📘 দু আর মহিমা > 📄 দু‘আর ফলে

📄 দু‘আর ফলে


একবার বাগদাদের জনসাধারণ খলিফা আল মুতাসিমের কাছে অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিল। মুতাসিম তার সেনাবাহিনীতে তুর্কি সেনাদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। যারা পুরো বাগদাদে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা ছিল কঠোর প্রকৃতির। সাধারণ জনসাধারণদের অনেক নির্যাতন করত তারা। বাগদাদের লোকজন তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মুতাসিমের নিকট একজন প্রতিনিধি পাঠাল। এই প্রতিনিধি ছিল একজন আলেম ইমাম ও শায়েখ। যখন তিনি আল মুতাসিমের নিকট গিয়ে বললেন, আপনার সৈন্যদের দমন করুন তা না হলে আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। মুতাসিম হেসে বললেন, তুমি আমার বিরুদ্ধে লড়তে চাও? অথচ আমার নিকট ৮০ হাজার সশস্ত্র সৈন্য আছে। প্রতিনিধি বলেছিল, হ্যাঁ আমরা আপনার বিরুদ্ধে রাত্রিবেলার তির দিয়ে লড়ব। (সালাতুল তাহাজ্জুদকে বলা হয় রাত্রিবেলার তির।) মুতাসিম একজন অত্যাচারী শাসক হওয়া সত্ত্বেও তিনি বলেছিলেন, আমি এ ভয়ংকর তিরের মুখোমুখি হতে পারব না। মুতাসিম বাগদাদ থেকে সামারা চলে গেল। মুতাসিম ছিল ওইসব জালিমদের মধ্যে অন্যতম যারা আহমদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহকে অত্যাচার করেছিল। কিন্তু এত ক্ষমতা ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও মুতাসিম জানত যে, লোকেরা তাকে যেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়েছে, তাকে প্রতিহত করার কোন শক্তি তার নেই।
সে একজন শক্তিশালী ও জালিম বাদশাহ হয়েও বুঝতে পেরেছিল যে, আল্লাহর নিকট তার বান্দার দু'আ কত শক্তিশালী আর ধারালো অস্ত্র।
এই তির অত্যাচার নির্যাতনের কতশত মেঘ আকাশ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, কত অত্যাচারীকে ধ্বংস করেছিল, কত অত্যাচারী শাসককে প্রতিহত করেছিল। হাজ্জাজ কর্তৃক সাইদ ইবনু আল মুসাইবকে হত্যার খবর যখন হাসান বসরির কাছে পৌঁছালো তিনি তার দু-হাত তুলে হাজ্জাজকে বদদু'আ করলেন। এই দু'আর পর হাজ্জাজ আর এক দিনও বেঁচেছিল না।
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'মজলুম এর দু'আকে ভয় করো যদি সে কাফিরও হয়। কারণ তার দু'আ এবং আল্লাহ তাআলার মাঝে কোনো পার্থক্য থাকে না'।
একজন কাফিরের ক্ষেত্রে যদি এটা প্রযোজ্য হয়। তাহলে চিন্তা করুন তো, একজন মুজাহিদের কথা, যার কপাল আল্লাহর প্রতি নত হয়, তার দু'আর ফল কি হতে পারে?

