📄 তুমিও হতে পারবে অনেক কিছু
তুমি যদি সালেহিনদের কাতারে শামিল হতে চাও, তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষরাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে দু'আ করতে হবে।
তুমি যদি দরিদ্র হও এবং আল্লাহর নিকট তোমার দারিদ্রতা থেকে মুক্তি কামনা করতে চাও, তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষরাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে দু'আ করতে হবে।
তুমি যদি মাজলুম হয়ে থাকো এবং আল্লাহর নিকট সাহায্য চাও, তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষরাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে দু'আ করতে হবে।
তুমি যদি পাপ ও পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি চাও, তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষ রাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে ক্ষমা চাইতে হবে।
তুমি যদি অসুস্থ হয়ে থাকো এবং আল্লাহ তাআলার নিকট সুস্থতা কামনা করতে চাও, তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষরাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে দু'আ করতে হবে।
তুমি যদি বন্ধ্যা ও নিঃসন্তান হয়ে থাকো এবং তুমি সন্তান কামনা করো; তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষরাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে দু'আ করতে হবে। সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
عليكم بقيام الليل فإنه دأب الصالحين قبلكم، ومقربة لكم إلى ربكم، ومكفرة للسيئات، وملهاة عن الإثم، ومطردة لداء الجسد
'তোমরা অবশ্যই কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদ আদায় করবে। কারণ তা ছিল তোমাদের পূর্ববর্তী সালেহিনদের অভ্যাস ও সাধনা। এর মাধ্যমে তোমাদের রবের নৈকট্য হাসিল হবে। তোমাদের পাপসমূহ মাফ হবে। এটা তোমাদেরকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে রাখবে এবং রুগ্ন-ব্যাধিকে শরীর থেকে দূরে রাখবে। [৫৯]
টিকাঃ
[৫৯] তাবরানি ফিল কাবির।
📄 একটি প্রশ্ন
ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, দিনে নফল নামাজ আদায় করার চেয়ে রাতে নফল নামাজ আদায় করা উত্তম। আর এর তুলনা হলো প্রকাশ্যে সাদাকাহ করা এবং গোপনে সাদাকাহ করার মতো।
রাতের নফল নামাজ দিনের নামাজের চেয়ে উত্তম ও ফজিলতপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো, রাতের নামাজে থাকে অধিক পরিমাণে ইখলাস এবং তা গোপনে হওয়ার কারণে লৌকিকতামুক্ত।
যারা রাত্রি জেগে আল্লাহর ইবাদত করে, সালাত আদায় করে, জিকির- আজকার করে এবং তাঁর নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করে
আল্লাহ তাআলা তাদের প্রশংসা করে বলেন,
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
'তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।'৬০
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ
'এবং শেষরাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী।'৬১
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا 'এবং যারা রাত্রিযাপন করে পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে ও দণ্ডায়মান হয়ে। '৬২
নিশ্চয় যারা রাত্রি জেগে আল্লাহর ইবাদত করে, তার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করে তারা অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাআলা এই দুইজনের মাঝে পার্থক্য করার জন্য বলেন,
أَمَّنْ هُوَ قَانِتُ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
'যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সেজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে ইবাদত করে, পরকালের আশঙ্কা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না; বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।'৬৩
রাতে দু'আ-ইবাদতকারীদের বৈশিষ্ট্য-
* আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ভালোবাসেন। * আল্লাহ তাআলা তাদের নিয়ে গর্ব করেন। * আল্লাহ তাআলা তাদের দু'আ কবুল করেন।
আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা তিন প্রকার মানুষকে ভালোবাসেন, তাদেরকে দেখে তিনি হাসেন এবং তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান করেন।
১. ওই ব্যক্তি, যখন যুদ্ধের জন্য বাহিনী প্রকাশ পায় তখন সে আল্লাহ তাআলাকে খুশি করার জন্য নিজের সর্বস্ব দিয়ে যুদ্ধ করে। অতঃপর হয়তো সে শহিদ হয় নয়তো আল্লাহ তাআলা তাকে বিজয় দান করেন। তখন আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদেরকে) বলেন, তোমরা আমার এই বান্দাকে দেখো, কীভাবে সে আমার জন্য ধৈর্যধারণ করেছে।
২. ওই ব্যক্তি যার সুন্দর স্ত্রী রয়েছে এবং নরম সুন্দর বিছানা রয়েছে, কিন্তু সে রাতে উঠে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে, তার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করে। তখন আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদের নিকট গর্ব করে) বলেন, আমার বান্দা শাহওয়াত ও প্রবৃত্তিকে ছুড়ে ফেলে আমার জিকির করছে, সে চাইলে তো শুয়েও থাকতে পারত।
৩. ওই ব্যক্তি, যে এক মুসাফির দলের সাথে সফর করে, যারা রাত্রির প্রথমে চলতে থাকে অতঃপর বিশ্রামের জন্য ঘুমিয়ে যায় আর সে সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় শেষরাতে উঠে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে, তার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করে। ৬৪
সালাফদের একজন বলেছেন, কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের নামাজে দীর্ঘ তেলাওয়াত এবং রাতের শেষভাগে আল্লাহর নিকট দু'আ-ইস্তেগফার কিয়ামতের দিনের সেই দীর্ঘ দণ্ডায়মানকে সহজ করে দেবে। এখানে অনেকেই একটা প্রশ্ন করতে পারেন যে, কীভাবে শেষরাতে জাগ্রত হওয়া যায়?
