📄 এরই নাম ভালোবাসা
মাহমুদ একদিন তার বন্ধুকে আক্ষেপ নিয়ে বলছিল, তিন বছর হলো আমাদের বিয়ের। আমি তাকে শরিয়তসম্মতভাবেই বিয়ে করেছিলাম। খুব আখলাকি। দীনদার। তবে আমার কেন জানি তাকে ভালো লাগে না। সে তেমন সুন্দর না। সেটাই হয়ত তাকে আমার ভালো না লাগার কারণ।
বিয়ের প্রথম দিকে সে স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত ছিল। সিজারে সন্তান হওয়ার পর তার এই সমস্যা আরও বেড়েছে। আগের চেয়ে অনেক মোটা হয়েছে। থলথলে মেদ জমেছে। এখন আমি কী করব?
সমাধান
* যেহেতু সে দীনদার ও উত্তম আখলাকের অধিকারিণী। সুতরাং আপনি তার সঙ্গে থাকুন। সুখ শুধু সৌন্দর্যের মাঝেই নিহিত নয়। জগতের সমস্ত নারী কি সুন্দরী?
* দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই এর বিনিময়ে আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করবেন। তার উসিলায় আপনাকে রিজিক দান করবেন। অজানা বিপদের হাত থেকে রক্ষা করবেন।
* আপনি আপনার নিয়তকে আল্লাহর ওয়াস্তে খাঁটি করুন; ব্যাপক কল্যাণ লাভ করবেন। আপনি তাকে ডিভোর্স দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করলে কী নিশ্চয়তা আছে যে, সেই নারীর এর চেয়ে বড় কোনো রোগ থাকবে না কিংবা তাকে নিয়ে আপনি সুখি হবেন? এমনও তো হতে পারে আপনি আরও কঠিন বিপদে পড়বেন। তখন আবার ডিভোর্স। তারপর আবার বিয়ে।
* আপনি বরং তাকে মেদ কমানোর জন্য এক্সারসাইজ করতে উদ্বুদ্ধ করুন। নিয়মিত হাঁটতে বলুন। তাকে কোনো মহিলা ফিটনেস স্পেশালিস্টের কাছে নিয়ে যান। সন্তান জন্মদানের পর প্রায় সব নারীরই কম বেশি ওজন বেড়ে যায়। কিছু এক্সারসাইজ করলে এটি আবার ঠিক হয়ে যায়। তাকে বলুন, ওজন না কমালে ভবিষ্যতে সে কী কী স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগবে। যেমন তার হাঁটুর সমস্যা দেখা দিতে পারে, ব্লাড প্রেসার বা রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। তার ডায়াবেটিস, স্ট্রোক সহ জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এবার একটি ঘটনা শুনুন, এক লোক সুন্দরী এক নারীকে বিয়ে করলো। সে তাকে খুব ভালোবাসত। বিয়ের কয়েক বছর পর তার স্ত্রীর ব্রণের সমস্যা দেখা দিল। দাগে দাগে তার পুরো চেহারা একেবারে নষ্ট হয়ে গেল।
স্ত্রীর এই সমস্যা দেখা দেওয়ার সময় সে সফরে ছিল। তাই সে জানতে পারেনি।
ফিরে আসার সময় রাস্তায় এক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সে তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে।
এরপর তারা উভয়ে একসঙ্গে বসবাস করতে থাকে। এদিকে তার স্ত্রীর ব্রণের সমস্যা দিন দিন আরও প্রকট হতে থাকে। একসময় তার সম্পূর্ণ চেহারা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু স্বামী তো অন্ধ। সে তো তার স্ত্রীর চেহারার এই দশা দেখতে পায় না।
এভাবেই তারা দুজন দুজনকে ভালোবেসে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়। একদিন তার স্ত্রী মারা যায়। সে তখন তার মৃত্যুশোকে ভীষণ মুষড়ে পড়ে।
স্ত্রীকে দাফন করে সে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। এমন সময় পেছন থেকে এক লোক তাকে ডাক দিয়ে বলল, কোথায় যাচ্ছ হে?
-বাড়িতে।
-তুমি তো অন্ধ। একা কীভাবে যাবে?
