের সঙ্গে কঠোর হতে পারছি না। আমরা দুর্বল, অসহায়, নাদান হয়ে পড়ছি।
আমাদের সন্তানরা ঘরে বসে টিভি দেখছে, গান শুনছে, গেমস খেলছে। কিন্তু আমাদের কোনো বিকার নেই। যেন এগুলো হওয়ারই কথা ছিল। স্ত্রী-সন্তানদের কাছে আমাদের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে। আল্লাহর ভয়ের চেয়ে স্ত্রী-সন্তানদের ভয় আমাদের বেশি গ্রাস করেছে। আল্লাহর অসন্তুষ্টির চেয়ে স্ত্রী-সন্তানদের অসন্তুষ্টি আমরা বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'যে মানুষকে সন্তুষ্ট করার জন্য আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে, আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হোন এবং মানুষকেও তার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দেন।'
এমতাবস্থায় স্ত্রী-সন্তান কেউ তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে না। সে তখন সবসময় দুশ্চিন্তায় ভোগে।
আমরা যে দেখি, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিভিন্ন সময় পারস্পরিক কলহ ও দ্বন্ধ সৃষ্টি হয়, এর পেছনে মূলত কারণ আল্লাহর নাফরমানি। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ
'আর তোমাদের উপর যে বিপদ আপতিত হয় তা তোমাদের হাতের কামাই। আর আল্লাহ তায়ালা অনেক ক্ষমা করেন।১৪৮
পরিবারের কারও দ্বারা কোনো গুনাহ হলে শরিয়ত লঙ্ঘিত হলে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেমন আচরণ করতেন, একটি ঘটনার মাধ্যমে এখানে তা তুলে ধরছি।
আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একবার আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট আসলেন। তখন ঘরে একখানা পর্দা ঝুলানো ছিল। যাতে (প্রাণির) ছবি ছিল। তা দেখে নবিজির চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল। তিনি পর্দাখানা হাতে নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন। তারপর বললেন, কেয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে ওই সব লোকের যারা আল্লাহর সৃষ্টি সদৃশ্য ছবি অঙ্কন করে।
সুবহানাল্লাহ! অথচ আজ আমাদের মুসলমানদের ঘরে কত ছবি টাঙানো থাকে। শো-পিস নামের কত কত পুতুল ও মূর্তি থাকে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'যে ঘরে কোনো প্রাণির ছবি থাকে, সে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।১৪৯
আর স্পষ্ট কথা, যে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না সে ঘরে অবশ্যই শয়তান প্রবেশ করে। শয়তান সে ঘরকে নিজের বাসস্থান বানিয়ে নেয়। শয়তান যে ঘরকে বাসস্থান বানিয়ে নেয়, সে ঘরে অশান্তি, অকল্যাণ, কলহ-বিবাদ, পেরেশানি ও দুশ্চিন্তা ইত্যাদি বাড়তে থাকবে।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমাদের প্রত্যেকেই অভিভাবক। তোমাদের প্রত্যেককেই আপন অধিনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। আর পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক। তাকে তার অধিনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।' ১৫০
নিম্নোক্ত হাদিসটি পড়ন, এখানে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও কঠিন কথা বলেছেন, 'কোনো বান্দা যখন এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, সে তার অধিনস্থদের ব্যাপারে খেয়ানতকারী ছিল, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।'
ঘিরে টিভি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ইত্যাদি ঢুকিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নাটক-মুভি দেখার সুযোগ করে দেওয়া কিংবা তারা এগুলো ঘরে নিয়ে আসলে কিছু না বলা, এগুলো তাদের সঙ্গে প্রতারনা নয়? খেয়ানত নয়? তাদের আখেরাত বরবাদ করে দেওয়া নয়? এগুলো যদি খেয়ানত না হয়, তাহলে খেয়ানত কোনটি? স্ত্রী-সন্তানরা কে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, কথা বলছে-এগুলো সম্পর্কে উদাসীন থাকা কি খেয়ানত নয়? এভাবে কি আমরা আমাদের উপর জান্নাতকে হারাম করছি না?
