📄 ভালোবাসার স্পষ্ট প্রকাশ
ছুটির দিন। বৃষ্টিভেজা বিকেল। জানালার ফাঁক গলে বৃষ্টির ঝাপটা এসে দুজনের চোখে-মুখে লাগছে। সপ্তাহের এই একটা দিন ফয়সাল তার স্ত্রীকে সময় দিতে পারে। তাদের দুজনের ভালো কিছু সময় কাটে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে তারা হারিয়ে যায় জীবনের গল্পে কিংবা জড়িয়ে পড়ে উষ্ণ আলিঙ্গনে। অন্যান্য সপ্তাহের মতো সেদিনও তাদের দুজনের ভালো কিছু সময় কাটছিল। গল্পে গল্পে মুহূর্তগুলো রাঙিয়ে উঠছিলো।
হঠাৎ তার স্ত্রীর কী মনে হলো, উদ্ভট এক প্রশ্ন করে বসলো। আচ্ছা আমার চেয়ে সুন্দরী, রূপসী কেউ কি আছে?
-এটা কেমন প্রশ্ন? পাগল হয়েছ নাকি?
-উত্তর জানতে চেয়েছি। উত্তর দাও।
-ফয়সাল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, জানি না।
-তার মানে আছে।
-আমার জানা নেই।
তার স্ত্রীর মাথা থেকে পাগলামিটা এখনও যায়নি। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা আমার চেয়ে ভালো কেউ কি আছে?
-আহা, কী জ্বালা। বললাম তো, জানি না।
-জানো না মানে?
-জানি না মানে জানি না। একটু থেমে ফয়সাল মুখে দুষ্টুমির হাসি নিয়ে বলল, আমি কীভাবে জানব, সবসময় তো তুমি আমার সঙ্গে থাকো। অন্য কাউকে নিয়ে ভাবার বা অন্য কারও দিকে তাকানোর আমার সুযোগ কোথায় বলো? আমার চোখে তো তুমিই সবার সেরা।
এক লোক একদিন তার স্ত্রীর খুব প্রশংসা করলো। স্ত্রী তখন বলল, একটু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে না। আমার প্রতিবেশীরা তো আমাকে ডাইনি, দাজ্জাল, আরও কী কী বলে।
তখন স্বামী বলল, আমি তোমাকে যে চোখ দিয়ে দেখি, তারা যদি সে চোখ দিয়ে দেখত, তাহলে আমার মতো তারাও তোমার প্রশংসা করত।
মাঝে মাঝে স্ত্রীর প্রশংসা করা। তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা। তার মনে খুশির দোলা দেওয়া। এতে সে অনুভব করে, আপনি তাকে ভালোবাসেন।
ঘরে প্রবেশের সময় হাসিমুখে সালাম দিয়ে প্রবেশ করা। স্ত্রীর চোখে পড়তে পারা। সে কী চায় তা দ্রুত বোঝার এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।
স্ত্রীদের সঙ্গে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ এমনই ছিল। বুখারি শরিফের হাদিস, আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'ঈদের দিন হাবশি লোকেরা যখন ঢাল ও তলোয়ার নিয়ে খেলা করছিল। তখন আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলাম কিংবা তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি কি দেখতে চাও?
