📘 দু আর মহিমা > 📄 কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়না যে তির

📄 কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়না যে তির


মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে, বস্তুত আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে। ১৮৬
এটা রামাদানের দু'আর গুরুত্বের প্রতি আপনাকে আরো যত্নশীল হতে উৎসাহিত করবে। আন্তরিক এবং একনিষ্ঠ দু'আ যে কতটা শক্তিশালী ও সুন্দর হতে পারে সেটা অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রায়ই বলতেন, 'আমার দু'আ কবুল হচ্ছে কি না সেটা নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আমি চিন্তিত দু'আ করার তাওফিক পাব কি না সেটা নিয়ে।'
বান্দা যখন আল্লাহর কাছে দু'আ করে তখন সে তার দুঃখ-কষ্ট, চাওয়া- পাওয়া আর অভিযোগকে আল্লাহর কাছে উপস্থাপন করে, আর স্বয়ং আল্লাহই সেই চাওয়া-পাওয়া দুঃখ কষ্টকে দেখেন।
আপনি কি লক্ষ করেছেন যে, কুরআন শুরু হয়েছে দু'আর মাধ্যমে এবং শেষও হয়েছে আল্লাহর নিকট দু'আ করার মধ্য দিয়ে। শুরু হয়েছে আল ফাতিহায়। আর আল ফাতিহা হলো কুরআনের সবচেয়ে বিস্ময়কর সুন্দর দু'আয় সাজানো সুরাগুলোর মধ্যে অন্যতম। যেমন, “তুমি আমাদের সরল পথের রাস্তা দেখাও”। আর কুরআন শেষ হয়েছে সুরা নাস এর মধ্য দিয়ে বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের ওপর তার অনিষ্ট থেকে যে আত্মগোপন করে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জিনের মধ্য থেকে ও মানুষের মধ্য থেকে।

ইমাম আল আওজায়ি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, একবার লোকজন বৃষ্টির জন্য 'সালাতুল ইস্তিসকা' আদায়ের জন্য সমবেত হলো। বেলাল ইবনু সাদ সেখানে একটি বক্তব্য পেশ করলেন। বিলাল ইবনু সাদ উঠে দাঁড়ালেন। আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর মহিমা ঘোষণা করলেন এবং লোকজনকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা যারা এখানে জড়ো হয়েছ তোমরা কি তোমাদের গুনাহের কথা স্বীকার করছ?' সবাই জবাব দিলো, 'হ্যাঁ'। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী তারা যা বলেছে।' আল্লাহ বলেন, 'সৎ লোকের প্রতি কোনো প্রকার অভিযোগ নেই। '৯০
আমরা আমাদের অপরাধ স্বীকার করছি হে আল্লাহ! আপনার ক্ষমা কি তবে তাদের ছাড়া অন্য কারো জন্য হবে? যারা তাদের ভুল স্বীকার করে? আমাদের ক্ষমা করুন আল্লাহ। আমাদের ওপর রহম করুন। তিনি তার দুই হাত তুললেন আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন এবং বৃষ্টি না নামা পর্যন্ত হাত নামালেন না। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করলেন।
যিনি অবিরাম বর্ষণসহ তাঁর রহমতের দরজাগুলো খুলে দিতে পারেন। তিনি আপনাকে আপনার পছন্দমতো জীবনসঙ্গীও দিতে পারেন, যদি আপনি আল্লাহর নিকট দু'আ করেন। তিনি আপনার জীবনের হারানো শান্তি ফিরিয়ে দিতে পারেন যদি আপনি দু'আ করেন। আপনার দাম্পত্যজীবনের শান্তি কি হারিয়ে গেছে? এখনি আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন, তাঁর নিকট দু'আ করুন। আপনার স্বামীর মনের ওপর যতটুকু তার নিজের ক্ষমতা মহান আল্লাহর ক্ষমতা কি তার থেকে বেশি নয়? আপনার স্ত্রীর মনের ওপর আপনার স্ত্রীর চেয়ে মহান আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ কি বেশি নয়?
وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ
'জেনে রেখো, আল্লাহ মানুষের এবং তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে যান। '৯১
আল্লাহর কাছে প্রার্থনাকারী ব্যক্তিটি যে কেউ হতে পারে। এমন কথা বলবেন না যে, আমি তো অনেক গুনাহ করে ফেলেছি। আল্লাহ কি আমার দু'আ কবুল করবেন? হ্যাঁ, আপনাকে আপনার গুনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে। সাথে সাথে দু'আও করতে হবে। আপনার হতাশ হলে চলবে না