মহান সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, 'যেসব নারী শরীরে উল্কি অঙ্কন করে এবং যারা উল্কি অঙ্কন করায়, যেসব নারী ভ্রু উপড়ে দেয় এবং যারা ভ্রু উপড়াতে চায় এবং যেসব নারী (সৌন্দর্যের জন্য) সম্মুখের দাঁতের মধ্যে ফাঁক তৈরী করে ও যেসব নারী আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধন করে, তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। ১৫১
বর্ণনাকারী বলেন, বনি আসাদ গোত্রের এক মহিলার নিকট হাদিসটি পৌঁছাল, যাকে উম্মে ইয়াকুব নামে ডাকা হয়। তিনি কুরআন পাঠ করছিলেন, অতঃপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এসে এ বিষয়ে আলোচনা করে বলেন, আমি নিশ্চিত যে, আপনার স্ত্রীর মাঝে এর কোনো একটি বিষয়
আছে। আমি গেলে ঠিকই দেখতে পাব। তিনি বললেন, তুমি যাও। দেখ, আছে কি না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর মহিলা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রীর কাছে গেল। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। তারপর সে তার নিকট ফিরে এসে বলল, কিছুই দেখতে পাইনি। তখন তিনি বললেন, যদি সে রকম কিছু হতো, তাহলে আমি তার সঙ্গে সহবাস করতাম না।
অর্থাৎ তার সঙ্গে থাকতাম না। বরং তাকে তালাক দিয়ে দিতাম এবং বিচ্ছিন্ন করে দিতাম।
আল্লাহর হুকুমের ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরام এমনই কঠোর ছিলেন। স্ত্রী-সন্তানরা আল্লাহর কোনো নাফরমানী করবে, এটা তারা বরদাশত করতে পারতেন না।
টিকাঃ
১৪৫ সুরা মায়িদা: ৭৮-৭৯।
১৪৬ সুরা তাহরিম: ৬।
১৪৭ সুরা নিসা: ৩৪।
১৪৮ সুরা শুরা : ৩১
১৪৯ সহিহ বুখারি : ২১০৫।
১৫০ সহিহ বুখারি: ৭১৩৮।
১৫১ সহিহ বুখারি: ৪৮৮৬।
এ বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনার স্ত্রী-সন্তানরা যখন আল্লাহর হক আদায় করবে না, তখন আপনার হকও আদায় করবে না। আল্লাহর হকের ব্যাপারে যে যত্নবান নয়, স্বাভাবিকভাবেই সে বান্দার হকের ব্যাপারে যত্নবান থাকবে না। আর একজন অভিভাবক হিসেবে স্ত্রীর নাফরমানির গুনাহ আপনার উপর এসেও বর্তাবে। তাই তারা আল্লাহর হুকুমের খেলাফ কোনো কাজ করলে আপনার উচিত তাকে বাধা দেওয়া, বোঝানো, সতর্ক করা, শাসন করা আপনার অবশ্য কর্তব্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ. كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ.
'বনি ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে দাউদ ও মরিয়ম তনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা একারণে যে, তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমালঙ্ঘন করত। তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করত না, যা তারা করত। তারা যা করত তা কতইনা মন্দ ছিল!' ১৪৫
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَاراً وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلائِكَةٌ غِلاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ.
