📘 দু আর মহিমা > 📄 ভাগ্য রজনী (লাইলাতুল কদর)

📄 ভাগ্য রজনী (লাইলাতুল কদর)


রামাদানে আল্লাহ তার বান্দার জন্য অনেক সুযোগ তৈরী করে দেন যাতে বান্দা তার গুনাহগুলো মাফ করিয়ে নিতে পারে। লাইলাতুল কদর সেইসকল সুযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ইমানের সাথে সাওয়াবের আশা নিয়ে লাইলাতুল কদরে সালাত আদায় করবে, তার সমস্ত গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হবে।'

📘 দু আর মহিমা > 📄 লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব

📄 লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব


পবিত্র কুরআনে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে ৫টি আয়াতের একটি সম্পূর্ণ সুরা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তার নাম করণও করা হয়েছে 'সুরাতুল কদর নামে।' এছাড়া সুরা দুখানের শুরুতে প্রায় চার থেকে ছয়টি আয়াতে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বলা হয়েছে। সুতরাং এখানে রয়েছে পবিত্র কুরআনের প্রায় ১১টি আয়াত এবং পূর্ণাঙ্গ সুরা। যাতে সেই রাত তথা কদর বা ভাগ্য রজনী সম্পর্কে বলা হয়েছে।
এটি কোনো সাধারাণ রাত নয়। এটি এমন একটি রাত যে রাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমি কুরআনকে কদরের রাতে নাজিল করেছি।'১১৩ অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমি একে অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে।'১১৪
কেন এটিকে লাইলাতুল কদর বলা হয়? এর দুটি কারণ রয়েছে। অথবা দুটির কোন একটির কারণে এই রাতের নাম লাইলাতুল কদর রাখা হয়েছে। এক. এটির মূল শব্দ কদর। যার অর্থ মূল্য বা গুরুত্ব। ভাগ্য রজনী অত্যন্ত মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ তাই এর নাম রাখা হয়েছে লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত্র।
দ্বিতীয় কারণ হলো, কদর নিয়তি/ভাগ্য থেকে আসে। এর অর্থ হলো আপনার ভাগ্য ওই রাতে লিখা হয়।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, আপনি আমাদেরকে বিভ্রান্ত করছেন। আপনিই তো আমাদেরকে বলেছেন, আকাশ পৃথিবী তৈরির অনেক আগেই আমাদের ভাগ্য লেখা হয়েছে। কিন্তু এখন বলছেন এটি লাইলাতুল কদরে লেখা হয়। আপনি মনস্থির করুন। দেখুন কীভাবে এটি হয়? এটি আকাশ ও নভোমণ্ডল তৈরির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই লেখা হয়েছে এবং এই বিশেষ রাতে ওই বছরের কাজগুলো ফেরেশতাদের হাতে দেওয়া হয়।
যেমন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কারিমে বলেছেন,
فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ
'এ রাতে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থির করা হয়।'১১৫
পুরো বছরের জন্য কাজগুলো ফেরেশতাদের দেওয়া হয়। কারা এ বছর মৃত্যুবরণ করবে? কারা ধন-সম্পদ দ্বারা সমৃদ্ধ হবে, কারা দরিদ্র হবে এসব কিছু। এ রাতে ঘুমানোর কোনো সময় নেই। এ রাতে আপনার রিজিক লেখা হবে। ভালো খারাপ সবকিছু ফেরেশতাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তাই এ রাতে আল্লাহর রহমতের জন্য প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ
'আর তুমি কি জানো মহিমান্বিত রাত কী?'১১৬
যদি এমন হয় আমি মূল্যবান কোনোকিছু কিনে আনলাম। আর আপনি আমার কাছে সেই জিনিসটি চাইলেন। তখন আমি যদি বলি, আপনি কি জানেন এটার মূল্য কত? প্রশ্নটি শোনার সাথে সাথেই আপনার মনে হবে যে, জিনিসটির মূল্য সত্যিই খুব বেশি যা বর্ণনা করা যায় না।
ঠিক তেমনিভাবে লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব ও তার মর্জাদা অধিক হওয়ার কারনে আল্লাহ তাআলাও প্রশ্ন করেছেন যে, আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর কি? অর্থাৎ আপনি কি জানেন এ রাতে আপনি কি পেতে যাচ্ছেন? এর পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলে দিচ্ছেন,
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ
'কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।'১১৭
এ রাতের ইবাদত হাজার মাস অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাসের চেয়েও উত্তম। আমার ভাই ও বোনেরা! এটাই আপনাদের জন্য উত্তম রাত। সৌভাগ্য অর্জনের রাত। আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে ক্ষমা লাভের রাত।
যদি এমন প্রশ্ন করা হয় যে, কোনটি তোমার জীবনের শ্রেষ্ট রাত? তখন আপনি কি বলবেন? কেউ কেউ হয়তো বা বলবে তার বাসর রাত, কেউ হয়তো বলবে তার গ্রাজুয়েশনের রাত অথবা যে রাতে তাদের সন্তান জন্ম নিয়েছিল সেই রাত। এসব ভালো, খারাপ জিনিস নয়। কিন্তু এগুলো আপনার জীবনের শ্রেষ্ট রাত হতে পারে না। বরং আপনার জীবনের শ্রেষ্ট রাত হল লাইলাতুল কদরের রাত। কারণ এই এক রাতে আপনি আপনার গুনাহগুলো ক্ষমা করাতে পেরেছেন, হাজার মাস তথা ৮৩ বছর চার মাসের চেয়ে বেশী সময় ধরে নেক আমল করার সাওয়াব অর্জন করতে পেরেছেন। আচ্ছা এর চেয়েও উত্তম কোন রাত কি তোমার জীবনে আসতে পারে?
ওয়াল্লাহি, এটা আপনার জীবনের সবচেয়ে উত্তম রাত হওয়া উচিত। এ রাতে যদি আপনি আল্লাহর ইবাদতে কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করেন, তবে আপনি ৮৩.৩৩ বছর ইবাদতের সমান সওয়াব পাবেন। এ রাতে আপনি আল্লাহু আকবার, সুবহানাল্লাহ এবং আলহামদুলিল্লাহ বললে যেন হাজার মাস ধরে বিরতিহীনভাবে আল্লাহর জিকির করলেন। এ রাতে যদি আপনি কুরআন তিলাওয়াত করেন এবং তাওবা করেন তা যেন ৮৩.৩৩ বছর ধরেই তিলাওয়াত আর তাওবা করে গেলেন। এ রাতে যদি আপনি আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হন, তা যেন ৩০,০০০ দিন-ই আপনি আল্লাহ্র সামনে দণ্ডায়মান হলেন। আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর কি?
আল্লাহর কসম আমাকে বলুন, যে এ রাতের বরকত মিস করেছে সে কি নিজেই নিজেকে প্রতারিত করেনি? যে ব্যক্তি এই রাতটি বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ কাজে অতিবাহিত করে, সে কি নিজেই নিজের ওপর জুলুম করে না? আরামের ঘুমকে পরিহার করুন। অলসতায় সময় অতিবাহিত না করে বিশেষ করে এই রাতে নিজের পা দুটোকে দৃঢ় করে বিনয়ের সাথে আপনার মহান রবের সামনে দণ্ডায়মান হোন। আর ৮৩.৩৩ বছরের সমান পুণ্য অর্জন করুন। কোনো বোধশক্তি-সম্পন্ন মানুষের দ্বারা এ রাতের এই সেরা সুযোগ হারানো সম্ভব না।