রাত্রিতে উঠে আল্লাহ তাআলার ইবাদত-বন্দেগি করা এবং তার নিকট দু'আ- ইস্তেগফার করতে পারার জন্য অনেকগুলো শর্ত রয়েছে, নিম্নে কয়েকটি শর্ত পেশ করা হলো-
* মন থেকে সত্যিসত্যিই ইখলাসের সাথে রাতে উঠার ব্যপারে আন্তরিক হতে হবে।
* অন্তরকে সকল ধরনের হিংসা-বিদ্ধেষ থেকে মুক্ত রেখে তাতে একমাত্র আল্লাহ ও আখিরাতের চিন্তাকেই স্থান দিতে হবে। দাউদ আত তাঈ রাহিমাহুল্লাহ শেষরাতে আল্লাহ তাআলার নিকট মুনাজাত করে বলতেন, হে আল্লাহ! আমার অন্তরে তোমার চিন্তার সামনে আমার অন্য সকল চিন্তা বিলীন হয়ে গেছে। এখন শুধুমাত্র তোমার চিন্তাই বাকি রয়েছে। তোমার চিন্তা আমার মাঝে এবং নিদ্রাহীন রাত্রিযাপনের মাঝে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে।
আল্লাহর ভয় এবং দুনিয়াবিমুখতা। কারণ যে আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় পায় সে নিদ্রাহীন থাকে, আর যে নিদ্রাহীন থাকে সেই তার উদ্দেশ্যে পৌঁছতে পারে। কারণ যে ব্যক্তি আখিরাতের ভয়াবহতা এবং জাহান্নামের কঠিন শাস্তি নিয়ে চিন্তা করে তার ঘুম চলে যায় এবং সে এর থেকে বাঁচার জন্য সতর্ক হয়। যেমন: তাউস রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয় জাহান্নামের চিন্তাই আবেদদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর নেককার বান্দারা তো সেই দিন থেকেই কিয়ামুল লাইল তথা রাত জেগে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি এবং তার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার এর ব্যাপারে পূর্ণ সজাগ থাকে, যেদিন এই আয়াত প্রথম তেলাওয়াত হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
'তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।'৬৫
কিয়ামুল লাইলের ব্যাপারে হাদিসে এসেছে,
عَنْ عَلِيَّ، قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " إِنَّ فِي الْجَنَّةِ غُرَفًا تُرَى ظُهُورُهَا مِنْ بُطُونِهَا وَبُطُونُهَا مِنْ ظُهُورِهَا " . فَقَامَ أَعْرَابِيُّ فَقَالَ لِمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ " لِمَنْ أَطَابَ الْكَلَامَ وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ وَأَدَامَ الصَّيَامَ وَصَلَّى لِلَّهِ بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامُ
'আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে একটি প্রাসাদ রয়েছে যার ভেতর থেকে বাহির এবং বাহির থেকে ভেতর দেখা যাবে। তখন জনৈক বেদুইন (গ্রাম্য ব্যক্তি) উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এটি কার হবে? তিনি বললেন, এটি হবে তার যে ভালো কথা বলে, অন্যকে আহার করায়, সর্বদা রোজা রাখে এবং যখন রাতে সব মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন সে উঠে সালাত (তাহাজ্জুদ) আদায় করে। ৬৬
