📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 পুরুষদের সাজসজ্জা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

📄 পুরুষদের সাজসজ্জা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা


বৈবাহিক জীবনে পুরুষেরও সৌন্দর্য অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে। এর মাধ্যমে স্ত্রীর মন আকর্ষণ করা যায়। মুগ্ধতার দৃষ্টি কাড়া যায়।
আপনি যদি সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকেন তাহলে আপনার প্রতি আপনার স্ত্রীর মাঝে এক ধরনের মুগ্ধতা কাজ করবে। সে আপনার দিকে যতবার তাকাবে, ততবার নতুন করে প্রেমে পড়বে। কারণ, মানুষ মাত্রই সৌন্দর্যপিয়াসী। সুন্দরের প্রতি তার মন ধাবিত হয়।
তাই ইসলামি শরিয়তেও এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সৌন্দর্য অবলম্বনের পথ ও পন্থা বাতলে দেওয়া হয়েছে। যেমন, সাধু সন্ন্যাসীদের মত দাড়ি ইয়া লম্বা করে রাখা যাবে না। আবার এক মুষ্টির চেয়ে ছোট করেও রাখা যাবে না।
আজকালকার বখাটে ছেলেপেলেদের মতো হেয়ার কাট না দিয়ে মার্জিতভাবে চুল রাখুন। অনেকের চুল খুব অগোছালো থাকে। জট পেকে যায়। দেখতে পাগল পাগল লাগে। এসব বর্জন করুন।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
كُنْتُ أُرَجِّلُ رَأْسَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا حَائِضُ
'আমি ঋতুবতী অবস্থায় থেকেও রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চুল আচড়িয়ে দিতাম।৯২
মুখ সবসময় পরিষ্কার দুর্গন্ধমুক্ত রাখুন। নিয়মিত মেসওয়াক করুন। রাতে শোয়ার আগে ব্রাশ করুন। পেটে অসুখের কারণে অনেকের সবসময় মুখে দুর্গন্ধ থাকে। কথা বললে দুর্গন্ধ বের হয়। অনেকে চুপ থাকলেও দুর্গন্ধ বের হয়। তারা মাউথ ফ্রেশ ব্যবহার করতে পারেন। ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে পারেন।
মুখের দুর্গন্ধের ব্যাপারে ইসলামি শরিয়ত খুব সেনসিটিভ। যেমন, কারও যদি মুখে দুর্গন্ধ থাকে। আর সে মসজিদে গেলে আশপাশের মুসল্লিদের কষ্ট হয়। তাহলে এমন ব্যক্তিকে শরিয়ত ফরজ নামাজও জামাতে না পড়ে ঘরে পড়ার আদেশ
করেছে। যাতে অন্যদের কষ্ট না হয়। অথচ একাকী নামাজের চেয়ে জামাতে নামাজের ফযিলত সাতাশ গুণ বেশী।
আর আপনি যার সঙ্গে সংসার করছেন। সে তো মসজিদের অপরিচিত কোনো মুসল্লি না। আপনার পত্নী। জীবনসঙ্গি। তাকে এভাবে কষ্ট দেওয়া হারান। শুধু তাকে নয়, যে কোনো মুসলমানকেই কষ্ট দেওয়া হারাম।
আপনার স্ত্রী হয়ত ভয়ে কিংবা লজ্জায় আপনাকে কিছু বলবে না। কিন্তু তার মাঝে আপনার প্রতি এক প্রকার ঘৃণা এবং অস্বস্তিবোধ কাজ করবে।
'আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞাসা করা হল, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম কোন কাজটি করতেন? তিনি বলেন, 'সর্বপ্রথম মেসওয়াক করতেন।'
♥ আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করুন। আতর ব্যবহার করা সুন্নত। যদি পারফিউম ব্যবহার করেন, তাহলে সেটা যেন অবশ্যই এ্যালকোহল মুক্ত হয়। দাম্পত্য জীবনে সুগন্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বছরের আট মাসেই আমাদের দেশের আবহাওয়া উষ্ণ থাকে। ঘামে ভিজে থাকে শরীর, জামা-কাপড়। সেই ঘাম শুকিয়ে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। কাছে যাওয়া দায় হয়।
আমরা অনেকে অফিসে কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার করি। কিন্তু ঘরের মানুষটার সাথে যখন থাকি তখন এ ব্যাপারে উদাসীন থাকি।
আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, 'আমি যত উত্তম খুশবু পেতাম, তা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লাগিয়ে দিতাম। এমনকি সে খুশবুর চমক তার মাথায় ও দাঁড়িতে দেখতে পেতাম। ৯৪
বুখারি শরিফের অপর একটি হাদিসে আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'আমি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মুহরিম অবস্থায় নিজ হাতে খুশবু লাগিয়ে দিয়েছি এবং মিনাতেও সেখান থেকে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে তাকে আমি খুশবু লাগিয়ে দিয়েছি।৯৫
সুগন্ধি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব প্রিয় বস্তু ছিল। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'পার্থিব বস্তুর মধ্যে স্ত্রী ও সুগন্ধি আমার নিকট পছন্দনীয় করা হয়েছে।৯৬
উত্তম সুগন্ধি নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অন্যের মাঝে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টিতে সহায়তা করে। মানুষকে কাছে টানে।
ঘরের প্রিয় মানুষটিকে দূরে সরিয়ে বাহিরের মানুষকে কাছে টেনে কী লাভ বলুন?
