📄 ক্ষমা
সুখী সংসারের জন্য প্রয়োজন অনেক কিছুর। আর সেই অনেক কিছুর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষমা, মার্জনা। স্ত্রী কোনো ভুল করে ফেললে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া। ভুল দেখেও না দেখার ভান করা। ভুল থেকে চোখ সরিয়ে ফেলা।
বিশেষ করে দুনিয়াবি বিষয় সংশ্লিষ্ট কোনো ভুল। দীনি বিষয় হলে আল্লাহর কোনো হুকুম লঙ্ঘিত হলে ভিন্ন কথা। কেননা শরিয়তের বিষয়ে আমাদের কারও ক্ষমা করার কোনো অধিকার নেই। এ অধিকার একমাত্র আল্লাহর।
আমাকে সবসময় মনে রাখতে হবে, আমি যার সঙ্গে সংসার করছি সে একজন মানুষ। আর মানুষ মাত্রই ভুলকারী। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'প্রত্যেক বনি আদমই ভুল করে থাকে। আর সর্বোত্তম ভুলকারী হল যে ভুল করে তওবা করে নেয়।'১০০৩
অর্থাৎ কোনো ভুল হয়ে গেলে সাথে সাথে তওবা করে নেওয়া।
একজন পুরুষ যার সঙ্গে সংসার করে সে শুধু একজন মানুষই নয়। একজন নারী। আর নারীর সৃষ্টিগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'আর তোমরা নারীদের সাথে সৎ ব্যবহার করবে। কেননা, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরের হাড় থেকে এবং সবচেয়ে বাঁকা হচ্ছে পাঁজরের ওপরের হাড়। যদি তুমি তা সোজা করতে চাও তাহলে ভেঙ্গে যাবে। আর যদি যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দাও তাহলে বাঁকাই থাকবে। অতএব, তোমাদের আদেশ করা হলো নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার।১০০৪
অর্থাৎ কথায় কথায় স্ত্রীর ভুল না ধরা। তার পিছে পিছে লেগে না থাকা। পান থেকে চুন খসলেই উত্তেজিত না হওয়া। তার সমস্ত কথা না ধরা। নিজের ইগো ও রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিচক্ষণ ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেওয়া।
আমরা আমাদের নিজেদের দিকে তাকালে দেখতে পাব, আমাদেরও অনেক ভুল হয়। আসলে আমরা কেউ পারফেক্ট না। ভুলের ঊর্ধ্বে না। কিন্তু আমাদের ভুলগুলো আমাদের চোখে পড়ে না। তাই আমরা সবসময় অন্যের ভুল নিয়ে পড়ে থাকি। আর নিজেদের সঠিক ভাবি।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের স্ত্রীরা বাসায় অনেক কাজ করে। রান্না-বান্না, ধোয়া-মোছা, সন্তানদের দেখাশোনা, তাদের গোসল করানো, খাওয়ানো, কান্না থামানো, কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানো ইত্যাদি আরও কত কাজ!
অনেক কাজ করতে গেলে কিছু ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। কোনো ভুল না হওয়াটা বরং অস্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক বিষয়টাকে যে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারবে না, তার মানসিক সমস্যা আছে। সে সুস্থ না।
তাই স্ত্রীর সমস্ত ভুল ধরা যাবে না। বিশেষ করে দুনিয়াবি বিষয় সংশ্লিষ্ট কোনো ভুল। যেমন, আপনি তার কাছে সামান্য কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু টাকাটা সে কোথায় রেখেছে মনে করতে পারছে না। অথবা আপনার অফিসে যাওয়ার ড্রেসটা সে স্ত্রী করে রাখতে পারেনি। কিংবা রান্নাটা একদিন একটু আপনার মনমত হয়নি ইত্যাদি ইত্যাদি।
সে যদি দশটি ভুল করে আপনি দু-তিনটা ধরুন। বাকিগুলো ছেড়ে দিন।
আপনি যদি তার সব ভুল ধরা শুরু করেন, তাহলে আপনি তার চোখ থেকে পড়ে যাবেন এবং একসময় বিরক্ত হয়ে সেও আপনার ভুল ধরা শুরু করবে। এভাবে দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরা শুরু করবে। একসময় ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। সংসারে কঠিন পরিণতি ডেকে আনবে।
এবার নবি জীবনের একটি ঘটনা শুনুন। ঘটনাটি স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামিন কুরআনে বর্ণনা করেছেন।
وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَن بَعْضٍ
'স্মরণ কর, যখন নবি তার স্ত্রীদের কোনো একজনকে গোপনে একটি কথা বলেছিল। তারপর সেই স্ত্রী যখন তা (গোপন রাখতে না পেরে অন্য কাউকে) বলে দিল এবং আল্লাহ তায়ালা নবির কাছে ব্যাপারটি প্রকাশ করে দিলেন। তখন নবি সে বিষয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন এবং কিছু এড়িয়ে গেলেন।' ১০৫
গোপন কথাটি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে কথাটি ফাঁস করে দিয়েছিলেন। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহির মাধ্যমে ব্যাপারটি জানতে পেরে সে বিষয়ে তাকে বললেন, কিন্তু সবটুকু বললেন না। কেননা সবটুকু বললে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা অনেক বেশি লজ্জা পেতেন। তাকে যেভাবে ভর্ৎসনা করা দরকার ছিল নবিজি তার সামান্যই করলেন।
নবি জীবনের আরেকটি ঘটনা শুনুন। ঘটনাটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়, ইনসাফ ও সহনশীলতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবাদের নিয়ে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে বসা ছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কিছু খাবার তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তার আগেই উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা খাবার পাঠিয়ে দিলেন।
উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তিনি একটি থালায় করে কিছু খাবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবাদের নিকট পাঠালেন। ইত্যবসরে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা চাদর জড়িয়ে আসলেন। তাঁর হাতে একটি পাথর ছিল। পাথরটি দিয়ে তিনি থালাটি ভেঙ্গে দিলেন। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থালার ভাঙ্গা টুকরো দুটি একত্র করলেন এবং (সাহাবাদের) বললেন, তোমরা খাও। তোমাদের আম্মাজানের আত্মমর্যাদাবোধে লেগেছে। এ কথাটি তিনি দু'বার বললেন। তারপর রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার থালা নিয়ে উম্মে সালামার নিকট পাঠালেন। আর উম্মে সালামার ভাঙ্গা থালাটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দিয়ে দিলেন। ১০৬
ইবনে মাজাহ শরিফে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে যে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, সেখানে এরূপ একটি ঘটনায় উম্মে সালামার পরিবর্তে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসের শেষে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'আমি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় আমার এমন আচরণের কোনো প্রতিক্রিয়াই লক্ষ করলাম না।'১০৭
অর্থাৎ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যে উপস্থিত সাহাবাদের সামনে আল্লাহর রাসুলের সাথে এমন মারাত্মক একটি আচরণ করলেন, পাথর দিয়ে আঘাত করে খাবারপূর্ণ প্লেট ভেঙ্গে ফেললেন। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি তাকে কিছুই বলেননি। না তিরস্কার করেছেন। আর না ভর্ৎসনা।
তিনি শুধু 'তোমাদের আম্মাজানের আত্মসম্মানে লেগেছে' কথাটি দু'বার বলেছেন এবং খুব সুন্দরভাবে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন। সাহাবাদের সামনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মর্যাদা এতটুকু নষ্ট হতে দিলেন না।
তার পক্ষ হয়ে তিনি নিজেই সাহাবাদের সামনে ওযর পেশ করলেন।
আবার তিনি উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতিও না-ইনসাফি করলেন না। যেহেতু তার থালা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। এর জরিমানাস্বরূপ তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছ থেকে একটি ভালো থালা নিয়ে তাকে দিয়ে দিলেন।
মুহূর্তের মধ্যে এমন কঠিন পরিস্থিতি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত সুন্দর ও কোমলভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। শুধু নিয়ন্ত্রণই করেননি, সেটাকে একটি উত্তম আদর্শের রূপ দান করেছেন।
কারণ, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের আত্মমর্যাদার বিষয়টি জানতেন। এটি তাদের সৃষ্টিগত বিষয়। তাই তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কিছুই বলেননি। যদিও উপস্থিত সাহাবাদের সামনে তিনি নবিজির সঙ্গে এমন আচরণ করেছিলেন।
এজন্যই তো কুরআনে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
'নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। ১০৮
এক সাহাবি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলেন। দরজায় টোকা দিতে যাবেন, এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন, ভেতরে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী তার সঙ্গে কড়া কণ্ঠে কথা
বলছেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু চুপ। তিনি তাঁর স্ত্রীর কোনো কথার উত্তর দিচ্ছেন না। ধৈর্যধারণ করে আছেন।
সাহাবি তখন খুব হতাশ হলেন। মনে মনে বললেন, কার কাছে অভিযোগ জানাতে এসেছি। তিনি নিজেই দেখি আমার মতো সমস্যায় আছেন।
সাহাবি ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। এমন সময় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে পেছন থেকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি বোধহয় কোনো প্রয়োজন নিয়ে এসেছিলে?
