📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 স্ত্রীকে সম্মান করা

📄 স্ত্রীকে সম্মান করা


আপনি কেন আপনার স্ত্রীকে সম্মান করবেন? কারণ,
♥ সে একজন মানবি। আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব।
♥ সে আপনার স্ত্রী। পৃথিবীর সমস্ত নারীদের মধ্য থেকে আপনি তাকে আপনার জীবনসঙ্গিনী হিসেবে নির্বাচন করেছেন।
♥ আপনার সন্তানের মা।
♥ আপনার গোপনীয়তা রক্ষাকারিনী।
♥ আপনার সুখ-শান্তির প্রতি মনোযোগী।
♥ আপনার ঈমান ও দ্বীনের হেফাজতকারিনী।
♥ আপনার সুখ-দুঃখের সঙ্গিনী।
এ ছাড়া আরও অসংখ্য কারণ রয়েছে।
ডক্টর আনওয়ার ওয়ারদাহ বলেন, 'আমার পিতা শাইখ আবদুল গণি ওয়ারদাহ একদিন এক মজলিসে বসা ছিলেন। তখন এক লোক নারীদের নিয়ে একটি মন্তব্য করল যে, 'নারী হচ্ছে পায়ের জুতার ন্যায়। পুরুষ চাইলে তাকে যেকোনো সময় পরিবর্তন করে নতুন জুতো নিতে পারে।'
উপস্থিত সবাই তখন আমার পিতার দিকে তাকাল। তারা তাকে জিজ্ঞাসা করল, ডক্টর সাহেব, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
তখন তিনি বললেন, উনি যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ সঠিক। যে ব্যক্তি নিজেকে পা মনে করে তার দৃষ্টিতে নারী জুতোর ন্যায়। আর যে নিজেকে মাথা মনে করে, তার কাছে নারী মাথার তাজের ন্যায়। উনি হয়ত নিজেকে পা মনে করেন। সুতরাং উনাকে তোমরা তিরস্কার করো না। বরং তিনি নিজেকে কী মনে করেন সেটা ভেবে দেখো।
নারীদের সম্পর্কে অনেকেরই এমন জাহেলি চিন্তাধারা। নিকৃষ্ট ধ্যান-ধারণা। এই চিন্তা থেকেই পুঁজিবাদ নারীদের পণ্যের চেয়েও নিম্নস্তরে নামিয়ে ফেলেছে।
এমন নিকৃষ্ট চিন্তাধারার ও সংকীর্ণ মন-মানসিকতার কাউকে যদি আপনি বলেন, অমুক বিষয়ে আপনি আপনার স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করুন, তখন তাদের ঠুনকো আত্মসম্মানবোধ জেগে উঠে। কপাল কুঁচকে আসে। তেজের সুরে বলে, 'পুরুষরা নারীদের সঙ্গে পরামর্শ করে না।'
জ্ঞান, মেধা ও বুদ্ধিতে তার স্ত্রী তার চেয়ে অগ্রগামী হলেও নারীদের প্রতি তার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সে তার কাছে পরামর্শ চায় না। এ দরজা সে নিজেই বন্ধ করে রেখেছে।
সাইয়্যিদুনা উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'জাহেলি যুগে আমরা নারীদের কোনো কিছু বলে গণনা করতাম না। অবশেষে (ইসলামের আগমন হলো) আল্লাহ তাদের ব্যাপারে যা নাযিল করার তা নাযিল করলেন এবং তাদের জন্য (উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে) যা বণ্টন করার, বণ্টন করে দিলেন।'
হেরা গুহার অভ্যন্তরে সর্বপ্রথম ওহি লাভ করার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে ফিরে এলেন, তখন তিনি ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে গিয়ে বসলেন। তাকে সব খুলে বললেন, তার কাছে পরামর্শ চাইলেন। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন তাকে তার চাচাত ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেলের কাছে নিয়ে গেলেন। সামনে আসবে সে আলোচনা।
ইফকের ঘটনায় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী যয়নাব বিনতে জাহাশের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। তিনি তাকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তখন তিনি তার সম্পর্কে উত্তম কথা বলেছিলেন।
হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় কঠিন মুহূর্তে আম্মাজান উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। তখন তিনি তাকে কার্যকরী পরামর্শ দিয়েছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে গল্প ও পরামর্শ শিরোনামে সামনে বিস্তারিত আসবে সে আলোচনা।
হাসান বসরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরামর্শ চাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তবে তিনি উম্মতকে শেখানোর জন্য এমনটি করেছিলেন। তিনি একটি আদর্শ রেখে যেতে চেয়েছিলেন। পুরুষ যেন স্ত্রীর কাছে পরামর্শ চাওয়াকে লজ্জার কিছু মনে না করে।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তার কন্যার কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু রাতে বের হলেন, তখন তিনি এক নারীকে আবৃত্তি করতে শুনলেন,
'আজকের এই রাতকে অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। পুরো পৃথিবী অন্ধকারের চাদর গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ আমার চোখে ঘুম নেই। আদর-সোহাগ করার আমার কোনো সঙ্গীও নেই।'
তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার কন্যা হাফসাকে জিজ্ঞাসা করলেন, স্বামী ছাড়া একজন নারী সর্বোচ্চ কতদিন ধৈর্যধারণ করতে পারে? তিনি বললেন, চার মাস কিংবা ছয় মাস। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তাহলে এখন থেকে কোনো সৈনিককে আর ছয়মাসের বেশি যুদ্ধের কাজে আটকে রাখব না।৪২