টিকাঃ
[৮৯] সুরা বাকারা: ১৮৬।
[৯০] সুরা তাওবা: ৯১।
[৯১] সুরা আনফাল: ২৪।

📘 দু আর মহিমা > 📄 স্বচ্ছ হৃদয়ের ডাক

📄 স্বচ্ছ হৃদয়ের ডাক


আতা আস সুলামি বলেন, আমাদের এলাকায় একবার বেশ কয়েকদিন যাবত বৃষ্টি হচ্ছিল না। বৃষ্টি না হওয়ার কারণে আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছিল। একদিন আমরা আমাদের নেতার আদেশে 'সালাতুল ইস্তিস্কা' আদায় করতে গেলাম। যাওয়ার সময় সরু রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন লোকের সাথে দেখা হলো। লোকটি আতা আস সুলামিকে চিনতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন, এটাই কি কিয়ামতের দিন? এটাই কি সেই দিন? যেই দিনের ব্যপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
أَفَلَا يَعْلَمُ إِذَا بُعْثِرَ مَا فِي الْقُبُورِ
'সে কি জানে না, যখন কবরে যা আছে তা উত্থিত হবে। '৯২
আসলে লোকটি সেদিন মানুষের এতো বিশাল সমাবেশ দেখেছিলেন। যা তিনি আগে কখনো দেখেননি। আতা আস সুলামি বললেন, 'না আমারা বৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করতে যাচ্ছি।' লোকটি বলল, 'দুনিয়ার মাঝে ডুবে থাকা হৃদয় নিয়ে আল্লাহর দরবারে দু'আ করবেন? নাকি আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল হৃদয় নিয়ে আল্লাহর দরবারে দু'আ করবেন?' আতা আস সুলামি বললেন, 'ইনশাআল্লাহ ইমানদারদের হৃদয় নিয়ে আমরা দু'আ করব।' অতপর মসজিদে পৌছানোর পূর্বেই লোকটি আল্লাহর নিকট দু'আ করলেন। এরপর আমাদের কারো গন্তব্য পৌঁছানোর আগেই বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করল এবং বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করল। খাঁটি মনে আল্লাহর কাছে দু'আ করলে, আল্লাহ তায়ালা দু'আ কবুল করে নেন। তাই পরিশুদ্ধময় হৃদয় দিয়ে আল্লাহকে ডাকতে হবে।

টিকাঃ
[৯২] সুরা আদিয়াত: ০৯

📘 দু আর মহিমা > 📄 মাজলুমের দু‘আ কখনো ফিরে আসে না

📄 মাজলুমের দু‘আ কখনো ফিরে আসে না


সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত প্রিয় একজন সাহাবি। দুনিয়াতে থেকেই জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবিদের একজন। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে কুফার গভর্ণর নিযুক্ত করেছিলেন। এক লোক এই মহান সাহাবির বিরুদ্ধে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট তিনটি অভিযোগ করে তাকে প্রতারক বলেছিল। লোকটি বলেছিল, তিনি এমন এক কাপুরুষ, যে জিহাদে অংশগ্রহণ করে না। অর্থাৎ তিনি লোকজনকে জিহাদে পাঠাতেন কিন্তু নিজে যেতেন না। দ্বিতীয় তিনি ঠিক মত নামাজ আদায় করেন না। এবং তৃতীয় অভিযোগটি ছিল যে, তিনি মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার করেন না।
যদিও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু একজন অত্যন্ত বড় মাপের সাহাবি ছিলেন, তবুও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু লোকটির অভিযোগটিকে আমলে নিলেন এবং সেটা তদন্ত করলেন এবং লোকটির সকল অভিযোগ মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল।
এই ঘটনায় সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু মনের মধ্যে কিছুটা আঘাত পেয়েছিলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করে বলেছিলেন, যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, আর সেটা যদি কোন লোভের কারণে হয়ে থাকে, তবে তুমি তাকে দীর্ঘ দরিদ্রতার একটি জীবন দাও এবং তাকে তুমি ফিতনার মুখে ঠেলে দাও। আল্লাহ তায়ালা তাঁর দু'আকে কবুল করে নিলেন। (এ হাদিসের সনদের একজন) রাবী আব্দুল মালেক ইবনু উবায়ের বলেছেন, এরপর আমি লোকটিকে বৃদ্ধ অবস্থাতে অলিতে-গলিতে মহিলাদের উত্যক্ত করতে এবং হারামে লিপ্ত থাকতে দেখেছি। যখন তাকে আমি তার এ অবস্থার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম তখন সে বলল, আমি একজন পথভ্রষ্ট বৃদ্ধ। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর দু'আর কারণে আজ আমার এই করুণ অবস্থা।