স্ত্রীকে আকর্ষণ না করে অন্যদের আকর্ষণের চেষ্টা কি কোনো সুপুরুষের কাজ হতে পারে? কখনোই না।
তাই ঘরে-বাইরে সর্বত্রই পুরুষের সুগন্ধি ব্যবহার করা উচিত। নারীরা শুধু গৃহাভ্যন্তরে সুগন্ধি ব্যবহার করবে। বাইরে বের হওয়ার সময় তাদের সুগন্ধি ব্যবহার করা হারাম। এতে পরপুরুষকে আকর্ষণ করা হয়।
• শরীরে বিভিন্ন জায়গায় অবাঞ্চিত পশম ও গোফ-মোচের ব্যাপারেও সতর্ক থাকুন। প্রতি সপ্তাহান্তেই নিয়ম করে পরিষ্কার করুন। অনেকে কাটব-কাটছি করে বন-জঙ্গল বানিয়ে ফেলে। বাহিরের মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় না বলে আমরা এ বিষয়ে অনেকে গুরুত্ব দেই না। এটা সুন্নতের খেলাফ।
এখানে উপরোল্লিখিত কয়েকটি হাদিসের মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে থাকার ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটা সচেতন ছিলেন।
সাহাবায়ে কেরামও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাট্যতার বিষয়ে অনেক সচেতন ছিলেন।
আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট ধূলিমলিন এলোকেশী এক ব্যক্তি এল। সাথে তার স্ত্রী। স্ত্রী বলতে লাগল, আমার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নাই। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারলেন যে, সে তার স্বামীকে অপছন্দ করে। তখন তিনি লোকটিকে পাঠিয়ে দিলেন। নখ-চুল-মোচ সব কেটে, ভালো করে গোসল করে সুন্দর জামা পড়ে একেবারে কেতাদুরস্ত হয়ে আসতে বললেন। তারপর লোকটি যখন এলো, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে তার স্ত্রীর সামনে যেতে বললেন। তার স্ত্রী তাকে দেখে প্রথমে চিনতে পারেনি। কারণ সে তাকে কোনোদিন এত সুন্দর অবস্থায় দেখেনি। তখন সে তার স্বামীকে গ্রহণ করে নেয় এবং বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তোমরা স্ত্রীদের সাথে এভাবেই থেকো। আল্লাহর শপথ! নারীরাও চায় তোমরা তাদের জন্য সাজসজ্জা অবলম্বন করো যেমন তোমরা চাও তারা তোমাদের জন্য সাজগোজ করে থাকুক।
তবে আজকাল অনেক পুরুষের মাঝে ফ্যাশন সচেতনতার নামে ইসলাম পরিপন্থি কিছু রুচির প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়, যা মানুষের সুস্থ স্বভাব-রুচি বিরুদ্ধ। অবশ্য এর জন্য ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং নববি আদর্শের চর্চাহীনতা দায়ী।
যেমন, অনেক পুরুষ আছে দাড়ি কাটা, দাড়ি চাঁছাকে স্মার্টনেস মনে করে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা আবার ধূমপানও করে। দুর্গন্ধে তাদের কাছেই যাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষই কাছে যেতে পারে না। ঘরের বউ তো দূরের কথা। কিন্তু তার স্ত্রী বেচারীর কি-ই-বা করার আছে। সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য সে এসব মুখ বুজে সহ্য করে নেয়। একসময় এসব তার সওয়া হয়ে যায়।
কেউ কেউ তো এমন আছেন, রাতে সিগারেট না খেলে ঘুম হয় না। এমন পুরুষের ঠোঁটে যখন তার স্ত্রী চুম্বন করে তখন স্ত্রীর মনে হয়, যেন সে কোনো ঠোঁটে নয়, কমোডে মুখ দিয়েছে।
অনেক দীনদার মানুষ আছে, অগোছালো আর অপরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে। বাহ্যিক সৌন্দর্য গ্রহণকে তারা দ্বীনের খেলাফ মনে করেন। তাই তারা এসব বর্জন করেন এবং এটাকে তারা সাদাসিধে জিন্দেগী নাম দিয়ে থাকেন। মনে করেন। অথচ এটি তাদের ভুল ধারণা। তারা শয়তানের ধোঁকার শিকার। সাদাসিদের সাথে নোংরা ও
অপরিচ্ছন্ন হয়ে থাকার কোনো সম্পর্ক নেই। তারা এভাবে মানুষকে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ম্যাসেজ প্রদান করছে। মানুষ তাদের দেখে মনে করছে ইসলাম বুঝি এমনই। ক্ষেত টাইপ। নাউযুবিল্লাহ। নিশ্চয়, আমার আল্লাহ সুন্দর। তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন।
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাহ্যিক সৌন্দর্যের ব্যাপারেও গুরুত্বারোপ করেছেন। তাবাকাতে ইবনে সাদে বর্ণিত হয়েছে। জুন্দুব ইবনে মাকিস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
'কোনো প্রতিনিধি দল আগমন করলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উত্তম কাপড়টি পরিধান করতেন এবং বিশিষ্ট সাহাবাদেরকেও উত্তম কাপড় পরিধান করতে বলতেন। অতএব যখন কিন্দার প্রতিনিধি দল আগমন করেছিল তখন আমির পরিধানে একটি ইয়ামেনি চাদর দেখেছিলাম এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুও সেদিন অনুরূপ কাপড় পরিধান করেছিলেন।'
এ হাদিসের মাধ্যমে বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয়ে নবিজি ও সাহাবায়ে কেরামের গুরুত্বারোপের বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে ফুটে ওঠেছে। সুতরাং এটিকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
আপনার স্ত্রী আপনার কাছ থেকে তেমন সাজসজ্জা কামনা করে যেমন আপনি তার কাছ থেকে করেন।
আপনি নিজের যত্ন নিন। দেখবেন আপনার ভালোবাসাও যত্নে থাকবে। আপনি অপরিচ্ছন্ন ময়লা হয়ে থাকলে আপনার ভালোবাসার গায়েও ময়লা জমবে। বিবর্ণ দেখাবে।
নিজেকে সবসময় সতেজ রাখুন। ঘ্রাণ নিন। ঘ্রাণ দিন। জীবনকে উপভোগ করুন। ঝরা পাতার মত ম্যারম্যারে হয়ে থাকবেন না। ঝরা পাতায় কারো চোখ আটকায় না। সবাই তাকে পায়ে মাড়াতে কিংবা ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দিতে পছন্দ করে।

টিকাঃ
** সহিহ বুখারি : ২৯৫।
১০ সহিহ মুসলিম : ৪৭৮।
৯৪ সহিহ বুখারি: ৫৯২৩।
* সহিহ বুখারি : ৫৯২২।
৯৬ সুনানে নাসাঈ: ৩৯৩৯।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 কে বেশি চুপ থাকে, পুরুষ না নারী?

