📄 আপনার দাম্পত্যবৃক্ষে ঈমান সিঞ্চিত করুন
গোলাপ দেখতে কী সুন্দর তাই না! কী মনমাতানো তার সুরভী! সে নীরবে তার সুরভী ছড়িয়ে যায়। আমরা তার সুরভী উপভোগ করি।
আমরা যদি গোলাপবৃক্ষের যত্ন না নেই। তাতে নিয়মিত পানি না দেই। পরিচর্যা না করি। তাহলে কী আমাদের পক্ষে সবসময় গোলাপের এমন সুরভী উপভোগ করা সম্ভব হতো? হতো না।
আমরা গোলাপের এমন সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারতাম? পারতাম না।
মানুষের দাম্পত্য জীবনও একটি বৃক্ষের ন্যায়। এরও ফুল আছে। ফল আছে। মনমাতানো সুরভী আছে। প্রশান্তি ছড়ানো ছায়া আছে।
কিন্তু এগুলো লাভ করতে হলে আমাদের দাম্পত্য বৃক্ষের যত্ন নিতে হবে। নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। তাহলে আমাদের দাম্পত্য জীবন ফুলে ফলে ছেয়ে থাকবে। ভালোবাসার ছায়া ছড়ানো থাকবে।
কিন্তু কীভাবে আমরা এর যত্ন নিব?
সেজন্য আমাদের যেটা করতে হবে-দাম্পত্য জীবন নামক বৃক্ষের গোড়ায় ঈমানের পানি সিঞ্চন করতে হবে। তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় অর্জন করতে হবে। স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস করতে হবে। সমস্ত গুনাহর কাজ ছাড়ার চেষ্টা করতে হবে। সৎকাজে একে অপরকে সাহায্য করতে হবে। অল্পে তুষ্ট থাকতে হবে। সন্তানকে দীনদারির উপর গড়ে তুলতে হবে। রাতে উঠে একসঙ্গে তাহাজ্জুদ আদায় করতে হবে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'আল্লাহ তায়ালা সেই লোকের প্রতি রহম করুন, যে রাতে উঠে নামাজ পড়ে এবং তার স্ত্রীকেও জাগিয়ে তুলে। সে যদি উঠতে না চায় তাহলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ তায়ালা সেই নারীর প্রতি রহম করুন, যে রাতে উঠে নামাজ পড়ে এবং তার স্বামীকে জাগিয়ে দেয়। সে যদি উঠতে না চায়, তাহলে মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়।৮৭
১ রাতে উঠে স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে তাহাজ্জুদ, সুবহানাল্লাহ, আহা কী স্বর্গীয় দৃশ্য!
কিন্তু এমন দম্পতি বর্তমানে কোথায়, যারা একে অপরকে তাহাজ্জুদের জন্য জাগিয়ে দিবে। উঠতে না চাইলে মুখে পানি ছিটিয়ে দিবে।
এমন দম্পতি খুঁজে পাওয়া আজকাল দুরূহ হলেও এমন অনেক দম্পতি পাওয়া যায়, যারা রাত জেগে একসঙ্গে নাটক, মুভি উপভোগ করে। গান শুনে। পছন্দের নাটক-সিরিয়ালের সময় হয়ে গেল স্মরণ করিয়ে দেয়। বিভিন্ন পার্টি ইনজয় করে।
নাউযুবিল্লাহ। আমরা এমন দম্পতি হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই, যারা আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত এবং যাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট।
আমরা তো এমন দম্পতি হতে চাই যাদের বন্ধন শুধু ইহকালের নয়। চিরকালের। যারা জান্নাতেও একসঙ্গে বসবাস করবে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
'অর্থাৎ স্থায়ীভাবে অবস্থানের সেই জান্নাত, যার ভেতর তারা নিজেরাও প্রবেশ করবে এবং তার বাপ-দাদাগণ, স্ত্রীগণ ও সন্তানদের মধ্যে যারা নেককার হবে, তারাও। আর (তাদের অভ্যর্থনার জন্য) ফেরেশতাগণ তাদের নিকট প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। (আর বলতে থাকবে) তোমরা দুনিয়ায় যে সবর অবলম্বন করেছিলে, তার বদৌলতে এখন তোমাদের প্রতি কেবল শান্তিই বর্ষিত হবে এবং প্রকৃত নিবাসে এটা তোমাদের উৎকৃষ্ট পরিণাম।'৮৮
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,
إِنَّ أَصْحَابَ الْجَنَّةِ الْيَوْمَ فِي شُغُلٍ فَاكِهُونَ. هُمْ وَأَزْوَاجُهُمْ فِي ظِلَالٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِثُونَ.
