📄 লাইলাতুল কদরের জন্য উপদেশ
লাইলাতুল কদর তথা ভাগ্য রজনী সম্পর্কে জানার পর আমাদের কী করা উচিত? আপনি যদি লাইলাতুল কদর পেতে চান, তাহলে গত পর্বগুলোতে আমরা যা উল্লেখ করেছি তার সবকিছুই করতে সচেষ্ট হবেন। নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, জিকির সাধ্যমতো করার চেষ্টা করবেন। লাইলাতুল কদরের জন্য একটি বিশেষ দু'আ আছে। কদরের রাতে এই দু'আটি বেশি বেশি করে পড়তে হবে। বিশেষ করে রামাদানের শেষ দশ রাতের কোন একটি রাত হচ্ছে লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত। বিশেষ করে বেজোড় রাত্রিগুলোর মধ্যে যে-কোনো একটি রাত। দু'আটি কী? দু'আটি হলো,
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
'হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল ও ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন। ১২২
এখানে ক্ষমা করা অর্থে 'গাফুর' শব্দটি ব্যবহার না করে 'আফুয়্যুন' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও শব্দ দুটি একই। প্রশ্ন হলো তাহলে আফুয়্যুন ব্যবহার করা হলো কেন? অর্থগত বিশ্লেষণ করলে আমরা পাই যে, আরবরা সাধারণত মুছে ফেলা অর্থে আফুয়্যুন শব্দটি ব্যবহার করে। যেমন, মরুভূমি থেকে পায়ের চিহ্ন চলে গেলে তারা (আরবরা) আফুয়্যুন বলে থাকে, এর অর্থ হলো এটা তো মুছে গেছে।
এটা থেকে আমরা সহজভাবে এর অর্থটা বুঝতে পারব। এই দুটি শব্দের মধ্যে পার্থক্য কী? উলামাগণ এই দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করেছেন।
কেউ কেউ বলেন যে, ফরজ ইবাদত ছেড়ে দেওয়ার পর যদি ক্ষমা করা হয়, তখন আফুয্যুন শব্দটি ব্যবহার করা হয়। আর হারাম কাজ করার পর ক্ষমা করলে গফুর শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বিশদভাবে বর্ণিত আরো একটি মত আছে। কারো কারো মতে আল্লাহ তাআলার মাগফিরাতের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কিন্তু আপনার গুনাহুগুলো লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। বিচার দিবসের আগ পর্যন্ত সেগুলো মুছে ফেলা হবে না।
আল্লাহ তার বান্দাকে নিজের সান্নিধ্যে আনতে থাকেন আর তাকে প্রশ্ন করতে থাকেন। 'তুমি কি নিজের প্রতি ওই গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারো?' বান্দা বলবে, 'হ্যাঁ, পারি।' আল্লাহ আবার জিজ্ঞেস করবেন, 'তুমি কি ওই গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারো?' বান্দা আবারো বলবে, 'হ্যাঁ, পারি।' এভাবে বান্দা যখন তার কৃত সকল গুনাহের কথা স্বীকার করবে, তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, 'আমি ইহকালে তোমার এই গুনাহগুলোকে গোপন রেখেছিলাম। আর তারপর তা ক্ষমা করে দিয়েছি।'
উলামাগণ এ ধরনের ক্ষমাকে মাগফিরাত বলে থাকেন। তাহলে আফুয়্যুন কী? আফুয়্যুন এর চেয়েও মর্যাদাসম্পন্ন ক্ষমা। আমরা এমন ক্ষমাই পেতে চাই। 'আফুয়্যুন' হলো যখন আল্লাহ তাআলা আপনার গুনাহগুলোকে ক্ষমা করে দেওয়ার পর তা সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলেন। এমনকি বিচার দিবসেও এসব গুনাহ সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞাসা করা হবে না। এছাড়া আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দা ও ফেরেশতাদেরকেও ওইসকল গুনাহগুলোর কথা ভুলিয়ে দেন। যেন বিচার দিবসেও আপনাকে আপনার গুনাহের জন্য অপমানিত হতে না হয়। মানুষ তার পাপ কর্মের জন্য যখন একেবারে মন থেকে ক্ষমা চায়, তখন আল্লাহ অত্যন্ত খুশি হয়ে এ ধরনের ক্ষমা করেন।