📄 কে বেশি চুপ থাকে, পুরুষ না নারী?


আফিফার বিয়ে হয়েছে আট বছর। তার ফুটফুটে দুটি বাচ্চাও আছে। সংসার, স্বামী, সন্তান, এসব নিয়ে তার বেশ সুখেই দিন কেটে যাচ্ছে। স্বামীর প্রতিও তার তেমন কোনো অভিযোগ নেই। শুধু ছোট্ট একটা অভিযোগ আছে। তার স্বামী সারাদিন চুপচাপ থাকে। তার সঙ্গে তেমন কোনো কথা বলে না।
কম কথা বলা, চুপচাপ থাকা যদিও একটি প্রশংসনীয় গুণ। প্রবাদ আছে, যে চুপ থাকে সে নাজাত পায়। দাম্পত্য জীবনেও চুপ থাকার গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে আমরা সেটা বর্ণনা করব। কিন্তু একেবারে চুপচাপ থাকাটা খারাপ। এতে অনেক সময় অন্যের প্রতি অবহেলা প্রকাশ পায়। ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত চুপচাপ থাকা একটি রোগ। নারীর চেয়ে পুরুষরা সাধারণত এই রোগে বেশি আক্রান্ত।
পুরুষরা চুপচাপ থাকলে নারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যখন এমন কোনো বিষয় হয়, যে বিষয়ে সে কিছু না বললে বোঝা যায় না, আসলে সে তার স্ত্রীকে গুরুত্ব দিচ্ছে কিনা, কিংবা এ বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ আছে কি না।
কিছু পুরুষ তো এমনও আছে, তাদের কিছু বলতে হলে স্ত্রীদের তাদের কাছে দূত পাঠাতে হয়।
স্বামী-স্ত্রী সাধারণত চুপ থাকার কারণ কী, সেটি আমরা এখন খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।
• বিবাহের যেহেতু অনেক বছর হয়েছে, তাই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সুন্দর একটা বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। তারা মনে করে, এখন সবকিছু বলে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। এখন আর সেই অবস্থা নেই যে, দুজন বসে মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের কথা বলবে। পুরনো মধুর কোনো স্মৃতিচারণ করবে। এগুলো তাদের কাছে ছেলেমানুষি মনে হয়। এখন কি আর ছেলেমানুষি করার বয়স আছে?
• কখনো পুরুষ তার কথা বলার সমস্ত শক্তি কর্মক্ষেত্রেই নিঃশেষ করে আসে। সেখানে তাকে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়। সারাদিন কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে সে বাসায় ফিরে। তাই সে বাসায় এসে চুপচাপ থাকে। কারও সঙ্গে কোনো কথা বলে না। কথা বলতে তার
ক্লান্তি লাগে। সে চুপ থাকে। এই চুপ থাকাটাই তার জন্য একপ্রকার বিশ্রাম।
♥ অনেক নারী খুব ঝগড়াটে হয়। তখন তার স্বামী ঝগড়া এড়ানোর জন্য বাসায় এসে বোবা সেজে থাকেন।
• এ ছাড়াও আরও কিছু কারণে পুরুষরা বাসায় এলে চুপচাপ থাকে। যেমন, অর্থনৈতিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা। মতবিরোধকে প্রশ্রয় না দেওয়া। কোনো প্রকৃত বিষয়কে গোপন করা।
আচ্ছা, কখনো কখনো চুপ থাকাটা কি আবশ্যক?
মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, নির্দিষ্ট সময় চুপ থাকাটা কোনো রোগ নয়। বরং দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া-বিবাদ এড়ানোর জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 আদর সোহাগ খুনসুঁটি

📄 আদর সোহাগ খুনসুঁটি


স্ত্রীর সঙ্গে খুনসুঁটি করা। একে অপরকে চিমটি কাটা। দুষ্টুমি করে কানটা আস্তে করে মলে দেওয়া। নাগের ডগায় টোকা দেওয়া। চুলে টান দিয়ে বুকের কাছে নিয়ে আসা। কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করা। স্ত্রীর সঙ্গে বসে গল্প করা। হেসে গায়ের উপর গিয়ে পড়া। আদর করে স্ত্রীকে তার সবচেয়ে পছন্দের নাম ধরে ডাকা। কিংবা নামকে সংক্ষেপ করে ডাকা। যেমন, স্ত্রীর নাম জুবাইদা হলে আদর করে তাকে 'জুবি' বলা।
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনেও এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে। তিনি তার স্ত্রী আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে আদর করে মাঝে মাঝে আইশ বলে ডাকতেন। যেমন একবার তিনি তাকে বললেন,
'হে আইশ! জিবরাইল আ. তোমাকে সালাম পাঠিয়েছেন।'১৭
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে হুমায়রা বলেও ডাকতেন। ইবনুল আসির তার নিহায়া গ্রন্থে বলেন, হুমায়রা শব্দটি হামরা শব্দের ক্ষুদ্রত্ববাচক শব্দ। আর হামরা শব্দের অর্থ হচ্ছে লাল। উদ্দেশ্য লাল ফর্সা। কোনো মেয়ে দেখতে লাল টকটকে ফর্সা হলে আরবরা তার ক্ষেত্রে হামরা শব্দটি ব্যবহার করত।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুয়তের এমন মহান উচ্চাসনে থাকা সত্ত্বে স্ত্রীদের সঙ্গে দুষ্টুমি করতেন। তাদের আদর-সোহাগ করতেন।
ইমাম বুখারি রহ. বর্ণনা করেছেন,
'আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই পাত্র থেকে গোসল করতাম, যা আমার এবং তার মাঝে থাকত। তিনি আমার থেকে আগে তাড়াতাড়ি করে ফেলতেন। তখন আমি বলতাম, আমার জন্য একটু রেখে দিন। আমার জন্য একটু রেখে দিন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন যে, তারা উভয়েই গোসল ফরয অবস্থায় ছিলেন।'
ইমাম মুসলিম রোযা অধ্যায়ে আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার একটি হাদিস বর্ণনা করেন। আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা অবস্থায় তার কোনো স্ত্রীকে চুম্বন করতেন। এ কথা বলে তিনি হাসতে থাকেন। ৯৯