সাহাবি বললেন, আমিরুল মুমিনিন, আমি আপনার কাছে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে অভিযোগ জানাতে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি আপনিও...।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর কথা শুনে মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, 'শোনো ভাই, আমার উপর তাঁর কিছু অধিকার রয়েছে। তাই আমি তাঁকে ক্ষমা করে দেই। সে আমার জন্য আমার এবং জাহান্নামের আগুনের মাঝে অন্তরায়। সে আমার অন্তরকে গুনাহর দিকে ধাবিত হওয়া থেকে ফিরিয়ে রাখে। তাতে প্রশান্তি আনয়ন করে। আমি বাড়িতে না থাকলে সে আমার ধন-সম্পদের হেফাজত করে। সে আমার জামা-কাপড় ধুয়ে রাখে। আমার জন্য খাবার রান্না করে। সে আমার সন্তানদের দেখাশোনা করে। অথচ শরিয়তে এসব তাঁকে করতে বলা হয়নি। এগুলো তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তাই আমি সহ্য করে নেই।'
আমিরুল মুমিনিন! আমার স্ত্রীও তো আপনার স্ত্রীর মতোই। আপনি যেহেতু তাঁর ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেন, আমিও তাঁর ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেব। ১০৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
'তোমরা তাঁদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর। তোমরা যদি তাঁদের অপছন্দ কর। তবে এর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে যে, তোমরা যেটাকে অপছন্দ করছ, আল্লাহ তায়ালা তাতে তোমাদের জন্য প্রভূত কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।' ১১০
এমনই ছিল সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের দাম্পত্য জীবন। তারা স্ত্রীদের সৎগুণগুলোর কথা আলোচনা করতেন। আর তাদের দোষ ও মন্দ গুণগুলো ঢেকে রাখতেন।
একবার আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে রাগ করে রাগের মাথায় বলে বসলেন, 'আপনার মত লোক নিজেকে কী করে নবি দাবি করে?' (কী মারাত্মক কথা বাবা!)
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে বিষয়টি উড়িয়ে দিলেন। তিনি ছবর করলেন। সহনশীলতা প্রদর্শন করলেন।
দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে হলে আমাদের নবি ও সাহাবাদের এমন সমুচ্চ আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। স্বর্গীয় সুষমামণ্ডিত এমন আখলাকের অধিকারী হতে হবে। তবেই আমাদের ঘরগুলো এক টুকরো স্বর্গে পরিণত হবে।
টিকাঃ
১০০৩ জামে তিরমিযি: ২৪৯৯।
১০০৪ সহিহ বুখারি: ৩৩৩১।
১০৫ সুরা তাহরিম: ৩।
১০৬ সুনানে নাসাঈ : ৩৯৬৬।
১০৭ সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৩৩।
১০৮ সুরা কলম: ৪।
১০৯ তাম্বিহুল গাফেলিন: পৃষ্ঠা নং ১৭১।
১১০ সুরা নিসা: ১৯।
সুখী সংসারের জন্য প্রয়োজন অনেক কিছুর। আর সেই অনেক কিছুর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষমা, মার্জনা। স্ত্রী কোনো ভুল করে ফেললে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া। ভুল দেখেও না দেখার ভান করা। ভুল থেকে চোখ সরিয়ে ফেলা।
বিশেষ করে দুনিয়াবি বিষয় সংশ্লিষ্ট কোনো ভুল। দীনি বিষয় হলে আল্লাহর কোনো হুকুম লঙ্ঘিত হলে ভিন্ন কথা। কেননা শরিয়তের বিষয়ে আমাদের কারও ক্ষমা করার কোনো অধিকার নেই। এ অধিকার একমাত্র আল্লাহর।
আমাকে সবসময় মনে রাখতে হবে, আমি যার সঙ্গে সংসার করছি সে একজন মানুষ। আর মানুষ মাত্রই ভুলকারী। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'প্রত্যেক বনি আদমই ভুল করে থাকে। আর সর্বোত্তম ভুলকারী হল যে ভুল করে তওবা করে নেয়।'১০০৩
অর্থাৎ কোনো ভুল হয়ে গেলে সাথে সাথে তওবা করে নেওয়া।
একজন পুরুষ যার সঙ্গে সংসার করে সে শুধু একজন মানুষই নয়। একজন নারী। আর নারীর সৃষ্টিগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'আর তোমরা নারীদের সাথে সৎ ব্যবহার করবে। কেননা, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরের হাড় থেকে এবং সবচেয়ে বাঁকা হচ্ছে পাঁজরের ওপরের হাড়। যদি তুমি তা সোজা করতে চাও তাহলে ভেঙ্গে যাবে। আর যদি যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দাও তাহলে বাঁকাই থাকবে। অতএব, তোমাদের আদেশ করা হলো নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার।১০০৪
অর্থাৎ কথায় কথায় স্ত্রীর ভুল না ধরা। তার পিছে পিছে লেগে না থাকা। পান থেকে চুন খসলেই উত্তেজিত না হওয়া। তার সমস্ত কথা না ধরা। নিজের ইগো ও রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিচক্ষণ ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেওয়া।
আমরা আমাদের নিজেদের দিকে তাকালে দেখতে পাব, আমাদেরও অনেক ভুল হয়। আসলে আমরা কেউ পারফেক্ট না। ভুলের ঊর্ধ্বে না। কিন্তু আমাদের ভুলগুলো আমাদের চোখে পড়ে না। তাই আমরা সবসময় অন্যের ভুল নিয়ে পড়ে থাকি। আর নিজেদের সঠিক ভাবি।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের স্ত্রীরা বাসায় অনেক কাজ করে। রান্না-বান্না, ধোয়া-মোছা, সন্তানদের দেখাশোনা, তাদের গোসল করানো, খাওয়ানো, কান্না থামানো, কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানো ইত্যাদি আরও কত কাজ!