আফুয়্যুন শব্দটি পবিত্র কুরআনে অনেকবার এসেছে, এর মধ্যে পাঁচবার শব্দটি 'কাদির' তথা আল্লাহ সর্বশক্তিমান কথাটির সাথে উল্লেখ এসেছে। অর্থাৎ আল্লাহ চাইলেই শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু তবুও তিনি ক্ষমা করে দেন।
إِنْ تُبْدُوا خَيْرًا أَوْ تُخْفُوهُ أَوْ تَعْفُوا عَنْ سُوءٍ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًا قَدِيرًا
'তোমরা যদি কল্যাণ করো প্রকাশ্যভাবে কিংবা গোপনে অথবা যদি তোমরা অপরাধ ক্ষমা করে দাও, তবে জেনে রেখো আল্লাহ নিজে ক্ষমাকারী, মহান শক্তিশালী। '১২৩
আফুয়্যুন ও গফুর শব্দটি কুরআনে সম্মিলিতভাবেও এসেছে। সম্ভবত এটা দেখানোর জন্য যে, আপনি মাগফিরাত চাইলে আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু আপনি যদি আরো অগ্রসর হন এবং কঠোর প্রচেষ্টা করেন, তাহলে আফুয্যুন পাবেন। যার ফলে আপনার সব গুনাহ সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া হবে। যে-কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেই বোঝা যায় যে, আফুয়্যুন হচ্ছে গুফরান এর বিস্তৃত রূপ। যার জন্য পুরস্কারের পরিমাণও অনেক বেশি হবে। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন এবং সম্মানজনক ক্ষমা। খেয়াল করলে পবিত্র কুরআনুল কারিমে দেখা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা যখন সবচেয়ে গুরুতর গুনাহগুলো মাফ করে দেন বা মানুষকে অন্যদের কোনো গুরুতর ব্যাপারে মাফ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন, তখন আফুয়্যুন শব্দটি ব্যবহার করেন। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় যে, মুসা আ. এর সম্প্রদায় যখন বাছুরকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছিল, এরপর আল্লাহ তাআলা যখন তাদের এমন নিকৃষ্ট গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিলেন তখন তিনি আফুয়্যুন শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আল্লাগ তাআলা বলেন,
وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَى أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ
'আর যখন আমি মুসার সাথে চল্লিশ রাতের ওয়াদা করেছিলাম, তারপর তোমরা তার অনুপস্থিতিতে বাছুর বানিয়ে নিয়েছিলে, তোমরা ছিলে জালিম। '১২৪
ثُمَّ عَفَوْنَا عَنكُم مِّن بَعْدِ ذَلِكَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
যখন আল্লাহ তাআলা তাদের ক্ষমা করে দেন। তখন তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নাও। '১২৫
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা আফুয়্যুন শব্দটি ব্যবহার করেছেন গফুর নয়। এমনকি তাবুক যুদ্ধে কুরআন তেলাওয়াতকারীদের যারা বিদ্রুপ করেছে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ إِنْ نَّعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِين
'তোমরা এখন ওজর পেশ করো না। একবার ইমান আনার পর তোমরা পুনরায় কাফের হয়ে গিয়েছিলে। তোমাদের মধ্যে আমি কোনো দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দেবই। কেননা তারা ছিল অপরাধী।' ১২৬