'নিশ্চয় সেদিন জান্নাতবাসীগণ আপন ব্যস্ততায় মগ্ন থাকবে। তারা ও তাদের স্ত্রীগণ নিবিড় ছায়ায় আরামদায়ক আসনে হেলান দিয়ে থাকবে।'৮৯
টিকাঃ
৮৭ সুনানে নাসাঈ: ১৬০৯।
৮৮ সুরা রাদ: ২৩-২৪।
৮৯ সুরা ইয়াসিন: ৫৫-৫৬।
📄 দাম্পত্য জীবনের সুরক্ষা ও রক্ষাকবচ
কোনো দম্পতি যদি চায় তাদের দাম্পত্য সুখ স্থায়ী হোক। তার পরিবার ও সন্তান-সন্ততি বিপদাপদ মুক্ত থাকুক। জিন শয়তান ও মানুষ শয়তানের হাত থেকে নিরাপদ থাকুক। তাহলে তাদের কিছু সুরক্ষা ও রক্ষাকবচ গ্রহণ করতে হবে।
কী সেই সুরক্ষা? কী সেই রক্ষাকবচ?
কুরআন-হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন দুআ-দুরুদ, তাসবিহ-তাহলিল ও যিকির-আযকার হচ্ছে সেই সুরক্ষা ও রক্ষাকবচ। এগুলো পড়ার দ্বারা মুমিন যে কোনো বিপদাপদ থেকে মুক্ত থাকে। কোনো বিপদে পড়লে দ্রুত তা থেকে পরিত্রাণ লাভ করে।
কিন্তু আমরা অনেকেই এসব দুআ দুরুদ সম্পর্কে জানি না। যারা জানি, তাদের অনেকে আবার পড়ি না।
মানুষ প্রতিমুহূর্তেই বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। কখনো তা অনুকূল হয়, কখনো তা প্রতিকূল। তাই সর্বাবস্থায় আমাদের আল্লাহ তায়ালার আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়।
তাছাড়া আমরা প্রায়ই আশপাশের মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন আনন্দ ও সুখের কথা শেয়ার করি। স্ত্রী যেমন শেয়ার করে, তেমনি স্বামীও করে। যেমন, আমার স্বামীর প্রমোশন হয়েছে। কিংবা আমার সন্তানটা ভালো রেজাল্ট করেছে। ওর স্বাস্থ্য আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে ইত্যাদি। এগুলো যখন শেয়ার করি তখন অনেক হিংসুকের চোখ বড় বড় হয়ে উঠে। তাদের বদনজর লাগে।
নজর লাগার বিষয়টি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাই আমাদের উচিত সকাল-সন্ধ্যা হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন দুআ ও আমলের মাধ্যমে নিজেকে ও নিজের পরিবারের সকলকে সুরক্ষিত রাখা।
যেমন, ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দিয়ে বিসমিল্লাহ বলে প্রবেশ করা। তখন শয়তান আর সেই ঘরে প্রবেশ করতে পারে না। তেমনি খেতে বসে বিসমিল্লাহ বলে আহার শুরু করা।
* পথিক প্রকাশন থেকে 'নবীজির দিন রাতের আমল' নামে এ বিষয়ক একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ইমাম ইবনুস সুন্নি রহ. বিরচিত। আপনারা চাইলে সে কিতাবটি সংগ্রহ করে আমল করতে পারেন।
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দুআ পড়ে বের হওয়া। কেউ যদি নিম্নোক্ত দুআটি পড়ে ঘর থেকে বের হয়, তাহলে সে সমস্ত অনিষ্ট ও শয়তানের হাত থেকে নিরাপদ থাকবে। আল্লাহ তায়ালা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবেন। দুআটি হচ্ছে,
بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ. لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ.