শেষরাতে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করা এবং তার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করতে পারার আরেকটি মাধ্যম হলো, আল্লাহর মুহব্বত। আল্লাহ তাআলাকে যদি কেই সত্যিকারের মুহব্বত করে, তাহলে সে অবশ্যই অবশ্যই আঁধার রাতে তাহাজ্জুদ পড়বে।
এক আবেদ বলেছেন, রাতের আগমন আমার মধ্যে একধরনের আনন্দের প্লাবন নিয়ে আসে। কারণ, আমি তখন আমার রবের সাথে একান্তে কথা বলতে পারি। আর দিনের আগমন আমার মধ্যে দুঃখের ছায়া ফেলে।
আলি আল বাক্কার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, গত চল্লিশ বছরে দিবসের আগমনের চেয়ে দুঃখের কিছু নেই আমার কাছে।
শদের ক্ষেপণাস্ত্র কত দূরে আঘাত হানে? বড়োজোড় আট হাজার বা দশ হাজার মাইল? কিন্তু প্রিয় ভাই ও বোন, তুমি কি জানো দু'আর পাল্লা কত মাইল? দু'আর অস্ত্র মহাকাশ অতিক্রম করে আল্লাহর আরশে গিয়ে পৌছে। এবার শোনো দু'আ কি করতে পারে-
টিকাঃ
[৬০] সুরা সাজদাহ: ১৬।
[৬১] সুরা আলে ইমরান: ১৭।
[৬২] সুরা ফুরকান: ৬৪।
[৬৩] সুরা ঝুমার: ৯।
[৬৪] আত তারগিব ওয়াত তারহিব: ১/২৪৫।
[৬৫] সুরা সাজদাহ: ১৬।
[৬৬] তিরমিজি: ১৯৯০।
📄 জাহান্নামের ভয়ে কাঁদি
সুহাইব নামে এক আল্লাহর ওলি রাত্রিজাগরণ করতেন, রাতে মুনাজাতে অনেক কাঁদতেন। অধিক পরিমাণে রাত্রিজাগরণ এবং ক্রন্দনের কারণে কেউ কেউ তাকে তিরস্কারও করত। একবার তার দাসিরা তাকে বলল, সুহাইব, আপনি তো নিজেকে ধ্বংস করে দেবেন। তিনি তখন বললেন, সুহাইবের যখন জান্নাতের কথা স্মরণ হয় তখন তার লোভ সামলাতে পারে না। আর যখন জাহান্নামের কথা স্মরণ হয় তখন ভয়ে তার ঘুম আসে না।
হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র। মহিমাময়। আপনি আমাদের সঠিক পথ দেখান। একাকী নির্জন পথে আপনি আমাদের সঙ্গী হন। আপনি যার পথের পথ-প্রদর্শক হবেন না তার জন্য তো পথ অনেক সঙ্কীর্ণ এবং বিপদসংকুল। আপনি যার পথের সঙ্গী হবেন না তার পথ তো অনেক নির্জন ও ভয়ংকর। সুতরাং হে মাবুদ আপনি আমাদের নির্জন পথে সঙ্গী হয়ে যান। আমাদের সঠিক পথ দেখান।
হে আল্লাহ, যে অন্তরে আপনার মুহব্বত রয়েছে, তা কতই-না সুখী ও সৌভাগ্যবান। যার অন্তরে আপনার মুহব্বত রয়েছে, তার নিকট আপনার চিন্তা এবং আপনার অনুভব সকল কিছুর চেয়ে প্রিয় এবং মজাদার। গোপনে মুনাজাতে আপনার সাথে কথা বলার চেয়ে প্রিয় ও মজার কিছু নেই তার কাছে। আর যেই অন্তরে আপনার ভয় রয়েছে সে অন্তর কতই-না সৌভাগ্যবান। আপনার ভয়ের কারণে সে সকল ধরনের নাফরমানি ও অবাধ্যতার কাজ থেকে বিরত থাকে।