টিকাঃ
৪২ হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন: ৪৮-৪৯।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 ভালোবাসার স্পষ্ট প্রকাশ

📄 ভালোবাসার স্পষ্ট প্রকাশ


ছুটির দিন। বৃষ্টিভেজা বিকেল। জানালার ফাঁক গলে বৃষ্টির ঝাপটা এসে দুজনের চোখে-মুখে লাগছে। সপ্তাহের এই একটা দিন ফয়সাল তার স্ত্রীকে সময় দিতে পারে। তাদের দুজনের ভালো কিছু সময় কাটে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে তারা হারিয়ে যায় জীবনের গল্পে কিংবা জড়িয়ে পড়ে উষ্ণ আলিঙ্গনে। অন্যান্য সপ্তাহের মতো সেদিনও তাদের দুজনের ভালো কিছু সময় কাটছিল। গল্পে গল্পে মুহূর্তগুলো রাঙিয়ে উঠছিলো।
হঠাৎ তার স্ত্রীর কী মনে হলো, উদ্ভট এক প্রশ্ন করে বসলো। আচ্ছা আমার চেয়ে সুন্দরী, রূপসী কেউ কি আছে?
-এটা কেমন প্রশ্ন? পাগল হয়েছ নাকি?
-উত্তর জানতে চেয়েছি। উত্তর দাও।
-ফয়সাল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, জানি না।
-তার মানে আছে।
-আমার জানা নেই।
তার স্ত্রীর মাথা থেকে পাগলামিটা এখনও যায়নি। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা আমার চেয়ে ভালো কেউ কি আছে?
-আহা, কী জ্বালা। বললাম তো, জানি না।
-জানো না মানে?
-জানি না মানে জানি না। একটু থেমে ফয়সাল মুখে দুষ্টুমির হাসি নিয়ে বলল, আমি কীভাবে জানব, সবসময় তো তুমি আমার সঙ্গে থাকো। অন্য কাউকে নিয়ে ভাবার বা অন্য কারও দিকে তাকানোর আমার সুযোগ কোথায় বলো? আমার চোখে তো তুমিই সবার সেরা।
এক লোক একদিন তার স্ত্রীর খুব প্রশংসা করলো। স্ত্রী তখন বলল, একটু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে না। আমার প্রতিবেশীরা তো আমাকে ডাইনি, দাজ্জাল, আরও কী কী বলে।
তখন স্বামী বলল, আমি তোমাকে যে চোখ দিয়ে দেখি, তারা যদি সে চোখ দিয়ে দেখত, তাহলে আমার মতো তারাও তোমার প্রশংসা করত।
মাঝে মাঝে স্ত্রীর প্রশংসা করা। তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা। তার মনে খুশির দোলা দেওয়া। এতে সে অনুভব করে, আপনি তাকে ভালোবাসেন।
ঘরে প্রবেশের সময় হাসিমুখে সালাম দিয়ে প্রবেশ করা। স্ত্রীর চোখে পড়তে পারা। সে কী চায় তা দ্রুত বোঝার এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।
স্ত্রীদের সঙ্গে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ এমনই ছিল। বুখারি শরিফের হাদিস, আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'ঈদের দিন হাবশি লোকেরা যখন ঢাল ও তলোয়ার নিয়ে খেলা করছিল। তখন আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলাম কিংবা তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি কি দেখতে চাও?
আমি বললাম, হাঁ। তারপর তিনি আমাকে তার পেছনে দাঁড় করালেন। আমার গাল তার গালের উপর ছিল। তিনি বলছিলেন, হে বনু আরফিদা, চালিয়ে যাও। যখন আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তিনি আমাকে বললেন, হয়েছে? জি, হয়েছে। তিনি বললেন, তাহলে এবার যাও।১৪৩

টিকাঃ
** সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।
* হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন: ৫৪-৫৫।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 নারী পুরুষের মতো নয়