অনেক কাজ করতে গেলে কিছু ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। কোনো ভুল না হওয়াটা বরং অস্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক বিষয়টাকে যে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারবে না, তার মানসিক সমস্যা আছে। সে সুস্থ না।
তাই স্ত্রীর সমস্ত ভুল ধরা যাবে না। বিশেষ করে দুনিয়াবি বিষয় সংশ্লিষ্ট কোনো ভুল। যেমন, আপনি তার কাছে সামান্য কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু টাকাটা সে কোথায় রেখেছে মনে করতে পারছে না। অথবা আপনার অফিসে যাওয়ার ড্রেসটা সে স্ত্রী করে রাখতে পারেনি। কিংবা রান্নাটা একদিন একটু আপনার মনমত হয়নি ইত্যাদি ইত্যাদি।
সে যদি দশটি ভুল করে আপনি দু-তিনটা ধরুন। বাকিগুলো ছেড়ে দিন।
আপনি যদি তার সব ভুল ধরা শুরু করেন, তাহলে আপনি তার চোখ থেকে পড়ে যাবেন এবং একসময় বিরক্ত হয়ে সেও আপনার ভুল ধরা শুরু করবে। এভাবে দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরা শুরু করবে। একসময় ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। সংসারে কঠিন পরিণতি ডেকে আনবে।
এবার নবি জীবনের একটি ঘটনা শুনুন। ঘটনাটি স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামিন কুরআনে বর্ণনা করেছেন।
وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَن بَعْضٍ
'স্মরণ কর, যখন নবি তার স্ত্রীদের কোনো একজনকে গোপনে একটি কথা বলেছিল। তারপর সেই স্ত্রী যখন তা (গোপন রাখতে না পেরে অন্য কাউকে) বলে দিল এবং আল্লাহ তায়ালা নবির কাছে ব্যাপারটি প্রকাশ করে দিলেন। তখন নবি সে বিষয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন এবং কিছু এড়িয়ে গেলেন।' ১০৫
গোপন কথাটি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে কথাটি ফাঁস করে দিয়েছিলেন। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহির মাধ্যমে ব্যাপারটি জানতে পেরে সে বিষয়ে তাকে বললেন, কিন্তু সবটুকু বললেন না। কেননা সবটুকু বললে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা অনেক বেশি লজ্জা পেতেন। তাকে যেভাবে ভর্ৎসনা করা দরকার ছিল নবিজি তার সামান্যই করলেন।
নবি জীবনের আরেকটি ঘটনা শুনুন। ঘটনাটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়, ইনসাফ ও সহনশীলতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবাদের নিয়ে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে বসা ছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কিছু খাবার তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তার আগেই উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা খাবার পাঠিয়ে দিলেন।
উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তিনি একটি থালায় করে কিছু খাবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবাদের নিকট পাঠালেন। ইত্যবসরে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা চাদর জড়িয়ে আসলেন। তাঁর হাতে একটি পাথর ছিল। পাথরটি দিয়ে তিনি থালাটি ভেঙ্গে দিলেন। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থালার ভাঙ্গা টুকরো দুটি একত্র করলেন এবং (সাহাবাদের) বললেন, তোমরা খাও। তোমাদের আম্মাজানের আত্মমর্যাদাবোধে লেগেছে। এ কথাটি তিনি দু'বার বললেন। তারপর রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার থালা নিয়ে উম্মে সালামার নিকট পাঠালেন। আর উম্মে সালামার ভাঙ্গা থালাটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দিয়ে দিলেন। ১০৬
ইবনে মাজাহ শরিফে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে যে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, সেখানে এরূপ একটি ঘটনায় উম্মে সালামার পরিবর্তে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসের শেষে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'আমি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় আমার এমন আচরণের কোনো প্রতিক্রিয়াই লক্ষ করলাম না।'১০৭
অর্থাৎ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যে উপস্থিত সাহাবাদের সামনে আল্লাহর রাসুলের সাথে এমন মারাত্মক একটি আচরণ করলেন, পাথর দিয়ে আঘাত করে খাবারপূর্ণ প্লেট ভেঙ্গে ফেললেন। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি তাকে কিছুই বলেননি। না তিরস্কার করেছেন। আর না ভর্ৎসনা।
তিনি শুধু 'তোমাদের আম্মাজানের আত্মসম্মানে লেগেছে' কথাটি দু'বার বলেছেন এবং খুব সুন্দরভাবে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন। সাহাবাদের সামনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মর্যাদা এতটুকু নষ্ট হতে দিলেন না।
তার পক্ষ হয়ে তিনি নিজেই সাহাবাদের সামনে ওযর পেশ করলেন।
আবার তিনি উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতিও না-ইনসাফি করলেন না। যেহেতু তার থালা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। এর জরিমানাস্বরূপ তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছ থেকে একটি ভালো থালা নিয়ে তাকে দিয়ে দিলেন।
মুহূর্তের মধ্যে এমন কঠিন পরিস্থিতি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত সুন্দর ও কোমলভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। শুধু নিয়ন্ত্রণই করেননি, সেটাকে একটি উত্তম আদর্শের রূপ দান করেছেন।
কারণ, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের আত্মমর্যাদার বিষয়টি জানতেন। এটি তাদের সৃষ্টিগত বিষয়। তাই তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কিছুই বলেননি। যদিও উপস্থিত সাহাবাদের সামনে তিনি নবিজির সঙ্গে এমন আচরণ করেছিলেন।
এজন্যই তো কুরআনে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
'নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। ১০৮
এক সাহাবি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলেন। দরজায় টোকা দিতে যাবেন, এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন, ভেতরে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী তার সঙ্গে কড়া কণ্ঠে কথা
বলছেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু চুপ। তিনি তাঁর স্ত্রীর কোনো কথার উত্তর দিচ্ছেন না। ধৈর্যধারণ করে আছেন।
সাহাবি তখন খুব হতাশ হলেন। মনে মনে বললেন, কার কাছে অভিযোগ জানাতে এসেছি। তিনি নিজেই দেখি আমার মতো সমস্যায় আছেন।
সাহাবি ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। এমন সময় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে পেছন থেকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি বোধহয় কোনো প্রয়োজন নিয়ে এসেছিলে?
সাহাবি বললেন, আমিরুল মুমিনিন, আমি আপনার কাছে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে অভিযোগ জানাতে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি আপনিও...।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর কথা শুনে মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, 'শোনো ভাই, আমার উপর তাঁর কিছু অধিকার রয়েছে। তাই আমি তাঁকে ক্ষমা করে দেই। সে আমার জন্য আমার এবং জাহান্নামের আগুনের মাঝে অন্তরায়। সে আমার অন্তরকে গুনাহর দিকে ধাবিত হওয়া থেকে ফিরিয়ে রাখে। তাতে প্রশান্তি আনয়ন করে। আমি বাড়িতে না থাকলে সে আমার ধন-সম্পদের হেফাজত করে। সে আমার জামা-কাপড় ধুয়ে রাখে। আমার জন্য খাবার রান্না করে। সে আমার সন্তানদের দেখাশোনা করে। অথচ শরিয়তে এসব তাঁকে করতে বলা হয়নি। এগুলো তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তাই আমি সহ্য করে নেই।'
আমিরুল মুমিনিন! আমার স্ত্রীও তো আপনার স্ত্রীর মতোই। আপনি যেহেতু তাঁর ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেন, আমিও তাঁর ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেব। ১০৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
'তোমরা তাঁদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর। তোমরা যদি তাঁদের অপছন্দ কর। তবে এর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে যে, তোমরা যেটাকে অপছন্দ করছ, আল্লাহ তায়ালা তাতে তোমাদের জন্য প্রভূত কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।' ১১০
এমনই ছিল সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের দাম্পত্য জীবন। তারা স্ত্রীদের সৎগুণগুলোর কথা আলোচনা করতেন। আর তাদের দোষ ও মন্দ গুণগুলো ঢেকে রাখতেন।
একবার আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে রাগ করে রাগের মাথায় বলে বসলেন, 'আপনার মত লোক নিজেকে কী করে নবি দাবি করে?' (কী মারাত্মক কথা বাবা!)
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে বিষয়টি উড়িয়ে দিলেন। তিনি ছবর করলেন। সহনশীলতা প্রদর্শন করলেন।
দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে হলে আমাদের নবি ও সাহাবাদের এমন সমুচ্চ আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। স্বর্গীয় সুষমামণ্ডিত এমন আখলাকের অধিকারী হতে হবে। তবেই আমাদের ঘরগুলো এক টুকরো স্বর্গে পরিণত হবে।
টিকাঃ
১০০৩ জামে তিরমিযি: ২৪৯৯।
১০০৪ সহিহ বুখারি: ৩৩৩১।
১০৫ সুরা তাহরিম: ৩।
১০৬ সুনানে নাসাঈ : ৩৯৬৬।
১০৭ সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৩৩।
১০৮ সুরা কলম: ৪।
১০৯ তাম্বিহুল গাফেলিন: পৃষ্ঠা নং ১৭১।
১১০ সুরা নিসা: ১৯।
📄 স্বামীর রোদন
ক. বাসাটা যেন ময়লার ভাগাড়
হাফিস সাহেব সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন। বাসায় ঢুকে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এ কী অবস্থা বাসার? বুঝতে পারছেন না, তিনি কি আসলে তার বাসায় এসেছেন নাকি ভুল করে কোনো ময়লার ভাগাড়ে চলে এসেছেন?