উপরোক্ত আয়াতে 'আফুয়্যুন' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে গাফুর নয়। কারণ ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান রীতিনীতি নিয়ে উপহাস ও বিশ্বাসীদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা একটি জঘন্য অপরাধ। ইসলামে যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করাও একটি গুরুতর অপরাধ। এই সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ تَوَلَّوْا مِنْكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ إِنَّمَا اسْتَزَلَّهُمُ الشَّيْطَانُ بِبَعْضِ مَا كَسَبُوا وَلَقَدْ عَفَا اللَّهُ عَنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ
'দুটি বাহিনী যখন সম্মুখ সমরে একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল, নিঃসন্দেহে সেদিন যারা ময়দান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের একাংশের অর্জিত কাজের জন্য শয়তান-ই তাদের পদস্খলন ঘটিয়ে দিয়েছিল। অতঃপর তারা অনুতপ্ত হলে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিলেন। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম ধৈর্যশীল।' ১২৭
যেহেতু এগুলো সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ। তাই আল্লাহ তাআলা এখানে গাফুরের পরিবর্তে আফা শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আমরাও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে এই সর্বোচ্চ সম্মানজনক ক্ষমাই পেতে চাই এবং আমাদের উচিত সেটাই পাওয়ার চেষ্টা করা।
টিকাঃ
[১২২] সুনানে বাইহাকি: ৩৪২৬। সনদ: সহিহ।
[১২৩] সুরা নিসা: ১৪৯।
[১২৪] সুরা আল বাকারা: ৫১।
[১২৫] সুরা আল বাকারা: ৫২।
[১২৬] সুরা আত তাওবা: ৬৬।
[১২৭] সুরা আল ইমরান: ১৫৫
📄 অভিপ্রায়ের গুরুত্ব
আপনার প্রতিজ্ঞাগুলো নবায়ন করুন, প্রতিদিন আপনার প্রতিজ্ঞাগুলোকে নবায়ন করুন। শুধু প্রতিদিনই নয়, অনেকবার নয়, বরং আপনার চলার পথে প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি কাজে নিয়তগুলোকে নবায়ন করুন। যখন আপনি কোনো কথা বলেন, যখন কোনো কিছু টাইপ করছেন, যখন আপনি দাওয়ার কাজে যান, যে-কোনো সময় আপনার নিয়তকে নবায়ন করুন। যখন পরবর্তীতে কোনো বিপর্যয় আপনাকে আঘাত করবে, এভাবেই আপনি ধৈর্যধারণ করার শক্তি অর্জন করবেন। যখন আপনি জীবনের কঠিন সময় পার করছেন এবং অন্যান্যরা আপনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন আপনি কি মনে করেন যে, আল্লাহর আগে কেউ আপনাকে সাহায্য করবে?
'সেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নি ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। ১২৮ যদি তারা আপনাকে দুনিয়াতে সহায়তা না করে, তবে আপনি কীভাবে আশা করতে পারেন যে, তারা আপনাকে পরকালে সহায়তা করবে?
আপনি যদি দুঃখ-কষ্টে আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন, আপনি সাহায্যের জন্য আল্লাহকে ছাড়া আর অন্য কাউকে খুঁজে পাবেন না। সত্যিই একমাত্র আল্লাহই আপনার কষ্ট থেকে পরিত্রাণের জন্য যথেষ্ট।