-আমি অন্ধ নই। অন্ধ সেজেছিলাম। সফর থেকে ফেরার সময় পথিমধ্যেই আমি আমার স্ত্রীর সমস্যার কথা জেনেছিলাম। কিন্তু আমি তার মনে কষ্ট দিতে চাইনি। সে স্ত্রী হিসেবে খুব উত্তম ছিল। তাই আমি এত বছর অন্ধ সেজে থেকেছি।
সুবহানাল্লাহ! এরই নাম ভালোবাসা! আজকাল এমন স্বামীর কথা শুধু কল্পনাতেই সম্ভব। ১৬
টিকাঃ
৭৬ 'হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন।
📄 আয় বুঝে ব্যয় না করা
অনেক পুরুষ আছে পকেটে টাকা এলে হুঁশ থাকে না, পরিবারের পিছনে হাত খুলে খরচ করতে থাকে। প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় সব কিনতে থাকে। কোনোকিছুই বাদ রাখে না। কিন্তু যখন টাকা শেষ হয়ে যায় তখন মানুষের কাছে হাত পাততেও তার বাধে না। এক হাতে ঋণ করতে থাকে আরেক হাতে খরচ। এভাবে একসময় সে বিশাল ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
আর কেউ আছে ব্যবসা ভালোভাবে না বুঝে, কারও সঙ্গে পরামর্শ না করে কোথাও বিনিয়োগ করে ফেলে, পরে যখন ধরা খায়, তখন ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে লোন নেয়। এভাবে সে বিশাল ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
অথচ পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা এমন নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَّحْسُورًا
'তুমি তোমার হাত তোমার গ্রীবায় আবদ্ধ করে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিতও করো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে।'
এই আয়াতে আমাদেরকে দুটি কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এক. কার্পণ্য। দুই. অপব্যয়।
অর্থাৎ আমরা যেমন কার্পণ্য করব না তেমনি অপব্যয়ও করব না। বরং মধ্যপন্থা অবলম্বন করব। আয় বুঝে ব্যয় করব। পারিবারিক সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করব। তাহলে আমাদের কখনো অভাবের মুখে পড়তে হবে না। কারও কাছে হাত পাততে হবে না। ঋণ করতে হবে না।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَا عَالَ مَنْ اقْتَصَدَ
'যে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে সে কখনো অভাবে পড়ে না।'৭৮
পুরুষের মাঝে অতিমাত্রায় খরচ কিংবা আয় বুঝে ব্যয় না করার এই যে প্রবণতা, এটা মূলত কয়েকটি কারণে হয়,
১. পারিবারিকভাবে। অর্থাৎ ছোটকাল থেকে সে তার বাবা-মাকে দেখে আসছে তারা অধিক খরুচে। অমিতব্যয়ী। হাতে যা থাকে সব খরচ ফেলে। তারপর মানুষের কাছ থেকে ঋণ করে। এভাবে তার মাঝেও অপব্যয়ের অভ্যাস গড়ে উঠেছে।
যদি এমনটি হয়ে থাকে তাহলে তার জেনে রাখা উচিত, পবিত্র কুরআনে অপব্যয় করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং অপব্যয়কারীকে শয়তানের ভাই বলে আখ্যায়িত করেছে।
সুতরাং তার উচিত নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা, আয় বুঝে ব্যয় করা, অপব্যয়ের হাত থেকে বেঁচে থাকা। এর জন্য সর্বপ্রথম নিজেকে পরিবর্তনের দৃঢ়সংকল্প থাকতে হবে, নিয়ত সঠিক করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে তাওফিক ক মনা করতে হবে।
২. স্ত্রীর কারণে। স্ত্রীর চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে অনেক স্বামী অতিরিক্ত খরচ করতে বাধ্য হয়। দেখা যায় স্ত্রীর তার সামর্থ্যের কথা বিবেচনা না করে কিছু চেয়ে বসেছে এবং সেটা তাকে দিতেই হবে, এমন জিদ ধরেছে। তখন স্বামী বেচারার বাধ্য হয়ে তা পূরণ করতে হয় এবং ব্যয়ের অতিরিক্ত বোঝা নিজের মাথায় চাপাতে হয়।
