📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 স্ত্রীকে সময় দেওয়া

📄 স্ত্রীকে সময় দেওয়া


অনেক পুরুষ আছে কাজে অকাজে সারাক্ষণ বাসার বাহিরে বাহিরে থাকে। ঘুরে বেড়ায়। আড্ডা দেয়। তারপর রাত করে বাড়ি ফিরে।
আবার অনেকে আছে, বাসায় ফিরে গভীর রাত পর্যন্ত টিভি, মোবাইল, ফেইসবুক, ইন্টারন্টে—এসব নিয়ে পড়ে থাকে।
এগুলো দাম্পত্য জীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পারস্পরিক সম্পর্কের বাঁধনকে শিথীল করে। সংসারে দূরত্ব সৃষ্টি করে।
আবার অনেক পুরুষ মনে করে, 'পরিবারকে সময় দেওয়ার কী আছে? এই যে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম—এ সব কিছু আমি কার জন্য করছি? এগুলো তো আমি আমার পরিবারের জন্যই করছি'
আচ্ছা, একজন পুরুষের কাছে দাম্পত্য জীবনের মানে কি শুধু স্ত্রী-সন্তানদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা? যা যা প্রয়োজন সব এনে দেওয়া?
টাকা-পয়সার প্রয়োজনই কী মানুষের জীবনে সব? থাকা-খাওয়ার ভালো ব্যবস্থার জন্যই কি একজন নারী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়? আপনজন সবাইকে ছেড়ে একজন অপরিচিত মানুষের পরিবারে চলে আসে? তার বাবার বাসায় কি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না? নাকি কোনো অভাব ছিল?
আবার অনেকে মনে করে, স্ত্রী-সন্তানদের সময় দিলে, তাদের সঙ্গে গল্প করলে নিজের ভারিত্ব কমে যাবে। তাই সে সবসময় একটা গুরুগম্ভীর ভাব বজায় রাখে। সবাই তাকে ভয় করে। ছোট বাচ্চারা তাকে দেখলে কেমন ফ্যাকাসে হয়ে যায়। বড়রাও কাছে আসতে ইতস্তত করে। তাকে কখনো স্ত্রীর সঙ্গে নরম ও কোমল সুরে কথা বলতে দেখা যায় না।
অথচ স্ত্রীদের সঙ্গে নবিজির আচরণ মোটেও এমন ছিলো না। তিনি গোটা মানবজাতির জন্য, বিশ্ব জাহানের জন্য নবি হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। সমগ্র মানবজাতির হেদায়াত ও মুক্তি ছিল তার চিন্তার বিষয়। নবুওয়াত ও রিসালাতের মহা গুরুদায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। তারপরও তিনি পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতেন। স্ত্রীদের সাথে বসে গল্প করতেন। তাদের যাবতীয় হক আদায় করতেন। তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতেন।
নবি জীবনে এমন দৃষ্টান্ত অসংখ্য। নমুনাস্বরূপ নিয়ে আমরা আবু যুরআর সুদীর্ঘ হাদিসটি তুলে ধরছি। তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের কীভাবে সময় দিতেন। কত লম্বা সময় ধরে তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। তাদের কথা শুনতেন। আমার আপনার দায়িত্ব ও ব্যস্ততা নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের চেয়ে অধিক না? আমার আপনার সময় নিশ্চয়ই তাঁর সময়ের চেয়ে অধিক দামী না?
একদিন আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বসে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে গল্প করছিলেন। গল্পটি হলো—
'তিনি বলেন, এগারো জন মহিলা একস্থানে একত্রিত হয়ে বসল। তারা সকলে মিলে এই কথার উপর একমত হল যে, তারা নিজেদের স্বামীর কোনো তথ্যই গোপন রাখবে না। প্রথমজন বলল, আমার স্বামী হচ্ছে অত্যন্ত হালকা-পাতলা দুর্বল উটের গোশতের ন্যায়, যেন কোনো পাহাড়ের চূড়ায় রাখা হয়েছে এবং সেখানে আরোহন করা সহজ কাজ নয় এবং গোশতের মধ্যে এত চর্বিও নেই, যে কারণে সেখানে উঠার জন্য কেউ কষ্ট স্বীকার করবে। দ্বিতীয় মহিলা বলল, আমি আমার স্বামী সম্পর্কে কিছু বলব না। কারণ, আমি ভয় করছি যে তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেষ করা যাবে না। কেননা যদি আমি তার সম্পর্কে বলতে যাই, তাহলে আমাকে তার সকল দুর্বলতা এবং মন্দ দিকগুলো সম্পর্কেও বলতে হবে।.....
এভাবে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা প্রত্যেকের স্বামী সম্পর্কে একে একে দশজন মহিলার মন্তব্য তুলে ধরলেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মনে তার কথা শুনে যাচ্ছেন। চেহারায় বিরক্তির কোনো লেশ নেই। নেই কোনো প্রচ্ছন্ন উপেক্ষা যে, আয়েশা আমার সাথে এসব কী গল্প করছে?
একাদশতম মহিলা বলল, আমার স্বামী আবু যুরআ। তার কথা আমি কী বলব। সে আমাকে এত বেশি গহনা দিয়েছে যে আমার কান ভারী হয়ে গিয়েছে। আমার বাজুতে মেদ জমেছে এবং আমি এত সন্তুষ্ট হযেছি যে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি। সে আমাকে এনেছে অত্যন্ত গরিব পরিবার থেকে, যে পরিবার ছিল মাত্র কয়েকটি বকরির মালিক। সে আমাকে অত্যন্ত ধনী পরিবারে নিয়ে আসে। যেখানে ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি এবং উটের হাওদার আওয়াজ এবং শষ্য মাড়াইয়ের খসখসানি শব্দ শোনা যায়। সে আমাকে ধন-সম্পদের মধ্যে রেখেছে। আমি যা কিছু বলতাম সে বিদ্রুপ করত না। আমি নিদ্রা যেতাম এবং সকালে দেরি করে উঠতাম। যখন আমি পান করতাম অত্যন্ত তৃপ্তি সহকারে পান করতাম।
আর আবু যারআর কথা কী বলব। তার পাত্র ছিল সর্বদা পরিপূর্ণ। তার ঘর ছিল প্রশস্ত। আবু যারআর পুত্রের কথা কী বলব। সেও খুব ভালো ছিল। তার শয্যা এত সংকীর্ণ ছিল, মনে হত যেন কোষবদ্ধ তরবারি। অর্থাৎ সে অত্যন্ত হালকা পাতলা দেহের অধিকারী। তার খাদ্য হচ্ছে ছাগলের একখানা পা। আর আবু যারআর কন্যা সম্পর্কে বলতে হয় সে কতই না ভালো। সে বাবা-মার একান্ত বাধ্যগত সন্তান। অত্যন্ত সু-সাস্থ্যের অধিকারিণী। যে কারণে সতীনরা তাকে হিংসা করে। আবু যারআর ক্রীতদাসীরও অনেক গুণ ছিল। কোনো গোপন কথা প্রকাশ করত না। সে আমাদের সম্পদকে কমাত এবং আমাদের আবর্জনা দিয়ে ভরে রাখত না। সে মহিলা আরও বলল, একদিন দুধ দোহন করার সময় আবু যারআ বাইরে বেরিয়ে এমন একজন মহিলাকে দেখতে পেল, যার দুটি পুত্র সন্তান রয়েছে। ওরা মায়ের স্তন নিয়ে বাঘের মত খেলা করছিল (দুধ পান করছিল)। সে ঐ মহিলাকে দেখে আকৃষ্ট হল এবং আমাকে তালাক দিয়ে তাকে বিয়ে করে ফেলল। এরপর এক সম্মানী ব্যক্তির সাথে আমার বিয়ে হল। সে দ্রুতগামী অশ্বে আরোহণ করত এবং হাতে বর্শা রাখত। সে আমাকে অনেক সম্পদ দিয়েছে এবং প্রত্যেক প্রকারের গৃহপালিত জন্তু থেকে এক একজোড়া আমাকে দিয়েছে এবং বলেছে, হে উম্মে যারআ! তুমি এ সম্পদ থেকে খাও, পরিধান কর এবং উপহার দাও। মহিলা আরও বলল, আমার এই স্বামী যা দিয়েছে তা আবু যারআর একটি ক্ষুদ্র পাত্রও পূর্ণ করতে পারবে না।
আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, (এতক্ষণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্যের সাথে শুধু শুনেই যাচ্ছিলেন। সব শুনে) তিনি বললেন, আবু যারআ তার স্ত্রী উম্মে যারআর প্রতি যেরূপ আমিও তোমার প্রতি অনুরূপ। (পার্থক্য এতটুকুই) আবু যারআ তাকে তালাক দিয়েছিল, তবে আমি তোমাকে তালাক দেব না এবং তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করব।' ১১২
আহা! নবিজির কী মধুর ভালোবাসামাখা উত্তর! বিরক্তি তো দূরের কথা। এমন উত্তরে জগতের কোনো স্ত্রীর কলিজা শীতল না হয়ে কি পারে!
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই হাদিস থেকে অর্জিত শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন,
'এই হাদিসের মাঝে পরিবারের সাথে উত্তম আচরণ, আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার এবং তাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করার শিক্ষা রয়েছে। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু যেন কখনোই বৈধতার গণ্ডি পেরিয়ে নিষিদ্ধ সীমানায় চলে না যায়।'
নিষিদ্ধ সীমানা বলতে উনি বুঝিয়েছেন, যেমন-স্ত্রীর সঙ্গে বসে কারও গীবত করা। পরচর্চা করা। নাটক, সিনেমা, গান, সিরিয়াল, খেলা ইত্যাদি নাজায়েজ বিষয় নিয়ে কথা বলা। কেননা এসব আলোচনা মানুষের গোনাহর বোঝাকে ভারী করে এবং মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল রাখে।
অনেক দীনদার লোক আছেন, যারা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসেন না। তাদের সঙ্গে গল্প করেন না। বাসায় এসে তাদের সাথে অন্তরঙ্গভাবে মেশেন না। মন খুলে কথা বলেন না। তারা মনে করেন, এতে স্ত্রী-সন্তান ও ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের প্রতি মহব্বত বেড়ে যায় এবং এগুলো মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল করে দেয়। তাদের ধারণানুযায়ী আল্লাহর রাসুলের সুন্নত ও সাহাবায়ে কেরামের আমলও এমন ছিল। তারা নবিজির সুন্নতেরই অনুসরণ করছেন।
এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল এমন ছিল না।
নিম্নোক্ত হাদিসটি পড়ুন।
হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
'একবার আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু আমার সঙ্গে দেখা করলেন এবং আমাকে বললেন, হে হানযালা! তুমি কেমন আছো? আমি বললাম, হানযালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে। সে সময় তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ তুমি কী বলছ? হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি বললাম, আমরা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থাকি। তিনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা শোনান, মনে হয় যেন উভয়টি আমরা চাক্ষুস দেখছি। তারপর আমরা যখন রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে আপন স্ত্রী-সন্তান এবং ধন-সম্পদের কাছে যাই তখন আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর কসম! আমারও তো একই অবস্থা। নিশ্চয়ই আমরা এ বিষয়ে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ
করব। তারপর আমি এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা রওনা করলাম। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা কী? আমি বললাম। আমরা আপনার কাছে থাকি। আপনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা মনে করিয়ে দেন। যেন আমরা তা স্বচক্ষে দেখতে পাই। তারপর আমরা যখন আপনার নিকট হতে বের হই এবং স্ত্রী-সন্তানদের কাছে যাই সে সময় আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, আমি তার কসম করে বলছি, আমার কাছে থাকাকালে তোমাদের যে অবস্থা হয়, যদি তোমরা সবসময় এ অবস্থায় অনড় থাকতে এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতে তাহলে অবশ্যই ফেরেশতাগণ তোমাদের বিছানায় ও রাস্তায় তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত। কিন্তু হে হানযালা! এক ঘন্টা (আল্লাহর যিকিরে) আর এক ঘন্টা (দুনিয়াবি কাজে ব্যয় করবে) অর্থাৎ আস্তে আস্তে (চেষ্টা করো)। এ কথাটি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বললেন। ১১১৩
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
'আমরা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় আমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তা ও হাসি তামাশা করা থেকে দূরে থাকতাম এই ভয়ে যে, এ বিষয়ে আমাদেরকে সতর্ক করে কোনো ওহি অবতীর্ণ হয়ে যায় নাকি। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আমরা তাদের সঙ্গে নির্ভয়ে কথাবার্তা বলতাম ও হাসি-তামাশা করতাম। ১১১৪