📄 নারী পুরুষের মতো নয়


নারীর যখন কোনো কারণে মন খারাপ থাকে, সে কোনো সমস্যায় থাকে, তখন সে কথা বলতে চায়। সে চায়, স্বামী তার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করুক। নারীরা সাধারণত তাদের সমস্যার কথা শেয়ার করতে পছন্দ করে। এতে সে হালকা বোধ করে। প্রশান্তি অনুভব করে।
কিন্তু সমস্যা হলো পুরুষের চিন্তায়।
সে মনোযোগ সহকারে স্ত্রীর কথা শুনতে গিয়ে মনে করে, তার স্ত্রী তার কাছে সমাধান চাচ্ছে। আসলে তা নয়। তার স্ত্রী মূলত চাচ্ছে কেউ তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুক, বুঝুক, তার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করুক।
কিন্তু পুরুষের ব্যাপারটি এমন নয়। পুরুষরা সাধারণত তাদের সমস্যার কথা তখনই শেয়ার করে, যখন তার কারও হেল্পের প্রয়োজন হয়। এটাও একটা কারণ যে, পুরুষ স্ত্রীর সমস্যার কথা শোনার সময় মনে করে সে কোনো সমাধান চাচ্ছে, হেল্প চাচ্ছে।
এ কারণে অনেক স্ত্রীকে অভিযোগ করতে শোনা যায়, তার স্বামী তার কথা মন দিয়ে শোনে না।
সমস্যাটা আসলে উভয়ের চিন্তায় ও স্বভাব-প্রকৃতির ভিন্নতায়। স্ত্রী চায়, স্বামী মনোযোগ দিয়ে তার কথাগুলো শুনুক। আর স্বামী মনে করে, স্ত্রী তার কাছে সমাধান চাচ্ছে। সে তখন তাকে সমাধান দিতে যায়। কিন্তু এই সমাধান সে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না। তখন আবার স্বামী মনে করে, তার স্ত্রী তার কথা গ্রহণ করছে না। তার কথাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। গুরুত্বই যেহেতু নেই। তাহলে আর সমস্যার কথা শুনে কী লাভ?
এরপর থেকে স্ত্রীর কথা শোনার প্রতি তার আগ্রহ কমে যায়।
সমাধান-
এ ক্ষেত্রে পুরুষের কর্তব্য হলো, প্রথমেই স্ত্রীকে সমাধান দিতে না যাওয়া। তার কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা। এরপর যথাসময় বুঝে সমাধান প্রদান করা। আর স্ত্রীরও উচিত স্বামীর মনোযোগ সহকারে শ্রবণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া। তাকে মুখ ফুটে বলা, তার এই গুণটি তার আসলেই ভালো লাগে।

📘 দুজনার পাঠশালা > 📄 পুরুষ নারীর মতো নয়

📄 পুরুষ নারীর মতো নয়


পুরুষ যখন কোনো সমস্যা ও দুশ্চিন্তায় থাকে, তার যখন মন খারাপ থাকে তখন সে চুপ থাকতে পছন্দ করে। একটু একা থাকতে ভালোবাসে।
তাকে এমন চুপচাপ ও একা থাকতে দেখে স্ত্রী মনে করে, সে তাকে উপেক্ষা করছে। তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। কারণ নিজের সমস্যার কথা শেয়ার করার ব্যাপারে পুরুষরা একটু ইন্ট্রোভার্ট হয়। অন্তর্মুখী। সহজে শেয়ার করতে চায় না। আর এক্ষেত্রে নারীরা হয় এক্সট্রোভার্ট। বহির্মুখী। তারা শেয়ার করতে ভালোবাসে।
পুরুষ কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকলে স্ত্রীর উচিত তাকে ভুল না বোঝা। রাগান্বিত না হওয়া। বরং অপেক্ষা করা, তাকে সময় নিতে দেওয়া এবং সুন্দর করে বলা, তোমার যখন কথা বলতে মন চাইবে, তখন বলো। আশা করি একসঙ্গে আমাদের ভালো কিছু সময় কাটবে।
খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় পুরুষরা যদিও একটু চুপচাপ থাকে। কিন্তু একটা সময় পর সে ঠিকই তার স্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করে।
কিন্তু পুরুষ যদি শেয়ার করার জন্য প্রস্তুত না থাকে, আর স্ত্রী তাকে পীড়াপীড়ি করে। তখন দেখা যাবে সে মেজাজ হারিয়ে এমন কিছু বলে বসবে, যার পরবর্তিতে তাদের উভয়ের জন্য লজ্জা ও অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এসব ক্ষেত্রে পুরুষকে একটু স্পেস দিতে হয়। তারা একটু স্পেস চায়। একা থাকার। একান্তে চিন্তা-ভাবনা করার। নিজে নিজেই সমাধা করার। সে শুরুতে কারও হেল্প নেওয়া পছন্দ করে না। আর নারী চায় কেউ তাকে শুনুক, তাকে বুঝুক। সহমর্মিতা প্রকাশ করুক। মমতার হাত প্রসারিত করুক।
পুরুষ বাস্তবতাপ্রবণ। আর নারী অনুভূতিপ্রবণ। পুরুষ জ্ঞানমুখী। আর নারী আবেগমুখী।

টিকাঃ
88 হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন: ৬০-৬১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00