অর্থাৎ কোনো স্ত্রী বলে তিনি নিজেকে বুঝিয়ে ছিলেন।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'একবার নбиজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুম্বন করার জন্য আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তখন আমি বললাম, আমি রোযা। তিনি বললেন, আমিও তো রোযা।'১১৯
অপর একটি হাদিস আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত আছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'যার আখলাক-চরিত্র ভালো এবং পরিবার-পরিজনের প্রতি যে অধিক কোমল ও দয়ার্দ্র, তার-ই ইমান সবচেয়ে পরিপূর্ণ।'১০০
স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের একটি পন্থা হল তার মুখে খাবার তুলে দেওয়া।
সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'তুমি তোমার পরিবারের পিছনে যে খরচই করবে, তা সদকা বলে গণ্য হবে। এমনকি সেই লোকমাটিও, যা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও।' ১০১
লক্ষ করুন, স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দেয়ার মাঝে দুটি নয়, তিনটি উপকারিতা।
এক. স্ত্রীর মন জয়।
দুই. তার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
তিন. সদকাহর মতো একটি ইবাদত পালন। যার বিনিময়ে আবার আজর ও সওয়াব পাওয়া যাবে। সুবহানাল্লাহ।
স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মাঝে শুধু পার্থিব নয়। অনেক অপার্থিব উপকারিতাও বিদ্যমান থাকে।
ইমাম নববি রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন যে, 'স্ত্রীর মুখে লোকমা তুলে দেওয়া সাধারণত ভালোবাসার তীব্রতার কারণে হয়ে থাকে। মনের কামনারও তাতে বড় দখল থাকে। তা সত্ত্বেও কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের উদ্দেশ্য এমনটি করে, তাহলে সে অবশ্যই আল্লাহর অনুগ্রহ ও সওয়াবের অধিকারী হবে।'
হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন, আরেকটি হাদিসে এমনই এক ফযিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। যা এর চেয়েও আরও সুস্পষ্ট। হযরত আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমাদের স্ত্রী মিলনের মাঝেও সদকার সওয়াব রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের কেউ তার দৈহিক কামনা পূরণ করলেও সে প্রতিদান লাভ করবে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাঁ। তোমরা কি মনে কর সে যদি তা হারাম পন্থায় পূরণ করত, তাহলে কি তার গুনাহ হত না? তেমনিভাবে সে হালাল পন্থায় তা পূরণ করলে তার জন্য সওয়াব রয়েছে।'১০২
আপনি যদি আপনার স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দেন, তাহলে দেখবেন সে ভালোবাসায় আপ্লুত হয়েছে। আবেগে তার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এখন আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই, আপনি সর্বশেষ কবে আপনার স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন?
যদি না দিয়ে থাকেন, তাহলে কেন দেননি? এটা খুব এক্সপেনসিভ বলে। এতে অনেক টাকা খরচ হয় তাই?
উত্তর অবশ্যই না। তাহলে?
আসলে আপনার মাঝে ভালোবাসার অভাব আছে। আপনি রাসুলের আদর্শ অনুসরণ করতে চান না কিংবা আপনার সওয়াবের প্রত্যাশা নেই।
স্ত্রীর প্রতি আদর-সোহাগ ও তার সঙ্গে খুনসুঁটি করার দ্বারা দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় হয়। পারস্পরিক হৃদ্যতা বৃদ্ধি পায়। এজন্যই যখন হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু একজন অকুমারি নারী বিয়ে করেছিলেন। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন, তুমি একজন কুমারি নারীকে বিয়ে করলে না কেন? তাহলে তুমি তার সাথে মজা করতে আর সেও তোমার সাথে মজা করত। তুমি তার সাথে হেসে কুটিকুটি হতে আর সেও তোমার সঙ্গে হাস্যরস করত।

টিকাঃ
১৭ সহিহ বুখারি : ৩৭৬৮।
১৮ সুনানে ইবনে মাজাহ শরিফেও অনুরূপ একটি হাদিস আছে: ১৬৮৩।
৯৯ জামে তিরমিযি: ২৬১২।
১০০ সুনানে তিরমিযি: ২৬১২।
১০১ সহিহ বুখারি : ৫০৫৪।
১০২ সহিহ মুসলিম : ১০০৬।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 ক্ষমা

📄 ক্ষমা


সুখী সংসারের জন্য প্রয়োজন অনেক কিছুর। আর সেই অনেক কিছুর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষমা, মার্জনা। স্ত্রী কোনো ভুল করে ফেললে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া। ভুল দেখেও না দেখার ভান করা। ভুল থেকে চোখ সরিয়ে ফেলা।
বিশেষ করে দুনিয়াবি বিষয় সংশ্লিষ্ট কোনো ভুল। দীনি বিষয় হলে আল্লাহর কোনো হুকুম লঙ্ঘিত হলে ভিন্ন কথা। কেননা শরিয়তের বিষয়ে আমাদের কারও ক্ষমা করার কোনো অধিকার নেই। এ অধিকার একমাত্র আল্লাহর।
আমাকে সবসময় মনে রাখতে হবে, আমি যার সঙ্গে সংসার করছি সে একজন মানুষ। আর মানুষ মাত্রই ভুলকারী। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'প্রত্যেক বনি আদমই ভুল করে থাকে। আর সর্বোত্তম ভুলকারী হল যে ভুল করে তওবা করে নেয়।'১০০৩
অর্থাৎ কোনো ভুল হয়ে গেলে সাথে সাথে তওবা করে নেওয়া।