টিকাঃ
১১২ সহিহ বুখারি: ৪৮১০।
১১০ সহিহ মুসলিম : ৬৭১৩।
১১৪ সহিহ বুখারি : ৪৮০৮।

অনেক পুরুষ আছে কাজে অকাজে সারাক্ষণ বাসার বাহিরে বাহিরে থাকে। ঘুরে বেড়ায়। আড্ডা দেয়। তারপর রাত করে বাড়ি ফিরে।
আবার অনেকে আছে, বাসায় ফিরে গভীর রাত পর্যন্ত টিভি, মোবাইল, ফেইসবুক, ইন্টারন্টে—এসব নিয়ে পড়ে থাকে।
এগুলো দাম্পত্য জীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পারস্পরিক সম্পর্কের বাঁধনকে শিথীল করে। সংসারে দূরত্ব সৃষ্টি করে।
আবার অনেক পুরুষ মনে করে, 'পরিবারকে সময় দেওয়ার কী আছে? এই যে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম—এ সব কিছু আমি কার জন্য করছি? এগুলো তো আমি আমার পরিবারের জন্যই করছি'
আচ্ছা, একজন পুরুষের কাছে দাম্পত্য জীবনের মানে কি শুধু স্ত্রী-সন্তানদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা? যা যা প্রয়োজন সব এনে দেওয়া?
টাকা-পয়সার প্রয়োজনই কী মানুষের জীবনে সব? থাকা-খাওয়ার ভালো ব্যবস্থার জন্যই কি একজন নারী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়? আপনজন সবাইকে ছেড়ে একজন অপরিচিত মানুষের পরিবারে চলে আসে? তার বাবার বাসায় কি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না? নাকি কোনো অভাব ছিল?
আবার অনেকে মনে করে, স্ত্রী-সন্তানদের সময় দিলে, তাদের সঙ্গে গল্প করলে নিজের ভারিত্ব কমে যাবে। তাই সে সবসময় একটা গুরুগম্ভীর ভাব বজায় রাখে। সবাই তাকে ভয় করে। ছোট বাচ্চারা তাকে দেখলে কেমন ফ্যাকাসে হয়ে যায়। বড়রাও কাছে আসতে ইতস্তত করে। তাকে কখনো স্ত্রীর সঙ্গে নরম ও কোমল সুরে কথা বলতে দেখা যায় না।
অথচ স্ত্রীদের সঙ্গে নবিজির আচরণ মোটেও এমন ছিলো না। তিনি গোটা মানবজাতির জন্য, বিশ্ব জাহানের জন্য নবি হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। সমগ্র মানবজাতির হেদায়াত ও মুক্তি ছিল তার চিন্তার বিষয়। নবুওয়াত ও রিসালাতের মহা গুরুদায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। তারপরও তিনি পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতেন। স্ত্রীদের সাথে বসে গল্প করতেন। তাদের যাবতীয় হক আদায় করতেন। তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতেন।
নবি জীবনে এমন দৃষ্টান্ত অসংখ্য। নমুনাস্বরূপ নিয়ে আমরা আবু যুরআর সুদীর্ঘ হাদিসটি তুলে ধরছি। তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের কীভাবে সময় দিতেন। কত লম্বা সময় ধরে তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। তাদের কথা শুনতেন। আমার আপনার দায়িত্ব ও ব্যস্ততা নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের চেয়ে অধিক না? আমার আপনার সময় নিশ্চয়ই তাঁর সময়ের চেয়ে অধিক দামী না?
একদিন আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বসে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে গল্প করছিলেন। গল্পটি হলো—
'তিনি বলেন, এগারো জন মহিলা একস্থানে একত্রিত হয়ে বসল। তারা সকলে মিলে এই কথার উপর একমত হল যে, তারা নিজেদের স্বামীর কোনো তথ্যই গোপন রাখবে না। প্রথমজন বলল, আমার স্বামী হচ্ছে অত্যন্ত হালকা-পাতলা দুর্বল উটের গোশতের ন্যায়, যেন কোনো পাহাড়ের চূড়ায় রাখা হয়েছে এবং সেখানে আরোহন করা সহজ কাজ নয় এবং গোশতের মধ্যে এত চর্বিও নেই, যে কারণে সেখানে উঠার জন্য কেউ কষ্ট স্বীকার করবে। দ্বিতীয় মহিলা বলল, আমি আমার স্বামী সম্পর্কে কিছু বলব না। কারণ, আমি ভয় করছি যে তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেষ করা যাবে না। কেননা যদি আমি তার সম্পর্কে বলতে যাই, তাহলে আমাকে তার সকল দুর্বলতা এবং মন্দ দিকগুলো সম্পর্কেও বলতে হবে।.....
এভাবে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা প্রত্যেকের স্বামী সম্পর্কে একে একে দশজন মহিলার মন্তব্য তুলে ধরলেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মনে তার কথা শুনে যাচ্ছেন। চেহারায় বিরক্তির কোনো লেশ নেই। নেই কোনো প্রচ্ছন্ন উপেক্ষা যে, আয়েশা আমার সাথে এসব কী গল্প করছে?
একাদশতম মহিলা বলল, আমার স্বামী আবু যুরআ। তার কথা আমি কী বলব। সে আমাকে এত বেশি গহনা দিয়েছে যে আমার কান ভারী হয়ে গিয়েছে। আমার বাজুতে মেদ জমেছে এবং আমি এত সন্তুষ্ট হযেছি যে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি। সে আমাকে এনেছে অত্যন্ত গরিব পরিবার থেকে, যে পরিবার ছিল মাত্র কয়েকটি বকরির মালিক। সে আমাকে অত্যন্ত ধনী পরিবারে নিয়ে আসে। যেখানে ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি এবং উটের হাওদার আওয়াজ এবং শষ্য মাড়াইয়ের খসখসানি শব্দ শোনা যায়। সে আমাকে ধন-সম্পদের মধ্যে রেখেছে। আমি যা কিছু বলতাম সে বিদ্রুপ করত না। আমি নিদ্রা যেতাম এবং সকালে দেরি করে উঠতাম। যখন আমি পান করতাম অত্যন্ত তৃপ্তি সহকারে পান করতাম।