প্রশ্ন হলো, কীভাবে আল্লাহকে আপনার পাশে পাবেন? আপনি দাওয়াহর কাজ করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। কষ্ট ও দুর্ভোগগুলো আপনার দাওয়াতের পথে একের-পর-এক বাধার মতো হচ্ছে। যদি আপনার বিপদের সময় আল্লাহকে পেতে চান, তবে আপনি দুর্দশাগ্রস্ত হওয়ার পূর্বেই আপনার সকল কাজ শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যই করুন। জনসাধারণ, বন্ধু কিংবা কোনো মানুষকে সন্তুষ্ট করার জন্য নয়।
এটা কি আল্লাহর জন্য? এটা কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে? এটা কি ইসলামের শিক্ষার মধ্যে পড়ে? আমাদের জীবনের এমন অনেক সময় আসে যখন আমাদের বন্ধুরা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। যদি আপনাদের কথা বলতে দিতাম, তবে সারাদিনই আমাদের এখানে থাকতে হতো। কারণ প্রত্যেকেরই নিজস্ব কিছু গল্প আছে। আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনকে মূলমঞ্চে বা বক্তৃতায় এমনকি সামাজিক মাধ্যমে আনতে চাই না। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার থাকে এই গল্পগুলোতে যা অন্যান্য মুসলমানদের মাঝে সচেনতা গড়ে তোলে। তাই আমি যা জানি তা থেকে বলতে পারি যে, আমি কারাগারে যাওয়ার পূর্বে যারা আমার ছাত্র ছিল তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যারা আমাকে অনুসরণ করে না, যখন আমাকে কারাগারে নেওয়া হয়েছিল। তখন রমজান শেষ হতে আর দু-রাত বাকি। ইদুল ফিতর আসার দুই রাত আগে। রামাদানে করাগারে প্রথম রাতে আমি জাগ্রত হলাম আর দু'আ করতে লাগলাম। হে আল্লাহ আমার মাকে যে কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ সম্মান দান করুন। কারাগারে যাওয়ার পূর্বের রাতে আমার বাবা এবং আমি আমাদের এক ছাত্রের বাড়িতে ইফতারের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলাম। আহমাদ জিবরীল সেখানে গিয়েছিলেন। শায়েখ মুসাও সেখানে আমন্ত্রিত ছিলেন। সেখানে সবাই আমন্ত্রিত ছিলেন। আমরা সেখানে ছিলাম অনেক রাত পর্যন্ত। কারণ এটি খুব বড় একটি সমাগম ছিল এবং আমি সেখানে তারাবিহ নামাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। আমার অন্য এক জায়াগায় খতমে কুরআন করার কথা ছিল এবং এটি ছিল শেষ পারা যেটা আমি করতে যাচ্ছিলাম। ওই বাড়িতে অনেক মানুষের সমাগম থাকায় কুরআন খতমটি সেখানেই করলাম। আমার বাবা উপস্থিত লোকদের বলল, যদি আগামীকাল ইদ না হয় তবে আপনারা সবাই আমাদের বাড়িতে আমন্ত্রিত।
সবাই আমাদের বাড়িতে আমন্ত্রিত। আল্লাহ আমার বাবাকে উত্তম প্রতিদান দান করুক। তার কাজগুলো পূর্ণ করার জন্য তাকে দীর্ঘ জীবন দান করুক, আর আমার মাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুক। আমরা আশা করছিলাম যে, ১৫০ থেকে ২৫০ জনের মতো অতিথি আমাদের বাড়িতে আসতে পারে।
এমনকি কারাগারে যাওয়ার পূর্বে যখন আমি নিয়মিত আলোচনা করতাম, তখন বেশিরভাগ সময়েই গাড়িতে করে যেতাম। আমার মনে আছে, তারা বিবাদে জড়িয়ে যেত আমার পাশে কে বসবে তা নিয়ে। এমন হত ভাইয়েরা আমাকে বলতে আসত যে, আপনি গাড়িতে যাবেন আর কে গাড়িটি চালাবে তা নিয়ে বিবাদ করছে। ওয়াল্লাহি, ওয়াল্লাহি, এটা অনেকবার ঘটেছে।
আমাকে বলতে দিন, যখন আমি কোর্টে জবাবদিহির জন্য যাচ্ছিলাম। কোর্ট রুমটি পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কাঁধ থেকে কাঁধে। কিন্তু সেখানে আমি আর আমার বাবা ছাড়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এর প্রতি কোনো বিশ্বাসী ছিল না।