একজন পুরুষ যার সঙ্গে সংসার করে সে শুধু একজন মানুষই নয়। একজন নারী। আর নারীর সৃষ্টিগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'আর তোমরা নারীদের সাথে সৎ ব্যবহার করবে। কেননা, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরের হাড় থেকে এবং সবচেয়ে বাঁকা হচ্ছে পাঁজরের ওপরের হাড়। যদি তুমি তা সোজা করতে চাও তাহলে ভেঙ্গে যাবে। আর যদি যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দাও তাহলে বাঁকাই থাকবে। অতএব, তোমাদের আদেশ করা হলো নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার।১০০৪
অর্থাৎ কথায় কথায় স্ত্রীর ভুল না ধরা। তার পিছে পিছে লেগে না থাকা। পান থেকে চুন খসলেই উত্তেজিত না হওয়া। তার সমস্ত কথা না ধরা। নিজের ইগো ও রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিচক্ষণ ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেওয়া।
আমরা আমাদের নিজেদের দিকে তাকালে দেখতে পাব, আমাদেরও অনেক ভুল হয়। আসলে আমরা কেউ পারফেক্ট না। ভুলের ঊর্ধ্বে না। কিন্তু আমাদের ভুলগুলো আমাদের চোখে পড়ে না। তাই আমরা সবসময় অন্যের ভুল নিয়ে পড়ে থাকি। আর নিজেদের সঠিক ভাবি।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের স্ত্রীরা বাসায় অনেক কাজ করে। রান্না-বান্না, ধোয়া-মোছা, সন্তানদের দেখাশোনা, তাদের গোসল করানো, খাওয়ানো, কান্না থামানো, কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানো ইত্যাদি আরও কত কাজ!
অনেক কাজ করতে গেলে কিছু ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। কোনো ভুল না হওয়াটা বরং অস্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক বিষয়টাকে যে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারবে না, তার মানসিক সমস্যা আছে। সে সুস্থ না।
তাই স্ত্রীর সমস্ত ভুল ধরা যাবে না। বিশেষ করে দুনিয়াবি বিষয় সংশ্লিষ্ট কোনো ভুল। যেমন, আপনি তার কাছে সামান্য কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু টাকাটা সে কোথায় রেখেছে মনে করতে পারছে না। অথবা আপনার অফিসে যাওয়ার ড্রেসটা সে স্ত্রী করে রাখতে পারেনি। কিংবা রান্নাটা একদিন একটু আপনার মনমত হয়নি ইত্যাদি ইত্যাদি।
সে যদি দশটি ভুল করে আপনি দু-তিনটা ধরুন। বাকিগুলো ছেড়ে দিন।
আপনি যদি তার সব ভুল ধরা শুরু করেন, তাহলে আপনি তার চোখ থেকে পড়ে যাবেন এবং একসময় বিরক্ত হয়ে সেও আপনার ভুল ধরা শুরু করবে। এভাবে দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরা শুরু করবে। একসময় ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। সংসারে কঠিন পরিণতি ডেকে আনবে।
এবার নবি জীবনের একটি ঘটনা শুনুন। ঘটনাটি স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামিন কুরআনে বর্ণনা করেছেন।
وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَن بَعْضٍ
'স্মরণ কর, যখন নবি তার স্ত্রীদের কোনো একজনকে গোপনে একটি কথা বলেছিল। তারপর সেই স্ত্রী যখন তা (গোপন রাখতে না পেরে অন্য কাউকে) বলে দিল এবং আল্লাহ তায়ালা নবির কাছে ব্যাপারটি প্রকাশ করে দিলেন। তখন নবি সে বিষয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন এবং কিছু এড়িয়ে গেলেন।' ১০৫
গোপন কথাটি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে কথাটি ফাঁস করে দিয়েছিলেন। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহির মাধ্যমে ব্যাপারটি জানতে পেরে সে বিষয়ে তাকে বললেন, কিন্তু সবটুকু বললেন না। কেননা সবটুকু বললে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা অনেক বেশি লজ্জা পেতেন। তাকে যেভাবে ভর্ৎসনা করা দরকার ছিল নবিজি তার সামান্যই করলেন।
নবি জীবনের আরেকটি ঘটনা শুনুন। ঘটনাটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়, ইনসাফ ও সহনশীলতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবাদের নিয়ে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে বসা ছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কিছু খাবার তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তার আগেই উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা খাবার পাঠিয়ে দিলেন।
উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তিনি একটি থালায় করে কিছু খাবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবাদের নিকট পাঠালেন। ইত্যবসরে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা চাদর জড়িয়ে আসলেন। তাঁর হাতে একটি পাথর ছিল। পাথরটি দিয়ে তিনি থালাটি ভেঙ্গে দিলেন। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থালার ভাঙ্গা টুকরো দুটি একত্র করলেন এবং (সাহাবাদের) বললেন, তোমরা খাও। তোমাদের আম্মাজানের আত্মমর্যাদাবোধে লেগেছে। এ কথাটি তিনি দু'বার বললেন। তারপর রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার থালা নিয়ে উম্মে সালামার নিকট পাঠালেন। আর উম্মে সালামার ভাঙ্গা থালাটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দিয়ে দিলেন। ১০৬