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনদের সেই অগ্নি থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হলো মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা আল্লাহ তায়ালা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তাদেরকে যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।' ১৪৬
সুরা নিসায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
'পুরুষরা নারীর উপর কর্তৃত্বশীল, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং পুরুষরা তাদের অর্থ সম্পদ ব্যয় করে।' ১৪৭
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমরা অনেকেই আমাদের এই দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন, অসচেতন। স্ত্রী-সন্তানদের ব্যাপারে আমরা আমাদের দ্বীনি গায়রাত তথা ধর্মীয় আত্মমর্যাদাবোধ বিসর্জন দিয়েছি। আমাদের পরিবারের নারীরা পর্দা প্রথাকে অবহেলা করছে। বেপর্দা হয়ে বাইরে বের হচ্ছে। কোনো মাহরাম ছাড়া শপিংয়ে যাচ্ছে। অনৈসলামিক জামা-কাপড় পড়ছে। পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলছে। ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের ছবি ছাড়ছে। এগুলো আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। কিন্তু আমরা তাদের নিষেধ করছি না। তাদের সঙ্গে কঠোর হতে পারছি না। আমরা দুর্বল, অসহায়, নাদান হয়ে পড়ছি।
আমাদের সন্তানরা ঘরে বসে টিভি দেখছে, গান শুনছে, গেমস খেলছে। কিন্তু আমাদের কোনো বিকার নেই। যেন এগুলো হওয়ারই কথা ছিল। স্ত্রী-সন্তানদের কাছে আমাদের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে। আল্লাহর ভয়ের চেয়ে স্ত্রী-সন্তানদের ভয় আমাদের বেশি গ্রাস করেছে। আল্লাহর অসন্তুষ্টির চেয়ে স্ত্রী-সন্তানদের অসন্তুষ্টি আমরা বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'যে মানুষকে সন্তুষ্ট করার জন্য আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে, আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হোন এবং মানুষকেও তার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দেন।'
এমতাবস্থায় স্ত্রী-সন্তান কেউ তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে না। সে তখন সবসময় দুশ্চিন্তায় ভোগে।
আমরা যে দেখি, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিভিন্ন সময় পারস্পরিক কলহ ও দ্বন্ধ সৃষ্টি হয়, এর পেছনে মূলত কারণ আল্লাহর নাফরমানি। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ
'আর তোমাদের উপর যে বিপদ আপতিত হয় তা তোমাদের হাতের কামাই। আর আল্লাহ তায়ালা অনেক ক্ষমা করেন।১৪৮
পরিবারের কারও দ্বারা কোনো গুনাহ হলে শরিয়ত লঙ্ঘিত হলে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেমন আচরণ করতেন, একটি ঘটনার মাধ্যমে এখানে তা তুলে ধরছি।
আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একবার আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট আসলেন। তখন ঘরে একখানা পর্দা ঝুলানো ছিল। যাতে (প্রাণির) ছবি ছিল। তা দেখে নবিজির চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল। তিনি পর্দাখানা হাতে নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন। তারপর বললেন, কেয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে ওই সব লোকের যারা আল্লাহর সৃষ্টি সদৃশ্য ছবি অঙ্কন করে।
সুবহানাল্লাহ! অথচ আজ আমাদের মুসলমানদের ঘরে কত ছবি টাঙানো থাকে। শো-পিস নামের কত কত পুতুল ও মূর্তি থাকে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'যে ঘরে কোনো প্রাণির ছবি থাকে, সে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।১৪৯
আর স্পষ্ট কথা, যে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না সে ঘরে অবশ্যই শয়তান প্রবেশ করে। শয়তান সে ঘরকে নিজের বাসস্থান বানিয়ে নেয়। শয়তান যে ঘরকে বাসস্থান বানিয়ে নেয়, সে ঘরে অশান্তি, অকল্যাণ, কলহ-বিবাদ, পেরেশানি ও দুশ্চিন্তা ইত্যাদি বাড়তে থাকবে।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমাদের প্রত্যেকেই অভিভাবক। তোমাদের প্রত্যেককেই আপন অধিনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। আর পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক। তাকে তার অধিনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।' ১৫০
নিম্নোক্ত হাদিসটি পড়ন, এখানে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও কঠিন কথা বলেছেন, 'কোনো বান্দা যখন এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, সে তার অধিনস্থদের ব্যাপারে খেয়ানতকারী ছিল, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।'
ঘিরে টিভি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ইত্যাদি ঢুকিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নাটক-মুভি দেখার সুযোগ করে দেওয়া কিংবা তারা এগুলো ঘরে নিয়ে আসলে কিছু না বলা, এগুলো তাদের সঙ্গে প্রতারনা নয়? খেয়ানত নয়? তাদের আখেরাত বরবাদ করে দেওয়া নয়? এগুলো যদি খেয়ানত না হয়, তাহলে খেয়ানত কোনটি? স্ত্রী-সন্তানরা কে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, কথা বলছে-এগুলো সম্পর্কে উদাসীন থাকা কি খেয়ানত নয়? এভাবে কি আমরা আমাদের উপর জান্নাতকে হারাম করছি না?