এফ বি আই এর প্রসিকিউটরস, সকল সরকারি লোক, কাউন্টার টেরোরিজম অফিসার, প্রতিটি এজেন্সির প্রতিনিধিরা সেখানে ছিল। আমার আইনজীবী বললেন, এই লোকগুলো তোমাকে সত্যিই ঘৃণা করে। আমি এর আগে কারো সাথে এমন করতে দেখিনি।
কারণ, যখন সেখানে দর্শক থাকে তখন বিচারকদের ওপর প্রভাব পড়ে। কারণ আপনি জানেন যে, তারা কীভাবে বিচার করবেন। আপনাকে একটি উচ্চতর সাজা দিতে সাধারণত বিচারকের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করছে। আইনজীবী বললেন, আমি তাদের আগে কখনো এই জাতীয় শাস্তিতে অংশ নিতে দেখিনি। তারা সত্যিই আপনাকে ঘৃণা করে।
আপনার সেই অনুসারীরা যারা আপনার পাশে আছে বলে দাবি করে, তারা সবাই কোথায়? পুরানো দিনগুলোতে আমাদের বাড়ির ওপরের অংশটি সপ্তাহের ৭টি দিনের ২৪ ঘণ্টা ছাত্রদের জন্য খোলা থাকত। আমি এটি বলছি শুধুমাত্র শিক্ষার জন্য বা অভিজ্ঞতার জন্য। অন্যকিছুর জন্য নয় এবং ওই দিনগুলোতে আমি দেখেছিলাম আমাদের বাড়িতে একটি পুরানো কফি মেশিন ছিল। এটি ছিল বাণিজ্যিক। কারণ, বাড়িতে সব সময় মেহমান থাকত বলে ছোটো কফি মেশিনটি দিয়ে কাজ করা যেত না। ওয়াল্লাহি, আমাদের বাড়িটিকে মানুষ বলত, 'এজেস ইলম ক্যাফে'। মানুষ এখানে আসত, যেত, শেখাত, শিখত, দাওয়ার কাজ করত অবিরাম। আল্লাহ আমার মাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুক। আমার মা এই সময়গুলো একাকী দাঁড়িয়ে থাকত। খাবার সরবরাহ করা, প্রদান করা, খাবারের সন্ধান করা, রান্না করা, কফি বানানো এসব মা একাই করতেন। পুরনো দিনগুলো আমার মনে আছে। আমি যেন আজও দেখতে পাচ্ছি ভাইয়েরা যারা আমার অনুসরণ করত, বাথরুমে যাওয়ার পথটাতেও তারা বসত। চিন্তা করুন, মানুষজন বাথরুমে যাওয়ার পথটাতেও বসত। যে বিচারক আমার মামলাটি তদারকি করছিলেন, তিনি প্রায় পাঁচ ফুটের মতো, দেখতে খুব খাটো। শিক্ষার বিষয় হলো, এই পাঁচ ফুট বিচারকের সামনে যদি সমর্থন করার জন্য কেউ না দাঁড়ায়, আপনি কি মনে করেন যখন সকল আদালতের আদালতে আপনি থাকবেন তখন আপনাকে কেউ সমর্থন করবে?
দুনিয়া ও আখেরাতের সকল মালিকানা ও অধিকার যেই সত্বার হাতে তার সামনে কীভাবে দাঁড়াবে? যদি তারা পাঁচ ফুট লম্বা এই বিচারকের সামনে দাঁড়াতে না পারে? তাহলে কিভাবে তারা মহামহিয়ান আল্লাহর সামনে দাড়াবে?
সুতরাং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আপনার নিয়তগুলোকে নবায়ন করুন। এটাই এর শিক্ষা। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেকে প্রশ্ন করুন, এটা কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য উপযুক্ত? অনেক লোকসমাগমের মাঝেও যখন প্রচন্ড বিপদ আসবে তখন সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। আর তখনো আপনার পাশে একমাত্র মহান আল্লাহকেই পাবেন। সুতরাং ওইরকম বিপদগ্রস্থ সময় আসার আগেই নিজেকে প্রশ্ন করুন। আপনি কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারছেন? যদি আপনি আল্লাহকে সন্তুষ্ট রাখেন তবে বিপদের সময়ে আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করবেন। এটির অন্যতম সেরা একটি উপায় হলো কঠোর সময়ে ধৈর্যধারণ করা। ইয়া আল্লাহ! আপনার কসম আমি সর্বদা এটা করছি, এটাই হলো অভিপ্রায়ের গুরুত্ব।
টিকাঃ
[১২৮] সুরা আবাসা: ৩৪-৩৬।