ইবনে মাজাহ শরিফে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে যে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, সেখানে এরূপ একটি ঘটনায় উম্মে সালামার পরিবর্তে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসের শেষে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'আমি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় আমার এমন আচরণের কোনো প্রতিক্রিয়াই লক্ষ করলাম না।'১০৭
অর্থাৎ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যে উপস্থিত সাহাবাদের সামনে আল্লাহর রাসুলের সাথে এমন মারাত্মক একটি আচরণ করলেন, পাথর দিয়ে আঘাত করে খাবারপূর্ণ প্লেট ভেঙ্গে ফেললেন। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি তাকে কিছুই বলেননি। না তিরস্কার করেছেন। আর না ভর্ৎসনা।
তিনি শুধু 'তোমাদের আম্মাজানের আত্মসম্মানে লেগেছে' কথাটি দু'বার বলেছেন এবং খুব সুন্দরভাবে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন। সাহাবাদের সামনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মর্যাদা এতটুকু নষ্ট হতে দিলেন না।
তার পক্ষ হয়ে তিনি নিজেই সাহাবাদের সামনে ওযর পেশ করলেন।
আবার তিনি উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতিও না-ইনসাফি করলেন না। যেহেতু তার থালা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। এর জরিমানাস্বরূপ তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছ থেকে একটি ভালো থালা নিয়ে তাকে দিয়ে দিলেন।
মুহূর্তের মধ্যে এমন কঠিন পরিস্থিতি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত সুন্দর ও কোমলভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। শুধু নিয়ন্ত্রণই করেননি, সেটাকে একটি উত্তম আদর্শের রূপ দান করেছেন।
কারণ, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের আত্মমর্যাদার বিষয়টি জানতেন। এটি তাদের সৃষ্টিগত বিষয়। তাই তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কিছুই বলেননি। যদিও উপস্থিত সাহাবাদের সামনে তিনি নবিজির সঙ্গে এমন আচরণ করেছিলেন।
এজন্যই তো কুরআনে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
'নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। ১০৮
এক সাহাবি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলেন। দরজায় টোকা দিতে যাবেন, এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন, ভেতরে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী তার সঙ্গে কড়া কণ্ঠে কথা
বলছেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু চুপ। তিনি তাঁর স্ত্রীর কোনো কথার উত্তর দিচ্ছেন না। ধৈর্যধারণ করে আছেন।
সাহাবি তখন খুব হতাশ হলেন। মনে মনে বললেন, কার কাছে অভিযোগ জানাতে এসেছি। তিনি নিজেই দেখি আমার মতো সমস্যায় আছেন।
সাহাবি ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। এমন সময় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে পেছন থেকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি বোধহয় কোনো প্রয়োজন নিয়ে এসেছিলে?
সাহাবি বললেন, আমিরুল মুমিনিন, আমি আপনার কাছে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে অভিযোগ জানাতে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি আপনিও...।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর কথা শুনে মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, 'শোনো ভাই, আমার উপর তাঁর কিছু অধিকার রয়েছে। তাই আমি তাঁকে ক্ষমা করে দেই। সে আমার জন্য আমার এবং জাহান্নামের আগুনের মাঝে অন্তরায়। সে আমার অন্তরকে গুনাহর দিকে ধাবিত হওয়া থেকে ফিরিয়ে রাখে। তাতে প্রশান্তি আনয়ন করে। আমি বাড়িতে না থাকলে সে আমার ধন-সম্পদের হেফাজত করে। সে আমার জামা-কাপড় ধুয়ে রাখে। আমার জন্য খাবার রান্না করে। সে আমার সন্তানদের দেখাশোনা করে। অথচ শরিয়তে এসব তাঁকে করতে বলা হয়নি। এগুলো তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তাই আমি সহ্য করে নেই।'
আমিরুল মুমিনিন! আমার স্ত্রীও তো আপনার স্ত্রীর মতোই। আপনি যেহেতু তাঁর ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেন, আমিও তাঁর ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেব। ১০৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
'তোমরা তাঁদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর। তোমরা যদি তাঁদের অপছন্দ কর। তবে এর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে যে, তোমরা যেটাকে অপছন্দ করছ, আল্লাহ তায়ালা তাতে তোমাদের জন্য প্রভূত কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।' ১১০
এমনই ছিল সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের দাম্পত্য জীবন। তারা স্ত্রীদের সৎগুণগুলোর কথা আলোচনা করতেন। আর তাদের দোষ ও মন্দ গুণগুলো ঢেকে রাখতেন।
একবার আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে রাগ করে রাগের মাথায় বলে বসলেন, 'আপনার মত লোক নিজেকে কী করে নবি দাবি করে?' (কী মারাত্মক কথা বাবা!)