স্ত্রীকে ডেকে প্রলয়কাণ্ড বাঁধালেন। আমি না হয় অফিসের কারণে সারাদিন বাসার বাইরে থাকি। বাসার সবকিছু গুছিয়ে রাখতে পারি না। কিন্তু তুমি? তুমি তো বাসায় থাকো। সবকিছু গুছিয়ে রাখতে পারো। কী অবস্থা করে রেখেছো দেখো তো? এটা কি কোনো বাসা না ময়লার ভাগাড়? সবকিছু অগোছalo, ময়লা, অপরিচ্ছন্ন। ফ্লোর কেমন আঠা আঠা হয়ে আছে। সকালে বিছানাটা যেভাবে রেখে গিয়েছিলাম এখনো সেভাবেই আছে। জিনিসপত্র সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আচ্ছা, বাসার কথা না হয় বাদ দিলাম। বাচ্চাদের এ কী অবস্থা করে রেখেছো? দেখ তো, ময়লার কারণে ওদের পরনের কাপড়গুলোর দিকে তাকানোই যাচ্ছে না। এই অবস্থা কেনো? তুমি কি চাও আমি প্রতিদিন এসব নিয়ে তোমার সঙ্গে ঝগড়া করি? এভাবে কী সংসার চলে?
খ. প্রতিবেশীদের অসন্তোষ
এক লোক বাসায় ফিরে তার স্ত্রীকে বলছে, তোমার কারণে আজকে আমার প্রতিবেশীর কাছ থেকে কতগুলো কথা শুনতে হলো। লজ্জিত হতে হলো। তুমি নাকি এত জোরে জোরে কথা বলো যে, তোমার আওয়াজ তাদের বাসা পর্যন্ত যায়। আমি তাদের কোনো কথার জবাব দিতে পারিনি। মান-সম্মান বাঁচাতে আমি বলে আসছি, 'কী বলবো ভাই, আমার বাচ্চাগুলো এত দুষ্টামি করে যে, অনেক সময় তারা জোরে ধমক না দিলে শুনতে চায় না।'
আমি যদিও তাদের একটা উত্তর দিয়ে এসেছি। কিন্তু আমি তো জানি, তুমি কত জোরে কথা বলো, তোমার গলার আওয়াজ কেমন।
তুমি যেভাবে আমার সঙ্গে চিৎকার করো, গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করো! কী বলবো...
মান সম্মানের ভয়ে আমি চুপ করে সব সহ্য করে যাই। আমি যদি পাল্টা জবাব দিতাম, তাহলে তো কুরুক্ষেত্র বেধে যেত।
সন্তানের সামনে তুমি আমাকে অপমান করা শুরু করো। তারা কী শিখছে তোমার কাছ থেকে? তারা তো সবকিছুতে তোমাকে অনুসরণ করে।
বাসাটা আমার কাছে নরক মনে হয় নরক। বুঝলে!
গ. বিবাহিত কিন্তু অবিবাহিত
দুটি বিপরীত বিষয় কখনো একত্র হতে পারে? যেমন-আগুন-পানি, রাত-দিন, আলো-অন্ধকার। কখনো সম্ভব? সম্ভব নয়।
তেমনি একজন মানুষ বিবাহিত হয়ে কীভাবে অবিবাহিত হতে পারে?
এমনই একটি ঘটনা এক বিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঘটেছে। বেচারা বিবাহিত। কিন্তু অবিবাহিত।
চলুন আমরা তার নিজের মুখ থেকে শুনি সে কী বলতে চায়-
কয়েক বছর হলো আমি তার সঙ্গে সংসার করছি। কিন্তু এখনও আমি অবিবাহিত। মানে ভার্জিন। এই যন্ত্রণা নিয়েই আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করে যাচ্ছি। কী বলব? আমি যখন ঘুমাতে যাই, তখন সে হয় টিভির সামনে বসে থাকে, মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমি যখন উঠি, তখন সে ঘুমিয়ে থাকে।
পরিস্থিতি কখনো অনুকূল হলে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সে তখন এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করে যে, মুড খারাপ হয়ে যায়।
আমার প্রতি কী আমার স্ত্রীর কখনোই দয়া হবে না?
আমি তো তাকে প্রশান্তি লাভের জন্য বিয়ে করেছিলাম। দিনের হেফাজতের জন্য বিয়ে করেছিলাম। প্রশান্তি তো গিয়েছেই। এখন দিনও চলে যাওয়ার উপক্রম।
ক. বাসাটা যেন ময়লার ভাগাড়
হাফিস সাহেব সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন। বাসায় ঢুকে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এ কী অবস্থা বাসার? বুঝতে পারছেন না, তিনি কি আসলে তার বাসায় এসেছেন নাকি ভুল করে কোনো ময়লার ভাগাড়ে চলে এসেছেন?
স্ত্রীকে ডেকে প্রলয়কাণ্ড বাঁধালেন। আমি না হয় অফিসের কারণে সারাদিন বাসার বাইরে থাকি। বাসার সবকিছু গুছিয়ে রাখতে পারি না। কিন্তু তুমি? তুমি তো বাসায় থাকো। সবকিছু গুছিয়ে রাখতে পারো। কী অবস্থা করে রেখেছো দেখো তো? এটা কি কোনো বাসা না ময়লার ভাগাড়? সবকিছু অগোছalo, ময়লা, অপরিচ্ছন্ন। ফ্লোর কেমন আঠা আঠা হয়ে আছে। সকালে বিছানাটা যেভাবে রেখে গিয়েছিলাম এখনো সেভাবেই আছে। জিনিসপত্র সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আচ্ছা, বাসার কথা না হয় বাদ দিলাম। বাচ্চাদের এ কী অবস্থা করে রেখেছো? দেখ তো, ময়লার কারণে ওদের পরনের কাপড়গুলোর দিকে তাকানোই যাচ্ছে না। এই অবস্থা কেনো? তুমি কি চাও আমি প্রতিদিন এসব নিয়ে তোমার সঙ্গে ঝগড়া করি? এভাবে কী সংসার চলে?
খ. প্রতিবেশীদের অসন্তোষ
এক লোক বাসায় ফিরে তার স্ত্রীকে বলছে, তোমার কারণে আজকে আমার প্রতিবেশীর কাছ থেকে কতগুলো কথা শুনতে হলো। লজ্জিত হতে হলো। তুমি নাকি এত জোরে জোরে কথা বলো যে, তোমার আওয়াজ তাদের বাসা পর্যন্ত যায়। আমি তাদের কোনো কথার জবাব দিতে পারিনি। মান-সম্মান বাঁচাতে আমি বলে আসছি, 'কী বলবো ভাই, আমার বাচ্চাগুলো এত দুষ্টামি করে যে, অনেক সময় তারা জোরে ধমক না দিলে শুনতে চায় না।'
আমি যদিও তাদের একটা উত্তর দিয়ে এসেছি। কিন্তু আমি তো জানি, তুমি কত জোরে কথা বলো, তোমার গলার আওয়াজ কেমন।
তুমি যেভাবে আমার সঙ্গে চিৎকার করো, গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করো! কী বলবো...
মান সম্মানের ভয়ে আমি চুপ করে সব সহ্য করে যাই। আমি যদি পাল্টা জবাব দিতাম, তাহলে তো কুরুক্ষেত্র বেধে যেত।
সন্তানের সামনে তুমি আমাকে অপমান করা শুরু করো। তারা কী শিখছে তোমার কাছ থেকে? তারা তো সবকিছুতে তোমাকে অনুসরণ করে।
বাসাটা আমার কাছে নরক মনে হয় নরক। বুঝলে!
গ. বিবাহিত কিন্তু অবিবাহিত
দুটি বিপরীত বিষয় কখনো একত্র হতে পারে? যেমন-আগুন-পানি, রাত-দিন, আলো-অন্ধকার। কখনো সম্ভব? সম্ভব নয়।
তেমনি একজন মানুষ বিবাহিত হয়ে কীভাবে অবিবাহিত হতে পারে?