প্রিয় ভাই ও বোন! যার আল্লাহ আছে, দুনিয়ার সকল কিছু হারালেও তার কোনো ক্ষতি নেই এবং আল্লাহ তাআলা যার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছেন দুনিয়ার সকলেই তার শত্রু হয়ে গেলেও তার কোনো ভয় নেই। যে বলেছে সে কতই-না সুন্দর বলেছে।
সৌভাগ্যবান সে, যে আপনার বন্ধুত্ব ও আনুগত্য নিয়ে সকাল করে, যদিও আসক্তির যন্ত্রণা তাকে দগ্ধ করে।
যার জন্য আপনি আছেন, দুনিয়ার কোনো কিছু না থাকলেও তার কোনো ক্ষতি নেই। আপনি যার প্রতি সন্তুষ্ট, মানুষ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হলেও তার কোনো পরোয়া নেই।
হে আল্লাহ, আপনিই তো অন্তরের যন্ত্রণার উপশম এবং মনের ব্যাধির প্রতিষেধক।
সুতরাং হে ভাই ও বোন! আপনারা বেশি বেশি আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করুন। আপনাদের মনের কথা গোপনে আল্লাহ তাআলাকে খুলে বলুন। তাঁকে আপনার প্রয়োজনের কথা বলুন। আপনার সুখের কথা বলুন, আপনার দুঃখের কথা বলুন। দুনিয়ার মানুষ যেখানে চাইলে অখুশি হয়, আর না চাইলে খুশি হয়, আর আল্লাহ চাইলে খুশি হন, আর না চাইলে অসন্তুষ্ট হন। সুতরাং আপনি বেশি বেশি আল্লাহ তাআলার নিকট চান, আল্লাহ তাআলা আপনার দু'আ কবুল করবেন। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত দু'আ কবুলকারী আর কেউ নেই। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ ۚ أَإِلَٰهُ مَّعَ اللَّهِ ۚ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ
'বলো তো কে নিরুপায়ের ডাকে সাড়া দেন যখন সে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে পূর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত করেন। সুতরাং আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই চিন্তা-ফিকির করো। '৭৬
দু'আ হলো মুমিনের অস্ত্র। আর অস্ত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন তা হয় মজবুত ও ধারালো, তার ব্যবহারকারী হয় দক্ষ ও শক্তিশালী এবং তার সামনে থাকে না কোনো বাধা ও প্রতিবন্ধকতা। সুতরাং আল্লাহ তাআলার সাথে যার সম্পর্ক যত বেশি দু'আর অস্ত্র চালনায় সে তত বেশি শক্তিশালী। দু'আ কবুলের প্রতিবন্ধকতা হলো হারাম মাল ভক্ষণ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, প্রতিবেশীর হক নষ্ট করাসহ আল্লাহ তাআলার প্রতিটি নাফরমানির কাজ। আর যে দু'আ করা হয় আশা, ভরসা, ভয় এবং কাকুতি-মিনতির সাথে চোখের অশ্রু ফেলে সেই দু'আ হয় মজবুত ও শক্তিশালী। সুতরাং যার মধ্যে এই তিনটা বিষয় যত বেশি থাকবে তার দু'আ তত দ্রুত কবুল হবে। ইনশাআল্লাহ।
সুতরাং তোমরা দু'আর অস্ত্র কার্যকর করার জন্য বেশি বেশি প্রশিক্ষণ নাও। কারণ শিক্ষা ব্যতীত ইলম নেই, ধৈর্যধারণ ব্যতীত ধৈর্য নেই। সহনশীল হওয়া ব্যতীত সহনশীলতা নেই।
টিকাঃ
[৭৬] সুরা নামল: ৬২।
📄 জান্নাতের দরজাসমূহ কীভাবে খুলবে?