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে বিষয়টি উড়িয়ে দিলেন। তিনি ছবর করলেন। সহনশীলতা প্রদর্শন করলেন।
দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে হলে আমাদের নবি ও সাহাবাদের এমন সমুচ্চ আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। স্বর্গীয় সুষমামণ্ডিত এমন আখলাকের অধিকারী হতে হবে। তবেই আমাদের ঘরগুলো এক টুকরো স্বর্গে পরিণত হবে।

টিকাঃ
১০০৩ জামে তিরমিযি: ২৪৯৯।
১০০৪ সহিহ বুখারি: ৩৩৩১।
১০৫ সুরা তাহরিম: ৩।
১০৬ সুনানে নাসাঈ : ৩৯৬৬।
১০৭ সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৩৩।
১০৮ সুরা কলম: ৪।
১০৯ তাম্বিহুল গাফেলিন: পৃষ্ঠা নং ১৭১।
১১০ সুরা নিসা: ১৯।

সুখী সংসারের জন্য প্রয়োজন অনেক কিছুর। আর সেই অনেক কিছুর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষমা, মার্জনা। স্ত্রী কোনো ভুল করে ফেললে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া। ভুল দেখেও না দেখার ভান করা। ভুল থেকে চোখ সরিয়ে ফেলা।
বিশেষ করে দুনিয়াবি বিষয় সংশ্লিষ্ট কোনো ভুল। দীনি বিষয় হলে আল্লাহর কোনো হুকুম লঙ্ঘিত হলে ভিন্ন কথা। কেননা শরিয়তের বিষয়ে আমাদের কারও ক্ষমা করার কোনো অধিকার নেই। এ অধিকার একমাত্র আল্লাহর।
আমাকে সবসময় মনে রাখতে হবে, আমি যার সঙ্গে সংসার করছি সে একজন মানুষ। আর মানুষ মাত্রই ভুলকারী। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'প্রত্যেক বনি আদমই ভুল করে থাকে। আর সর্বোত্তম ভুলকারী হল যে ভুল করে তওবা করে নেয়।'১০০৩
অর্থাৎ কোনো ভুল হয়ে গেলে সাথে সাথে তওবা করে নেওয়া।
একজন পুরুষ যার সঙ্গে সংসার করে সে শুধু একজন মানুষই নয়। একজন নারী। আর নারীর সৃষ্টিগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'আর তোমরা নারীদের সাথে সৎ ব্যবহার করবে। কেননা, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরের হাড় থেকে এবং সবচেয়ে বাঁকা হচ্ছে পাঁজরের ওপরের হাড়। যদি তুমি তা সোজা করতে চাও তাহলে ভেঙ্গে যাবে। আর যদি যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দাও তাহলে বাঁকাই থাকবে। অতএব, তোমাদের আদেশ করা হলো নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার।১০০৪
অর্থাৎ কথায় কথায় স্ত্রীর ভুল না ধরা। তার পিছে পিছে লেগে না থাকা। পান থেকে চুন খসলেই উত্তেজিত না হওয়া। তার সমস্ত কথা না ধরা। নিজের ইগো ও রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিচক্ষণ ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেওয়া।
আমরা আমাদের নিজেদের দিকে তাকালে দেখতে পাব, আমাদেরও অনেক ভুল হয়। আসলে আমরা কেউ পারফেক্ট না। ভুলের ঊর্ধ্বে না। কিন্তু আমাদের ভুলগুলো আমাদের চোখে পড়ে না। তাই আমরা সবসময় অন্যের ভুল নিয়ে পড়ে থাকি। আর নিজেদের সঠিক ভাবি।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের স্ত্রীরা বাসায় অনেক কাজ করে। রান্না-বান্না, ধোয়া-মোছা, সন্তানদের দেখাশোনা, তাদের গোসল করানো, খাওয়ানো, কান্না থামানো, কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানো ইত্যাদি আরও কত কাজ!
অনেক কাজ করতে গেলে কিছু ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। কোনো ভুল না হওয়াটা বরং অস্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক বিষয়টাকে যে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারবে না, তার মানসিক সমস্যা আছে। সে সুস্থ না।
তাই স্ত্রীর সমস্ত ভুল ধরা যাবে না। বিশেষ করে দুনিয়াবি বিষয় সংশ্লিষ্ট কোনো ভুল। যেমন, আপনি তার কাছে সামান্য কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু টাকাটা সে কোথায় রেখেছে মনে করতে পারছে না। অথবা আপনার অফিসে যাওয়ার ড্রেসটা সে স্ত্রী করে রাখতে পারেনি। কিংবা রান্নাটা একদিন একটু আপনার মনমত হয়নি ইত্যাদি ইত্যাদি।
সে যদি দশটি ভুল করে আপনি দু-তিনটা ধরুন। বাকিগুলো ছেড়ে দিন।
আপনি যদি তার সব ভুল ধরা শুরু করেন, তাহলে আপনি তার চোখ থেকে পড়ে যাবেন এবং একসময় বিরক্ত হয়ে সেও আপনার ভুল ধরা শুরু করবে। এভাবে দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরা শুরু করবে। একসময় ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। সংসারে কঠিন পরিণতি ডেকে আনবে।
এবার নবি জীবনের একটি ঘটনা শুনুন। ঘটনাটি স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামিন কুরআনে বর্ণনা করেছেন।
وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَن بَعْضٍ
'স্মরণ কর, যখন নবি তার স্ত্রীদের কোনো একজনকে গোপনে একটি কথা বলেছিল। তারপর সেই স্ত্রী যখন তা (গোপন রাখতে না পেরে অন্য কাউকে) বলে দিল এবং আল্লাহ তায়ালা নবির কাছে ব্যাপারটি প্রকাশ করে দিলেন। তখন নবি সে বিষয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন এবং কিছু এড়িয়ে গেলেন।' ১০৫
গোপন কথাটি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে কথাটি ফাঁস করে দিয়েছিলেন। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহির মাধ্যমে ব্যাপারটি জানতে পেরে সে বিষয়ে তাকে বললেন, কিন্তু সবটুকু বললেন না। কেননা সবটুকু বললে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা অনেক বেশি লজ্জা পেতেন। তাকে যেভাবে ভর্ৎসনা করা দরকার ছিল নবিজি তার সামান্যই করলেন।
নবি জীবনের আরেকটি ঘটনা শুনুন। ঘটনাটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়, ইনসাফ ও সহনশীলতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবাদের নিয়ে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে বসা ছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কিছু খাবার তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তার আগেই উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা খাবার পাঠিয়ে দিলেন।
উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তিনি একটি থালায় করে কিছু খাবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবাদের নিকট পাঠালেন। ইত্যবসরে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা চাদর জড়িয়ে আসলেন। তাঁর হাতে একটি পাথর ছিল। পাথরটি দিয়ে তিনি থালাটি ভেঙ্গে দিলেন। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থালার ভাঙ্গা টুকরো দুটি একত্র করলেন এবং (সাহাবাদের) বললেন, তোমরা খাও। তোমাদের আম্মাজানের আত্মমর্যাদাবোধে লেগেছে। এ কথাটি তিনি দু'বার বললেন। তারপর রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার থালা নিয়ে উম্মে সালামার নিকট পাঠালেন। আর উম্মে সালামার ভাঙ্গা থালাটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দিয়ে দিলেন। ১০৬