এমতাবস্থায় পুরুষের মনে রাখা উচিত যে, স্ত্রী সং-শরের কর্তা নয়। আদেশ-নিষেধকারী নয়। বরং সে অধিনস্থ এবং গুনাহর কাজ না হলে স্বামীর নির্দেশ মানতে বাধ্য। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তার কোনো কথা ধর্তব্য হবে না। তার চাওয়া-পাওয়ার কোনো গুরুত্ব স্বামীর কাছে থাকবে না। বরং সাধ্যের মধ্যে থেকে এবং স্বামীর সন্তুষ্টির ভিত্তিতে। কারণ সে-ই পরিবারের কর্তা।
তাই সে যদি দেখে, স্ত্রী তাকে এমন অপ্রয়োজনীয় কিছু কিনে দিতে বলছে, যা সম্পূর্ণ অপচয় এবং যার জন্য তাকে ঋণ করতে হবে, কিংবা পরে কিনে দিলেও হবে, তখন সে তাকে বুঝিয়ে বলবে যে, অপচয় করা হারাম। আর কোনো হারাম কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব না। সে আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হতে পারবে না। তাছাড়া এটা কিনে দিতে গেলে তাকে ঋণ করতে হবে। নিজেকে সে আর ঋণগ্রস্ত করতে চাচ্ছে না। এতে তার মান-সম্মান ও আত্মিক প্রশান্তি বিনষ্ট হয়।
স্ত্রীর বিষয়টি উপলব্ধি করা উচিত। স্বামীকে মিতব্যয়ী হতে সাহায্য করা উচিত। অন্যথায় তাকে অপব্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার কারণে সেও গুনাহগার হবে। এর কুফল তাকেও ভোগ করতে হবে। কখনো দেখা যায় স্ত্রীর এসব চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে স্বামীকে হারাম উপার্জনের দিকে হাত বাড়াতে হয়। আমাদের পূর্ববর্তী নেককার স্ত্রীগণ এমন ছিলেন না। তাদের তাকওয়া পরহেযগারী এত অধিক ছিল যে, তারা স্বামীকে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলতেন,
اتَّقُوا اللهَ فِيْنَا وَ لَا تُطْعِمُوْنَا الكَسْبَ الحرامَ فَإِنَّا نَصْبِرُ عَلَى الجُوعِ والضر ولا نَصْبِرُ عَلى النار
'আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন। আমাদের হারাম কামাই খাওয়াবেন না। কারণ, আমরা ক্ষুধা ও কষ্ট সহ্য করে নিতে পারব, কিন্তু জাহান্নামের আগুন সহ্য করতে পারব না।' ৭৯
এটাই প্রকৃত মুমিন স্ত্রীর কথা। তার কথা কখনো এমন হবে না, যাও, আমি যা চেয়েছি, তা জলদি গিয়ে নিয়ে আসো। আমাদের কথা অবশ্য এর চেয়ে কম হয় না।
পুরুষের জেনে রাখা উচিত, অধিকাংশ নারীরাই স্বভাবত এটা সেটা কিনতে পছন্দ করে। তার মন কখনো তৃপ্ত হয় না। এখন সে যদি তার এই প্রবণতাকে আরও উস্কে দেয়, তাহলে তো তার মরণ। খরচ করতে করতে সে শেষ হয়ে যাবে।
৩. অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও লোক দেখানো অপচয় ও অপব্যয়ের এটি অন্যতম একটি কারণ। স্ত্রীর মাঝে যদি এমন অসুস্থ প্রবণতা থাকে যে, কেউ কিছু কিনলে তার দেখাদেখি তারও সেটা কিনতে হবে কিংবা মানুষকে দেখাতে হবে, তাহলে স্বামীর উচিত তাকে বোঝানো যে, প্রতিযোগিতা করতে চাইলে আখেরাতের বিষয়ে করো। সৎকর্মে করো। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার লয়শীল কোনো জিনিসের জন্য নয়।
টিকাঃ
* সূরা বনি ইসরাইল: ২৯।
৭৮ শুআবুল ঈমান: ৬৫৬৮।
** ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন : বিবাহ অধ্যায়।
📄 তুলনায় যাবেন না
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يُسْقَوْنَ مِنْ رَحِيقٍ مَخْتُومٍ خِتَامُهُ مِسْلٌ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ
'জান্নাতীদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় হতে পান করানো হবে, যার মোহর হবে মিশকের, এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক।'৮০
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও পার্থিব বিষয়ে তার স্ত্রীগণের দৃষ্টি আখেরাতমুখী করে দিতেন।
একবার নবিপত্নিগণ নবিজিকে জিজ্ঞাসা করলেন,
أَيُّنَا أَسْرَعُ بِكَ لُحُوقًا؟ قَالَ: أَطْوَلُكُنَّ يَدًا، فَأَخَذُوا قَصَبَةً يَذْرَعُونَهَا، فَكَانَتْ سَوْدَةُ أَطْوَلَهُنَّ يَدًا، فَعَلِمْنَا بَعْدُ أَنَّمَا كَانَتْ طُولَ يَدِهَا الصَّدَقَةُ، وَكَانَتْ أَسْرَعَنَا لُحُوقًا بِهِ زَيْنَبُ وَكَانَتْ تُحِبُّ الصَّدَقَةَ
'আপনার মৃত্যুর পর আমাদের মধ্যে কে সর্বাগ্রে আপনার সঙ্গে মিলিত হবে? (অর্থাৎ কে সবার আগে মৃত্যুবরণ করবে?) তখন তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে যার হাত সবচেয়ে লম্বা। তখন তারা একটি বাঁশের কঞ্চি নিয়ে নিজেদের হাত মেপে দেখতে লাগল। (দেখল যে,) সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর হাত সবচেয়ে লম্বা। কিন্তু পরবর্তিতে আমরা জানতে পারলাম যে হাত লম্বা বলতে দান-সদকা বেশি করা বুঝিয়েছেন। (অর্থাৎ যে দান-সদকা বেশি করে)। (নবিজির ইন্তেকালের পর) যয়নাব আমাদের মধ্যে সর্বাগ্রে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি দান-সদকা খুব ভালোবাসতেন।'৮১
নারীকে বলছি-
স্বামীর কাছে কিছু চাইলে সে যদি কখনো না করে, তখন তাকে সুন্দর করে বলুন, 'তোমার মুখে না শুনতেও ভালো লাগে।' দেখবেন, 'না' টা সঙ্গে সঙ্গে 'হাঁ' হয়ে গেছে।
কম্পেয়ারিজম। মানে তুলনা করা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি খুব ইতিবাচক হলেও দাম্পত্য জীবনে খুব নেতিবাচক। এর ফলে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। অসন্তুষ্টি ও অকৃতজ্ঞতাবোধ জন্ম নেয়।
পুরুষ মানুষ কাউকে স্ত্রী নিয়ে সুখে থাকতে দেখে, নিজের স্ত্রীকে সেই নারীর সঙ্গে তুলনা করে আফসোস করে। তাকে তার মতো হতে বলে। স্ত্রী এতে খুব অপমান বোধ করে।
স্ত্রীও তার স্বামীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে তুলনা করে। তার তখন সেই বান্ধবীর কথা মনে পড়ে, যে তাকে বলেছিল, আমার স্বামী আমার খুব খেয়াল রাখে। সমস্ত কাজে আমাকে সাহায্য করে।
তারপর বান্ধবীর স্বামীর সঙ্গে নিজের স্বামীর তুলনা করতে গিয়ে যখন সে দেখে যে, তার স্বামী তাকে কোনো কাজে সাহায্য করে না। মিষ্টি করে কথা বলে না। তাকে বোঝার চেষ্টা করে না।
এসব ভেবে তার মনটা বিষাদে ভরে যায়। তার মনের গহীনে চাপা বোবা কান্না গুমরে মরে। সে খুব কষ্ট অনুভব করে।
এরপর যখন তার স্বামী বাড়িতে আসে, তখন সে তার সঙ্গে বিরক্তি নিয়ে কথা বলে।
আসলে তারা দুজন যাদের সুখী দম্পতি মনে করছে, তারাও আসলে সুখী নয়। কেননা তাদের সংসারের কিছু কিছু দিক হয়ত খুব পজিটিভ। আনন্দের, সুখের। কিন্তু এমনও অনেক দিক আছে, যেগুলো খুব নেতিবাচক। কষ্টের। বিষাদের। সে কথাগুলো হয়ত তারা জানে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, জীবনসঙ্গি হিসেবে আমরা যেমনটি কল্পনা করে রাখি, একেবারে মনের মতো, নিখুঁত, আমাদের পক্ষে আসলে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় না।
কিন্তু আমরা চাইলে আমাদের কল্পনার সেই মানুষটিকে গড়ে নিতে পারি।
কীভাবে?