আর আবু যারআর কথা কী বলব। তার পাত্র ছিল সর্বদা পরিপূর্ণ। তার ঘর ছিল প্রশস্ত। আবু যারআর পুত্রের কথা কী বলব। সেও খুব ভালো ছিল। তার শয্যা এত সংকীর্ণ ছিল, মনে হত যেন কোষবদ্ধ তরবারি। অর্থাৎ সে অত্যন্ত হালকা পাতলা দেহের অধিকারী। তার খাদ্য হচ্ছে ছাগলের একখানা পা। আর আবু যারআর কন্যা সম্পর্কে বলতে হয় সে কতই না ভালো। সে বাবা-মার একান্ত বাধ্যগত সন্তান। অত্যন্ত সু-সাস্থ্যের অধিকারিণী। যে কারণে সতীনরা তাকে হিংসা করে। আবু যারআর ক্রীতদাসীরও অনেক গুণ ছিল। কোনো গোপন কথা প্রকাশ করত না। সে আমাদের সম্পদকে কমাত এবং আমাদের আবর্জনা দিয়ে ভরে রাখত না। সে মহিলা আরও বলল, একদিন দুধ দোহন করার সময় আবু যারআ বাইরে বেরিয়ে এমন একজন মহিলাকে দেখতে পেল, যার দুটি পুত্র সন্তান রয়েছে। ওরা মায়ের স্তন নিয়ে বাঘের মত খেলা করছিল (দুধ পান করছিল)। সে ঐ মহিলাকে দেখে আকৃষ্ট হল এবং আমাকে তালাক দিয়ে তাকে বিয়ে করে ফেলল। এরপর এক সম্মানী ব্যক্তির সাথে আমার বিয়ে হল। সে দ্রুতগামী অশ্বে আরোহণ করত এবং হাতে বর্শা রাখত। সে আমাকে অনেক সম্পদ দিয়েছে এবং প্রত্যেক প্রকারের গৃহপালিত জন্তু থেকে এক একজোড়া আমাকে দিয়েছে এবং বলেছে, হে উম্মে যারআ! তুমি এ সম্পদ থেকে খাও, পরিধান কর এবং উপহার দাও। মহিলা আরও বলল, আমার এই স্বামী যা দিয়েছে তা আবু যারআর একটি ক্ষুদ্র পাত্রও পূর্ণ করতে পারবে না।
আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, (এতক্ষণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্যের সাথে শুধু শুনেই যাচ্ছিলেন। সব শুনে) তিনি বললেন, আবু যারআ তার স্ত্রী উম্মে যারআর প্রতি যেরূপ আমিও তোমার প্রতি অনুরূপ। (পার্থক্য এতটুকুই) আবু যারআ তাকে তালাক দিয়েছিল, তবে আমি তোমাকে তালাক দেব না এবং তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করব।' ১১২
আহা! নবিজির কী মধুর ভালোবাসামাখা উত্তর! বিরক্তি তো দূরের কথা। এমন উত্তরে জগতের কোনো স্ত্রীর কলিজা শীতল না হয়ে কি পারে!
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই হাদিস থেকে অর্জিত শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন,
'এই হাদিসের মাঝে পরিবারের সাথে উত্তম আচরণ, আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার এবং তাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করার শিক্ষা রয়েছে। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু যেন কখনোই বৈধতার গণ্ডি পেরিয়ে নিষিদ্ধ সীমানায় চলে না যায়।'
নিষিদ্ধ সীমানা বলতে উনি বুঝিয়েছেন, যেমন-স্ত্রীর সঙ্গে বসে কারও গীবত করা। পরচর্চা করা। নাটক, সিনেমা, গান, সিরিয়াল, খেলা ইত্যাদি নাজায়েজ বিষয় নিয়ে কথা বলা। কেননা এসব আলোচনা মানুষের গোনাহর বোঝাকে ভারী করে এবং মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল রাখে।
অনেক দীনদার লোক আছেন, যারা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসেন না। তাদের সঙ্গে গল্প করেন না। বাসায় এসে তাদের সাথে অন্তরঙ্গভাবে মেশেন না। মন খুলে কথা বলেন না। তারা মনে করেন, এতে স্ত্রী-সন্তান ও ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের প্রতি মহব্বত বেড়ে যায় এবং এগুলো মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল করে দেয়। তাদের ধারণানুযায়ী আল্লাহর রাসুলের সুন্নত ও সাহাবায়ে কেরামের আমলও এমন ছিল। তারা নবিজির সুন্নতেরই অনুসরণ করছেন।
এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল এমন ছিল না।
নিম্নোক্ত হাদিসটি পড়ুন।
হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
'একবার আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু আমার সঙ্গে দেখা করলেন এবং আমাকে বললেন, হে হানযালা! তুমি কেমন আছো? আমি বললাম, হানযালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে। সে সময় তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ তুমি কী বলছ? হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি বললাম, আমরা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থাকি। তিনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা শোনান, মনে হয় যেন উভয়টি আমরা চাক্ষুস দেখছি। তারপর আমরা যখন রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে আপন স্ত্রী-সন্তান এবং ধন-সম্পদের কাছে যাই তখন আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর কসম! আমারও তো একই অবস্থা। নিশ্চয়ই আমরা এ বিষয়ে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ
করব। তারপর আমি এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা রওনা করলাম। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা কী? আমি বললাম। আমরা আপনার কাছে থাকি। আপনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা মনে করিয়ে দেন। যেন আমরা তা স্বচক্ষে দেখতে পাই। তারপর আমরা যখন আপনার নিকট হতে বের হই এবং স্ত্রী-সন্তানদের কাছে যাই সে সময় আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, আমি তার কসম করে বলছি, আমার কাছে থাকাকালে তোমাদের যে অবস্থা হয়, যদি তোমরা সবসময় এ অবস্থায় অনড় থাকতে এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতে তাহলে অবশ্যই ফেরেশতাগণ তোমাদের বিছানায় ও রাস্তায় তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত। কিন্তু হে হানযালা! এক ঘন্টা (আল্লাহর যিকিরে) আর এক ঘন্টা (দুনিয়াবি কাজে ব্যয় করবে) অর্থাৎ আস্তে আস্তে (চেষ্টা করো)। এ কথাটি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বললেন। ১১১৩
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
'আমরা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় আমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তা ও হাসি তামাশা করা থেকে দূরে থাকতাম এই ভয়ে যে, এ বিষয়ে আমাদেরকে সতর্ক করে কোনো ওহি অবতীর্ণ হয়ে যায় নাকি। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আমরা তাদের সঙ্গে নির্ভয়ে কথাবার্তা বলতাম ও হাসি-তামাশা করতাম। ১১১৪