মহান সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, 'যেসব নারী শরীরে উল্কি অঙ্কন করে এবং যারা উল্কি অঙ্কন করায়, যেসব নারী ভ্রু উপড়ে দেয় এবং যারা ভ্রু উপড়াতে চায় এবং যেসব নারী (সৌন্দর্যের জন্য) সম্মুখের দাঁতের মধ্যে ফাঁক তৈরী করে ও যেসব নারী আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধন করে, তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। ১৫১
বর্ণনাকারী বলেন, বনি আসাদ গোত্রের এক মহিলার নিকট হাদিসটি পৌঁছাল, যাকে উম্মে ইয়াকুব নামে ডাকা হয়। তিনি কুরআন পাঠ করছিলেন, অতঃপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এসে এ বিষয়ে আলোচনা করে বলেন, আমি নিশ্চিত যে, আপনার স্ত্রীর মাঝে এর কোনো একটি বিষয়
আছে। আমি গেলে ঠিকই দেখতে পাব। তিনি বললেন, তুমি যাও। দেখ, আছে কি না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর মহিলা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রীর কাছে গেল। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। তারপর সে তার নিকট ফিরে এসে বলল, কিছুই দেখতে পাইনি। তখন তিনি বললেন, যদি সে রকম কিছু হতো, তাহলে আমি তার সঙ্গে সহবাস করতাম না।
অর্থাৎ তার সঙ্গে থাকতাম না। বরং তাকে তালাক দিয়ে দিতাম এবং বিচ্ছিন্ন করে দিতাম।
আল্লাহর হুকুমের ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরام এমনই কঠোর ছিলেন। স্ত্রী-সন্তানরা আল্লাহর কোনো নাফরমানী করবে, এটা তারা বরদাশত করতে পারতেন না।
টিকাঃ
১৪৫ সুরা মায়িদা: ৭৮-৭৯।
১৪৬ সুরা তাহরিম: ৬।
১৪৭ সুরা নিসা: ৩৪।
১৪৮ সুরা শুরা : ৩১
১৪৯ সহিহ বুখারি : ২১০৫।
১৫০ সহিহ বুখারি: ৭১৩৮।
১৫১ সহিহ বুখারি: ৪৮৮৬।
📄 পিতা-মাতা কেন সন্তানদের সংসারে হস্তক্ষেপ করেন?
