📄 জান্নাতের দরজাসমূহ কীভাবে খুলবে?
দু'আ-মুনাজাত ও আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতির মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সেই জান্নাতের দরজা খুলে দেন, যার প্রশস্থতা আসমান ও জমিনের চেয়ে বড়ো, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَنَعِيمٍ فَاكِهِينَ بِمَا آتَاهُمْ رَبُّهُمْ وَوَقَاهُمْ رَبُّهُمْ عَذَابَ ا- الْجَحِيمِ
'নিশ্চয় খোদাভীরুরা থাকবে জান্নাতে ও নিয়ামতে। তারা উপভোগ করবে যা তাদের পালনকর্তা তাদের দেবেন এবং তিনি জাহান্নামের আজাব থেকে তাদের রক্ষা করবেন। '৭৭
وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ إِنَّا كُنَّا مِن قَبْلُ نَدْعُوهُ ، إِنَّهُ هُوَ الْبَرُّ الرَّحِيمُ
'তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তারা বলবে, আমরা ইতঃপূর্বে নিজেদের বাসগৃহে ভীত- কম্পিত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। আমরা পূর্বেও আল্লাহকে ডাকতাম, তাঁর নিকট দু'আ করতাম। তিনি সৌজন্যশীল, পরম দয়ালু।'৭৮
আল্লামা সাদি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ) وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।) অর্থাৎ তারা একে অপরকে তাদের দুনিয়ার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে। এরপর তারা জান্নাতের এই নিয়ামত পেয়ে আনন্দ ও খুশিতে একে অপরকে বলতে থাকবে, ) قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ তারা বলবে, আমরা ইতঃপূর্বে নিজেদের বাসগৃহে ভীত-কম্পিত ছিলাম) অর্থাৎ আমরা দুনিয়াতে ছিলাম ভীত ও শঙ্কিত। আমরা আল্লাহর আজাবের ভয়ে দুনিয়াতে গুনাহ ও নাফরমানির কাজ ছেড়ে দিয়েছিলাম এবং আমাদের দোষ-ত্রুটিগুলো সংশোধন করে নিয়েছিলাম।
فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ ) আর এর ফলাফল হলো আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শান্তি থেকে রক্ষা করেছেন।) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন, নেক কাজ করার তাওফিক দিয়েছেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেছেন। এরপর তারা তাদের অবস্থা এবং এই সফলতার কারণ নিয়ে আলোচনা করবে যে, إِنَّا كُنَّا مِن قَبْلُ نَدْعُوهُ ، إِنَّهُ هُوَ الْبَرُّ الرَّحِيمُ) আমরা পূর্বেও আল্লাহকে ডাকতাম। তিনি সৌজন্যশীল, পরম দয়ালু) অর্থাৎ আমরা আল্লাহ তাআলার নিকট এই দু'আ ও প্রার্থনা করতাম যে, তিনি যেন আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে জান্নাত দান করেন। সুতরাং তিনি তার দয়া ও অনুগ্রহে আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে জান্নাত দান করেছেন।
প্রিয় ভাই! তাদের এই সফলতা এবং মুক্তির কারণ হলো তারা আখিরাত সম্পর্কে সদা সতর্ক থাকত, তারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করত, তার সামনে হিসাব দেওয়ার বিষয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকত, অনুরুপভাবে তারা তাদের পরিবারের নিকট ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় থাকত, কারণ সেখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের ফেতনা, ধোঁকা ও প্রতারণা। কিন্তু তারা সেই ফেতনা ও ধোঁকায় না পড়ে মহান রবের দরবারে দুই হাত তুলে তাদের প্রয়োজনের কথা, তাদের ভয় ও আশঙ্কার কথা বলত এবং আল্লাহ তাআলার নিকট কাকুতিমিনতি করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাইত এবং জান্নাত কামনা করত। কারণ তারা জানত যে, আল্লাহ তাআলা হলেন দয়ালু, তিনি রহমান ও রহিম। তিনি বান্দার দু'আ শোনেন এবং তা কবুল করেন।
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ليس شيء أكرم على الله من الدعاء
'আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আর চেয়ে প্রিয় এবং সম্মানিত আর কিছু নেই। '৭৯