সেই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ
এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। ১১৮
আয়াতে উল্লিখিত রূহ দ্বারা উদ্দেশ্য হল জিবরাইল আ.। অনেক হাদিস গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, এই পৃথিবীতে যে পরিমাণ পাথর কণা রয়েছে সে রাতে তার চেয়েও বেশিসংখ্যক ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং জিবরাইল আ.-ও তাদের সাথে পৃথিবীতে নেমে আসেন।
এত সুন্দর একটি বিষয়, আপনি কি কখনো তা কল্পনা করে দেখেছেন? এর মাধ্যমেই তো বোঝা যায় যে, এই রাতটি কত শান্তির। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পর জিবরাইল আ. পৃথিবীতে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। কদরের রাতটি এমন একটি বিশেষ রাত যে রাতে জিবরাইল আ. পৃথিবীতে নেমে আসেন। ফেরেশতাগণ ইবাদতের ক্ষেত্রে সেরাটাই ভালোবাসেন। তারা এমন ইবাদাতকারী যারা কখনো আল্লাহর আদেশ অমান্য করেন না।
لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
'তারা আল্লাহ তাআলা যা আদেশ করেন তা অমান্য করেন না এবং যা আদেশ করা হয় তাই পালন করেন। '১১৯
ফেরেশতাদের ইবাদতের জন্য রয়েছে বাইতুল মামুর। ফেরেশতাগণ সেখানে সকাল-সন্ধ্যা ইবাদতে মশগুল থাকেন। কিন্তু তবুও তারা ওই রাতে পৃথিবীতে নেমে আসেন।