এমনই একটি ঘটনা এক বিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঘটেছে। বেচারা বিবাহিত। কিন্তু অবিবাহিত।
চলুন আমরা তার নিজের মুখ থেকে শুনি সে কী বলতে চায়-
কয়েক বছর হলো আমি তার সঙ্গে সংসার করছি। কিন্তু এখনও আমি অবিবাহিত। মানে ভার্জিন। এই যন্ত্রণা নিয়েই আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করে যাচ্ছি। কী বলব? আমি যখন ঘুমাতে যাই, তখন সে হয় টিভির সামনে বসে থাকে, মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমি যখন উঠি, তখন সে ঘুমিয়ে থাকে।
পরিস্থিতি কখনো অনুকূল হলে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সে তখন এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করে যে, মুড খারাপ হয়ে যায়।
আমার প্রতি কী আমার স্ত্রীর কখনোই দয়া হবে না?
আমি তো তাকে প্রশান্তি লাভের জন্য বিয়ে করেছিলাম। দিনের হেফাজতের জন্য বিয়ে করেছিলাম। প্রশান্তি তো গিয়েছেই। এখন দিনও চলে যাওয়ার উপক্রম।
📄 স্ত্রীর রোদন
ক. সন্দেহ নামক ঘাতক ব্যাধি
এক মহিলা কষ্ট নিয়ে বলছিল, আমার স্বামী বাসায় ফিরে আমাকে শুধু সন্দেহ করতে থাকে। কার সঙ্গে দেখা করেছো? বাসা থেকে বের হয়েছিলে? বাসায় কি কেউ এসেছিলো?
এসব শুনলে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। আমার জন্য তার চেহারায় না আছে কোনো হাসি, আর তার মনে না আছে কোনো ভালোবাসা। তার সঙ্গে সংসার করে আমি কোনো শান্তি পাচ্ছি না।
খ. আপনি 'স্ত্রী' শব্দের মর্ম বুঝেন না
এক নারী তার স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলছিল, আপনি কীভাবে কামনা করেন, আমি যেন আপনাকে মন থেকে ভালোবাসি, অথচ আপনি আমাকে ক্রীতদাসীর মতো প্রহার করেন?
সবসময় আপনার হাত চলতেই থাকে। সামান্য থেকে সামান্য ভুলে আপনি ঠাস ঠাস মেরে বসেন। চেহারায় দাগ বসিয়ে দেন। আমি কারও সামনে যেতে পারি না। প্রতিবেশী মহিলারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, চেহারায় এমন দাগ কেনো? আমি তখন বানিয়ে মিথ্যা কথা বলি। কিন্তু চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারি না। মানুষের সামনে তখন আমাকে লজ্জিত হতে হয়।
গ. তুচ্ছতাচ্ছিল্য
জনৈকা নারী দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তার স্বামীকে বলছিল, আপনি আমার দিকে যেভাবে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকান, এটা আমার অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আমি সহ্য করতে পারি না। আমি কোনো কথা বললে আপনি সেটা নিয়ে উপহাস করেন। আপনি কি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদিসটি পড়েননি? 'কারও নিকৃষ্ট হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তাচ্ছিল্য করে (তাকে হেয় জ্ঞান করে)।'”
আল্লাহর রাসুল যদি সাধারণ কোনো মুসলমানকে তাচ্ছিল্য করা নিয়ে এমন কঠিন কথা বলতে পারেন, তাহলে তার সম্পর্কে আপনার কী মত যে আপনার স্ত্রী, আপনার সন্তানদের মা? এরপরও আপনি চান, আমি যেন আপনাকে ভালোবাসি? একজন নারী হিসেবে না হোক, আপনার স্ত্রী বা সন্তানের মা হিসেবে তো আপনি আমাকে মূল্যায়ন করতে পারেন?
আমার নারী সত্ত্বার কোনো দাম যদি আপনার কাছে নাও থাকে আমার মাতৃসত্তাকে আপনার শ্রদ্ধা করা উচিত।
টিকাঃ
১” সহিহ মুসলিম : ৬৪৩৫।
ক. সন্দেহ নামক ঘাতক ব্যাধি
এক মহিলা কষ্ট নিয়ে বলছিল, আমার স্বামী বাসায় ফিরে আমাকে শুধু সন্দেহ করতে থাকে। কার সঙ্গে দেখা করেছো? বাসা থেকে বের হয়েছিলে? বাসায় কি কেউ এসেছিলো?
এসব শুনলে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। আমার জন্য তার চেহারায় না আছে কোনো হাসি, আর তার মনে না আছে কোনো ভালোবাসা। তার সঙ্গে সংসার করে আমি কোনো শান্তি পাচ্ছি না।
খ. আপনি 'স্ত্রী' শব্দের মর্ম বুঝেন না
এক নারী তার স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলছিল, আপনি কীভাবে কামনা করেন, আমি যেন আপনাকে মন থেকে ভালোবাসি, অথচ আপনি আমাকে ক্রীতদাসীর মতো প্রহার করেন?
সবসময় আপনার হাত চলতেই থাকে। সামান্য থেকে সামান্য ভুলে আপনি ঠাস ঠাস মেরে বসেন। চেহারায় দাগ বসিয়ে দেন। আমি কারও সামনে যেতে পারি না। প্রতিবেশী মহিলারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, চেহারায় এমন দাগ কেনো? আমি তখন বানিয়ে মিথ্যা কথা বলি। কিন্তু চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারি না। মানুষের সামনে তখন আমাকে লজ্জিত হতে হয়।
গ. তুচ্ছতাচ্ছিল্য
জনৈকা নারী দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তার স্বামীকে বলছিল, আপনি আমার দিকে যেভাবে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকান, এটা আমার অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আমি সহ্য করতে পারি না। আমি কোনো কথা বললে আপনি সেটা নিয়ে উপহাস করেন। আপনি কি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদিসটি পড়েননি? 'কারও নিকৃষ্ট হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তাচ্ছিল্য করে (তাকে হেয় জ্ঞান করে)।'”
আল্লাহর রাসুল যদি সাধারণ কোনো মুসলমানকে তাচ্ছিল্য করা নিয়ে এমন কঠিন কথা বলতে পারেন, তাহলে তার সম্পর্কে আপনার কী মত যে আপনার স্ত্রী, আপনার সন্তানদের মা? এরপরও আপনি চান, আমি যেন আপনাকে ভালোবাসি? একজন নারী হিসেবে না হোক, আপনার স্ত্রী বা সন্তানের মা হিসেবে তো আপনি আমাকে মূল্যায়ন করতে পারেন?
আমার নারী সত্ত্বার কোনো দাম যদি আপনার কাছে নাও থাকে আমার মাতৃসত্তাকে আপনার শ্রদ্ধা করা উচিত।
টিকাঃ
১” সহিহ মুসলিম : ৬৪৩৫।
📄 স্ত্রীকে সময় দেওয়া
অনেক পুরুষ আছে কাজে অকাজে সারাক্ষণ বাসার বাহিরে বাহিরে থাকে। ঘুরে বেড়ায়। আড্ডা দেয়। তারপর রাত করে বাড়ি ফিরে।
আবার অনেকে আছে, বাসায় ফিরে গভীর রাত পর্যন্ত টিভি, মোবাইল, ফেইসবুক, ইন্টারন্টে—এসব নিয়ে পড়ে থাকে।
এগুলো দাম্পত্য জীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পারস্পরিক সম্পর্কের বাঁধনকে শিথীল করে। সংসারে দূরত্ব সৃষ্টি করে।
আবার অনেক পুরুষ মনে করে, 'পরিবারকে সময় দেওয়ার কী আছে? এই যে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম—এ সব কিছু আমি কার জন্য করছি? এগুলো তো আমি আমার পরিবারের জন্যই করছি'
আচ্ছা, একজন পুরুষের কাছে দাম্পত্য জীবনের মানে কি শুধু স্ত্রী-সন্তানদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা? যা যা প্রয়োজন সব এনে দেওয়া?
টাকা-পয়সার প্রয়োজনই কী মানুষের জীবনে সব? থাকা-খাওয়ার ভালো ব্যবস্থার জন্যই কি একজন নারী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়? আপনজন সবাইকে ছেড়ে একজন অপরিচিত মানুষের পরিবারে চলে আসে? তার বাবার বাসায় কি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না? নাকি কোনো অভাব ছিল?
