📄 নারীরা যেসব কারণে মিথ্যা বলে
একজন নারীর মিথ্যা বলার অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন,
♥ বিয়ের আগে থেকেই অনেক নারীর মিথ্যা বলার অভ্যাস থাকে। পরিবারের থেকেও অনেকে মিথ্যা বলা শিখে। যেমন, সে ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে, তার পরিবারের বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই মিথ্যা বলে।
♥ কোনো কোনো নারী মায়ের কাছ থেকে মিথ্যা বলা শিখে। সে তার মাকে দেখেছে শুধু তার বাবার সঙ্গে মিথ্যা বলতো। অন্য কারও সঙ্গে মিথ্যা না বললেও তার মা তার বাবার সঙ্গে মিথ্যা বলত। এমন না যে তার বাবা কৃপণ ছিল, তাই তার মা তার সঙ্গে মিথ্যা বলতেন। এটা তার অভ্যাস ছিল।
♥ স্বামীর মিথ্যা বলার অভ্যাস থাকার কারণেও অনেক নারী মিথ্যা বলে। যেমন, তার স্বামী কথা দিয়ে কথা রাখে না। কিংবা কোনো প্রয়োজনে তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে সেটা আর ফেরত দেয় না। অথবা সে হয়ত তার স্বামীকে কোনো কিছু কিনতে টাকা দিয়েছে, তিনি সেটা কেনার পর বাকি টাকা আর ফেরত দেয়নি। তার কাছে রেখে দিয়েছেন।
♥ আবার অনেক নারী স্বামীর কঠিন স্বভাব ও আচার-আচরণের কারণে মিথ্যা বলে। কোনো কোনো স্বামী আছেন, স্ত্রীর সামান্য ভুলে ক্ষিপ্ত হয়ে যান। খুব মেজাজ দেখান। তেড়েফুঁড়ে আসেন। এমন স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য কোনো কোনো নারী মিথ্যা বলে থাকেন।
♥ আবার অনেক স্বামী স্ত্রীকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করেন। যেমন, স্ত্রী কোনো একটা কিছু কিনে বাসায় এসে যদি বলে, এত টাকা। স্বামী তখন তাকে কিছু টাকা কমিয়ে দেয়। যেমন, একশ টাকা বললে স্বামী দেয় পঞ্চাশ টাকা। বারোশ বললে দেয় এক হাজার টাকা। কিংবা তাকে বলে, তুমি এটা কিনে ঠকেছো, এটার দাম এত না। মানে স্ত্রী কিছু কিনলেই সেটার দাম বেশি। এমতাবস্থায় অনেক স্ত্রী মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়।
♥ হিংসুকদের হিংসা থেকে বাঁচার জন্যেও কোনো কোনো নারী মিথ্যা বলে থাকে।
প্রতিকার বা চিকিৎসা
স্ত্রীর মিথ্যা বলার রোগ থাকলে অনেকভাবেই এ রোগের চিকিৎসা করা যায়। নিম্নে কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি তুলে ধরা হলো,
• পারস্পরিক সুন্দর বোঝাপড়া সৃষ্টি করা। আস্থা ও বিশ্বাস গড়ে তোলা।
• স্ত্রীর দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া। নারীরা সৃষ্টিগতভাবেই দুর্বল। তাই তাদের ক্ষমা করে দেওয়া তাকওয়ার পরিচায়ক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَنْ تَعْفُوا أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى
'মাফ করে দেওয়াই তাকওয়ার অধিক নিকটতর। ৫৫