টিকাঃ
[১১৩] সুরা কদর: ১।
[১১৪] সুরা আদ দুখান: ৩।
[১১৫] সুরা আদ দুখান: ৪।
[১১৬] সুরা কদর: ২।
[১১৭] সুরা কদর: ৩।
[১১৮] সুরা কদর-৪
[১১৯] সুরা তাহরীম:০৬

📘 দু আর মহিমা > 📄 কদরের রাতের কিছু নিদর্শন

📄 কদরের রাতের কিছু নিদর্শন


কদরের রাতটি হবে শান্তির রাত। প্রশান্তি হচ্ছে কদরের রাতের একটি নিদর্শন।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা একবার লাইলাতুল কদর নিয়ে আলোচনা করছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কথা শুনছিলেন। পরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা এ রাতকে মনে রাখবে তারা যেন এ রাতের চাঁদকে দেখে নেয়। যা দেখতে একটি থালার মতো হবে। অর্থাৎ ক্ষয় হয়ে যাওয়া চাঁদ। চাঁদ দেখতে হবে অর্ধেক থালার মতো।
উবাদা ইবনু সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, লাইলাতুল কদর হবে পরিষ্কার আর স্বচ্ছ একটি রাত। দেখে মনে হবে যেন সে রাতে একটি উজ্জ্বল চাঁদ উঠেছে। এই কথাটা খুব মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করুন। এখানে উজ্জ্বলতা চাঁদ থেকে আসবে না। বরং এই রাতটা স্বচ্ছ এবং উজ্জ্বল হবে ফেরেশতাদের দুনিয়াতে আসা যাওয়ার কারণে। আল্লাহ তাআলা সে রাতে নুর দিয়ে দেবেন। হাদিসটিতে আরো বলা হয়েছে, কদরের রাত হবে একটি শান্ত এবং প্রশান্তির রাত। যা না হবে খুব ঠান্ডা, না হবে খুব গরম। আর সে রাত ফজরের আগ পর্যন্ত আকাশে কোনো তারা খসবে না। এগুলো হলো লাইলাতুল কদরের কিছু নিদর্শন।
কোনো কোনো আলিমদের মতে সেই রাতের বাতাস হবে স্থির। এছাড়াও অনেকে বলেন যে, কদরের রাতে কোনো কুকুর ডাকবে না। কিন্তু এসব কথার কোনো প্রমাণ নেই।