এক যুদ্ধের ব্যাপারে মুগিরা ইবনু হাবিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা যখন শত্রুর মুখোমুখি হলাম তখন আব্দুল্লাহ ইবনু গানেম বললেন, এই তো জান্নাত সুসজ্জিত করা হয়ে গেছে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এই দুনিয়াতে বুদ্ধিমান লোকেরা থাকার কামনা করতে পারে না। ওয়াল্লাহি! আমার নিকট যদি শেষরাতে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে তেলাওয়াত করা, রাতের অন্ধকারে একাকী আল্লাহর সামনে মাটিতে মাথা রেখে সিজদাহ করা এবং নির্জন প্রার্থনায় আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাত চাওয়া ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করা প্রিয় না হত, তাহলে আমি এই দুনিয়া এবং দুনিয়াবাসীদের থেকে পৃথক হওয়া কামনা করতাম। এরপর তিনি তার তরবারির খাপ ভেঙে ফেললেন এবং সামনে অগ্রসর হয়ে জিহাদ করতে করতে শহিদ হলেন। অতঃপর তাকে যখন দাফন করা হলো, তার কবর থেকে মিশকের সুঘ্রাণ বের হতে থাকে।
এর কিছুদিন পর তাকে এক লোক স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞাসা করল, হে আবু সুরাকা! তোমার কি অবস্থা? তিনি উত্তরে বলেন, ভালো, অনেক ভালো। লোকটি আবার তাকে প্রশ্ন করল তুমি এখন কোথায় আছ? সে বলল, জান্নাতে। লোকটি আবার তাকে প্রশ্ন করল, কীসের বিনিময়ে? সে বলল, আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, দীর্ঘ তাহাজ্জুদ, রোজা রেখে পিপাসায় গলা শুকানো এবং অধিক দু'আর কারণে।
এরপর সে আবার তাকে প্রশ্ন করল, আপনার কবর থেকে যে সুঘ্রাণ বের হচ্ছে তা কীসের? সে বলল, এটা হলো কুরআন তেলাওয়াত এবং রোজায় পিপাসিত থাকার ঘ্রাণ। লোকটি এবার তাকে বলল, আমাকে কিছু নসিহত করুন! সে বলল, তোমাকে সকল কল্যাণকর কাজের নসিহত করছি।
এরপর লোকটি আবারো তাকে বলল, আমাকে কিছু নসিহত করুন। সে বলল, তুমি নিজের জন্য নেকি অর্জন করো। একটি রাতও যেন তোমার আল্লাহর দরবারে দু'আ-মুনাজাত থেকে খালি না যায়। আমি আবরারদেরকে দেখেছি তারা পুণ্যের বিনিময় পুণ্য পেয়েছেন।
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ (২২) عَلَى الْأَرَائِكِ يَنْظُرُونَ (২৫) تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعِيمِ (২৪) يُسْقَوْنَ مِنْ رَحِيقٍ مَخْتُومٍ (২৫) خِتَامُهُ مِسْكُ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ (২৬) وَمِزَاجُهُ مِنْ تَسْنِيمٍ (২৭) عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُونَ
'নিশ্চয় সৎলোকগণ থাকবে পরম আরামে, সিংহাসনে বসে অবলোকন করবে। আপনি তাদের মুখমন্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবেন। তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় পান করানো হবে। তার মোহর হবে কস্তুরী। এ বিষয়ে প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত। তার মিশ্রণ হবে তসনিমের পানি। এটা একটা ঝরনা, যার পানি পান করবে নৈকট্যশীলগণ। ৮০
সুতরাং হে ভাই! তুমি যদি তাদের মতো হতে চাও, তাহলে তোমাকে বেশি বেশি মহান আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করতে হবে। তার নিকট জান্নাত চাইতে হবে, জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করতে হবে। যেমন জান্নাতিরা পরস্পর আলাপকালে বলবে,
قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ (২৬) فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ (২৭) إِنَّا كُنَّا مِنْ قَبْلُ نَدْعُوهُ إِنَّهُ هُوَ الْبَرُّ الرَّحِيمُ
'আমরা ইতঃপূর্বে নিজেদের বাসগৃহে ভীত-কম্পিত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। আমরা পূর্বেও আল্লাহকে ডাকতাম। তিনি সৌজন্যশীল, পরম দয়ালু। ৮১
তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করে বলবে, হে আল্লাহ, আমি একজন ভিখারির ন্যায় আপনার দরবারে এসেছি। আপনি আমার প্রতি দয়া করুন। আমাকে ক্ষমা করুন। আপনার রহমতের ছায়াতলে আমাকে আশ্রয় দিন। আমাকে বঞ্চিতদের কাতারে ফেলবেন না।
হে আল্লাহ, আপনি আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাত দান করুন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদেরকে নেককার, সালেহিন, সাদেকিন এবং শুহাদাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। হ্যাঁ, তুমি এভাবে আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করতে থাকো। ইনশাআল্লাহ তিনি তোমার দু'আ কবুল করবেন।