দু'আ-মুনাজাত ও আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতির মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সেই জান্নাতের দরজা খুলে দেন, যার প্রশস্থতা আসমান ও জমিনের চেয়ে বড়ো, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَنَعِيمٍ فَاكِهِينَ بِمَا آتَاهُمْ رَبُّهُمْ وَوَقَاهُمْ رَبُّهُمْ عَذَابَ ا- الْجَحِيمِ
'নিশ্চয় খোদাভীরুরা থাকবে জান্নাতে ও নিয়ামতে। তারা উপভোগ করবে যা তাদের পালনকর্তা তাদের দেবেন এবং তিনি জাহান্নামের আজাব থেকে তাদের রক্ষা করবেন। '৭৭
وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ إِنَّا كُنَّا مِن قَبْلُ نَدْعُوهُ ، إِنَّهُ هُوَ الْبَرُّ الرَّحِيمُ
'তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তারা বলবে, আমরা ইতঃপূর্বে নিজেদের বাসগৃহে ভীত- কম্পিত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। আমরা পূর্বেও আল্লাহকে ডাকতাম, তাঁর নিকট দু'আ করতাম। তিনি সৌজন্যশীল, পরম দয়ালু।'৭৮
আল্লামা সাদি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ) وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।) অর্থাৎ তারা একে অপরকে তাদের দুনিয়ার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে। এরপর তারা জান্নাতের এই নিয়ামত পেয়ে আনন্দ ও খুশিতে একে অপরকে বলতে থাকবে, ) قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ তারা বলবে, আমরা ইতঃপূর্বে নিজেদের বাসগৃহে ভীত-কম্পিত ছিলাম) অর্থাৎ আমরা দুনিয়াতে ছিলাম ভীত ও শঙ্কিত। আমরা আল্লাহর আজাবের ভয়ে দুনিয়াতে গুনাহ ও নাফরমানির কাজ ছেড়ে দিয়েছিলাম এবং আমাদের দোষ-ত্রুটিগুলো সংশোধন করে নিয়েছিলাম।
فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ ) আর এর ফলাফল হলো আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শান্তি থেকে রক্ষা করেছেন।) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন, নেক কাজ করার তাওফিক দিয়েছেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেছেন। এরপর তারা তাদের অবস্থা এবং এই সফলতার কারণ নিয়ে আলোচনা করবে যে, إِنَّا كُنَّا مِن قَبْلُ نَدْعُوهُ ، إِنَّهُ هُوَ الْبَرُّ الرَّحِيمُ) আমরা পূর্বেও আল্লাহকে ডাকতাম। তিনি সৌজন্যশীল, পরম দয়ালু) অর্থাৎ আমরা আল্লাহ তাআলার নিকট এই দু'আ ও প্রার্থনা করতাম যে, তিনি যেন আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে জান্নাত দান করেন। সুতরাং তিনি তার দয়া ও অনুগ্রহে আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে জান্নাত দান করেছেন।
প্রিয় ভাই! তাদের এই সফলতা এবং মুক্তির কারণ হলো তারা আখিরাত সম্পর্কে সদা সতর্ক থাকত, তারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করত, তার সামনে হিসাব দেওয়ার বিষয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকত, অনুরুপভাবে তারা তাদের পরিবারের নিকট ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় থাকত, কারণ সেখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের ফেতনা, ধোঁকা ও প্রতারণা। কিন্তু তারা সেই ফেতনা ও ধোঁকায় না পড়ে মহান রবের দরবারে দুই হাত তুলে তাদের প্রয়োজনের কথা, তাদের ভয় ও আশঙ্কার কথা বলত এবং আল্লাহ তাআলার নিকট কাকুতিমিনতি করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাইত এবং জান্নাত কামনা করত। কারণ তারা জানত যে, আল্লাহ তাআলা হলেন দয়ালু, তিনি রহমান ও রহিম। তিনি বান্দার দু'আ শোনেন এবং তা কবুল করেন।
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ليس شيء أكرم على الله من الدعاء
'আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আর চেয়ে প্রিয় এবং সম্মানিত আর কিছু নেই। '৭৯
