📘 দু আর মহিমা > 📄 মাজলুমের দু‘আ কখনো ফিরে আসে না

📄 মাজলুমের দু‘আ কখনো ফিরে আসে না


সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত প্রিয় একজন সাহাবি। দুনিয়াতে থেকেই জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবিদের একজন। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে কুফার গভর্ণর নিযুক্ত করেছিলেন। এক লোক এই মহান সাহাবির বিরুদ্ধে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট তিনটি অভিযোগ করে তাকে প্রতারক বলেছিল। লোকটি বলেছিল, তিনি এমন এক কাপুরুষ, যে জিহাদে অংশগ্রহণ করে না। অর্থাৎ তিনি লোকজনকে জিহাদে পাঠাতেন কিন্তু নিজে যেতেন না। দ্বিতীয় তিনি ঠিক মত নামাজ আদায় করেন না। এবং তৃতীয় অভিযোগটি ছিল যে, তিনি মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার করেন না।
যদিও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু একজন অত্যন্ত বড় মাপের সাহাবি ছিলেন, তবুও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু লোকটির অভিযোগটিকে আমলে নিলেন এবং সেটা তদন্ত করলেন এবং লোকটির সকল অভিযোগ মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল।
এই ঘটনায় সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু মনের মধ্যে কিছুটা আঘাত পেয়েছিলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করে বলেছিলেন, যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, আর সেটা যদি কোন লোভের কারণে হয়ে থাকে, তবে তুমি তাকে দীর্ঘ দরিদ্রতার একটি জীবন দাও এবং তাকে তুমি ফিতনার মুখে ঠেলে দাও। আল্লাহ তায়ালা তাঁর দু'আকে কবুল করে নিলেন। (এ হাদিসের সনদের একজন) রাবী আব্দুল মালেক ইবনু উবায়ের বলেছেন, এরপর আমি লোকটিকে বৃদ্ধ অবস্থাতে অলিতে-গলিতে মহিলাদের উত্যক্ত করতে এবং হারামে লিপ্ত থাকতে দেখেছি। যখন তাকে আমি তার এ অবস্থার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম তখন সে বলল, আমি একজন পথভ্রষ্ট বৃদ্ধ। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর দু'আর কারণে আজ আমার এই করুণ অবস্থা।

📘 দু আর মহিমা > 📄 দু‘আর ফলে

📄 দু‘আর ফলে


একবার বাগদাদের জনসাধারণ খলিফা আল মুতাসিমের কাছে অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিল। মুতাসিম তার সেনাবাহিনীতে তুর্কি সেনাদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। যারা পুরো বাগদাদে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা ছিল কঠোর প্রকৃতির। সাধারণ জনসাধারণদের অনেক নির্যাতন করত তারা। বাগদাদের লোকজন তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মুতাসিমের নিকট একজন প্রতিনিধি পাঠাল। এই প্রতিনিধি ছিল একজন আলেম ইমাম ও শায়েখ। যখন তিনি আল মুতাসিমের নিকট গিয়ে বললেন, আপনার সৈন্যদের দমন করুন তা না হলে আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। মুতাসিম হেসে বললেন, তুমি আমার বিরুদ্ধে লড়তে চাও? অথচ আমার নিকট ৮০ হাজার সশস্ত্র সৈন্য আছে। প্রতিনিধি বলেছিল, হ্যাঁ আমরা আপনার বিরুদ্ধে রাত্রিবেলার তির দিয়ে লড়ব। (সালাতুল তাহাজ্জুদকে বলা হয় রাত্রিবেলার তির।) মুতাসিম একজন অত্যাচারী শাসক হওয়া সত্ত্বেও তিনি বলেছিলেন, আমি এ ভয়ংকর তিরের মুখোমুখি হতে পারব না। মুতাসিম বাগদাদ থেকে সামারা চলে গেল। মুতাসিম ছিল ওইসব জালিমদের মধ্যে অন্যতম যারা আহমদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহকে অত্যাচার করেছিল। কিন্তু এত ক্ষমতা ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও মুতাসিম জানত যে, লোকেরা তাকে যেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়েছে, তাকে প্রতিহত করার কোন শক্তি তার নেই।
সে একজন শক্তিশালী ও জালিম বাদশাহ হয়েও বুঝতে পেরেছিল যে, আল্লাহর নিকট তার বান্দার দু'আ কত শক্তিশালী আর ধারালো অস্ত্র।
এই তির অত্যাচার নির্যাতনের কতশত মেঘ আকাশ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, কত অত্যাচারীকে ধ্বংস করেছিল, কত অত্যাচারী শাসককে প্রতিহত করেছিল। হাজ্জাজ কর্তৃক সাইদ ইবনু আল মুসাইবকে হত্যার খবর যখন হাসান বসরির কাছে পৌঁছালো তিনি তার দু-হাত তুলে হাজ্জাজকে বদদু'আ করলেন। এই দু'আর পর হাজ্জাজ আর এক দিনও বেঁচেছিল না।
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'মজলুম এর দু'আকে ভয় করো যদি সে কাফিরও হয়। কারণ তার দু'আ এবং আল্লাহ তাআলার মাঝে কোনো পার্থক্য থাকে না'।
একজন কাফিরের ক্ষেত্রে যদি এটা প্রযোজ্য হয়। তাহলে চিন্তা করুন তো, একজন মুজাহিদের কথা, যার কপাল আল্লাহর প্রতি নত হয়, তার দু'আর ফল কি হতে পারে?

