📄 স্ত্রীকে দীন শিক্ষা দেওয়া
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَاراً وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلائِكَةٌ غِلاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনদের সেই অগ্নি থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হলো মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা আল্লাহ তায়ালা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তাদেরকে যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।' ৩৫
এই আয়াতে মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নিজেকে ও তার পরিবার- পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর। সে জন্য আমাদের অবশ্যই আল্লাহর হুকুম-আহকামগুলো সঠিকভাবে পালন করতে হবে। তাঁর বিধান অনুযায়ী জীবন-যাপন করতে হবে। আর সে জন্য আমাদের আল্লাহর বিধান সম্পর্কে জানতে হবে। শরিয়তের জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যেটাকে আমরা দ্বীনি শিক্ষা বলি।
পুরুষকে তার পরিবারের কল্যাণকামী হওয়ার, তাদেরকে সৎকাজের আদেশ করার ও অসৎকাজের নিষেধ করার ব্যাপারে আদেশ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় রাসুলকে নির্দেশ দিয়ে বলেন,
وَأُمُرُ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
'আপনি আপনার পরিবারস্থ লোকজনকে নামাজের আদেশ করুন, নিজেও তার উপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে রিজিক চাই না। রিজিক তো আমিই আপনাকে দান করি। আর উত্তম পরিণতি তো তাকওয়ার জন্য।' ৩৬
স্ত্রীর পর্দার বিষয়ে অবহেলা থাকলে স্বামীর উচিত তাকে পর্দার ব্যাপারে যত্নবান হতে বলা, সে যেন কোনো পরপুরুষের সামনে না যায়। যাদের সঙ্গে দেখা করা হারাম তাদেরকে দেখা না দেয়।
এখন কাদের সঙ্গে তার পর্দা করতে হবে, এ বিষয়টি যদি স্ত্রীর জানা না থাকে, তাহলে স্বামীর উচিত তাকে জানিয়ে দেওয়া। জানা থাকলে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। তাকে তার প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল ও দুআ-দুরুদ, তাসবিহ-তাহলিল শিক্ষা দেওয়া। কুরআন শরিফ পড়তে না পারলে শুদ্ধ করে কুরআন শেখার ব্যবস্থা করা।
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পুরুষের উচিত হায়েজের বিধানাবলি শিখে রাখা, যাতে স্ত্রীর হায়েজের দিনগুলোতে কী কী বিষয় থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব, তা তার জানা থাকে। স্ত্রীকেও শিক্ষা দেওয়া দরকার। যেমন, (হায়েজের সময়সীমা কী, হায়েজ শেষ হয়েছে কি না তা বোঝার উপায় কী, হায়েজ ও ইস্তিহাযার মধ্যে পার্থক্য কী) হায়েজের সময়কার কোন কোন নামাজের কাযা পড়তে হয় এবং কোন কোন নামাজের কাযা পড়তে হয় না ইত্যাদি যাবতীয় মাসআলা-মাসায়েল তাকে শিক্ষা দেওয়া।
কেননা পবিত্র কুরআনে স্ত্রীকে দোযখ থেকে বাঁচানোর জন্য পুরুষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে,
قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَاراً
'তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।'৩৭