প্রতি বছরই লাইলাতুল কদর সম্পর্কিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি বিখ্যাত হাদিস নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের বলতে যাচ্ছিলেন যে কোন রাতটি কদরের রাত। যাওয়ার পথে তিনি দুটি লোককে ঝগড়া করতে দেখলেন। আর লাইলাতুল কদর কবে তা তিনি ভুলে গেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাদেরকে বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছি। এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য রহমত এবং আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দয়া যে, লাইলাতুল কদর কবে তা তিনি আমাদের জানাননি। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত যে, তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভুলিয়ে দিয়েছেন এবং আমাদের তা জানানো থেকে বিরত রেখেছেন। কীভাবে এটা রহমত হতে পারে? হ্যাঁ, এটা রহমত। যদি আমরা একটি নির্দিষ্ট রাতকে লাইলাতুল কদর হিসেবে জানতাম তাহলে আমরা নিজেরাই পুরো রামাদানকে অবহেলা করতাম। শুধু ওই একটা রাতের জন্য অপেক্ষা করতাম। আর ওই রাতে অল্প কিছু ইবাদত করে ঘুমিয়ে পড়তাম। কিন্তু তিনি বলেছেন, এটা দশ রাতের মধ্যে যে-কোনো একটি রাত। এর ফলে আমরা এই দশ রাতে অনেক বেশি সওয়াব অর্জন করতে পারি। এরপর আবার এটাকে ওই দশ রাতের এক বেজোড় রাতে বলে দিয়েছেন। এভাবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাতটিকে নিয়ে না এসে যদি বলা হত বছরের ৩৬৫ রাতের মধ্যে যে-কোনো রাতেই লাইলাতুল কদর হতে পারে। তবুও এই রাতটিতে ইবাদতের আশায় সাড়া বছর প্রত্যেক রাতে ইবাদত করা উচিত ছিল। কারন এই একটা রাতে আপনি যা আমল করবেন, যতটুকু করবেন সেটার জন্য আপনি ৩০ হাজার রাতের প্রতিদান পাবেন। আল্লাহ মাত্র ৫ রাতের কমিয়ে এনে আমাদের ওপর রহম করেছেন। আল্লাহ এটাকে শুধু রামাদান মাসেই কমিয়ে এনেছেন, এরপর রামাদানের শেষ দশদিনের বেজুর রাত্রির কোন এক রাতে।

একটা উদাহরণের দিকে লক্ষ করুন। আমি যদি বলি, আমি একটি কাগজের টুকরোর মধ্যে কোনো একটা তারিখ লিখে রাখব এবং সেটা লুকিয়ে রাখব, আর আমার লেখা ওই তারিখে কেউ যদি আমাকে এক টাকা দেয়, তাহলে এর বিনিময়ে আমার কাছ থেকে সে ৩০ হাজার টাকা পাবে। এ কথা শুনে যে-কোনো বুদ্ধিসম্পন্ন লোক কি করবে? কেউ যদি বোকাও হয় তবুও সে ৩৬৫ দিনের জন্য ৩৬৫ টাকা সংগ্রহ করবে। এরপর প্রতিদিন আমাকে এক টাকা করে দেবে। কারণ সে জানে এটা করলে সে ৩০,০০০ টাকা পাবে। কিন্তু এই কয়েক শত টাকার বিনিময়ে সে কি অর্জন করবে? ৩০,০০০ টাকা! এটাই হলো লাইলাতুল কদর। ৫টি বেজোড় রাতের কোনো এক রাতে আপনি যে কাজ করবেন তার জন্য ৩০,০০০ রাতের সমান প্রতিদান পাবেন।
আল্লাহর সাথে কৃপণতা করবেন না। হতে পারে এ রাতে আপনি যে বিপুল পরিমাণ সওয়াব অর্জন করবেন, সেটাই আপনাকে আপনার আখিরাতে সাফল্য এনে দেবে। হতে পারে আপনাকে আপনার আমলনামা ডান হাতে এনে দেবে। আর তখন আপনি আপনার পরিবারের কাছে দৌড়ে গিয়ে বলবেন,
'এই নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখো'। ১২১