ইবনে মাজাহ শরিফে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে যে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, সেখানে এরূপ একটি ঘটনায় উম্মে সালামার পরিবর্তে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসের শেষে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'আমি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় আমার এমন আচরণের কোনো প্রতিক্রিয়াই লক্ষ করলাম না।'১০৭
অর্থাৎ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যে উপস্থিত সাহাবাদের সামনে আল্লাহর রাসুলের সাথে এমন মারাত্মক একটি আচরণ করলেন, পাথর দিয়ে আঘাত করে খাবারপূর্ণ প্লেট ভেঙ্গে ফেললেন। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি তাকে কিছুই বলেননি। না তিরস্কার করেছেন। আর না ভর্ৎসনা।
তিনি শুধু 'তোমাদের আম্মাজানের আত্মসম্মানে লেগেছে' কথাটি দু'বার বলেছেন এবং খুব সুন্দরভাবে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন। সাহাবাদের সামনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মর্যাদা এতটুকু নষ্ট হতে দিলেন না।
তার পক্ষ হয়ে তিনি নিজেই সাহাবাদের সামনে ওযর পেশ করলেন।
আবার তিনি উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতিও না-ইনসাফি করলেন না। যেহেতু তার থালা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। এর জরিমানাস্বরূপ তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছ থেকে একটি ভালো থালা নিয়ে তাকে দিয়ে দিলেন।
মুহূর্তের মধ্যে এমন কঠিন পরিস্থিতি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত সুন্দর ও কোমলভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। শুধু নিয়ন্ত্রণই করেননি, সেটাকে একটি উত্তম আদর্শের রূপ দান করেছেন।
কারণ, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের আত্মমর্যাদার বিষয়টি জানতেন। এটি তাদের সৃষ্টিগত বিষয়। তাই তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কিছুই বলেননি। যদিও উপস্থিত সাহাবাদের সামনে তিনি নবিজির সঙ্গে এমন আচরণ করেছিলেন।
এজন্যই তো কুরআনে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
'নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। ১০৮
এক সাহাবি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলেন। দরজায় টোকা দিতে যাবেন, এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন, ভেতরে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী তার সঙ্গে কড়া কণ্ঠে কথা
বলছেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু চুপ। তিনি তাঁর স্ত্রীর কোনো কথার উত্তর দিচ্ছেন না। ধৈর্যধারণ করে আছেন।
সাহাবি তখন খুব হতাশ হলেন। মনে মনে বললেন, কার কাছে অভিযোগ জানাতে এসেছি। তিনি নিজেই দেখি আমার মতো সমস্যায় আছেন।
সাহাবি ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। এমন সময় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে পেছন থেকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি বোধহয় কোনো প্রয়োজন নিয়ে এসেছিলে?
সাহাবি বললেন, আমিরুল মুমিনিন, আমি আপনার কাছে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে অভিযোগ জানাতে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি আপনিও...।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর কথা শুনে মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, 'শোনো ভাই, আমার উপর তাঁর কিছু অধিকার রয়েছে। তাই আমি তাঁকে ক্ষমা করে দেই। সে আমার জন্য আমার এবং জাহান্নামের আগুনের মাঝে অন্তরায়। সে আমার অন্তরকে গুনাহর দিকে ধাবিত হওয়া থেকে ফিরিয়ে রাখে। তাতে প্রশান্তি আনয়ন করে। আমি বাড়িতে না থাকলে সে আমার ধন-সম্পদের হেফাজত করে। সে আমার জামা-কাপড় ধুয়ে রাখে। আমার জন্য খাবার রান্না করে। সে আমার সন্তানদের দেখাশোনা করে। অথচ শরিয়তে এসব তাঁকে করতে বলা হয়নি। এগুলো তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তাই আমি সহ্য করে নেই।'
আমিরুল মুমিনিন! আমার স্ত্রীও তো আপনার স্ত্রীর মতোই। আপনি যেহেতু তাঁর ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেন, আমিও তাঁর ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেব। ১০৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
'তোমরা তাঁদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর। তোমরা যদি তাঁদের অপছন্দ কর। তবে এর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে যে, তোমরা যেটাকে অপছন্দ করছ, আল্লাহ তায়ালা তাতে তোমাদের জন্য প্রভূত কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।' ১১০
এমনই ছিল সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের দাম্পত্য জীবন। তারা স্ত্রীদের সৎগুণগুলোর কথা আলোচনা করতেন। আর তাদের দোষ ও মন্দ গুণগুলো ঢেকে রাখতেন।
একবার আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে রাগ করে রাগের মাথায় বলে বসলেন, 'আপনার মত লোক নিজেকে কী করে নবি দাবি করে?' (কী মারাত্মক কথা বাবা!)
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে বিষয়টি উড়িয়ে দিলেন। তিনি ছবর করলেন। সহনশীলতা প্রদর্শন করলেন।
দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে হলে আমাদের নবি ও সাহাবাদের এমন সমুচ্চ আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। স্বর্গীয় সুষমামণ্ডিত এমন আখলাকের অধিকারী হতে হবে। তবেই আমাদের ঘরগুলো এক টুকরো স্বর্গে পরিণত হবে।

টিকাঃ
১০০৩ জামে তিরমিযি: ২৪৯৯।
১০০৪ সহিহ বুখারি: ৩৩৩১।
১০৫ সুরা তাহরিম: ৩।
১০৬ সুনানে নাসাঈ : ৩৯৬৬।
১০৭ সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৩৩।
১০৮ সুরা কলম: ৪।
১০৯ তাম্বিহুল গাফেলিন: পৃষ্ঠা নং ১৭১।
১১০ সুরা নিসা: ১৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00