'আল্লাহর নামে বের হচ্ছি। আল্লাহর উপর ভরসা করছি। তিনি ছাড়া কোনো উপায় ও শক্তি নেই।৯১
প্রতি নামাজের শেষে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়া।
প্রত্যেক নামাজের শেষে ও ঘুমের সময় আয়াতুল কুরসি তেলাওয়াত করা। সময় করে সুরা বাকারা পড়ে সমস্ত ঘরে দম করা। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ঘরে সুরা বাকারা তেলাওয়াত করা হয় সেই ঘর থেকে শয়তান দূর হয়ে যায়।
শোয়ার সময় অযু করে শোয়া। ডান কাত হয়ে শোয়া এবং জিকির করতে করতে ঘুমাতে যাওয়া।
আজকাল আমরা গান শুনতে শুনতে ঘুমাতে যাই। আল্লাহ না করুন ওই অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হয়, তখন কী অবস্থা হবে চিন্তা করুন। জীবনের শেষ আমল যদি হয় গান শোনা কিংবা নাটক, সিনেমা ইত্যাদি দেখা, তাহলে কি আমি আমার নাজাতের আশা করতে পারি।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে হেফাজত করুন।
• বেশি বেশি দান-সদকা করা। দান-সদকার দ্বারা বিভিন্ন বিপদাপদ দূর হয়।
টিকাঃ
৯১ "সুনানে তিরমিযি: ৩৪২২। সুনানে আবু দাউদ: ৫০৯৫।
📄 পুরুষদের সাজসজ্জা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
বৈবাহিক জীবনে পুরুষেরও সৌন্দর্য অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে। এর মাধ্যমে স্ত্রীর মন আকর্ষণ করা যায়। মুগ্ধতার দৃষ্টি কাড়া যায়।
আপনি যদি সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকেন তাহলে আপনার প্রতি আপনার স্ত্রীর মাঝে এক ধরনের মুগ্ধতা কাজ করবে। সে আপনার দিকে যতবার তাকাবে, ততবার নতুন করে প্রেমে পড়বে। কারণ, মানুষ মাত্রই সৌন্দর্যপিয়াসী। সুন্দরের প্রতি তার মন ধাবিত হয়।
তাই ইসলামি শরিয়তেও এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সৌন্দর্য অবলম্বনের পথ ও পন্থা বাতলে দেওয়া হয়েছে। যেমন, সাধু সন্ন্যাসীদের মত দাড়ি ইয়া লম্বা করে রাখা যাবে না। আবার এক মুষ্টির চেয়ে ছোট করেও রাখা যাবে না।
আজকালকার বখাটে ছেলেপেলেদের মতো হেয়ার কাট না দিয়ে মার্জিতভাবে চুল রাখুন। অনেকের চুল খুব অগোছালো থাকে। জট পেকে যায়। দেখতে পাগল পাগল লাগে। এসব বর্জন করুন।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
كُنْتُ أُرَجِّلُ رَأْسَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا حَائِضُ
'আমি ঋতুবতী অবস্থায় থেকেও রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চুল আচড়িয়ে দিতাম।৯২
মুখ সবসময় পরিষ্কার দুর্গন্ধমুক্ত রাখুন। নিয়মিত মেসওয়াক করুন। রাতে শোয়ার আগে ব্রাশ করুন। পেটে অসুখের কারণে অনেকের সবসময় মুখে দুর্গন্ধ থাকে। কথা বললে দুর্গন্ধ বের হয়। অনেকে চুপ থাকলেও দুর্গন্ধ বের হয়। তারা মাউথ ফ্রেশ ব্যবহার করতে পারেন। ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে পারেন।
মুখের দুর্গন্ধের ব্যাপারে ইসলামি শরিয়ত খুব সেনসিটিভ। যেমন, কারও যদি মুখে দুর্গন্ধ থাকে। আর সে মসজিদে গেলে আশপাশের মুসল্লিদের কষ্ট হয়। তাহলে এমন ব্যক্তিকে শরিয়ত ফরজ নামাজও জামাতে না পড়ে ঘরে পড়ার আদেশ
করেছে। যাতে অন্যদের কষ্ট না হয়। অথচ একাকী নামাজের চেয়ে জামাতে নামাজের ফযিলত সাতাশ গুণ বেশী।
আর আপনি যার সঙ্গে সংসার করছেন। সে তো মসজিদের অপরিচিত কোনো মুসল্লি না। আপনার পত্নী। জীবনসঙ্গি। তাকে এভাবে কষ্ট দেওয়া হারান। শুধু তাকে নয়, যে কোনো মুসলমানকেই কষ্ট দেওয়া হারাম।
আপনার স্ত্রী হয়ত ভয়ে কিংবা লজ্জায় আপনাকে কিছু বলবে না। কিন্তু তার মাঝে আপনার প্রতি এক প্রকার ঘৃণা এবং অস্বস্তিবোধ কাজ করবে।
'আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞাসা করা হল, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম কোন কাজটি করতেন? তিনি বলেন, 'সর্বপ্রথম মেসওয়াক করতেন।'