প্রচণ্ড শীত। ঠাণ্ডায় সব জমে যাচ্ছে। উষ্ণতা লাভের জন্য কিছু শজারু একে অপরের গা ঘেঁষে বসল। কিন্তু সবার গায়ে কাঁটা থাকায় তাদের গায়ে কাঁটা বিধতে লাগল। তারা তখন একে অপর থেকে একটু সরে বসল। কিন্তু সরে বসতেই তাদের আবার শীত লাগতে শুরু করল।
তখন তারা আবার কাছে এলো। এভাবে তারা একবার কাছে আসে, কিন্তু গায়ে কাঁটা বিধার কারণে আবার সরে যায়। কী করা যায়, কী করা যায়, ভেবে তারা এমনভাবে কাছে এসে বসল, যেন শীত থেকেও বাঁচা যায়, আবার কাঁটার আঘাত থেকেও।
এটি একটি প্রতিকী ঘটনা। উদ্দেশ্য সংসার জীবনে কিছু মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে তাদের থেকে উপকৃত হওয়া। তবে দূরত্ব বজায় রাখার সময় ভালোবাসা যেন বজায় থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
অনেক পিতা-মাতা আছেন, সন্তানের সংসারে অতিমাত্রায় হস্তক্ষেপ করেন, যার ফলে সন্তানদের পক্ষে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়।
পিতা-মাতা কেন হস্তক্ষেপ করেন? এর অনেক কারণ রয়েছে:
• কখনো স্বামী-স্ত্রীর আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ডের কারণে পিতা-মাতা তাদের সংসারে হস্তক্ষেপ করে থাকেন। আসলে তখন তারা হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হন।
• কখনো শূণ্যতাবোধের কারণে। অর্থাৎ সন্তানকে বিয়ে দেওয়ার পর পিতা-মাতা খুব একা, নিঃসঙ্গ অনুভব করেন। তাই তারা সন্তানদের তাদের সংসার সম্পর্কে এটা-সেটা জিজ্ঞাসা করতে থাকেন।
• সন্তানদের প্রতি অতিরিক্ত স্নেহ-ভালোবাসার কারণেও অনেক পিতা-মাতা এমনটি করে থাকেন।
• কখনো ছেলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ার কারণে পিতা-মাতা তার সংসারে হস্তক্ষেপ করেন।
• আবার কখনো পিতা-মাতা নতুন স্বামী-স্ত্রীর নিজস্বতা বলতে যে কিছু আছে, এটা বুঝতে চান না। তাই তারা তাদের সমস্ত বিষয় জানতে চান।
তারা মনে করেন, এভাবে তারা তাদের গুরুত্ব প্রদান করছেন। অথচ তারা যেটাকে গুরুত্ব প্রদান মনে করছেন, স্বামী-স্ত্রীর কাছে সেটাই হস্তক্ষেপ।
* আবার কখনো স্বামী-স্ত্রীর স্বভাব-প্রকৃতির কারণেও পিতা-মাতা হস্তক্ষেপ করেন। যেমন, কোনো কোনো দম্পতি আছেন, নিজেদের যে কোনো সমস্যা পিতা-মাতাকে জানান।
এটা মূলতঃ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্কের দুর্বলতার কারণে হয়। কারণ, নিজেদের মাঝে সম্পর্ক দুর্বল থাকলে যে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য তৃতীয় পক্ষকে টেনে আনতে হয়।
* আবার কখনো পিতা-মাতার উপর সন্তানদের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণেও হয়। যেমন, সে কোনো সিদ্ধান্তই পিতা-ম তাকে ছাড়া নিতে পারে না। তাদেরকে তার সবকিছু জানাতে হয়।
হস্তক্ষেপ যে সবসময় নেতিবাচক তা নয়। তবে অনেক সময় পিতা-মাতার এই হস্তক্ষেপের কারণে দাম্পত্যজীবনের বিশেষত্ব এবং স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্কের উষ্ণতা নষ্ট হয়। তাদের পারস্পরিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে।
দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী তাদের পিতা-মাতাদের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে বিরক্ত হয়ে একসময় তাদের মুখের উপর কিছু বলে বসেন। তুচ্ছ কারণে তাদের সঙ্গে রেগে যান। তখন আরও বড় বিপর্যয় দেখা দেয়। উভয় পক্ষের সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়।
সমাধান
* স্বামী-স্ত্রীদের নিজেদের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া। এমন কোনো ভুল না করা, যাতে পিতা-মাতা হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হন।