টিকাঃ
[৭৭] সুরা তুর: ১৭-১৮।
[৭৮] সুরা তুর: ২৫-২৮।
[৭৯] আল মুসতাদ রাক: ১৮৪৪।
[৮০] সুরা মুতাফফিন: ২২-২৮।
[৮১] সুরা তুর: ২৬-২৮।
📄 সবচেয়ে মধুর ও সুন্দর সময়
সবচেয়ে সুন্দর ও মধুর সময় হলো—দু'আ কবুলের সময়। দু'আ কবুলের অনেকগুলো সময় রয়েছে, নিম্নে তার থেকে কয়েকটি উল্লেখ করছি—
১. আজানের সময়।
২. আজান এবং ইকামতের মাঝামাঝি সময়।
৩. পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর।
৪. জুমআর দিন ইমাম যখন মিম্বারে আরোহণ করে, তারপর থেকে নামাজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়।
৫. জুমআর দিন আসরের পর।
৬. আর দু'আ কবুলের সবচেয়ে উত্তম সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। রাতের শেষ প্রহরে মহান প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাকে উদ্দেশ্য করে ডাকতে থাকেন এবং তাদেরকে দু'আ করতে বলেন, যেমন হাদিস শরিফে এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ
'আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহামহিম আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতে, রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, কে আছ এমন যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছ এমন যে আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দেব। কে আছ এমন যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। ৮২
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,
وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ
'এবং শেষরাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারীগণ। '৮৩
আহমদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ এর জুহুদ নামক কিতাবে এসেছে। দাউদ আ. জিবরাইল আ.-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হে জিবরাইল, রাতের কোন অংশ উত্তম? এর উত্তরে জিবরাইল আ. বলেন, আমি জানি না। তবে রাতের শেষ অংশে আল্লাহর আরশ কাঁপতে থাকে।
কবি বলেন,
قلت لليل هل في جوفك سر .. عامر بالحديث والاسرار
قال لم الق في حياتي حديثا .. كحديث الاحباب في الاسحار
'আমি রাতকে বললাম, তোমার মধ্যে কি গুরুত্বপূর্ণ কোনো গোপন কথা লুক্কায়িত আছে?
সে বলল, শেষরাতে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কথার মতো এত উত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ কথা আমি জীবনে শুনিনি।
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, রাত্রিকালে এমন একটি সময় রয়েছে যখন কোনো মুসলমান ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দুনিয়া-আখিরাতের কোনো কল্যাণের প্রার্থনা করা অবস্থায় যদি সময়টির আনুকূল্য পায়; তবে আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দান করবেন। আর এটা রয়েছে প্রতি রাতেই। ৮৪
এক আবেদ শেষ রাতে আল্লাহ তাআলার দরবারে দু'আ করে বলতেন, হে আমার মাবুদ! আমার অন্তরের সবচেয়ে মধুর ও মজার কল্পনা হলো, তোমার কল্পনা এবং তোমার সাথে মিলনের বাসনা। আমার জবানের সবচেয়ে মিষ্ট ও মধুর কথা হলো তোমার প্রশংসা। হে আল্লাহ, এই নিশুতি রাতে পৃথিবীর সকল রাজা-বাদশাহদের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের দরজার সামনে প্রহরীরা প্রহরায় রয়েছে। কিন্তু হে প্রভু! তোমার দরজা তো খোলা রয়েছে প্রার্থনাকারীদের জন্য। মানুষের চক্ষু ঘুমিয়ে পড়েছে, তারকারাজি স্তমিত হচ্ছে কিন্তু তোমার চোখ কখনো ঘুমায় না। তুমি চিরঞ্জীব হে প্রভু! তুমি আদি ও অনন্ত।
আরেক আবেদ বারবার এই দু'আ করতেন, হে মাবুদ! বিছানাসমূহ বিছানো হয়েছে, প্রেমিকরা তাদের প্রেমাস্পদের সাথে মিলিত হয়েছে। হে মাবুদ! তুমি তো তাহাজ্জুদ আদায়কারীদের প্রেমাস্পদ, তুমি একাকী রাত্রি জাগরণকারীদের বন্ধু।
হে প্রভু, আমাকে যদি তোমার দরবার থেকে তাড়িয়ে দাও, তাহলে আমি কার দরবারে গিয়ে আশ্রয় নেব? হে আল্লাহ! তুমি যদি আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করো, তাহলে আমি কার সাথে সম্পর্ক রাখব?
হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাকে শান্তি দেন, তাহলে আমি তো শান্তিরই উপযুক্ত। আর যদি আমাকে ক্ষমা করেন, নিশ্চয় আপনি মহান দয়ালু।
হে আল্লাহ, আরেফিনরা আপনার জন্য নিবেদিত হয়েছে, আপনার দয়ায় সালেহিনরা নাজাত পেয়েছে, আপনার রহমতে অক্ষম ব্যক্তিরাও নৈকট্যশীল হয়েছে। সুতরাং হে সুন্দর ক্ষমাশীল! আপনার ক্ষমার শীতলতায় আমাকে সিক্ত ও তৃপ্ত করুন, যদিও আমি এর উপযুক্ত নই। বরং আপনি হলেন ক্ষমাকারী এবং দয়ালু প্রভু।
'সফল ওই ব্যক্তি, মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে সে তখন জেগে জেগে মহান রবের তাসবিহ জপে। প্রবৃত্তির তাড়নাকে পাজরের মাঝে দাফন করে। একধরনের একাগ্রতা এবং তন্ময়তায় আচ্ছন্ন হয়ে আল্লাহর জিকির করে দুই নয়নের অশ্রু ফেলে। হ্যাঁ, অচিরেই এই অশ্রুগুলো সুগন্ধি হয়ে সুঘ্রাণ ছড়াবে।'
সুতরাং হে ভাই ও বোন! দয়াময় আল্লাহর প্রেমিকরা কোথায়? কোথায় আজ জান্নাতের অন্বেষণকারীরা? হে রাতের শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদ আদায়কারী এবং মহান রবের নিকট দু'আ ও ইস্তেগফারকারীরা! তোমরা ঘুমে ডুবে থাকা লোকগুলোর জন্য একটু শাফায়াত করো। তাদের জন্য মহান রবের নিকট দু'আ করো। হে জাগ্রত হৃদয়ের অধীকারীরা! তোমরা মৃত হৃদয়গুলোর ওপর রহম করো।
টিকাঃ
[৮২] সহিহ বুখারি: ১০৭৯।
[৮৩] সুরা আল ইমরান: ১৭।
[৮৪] সহিহ মুসলিম: ১৬৪৩।
📄 চিরকুটের লেখাগুলো
মালেক ইবনে দিনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এক রাতে জ্বরের কারণে কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে আমি ঘুমিয়ে যাই। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখলাম, অত্যন্ত সুন্দরী একজন রমণী একটি চিরকুট হাতে নিয়ে আমার কাছে এসে বলল, আপনি কি ভালোভাবে পড়তে জানেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন সে কাগজের টুকরোটা আমার দিকে এগিয়ে দিলো। আমি তা খুলে দেখলাম তাতে লেখা আছে, 'তুমি কি দুনিয়ার আরাম-আয়েশ এবং কাল্পনিক আশার কারণে জান্নাতের যুবতি হুরদের কথা ভুলে গেলে? সেখানে তোমার কোনো মৃত্যু নেই, তুমি সেখানে চিরকাল থাকবে এবং জান্নাতি হুরদের সাথে আনন্দ করবে। সুতরাং তুমি ঘুম থেকে ওঠো, নিশ্চয় তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কুরআন তেলাওয়াত করা, নরম বিছানায় ঘুমানোর চেয়ে অনেক উত্তম।'
ইবনুল কাইয়ুম রাহিমাহুল্লাহু বলেন, ওই ব্যক্তির অবস্থা কতই-না আশ্চর্যজনক, যে এই ধ্বংসশীল অস্থায়ী জীবনকে চিরস্থায়ী জীবনের ওপর প্রাধান্য দেয়। আসমান ও জমিনের চেয়ে প্রশস্ত জান্নাতকে বিক্রি করে দেয় এই সংকীর্ণ দুনিয়া নামক মানব-জেলখানার বিনিময়ে। আশ্চর্য! মানুষ কীভাবে জান্নাতের কথা জেনেও রাতে ঘুমোতে যায়! মানুষ কীভাবে জান্নাতের হুরদের কথা শুনেও তাদের মোহর প্রস্তুত করা ছেড়ে দেয়? জান্নাত এবং জান্নাতের এমন নিয়ামতরাজির কথা শুনে কীভাবে মানুষ দুনিয়ার তুচ্ছ ও হারাম মজায় ডুবে থাকতে পারে?