টিকাঃ
১১২ সহিহ বুখারি: ৪৮১০।
১১০ সহিহ মুসলিম : ৬৭১৩।
১১৪ সহিহ বুখারি : ৪৮০৮।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করা

📄 স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করা


স্ত্রীর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করা, তার অভিযোগ ও সমস্যার কথাগুলো শোনা। এতে তার প্রতি আপনার গুরুত্ব ও ভালোবাসার বিষয়টি প্রকাশ পাবে। কোনো বিষয়ে পরামর্শ করার প্রয়োজন না থাকলেও আপনি তার সঙ্গে পরামর্শ করুন। তার মতামত জানুন। গুরুত্বের সঙ্গে তার কথা গ্রহণ করুন। ইনশাল্লাহ ভালো কিছু পেলেও পেতে পারেন। কারণ অনেক সময় স্ত্রী আপনাকে এমন পরামর্শ দিবে, সত্যিকার অর্থেই যা আপনার উপকার করবে।
স্ত্রীগণ যে অনেক সময় আসলেই ভালো পরামর্শ দিয়ে থাকেন, এমন দৃষ্টান্ত রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে অনেক। তিনি নবি হয়ে, আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে ওহিপ্রাপ্ত হয়েও আপন স্ত্রীদের সাথে পরামর্শ করতেন। বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন।
যেমন, হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় আম্মাজান উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘটনা। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবাগণকে উমরার জন্য আনা পশু কুরবানি করে ফেলার এবং মাথার চুল ফেলে দেওয়ার আদেশ করলেন। কিন্তু তারা তা করলেন না। মক্কায় প্রবেশ করে উমরা না করে ফিরে যেতে তাদের মন মানছিল না। তাই তারা পশু কুরবানি করতে চাচ্ছিলেন না।
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে কিছুটা মনঃক্ষুন্ন হলেন। বিষন্ন ও চিন্তিত মুখে তিনি আম্মাজান উম্মে সালামার তাঁবুতে প্রবেশ করলেন। কী করবেন ভাবছেন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর আদেশ পালন না করলে তাদের উপর আল্লাহর আযাব চলে আসতে পারে। তবে তাদের আবেগের কারণে তিনি তাদের কিছু বলতেও পারছেন না। উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিষয়টা বললেন। তিনি তখন এমন সময়োপযোগী একটি পরামর্শ দিলেন যে, সঙ্গে সঙ্গে এত বড় সমস্যা খুব সহজে সমাধান হয়ে গেল।
তিনি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আল'ইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনি নিজে গিয়ে সবার আগে মাথা চুল ফেলে দিন এবং কুরবানি করে নিন।'
তিনি গিয়ে মাথার চুল ফেলে কুরবানি করে নিলেন। সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরাম সকলে উঠে গিয়ে মাথার চুল ফেলে কুরবানি করতে শুরু করল।
আরেকটি ঘটনা শুনুন। হেরা গুহার অভ্যন্তরে সর্বপ্রথম নবিজি যখন ওহি লাভ করলেন, তখন তিনি খুব ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ঘরে ফিরে তিনি খাদিজা
রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে ঘনিষ্ট হয়ে বসলেন। তারপর তাকে সব খুলে বললেন। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকে সান্ত্বনা দিলেন। অভয় বাণী শুনিয়ে বললেন,
'এ ঘটনাকে আপনি পরম শুভ লক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করুন এবং অবিচল থাকুন। যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, আপনি এ যুগের মানবজাতির জন্য নবি হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।'*
দেখুন ওহির মতো জগতের সবচেয়ে মহান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে তিনি সর্বপ্রথম নিজ স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এমনটি মনে করেননি, একজন নারী আর কী পরামর্শ দিবে?!
আমরা তো কোনো বিষয়ে পরামর্শের ক্ষেত্রে স্ত্রীদের গুরুত্ব দিতে চাই না। তাদের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজনবোধ করিনা। ভালো পরামর্শ দিলেও অনেক সময় গ্রাহ্য করি না। এভাবে আমরা অনেক বরকত থেকে বঞ্চিত হই।
স্বামী যখন স্ত্রীকে গুরুত্ব প্রদান করে তখন স্ত্রী এভাবেই তার জীবনে ভূমিকা রাখে। আল্লাহ তায়ালা তাকে তার জন্য রহমত ও প্রশান্তির কারণ বানিয়ে দেন।
স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলুন। তাকে নিয়ে বসুন। পারস্পরিক কথাবার্তা, আলোচনা ও পরামর্শের দ্বারা দাম্পত্য জীবনের বন্ধন দৃঢ় হয়। ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়। একে অপরকে বোঝা সহজ হয়। পরস্পরের রুচিবোধ ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ হয়।
একদিন এক লোক আমার কাছে এসে বলল, আমাদের বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর হলো। বিভিন্ন কাজের হুকুম দেওয়া ছাড়া সারাদিন তার সঙ্গে আমার কোনো কথা হয় না। আমি কথা বলার মতো কোনো বিষয় খুঁজে পাই না।
বিষয় খুঁজে না পাওয়ার কিছু নেই। কথা বলার মতো অনেক বিষয় আছে। যেমন, আপনি আপনার স্ত্রীর সৌন্দর্য ও রূপের প্রশংসা করুন। তার রান্না-বান্না ও সাংসারিক অন্যান্য গুণের তারিফ করুন। সন্তানদের সাথে সারা বিশ্বে মুসলমানদের বর্তমান অবস্থা ও তাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলুন। নবি-রাসুল ও সাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন ঘটনা আলোচনা করুন। দুজন মিলে বসে তালিম করুন। একে অপরকে হাদিস পড়ে শোনান। সন্তানদের দ্বীনি ও শিক্ষা-দীক্ষার বিষয়ে কথা বলুন।