• স্ত্রীকে কোমলভাবে বোঝানো যে, মিথ্যা বলা মহাপাপ। কবিরা গুনাহ। মিথ্যা মানুষের বিশ্বাসকে নষ্ট করে দেয়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যদি বিশ্বাসই না থাকে, তাহলে তারা কীভাবে সংসার করবে? তাদের মাঝে ভালোবাসা কীভাবে থাকবে? যাকে বিশ্বাস করা যায় না, তাকে কখনো ভালোবাসাও যায় না।
• নিজের প্রয়োজনের কথা স্বামীর কাছে স্পষ্ট করে বলা। 'স্বামীকে বললে হয়ত দিবে না' এই ভেবে অনেক নারী তার প্রয়োজনের কথা বলে না। এমনটি না করা। বরং স্পষ্ট করে বলে দেওয়া।
• অল্পে তুষ্ট থাকা। লোভ না করা। লোভ মানুষকে মিথ্যার দিকে ঠেলে দেয়। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের নির্দেশ মেনে চলা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সত্যকে ধারণ করা তোমাদের একান্ত কর্তব্য। কারণ সত্য সৎকর্মের দিকে পথপ্রদর্শন করে। আর সৎকর্ম জান্নাতের দিকে পথপ্রদর্শন করে। কোনো ব্যক্তি সর্বদা সত্য কথা বললে ও সত্য বলার চেষ্টায় রত থাকলে অবশ্যই আল্লাহ তায়ালার নিকট সে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। আর তোমরা মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাক। কারণ মিথ্যা পাপের দিকে পথপ্রদর্শন করে। পাপ জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করে। কোনো ব্যক্তি সর্বদা মিথ্যা বললে এবং মিথ্যার উপর অবিচল থাকার চেষ্টা করলে অবশেষে সে আল্লাহর নিকট মিথ্যাবাদীরূপে লিপিবদ্ধ হয়। ৫৬
টিকাঃ
৫৫ সুরা বাকারা: ২৩৭।
৫৬ সহিহ মুসলিম: ৬৪০১।
📄 পুরুষরা যেসব কারণে মিথ্যা বলে
এক মহিলার অভিযোগ, আমার স্বামী আমার সঙ্গে সবকিছু নিয়ে মিথ্যা বলে। ছোটোখাটো যে কোনো বিষয় নিয়েও মিথ্যা বলে।
সাধারণত পুরুষরা যেসব নিয়ে মিথ্যা বলে আসুন সেগুলো জেনে নেই।
• নিজের প্রফেশন নিয়ে মিথ্যা বলে। যেমন সে হয়ত কোনো প্রতিষ্ঠানের সহকারি পরিচালক। কিন্তু নিজেকে সে পরিচালক বলে দাবি করে। কিংবা সে কোনো কলেজের লেকচারার। কিন্তু নিজেকে সে প্রফেসর বলে দাবি করে।
• মাসিক ইনকাম নিয়ে অনেকে মিথ্যা বলে। এদের মধ্যে আবার দুই শ্রেণি, কেউ বাড়িয়ে বলে। কেউ কমিয়ে বলে। নিজের প্রেস্টিজ রক্ষার জন্য কেউ বাড়িয়ে বলে। আর স্ত্রী-সন্তানদের বাড়তি খরচের হাত থেকে বাঁচার জন্য কেউ কমিয়ে বলে।
• একটু স্বাধীনতা লাভের জন্য কেউ কেউ মিথ্যা বলে। যেমন সে হয়ত মনের খুশিতে ড্রাইভ করছে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে খেতে গিয়েছে। কিন্তু স্ত্রীকে বলছে অফিসের কাজে আছে।
♥ স্ত্রীর অতিরিক্ত গোয়েন্দাগিরির হাত থেকে বাঁচার জন্য কেউ কেউ মিথ্যা বলে।
♥ চরিত্রে সমস্যা থাকলে মিথ্যা বলে। কোনো গুনাহর কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে মিথ্যা বলে।
স্বামী যখন মিথ্যা বলে তখন স্ত্রীর নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, তার স্বামী তার সঙ্গে কেন মিথ্যা বলে?