টিকাঃ
[১২০] সুরা কদর: ০৫
[১২১] সুরা আল হাক্কাহ: ১৯।

📘 দু আর মহিমা > 📄 লাইলাতুল কদরের জন্য উপদেশ

📄 লাইলাতুল কদরের জন্য উপদেশ


লাইলাতুল কদর তথা ভাগ্য রজনী সম্পর্কে জানার পর আমাদের কী করা উচিত? আপনি যদি লাইলাতুল কদর পেতে চান, তাহলে গত পর্বগুলোতে আমরা যা উল্লেখ করেছি তার সবকিছুই করতে সচেষ্ট হবেন। নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, জিকির সাধ্যমতো করার চেষ্টা করবেন। লাইলাতুল কদরের জন্য একটি বিশেষ দু'আ আছে। কদরের রাতে এই দু'আটি বেশি বেশি করে পড়তে হবে। বিশেষ করে রামাদানের শেষ দশ রাতের কোন একটি রাত হচ্ছে লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত। বিশেষ করে বেজোড় রাত্রিগুলোর মধ্যে যে-কোনো একটি রাত। দু'আটি কী? দু'আটি হলো,
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
'হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল ও ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন। ১২২
এখানে ক্ষমা করা অর্থে 'গাফুর' শব্দটি ব্যবহার না করে 'আফুয়্যুন' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও শব্দ দুটি একই। প্রশ্ন হলো তাহলে আফুয়্যুন ব্যবহার করা হলো কেন? অর্থগত বিশ্লেষণ করলে আমরা পাই যে, আরবরা সাধারণত মুছে ফেলা অর্থে আফুয়্যুন শব্দটি ব্যবহার করে। যেমন, মরুভূমি থেকে পায়ের চিহ্ন চলে গেলে তারা (আরবরা) আফুয়্যুন বলে থাকে, এর অর্থ হলো এটা তো মুছে গেছে।
এটা থেকে আমরা সহজভাবে এর অর্থটা বুঝতে পারব। এই দুটি শব্দের মধ্যে পার্থক্য কী? উলামাগণ এই দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করেছেন।
কেউ কেউ বলেন যে, ফরজ ইবাদত ছেড়ে দেওয়ার পর যদি ক্ষমা করা হয়, তখন আফুয্যুন শব্দটি ব্যবহার করা হয়। আর হারাম কাজ করার পর ক্ষমা করলে গফুর শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বিশদভাবে বর্ণিত আরো একটি মত আছে। কারো কারো মতে আল্লাহ তাআলার মাগফিরাতের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কিন্তু আপনার গুনাহুগুলো লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। বিচার দিবসের আগ পর্যন্ত সেগুলো মুছে ফেলা হবে না।
আল্লাহ তার বান্দাকে নিজের সান্নিধ্যে আনতে থাকেন আর তাকে প্রশ্ন করতে থাকেন। 'তুমি কি নিজের প্রতি ওই গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারো?' বান্দা বলবে, 'হ্যাঁ, পারি।' আল্লাহ আবার জিজ্ঞেস করবেন, 'তুমি কি ওই গুনাহের কথা স্মরণ করতে পারো?' বান্দা আবারো বলবে, 'হ্যাঁ, পারি।' এভাবে বান্দা যখন তার কৃত সকল গুনাহের কথা স্বীকার করবে, তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, 'আমি ইহকালে তোমার এই গুনাহগুলোকে গোপন রেখেছিলাম। আর তারপর তা ক্ষমা করে দিয়েছি।'
উলামাগণ এ ধরনের ক্ষমাকে মাগফিরাত বলে থাকেন। তাহলে আফুয়্যুন কী? আফুয়্যুন এর চেয়েও মর্যাদাসম্পন্ন ক্ষমা। আমরা এমন ক্ষমাই পেতে চাই। 'আফুয়্যুন' হলো যখন আল্লাহ তাআলা আপনার গুনাহগুলোকে ক্ষমা করে দেওয়ার পর তা সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলেন। এমনকি বিচার দিবসেও এসব গুনাহ সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞাসা করা হবে না। এছাড়া আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দা ও ফেরেশতাদেরকেও ওইসকল গুনাহগুলোর কথা ভুলিয়ে দেন। যেন বিচার দিবসেও আপনাকে আপনার গুনাহের জন্য অপমানিত হতে না হয়। মানুষ তার পাপ কর্মের জন্য যখন একেবারে মন থেকে ক্ষমা চায়, তখন আল্লাহ অত্যন্ত খুশি হয়ে এ ধরনের ক্ষমা করেন।