টিকাঃ
* সিরাতে ইবনে হিশাম।

স্ত্রীর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করা, তার অভিযোগ ও সমস্যার কথাগুলো শোনা। এতে তার প্রতি আপনার গুরুত্ব ও ভালোবাসার বিষয়টি প্রকাশ পাবে। কোনো বিষয়ে পরামর্শ করার প্রয়োজন না থাকলেও আপনি তার সঙ্গে পরামর্শ করুন। তার মতামত জানুন। গুরুত্বের সঙ্গে তার কথা গ্রহণ করুন। ইনশাল্লাহ ভালো কিছু পেলেও পেতে পারেন। কারণ অনেক সময় স্ত্রী আপনাকে এমন পরামর্শ দিবে, সত্যিকার অর্থেই যা আপনার উপকার করবে।
স্ত্রীগণ যে অনেক সময় আসলেই ভালো পরামর্শ দিয়ে থাকেন, এমন দৃষ্টান্ত রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে অনেক। তিনি নবি হয়ে, আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে ওহিপ্রাপ্ত হয়েও আপন স্ত্রীদের সাথে পরামর্শ করতেন। বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন।
যেমন, হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় আম্মাজান উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘটনা। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবাগণকে উমরার জন্য আনা পশু কুরবানি করে ফেলার এবং মাথার চুল ফেলে দেওয়ার আদেশ করলেন। কিন্তু তারা তা করলেন না। মক্কায় প্রবেশ করে উমরা না করে ফিরে যেতে তাদের মন মানছিল না। তাই তারা পশু কুরবানি করতে চাচ্ছিলেন না।
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে কিছুটা মনঃক্ষুন্ন হলেন। বিষন্ন ও চিন্তিত মুখে তিনি আম্মাজান উম্মে সালামার তাঁবুতে প্রবেশ করলেন। কী করবেন ভাবছেন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর আদেশ পালন না করলে তাদের উপর আল্লাহর আযাব চলে আসতে পারে। তবে তাদের আবেগের কারণে তিনি তাদের কিছু বলতেও পারছেন না। উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিষয়টা বললেন। তিনি তখন এমন সময়োপযোগী একটি পরামর্শ দিলেন যে, সঙ্গে সঙ্গে এত বড় সমস্যা খুব সহজে সমাধান হয়ে গেল।
তিনি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আল'ইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনি নিজে গিয়ে সবার আগে মাথা চুল ফেলে দিন এবং কুরবানি করে নিন।'
তিনি গিয়ে মাথার চুল ফেলে কুরবানি করে নিলেন। সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরাম সকলে উঠে গিয়ে মাথার চুল ফেলে কুরবানি করতে শুরু করল।
আরেকটি ঘটনা শুনুন। হেরা গুহার অভ্যন্তরে সর্বপ্রথম নবিজি যখন ওহি লাভ করলেন, তখন তিনি খুব ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ঘরে ফিরে তিনি খাদিজা
রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে ঘনিষ্ট হয়ে বসলেন। তারপর তাকে সব খুলে বললেন। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকে সান্ত্বনা দিলেন। অভয় বাণী শুনিয়ে বললেন,
'এ ঘটনাকে আপনি পরম শুভ লক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করুন এবং অবিচল থাকুন। যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, আপনি এ যুগের মানবজাতির জন্য নবি হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।'*
দেখুন ওহির মতো জগতের সবচেয়ে মহান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে তিনি সর্বপ্রথম নিজ স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এমনটি মনে করেননি, একজন নারী আর কী পরামর্শ দিবে?!
আমরা তো কোনো বিষয়ে পরামর্শের ক্ষেত্রে স্ত্রীদের গুরুত্ব দিতে চাই না। তাদের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজনবোধ করিনা। ভালো পরামর্শ দিলেও অনেক সময় গ্রাহ্য করি না। এভাবে আমরা অনেক বরকত থেকে বঞ্চিত হই।
স্বামী যখন স্ত্রীকে গুরুত্ব প্রদান করে তখন স্ত্রী এভাবেই তার জীবনে ভূমিকা রাখে। আল্লাহ তায়ালা তাকে তার জন্য রহমত ও প্রশান্তির কারণ বানিয়ে দেন।
স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলুন। তাকে নিয়ে বসুন। পারস্পরিক কথাবার্তা, আলোচনা ও পরামর্শের দ্বারা দাম্পত্য জীবনের বন্ধন দৃঢ় হয়। ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়। একে অপরকে বোঝা সহজ হয়। পরস্পরের রুচিবোধ ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ হয়।
একদিন এক লোক আমার কাছে এসে বলল, আমাদের বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর হলো। বিভিন্ন কাজের হুকুম দেওয়া ছাড়া সারাদিন তার সঙ্গে আমার কোনো কথা হয় না। আমি কথা বলার মতো কোনো বিষয় খুঁজে পাই না।
বিষয় খুঁজে না পাওয়ার কিছু নেই। কথা বলার মতো অনেক বিষয় আছে। যেমন, আপনি আপনার স্ত্রীর সৌন্দর্য ও রূপের প্রশংসা করুন। তার রান্না-বান্না ও সাংসারিক অন্যান্য গুণের তারিফ করুন। সন্তানদের সাথে সারা বিশ্বে মুসলমানদের বর্তমান অবস্থা ও তাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলুন। নবি-রাসুল ও সাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন ঘটনা আলোচনা করুন। দুজন মিলে বসে তালিম করুন। একে অপরকে হাদিস পড়ে শোনান। সন্তানদের দ্বীনি ও শিক্ষা-দীক্ষার বিষয়ে কথা বলুন।

টিকাঃ
* সিরাতে ইবনে হিশাম।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 পারস্পরিক বোঝাপড়া