সুতরাং ভাই আমার, তুমি কীভাবে ওই সময়ের ব্যাপারে গাফেল ও উদাসীন থাকতে পারো যখন আমাদের পরম দয়ালু রব দুনিয়ার আসমানে এসে আমাদের ডেকে ডেকে বলতে থাকেন, কে আছ এমন যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছ এমন যে আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দেব। কে আছ এমন যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। ৮৫
প্রিয় ভাই! আল্লাহর শপথ করে বলছি, অভাবী এবং গুনাহগাররা যদি শেষ রাতে উঠে আল্লাহ তাআলার দরবারে কিছু চায়, আল্লাহ তাআলার সামনে তাদের প্রয়োজনের তালিকা তুলে ধরে, তারা আল্লাহ তাআলার সামনে দু- চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে তাওবা ইস্তেগফার করে, তাহলে অবশ্যই তাদের প্রয়োজন মহান রব পূরণ করে দেবেন।
আল্লাহর শপথ করে বলছি, তুমি যদি শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত ও দু'আ-মুনাজাতে অভ্যস্ত হতে পারো, তাহলে তোমার মধ্য থেকে দুনিয়ার নেশা কেটে যাবে এবং আখিরাত অর্জনের নেশা সৃষ্টি হবে।
টিকাঃ
[৮৫] সহীহ বুখারি: ১০৭৯
📄 এ অস্ত্র যেভাবে ব্যর্থ হয়
এমন অব্যর্থ অস্ত্রও কি কখনো ব্যর্থ হয়? আল্লাহ তাআলাও কি কখনো বান্দার দু'আ কবুল না করে ফিরিয়ে দেন? হ্যাঁ! অনেকগুলো কারণে এই অব্যর্থ অস্ত্রও ব্যর্থ হয়। আল্লাহ তাআলা বান্দার দু'আ কবুল না করে ফিরিয়ে দেন। নিম্নে একটি একটি করে সে কারণগুলো উল্লেখ করা হলো-
১) মানুষ যখন আমর বিল মারুফ এবং নাহি আনিল মুনকার (তথা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ) ছেড়ে দেয় তখন এই অস্ত্র ব্যর্থ হয়, সে তার কার্যকারিতা হারায় এবং আল্লাহ তাআলা বান্দার দু'আ ফিরিয়ে দেন। হাদিস শরিফে এসেছে, হুজাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'ওই সত্তার কসম করে বলছি যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করবে। (যদি না করো) তাহলে আল্লাহ তাআলা হয়তো এজন্য তোমাদের ওপর শাস্তি প্রেরণ করবেন। অতঃপর তোমরা দু'আ করবে কিন্তু তিনি তোমাদের দু'আ কবুল করবেন না।'৮৬
সুতরাং হে ভাই ও বোন, আসুন একবার নিজেরাই নিজেদেরকে প্রশ্ন করে দেখি যে, আমরা কি আমর বিল মারুফ এবং নাহি আনিল মুনকার করি, মানুষকে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করি? আমাদের উত্তর যদি 'হ্যাঁ' হয়, তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি না হয়, তাহলে আমাদের দু'আ কীভাবে কবুল হবে? এবং আল্লাহ তাআলা আমাদের দু'আ কেন কবুল করবেন? যখন আমরা নিজেরাই দু'আ কবুলের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছি।