আবার অনেকে মনে করে, স্ত্রী-সন্তানদের সময় দিলে, তাদের সঙ্গে গল্প করলে নিজের ভারিত্ব কমে যাবে। তাই সে সবসময় একটা গুরুগম্ভীর ভাব বজায় রাখে। সবাই তাকে ভয় করে। ছোট বাচ্চারা তাকে দেখলে কেমন ফ্যাকাসে হয়ে যায়। বড়রাও কাছে আসতে ইতস্তত করে। তাকে কখনো স্ত্রীর সঙ্গে নরম ও কোমল সুরে কথা বলতে দেখা যায় না।
অথচ স্ত্রীদের সঙ্গে নবিজির আচরণ মোটেও এমন ছিলো না। তিনি গোটা মানবজাতির জন্য, বিশ্ব জাহানের জন্য নবি হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। সমগ্র মানবজাতির হেদায়াত ও মুক্তি ছিল তার চিন্তার বিষয়। নবুওয়াত ও রিসালাতের মহা গুরুদায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। তারপরও তিনি পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতেন। স্ত্রীদের সাথে বসে গল্প করতেন। তাদের যাবতীয় হক আদায় করতেন। তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতেন।
নবি জীবনে এমন দৃষ্টান্ত অসংখ্য। নমুনাস্বরূপ নিয়ে আমরা আবু যুরআর সুদীর্ঘ হাদিসটি তুলে ধরছি। তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের কীভাবে সময় দিতেন। কত লম্বা সময় ধরে তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। তাদের কথা শুনতেন। আমার আপনার দায়িত্ব ও ব্যস্ততা নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের চেয়ে অধিক না? আমার আপনার সময় নিশ্চয়ই তাঁর সময়ের চেয়ে অধিক দামী না?
একদিন আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বসে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে গল্প করছিলেন। গল্পটি হলো—
'তিনি বলেন, এগারো জন মহিলা একস্থানে একত্রিত হয়ে বসল। তারা সকলে মিলে এই কথার উপর একমত হল যে, তারা নিজেদের স্বামীর কোনো তথ্যই গোপন রাখবে না। প্রথমজন বলল, আমার স্বামী হচ্ছে অত্যন্ত হালকা-পাতলা দুর্বল উটের গোশতের ন্যায়, যেন কোনো পাহাড়ের চূড়ায় রাখা হয়েছে এবং সেখানে আরোহন করা সহজ কাজ নয় এবং গোশতের মধ্যে এত চর্বিও নেই, যে কারণে সেখানে উঠার জন্য কেউ কষ্ট স্বীকার করবে। দ্বিতীয় মহিলা বলল, আমি আমার স্বামী সম্পর্কে কিছু বলব না। কারণ, আমি ভয় করছি যে তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেষ করা যাবে না। কেননা যদি আমি তার সম্পর্কে বলতে যাই, তাহলে আমাকে তার সকল দুর্বলতা এবং মন্দ দিকগুলো সম্পর্কেও বলতে হবে।.....
এভাবে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা প্রত্যেকের স্বামী সম্পর্কে একে একে দশজন মহিলার মন্তব্য তুলে ধরলেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মনে তার কথা শুনে যাচ্ছেন। চেহারায় বিরক্তির কোনো লেশ নেই। নেই কোনো প্রচ্ছন্ন উপেক্ষা যে, আয়েশা আমার সাথে এসব কী গল্প করছে?
একাদশতম মহিলা বলল, আমার স্বামী আবু যুরআ। তার কথা আমি কী বলব। সে আমাকে এত বেশি গহনা দিয়েছে যে আমার কান ভারী হয়ে গিয়েছে। আমার বাজুতে মেদ জমেছে এবং আমি এত সন্তুষ্ট হযেছি যে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি। সে আমাকে এনেছে অত্যন্ত গরিব পরিবার থেকে, যে পরিবার ছিল মাত্র কয়েকটি বকরির মালিক। সে আমাকে অত্যন্ত ধনী পরিবারে নিয়ে আসে। যেখানে ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি এবং উটের হাওদার আওয়াজ এবং শষ্য মাড়াইয়ের খসখসানি শব্দ শোনা যায়। সে আমাকে ধন-সম্পদের মধ্যে রেখেছে। আমি যা কিছু বলতাম সে বিদ্রুপ করত না। আমি নিদ্রা যেতাম এবং সকালে দেরি করে উঠতাম। যখন আমি পান করতাম অত্যন্ত তৃপ্তি সহকারে পান করতাম।
আর আবু যারআর কথা কী বলব। তার পাত্র ছিল সর্বদা পরিপূর্ণ। তার ঘর ছিল প্রশস্ত। আবু যারআর পুত্রের কথা কী বলব। সেও খুব ভালো ছিল। তার শয্যা এত সংকীর্ণ ছিল, মনে হত যেন কোষবদ্ধ তরবারি। অর্থাৎ সে অত্যন্ত হালকা পাতলা দেহের অধিকারী। তার খাদ্য হচ্ছে ছাগলের একখানা পা। আর আবু যারআর কন্যা সম্পর্কে বলতে হয় সে কতই না ভালো। সে বাবা-মার একান্ত বাধ্যগত সন্তান। অত্যন্ত সু-সাস্থ্যের অধিকারিণী। যে কারণে সতীনরা তাকে হিংসা করে। আবু যারআর ক্রীতদাসীরও অনেক গুণ ছিল। কোনো গোপন কথা প্রকাশ করত না। সে আমাদের সম্পদকে কমাত এবং আমাদের আবর্জনা দিয়ে ভরে রাখত না। সে মহিলা আরও বলল, একদিন দুধ দোহন করার সময় আবু যারআ বাইরে বেরিয়ে এমন একজন মহিলাকে দেখতে পেল, যার দুটি পুত্র সন্তান রয়েছে। ওরা মায়ের স্তন নিয়ে বাঘের মত খেলা করছিল (দুধ পান করছিল)। সে ঐ মহিলাকে দেখে আকৃষ্ট হল এবং আমাকে তালাক দিয়ে তাকে বিয়ে করে ফেলল। এরপর এক সম্মানী ব্যক্তির সাথে আমার বিয়ে হল। সে দ্রুতগামী অশ্বে আরোহণ করত এবং হাতে বর্শা রাখত। সে আমাকে অনেক সম্পদ দিয়েছে এবং প্রত্যেক প্রকারের গৃহপালিত জন্তু থেকে এক একজোড়া আমাকে দিয়েছে এবং বলেছে, হে উম্মে যারআ! তুমি এ সম্পদ থেকে খাও, পরিধান কর এবং উপহার দাও। মহিলা আরও বলল, আমার এই স্বামী যা দিয়েছে তা আবু যারআর একটি ক্ষুদ্র পাত্রও পূর্ণ করতে পারবে না।
আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, (এতক্ষণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্যের সাথে শুধু শুনেই যাচ্ছিলেন। সব শুনে) তিনি বললেন, আবু যারআ তার স্ত্রী উম্মে যারআর প্রতি যেরূপ আমিও তোমার প্রতি অনুরূপ। (পার্থক্য এতটুকুই) আবু যারআ তাকে তালাক দিয়েছিল, তবে আমি তোমাকে তালাক দেব না এবং তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করব।' ১১২
আহা! নবিজির কী মধুর ভালোবাসামাখা উত্তর! বিরক্তি তো দূরের কথা। এমন উত্তরে জগতের কোনো স্ত্রীর কলিজা শীতল না হয়ে কি পারে!