📄 পারস্পরিক বোঝাপড়া


দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক বোঝাপড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে দাম্পত্য জীবন সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়। হৃদ্যতাপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি হয়। পারিবারিক মিলবন্ধন সুদৃঢ় হয়। অনেক কঠিন সমস্যাও তখন সহজে সমাধান করা যায়। অপরদিকে পারস্পরিক বোঝাপড়া না থাকলে সংসারে অনেক অশান্তি ও ফিতনার সৃষ্টি হয়। পারিবারিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। ক্রমাগত দূরত্ব বাড়তে থাকে। অনৈক্য দেখা দিতে থাকে। একে অন্যের উপর অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে থাকে এবং সবশেষে তা আমাদের জন্য এক অশুভ পরিণতি ডেকে আনে।
সেজন্য পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয়ে আমাদের সকলের সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা প্রয়োজন। আমরা আমাদের চারপাশে একটু দৃষ্টি দিলেই দেখতে পাই, পারস্পরিক বোঝাপড়া ভালো না থাকায় কত পরিবার ভেঙে গেছে। পাপের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে।
যেহেতু মানুষ দেহসর্বস্ব নয়, তার মাঝে আবেগ, অনুভূতি, মন, মনন ও আত্মার অস্তিত্ব বিদ্যমান। তাই আমাদের সর্বপ্রথম যেটা করতে হবে, সঙ্গীর এসব বিষয় বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তার রুচি ও অভিপ্রায় জানতে হবে এবং সেগুলোকে মূল্যায়ণ করতে হবে। তাকে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিতে হবে। তার সব বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
বিয়ের প্রথম দিকে এই সমস্যাগুলো হয় না। কারণ, তখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই সর্বাত্মক চেষ্টা থাকে একে অপরকে আকর্ষণ করার। তার মন জয় করার। স্যাক্রিফাইস করার। একটু অতিরিক্ত ভালো সেজে থাকার। দুজনের মাঝে তখন স্বভাব ও আচরণগত ভিন্নতা থাকলেও তারা সেটা প্রকাশের চেষ্টা করে না। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার চাদর দিয়ে সেসব ঢেকে রাখে।
সমস্যাটা হয় বিয়ের এক দু'বছর যাওয়ার পর। তখন উভয়ের আসল রূপটা প্রকাশ পায়।
স্বামী-স্ত্রী বুঝতে পারে তাদের দুজনের মাঝে যতটা না মিল তার চেয়ে অনেক অমিল।
এতদিন তাদের মাঝে সবকিছু ঠিকভাবে চললেও এখন আর চলছেনা। সংসার নামক গাড়িটা একটু পরপর কোথায় যেন আটকে যাচ্ছে। কিসের সাথে যেন ধাক্কা
খাচ্ছে। সংসারটাকে দিন দিন কেমন যেন কঠিন মনে হচ্ছে। রসকসহীন। তিক্ত। বিস্বাদ। একঘেঁয়ে।
এখন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রায়ই তাদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয়। কথা কাটাকাটি হয়।
অবশ্য মতবিরোধের এ বিষয়টি একেবারে নেতিবাচক নয়। এর অনেক ইতিবাচক দিকও রয়েছে। স্বভাব ও রুচিবোধের এই যে ভিন্নতা ও বৈচিত্র, এটি মানুষের প্রকৃতিগত বিষয়। এই বৈচিত্রগুণের বলেই মানুষ একে অপরকে আকর্ষণ করে থাকে। এর মাধ্যমে দাম্পত্যজীবনে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। একে অপরকে ভালোভাবে জানার ও বোঝার প্রয়োজন অনুভূত হয়। উভয়ে তখন নিজেকে ভেঙ্গে নতুন করে গড়ার চেষ্টা করে। নানা বৈচিত্র ও ভিন্নতার মাঝে তারা ঐক্যের সুর খুঁজে ফিরে।
এতদিন যা ছিল কৃত্রিম এখন তা বাস্তব রূপ লাভ করে।
পারস্পরিক আন্তরিকতা ও ভালোবাসা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। স্বামী-স্ত্রী সেসব সফলভাবে মোকাবেলা করে দাম্পত্য জীবনকে আরও মজবুত ও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়।
কিন্তু আসল সমস্যাটা দেখা দেয় যখন আমরা একে অপরের উপর নিজেদের অভিপ্রায় ও অভিরুচি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। সঙ্গিকে নিজের ভাবশিষ্য বানানোর চেষ্টা করি এবং এভাবে আমরা দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে মারাত্মক ভুলটা করি।
কারণ, এমতাবস্থায় পারস্পরিক মতানৈক্য ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতগুলো চরম আকার ধারণ করে।
দুজনের মাঝে সত্তাগত এবং স্বভাব-প্রকৃতিগত পার্থক্য ও বৈচিত্রগুলো যদি আমরা সুস্পষ্টরূপে আবিষ্কার করতে পারি এবং সেগুলোকে যথাস্মান ও সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে পারি, তাহলেই দাম্পত্য জীবনের সমস্যাগুলো অনেকাংশে আমরা কমিয়ে ফেলতে পারি। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে একজন নারী একজন পুরুষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন দৈহিক গঠনের দিক থেকে, তেমনি রুচিবোধ, অভ্যাস, চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মন-মানসিকতার দিক থেকে।

দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক বোঝাপড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে দাম্পত্য জীবন সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়। হৃদ্যতাপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি হয়। পারিবারিক মিলবন্ধন সুদৃঢ় হয়। অনেক কঠিন সমস্যাও তখন সহজে সমাধান করা যায়। অপরদিকে পারস্পরিক বোঝাপড়া না থাকলে সংসারে অনেক অশান্তি ও ফিতনার সৃষ্টি হয়। পারিবারিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। ক্রমাগত দূরত্ব বাড়তে থাকে। অনৈক্য দেখা দিতে থাকে। একে অন্যের উপর অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে থাকে এবং সবশেষে তা আমাদের জন্য এক অশুভ পরিণতি ডেকে আনে।
সেজন্য পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয়ে আমাদের সকলের সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা প্রয়োজন। আমরা আমাদের চারপাশে একটু দৃষ্টি দিলেই দেখতে পাই, পারস্পরিক বোঝাপড়া ভালো না থাকায় কত পরিবার ভেঙে গেছে। পাপের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে।
যেহেতু মানুষ দেহসর্বস্ব নয়, তার মাঝে আবেগ, অনুভূতি, মন, মনন ও আত্মার অস্তিত্ব বিদ্যমান। তাই আমাদের সর্বপ্রথম যেটা করতে হবে, সঙ্গীর এসব বিষয় বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তার রুচি ও অভিপ্রায় জানতে হবে এবং সেগুলোকে মূল্যায়ণ করতে হবে। তাকে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিতে হবে। তার সব বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
বিয়ের প্রথম দিকে এই সমস্যাগুলো হয় না। কারণ, তখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই সর্বাত্মক চেষ্টা থাকে একে অপরকে আকর্ষণ করার। তার মন জয় করার। স্যাক্রিফাইস করার। একটু অতিরিক্ত ভালো সেজে থাকার। দুজনের মাঝে তখন স্বভাব ও আচরণগত ভিন্নতা থাকলেও তারা সেটা প্রকাশের চেষ্টা করে না। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার চাদর দিয়ে সেসব ঢেকে রাখে।
সমস্যাটা হয় বিয়ের এক দু'বছর যাওয়ার পর। তখন উভয়ের আসল রূপটা প্রকাশ পায়।
স্বামী-স্ত্রী বুঝতে পারে তাদের দুজনের মাঝে যতটা না মিল তার চেয়ে অনেক অমিল।
এতদিন তাদের মাঝে সবকিছু ঠিকভাবে চললেও এখন আর চলছেনা। সংসার নামক গাড়িটা একটু পরপর কোথায় যেন আটকে যাচ্ছে। কিসের সাথে যেন ধাক্কা
খাচ্ছে। সংসারটাকে দিন দিন কেমন যেন কঠিন মনে হচ্ছে। রসকসহীন। তিক্ত। বিস্বাদ। একঘেঁয়ে।
এখন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রায়ই তাদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয়। কথা কাটাকাটি হয়।
অবশ্য মতবিরোধের এ বিষয়টি একেবারে নেতিবাচক নয়। এর অনেক ইতিবাচক দিকও রয়েছে। স্বভাব ও রুচিবোধের এই যে ভিন্নতা ও বৈচিত্র, এটি মানুষের প্রকৃতিগত বিষয়। এই বৈচিত্রগুণের বলেই মানুষ একে অপরকে আকর্ষণ করে থাকে। এর মাধ্যমে দাম্পত্যজীবনে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। একে অপরকে ভালোভাবে জানার ও বোঝার প্রয়োজন অনুভূত হয়। উভয়ে তখন নিজেকে ভেঙ্গে নতুন করে গড়ার চেষ্টা করে। নানা বৈচিত্র ও ভিন্নতার মাঝে তারা ঐক্যের সুর খুঁজে ফিরে।
এতদিন যা ছিল কৃত্রিম এখন তা বাস্তব রূপ লাভ করে।
পারস্পরিক আন্তরিকতা ও ভালোবাসা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। স্বামী-স্ত্রী সেসব সফলভাবে মোকাবেলা করে দাম্পত্য জীবনকে আরও মজবুত ও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়।
কিন্তু আসল সমস্যাটা দেখা দেয় যখন আমরা একে অপরের উপর নিজেদের অভিপ্রায় ও অভিরুচি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। সঙ্গিকে নিজের ভাবশিষ্য বানানোর চেষ্টা করি এবং এভাবে আমরা দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে মারাত্মক ভুলটা করি।
কারণ, এমতাবস্থায় পারস্পরিক মতানৈক্য ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতগুলো চরম আকার ধারণ করে।
দুজনের মাঝে সত্তাগত এবং স্বভাব-প্রকৃতিগত পার্থক্য ও বৈচিত্রগুলো যদি আমরা সুস্পষ্টরূপে আবিষ্কার করতে পারি এবং সেগুলোকে যথাস্মান ও সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতে পারি, তাহলেই দাম্পত্য জীবনের সমস্যাগুলো অনেকাংশে আমরা কমিয়ে ফেলতে পারি। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে একজন নারী একজন পুরুষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন দৈহিক গঠনের দিক থেকে, তেমনি রুচিবোধ, অভ্যাস, চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মন-মানসিকতার দিক থেকে।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 স্ত্রীর সঙ্গে কঠোর আচরণ না করা