📘 দু আর মহিমা > 📄 জালিম নেতার ভয়ংকর পরিণতি

📄 জালিম নেতার ভয়ংকর পরিণতি


আব্বাসী খিলাফতের সময়ে ১৯৬ হিজরিতে আব্দুল্লাহ ইবনু আখলাব নামে আফ্রিকায় একজন নেতা ছিল। যে ছিল একজন অহংকারী ও স্বৈরাচারী শাসক। তিনি মন্দ স্বভাবের লোক ছিল। ওই সময়ে আফ্রিকায় হাফস ইবনু হুমাইদ নামে একজন বড় ইমাম ছিলেন। তিনি নেতার কাছে গেলেন এবং বললেন, আল্লাহকে ভয় করুন। আপনার যৌবন ও চেহারার প্রতি একটু দয়া করুন। (সুন্দর চেহারা এবং শারিরিক গঠন এবং শক্তির জন্য মানুষের কাছে তার একটা সুনাম ছিল।) আপনি অত্যাধিক কর আরোপ করা বন্ধ করুন এবং কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত করুন। এরপর সে আগের চেয়ে আরো বেশী অহংকারী এবং উদ্ধত হয়ে পড়ল। মানুষের প্রতি অত্যাচার করা এবং করের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিলো। শায়েখ হাফস ইবনু হুমাইদ জনসাধারণের নিকট ফিরে এসে বললেন, আমি সেই নেতার প্রতি হতাশ হলাম কিন্তু আমি আল্লাহর রহমতের প্রতি হতাশ নই। আজকে এশা থেকে ফজর পর্যন্ত আমরা প্রত্যেকে দু'আ করব। আজকে এশা থেকে ফজর পর্যন্ত জিহ্বার জড়তা দূর করে ফেলব। মানুষজন তাদের মসজিদ এবং তাদের বাড়িতে জড়ো হতে লাগল। সবাই ওজু করে এশা থেকে ফজর পর্যন্ত দু'আ করল। হে আল্লাহ! তুমি তাকে ধ্বংস করে দাও। তার অত্যাচার থেকে আমাদের রক্ষা করো।
এরপর হঠাৎ সে নেতার কানের নিচে একটি টিউমার বা দাগের মতো দেখা গেল। তার শরীরের রং পরিবর্তন হয়ে গেল। সে দেখতে কালো ছিল। ধীরে ধীরে শরীরের রং পরিবর্তন হয়ে পচা সাদা রং হয়ে গেল। সে দেখতে খুব শক্তিশালী ও সুদর্শন ছিল, কিন্তু আল্লাহ তার সব নিয়ে নিলেন। মহান রব গ্রামবাসীর দু'আকে কবুল করে নেতাকে এই দুনিয়ার ভিক্ষুক বানিয়ে দিলেন।

📘 দু আর মহিমা > 📄 দু‘আ কবুলের ঘটনা

📄 দু‘আ কবুলের ঘটনা


সুলতান সালাহ উদ্দিন ৫৮৯ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর মুসলিম বিশ্ব দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটা অংশ তার পুত্রদের হাতে চলে যায় আর বাকি অংশ তার ভাইদের হাতে। তাদের প্রত্যেকেই নেতা হতে চেয়েছিল। মিশরের অংশ গিয়েছিল সুলতান সালাহ উদ্দিনের পুত্র আজিজ এর নিকট। তার বন্ধুরা ছিল জাহমিয়্যাহ। (যারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলিকে অবিশ্বাস করত এবং তাকদিরের প্রতি তাদের বিশ্বাস ছিল ভ্রষ্টতাপূর্ণ।) জাহমিয়্যারা তাকে হক্কপন্থি হাম্বলি মাজহাবের অনুসারি আলেমদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত করেছিল। এই আলেমগণ ছিলেন সঠিক সুন্নাহর অনুসারী। তারা মানুষদের কুরআন এবং সুন্নাহর সঠিক পথে চলার জন্য দাওয়াত দিতেন।
ফলে সাধারণ মানুষ এসকল আলেমদের অনুসরণ করতো এবং তাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতো। কিন্তু জাহমিয়্যাহদের এটা সহ্য হলো না, তারা চাচ্ছিল মানুষ তাদের অনুসরণ করুক। আর এজন্য তারা বাদশাহর সাথে তাদের বন্ধুত্বকে কাজে লাগাল। তারা বাদশাহর নিকট হকপন্থি আলেমদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করলো এবং মিশরে তাদের দাওয়াতি কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ করার আবেদন করলো। বাদশাহ তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে হকপন্থি আলেমদের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দিলো। এই পরিস্থিতিতে মাজলুম উলামায়ে কেরামদের দু'আ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। এটা ছিল ৫৯৫ হিজরির মুহাররম মাসের ঊনিশতম দিন।
সালাহ উদ্দিনের পুত্র অন্যান্য দিনের মতোই শিকারে বের হল। আর যারা তাকে বিভ্রান্ত করেছিল তারা অনেক আনন্দিত হয়ে ছিল, তারা এটা ভেবে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিল যে, তাদের বিজয় হয়ে গেছে। তাদের বিরোধিতা করার মতো আলেমদের আর কোন শক্তি নেই। এবার সাধারণ মানুষদেরকে তাদের অনুসারী বানাতে আর কোন বাধা নেই। অন্য দিকে মুখলিস আলেমদের রাত্রি যাচ্ছিল নিদ্রাহীনভাবে, আল্লাহর নিকট দু'আ করে। তারা তাদের সকল অভিযোগ জানাচ্ছিল মহান রবের দরবারে। মহান আল্লাহ তাআলা মাজলুম আলেমদের দু'আ শুনলেন এবং তাদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করলেন।
বাদশাহ যখন শিকার করছিল তখন একটি নেকড়ে এসে তার ঘোড়ার উপর আক্রমণ করলো, ঘোড়াটি ভয়ে লাফিয়ে উঠলো, ফলে ঘোড়ার উপর বসে থাকা বাদশাহ নিয়ন্ত্রন হারিয়ে নিচে পড়ে গেল, আর নেকড়েটি তার উপর ঝাপিয়ে পড়লো এবং নেকড়ের আক্রমণে তার মৃত্যু ঘটল। এই ঘটনাটি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ার পর হকপন্থি আলেমদের মর্যাদা আরো বেড়ে গেল। মিশর এবং শামের জনগণ তাদেরকে আরো আপন করে নিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
'তারা যেমন ছলনা করে তেমনি আল্লাহও কৌশল করেন। বস্তুত আল্লাহর কৌশলই সর্বোত্তম। '৯৩