সর্বপ্রথম আমাদের যেটা করতে হবে, আমাদের কল্পনার চক্ষুকে বন্ধ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন নারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার স্বামী দীনদার ও আখলাকি হওয়া। তার আচার-ব্যবহার ভালো হওয়া। তাহলে সে তার হেফাজত করতে পারবে এবং তার অধিকারসমূহের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে।
অমুক তার স্ত্রীকে এই দিয়েছে, সেই দিয়েছে। এখানে বেড়াতে নিয়ে গেছে, ওখানে ঘুরতে নিয়ে গেছে। এই করেছে, সেই করেছে—একজন নারীর কখনো তার স্বামীকে এসব কথা বলা উচিত নয়। এমনিভাবে স্বামীর সামনে কখনো বিয়ের আগের ও পরের অবস্থার মাঝে তুলনা না করা। তবে বিয়ের পরের কোনো অবস্থা যদি বেশি ভালো হয়, তাহলে উল্লেখ করা যেতে পারে।
এমনিভাবে একজন পুরুষেরও কখনো উচিত নয়, স্ত্রীর সামনে অন্য কোনো নারীর প্রশংসা করে তাকে খোঁটা দেওয়া। তার আবেগ-অনুভূতিতে আঘাত করা। সে কষ্ট পাবে এমন কোনো কথা বলা। তাকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করা।
এতে দাম্পত্যজীবনের প্রতি এক ধরনের অতৃপ্তি চলে আসে। আমরা হতাশায় ভুগতে থাকি। আমাদের মানসিক শান্তি নষ্ট হতে থাকে।
♡ ♡ ♡
আমরা কখনো নাটক, মুভি ও সিরিয়ালের রোমান্টিসিজম আমাদের বাস্তব জীবনের তুলনা করব না। তাহলে আমরা প্রতারিত হব।
কেননা এসব নাটক, মুভি ও সিরিয়ালে আমরা যা দেখি এগুলো কল্পনা ও অভিনয় ছাড়া আর কিছু নয়।
কিভাবে?
সেটা আপনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন।
আমরা যদি এসব অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বাস্তব জীবনের দিকে তাকাই, তাদের সাংসারিক জীবনের খোঁজখবর নেই, তাহলে দেখতে পাব তারা একেকজন একেকটি নরকে বাস করছে। ঘৃণা এসে যাবে তাদের সংসার জীবনের কথা শুনলে। সংসার জীবনে তারা একেকজন চরম ব্যর্থ। অসুখী। সেখানে না আছে কোনো
ভালোবাসা। না আছে চারিত্রিক পবিত্রতা। তাদের বিয়ে করতে দেরি হয়। বিয়ে ভাঙতে দেরি হয় না।
যখন তাদের বিয়ে ভেঙে যায়, কোর্টে মামলা হয়। অনেক টানাহেঁচড়া হয়। মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশে যায়। তখন তারা মিডিয়ায় ইন্টারভিউ দিতে এসে বলে, 'আমরা দুজন আলাদা হয়ে গেছি ঠিকই। তবে এখনও আমরা দুজন খুব ভালো বন্ধু। আমাদের দুজনের বোঝাপড়াটা চমৎকার।'
এত চমৎকার যে, তাদের পক্ষে এক ছাদের নিচে থাকা সম্ভব হয়নি।
এসব হাস্যকর কথাবার্তা। খুবই হাস্যকর। ভয়াবহ মিথ্যে। দর্শকের সঙ্গে চরম প্রতারণা।
আল্লাহ তায়ালা এসব ধোঁকা থেকে আমাদের হেফাজত করুন এবং সবর ও শোকরের জিন্দেগি দান করুন।৮২
টিকাঃ
৮০ সুরা মুতাফফিফীন: ২৫-২৬।
৮১ সহিহ বুখারি: ১৪২০।
৮২. হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন।
📄 দরজা কে খুলবে?