♥ আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করুন। আতর ব্যবহার করা সুন্নত। যদি পারফিউম ব্যবহার করেন, তাহলে সেটা যেন অবশ্যই এ্যালকোহল মুক্ত হয়। দাম্পত্য জীবনে সুগন্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বছরের আট মাসেই আমাদের দেশের আবহাওয়া উষ্ণ থাকে। ঘামে ভিজে থাকে শরীর, জামা-কাপড়। সেই ঘাম শুকিয়ে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। কাছে যাওয়া দায় হয়।
আমরা অনেকে অফিসে কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার করি। কিন্তু ঘরের মানুষটার সাথে যখন থাকি তখন এ ব্যাপারে উদাসীন থাকি।
আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, 'আমি যত উত্তম খুশবু পেতাম, তা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লাগিয়ে দিতাম। এমনকি সে খুশবুর চমক তার মাথায় ও দাঁড়িতে দেখতে পেতাম। ৯৪
বুখারি শরিফের অপর একটি হাদিসে আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'আমি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মুহরিম অবস্থায় নিজ হাতে খুশবু লাগিয়ে দিয়েছি এবং মিনাতেও সেখান থেকে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে তাকে আমি খুশবু লাগিয়ে দিয়েছি।৯৫
সুগন্ধি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব প্রিয় বস্তু ছিল। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'পার্থিব বস্তুর মধ্যে স্ত্রী ও সুগন্ধি আমার নিকট পছন্দনীয় করা হয়েছে।৯৬
উত্তম সুগন্ধি নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অন্যের মাঝে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টিতে সহায়তা করে। মানুষকে কাছে টানে।
ঘরের প্রিয় মানুষটিকে দূরে সরিয়ে বাহিরের মানুষকে কাছে টেনে কী লাভ বলুন?
স্ত্রীকে আকর্ষণ না করে অন্যদের আকর্ষণের চেষ্টা কি কোনো সুপুরুষের কাজ হতে পারে? কখনোই না।
তাই ঘরে-বাইরে সর্বত্রই পুরুষের সুগন্ধি ব্যবহার করা উচিত। নারীরা শুধু গৃহাভ্যন্তরে সুগন্ধি ব্যবহার করবে। বাইরে বের হওয়ার সময় তাদের সুগন্ধি ব্যবহার করা হারাম। এতে পরপুরুষকে আকর্ষণ করা হয়।
• শরীরে বিভিন্ন জায়গায় অবাঞ্চিত পশম ও গোফ-মোচের ব্যাপারেও সতর্ক থাকুন। প্রতি সপ্তাহান্তেই নিয়ম করে পরিষ্কার করুন। অনেকে কাটব-কাটছি করে বন-জঙ্গল বানিয়ে ফেলে। বাহিরের মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় না বলে আমরা এ বিষয়ে অনেকে গুরুত্ব দেই না। এটা সুন্নতের খেলাফ।
এখানে উপরোল্লিখিত কয়েকটি হাদিসের মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে থাকার ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটা সচেতন ছিলেন।
সাহাবায়ে কেরামও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাট্যতার বিষয়ে অনেক সচেতন ছিলেন।
আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট ধূলিমলিন এলোকেশী এক ব্যক্তি এল। সাথে তার স্ত্রী। স্ত্রী বলতে লাগল, আমার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নাই। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারলেন যে, সে তার স্বামীকে অপছন্দ করে। তখন তিনি লোকটিকে পাঠিয়ে দিলেন। নখ-চুল-মোচ সব কেটে, ভালো করে গোসল করে সুন্দর জামা পড়ে একেবারে কেতাদুরস্ত হয়ে আসতে বললেন। তারপর লোকটি যখন এলো, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে তার স্ত্রীর সামনে যেতে বললেন। তার স্ত্রী তাকে দেখে প্রথমে চিনতে পারেনি। কারণ সে তাকে কোনোদিন এত সুন্দর অবস্থায় দেখেনি। তখন সে তার স্বামীকে গ্রহণ করে নেয় এবং বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তোমরা স্ত্রীদের সাথে এভাবেই থেকো। আল্লাহর শপথ! নারীরাও চায় তোমরা তাদের জন্য সাজসজ্জা অবলম্বন করো যেমন তোমরা চাও তারা তোমাদের জন্য সাজগোজ করে থাকুক।