* স্বামী-স্ত্রী একত্রে বসে নির্ধারণ করে নেওয়া, তাদের কোন কোন বিষয়ে পিতা-মাতা হস্তক্ষেপ করলে সমস্যা নেই। আর কোন কোন বিষয়ে সমস্যা আছে। তারা পিতা-মাতার সঙ্গে কী কী বিষয় শেয়ার করবে, আর কী বিষয় শেয়ার করবে না, ইত্যাদি নিজেরা বসে নির্ধারণ করে নিবে।
* পিতা-মাতাদের সম্মান করা। মূল্যায়ন করা। গুরুত্ব দেওয়া। এসব ব্যাপারে যত্নবান থাকা। তারা কখনো যেন মনে না করেন, বিয়ের পর আপনারা তাদের ভুলে গেছেন। দূরের মানুষ হয়ে গেছেন। তাদের ঘন ঘন দেখতে যান, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করুন, মোবাইলে কথা
বলুন, খোঁজখবর নিন, হাদিয়া দিন, তাদের প্রয়োজনাদির প্রতি লক্ষ রাখুন, সেগুলো পূরণ করুন। নিজেদের একান্ত কোনো বিষয় না হলে তাদের কাছে পরামর্শ চান। এতে তারা আশ্বস্ত হবে যে, সন্তানদের কাছে এখনো তাদের মূল্য আছে। তারা তাদের মূল্যায়ন করে।
• নিজেদের বৈষয়িক প্রয়োজনগুলো নিজেরাই পূরণের চেষ্টা করুন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হোন।
• যথাসম্ভব পিতা-মাতার বাড়িতে না থাকার চেষ্টা করুন। পিতা-মাতাকে সঙ্গে রাখুন, তবে আপনার বাসায়।
• তাদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে হেকমতের সঙ্গে এড়িয়ে যান। হয় আলোচনার বিষয়বস্তু পরিবর্তন করুন কিংবা কৌশলি উত্তর প্রদান করুন।
• নিজেদের সমস্ত বিষয় তাদের জানাতে যাবেন না। কারণ স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত এমন অনেক বিষয় থাকে যেগুলো অন্যদের জানানো ঠিক না। না জানানোর মাঝেই পারিবারিক কল্যাণ নিহিত।
♥. আত্মবিশ্বাসী হোন। নিজেদের উপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখুন যে, আপনারা নিজেরাই নিজেদের সমস্যা সমাধান করতে পারবেন। ভালোবাসার বন্ধনকে সুদৃঢ় করুন। আপনারা একে অপরকে যেভাবে বুঝতে পারেন, অন্য কারও পক্ষে আপনাদের সেভাবে বুঝতে পারা সম্ভব নয়। তাই জটিল ও কঠিন কোনো সমস্যা না হলে এবং সেটাও নিজেরা সমাধানে ব্যর্থ না হলে তৃতীয় পক্ষকে ডাকবেন না।
♥ আপনার শ্বশুরবাড়ির কেউ হস্তক্ষেপ করলে সেজন্য আপনার সঙ্গিকে কথা শোনাবেন না। তাকে ভর্ৎসনা করবেন না। বিষয়টি সেখানেই নিষ্পত্তি করে ফেলুন। কারণ, প্রত্যেকেই তার পরিবারকে ভালোবাসে। তারা ভুল করলেও তাদের ব্যাপারে কোনো কথা শুনতে তার খারাপ লাগে।
• পিতা-মাতারও কিছু কর্তব্য আছে। তাদের উচিত স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বোঝাপড়া ভালো থাকলে হস্তক্ষেপ না করা। কারণ, এতে অনেক সময় তাদের সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। কখনো যদি হস্তক্ষেপ করতে হয়, তাহলে অবশ্যই সৎ নিয়তে করতে হবে। সমস্যা সমাধানের সদিচ্ছা থাকতে হবে। নতুন কোনো সমস্যা সৃষ্টি করা নয়।
📄 নিজেদের কলহ-বিবাদ থেকে সন্তানদের দূরে রাখুন
এমন অনেক পরিবার আছে, যেখানে সন্তানদের সকালের সূর্যের মিষ্টি আলোয়, পাখিদের মিষ্টি গানে ঘুম ভাঙে না। তাদের সেই সৌভাগ্য হয় না। তাদের ঘুম ভাঙে পিতা-মাতার কলহ-বিবাদের কর্কশ আওয়াজে। সে ঘুম থেকে উঠে দেখে তার পিতা-মাতা চিৎকার করছে। একে অপরকে দোষারোপ করছে। গালি দিচ্ছে। এটা সেটা ভাঙচুর করছে। বাসায় প্রলয়কাণ্ড বাঁধিয়ে তুলেছে।
সে তখন বুঝতে পারে না, এখন সে কার কাছে যাবে। কে তাকে কাছে টেনে নিবে। সে বিছানা থেকে নামতে ভয় পায়। অগত্যা বিছানায় শুয়েই কাঁদতে থাকে। তার দু'চোখের অশ্রুতে নদি বয়ে যেতে থাকে।
তখন হয় তার বাবা কিংবা তার মা এসে তাকে কাছে টেনে নেন। তারপর তার কাছে অন্য পক্ষের বদনাম করা শুরু করেন। বলে, দেখেছো তোমার বাবা কত খারাপ! কিংবা তোমার মা কত খারাপ! সকাল সকাল আমার সঙ্গে কেমন ঝগড়া করছে!