টিকাঃ
[৯৩] সুরা আনফাল: ৩০।

📘 দু আর মহিমা > 📄 দু‘আর বিশেষ সময়

📄 দু‘আর বিশেষ সময়


আপনি মহান রবকে যখনই ডাকবেন, যে অবস্থায় ডাকাবেন তখনই তিনি আপনার ডাকে সাড়া দেবেন। দিনে, রাতে, সকালে, সন্ধায় যখন ডাকবেন তখনই তিনি আপনার ডাক শুনবেন। আপনি যে অবস্থায় তাকে ডাকেন না কেন তিনি আপনার ডাকে সাড়া দেবেন। দাঁড়ানো অবস্থায়, শোয়া অবস্থায় এবং বসা অবস্থায়, সব অবস্থাতেই আল্লাহ দু'আর জবাব দেন। ওজু থাকা অবস্থায় এমনকি ওজু না থাকা অবস্থায়ও আল্লাহ দু'আর জবাব দেন। হ্যাঁ দু'আ কবুল হওয়ার বিশেষ কিছু সময় রয়েছে, যেই সময়ে দু'আ করলে অধিক পরিমাণে দু'আ কবুল হয়। যেমন: আরাফার দিন, রামাদান মাস, রাতের শেষ তৃতীয়াংশ ও বৃষ্টির সময়, ইকামতের পর, আজান ও ইকামতের মাঝের সময়ে, রোজাদারের দু'আ।

রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ দুনিয়ার নিকটবর্তী আসমানে নেমে এসে বলতে থাকেন, কেউ কি আছে যার কিছু প্রয়োজন? কেউ কি আছে যে ক্ষমা পেতে চায়? যাতে আমি ক্ষমা করে দিই। এই সময় ও পরিস্থিতিগুলো যত একসাথে করতে পারা যায় দু'আ কবুলের সম্ভাবনা তত বেড়ে যায় ইনশাআল্লাহ। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, রামাদান মাসে লাইলাতুল কদরের রাতের শেষ তৃতীয়াংশে সেজদারত অবস্থায় করা দু'আ। বুঝতেই পারছেন দু'আ কবুলের জন্য চমৎকার একটা মূহুর্ত। বিশেষ সময় আর বিশেষ পরিস্থিতি। সাথে দু'আর আনুষ্ঠানিকতা।

আপনি যে-কোনো সময় যে-কোনো অবস্থাতেই দু'আ করতে পারেন। কিন্তু মাঝে মাঝে আনুষ্ঠানিকতাগুলোও পালন করবেন। যেমন, মাঝে মাঝে ওজু করে দু'আর পরিকল্পনা করুন। ব্যাপারটাকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের প্রথা হিসেবে চিন্তা করুন। ওজু করে ২ রাকাত নামাজ পড়ে কিবলামুখী হয়ে হাত তুলে দু'আ করুন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'আ করার সময় হাত একবার এত উঁচু করেছিলেন যে, তার বগলের শুভ্রতা দৃশ্যমান হয়ে গিয়েছিল। কখনো তিনি বুক পর্যন্ত হাত উঁচু করতেন। আবার কখনো আঙুল তুলে দু'আ করতেন।
কেউ যখন দু'আ করার জন্য হাত তুলে, তখন চিরঞ্জীব ও সম্মানিত আল্লাহ তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। তিনি কখনোই আপনাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেবেন না। কারণ, তিনি তা করতে লজ্জিত হন। সাহাবি আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তোমাদের হাতগুলো শিকলবন্দি হয়ে যাবার আগেই সেগুলো আল্লাহর কাছে উঁচু করো। কোনো একদিন তোমার জীবনের বাতি নিভে যাবে। আর তখন হাত তুলতে মন চাইলেও তুমি আর তুলতে পারবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00