অনেক নারী আছে স্বামীকে প্রচুর প্রশ্ন করতে থাকে। জেরা করতে থাকে। তার এই জেরার হাত থেকে বাঁচার জন্য কোনো কোনো পুরুষ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে। যেমন, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে সে তা গোপন করে। নিজের মা-বাবা, ভাই-বোনদের পিছনে খরচ করলে তা গোপন করে।
স্ত্রীর অতিরিক্ত সন্দেহ কিংবা কঠোর আচরণও স্বামীকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করে।
মিথ্যা অবশ্যই একটি ঘৃণিত স্বভাব। কবিরা গুনাহ। দীর্ঘ সময় নিয়ে এই রোগের চিকিৎসা করা প্রয়োজন। তবে চিকিৎসা গ্রহণের সদিচ্ছা থাকলে, নিয়ত খালেস থাকলে এ রোগ থেকে সেরে উঠা অসম্ভব কিছু নয়।
♥ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মিথ্যা বলার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া এবং এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যে, তার মাঝে এ ঘৃণ্য স্বভাব থেকে বের হয়ে আসার যোগ্যতা রয়েছে। সে চেষ্টা করলে পারবে।
♥ তাকে এ জন্য তিরস্কার ও ভর্ৎসনা না করা। এতে হতে পারে সে আরও বিগড়ে যাবে। তার সঙ্গে নম্রতা ও কোমলতার আচরণ করা। তার ভেতরে এই অনুভূতি সৃষ্টি করা যে আপনি তাকে ভালোবাসেন বলেই তার সংশোধন চাচ্ছেন।
♥ তার জন্য দুআ করা। বিশেষ করে যেসব সময়ে দুআ কবুল হয়। যেমন শেষ রাতে উঠে। প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে। দিনের শুরু ও শেষ সময়ে। জুমুআর দিনে।
♥ তাকে ধর্মীয় বই-পুস্তক পড়তে দেওয়া। মিথ্যার কুফল ও অশুভ পরিণতি বিষয়ক অনেক বই আছে, সেগুলো পড়তে দেওয়া। হক্কানী কোনো আলেমের সোহবতে নিয়ে যাওয়া।
♥ তার মোবাইল, পকেট, মানিব্যাগ ইত্যাদি চেক না করা। তার পিছনে লেগে না থাকা। ৫৭
টিকাঃ
৫৭ 'হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন।
📄 একদিকে মা, একদিকে স্ত্রী
বউ-শাশুড়ির মাঝে সাধারণত সম্পর্ক ভালো থাকে না, এটা প্রসিদ্ধ কথা। তাদের মাঝে বন্দুক যুদ্ধ না হলেও স্নায়ু যুদ্ধ চলতে থাকে। খুব কম পরিবারেই বউ-শাশুড়ির মাঝে সুসম্পর্ক দেখা যায়। কোনো কোনো পরিবারের কাছে তো এটা দুঃস্বপ্ন।
স্ত্রী ও মাকে নিয়ে অনেক পুরুষকে কঠিন সমস্যায় পড়তে হয়। উভয় সংকট যাকে বলে। একদিকে মা, একদিকে স্ত্রী। সে কোন পক্ষ নিবে বুঝতে পারে না। কারণ তাকে দুজনকেই সন্তুষ্ট রাখতে হবে।
এমতাবস্থায় সে যদি একটু হেকমত ও সবরের সঙ্গে চলে, তাহলে সে উভয়কেই সন্তুষ্ট রাখতে পারবে এবং উভয়ের হক আদায় করতে পারবে।
প্রথমে পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আপনার মায়ের প্রতি আপনার স্ত্রীর অনুভূতি কী, সে তাকে নিয়ে কী ভাবে, তার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন, এগুলো জানার চেষ্টা করতে হবে।
আপনার মা আপনাদের সঙ্গে থাকলে আপনার স্ত্রী যদি বিরক্তি প্রকাশ করে তাহলে এর কারণ কী—আপনাকে তা খুঁজে বের করতে হবে।
অপরদিকে মায়ের দিকটিও আপনার ভুলে থাকলে চলবে না। আপনার স্ত্রীর প্রতি তার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের পেছনে কারণ হচ্ছে—তিনি আশঙ্কা করেন, তিনি আপনার কাছে অপাংক্তেয় হয়ে পড়বেন। এতদিন যে মাকে অবলম্বন করে আপনি বেঁচেছেন। এখন তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো নারীকে আপনি আপনার অবলম্বন বানিয়েছেন। এসব ভেবে তিনি হয়তো খুব সংবেদনশীল হয়ে পড়েন।
এ ক্ষেত্রে আপনার জন্য আমার পরামর্শ হলো,
• আপনি তাদের উভয়ের সঙ্গেই কথা বলুন। তাদের আবেগ-অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করুন।