সেই সাথে স্ত্রীকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদার বিষয়গুলোও শিক্ষা দেওয়া। এ কাজটি পুরুষের জন্য আবশ্যক। স্ত্রী যদি কোনো বিদআতে কান দিয়ে থাকে, পুরুষের উচিত তা তার মন থেকে দূর করে দেওয়া। আল্লাহর হুকুম পালনে অলসতা করলে তাকে আল্লাহর আযাবের ভয় দেখানো। হায়েজ ও এস্তেহাযার প্রয়োজনীয় মাসআলা শিক্ষা দেওয়া, যেমন হায়েজের সময়সীমা কী, হায়েজ ও ইস্তেহাজার মধ্যে পার্থক্য কী, হায়েজ অবস্থায় হজ্জ-উমরার বিধান ইত্যাদি।
মাসআলা শেখার জন্য স্বামী যথেষ্ট হলে কোনো আলেমের কাছে যাওয়া স্ত্রীর জন্য বৈধ নয়। কিংবা পুরুষের যদি মাসআলা না জানা থাকে, কিন্তু কোনো মুফতির কাছ থেকে তিনি জেনে তাকে জানাতে পারেন, তবুও স্ত্রীর জন্য বাইরে যাওয়া জায়েজ নয়। এছাড়া স্ত্রীর বাইরে যাওয়া এবং জিজ্ঞেস করে নেওয়া জায়েজ, বরং ওয়াজিব। এমতাবস্থায় স্বামী নিষেধ করলে গুনাহগার হবে।
স্ত্রীর যদি ফরজ বিধানগুলো জানা থাকে, তবে আরও অধিক ইলম হাসিলের জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোনো ওয়াজের মজলিসে যাওয়া জায়েজ নয়।
যদি এমন হয়, স্ত্রী হায়েজ-ইস্তেহাজার কোনো মাসআলা জানে না। না জানার কারণে সে পালনও করে না। আর তার স্বামীও তাকে শিক্ষা দেয় না। এমতাবস্থায় স্ত্রী কোনো আলেমের কাছে যেতে চাইলে স্বামী তার সঙ্গে যাবে। নতুবা গুনাহে সেও তার অংশীদার হবে।
ইবনে হাজম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, প্রাপ্তবয়স্ত ও সুস্থ-মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য পবিত্রতা অবলম্বন করা, সালাত আদায় করা ও রমজানের ফরজ রোজা রাখা আবশ্যক। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই। তাই তাদের উপর নামাজ, রোজা ও পবিত্রতার বিধান সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং সেগুলো পালন করার পদ্ধতিসমূহ জানা ফরজ। অনুরূপভাবে তাদের উপর পানাহার, পরিধেয় বস্ত্র, লজ্জাস্থান, রক্ত, কথা ও কাজ সংক্রান্ত হালাল-হারামের বিধান সম্পর্কে জানা ফরজ। এগুলো সম্পর্কে কোনো মুসলমানের অজ্ঞ থাকার সুযোগ নেই।
একজন পুরুষ যেহেতু পরিবারের দায়িত্বশীল, তাই তার অবশ্য কর্তব্য পরিবারের সকলকে এগুলো শিক্ষা দেওয়া, কিংবা তাদের শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা। নতুবা সে গুনাহগার হবে এবং এর জন্য আল্লাহর কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
টিকাঃ
৩৫ সুরা তাহরিম: ৬।
৩৬ সুরা ত্বহা: ১৩২।
৩৭ সুরা তাহরিম: ৬।
* 'আল-ইহকাম ফি উসূলিল আহকাম: ৫/১২১।
** আখতাউন شাইয়াতুন ইয়াকাউ ফি-হাল আযওয়ায: ২০।
📄 প্রয়োজন একটি ক্ষমার রবারের
এক যুবক বিয়ে করল। তারপর সে তার বাবার কাছে গেল আশীর্বাদ নিতে। বাবা তাকে বললেন—একটি কাগজ, একটি পেন্সিল আর একটি রবার নিয়ে আসো।
যুবক বলল, কেন বাবা?
আরে নিয়ে আসো না।
সে তখন ভুলে রবার না কিনে শুধু কাগজ আর পেন্সিল নিয়ে চলে এলো।
বাবা বললেন, আবার নিচে যাও। গিয়ে রবার নিয়ে আসো।
সে রবার নিয়ে এলো। তারপর এসে বাবার পাশে বসল।
বাবা বললেন, এবার যে কোনো একটি বাক্য লিখ। তোমার যা খুশি।
-লিখেছি
-রবার দিয়ে বাক্যটি মুছে ফেল।
-জি, মুছেছি।
-আবার যে কোনো একটি বাক্য লিখ।
-লিখেছি।
-এবারও মুছে ফেল।
-জি, মুছেছি।
-আবার লিখ।
বিরক্ত হয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, তুমি আসলে কী চাচ্ছ খুলে বলো তো? বারবার শুধু লিখছি আর মুছছি?