📘 দু আর মহিমা > 📄 জালিম নেতার ভয়ংকর পরিণতি

📄 জালিম নেতার ভয়ংকর পরিণতি


আব্বাসী খিলাফতের সময়ে ১৯৬ হিজরিতে আব্দুল্লাহ ইবনু আখলাব নামে আফ্রিকায় একজন নেতা ছিল। যে ছিল একজন অহংকারী ও স্বৈরাচারী শাসক। তিনি মন্দ স্বভাবের লোক ছিল। ওই সময়ে আফ্রিকায় হাফস ইবনু হুমাইদ নামে একজন বড় ইমাম ছিলেন। তিনি নেতার কাছে গেলেন এবং বললেন, আল্লাহকে ভয় করুন। আপনার যৌবন ও চেহারার প্রতি একটু দয়া করুন। (সুন্দর চেহারা এবং শারিরিক গঠন এবং শক্তির জন্য মানুষের কাছে তার একটা সুনাম ছিল।) আপনি অত্যাধিক কর আরোপ করা বন্ধ করুন এবং কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত করুন। এরপর সে আগের চেয়ে আরো বেশী অহংকারী এবং উদ্ধত হয়ে পড়ল। মানুষের প্রতি অত্যাচার করা এবং করের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিলো। শায়েখ হাফস ইবনু হুমাইদ জনসাধারণের নিকট ফিরে এসে বললেন, আমি সেই নেতার প্রতি হতাশ হলাম কিন্তু আমি আল্লাহর রহমতের প্রতি হতাশ নই। আজকে এশা থেকে ফজর পর্যন্ত আমরা প্রত্যেকে দু'আ করব। আজকে এশা থেকে ফজর পর্যন্ত জিহ্বার জড়তা দূর করে ফেলব। মানুষজন তাদের মসজিদ এবং তাদের বাড়িতে জড়ো হতে লাগল। সবাই ওজু করে এশা থেকে ফজর পর্যন্ত দু'আ করল। হে আল্লাহ! তুমি তাকে ধ্বংস করে দাও। তার অত্যাচার থেকে আমাদের রক্ষা করো।
এরপর হঠাৎ সে নেতার কানের নিচে একটি টিউমার বা দাগের মতো দেখা গেল। তার শরীরের রং পরিবর্তন হয়ে গেল। সে দেখতে কালো ছিল। ধীরে ধীরে শরীরের রং পরিবর্তন হয়ে পচা সাদা রং হয়ে গেল। সে দেখতে খুব শক্তিশালী ও সুদর্শন ছিল, কিন্তু আল্লাহ তার সব নিয়ে নিলেন। মহান রব গ্রামবাসীর দু'আকে কবুল করে নেতাকে এই দুনিয়ার ভিক্ষুক বানিয়ে দিলেন।

📘 দু আর মহিমা > 📄 দু‘আ কবুলের ঘটনা

📄 দু‘আ কবুলের ঘটনা


সুলতান সালাহ উদ্দিন ৫৮৯ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর মুসলিম বিশ্ব দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটা অংশ তার পুত্রদের হাতে চলে যায় আর বাকি অংশ তার ভাইদের হাতে। তাদের প্রত্যেকেই নেতা হতে চেয়েছিল। মিশরের অংশ গিয়েছিল সুলতান সালাহ উদ্দিনের পুত্র আজিজ এর নিকট। তার বন্ধুরা ছিল জাহমিয়্যাহ। (যারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলিকে অবিশ্বাস করত এবং তাকদিরের প্রতি তাদের বিশ্বাস ছিল ভ্রষ্টতাপূর্ণ।) জাহমিয়্যারা তাকে হক্কপন্থি হাম্বলি মাজহাবের অনুসারি আলেমদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত করেছিল। এই আলেমগণ ছিলেন সঠিক সুন্নাহর অনুসারী। তারা মানুষদের কুরআন এবং সুন্নাহর সঠিক পথে চলার জন্য দাওয়াত দিতেন।
ফলে সাধারণ মানুষ এসকল আলেমদের অনুসরণ করতো এবং তাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতো। কিন্তু জাহমিয়্যাহদের এটা সহ্য হলো না, তারা চাচ্ছিল মানুষ তাদের অনুসরণ করুক। আর এজন্য তারা বাদশাহর সাথে তাদের বন্ধুত্বকে কাজে লাগাল। তারা বাদশাহর নিকট হকপন্থি আলেমদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করলো এবং মিশরে তাদের দাওয়াতি কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ করার আবেদন করলো। বাদশাহ তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে হকপন্থি আলেমদের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দিলো। এই পরিস্থিতিতে মাজলুম উলামায়ে কেরামদের দু'আ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। এটা ছিল ৫৯৫ হিজরির মুহাররম মাসের ঊনিশতম দিন।
সালাহ উদ্দিনের পুত্র অন্যান্য দিনের মতোই শিকারে বের হল। আর যারা তাকে বিভ্রান্ত করেছিল তারা অনেক আনন্দিত হয়ে ছিল, তারা এটা ভেবে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিল যে, তাদের বিজয় হয়ে গেছে। তাদের বিরোধিতা করার মতো আলেমদের আর কোন শক্তি নেই। এবার সাধারণ মানুষদেরকে তাদের অনুসারী বানাতে আর কোন বাধা নেই। অন্য দিকে মুখলিস আলেমদের রাত্রি যাচ্ছিল নিদ্রাহীনভাবে, আল্লাহর নিকট দু'আ করে। তারা তাদের সকল অভিযোগ জানাচ্ছিল মহান রবের দরবারে। মহান আল্লাহ তাআলা মাজলুম আলেমদের দু'আ শুনলেন এবং তাদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করলেন।
বাদশাহ যখন শিকার করছিল তখন একটি নেকড়ে এসে তার ঘোড়ার উপর আক্রমণ করলো, ঘোড়াটি ভয়ে লাফিয়ে উঠলো, ফলে ঘোড়ার উপর বসে থাকা বাদশাহ নিয়ন্ত্রন হারিয়ে নিচে পড়ে গেল, আর নেকড়েটি তার উপর ঝাপিয়ে পড়লো এবং নেকড়ের আক্রমণে তার মৃত্যু ঘটল। এই ঘটনাটি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ার পর হকপন্থি আলেমদের মর্যাদা আরো বেড়ে গেল। মিশর এবং শামের জনগণ তাদেরকে আরো আপন করে নিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
'তারা যেমন ছলনা করে তেমনি আল্লাহও কৌশল করেন। বস্তুত আল্লাহর কৌশলই সর্বোত্তম। '৯৩

টিকাঃ
[৯৩] সুরা আনফাল: ৩০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00