♥ আপনার স্ত্রী যদি আপনার মায়ের সঙ্গে না থাকে, কিংবা কর্মস্থলের কারণে আপনাকে ফ্যামিলি নিয়ে আলাদা থাকতে হয়, তাহলে চেষ্টা করবেন উভয়ের মাঝে ঘন ঘন সাক্ষাৎ করাতে। স্ত্রীকে প্রায় মায়ের বাড়িতে নিয়ে আসবেন। এসে যেন আবার বেশিদিন না থাকে। তখন
আবার তিক্ততা শুরু হয়ে যাবে। স্বল্প সময়ের জন্য আসবেন। দু-তিন দিন বা দুয়েক সপ্তাহ। আপনি এটা ভাববেন না, বেশিদিন থাকলে সম্পর্ক মধুর হবে।
♥ স্ত্রীর সঙ্গে আপনি আপনার মায়ের স্মৃতিচারণ করুন। আপনাদের তিনি কত কষ্ট করে মানুষ করেছেন, বড় করেছেন, তার সেসব ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা আলোচনা করুন। তাকে মাঝে মাঝে আপনার মায়ের মজার মজার ঘটনা শোনান। এভাবে তার ভেতর আপনার মায়ের প্রতি মমত্ব ও শ্রদ্ধাবোধ জেগে উঠবে।
• আপনার মা সম্পর্কে আপনার কোনো নেতিবাচক চিন্তা স্ত্রীর সঙ্গে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন।
♥ তাদের একজনকে আরেকজনের সামনে মন্দভাবে তুলে ধরবেন না। একজনের কাছে অন্যজনের খারাপ দিকগুলো আলোচনা করবেন না।
• দুজনের কেউ যেন অপরের সম্পর্কে আপনার কাছে মন্দ কিছু বলার সুযোগ না পায়। গালিগালাজ তো দূরের কথা।
♥ যে কোনো দ্বন্ধ সূচনাতেই মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।
• কারও বেশি বেশি বলার অভ্যাস থাকলে শুধু নির্দিষ্ট অভিযোগটি শুনুন। অতীতের পুরনো কাসন্দি ঘাটার সুযোগ দেবেন না।
• প্রত্যেককে নিয়ে আলাদাভাবে বসুন। এমন যেন না হয়, দুজনকে একসঙ্গে নিয়ে বসলেন। আর তারা আপনার সামনেই ঝগড়া শুরু করে দিল।
• দুজনের কাউকে অপরকে মহব্বত করার জন্য জোর করবেন না। এক পক্ষকে খুশি করতে গিয়ে অপর পক্ষের উপর জুলুম করবেন না।
• সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে নিজে সমস্যায় জড়াবেন না। নিজেকে দূরে রাখবেন। তবে কী হচ্ছে, তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন।
• তারা উভয়ে যেন আপনাকে সম্মান করে, আপনার কথা গ্রহণ করে, নিজেকে আপনার সেভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে হবে।
♥ কিছু বিষয়ে আপনাকে সুস্পষ্টরূপে 'না' বলে দিতে হবে। কোনোরূপ প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। যেমন, আপনার মা যদি আপনার সন্তানদের লালন-পালনের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চান কিংবা আপনার স্ত্রী যদি সন্তানদের দাদা-দাদীর কাছে যেতে বাধা দেয়।
এবার এক ব্যতিক্রমী নারীর কথা বলি, সব নারী তো আর একরকম হয় না। পৃথিবীতে আল্লাহর কিছু প্রিয় বান্দিও থাকেন। আমার একজন বৃদ্ধা পেশেন্ট আছেন। পঙ্গু। তার সঙ্গে সবসময় একজন মহিলা থাকেন। এক মুহূর্তের জন্যও তাকে ছেড়ে কোথাও যান না। বৃদ্ধার ছেলে বড় এক ভার্সিটির প্রফেসর। একদিন সে আমাকে বলল, এই ভদ্র মহিলা আমার স্ত্রী। আজ চৌদ্দ বছর যাবৎ সে আমার মায়ের খেদমত করে যাচ্ছে। তাকে সেবা-শুশ্রুষা করছে। এক রাতের জন্য সে আমার মাকে একা থাকতে দেয়নি।
আল্লাহর এ জমিনে আল্লাহর এমন বান্দিও আছে, যে পূর্ণ নিবেদন ও আত্মত্যাগের সঙ্গে, নিজের সর্বস্ব দিয়ে শ্বাশুড়ির খেদমত করে যাচ্ছে।
টিকাঃ
* হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন: ১৪৪-১৪৫।
📄 স্ত্রীর কারণে মায়ের উপর জুলুম না করা
মায়ের শ্রেষ্ঠত্ব ও অনুগ্রহের কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পর তাকে সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে। একজন মা তার সন্তানের জান্নাত, যদি সন্তান তার হক আদায় করতে পারে। আর হক আদায় করতে না পারলে এই জান্নাতই তার জন্য জাহান্নামে পরিণত হবে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,
'এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি জিজ্ঞাসা করল, অতঃপর কে? নবিজি বললেন, তোমার মা। সে বললো, অতঃপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বললো, অতঃপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা। ৫৯
আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন,
'ইয়া রাসুলাল্লাহ, নারীর উপর সবচেয়ে বেশি অধিকার কার? তিনি বললেন, তার স্বামীর। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা জিজ্ঞাসা করলেন, পুরুষের উপর? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার মায়ের।' ৬০
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
'নিশ্চয় মহান আল্লাহ তোমাদের মায়েদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিচ্ছেন, তারপর আবার তিনি তোমাদের মায়েদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিচ্ছেন, তারপর তিনি তোমাদের বাবাদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিচ্ছেন, তারপর তিনি আত্মীয়তার দিক থেকে যে যত নিকটের তার সঙ্গে তত সদাচরণের নির্দেশ দিচ্ছেন।'৬১
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা মায়েদের সঙ্গে অবাধ্যচরণকে হারাম করেছেন। নবিজির পবিত্র জবানে ইরশাদ হচ্ছে,
'আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর মায়েদের অবাধ্যচরণ, কন্যা সন্তানকে জীবিত প্রোথিতকরণ, কাউকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিতকরণ হারাম করেছেন। এবং তিনি তোমাদের জন্য গুজব ছড়ানো ও অধিক প্রশ্ন করাকে অপছন্দ করেছেন। '৬২
নবিজি তার অপর একটি হাদিসে পিতা-মাতা উভয়ের অবাধ্যচরণকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহসমূহের একটি বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু এই হাদিসে তিনি বিশেষভাবে মায়ের অবাধ্যচরণ হারাম হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে মায়ের অবাধ্যতা যে কত বড় জঘন্য অপরাধ, কত বড় মারাত্মক গুনাহ তা বোঝা যায়।
মা যে কত কষ্ট করে সন্তানকে গর্ভধারণ করেন, দশ মাস তাকে নিজের পেটে বয়ে বেড়ান, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তার সে কষ্টের কথা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। এ এমন এক কষ্ট। সন্তান যদি সারাজীবন মায়ের খেদমত করে, তাকে মাথায় তুলে রাখে, তথাপি সেই কষ্টের সমতুল্য হবে না। তার সামান্যতম ঋণ পরিশোধ হবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا حَمَلَتْهُ أُمُّهُ كُرْهًا وَوَضَعَتْهُ كُرْهًا
'আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিচ্ছি, তার মা তাকে কষ্ট করে গর্ভধারণ করেছেন। কষ্ট করে প্রসব করেছেন।' ৬৩
'নবিজি এক লোককে দেখলেন, মাকে কাঁধে নিয়ে কাবা শরিফ তওয়াফ করছে। তখন লোকটি তাকে জিজ্ঞাসা করল, এভাবে কি আমি আমার মায়ের হক আদায় করতে পারব? নবিজি বললেন, গর্ভপাতের সময়ের রক্তের এক ফোটার পরিমাণও আদায় হবে না।'৬৪
একমাত্র শিরক ও আল্লাহর নাফরমানি ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া যাবে না। এটা হারাম। কবিরা গুনাহ।
আজকাল অনেক যুবককে দেখা যায় স্ত্রীর কারণে মাকে কষ্ট দেয়। অপমান করে। অবহেলা করে। এদের দুনিয়া-আখেরাত বরবাদ। ইহকাল ও পরকালে এরা যন্ত্রদায়ক আযাবে গ্রেফতার হবে।