কোথায় তারা নিজেরা ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলবে, তা না। উল্টো সন্তানকেও এতে জড়াচ্ছে। তাকে নিজেদের যুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
এভাবে একসময় সন্তানের মন থেকে বাবা-মার প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থাবোধ উঠে যায়।
এমন দৃশ্য আমাদের সমাজের অসংখ্য পরিবারের।
এর চেয়েও অদ্ভূত ব্যাপার হচ্ছে, কোনো কোনো বাবা-মা আছেন, সন্তানদের সামনে ঝগড়া না করলে, একে অপরকে তুই-তুই করে কথা না বললে, গায়ে হাত না তুললে যেন তাদের তৃপ্তি মেটে না।
দাম্পত্য জীবনে সমস্যা থাকবেই। সমস্যা যেমন আছে তেমনি সমাধানও আছে। কিন্তু আমরা যদি সন্তানদের সামনে ঝগড়া করি, তাহলে তাদের উপরের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তারা আমাদের কাছ থেকে ঝগড়া করা শিখে এবং বড় হয়ে একসময় আমাদের সঙ্গেই ঝগড়া করা শুরু করে। আমাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা আমাদেরকেই ফিরিয়ে দেয়।
এভাবে অশান্ত পরিবেশে বেড়ে উঠতে উঠতে একসময় তারাও অশান্ত হয়ে যায়। তাদের স্বভাব-প্রকৃতিতে কঠোরতা চলে আসে। ভবিষ্যতে সে যখন তার সন্তানদের প্রতিপালন করতে যায়, তখন সে তাদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করে।
সবচেয়ে নিকৃষ্ট হচ্ছে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে সন্তানের কাছে দোষী হিসেবে তুলে ধরা। অনেক সময় এমন হয়, ঝগড়া করার পর পুরুষ বাইরে চলে যায়। তখন সন্তানরা মাকে তাদের বাবা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। মা তাদের সামনে বাবার দোষ-ত্রুটিগুলো তুলে ধরেন। তাকে তাদের কাছে ছোট করেন। অনেক বাবাও এই কাজটি করেন।
সন্তানদের সামনে যেমন ঝগড়া করা যাবে না, তেমনি নিজেদের কোনো সমস্যার সমাধান নিয়েও আলোচনা করা যাবে না। তাদের কোনোভাবেই এসবে জড়ানো যাবে না। তাহলে মাঝেমাঝে কথা কাটাকাটির টুকটাক আওয়াজ তাদের কানে আসলেও তারা মনে করে নিবে, এগুলো স্বাভাবিক বিষয়। একটু-আধটু হয়ই। নিজেদের অজান্তেই তাদের মাঝে তখন সমাধানের মানসিকতা গড়ে উঠবে।
পিতা-মাতাকে অবশ্যই সন্তানদের সুস্থ সুন্দর পরিবেশে গড়ে তোলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের স্মরণ রাখতে হবে সন্তানদের সামনে ঝগড়া তাদের ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রাসাদকে চূর্ণ করে।