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই হাদিস থেকে অর্জিত শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন,
'এই হাদিসের মাঝে পরিবারের সাথে উত্তম আচরণ, আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার এবং তাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করার শিক্ষা রয়েছে। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু যেন কখনোই বৈধতার গণ্ডি পেরিয়ে নিষিদ্ধ সীমানায় চলে না যায়।'
নিষিদ্ধ সীমানা বলতে উনি বুঝিয়েছেন, যেমন-স্ত্রীর সঙ্গে বসে কারও গীবত করা। পরচর্চা করা। নাটক, সিনেমা, গান, সিরিয়াল, খেলা ইত্যাদি নাজায়েজ বিষয় নিয়ে কথা বলা। কেননা এসব আলোচনা মানুষের গোনাহর বোঝাকে ভারী করে এবং মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল রাখে।
অনেক দীনদার লোক আছেন, যারা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসেন না। তাদের সঙ্গে গল্প করেন না। বাসায় এসে তাদের সাথে অন্তরঙ্গভাবে মেশেন না। মন খুলে কথা বলেন না। তারা মনে করেন, এতে স্ত্রী-সন্তান ও ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের প্রতি মহব্বত বেড়ে যায় এবং এগুলো মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল করে দেয়। তাদের ধারণানুযায়ী আল্লাহর রাসুলের সুন্নত ও সাহাবায়ে কেরামের আমলও এমন ছিল। তারা নবিজির সুন্নতেরই অনুসরণ করছেন।
এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল এমন ছিল না।
নিম্নোক্ত হাদিসটি পড়ুন।
হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
'একবার আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু আমার সঙ্গে দেখা করলেন এবং আমাকে বললেন, হে হানযালা! তুমি কেমন আছো? আমি বললাম, হানযালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে। সে সময় তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ তুমি কী বলছ? হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি বললাম, আমরা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থাকি। তিনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা শোনান, মনে হয় যেন উভয়টি আমরা চাক্ষুস দেখছি। তারপর আমরা যখন রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে আপন স্ত্রী-সন্তান এবং ধন-সম্পদের কাছে যাই তখন আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর কসম! আমারও তো একই অবস্থা। নিশ্চয়ই আমরা এ বিষয়ে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ
করব। তারপর আমি এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা রওনা করলাম। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা কী? আমি বললাম। আমরা আপনার কাছে থাকি। আপনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা মনে করিয়ে দেন। যেন আমরা তা স্বচক্ষে দেখতে পাই। তারপর আমরা যখন আপনার নিকট হতে বের হই এবং স্ত্রী-সন্তানদের কাছে যাই সে সময় আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, আমি তার কসম করে বলছি, আমার কাছে থাকাকালে তোমাদের যে অবস্থা হয়, যদি তোমরা সবসময় এ অবস্থায় অনড় থাকতে এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতে তাহলে অবশ্যই ফেরেশতাগণ তোমাদের বিছানায় ও রাস্তায় তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত। কিন্তু হে হানযালা! এক ঘন্টা (আল্লাহর যিকিরে) আর এক ঘন্টা (দুনিয়াবি কাজে ব্যয় করবে) অর্থাৎ আস্তে আস্তে (চেষ্টা করো)। এ কথাটি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বললেন। ১১১৩
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
'আমরা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় আমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তা ও হাসি তামাশা করা থেকে দূরে থাকতাম এই ভয়ে যে, এ বিষয়ে আমাদেরকে সতর্ক করে কোনো ওহি অবতীর্ণ হয়ে যায় নাকি। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আমরা তাদের সঙ্গে নির্ভয়ে কথাবার্তা বলতাম ও হাসি-তামাশা করতাম। ১১১৪
টিকাঃ
১১২ সহিহ বুখারি: ৪৮১০।
১১০ সহিহ মুসলিম : ৬৭১৩।
১১৪ সহিহ বুখারি : ৪৮০৮।
অনেক পুরুষ আছে কাজে অকাজে সারাক্ষণ বাসার বাহিরে বাহিরে থাকে। ঘুরে বেড়ায়। আড্ডা দেয়। তারপর রাত করে বাড়ি ফিরে।
আবার অনেকে আছে, বাসায় ফিরে গভীর রাত পর্যন্ত টিভি, মোবাইল, ফেইসবুক, ইন্টারন্টে—এসব নিয়ে পড়ে থাকে।
এগুলো দাম্পত্য জীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পারস্পরিক সম্পর্কের বাঁধনকে শিথীল করে। সংসারে দূরত্ব সৃষ্টি করে।
আবার অনেক পুরুষ মনে করে, 'পরিবারকে সময় দেওয়ার কী আছে? এই যে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম—এ সব কিছু আমি কার জন্য করছি? এগুলো তো আমি আমার পরিবারের জন্যই করছি'
আচ্ছা, একজন পুরুষের কাছে দাম্পত্য জীবনের মানে কি শুধু স্ত্রী-সন্তানদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা? যা যা প্রয়োজন সব এনে দেওয়া?
টাকা-পয়সার প্রয়োজনই কী মানুষের জীবনে সব? থাকা-খাওয়ার ভালো ব্যবস্থার জন্যই কি একজন নারী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়? আপনজন সবাইকে ছেড়ে একজন অপরিচিত মানুষের পরিবারে চলে আসে? তার বাবার বাসায় কি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না? নাকি কোনো অভাব ছিল?
আবার অনেকে মনে করে, স্ত্রী-সন্তানদের সময় দিলে, তাদের সঙ্গে গল্প করলে নিজের ভারিত্ব কমে যাবে। তাই সে সবসময় একটা গুরুগম্ভীর ভাব বজায় রাখে। সবাই তাকে ভয় করে। ছোট বাচ্চারা তাকে দেখলে কেমন ফ্যাকাসে হয়ে যায়। বড়রাও কাছে আসতে ইতস্তত করে। তাকে কখনো স্ত্রীর সঙ্গে নরম ও কোমল সুরে কথা বলতে দেখা যায় না।
অথচ স্ত্রীদের সঙ্গে নবিজির আচরণ মোটেও এমন ছিলো না। তিনি গোটা মানবজাতির জন্য, বিশ্ব জাহানের জন্য নবি হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। সমগ্র মানবজাতির হেদায়াত ও মুক্তি ছিল তার চিন্তার বিষয়। নবুওয়াত ও রিসালাতের মহা গুরুদায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। তারপরও তিনি পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতেন। স্ত্রীদের সাথে বসে গল্প করতেন। তাদের যাবতীয় হক আদায় করতেন। তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতেন।
নবি জীবনে এমন দৃষ্টান্ত অসংখ্য। নমুনাস্বরূপ নিয়ে আমরা আবু যুরআর সুদীর্ঘ হাদিসটি তুলে ধরছি। তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের কীভাবে সময় দিতেন। কত লম্বা সময় ধরে তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। তাদের কথা শুনতেন। আমার আপনার দায়িত্ব ও ব্যস্ততা নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের চেয়ে অধিক না? আমার আপনার সময় নিশ্চয়ই তাঁর সময়ের চেয়ে অধিক দামী না?
একদিন আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বসে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে গল্প করছিলেন। গল্পটি হলো—
'তিনি বলেন, এগারো জন মহিলা একস্থানে একত্রিত হয়ে বসল। তারা সকলে মিলে এই কথার উপর একমত হল যে, তারা নিজেদের স্বামীর কোনো তথ্যই গোপন রাখবে না। প্রথমজন বলল, আমার স্বামী হচ্ছে অত্যন্ত হালকা-পাতলা দুর্বল উটের গোশতের ন্যায়, যেন কোনো পাহাড়ের চূড়ায় রাখা হয়েছে এবং সেখানে আরোহন করা সহজ কাজ নয় এবং গোশতের মধ্যে এত চর্বিও নেই, যে কারণে সেখানে উঠার জন্য কেউ কষ্ট স্বীকার করবে। দ্বিতীয় মহিলা বলল, আমি আমার স্বামী সম্পর্কে কিছু বলব না। কারণ, আমি ভয় করছি যে তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেষ করা যাবে না। কেননা যদি আমি তার সম্পর্কে বলতে যাই, তাহলে আমাকে তার সকল দুর্বলতা এবং মন্দ দিকগুলো সম্পর্কেও বলতে হবে।.....
এভাবে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা প্রত্যেকের স্বামী সম্পর্কে একে একে দশজন মহিলার মন্তব্য তুলে ধরলেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মনে তার কথা শুনে যাচ্ছেন। চেহারায় বিরক্তির কোনো লেশ নেই। নেই কোনো প্রচ্ছন্ন উপেক্ষা যে, আয়েশা আমার সাথে এসব কী গল্প করছে?