তবে আজকাল অনেক পুরুষের মাঝে ফ্যাশন সচেতনতার নামে ইসলাম পরিপন্থি কিছু রুচির প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়, যা মানুষের সুস্থ স্বভাব-রুচি বিরুদ্ধ। অবশ্য এর জন্য ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং নববি আদর্শের চর্চাহীনতা দায়ী।
যেমন, অনেক পুরুষ আছে দাড়ি কাটা, দাড়ি চাঁছাকে স্মার্টনেস মনে করে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা আবার ধূমপানও করে। দুর্গন্ধে তাদের কাছেই যাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষই কাছে যেতে পারে না। ঘরের বউ তো দূরের কথা। কিন্তু তার স্ত্রী বেচারীর কি-ই-বা করার আছে। সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য সে এসব মুখ বুজে সহ্য করে নেয়। একসময় এসব তার সওয়া হয়ে যায়।
কেউ কেউ তো এমন আছেন, রাতে সিগারেট না খেলে ঘুম হয় না। এমন পুরুষের ঠোঁটে যখন তার স্ত্রী চুম্বন করে তখন স্ত্রীর মনে হয়, যেন সে কোনো ঠোঁটে নয়, কমোডে মুখ দিয়েছে।
অনেক দীনদার মানুষ আছে, অগোছালো আর অপরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে। বাহ্যিক সৌন্দর্য গ্রহণকে তারা দ্বীনের খেলাফ মনে করেন। তাই তারা এসব বর্জন করেন এবং এটাকে তারা সাদাসিধে জিন্দেগী নাম দিয়ে থাকেন। মনে করেন। অথচ এটি তাদের ভুল ধারণা। তারা শয়তানের ধোঁকার শিকার। সাদাসিদের সাথে নোংরা ও
অপরিচ্ছন্ন হয়ে থাকার কোনো সম্পর্ক নেই। তারা এভাবে মানুষকে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ম্যাসেজ প্রদান করছে। মানুষ তাদের দেখে মনে করছে ইসলাম বুঝি এমনই। ক্ষেত টাইপ। নাউযুবিল্লাহ। নিশ্চয়, আমার আল্লাহ সুন্দর। তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন।
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাহ্যিক সৌন্দর্যের ব্যাপারেও গুরুত্বারোপ করেছেন। তাবাকাতে ইবনে সাদে বর্ণিত হয়েছে। জুন্দুব ইবনে মাকিস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
'কোনো প্রতিনিধি দল আগমন করলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উত্তম কাপড়টি পরিধান করতেন এবং বিশিষ্ট সাহাবাদেরকেও উত্তম কাপড় পরিধান করতে বলতেন। অতএব যখন কিন্দার প্রতিনিধি দল আগমন করেছিল তখন আমির পরিধানে একটি ইয়ামেনি চাদর দেখেছিলাম এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুও সেদিন অনুরূপ কাপড় পরিধান করেছিলেন।'
এ হাদিসের মাধ্যমে বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয়ে নবিজি ও সাহাবায়ে কেরামের গুরুত্বারোপের বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে ফুটে ওঠেছে। সুতরাং এটিকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
আপনার স্ত্রী আপনার কাছ থেকে তেমন সাজসজ্জা কামনা করে যেমন আপনি তার কাছ থেকে করেন।
আপনি নিজের যত্ন নিন। দেখবেন আপনার ভালোবাসাও যত্নে থাকবে। আপনি অপরিচ্ছন্ন ময়লা হয়ে থাকলে আপনার ভালোবাসার গায়েও ময়লা জমবে। বিবর্ণ দেখাবে।
নিজেকে সবসময় সতেজ রাখুন। ঘ্রাণ নিন। ঘ্রাণ দিন। জীবনকে উপভোগ করুন। ঝরা পাতার মত ম্যারম্যারে হয়ে থাকবেন না। ঝরা পাতায় কারো চোখ আটকায় না। সবাই তাকে পায়ে মাড়াতে কিংবা ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দিতে পছন্দ করে।
টিকাঃ
** সহিহ বুখারি : ২৯৫।
১০ সহিহ মুসলিম : ৪৭৮।
৯৪ সহিহ বুখারি: ৫৯২৩।
* সহিহ বুখারি : ৫৯২২।
৯৬ সুনানে নাসাঈ: ৩৯৩৯।
📄 কে বেশি চুপ থাকে, পুরুষ না নারী?