আমি বললাম, হাঁ। তারপর তিনি আমাকে তার পেছনে দাঁড় করালেন। আমার গাল তার গালের উপর ছিল। তিনি বলছিলেন, হে বনু আরফিদা, চালিয়ে যাও। যখন আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তিনি আমাকে বললেন, হয়েছে? জি, হয়েছে। তিনি বললেন, তাহলে এবার যাও।১৪৩
টিকাঃ
** সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।
* হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন: ৫৪-৫৫।
📄 নারী পুরুষের মতো নয়
নারীর যখন কোনো কারণে মন খারাপ থাকে, সে কোনো সমস্যায় থাকে, তখন সে কথা বলতে চায়। সে চায়, স্বামী তার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করুক। নারীরা সাধারণত তাদের সমস্যার কথা শেয়ার করতে পছন্দ করে। এতে সে হালকা বোধ করে। প্রশান্তি অনুভব করে।
কিন্তু সমস্যা হলো পুরুষের চিন্তায়।
সে মনোযোগ সহকারে স্ত্রীর কথা শুনতে গিয়ে মনে করে, তার স্ত্রী তার কাছে সমাধান চাচ্ছে। আসলে তা নয়। তার স্ত্রী মূলত চাচ্ছে কেউ তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুক, বুঝুক, তার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করুক।
কিন্তু পুরুষের ব্যাপারটি এমন নয়। পুরুষরা সাধারণত তাদের সমস্যার কথা তখনই শেয়ার করে, যখন তার কারও হেল্পের প্রয়োজন হয়। এটাও একটা কারণ যে, পুরুষ স্ত্রীর সমস্যার কথা শোনার সময় মনে করে সে কোনো সমাধান চাচ্ছে, হেল্প চাচ্ছে।
এ কারণে অনেক স্ত্রীকে অভিযোগ করতে শোনা যায়, তার স্বামী তার কথা মন দিয়ে শোনে না।
সমস্যাটা আসলে উভয়ের চিন্তায় ও স্বভাব-প্রকৃতির ভিন্নতায়। স্ত্রী চায়, স্বামী মনোযোগ দিয়ে তার কথাগুলো শুনুক। আর স্বামী মনে করে, স্ত্রী তার কাছে সমাধান চাচ্ছে। সে তখন তাকে সমাধান দিতে যায়। কিন্তু এই সমাধান সে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না। তখন আবার স্বামী মনে করে, তার স্ত্রী তার কথা গ্রহণ করছে না। তার কথাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। গুরুত্বই যেহেতু নেই। তাহলে আর সমস্যার কথা শুনে কী লাভ?
এরপর থেকে স্ত্রীর কথা শোনার প্রতি তার আগ্রহ কমে যায়।
সমাধান-
এ ক্ষেত্রে পুরুষের কর্তব্য হলো, প্রথমেই স্ত্রীকে সমাধান দিতে না যাওয়া। তার কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা। এরপর যথাসময় বুঝে সমাধান প্রদান করা। আর স্ত্রীরও উচিত স্বামীর মনোযোগ সহকারে শ্রবণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া। তাকে মুখ ফুটে বলা, তার এই গুণটি তার আসলেই ভালো লাগে।
📄 পুরুষ নারীর মতো নয়
পুরুষ যখন কোনো সমস্যা ও দুশ্চিন্তায় থাকে, তার যখন মন খারাপ থাকে তখন সে চুপ থাকতে পছন্দ করে। একটু একা থাকতে ভালোবাসে।
তাকে এমন চুপচাপ ও একা থাকতে দেখে স্ত্রী মনে করে, সে তাকে উপেক্ষা করছে। তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। কারণ নিজের সমস্যার কথা শেয়ার করার ব্যাপারে পুরুষরা একটু ইন্ট্রোভার্ট হয়। অন্তর্মুখী। সহজে শেয়ার করতে চায় না। আর এক্ষেত্রে নারীরা হয় এক্সট্রোভার্ট। বহির্মুখী। তারা শেয়ার করতে ভালোবাসে।
পুরুষ কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকলে স্ত্রীর উচিত তাকে ভুল না বোঝা। রাগান্বিত না হওয়া। বরং অপেক্ষা করা, তাকে সময় নিতে দেওয়া এবং সুন্দর করে বলা, তোমার যখন কথা বলতে মন চাইবে, তখন বলো। আশা করি একসঙ্গে আমাদের ভালো কিছু সময় কাটবে।
খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় পুরুষরা যদিও একটু চুপচাপ থাকে। কিন্তু একটা সময় পর সে ঠিকই তার স্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করে।
কিন্তু পুরুষ যদি শেয়ার করার জন্য প্রস্তুত না থাকে, আর স্ত্রী তাকে পীড়াপীড়ি করে। তখন দেখা যাবে সে মেজাজ হারিয়ে এমন কিছু বলে বসবে, যার পরবর্তিতে তাদের উভয়ের জন্য লজ্জা ও অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এসব ক্ষেত্রে পুরুষকে একটু স্পেস দিতে হয়। তারা একটু স্পেস চায়। একা থাকার। একান্তে চিন্তা-ভাবনা করার। নিজে নিজেই সমাধা করার। সে শুরুতে কারও হেল্প নেওয়া পছন্দ করে না। আর নারী চায় কেউ তাকে শুনুক, তাকে বুঝুক। সহমর্মিতা প্রকাশ করুক। মমতার হাত প্রসারিত করুক।
পুরুষ বাস্তবতাপ্রবণ। আর নারী অনুভূতিপ্রবণ। পুরুষ জ্ঞানমুখী। আর নারী আবেগমুখী।
টিকাঃ
88 হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন: ৬০-৬১।
📄 কালিমাতুন তাইয়্যিবাহ
মহান আল্লাহ আমাদের বাকশক্তি দিয়েছেন। মনের ভাব ব্যক্ত করা শিখিয়েছেন। এটি তাঁর অনেক বড় একটি নেয়ামত। কিন্তু আমরা অনেকে এই নেয়ামতের অপব্যবহার করি এবং নিজেদের জন্য অনেক বড় বড় আপদ ডেকে নিয়ে আসি। মিথ্যা, অপবাদ, গিবত, পরচর্চা, কটুবাক্য, কথা লাগানো, কারও সম্পর্কে কাউকে বিষিয়ে তোলা, এসব করে আমরা নিজেদের আখেরাত বরবাদ করি। কিন্তু আমরা যদি একটু সতর্ক হই। আমাদের জবানকে নিয়ন্ত্রণ করি। সবসময় ভালো কথা বলি, তাহলে আমরা খুব সহজেই ইহ ও পরকালিন নাজাত লাভ করতে পারি। আমাদের জীবনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে পারি। সংসার জীবনে প্রশান্তির হিমেল হাওয়া ছড়িয়ে দিতে পারি।
কালিমাতুন তাইয়্যিবাহ মানে হচ্ছে উত্তম কথা। সুন্দর কথা। মিষ্টি কথা। ভালো কথা। হাদিসে শরিফে নবিজি উত্তম ও ভালো কথাকে সদকা বলেছেন। এর বিনিময়ে সওয়াব ও প্রতিদান ঘোষণা করেছেন। সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা বৃদ্ধিতে কালিমাতুন তাইয়্যিবার ভূমিকা অপরিসীম। এ সম্পর্কে আমরা এখানে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করব। যেমন,
স্ত্রীর জন্য প্রার্থনা করা। তাকে নিজের প্রার্থনা শোনানো। যেমন আপনি সালাত আদায়ের পর হাত তুলে স্ত্রীর জন্য এভাবে দুআ করলেন,
হে আল্লাহ, আপনি তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। কারণ আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট।
তবে তাকে শুনিয়ে আবার এমন দুআ করবেন না যাতে সে কষ্ট পায় হয়। যেমন, হে আল্লাহ, আপনি আমার স্ত্রীর আখলাক-চরিত্র, আচার-ব্যবহার সংশোধন করে দিন। তার ভেতরের সমস্ত হঠকারিতা ও অবাধ্যতা দূর করে দিন। তাকে সর্বদা বাধ্য, অনুগতা হওয়ার তৌফিক দান করুন।
কিংবা 'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করার তৌফিক দান করুন, আমি তাকে নিয়ে আর পারছি না।'
স্ত্রী অসুস্থ হলে তার মাথায় হাত রেখে তার জন্য দুআ করা। এমন কোনো কথা না বলা, যাতে তার প্রতি আপনার অবহেলা প্রকাশ পায়। যেমন, বহুত হয়েছে অসুস্থতার ভান। এবার উঠো। তোমার আসলে কিছুই হয়নি।