-লিখতে বলেছি লিখো।
-লিখেছি।
-আবার মুছে ফেল।
-জি, মুছেছি।
এবার বাবা তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, বেটা! এর মাধ্যমে আমি মূলত তোমাকে বোঝাতে চেয়েছি, দাম্পত্য জীবনের জন্য একটা রবারের প্রয়োজন।
বিয়ের পর তুমি যদি তোমার সঙ্গে এমন একটি ক্ষমার রবার না রাখো, যা দিয়ে তুমি তোমার স্ত্রীর ভুলগুলো মুছে ফেলবে, কিংবা তোমার স্ত্রীর কাছে যদি কোনো রবার না থাকে যা দিয়ে সে তোমার ভুলগুলো মুছে ফেলবে, তাহলে খুব দ্রুত দেখবে দাম্পত্য জীবনের পৃষ্ঠাটি কষ্ট-অসন্তোষের দাগে কালো হয়ে গেছে।
সুতরাং তোমরা একে অন্যের ছিদ্রান্বেষণ করবে না। দোষ-ত্রুটির পিছনে পড়বে না। বরং ক্ষমা ও মার্জনার পথে হাঁটবে। ধৈর্যধারণ করবে। স্ত্রীর ছোট ছোট দোষ থেকে চোখ বন্ধ করে রাখবে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী সেই ব্যক্তি, মানুষের মধ্যে যার আখলাক সর্বোত্তম। আর তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের কাছে সর্বোত্তম।'৪০
আলহামদুলিল্লাহ, এমন অনেক দম্পতি আছে, যারা দিনশেষে একসঙ্গে কথা বলতে বসে একে অপরের দোষ-ত্রুটিগুলো সম্পূর্ণরূপে ভুলে যায়। তাদের অন্তরে তখন ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আর আকাশছোঁয়া এই ভালোবাসার সামনে কোনো সমস্যা ও সংকট কিছুই না।
উসমান ইবনু যায়েদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
'আমি ইমাম আহমাদকে বললাম, আফিয়াত তথা নিরাপত্তার দশটি অংশ। এই নয়টিই গুরুত্ব না দেওয়ার মাঝে নিহিত। অর্থাৎ কোনো দোষ-ত্রুটি দেখেও না দেখার ভান করা।'৪১
টিকাঃ
৪০ সুনানে আবু দাউদ: ১১৬২। মুসনাদে আহমাদ।
৪১ 'হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন: ৪২।
📄 স্ত্রীকে সম্মান করা
আপনি কেন আপনার স্ত্রীকে সম্মান করবেন? কারণ,
♥ সে একজন মানবি। আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব।
♥ সে আপনার স্ত্রী। পৃথিবীর সমস্ত নারীদের মধ্য থেকে আপনি তাকে আপনার জীবনসঙ্গিনী হিসেবে নির্বাচন করেছেন।
♥ আপনার সন্তানের মা।
♥ আপনার গোপনীয়তা রক্ষাকারিনী।
♥ আপনার সুখ-শান্তির প্রতি মনোযোগী।
♥ আপনার ঈমান ও দ্বীনের হেফাজতকারিনী।
♥ আপনার সুখ-দুঃখের সঙ্গিনী।
এ ছাড়া আরও অসংখ্য কারণ রয়েছে।
ডক্টর আনওয়ার ওয়ারদাহ বলেন, 'আমার পিতা শাইখ আবদুল গণি ওয়ারদাহ একদিন এক মজলিসে বসা ছিলেন। তখন এক লোক নারীদের নিয়ে একটি মন্তব্য করল যে, 'নারী হচ্ছে পায়ের জুতার ন্যায়। পুরুষ চাইলে তাকে যেকোনো সময় পরিবর্তন করে নতুন জুতো নিতে পারে।'
উপস্থিত সবাই তখন আমার পিতার দিকে তাকাল। তারা তাকে জিজ্ঞাসা করল, ডক্টর সাহেব, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
তখন তিনি বললেন, উনি যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ সঠিক। যে ব্যক্তি নিজেকে পা মনে করে তার দৃষ্টিতে নারী জুতোর ন্যায়। আর যে নিজেকে মাথা মনে করে, তার কাছে নারী মাথার তাজের ন্যায়। উনি হয়ত নিজেকে পা মনে করেন। সুতরাং উনাকে তোমরা তিরস্কার করো না। বরং তিনি নিজেকে কী মনে করেন সেটা ভেবে দেখো।
নারীদের সম্পর্কে অনেকেরই এমন জাহেলি চিন্তাধারা। নিকৃষ্ট ধ্যান-ধারণা। এই চিন্তা থেকেই পুঁজিবাদ নারীদের পণ্যের চেয়েও নিম্নস্তরে নামিয়ে ফেলেছে।
এমন নিকৃষ্ট চিন্তাধারার ও সংকীর্ণ মন-মানসিকতার কাউকে যদি আপনি বলেন, অমুক বিষয়ে আপনি আপনার স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করুন, তখন তাদের ঠুনকো আত্মসম্মানবোধ জেগে উঠে। কপাল কুঁচকে আসে। তেজের সুরে বলে, 'পুরুষরা নারীদের সঙ্গে পরামর্শ করে না।'
জ্ঞান, মেধা ও বুদ্ধিতে তার স্ত্রী তার চেয়ে অগ্রগামী হলেও নারীদের প্রতি তার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সে তার কাছে পরামর্শ চায় না। এ দরজা সে নিজেই বন্ধ করে রেখেছে।
সাইয়্যিদুনা উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'জাহেলি যুগে আমরা নারীদের কোনো কিছু বলে গণনা করতাম না। অবশেষে (ইসলামের আগমন হলো) আল্লাহ তাদের ব্যাপারে যা নাযিল করার তা নাযিল করলেন এবং তাদের জন্য (উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে) যা বণ্টন করার, বণ্টন করে দিলেন।'
হেরা গুহার অভ্যন্তরে সর্বপ্রথম ওহি লাভ করার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে ফিরে এলেন, তখন তিনি ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে গিয়ে বসলেন। তাকে সব খুলে বললেন, তার কাছে পরামর্শ চাইলেন। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন তাকে তার চাচাত ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেলের কাছে নিয়ে গেলেন। সামনে আসবে সে আলোচনা।
ইফকের ঘটনায় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী যয়নাব বিনতে জাহাশের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। তিনি তাকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তখন তিনি তার সম্পর্কে উত্তম কথা বলেছিলেন।
হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় কঠিন মুহূর্তে আম্মাজান উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। তখন তিনি তাকে কার্যকরী পরামর্শ দিয়েছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে গল্প ও পরামর্শ শিরোনামে সামনে বিস্তারিত আসবে সে আলোচনা।
হাসান বসরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরামর্শ চাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তবে তিনি উম্মতকে শেখানোর জন্য এমনটি করেছিলেন। তিনি একটি আদর্শ রেখে যেতে চেয়েছিলেন। পুরুষ যেন স্ত্রীর কাছে পরামর্শ চাওয়াকে লজ্জার কিছু মনে না করে।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তার কন্যার কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু রাতে বের হলেন, তখন তিনি এক নারীকে আবৃত্তি করতে শুনলেন,
'আজকের এই রাতকে অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। পুরো পৃথিবী অন্ধকারের চাদর গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ আমার চোখে ঘুম নেই। আদর-সোহাগ করার আমার কোনো সঙ্গীও নেই।'
তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার কন্যা হাফসাকে জিজ্ঞাসা করলেন, স্বামী ছাড়া একজন নারী সর্বোচ্চ কতদিন ধৈর্যধারণ করতে পারে? তিনি বললেন, চার মাস কিংবা ছয় মাস। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তাহলে এখন থেকে কোনো সৈনিককে আর ছয়মাসের বেশি যুদ্ধের কাজে আটকে রাখব না।৪২
টিকাঃ
৪২ হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন: ৪৮-৪৯।
📄 ভালোবাসার স্পষ্ট প্রকাশ
ছুটির দিন। বৃষ্টিভেজা বিকেল। জানালার ফাঁক গলে বৃষ্টির ঝাপটা এসে দুজনের চোখে-মুখে লাগছে। সপ্তাহের এই একটা দিন ফয়সাল তার স্ত্রীকে সময় দিতে পারে। তাদের দুজনের ভালো কিছু সময় কাটে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে তারা হারিয়ে যায় জীবনের গল্পে কিংবা জড়িয়ে পড়ে উষ্ণ আলিঙ্গনে। অন্যান্য সপ্তাহের মতো সেদিনও তাদের দুজনের ভালো কিছু সময় কাটছিল। গল্পে গল্পে মুহূর্তগুলো রাঙিয়ে উঠছিলো।
হঠাৎ তার স্ত্রীর কী মনে হলো, উদ্ভট এক প্রশ্ন করে বসলো। আচ্ছা আমার চেয়ে সুন্দরী, রূপসী কেউ কি আছে?
-এটা কেমন প্রশ্ন? পাগল হয়েছ নাকি?
-উত্তর জানতে চেয়েছি। উত্তর দাও।
-ফয়সাল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, জানি না।
-তার মানে আছে।
-আমার জানা নেই।
তার স্ত্রীর মাথা থেকে পাগলামিটা এখনও যায়নি। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা আমার চেয়ে ভালো কেউ কি আছে?
-আহা, কী জ্বালা। বললাম তো, জানি না।
-জানো না মানে?
-জানি না মানে জানি না। একটু থেমে ফয়সাল মুখে দুষ্টুমির হাসি নিয়ে বলল, আমি কীভাবে জানব, সবসময় তো তুমি আমার সঙ্গে থাকো। অন্য কাউকে নিয়ে ভাবার বা অন্য কারও দিকে তাকানোর আমার সুযোগ কোথায় বলো? আমার চোখে তো তুমিই সবার সেরা।
এক লোক একদিন তার স্ত্রীর খুব প্রশংসা করলো। স্ত্রী তখন বলল, একটু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে না। আমার প্রতিবেশীরা তো আমাকে ডাইনি, দাজ্জাল, আরও কী কী বলে।
তখন স্বামী বলল, আমি তোমাকে যে চোখ দিয়ে দেখি, তারা যদি সে চোখ দিয়ে দেখত, তাহলে আমার মতো তারাও তোমার প্রশংসা করত।
মাঝে মাঝে স্ত্রীর প্রশংসা করা। তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা। তার মনে খুশির দোলা দেওয়া। এতে সে অনুভব করে, আপনি তাকে ভালোবাসেন।
ঘরে প্রবেশের সময় হাসিমুখে সালাম দিয়ে প্রবেশ করা। স্ত্রীর চোখে পড়তে পারা। সে কী চায় তা দ্রুত বোঝার এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।
স্ত্রীদের সঙ্গে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ এমনই ছিল। বুখারি শরিফের হাদিস, আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
'ঈদের দিন হাবশি লোকেরা যখন ঢাল ও তলোয়ার নিয়ে খেলা করছিল। তখন আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলাম কিংবা তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি কি দেখতে চাও?
আমি বললাম, হাঁ। তারপর তিনি আমাকে তার পেছনে দাঁড় করালেন। আমার গাল তার গালের উপর ছিল। তিনি বলছিলেন, হে বনু আরফিদা, চালিয়ে যাও। যখন আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তিনি আমাকে বললেন, হয়েছে? জি, হয়েছে। তিনি বললেন, তাহলে এবার যাও।১৪৩
টিকাঃ
** সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।
* হামাসাতুন ফি উযুনি যাওযাইন: ৫৪-৫৫।