📄 স্ত্রীর সঙ্গে কঠোর আচরণ না করা


যেহেতু নারীদের অনেক নায়ক তবিয়ত দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাই তার উপর অধিক চাপ প্রয়োগ করতে থাকলে, তার সঙ্গে কঠোর আচরণ করতে থাকলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'তোমরা নারীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো। কারণ, তাদের পাঁজরের হাড্ডি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড্ডিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাঁকা হল উপরেরটি। যদি তুমি তা সোজা করতে যাও তাহলে ভেঙে ফেলবে। আর যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় রেখে দিলে বাঁকাই থেকে যাবে। সুতরাং তোমরা নারীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।'১১৬
সুতরাং যেটা অসম্ভব সেটা করতে যেও না। অর্থাৎ তাকে সম্পূর্ণরূপে সোজা করতে যাওয়া। তুমি বরং তোমার স্ত্রীর মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করো। তার স্বভাব-প্রকৃতি অনুধাবনের চেষ্টা করো এবং তার সঙ্গে নরম ও কোমল আচরণ করো।
ইমাম বাইযাবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাদিসে ব্যবহৃত اسْتَوْصُوا শব্দের অর্থ হলো, আমি তোমাদের তাদের ব্যাপারে কল্যাণকামিতার আদেশ করছি। সুতরাং তোমরা আমার আদেশ পালন করো এবং তাদের কল্যাণ কামনা করো।
হাদিসে এদিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, শরয়িভাবে বৈধ এমন বিষয়ে নারীকে তার স্বভাবগত বক্রতার উপর ছেড়ে দেওয়া। সে যেভাবে আছে সেভাবেই তার সঙ্গে থাকা। তাকে সোজা করার চেষ্টা না করা। মনে রাখতে হবে, বক্রতাও এক প্রকার সৌন্দর্য। চোখের ভ্রুটা বক্র না হয়ে যদি সোজা হত, তাহলে তা দেখতে লাগতো না।
তবে সে যদি স্বভাবগত বক্রতার কারণে কোনো গুনাহে লিপ্ত হয়, আল্লাহর নাফরমানি করে, ওয়াজিব কোনো আমল ছেড়ে দেয়, তখন আর তাকে ছাড় দেওয়া যাবে না।
অনুরূপভাবে হাদিসে এদিকেও ইঙ্গিত রয়েছে যে, নারীকে ক্ষমার মাধ্যমে শাসন করতে হবে। নম্রভাবে তাকে পরিচালিত করতে হবে। তার অসদাচরণ ও দুর্ব্যবহারে ধৈর্যধারণ করতে হবে। বিচক্ষণতা ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
অপর একটি হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'কোনো মুমিন পুরুষ কোনো মুমিন নারীর প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষ পোষণ করবে না। তার কোনো স্বভাব-চরিত্র অপছন্দ হলে অন্য কোনো স্বভাব-চরিত্র তার অবশ্যই পছন্দ হবে।' ১১৭
অর্থাৎ সে তার কোনো কিছু এমনভাবে ঘৃণা করবে না, যার কারণে তার সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটাতে হয়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'তোমরা আমার পক্ষ হতে নারীদের প্রতি সদাচরণের উপদেশ গ্রহণ করো। কেননা তারা তো তোমাদের কাছে আটকে আছে।' ১১৮
এটা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিদায় হজ্বে প্রদত্ত ভাষণের অংশবিশেষ। কত চমৎকার উপমা দেখুন। 'নারীরা তোমাদের নিকট আটকে আছে।' কারণ, তারা পুরুষের নিকট বন্দির ন্যায়। ভগ্ন হৃদয়, ডানা ভাঙ্গা পাখির ন্যায়। তাই পুরুষের উচিত তার ভগ্ন হৃদয়কে জোড়া লাগানো। তার প্রতি সদাচরণ করা। তাকে সম্মান করা। তাকে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা। সে কোনো ভুল করে ফেললে ক্ষমা করা। এটি অনেক বড় একটি শিষ্টাচার। সুমহান আখলাকের পরিচায়ক। বিশেষ করে স্ত্রীর রাগের সময়।
অনুরূপভাবে এই হাদিস থেকে আমরা আরেকটি নির্দেশনা লাভ করি, আর তা হচ্ছে, স্ত্রী তার স্বামীর কাছে থাকতে বাধ্য। তার অনুমতি ছাড়া সে কোথাও যাবে না ও কোথাও থাকবে না। স্বামীর গৃহকেই নিজ গৃহ মনে করবে। এটাকেই সে আপন ভুবন বানিয়ে নিবে।
এবার এই হাদিসটি শুনুন। আমি একটু পর পর হাদিস উল্লেখ করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসুলের আদর্শের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছি। কারণ তিনিই আমাদের জন্য আদর্শের বাতি, আলোকবর্তিকা।
তাই আমাদের তার আদর্শ অধ্যয়ন করা ও তা গ্রহণ করা উচিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
'তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মাঝে উত্তম আদর্শ রয়েছে।' ১১১৯
নাসাঈ শরিফে 'স্ত্রীর সঙ্গে আচরণ' অধ্যায়ে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে,
'আম্মাজান সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কোনো এক সফরে ছিলেন, সেদিন তার পালা ছিল। কাফেলা থেকে পিছনে পড়ে যাওয়ার কারণে তার আসতে বিলম্ব হল। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগিয়ে এসে তাকে গ্রহণ করলেন। তিনি তখন কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, আপনি আমাকে একটি ধীরগামী উটে চড়িয়েছেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দু হাত দিয়ে তার অশ্রু মুছে দিলেন এবং তাকে শান্ত করলেন।'
আল্লাহু আকবার! আল্লাহর রাসুল নিজ হাতে তার চোখ মুছে দিচ্ছেন এবং তাকে শান্ত করছেন। কিন্তু তারপরও তিনি যখন কেঁদে চললেন, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগ করে তাকে ত্যাগ করলেন। সাফিয়্যা তখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে গিয়ে বললেন, আমার ভাগের আজকের দিনটি তোমাকে দিয়ে দিলাম। দেখ তুমি তাকে সন্তুষ্ট করতে পারো কি না। তখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কী করলেন?
হে নারী! তুমি একটু মনোযোগের সঙ্গে শ্রবণ করো। এই হাদিসটি সামনে ইনশাআল্লাহ আসবে। কিন্তু আমি বলছি, এখানে তুমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বুদ্ধিমত্তার প্রতি লক্ষ করো। কীভাবে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মন ভালো করলেন।
তিনি কী করলেন, তার ওড়নাটিতে গোলাব ও জাফরানের পানি ছিটালেন, যাতে সুঘ্রাণ আসে। তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিয়রের কাছে এসে বসলেন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার? আজকে তুমি আমার কাছে? তখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা দান করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারলেন সাফিয়্যা তার ভাগের দিনটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দিয়েছেন। তিনি তখন সাফিয়্যার প্রতি খুশি হয়ে গেলেন।