📘 দু আর মহিমা > 📄 দু‘আর ফলে

📄 দু‘আর ফলে


একবার বাগদাদের জনসাধারণ খলিফা আল মুতাসিমের কাছে অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিল। মুতাসিম তার সেনাবাহিনীতে তুর্কি সেনাদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। যারা পুরো বাগদাদে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা ছিল কঠোর প্রকৃতির। সাধারণ জনসাধারণদের অনেক নির্যাতন করত তারা। বাগদাদের লোকজন তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মুতাসিমের নিকট একজন প্রতিনিধি পাঠাল। এই প্রতিনিধি ছিল একজন আলেম ইমাম ও শায়েখ। যখন তিনি আল মুতাসিমের নিকট গিয়ে বললেন, আপনার সৈন্যদের দমন করুন তা না হলে আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। মুতাসিম হেসে বললেন, তুমি আমার বিরুদ্ধে লড়তে চাও? অথচ আমার নিকট ৮০ হাজার সশস্ত্র সৈন্য আছে। প্রতিনিধি বলেছিল, হ্যাঁ আমরা আপনার বিরুদ্ধে রাত্রিবেলার তির দিয়ে লড়ব। (সালাতুল তাহাজ্জুদকে বলা হয় রাত্রিবেলার তির।) মুতাসিম একজন অত্যাচারী শাসক হওয়া সত্ত্বেও তিনি বলেছিলেন, আমি এ ভয়ংকর তিরের মুখোমুখি হতে পারব না। মুতাসিম বাগদাদ থেকে সামারা চলে গেল। মুতাসিম ছিল ওইসব জালিমদের মধ্যে অন্যতম যারা আহমদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহকে অত্যাচার করেছিল। কিন্তু এত ক্ষমতা ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও মুতাসিম জানত যে, লোকেরা তাকে যেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়েছে, তাকে প্রতিহত করার কোন শক্তি তার নেই।
সে একজন শক্তিশালী ও জালিম বাদশাহ হয়েও বুঝতে পেরেছিল যে, আল্লাহর নিকট তার বান্দার দু'আ কত শক্তিশালী আর ধারালো অস্ত্র।
এই তির অত্যাচার নির্যাতনের কতশত মেঘ আকাশ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, কত অত্যাচারীকে ধ্বংস করেছিল, কত অত্যাচারী শাসককে প্রতিহত করেছিল। হাজ্জাজ কর্তৃক সাইদ ইবনু আল মুসাইবকে হত্যার খবর যখন হাসান বসরির কাছে পৌঁছালো তিনি তার দু-হাত তুলে হাজ্জাজকে বদদু'আ করলেন। এই দু'আর পর হাজ্জাজ আর এক দিনও বেঁচেছিল না।
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'মজলুম এর দু'আকে ভয় করো যদি সে কাফিরও হয়। কারণ তার দু'আ এবং আল্লাহ তাআলার মাঝে কোনো পার্থক্য থাকে না'।
একজন কাফিরের ক্ষেত্রে যদি এটা প্রযোজ্য হয়। তাহলে চিন্তা করুন তো, একজন মুজাহিদের কথা, যার কপাল আল্লাহর প্রতি নত হয়, তার দু'আর ফল কি হতে পারে?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00