আফিফার বিয়ে হয়েছে আট বছর। তার ফুটফুটে দুটি বাচ্চাও আছে। সংসার, স্বামী, সন্তান, এসব নিয়ে তার বেশ সুখেই দিন কেটে যাচ্ছে। স্বামীর প্রতিও তার তেমন কোনো অভিযোগ নেই। শুধু ছোট্ট একটা অভিযোগ আছে। তার স্বামী সারাদিন চুপচাপ থাকে। তার সঙ্গে তেমন কোনো কথা বলে না।
কম কথা বলা, চুপচাপ থাকা যদিও একটি প্রশংসনীয় গুণ। প্রবাদ আছে, যে চুপ থাকে সে নাজাত পায়। দাম্পত্য জীবনেও চুপ থাকার গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে আমরা সেটা বর্ণনা করব। কিন্তু একেবারে চুপচাপ থাকাটা খারাপ। এতে অনেক সময় অন্যের প্রতি অবহেলা প্রকাশ পায়। ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত চুপচাপ থাকা একটি রোগ। নারীর চেয়ে পুরুষরা সাধারণত এই রোগে বেশি আক্রান্ত।
পুরুষরা চুপচাপ থাকলে নারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যখন এমন কোনো বিষয় হয়, যে বিষয়ে সে কিছু না বললে বোঝা যায় না, আসলে সে তার স্ত্রীকে গুরুত্ব দিচ্ছে কিনা, কিংবা এ বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ আছে কি না।
কিছু পুরুষ তো এমনও আছে, তাদের কিছু বলতে হলে স্ত্রীদের তাদের কাছে দূত পাঠাতে হয়।
স্বামী-স্ত্রী সাধারণত চুপ থাকার কারণ কী, সেটি আমরা এখন খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।
• বিবাহের যেহেতু অনেক বছর হয়েছে, তাই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সুন্দর একটা বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। তারা মনে করে, এখন সবকিছু বলে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। এখন আর সেই অবস্থা নেই যে, দুজন বসে মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের কথা বলবে। পুরনো মধুর কোনো স্মৃতিচারণ করবে। এগুলো তাদের কাছে ছেলেমানুষি মনে হয়। এখন কি আর ছেলেমানুষি করার বয়স আছে?
• কখনো পুরুষ তার কথা বলার সমস্ত শক্তি কর্মক্ষেত্রেই নিঃশেষ করে আসে। সেখানে তাকে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়। সারাদিন কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে সে বাসায় ফিরে। তাই সে বাসায় এসে চুপচাপ থাকে। কারও সঙ্গে কোনো কথা বলে না। কথা বলতে তার
ক্লান্তি লাগে। সে চুপ থাকে। এই চুপ থাকাটাই তার জন্য একপ্রকার বিশ্রাম।
♥ অনেক নারী খুব ঝগড়াটে হয়। তখন তার স্বামী ঝগড়া এড়ানোর জন্য বাসায় এসে বোবা সেজে থাকেন।
• এ ছাড়াও আরও কিছু কারণে পুরুষরা বাসায় এলে চুপচাপ থাকে। যেমন, অর্থনৈতিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা। মতবিরোধকে প্রশ্রয় না দেওয়া। কোনো প্রকৃত বিষয়কে গোপন করা।
আচ্ছা, কখনো কখনো চুপ থাকাটা কি আবশ্যক?
মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, নির্দিষ্ট সময় চুপ থাকাটা কোনো রোগ নয়। বরং দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া-বিবাদ এড়ানোর জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।