টিকাঃ
১১৬ সহিহ বুখারি: ৩৩৩১, ৫১১৬।
১১৭ সহিহ মুসলিম: ১৪৬৯।
১১৮ সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫১।
* সুরা হুজুরাত : ২১।

যেহেতু নারীদের অনেক নায়ক তবিয়ত দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাই তার উপর অধিক চাপ প্রয়োগ করতে থাকলে, তার সঙ্গে কঠোর আচরণ করতে থাকলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'তোমরা নারীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো। কারণ, তাদের পাঁজরের হাড্ডি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড্ডিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাঁকা হল উপরেরটি। যদি তুমি তা সোজা করতে যাও তাহলে ভেঙে ফেলবে। আর যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় রেখে দিলে বাঁকাই থেকে যাবে। সুতরাং তোমরা নারীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।'১১৬
সুতরাং যেটা অসম্ভব সেটা করতে যেও না। অর্থাৎ তাকে সম্পূর্ণরূপে সোজা করতে যাওয়া। তুমি বরং তোমার স্ত্রীর মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করো। তার স্বভাব-প্রকৃতি অনুধাবনের চেষ্টা করো এবং তার সঙ্গে নরম ও কোমল আচরণ করো।
ইমাম বাইযাবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হাদিসে ব্যবহৃত اسْتَوْصُوا শব্দের অর্থ হলো, আমি তোমাদের তাদের ব্যাপারে কল্যাণকামিতার আদেশ করছি। সুতরাং তোমরা আমার আদেশ পালন করো এবং তাদের কল্যাণ কামনা করো।
হাদিসে এদিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, শরয়িভাবে বৈধ এমন বিষয়ে নারীকে তার স্বভাবগত বক্রতার উপর ছেড়ে দেওয়া। সে যেভাবে আছে সেভাবেই তার সঙ্গে থাকা। তাকে সোজা করার চেষ্টা না করা। মনে রাখতে হবে, বক্রতাও এক প্রকার সৌন্দর্য। চোখের ভ্রুটা বক্র না হয়ে যদি সোজা হত, তাহলে তা দেখতে লাগতো না।
তবে সে যদি স্বভাবগত বক্রতার কারণে কোনো গুনাহে লিপ্ত হয়, আল্লাহর নাফরমানি করে, ওয়াজিব কোনো আমল ছেড়ে দেয়, তখন আর তাকে ছাড় দেওয়া যাবে না।
অনুরূপভাবে হাদিসে এদিকেও ইঙ্গিত রয়েছে যে, নারীকে ক্ষমার মাধ্যমে শাসন করতে হবে। নম্রভাবে তাকে পরিচালিত করতে হবে। তার অসদাচরণ ও দুর্ব্যবহারে ধৈর্যধারণ করতে হবে। বিচক্ষণতা ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
অপর একটি হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'কোনো মুমিন পুরুষ কোনো মুমিন নারীর প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষ পোষণ করবে না। তার কোনো স্বভাব-চরিত্র অপছন্দ হলে অন্য কোনো স্বভাব-চরিত্র তার অবশ্যই পছন্দ হবে।' ১১৭
অর্থাৎ সে তার কোনো কিছু এমনভাবে ঘৃণা করবে না, যার কারণে তার সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটাতে হয়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'তোমরা আমার পক্ষ হতে নারীদের প্রতি সদাচরণের উপদেশ গ্রহণ করো। কেননা তারা তো তোমাদের কাছে আটকে আছে।' ১১৮
এটা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিদায় হজ্বে প্রদত্ত ভাষণের অংশবিশেষ। কত চমৎকার উপমা দেখুন। 'নারীরা তোমাদের নিকট আটকে আছে।' কারণ, তারা পুরুষের নিকট বন্দির ন্যায়। ভগ্ন হৃদয়, ডানা ভাঙ্গা পাখির ন্যায়। তাই পুরুষের উচিত তার ভগ্ন হৃদয়কে জোড়া লাগানো। তার প্রতি সদাচরণ করা। তাকে সম্মান করা। তাকে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা। সে কোনো ভুল করে ফেললে ক্ষমা করা। এটি অনেক বড় একটি শিষ্টাচার। সুমহান আখলাকের পরিচায়ক। বিশেষ করে স্ত্রীর রাগের সময়।
অনুরূপভাবে এই হাদিস থেকে আমরা আরেকটি নির্দেশনা লাভ করি, আর তা হচ্ছে, স্ত্রী তার স্বামীর কাছে থাকতে বাধ্য। তার অনুমতি ছাড়া সে কোথাও যাবে না ও কোথাও থাকবে না। স্বামীর গৃহকেই নিজ গৃহ মনে করবে। এটাকেই সে আপন ভুবন বানিয়ে নিবে।
এবার এই হাদিসটি শুনুন। আমি একটু পর পর হাদিস উল্লেখ করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসুলের আদর্শের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছি। কারণ তিনিই আমাদের জন্য আদর্শের বাতি, আলোকবর্তিকা।
তাই আমাদের তার আদর্শ অধ্যয়ন করা ও তা গ্রহণ করা উচিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
'তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মাঝে উত্তম আদর্শ রয়েছে।' ১১১৯
নাসাঈ শরিফে 'স্ত্রীর সঙ্গে আচরণ' অধ্যায়ে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে,
'আম্মাজান সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কোনো এক সফরে ছিলেন, সেদিন তার পালা ছিল। কাফেলা থেকে পিছনে পড়ে যাওয়ার কারণে তার আসতে বিলম্ব হল। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগিয়ে এসে তাকে গ্রহণ করলেন। তিনি তখন কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, আপনি আমাকে একটি ধীরগামী উটে চড়িয়েছেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দু হাত দিয়ে তার অশ্রু মুছে দিলেন এবং তাকে শান্ত করলেন।'
আল্লাহু আকবার! আল্লাহর রাসুল নিজ হাতে তার চোখ মুছে দিচ্ছেন এবং তাকে শান্ত করছেন। কিন্তু তারপরও তিনি যখন কেঁদে চললেন, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগ করে তাকে ত্যাগ করলেন। সাফিয়্যা তখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে গিয়ে বললেন, আমার ভাগের আজকের দিনটি তোমাকে দিয়ে দিলাম। দেখ তুমি তাকে সন্তুষ্ট করতে পারো কি না। তখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কী করলেন?
হে নারী! তুমি একটু মনোযোগের সঙ্গে শ্রবণ করো। এই হাদিসটি সামনে ইনশাআল্লাহ আসবে। কিন্তু আমি বলছি, এখানে তুমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বুদ্ধিমত্তার প্রতি লক্ষ করো। কীভাবে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মন ভালো করলেন।
তিনি কী করলেন, তার ওড়নাটিতে গোলাব ও জাফরানের পানি ছিটালেন, যাতে সুঘ্রাণ আসে। তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিয়রের কাছে এসে বসলেন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার? আজকে তুমি আমার কাছে? তখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা দান করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারলেন সাফিয়্যা তার ভাগের দিনটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দিয়েছেন। তিনি তখন সাফিয়্যার প্রতি খুশি হয়ে গেলেন।

টিকাঃ
১১৬ সহিহ বুখারি: ৩৩৩১, ৫১১৬।
১১৭ সহিহ মুসলিম: ১৪৬৯।
১১৮ সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫১।
* সুরা হুজুরাত : ২১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00