এক যুদ্ধের ব্যাপারে মুগিরা ইবনু হাবিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা যখন শত্রুর মুখোমুখি হলাম তখন আব্দুল্লাহ ইবনু গানেম বললেন, এই তো জান্নাত সুসজ্জিত করা হয়ে গেছে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এই দুনিয়াতে বুদ্ধিমান লোকেরা থাকার কামনা করতে পারে না। ওয়াল্লাহি! আমার নিকট যদি শেষরাতে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে তেলাওয়াত করা, রাতের অন্ধকারে একাকী আল্লাহর সামনে মাটিতে মাথা রেখে সিজদাহ করা এবং নির্জন প্রার্থনায় আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাত চাওয়া ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করা প্রিয় না হত, তাহলে আমি এই দুনিয়া এবং দুনিয়াবাসীদের থেকে পৃথক হওয়া কামনা করতাম। এরপর তিনি তার তরবারির খাপ ভেঙে ফেললেন এবং সামনে অগ্রসর হয়ে জিহাদ করতে করতে শহিদ হলেন। অতঃপর তাকে যখন দাফন করা হলো, তার কবর থেকে মিশকের সুঘ্রাণ বের হতে থাকে।
এর কিছুদিন পর তাকে এক লোক স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞাসা করল, হে আবু সুরাকা! তোমার কি অবস্থা? তিনি উত্তরে বলেন, ভালো, অনেক ভালো। লোকটি আবার তাকে প্রশ্ন করল তুমি এখন কোথায় আছ? সে বলল, জান্নাতে। লোকটি আবার তাকে প্রশ্ন করল, কীসের বিনিময়ে? সে বলল, আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, দীর্ঘ তাহাজ্জুদ, রোজা রেখে পিপাসায় গলা শুকানো এবং অধিক দু'আর কারণে।
এরপর সে আবার তাকে প্রশ্ন করল, আপনার কবর থেকে যে সুঘ্রাণ বের হচ্ছে তা কীসের? সে বলল, এটা হলো কুরআন তেলাওয়াত এবং রোজায় পিপাসিত থাকার ঘ্রাণ। লোকটি এবার তাকে বলল, আমাকে কিছু নসিহত করুন! সে বলল, তোমাকে সকল কল্যাণকর কাজের নসিহত করছি।
এরপর লোকটি আবারো তাকে বলল, আমাকে কিছু নসিহত করুন। সে বলল, তুমি নিজের জন্য নেকি অর্জন করো। একটি রাতও যেন তোমার আল্লাহর দরবারে দু'আ-মুনাজাত থেকে খালি না যায়। আমি আবরারদেরকে দেখেছি তারা পুণ্যের বিনিময় পুণ্য পেয়েছেন।
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন,
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ (২২) عَلَى الْأَرَائِكِ يَنْظُرُونَ (২৫) تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعِيمِ (২৪) يُسْقَوْنَ مِنْ رَحِيقٍ مَخْتُومٍ (২৫) خِتَامُهُ مِسْكُ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ (২৬) وَمِزَاجُهُ مِنْ تَسْنِيمٍ (২৭) عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُونَ
'নিশ্চয় সৎলোকগণ থাকবে পরম আরামে, সিংহাসনে বসে অবলোকন করবে। আপনি তাদের মুখমন্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবেন। তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় পান করানো হবে। তার মোহর হবে কস্তুরী। এ বিষয়ে প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত। তার মিশ্রণ হবে তসনিমের পানি। এটা একটা ঝরনা, যার পানি পান করবে নৈকট্যশীলগণ। ৮০
সুতরাং হে ভাই! তুমি যদি তাদের মতো হতে চাও, তাহলে তোমাকে বেশি বেশি মহান আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করতে হবে। তার নিকট জান্নাত চাইতে হবে, জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করতে হবে। যেমন জান্নাতিরা পরস্পর আলাপকালে বলবে,
قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ (২৬) فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ (২৭) إِنَّا كُنَّا مِنْ قَبْلُ نَدْعُوهُ إِنَّهُ هُوَ الْبَرُّ الرَّحِيمُ
'আমরা ইতঃপূর্বে নিজেদের বাসগৃহে ভীত-কম্পিত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। আমরা পূর্বেও আল্লাহকে ডাকতাম। তিনি সৌজন্যশীল, পরম দয়ালু। ৮১
তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করে বলবে, হে আল্লাহ, আমি একজন ভিখারির ন্যায় আপনার দরবারে এসেছি। আপনি আমার প্রতি দয়া করুন। আমাকে ক্ষমা করুন। আপনার রহমতের ছায়াতলে আমাকে আশ্রয় দিন। আমাকে বঞ্চিতদের কাতারে ফেলবেন না।
হে আল্লাহ, আপনি আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাত দান করুন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদেরকে নেককার, সালেহিন, সাদেকিন এবং শুহাদাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। হ্যাঁ, তুমি এভাবে আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করতে থাকো। ইনশাআল্লাহ তিনি তোমার দু'আ কবুল করবেন।
টিকাঃ
[৭৭] সুরা তুর: ১৭-১৮।
[৭৮] সুরা তুর: ২৫-২৮।
[৭৯] আল মুসতাদ রাক: ১৮৪৪।
[৮০] সুরা মুতাফফিন: ২২-২৮।
[৮১] সুরা তুর: ২৬-২৮।