একদিন সকালে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কথা কাটাকাটি হলো। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে দুজনেই প্রতিজ্ঞা করল যে, বাসায় যে-ই আসুক, তারা কেউ দরজা খুলবে না।
ঘটনাক্রমে সেদিন স্বামীর পিতা-মাতা এলো। তারা দরজা নক করছে। জোরে জোরে ডাকছে। দরজা খুলতে বলছে।
স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। স্ত্রী চোখের ইশারায় স্বামীকে তার প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
তখন তার পিতা-মাতা অনেকক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল। কিন্তু তারা দরজা খুলল না।
কিছুক্ষণ পর স্ত্রীর পিতা-মাতা এলো। দরজায় নক করলো। তারা নক করতেই তাদের মেয়ে অস্থির হয়ে গেল।
স্বামী তার স্ত্রীর দিকে তাকাল, দেখল, সে অঝোরে কাঁদছে। আর বলছে, আল্লাহর শপথ! আমার পিতা-মাতা আমার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে আর আমি দরজা খুলব না, এটা কখনো হতে পারে না। এটা আমার জন্য খুবই কষ্টের।
স্বামী তার কথা শুনে চুপ করে রইল। তখন স্ত্রী গিয়ে দরজা খুলে দিল।
এ ঘটনার পর অনেক বছর কেটে গেল। এর মাঝে তাদের পাঁচটি সন্তান হয়েছে। প্রথম চারটি একে একে পুত্র সন্তান। আর পঞ্চমটি কন্যা সন্তান।
কন্যা সন্তান হওয়াতে তার স্বামী সবচেয়ে বেশি খুশি হলো। মেয়ের আকিকার জন্য বড় করে অনুষ্ঠান করল। আত্মীয়-স্বজন সবাইকে দাওয়াত করলো।
সবাই তো অবাক। মেয়ে হওয়ায় তুমি এত খুশি হলে? কারণ কী? এর আগে তো তোমার আরও চারটি পুত্র সন্তান হয়েছে। তখন তো তোমাকে এত খুশি হতে দেখিনি?
তখন সে উত্তর দিল, একদিন এই মেয়েই আমার জন্য দরজা খুলে দিবে?
কন্যা সন্তান হলে যারা কষ্ট পায়, স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, সন্তান কোলে নিতে চায় না, মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখে, জাহেলি যুগের মানুষের মতো যাদের মুখ কালো হয়ে যায় তাদের জন্য আফসোস! শত আফসোস!!
আমাদের মধ্যে অনেকে আছে, কন্যা সন্তানের চেয়ে পুত্র সন্তান বেশি পছন্দ করে। স্ত্রী পুত্র সন্তান জন্ম না দিলে সে খুব কষ্ট পায়। মনে হয় তাকে কেউ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছে।
অথচ এটা আমাদের ইসলামের পবিত্র শিক্ষার পরিপন্থি। আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ। ইসলামে পুত্রসন্তানকে কন্যাসন্তান থেকে আলাদা করে দেখা হয়নি। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী প্রত্যেক মুমিন জানে যে, আল্লাহ তায়ালা তার পবিত্র কুরআনে বলেছেন, 'তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন। যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।'৮৩
সুতরাং কন্যা সন্তান হলে যারা অসন্তুষ্ট হয়, তারা মূলত আল্লাহর ফায়সালার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। তিনি বান্দার জন্য যেটাকে কল্যাণকর মনে করেছেন, সেটাকে অপছন্দ করে।
একজন মুমিন কন্যা সন্তান হলে কীভাবে অসন্তুষ্ট হতে পারে? কীভাবে তার চেহারা কালো হয়ে যেতে পারে? এটা কী আল্লাহ তায়ালার বিরাট দান নয়? তাঁর নেয়ামত নয়?
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা ও পুত্র সন্তানের মাঝে পার্থক্য করতে নিষেধ করেছেন। তারা প্রত্যেকেই আল্লাহর নেয়ামত। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা উপহার-উপঢৌকনের ক্ষেত্রে সন্তানদের মাঝে সমতা বজায় রাখবে। যদি আমি প্রাধান্য দিতাম, তাহলে নারীদের প্রাধান্য দিতাম।'৮৪
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, 'যার তিনটি মেয়ে অথবা তিনটি বোন আছে, সে তাদের সঙ্গে সদাচরণ করলে জান্নাতে যাবে।'৮৫
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, 'যে ব্যক্তি দুটি কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করবে, আমি এবং সে এভাবে একসঙ্গে জান্নাতে পাশাপাশি থাকব। এই বলে তিনি হাতের দুটি আঙুল একত্র করে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন।'৮৬
টিকাঃ
৮৩ সুরা শুরা: ৪৯।
৮৪ হাফেজ ইবন হাজার রহিমাহুল্লাহ কৃত ফাতহুল বারি: ৫/২৫৩।
৮৫ সুনানে তিরমিযি: ১৯১২।
৮৬ সুনানে তিরমিযি: ১৯১৪।
* হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন।