📄 অভিপ্রায়ের গুরুত্ব
আপনার প্রতিজ্ঞাগুলো নবায়ন করুন, প্রতিদিন আপনার প্রতিজ্ঞাগুলোকে নবায়ন করুন। শুধু প্রতিদিনই নয়, অনেকবার নয়, বরং আপনার চলার পথে প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি কাজে নিয়তগুলোকে নবায়ন করুন। যখন আপনি কোনো কথা বলেন, যখন কোনো কিছু টাইপ করছেন, যখন আপনি দাওয়ার কাজে যান, যে-কোনো সময় আপনার নিয়তকে নবায়ন করুন। যখন পরবর্তীতে কোনো বিপর্যয় আপনাকে আঘাত করবে, এভাবেই আপনি ধৈর্যধারণ করার শক্তি অর্জন করবেন। যখন আপনি জীবনের কঠিন সময় পার করছেন এবং অন্যান্যরা আপনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন আপনি কি মনে করেন যে, আল্লাহর আগে কেউ আপনাকে সাহায্য করবে?
'সেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নি ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। ১২৮ যদি তারা আপনাকে দুনিয়াতে সহায়তা না করে, তবে আপনি কীভাবে আশা করতে পারেন যে, তারা আপনাকে পরকালে সহায়তা করবে?
আপনি যদি দুঃখ-কষ্টে আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন, আপনি সাহায্যের জন্য আল্লাহকে ছাড়া আর অন্য কাউকে খুঁজে পাবেন না। সত্যিই একমাত্র আল্লাহই আপনার কষ্ট থেকে পরিত্রাণের জন্য যথেষ্ট।
প্রশ্ন হলো, কীভাবে আল্লাহকে আপনার পাশে পাবেন? আপনি দাওয়াহর কাজ করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। কষ্ট ও দুর্ভোগগুলো আপনার দাওয়াতের পথে একের-পর-এক বাধার মতো হচ্ছে। যদি আপনার বিপদের সময় আল্লাহকে পেতে চান, তবে আপনি দুর্দশাগ্রস্ত হওয়ার পূর্বেই আপনার সকল কাজ শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যই করুন। জনসাধারণ, বন্ধু কিংবা কোনো মানুষকে সন্তুষ্ট করার জন্য নয়।
এটা কি আল্লাহর জন্য? এটা কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে? এটা কি ইসলামের শিক্ষার মধ্যে পড়ে? আমাদের জীবনের এমন অনেক সময় আসে যখন আমাদের বন্ধুরা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। যদি আপনাদের কথা বলতে দিতাম, তবে সারাদিনই আমাদের এখানে থাকতে হতো। কারণ প্রত্যেকেরই নিজস্ব কিছু গল্প আছে। আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনকে মূলমঞ্চে বা বক্তৃতায় এমনকি সামাজিক মাধ্যমে আনতে চাই না। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার থাকে এই গল্পগুলোতে যা অন্যান্য মুসলমানদের মাঝে সচেনতা গড়ে তোলে। তাই আমি যা জানি তা থেকে বলতে পারি যে, আমি কারাগারে যাওয়ার পূর্বে যারা আমার ছাত্র ছিল তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যারা আমাকে অনুসরণ করে না, যখন আমাকে কারাগারে নেওয়া হয়েছিল। তখন রমজান শেষ হতে আর দু-রাত বাকি। ইদুল ফিতর আসার দুই রাত আগে। রামাদানে করাগারে প্রথম রাতে আমি জাগ্রত হলাম আর দু'আ করতে লাগলাম। হে আল্লাহ আমার মাকে যে কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ সম্মান দান করুন। কারাগারে যাওয়ার পূর্বের রাতে আমার বাবা এবং আমি আমাদের এক ছাত্রের বাড়িতে ইফতারের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলাম। আহমাদ জিবরীল সেখানে গিয়েছিলেন। শায়েখ মুসাও সেখানে আমন্ত্রিত ছিলেন। সেখানে সবাই আমন্ত্রিত ছিলেন। আমরা সেখানে ছিলাম অনেক রাত পর্যন্ত। কারণ এটি খুব বড় একটি সমাগম ছিল এবং আমি সেখানে তারাবিহ নামাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। আমার অন্য এক জায়াগায় খতমে কুরআন করার কথা ছিল এবং এটি ছিল শেষ পারা যেটা আমি করতে যাচ্ছিলাম। ওই বাড়িতে অনেক মানুষের সমাগম থাকায় কুরআন খতমটি সেখানেই করলাম। আমার বাবা উপস্থিত লোকদের বলল, যদি আগামীকাল ইদ না হয় তবে আপনারা সবাই আমাদের বাড়িতে আমন্ত্রিত।
সবাই আমাদের বাড়িতে আমন্ত্রিত। আল্লাহ আমার বাবাকে উত্তম প্রতিদান দান করুক। তার কাজগুলো পূর্ণ করার জন্য তাকে দীর্ঘ জীবন দান করুক, আর আমার মাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুক। আমরা আশা করছিলাম যে, ১৫০ থেকে ২৫০ জনের মতো অতিথি আমাদের বাড়িতে আসতে পারে।
এমনকি কারাগারে যাওয়ার পূর্বে যখন আমি নিয়মিত আলোচনা করতাম, তখন বেশিরভাগ সময়েই গাড়িতে করে যেতাম। আমার মনে আছে, তারা বিবাদে জড়িয়ে যেত আমার পাশে কে বসবে তা নিয়ে। এমন হত ভাইয়েরা আমাকে বলতে আসত যে, আপনি গাড়িতে যাবেন আর কে গাড়িটি চালাবে তা নিয়ে বিবাদ করছে। ওয়াল্লাহি, ওয়াল্লাহি, এটা অনেকবার ঘটেছে।
আমাকে বলতে দিন, যখন আমি কোর্টে জবাবদিহির জন্য যাচ্ছিলাম। কোর্ট রুমটি পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কাঁধ থেকে কাঁধে। কিন্তু সেখানে আমি আর আমার বাবা ছাড়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এর প্রতি কোনো বিশ্বাসী ছিল না।
এফ বি আই এর প্রসিকিউটরস, সকল সরকারি লোক, কাউন্টার টেরোরিজম অফিসার, প্রতিটি এজেন্সির প্রতিনিধিরা সেখানে ছিল। আমার আইনজীবী বললেন, এই লোকগুলো তোমাকে সত্যিই ঘৃণা করে। আমি এর আগে কারো সাথে এমন করতে দেখিনি।
কারণ, যখন সেখানে দর্শক থাকে তখন বিচারকদের ওপর প্রভাব পড়ে। কারণ আপনি জানেন যে, তারা কীভাবে বিচার করবেন। আপনাকে একটি উচ্চতর সাজা দিতে সাধারণত বিচারকের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করছে। আইনজীবী বললেন, আমি তাদের আগে কখনো এই জাতীয় শাস্তিতে অংশ নিতে দেখিনি। তারা সত্যিই আপনাকে ঘৃণা করে।
আপনার সেই অনুসারীরা যারা আপনার পাশে আছে বলে দাবি করে, তারা সবাই কোথায়? পুরানো দিনগুলোতে আমাদের বাড়ির ওপরের অংশটি সপ্তাহের ৭টি দিনের ২৪ ঘণ্টা ছাত্রদের জন্য খোলা থাকত। আমি এটি বলছি শুধুমাত্র শিক্ষার জন্য বা অভিজ্ঞতার জন্য। অন্যকিছুর জন্য নয় এবং ওই দিনগুলোতে আমি দেখেছিলাম আমাদের বাড়িতে একটি পুরানো কফি মেশিন ছিল। এটি ছিল বাণিজ্যিক। কারণ, বাড়িতে সব সময় মেহমান থাকত বলে ছোটো কফি মেশিনটি দিয়ে কাজ করা যেত না। ওয়াল্লাহি, আমাদের বাড়িটিকে মানুষ বলত, 'এজেস ইলম ক্যাফে'। মানুষ এখানে আসত, যেত, শেখাত, শিখত, দাওয়ার কাজ করত অবিরাম। আল্লাহ আমার মাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুক। আমার মা এই সময়গুলো একাকী দাঁড়িয়ে থাকত। খাবার সরবরাহ করা, প্রদান করা, খাবারের সন্ধান করা, রান্না করা, কফি বানানো এসব মা একাই করতেন। পুরনো দিনগুলো আমার মনে আছে। আমি যেন আজও দেখতে পাচ্ছি ভাইয়েরা যারা আমার অনুসরণ করত, বাথরুমে যাওয়ার পথটাতেও তারা বসত। চিন্তা করুন, মানুষজন বাথরুমে যাওয়ার পথটাতেও বসত। যে বিচারক আমার মামলাটি তদারকি করছিলেন, তিনি প্রায় পাঁচ ফুটের মতো, দেখতে খুব খাটো। শিক্ষার বিষয় হলো, এই পাঁচ ফুট বিচারকের সামনে যদি সমর্থন করার জন্য কেউ না দাঁড়ায়, আপনি কি মনে করেন যখন সকল আদালতের আদালতে আপনি থাকবেন তখন আপনাকে কেউ সমর্থন করবে?
দুনিয়া ও আখেরাতের সকল মালিকানা ও অধিকার যেই সত্বার হাতে তার সামনে কীভাবে দাঁড়াবে? যদি তারা পাঁচ ফুট লম্বা এই বিচারকের সামনে দাঁড়াতে না পারে? তাহলে কিভাবে তারা মহামহিয়ান আল্লাহর সামনে দাড়াবে?
সুতরাং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আপনার নিয়তগুলোকে নবায়ন করুন। এটাই এর শিক্ষা। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেকে প্রশ্ন করুন, এটা কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য উপযুক্ত? অনেক লোকসমাগমের মাঝেও যখন প্রচন্ড বিপদ আসবে তখন সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। আর তখনো আপনার পাশে একমাত্র মহান আল্লাহকেই পাবেন। সুতরাং ওইরকম বিপদগ্রস্থ সময় আসার আগেই নিজেকে প্রশ্ন করুন। আপনি কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারছেন? যদি আপনি আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখেন তবে বিপদের সময়ে আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করবেন। এটির অন্যতম সেরা একটি উপায় হলো কঠোর সময়ে ধৈর্যধারণ করা। ইয়া আল্লাহ! আপনার কসম আমি সর্বদা এটা করছি, এটাই হলো অভিপ্রায়ের গুরুত্ব।
টিকাঃ
[১২৮] সুরা আবাসা: ৩৪-৩৬।