কেউ কেউ আছে নিজের মাকে কষ্ট না দিলেও স্ত্রী যখন তার মাকে কষ্ট দেয়, তার সঙ্গে বেয়াদবি করে, তখন সে চুপ থাকে। স্ত্রীকে শাসন করে না। তাকে বাধা দেয় না। এরা বড়ই হতভাগা। অকৃতজ্ঞ। আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত।
মনে রাখবেন, মা-বাবার সঙ্গে যে যেমন আচরণ করবে, একদিন তার সন্তানরাও তার সঙ্গে তেমন আচরণ করবে। পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ সন্তানদের কাছ থেকে সদাচরণ লাভের কারণ।
অনেক স্ত্রী আছে স্বামীর কাছে তার মায়ের নামে মিথ্যা বলে। স্বামীকে তার মায়ের খেদমত করতে দেখলে সে বেজায় রকম ক্ষেপে যায়। গায়ে পড়ে তার সঙ্গে ঝগড়া বাঁধায়। সে তাদের মা-ছেলের সম্পর্কে ফাঁটল ধরাতে চায়।
স্বামী খুব মা ভক্ত হলে অনেক স্ত্রী এ ধরনের চক্রান্তের পথে হাঁটে। মাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় তার আত্মসম্মানে লাগে। সে চায় তার স্বামী মায়ের চেয়ে তাকে বেশি গুরুত্ব দিক। স্ত্রী দীনদার না হলে, তার মধ্যে আদব-আখলাক ও সুশিক্ষার অভাব থাকলে সে এমনটি করে থাকে।
কিন্তু স্ত্রী যদি দীনদার হয়, আখলাকী হয়, তাহলে সে স্বামীকে তার মায়ের সঙ্গে উত্তম আচরণের ব্যাপারে সাহায্য করে। স্বামী কখনো তার মা-বাবার সঙ্গে মন্দ আচরণ করলে সে তাকে তিরস্কার করে। শাসন করে।
স্বামীর যেমন তার পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ করা কর্তব্য, তেমনি তা স্ত্রীরও কর্তব্য।
একটি বিষয় স্বামীর খুব ভালোভাবে জেনে রাখা দরকার, পিতা-মাতার সঙ্গে, বিশেষ করে মায়ের সঙ্গে সদাচরণের দ্বারা মানুষ অনেক বড় বড় বিপদ থেকে, এমনকি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি লাভ করে। বুখারি শরিফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
'তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে তিন ব্যক্তি সফরে বের হয়ে তারা রাত কাটাবার জন্য একটি গুহায় আশ্রয় নেয়। হঠাৎ পাহাড় হতে এক খণ্ড পাথর পড়ে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। তখন তারা নিজেদের মধ্যে বলতে লাগল তোমাদের সৎকার্যাবলীর ওসিলা নিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করা ছাড়া আর কোনো কিছুই এ পাথর হতে তোমাদের মুক্ত করতে পারে না। তখন তাদের মধ্যে একজন বলতে লাগল, হে আল্লাহ্! আমার পিতা-মাতা খুব বৃদ্ধ ছিলেন। আমি কখনো তাদের আগে আমার পরিবার পরিজনকে কিংবা দাস-দাসীকে দুধ পান করাতাম না। একদিন কোনো একটি জিনিসের তালাশে আমাকে অনেক দূরে চলে যেতে হয়; কাজেই আমি তাঁদের ঘুমিয়ে পড়ার পূর্বে ফিরতে পারলাম না। আমি তাঁদের জন্য দুধ দোহন করে নিয়ে এলাম। কিন্তু তাদের ঘুমন্ত পেলাম। তাদের আগে আমার পরিবার-পরিজন ও দাস-দাসীকে দুধ পান করতে দেয়াটাও আমি পছন্দ করিনি। তাই আমি তাঁদের জেগে উঠার অপেক্ষায় পেয়ালাটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এভাবে ভোরের আলো ফুটে উঠল। তারপর তাঁরা জাগলেন এবং দুধ পান করলেন। হে আল্লাহ্! যদি আমি তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এ কাজ করে থাকি, তবে এ পাথরের কারণে আমরা যে বিপদে পড়েছি, তা আমাদের থেকে দূর করে দিন। ফলে পাথর সামান্য সরে গেল।...'৬৫
টিকাঃ
৫৯ সহিহ বুখারি: ৫৯৭১।
৬০ মুসনাদে আহমাদ: ৬৩০৭।
৬১ ইমাম বুখারিকৃত আল-আদাবুল মুফরাদ: ৬০।
৬۲ সহিহ বুখারি: ২৪০৮।
৬৩ সুরা আহকাফ: ১৫।
৬৪ মুসনাদে বাযযার: ৪৫৫৭।
৬৫ 'সহিহ বুখারি : ২২৭২। দেখুন আদেল ফাতহি কৃত আখতাউন শাইয়াতুন তাকাউ ফি-হাল আযওয়ায।