২) মানুষ যখন হারাম খাবার গ্রহণ করবে, তখন তার এই অব্যর্থ অস্ত্র অকেজো হবে। মহান রবের দরবারে তার দু'আ পৌঁছবে না এবং তা কবুলও হবে না। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই কবুল করে থাকেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ওই কাজই করার হুকুম দিয়েছেন যা করার হুকুম তিনি রাসুলদেরকে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে রাসুলগণ! পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং নেক আমল করুন। আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, হে মুমিনগণ! আমরা তোমাদের যে পবিত্র জীবিকা দান করেছি তা থেকে আহার করো।
তারপর তিনি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন যে ব্যক্তি দীর্ঘ সফরের কারণে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে ও কাপড় ধুলোবালিতে ময়লা হয়ে আছে। অতঃপর সে নিজের দুই হাত আকাশের দিকে তুলে ধরে ও বলে, হে রব! হে রব! অথচ তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, সে হারামভাবে লালিত-পালিত হয়েছে; এ অবস্থায় কেমন করে তার দু'আ কবুল হতে পারে। ১৮৭
(৩) মানুষের মধ্যে যখন গুনাহ, প্রতারণা, লোক-ঠকানো, অশ্লীলতা, জিনা-ব্যভিচার বেড়ে যাবে তখন এই অস্ত্র অকেজো হয়ে যাবে এবং তা আল্লাহ তাআলার দরবারে পৌঁছতে ব্যর্থ হবে। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা যখন ওজন ও পরিমাপে কম দেবে, আল্লাহ তাআলা তখন তাদের ওপর বৃষ্টি বন্ধ করে দেবেন। কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে যখন যিনা-ব্যভিচার প্রকাশ পাবে, তখন তাদের মধ্যে মৃত্যু (কঠিন কোনো রোগ যা মৃত্যুর কারণ হবে) ছড়িয়ে পড়বে। কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে যখন সুদ প্রকাশ পাবে, আল্লাহ তাআলা তখন তাদের ওপর পাগলামির বিস্তার ঘটাবেন। আর যে সম্প্রদায়ের মধ্যে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ড প্রকাশ পাবে, একজন অপরজনকে কোনো কারণ ছাড়াই হত্যা করবে, আল্লাহ তাআলা তখন তাদের ওপর তাদের শত্রুদেরকে চাপিয়ে দেবেন। আর যে সম্প্রদায়ের মধ্যে লুত সম্প্রদায়ের কর্মকান্ড (সমকামিতা) প্রকাশ পাবে, তখন তাদের মধ্যে ভূমিধস এবং ভূমিকম্প প্রকাশ পাবে। মানুষ যখন আমর বিল মারুফ এবং নাহি আনিল মুনকার ছেড়ে দেয় তখন তাদের আমল কবুল হয় না এবং তাদের দু'আ কবুল হয় না। ৮৮
এ সকল লোকের ব্যাপারে ইয়াহইয়া ইবনু মুআজ রাহিমাহুল্লাহু বলেন, এরা কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের নামাজের ওপর ঘুমকে প্রাধান্য দেয়। জিহাদের ওপর বাড়িতে স্বস্তিতে বসে থাকাকে প্রাধান্য দেয়।
(৪) মানুষ যখন শেষরাতে ইস্তেগফার করা ছেড়ে দেয়, তখন তাদের দু'আর অস্ত্র অকেজো হয়ে যায়। তাদের দু'আ কবুল হয় না।
(৫) মানুষ যখন রাতের ইবাদত এবং দিনের জিহাদ ছেড়ে দেবে তখন দু'আর অস্ত্র ভোঁতা হয়ে যাবে। তাদের দু'আ আর কবুল হবে না।
টিকাঃ
[৮৬] তিরমিজি।
[৮৭] মুসলিম: ১০১৫।
[৮৮] তাবারানি।