আফুয়্যুন শব্দটি পবিত্র কুরআনে অনেকবার এসেছে, এর মধ্যে পাঁচবার শব্দটি 'কাদির' তথা আল্লাহ সর্বশক্তিমান কথাটির সাথে উল্লেখ এসেছে। অর্থাৎ আল্লাহ চাইলেই শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু তবুও তিনি ক্ষমা করে দেন।
إِنْ تُبْدُوا خَيْرًا أَوْ تُخْفُوهُ أَوْ تَعْفُوا عَنْ سُوءٍ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًا قَدِيرًا
'তোমরা যদি কল্যাণ করো প্রকাশ্যভাবে কিংবা গোপনে অথবা যদি তোমরা অপরাধ ক্ষমা করে দাও, তবে জেনে রেখো আল্লাহ নিজে ক্ষমাকারী, মহান শক্তিশালী। '১২৩
আফুয়্যুন ও গফুর শব্দটি কুরআনে সম্মিলিতভাবেও এসেছে। সম্ভবত এটা দেখানোর জন্য যে, আপনি মাগফিরাত চাইলে আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু আপনি যদি আরো অগ্রসর হন এবং কঠোর প্রচেষ্টা করেন, তাহলে আফুয্যুন পাবেন। যার ফলে আপনার সব গুনাহ সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া হবে। যে-কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেই বোঝা যায় যে, আফুয়্যুন হচ্ছে গুফরান এর বিস্তৃত রূপ। যার জন্য পুরস্কারের পরিমাণও অনেক বেশি হবে। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন এবং সম্মানজনক ক্ষমা। খেয়াল করলে পবিত্র কুরআনুল কারিমে দেখা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা যখন সবচেয়ে গুরুতর গুনাহগুলো মাফ করে দেন বা মানুষকে অন্যদের কোনো গুরুতর ব্যাপারে মাফ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন, তখন আফুয়্যুন শব্দটি ব্যবহার করেন। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় যে, মুসা আ. এর সম্প্রদায় যখন বাছুরকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছিল, এরপর আল্লাহ তাআলা যখন তাদের এমন নিকৃষ্ট গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিলেন তখন তিনি আফুয়্যুন শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আল্লাগ তাআলা বলেন,
وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَى أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ
'আর যখন আমি মুসার সাথে চল্লিশ রাতের ওয়াদা করেছিলাম, তারপর তোমরা তার অনুপস্থিতিতে বাছুর বানিয়ে নিয়েছিলে, তোমরা ছিলে জালিম। '১২৪
ثُمَّ عَفَوْنَا عَنكُم مِّن بَعْدِ ذَلِكَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
যখন আল্লাহ তাআলা তাদের ক্ষমা করে দেন। তখন তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নাও। '১২৫
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা আফুয়্যুন শব্দটি ব্যবহার করেছেন গফুর নয়। এমনকি তাবুক যুদ্ধে কুরআন তেলাওয়াতকারীদের যারা বিদ্রুপ করেছে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ إِنْ نَّعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِين
'তোমরা এখন ওজর পেশ করো না। একবার ইমান আনার পর তোমরা পুনরায় কাফের হয়ে গিয়েছিলে। তোমাদের মধ্যে আমি কোনো দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দেবই। কেননা তারা ছিল অপরাধী।' ১২৬
উপরোক্ত আয়াতে 'আফুয়্যুন' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে গাফুর নয়। কারণ ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান রীতিনীতি নিয়ে উপহাস ও বিশ্বাসীদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা একটি জঘন্য অপরাধ। ইসলামে যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করাও একটি গুরুতর অপরাধ। এই সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ تَوَلَّوْا مِنْكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ إِنَّمَا اسْتَزَلَّهُمُ الشَّيْطَانُ بِبَعْضِ مَا كَسَبُوا وَلَقَدْ عَفَا اللَّهُ عَنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ
'দুটি বাহিনী যখন সম্মুখ সমরে একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল, নিঃসন্দেহে সেদিন যারা ময়দান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের একাংশের অর্জিত কাজের জন্য শয়তান-ই তাদের পদস্খলন ঘটিয়ে দিয়েছিল। অতঃপর তারা অনুতপ্ত হলে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিলেন। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম ধৈর্যশীল।' ১২৭
যেহেতু এগুলো সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ। তাই আল্লাহ তাআলা এখানে গাফুরের পরিবর্তে আফা শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আমরাও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে এই সর্বোচ্চ সম্মানজনক ক্ষমাই পেতে চাই এবং আমাদের উচিত সেটাই পাওয়ার চেষ্টা করা।

টিকাঃ
[১২২] সুনানে বাইহাকি: ৩৪২৬। সনদ: সহিহ।
[১২৩] সুরা নিসা: ১৪৯।
[১২৪] সুরা আল বাকারা: ৫১।
[১২৫] সুরা আল বাকারা: ৫২।
[১২৬] সুরা আত তাওবা: ৬৬।
[১২৭] সুরা আল ইমরান: ১৫৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00