একাদশতম মহিলা বলল, আমার স্বামী আবু যুরআ। তার কথা আমি কী বলব। সে আমাকে এত বেশি গহনা দিয়েছে যে আমার কান ভারী হয়ে গিয়েছে। আমার বাজুতে মেদ জমেছে এবং আমি এত সন্তুষ্ট হযেছি যে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি। সে আমাকে এনেছে অত্যন্ত গরিব পরিবার থেকে, যে পরিবার ছিল মাত্র কয়েকটি বকরির মালিক। সে আমাকে অত্যন্ত ধনী পরিবারে নিয়ে আসে। যেখানে ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি এবং উটের হাওদার আওয়াজ এবং শষ্য মাড়াইয়ের খসখসানি শব্দ শোনা যায়। সে আমাকে ধন-সম্পদের মধ্যে রেখেছে। আমি যা কিছু বলতাম সে বিদ্রুপ করত না। আমি নিদ্রা যেতাম এবং সকালে দেরি করে উঠতাম। যখন আমি পান করতাম অত্যন্ত তৃপ্তি সহকারে পান করতাম।
আর আবু যারআর কথা কী বলব। তার পাত্র ছিল সর্বদা পরিপূর্ণ। তার ঘর ছিল প্রশস্ত। আবু যারআর পুত্রের কথা কী বলব। সেও খুব ভালো ছিল। তার শয্যা এত সংকীর্ণ ছিল, মনে হত যেন কোষবদ্ধ তরবারি। অর্থাৎ সে অত্যন্ত হালকা পাতলা দেহের অধিকারী। তার খাদ্য হচ্ছে ছাগলের একখানা পা। আর আবু যারআর কন্যা সম্পর্কে বলতে হয় সে কতই না ভালো। সে বাবা-মার একান্ত বাধ্যগত সন্তান। অত্যন্ত সু-সাস্থ্যের অধিকারিণী। যে কারণে সতীনরা তাকে হিংসা করে। আবু যারআর ক্রীতদাসীরও অনেক গুণ ছিল। কোনো গোপন কথা প্রকাশ করত না। সে আমাদের সম্পদকে কমাত এবং আমাদের আবর্জনা দিয়ে ভরে রাখত না। সে মহিলা আরও বলল, একদিন দুধ দোহন করার সময় আবু যারআ বাইরে বেরিয়ে এমন একজন মহিলাকে দেখতে পেল, যার দুটি পুত্র সন্তান রয়েছে। ওরা মায়ের স্তন নিয়ে বাঘের মত খেলা করছিল (দুধ পান করছিল)। সে ঐ মহিলাকে দেখে আকৃষ্ট হল এবং আমাকে তালাক দিয়ে তাকে বিয়ে করে ফেলল। এরপর এক সম্মানী ব্যক্তির সাথে আমার বিয়ে হল। সে দ্রুতগামী অশ্বে আরোহণ করত এবং হাতে বর্শা রাখত। সে আমাকে অনেক সম্পদ দিয়েছে এবং প্রত্যেক প্রকারের গৃহপালিত জন্তু থেকে এক একজোড়া আমাকে দিয়েছে এবং বলেছে, হে উম্মে যারআ! তুমি এ সম্পদ থেকে খাও, পরিধান কর এবং উপহার দাও। মহিলা আরও বলল, আমার এই স্বামী যা দিয়েছে তা আবু যারআর একটি ক্ষুদ্র পাত্রও পূর্ণ করতে পারবে না।
আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, (এতক্ষণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্যের সাথে শুধু শুনেই যাচ্ছিলেন। সব শুনে) তিনি বললেন, আবু যারআ তার স্ত্রী উম্মে যারআর প্রতি যেরূপ আমিও তোমার প্রতি অনুরূপ। (পার্থক্য এতটুকুই) আবু যারআ তাকে তালাক দিয়েছিল, তবে আমি তোমাকে তালাক দেব না এবং তোমার সাথে উত্তম ব্যবহার করব।' ১১২
আহা! নবিজির কী মধুর ভালোবাসামাখা উত্তর! বিরক্তি তো দূরের কথা। এমন উত্তরে জগতের কোনো স্ত্রীর কলিজা শীতল না হয়ে কি পারে!
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই হাদিস থেকে অর্জিত শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন,
'এই হাদিসের মাঝে পরিবারের সাথে উত্তম আচরণ, আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার এবং তাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করার শিক্ষা রয়েছে। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু যেন কখনোই বৈধতার গণ্ডি পেরিয়ে নিষিদ্ধ সীমানায় চলে না যায়।'
নিষিদ্ধ সীমানা বলতে উনি বুঝিয়েছেন, যেমন-স্ত্রীর সঙ্গে বসে কারও গীবত করা। পরচর্চা করা। নাটক, সিনেমা, গান, সিরিয়াল, খেলা ইত্যাদি নাজায়েজ বিষয় নিয়ে কথা বলা। কেননা এসব আলোচনা মানুষের গোনাহর বোঝাকে ভারী করে এবং মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল রাখে।
অনেক দীনদার লোক আছেন, যারা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসেন না। তাদের সঙ্গে গল্প করেন না। বাসায় এসে তাদের সাথে অন্তরঙ্গভাবে মেশেন না। মন খুলে কথা বলেন না। তারা মনে করেন, এতে স্ত্রী-সন্তান ও ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের প্রতি মহব্বত বেড়ে যায় এবং এগুলো মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল করে দেয়। তাদের ধারণানুযায়ী আল্লাহর রাসুলের সুন্নত ও সাহাবায়ে কেরামের আমলও এমন ছিল। তারা নবিজির সুন্নতেরই অনুসরণ করছেন।
এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল এমন ছিল না।
নিম্নোক্ত হাদিসটি পড়ুন।
হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
'একবার আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু আমার সঙ্গে দেখা করলেন এবং আমাকে বললেন, হে হানযালা! তুমি কেমন আছো? আমি বললাম, হানযালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে। সে সময় তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ তুমি কী বলছ? হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি বললাম, আমরা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থাকি। তিনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা শোনান, মনে হয় যেন উভয়টি আমরা চাক্ষুস দেখছি। তারপর আমরা যখন রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে আপন স্ত্রী-সন্তান এবং ধন-সম্পদের কাছে যাই তখন আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর কসম! আমারও তো একই অবস্থা। নিশ্চয়ই আমরা এ বিষয়ে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ
করব। তারপর আমি এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা রওনা করলাম। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা কী? আমি বললাম। আমরা আপনার কাছে থাকি। আপনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা মনে করিয়ে দেন। যেন আমরা তা স্বচক্ষে দেখতে পাই। তারপর আমরা যখন আপনার নিকট হতে বের হই এবং স্ত্রী-সন্তানদের কাছে যাই সে সময় আমরা এর অনেক বিষয় ভুলে যাই। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, আমি তার কসম করে বলছি, আমার কাছে থাকাকালে তোমাদের যে অবস্থা হয়, যদি তোমরা সবসময় এ অবস্থায় অনড় থাকতে এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতে তাহলে অবশ্যই ফেরেশতাগণ তোমাদের বিছানায় ও রাস্তায় তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত। কিন্তু হে হানযালা! এক ঘন্টা (আল্লাহর যিকিরে) আর এক ঘন্টা (দুনিয়াবি কাজে ব্যয় করবে) অর্থাৎ আস্তে আস্তে (চেষ্টা করো)। এ কথাটি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বললেন। ১১১৩
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
'আমরা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় আমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তা ও হাসি তামাশা করা থেকে দূরে থাকতাম এই ভয়ে যে, এ বিষয়ে আমাদেরকে সতর্ক করে কোনো ওহি অবতীর্ণ হয়ে যায় নাকি। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আমরা তাদের সঙ্গে নির্ভয়ে কথাবার্তা বলতাম ও হাসি-তামাশা করতাম। ১১১৪
টিকাঃ
১১২ সহিহ বুখারি: ৪৮১০।
১১০ সহিহ মুসলিম : ৬৭১৩।
১১৪ সহিহ বুখারি : ৪৮০৮।