📄 আল্লাহ তাআলাই হলেন সাহায্যকারী
হে আল্লাহ, আপনিই আমাদের সাহায্যকারী, আমাদেরকে এই বিপদ থেকে উদ্ধারকারী। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের সাহায্য করুন। এই বিপদ থেকে উদ্ধার করুন।
হে আল্লাহ! আপনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। হে অন্তরসমূহকে পরিবর্তনকারী। আপনি তো পথভ্রষ্টকে হেদায়েত দান করেন, ফকিরকে ধনী বানান, গুনাহসমূহ ক্ষমা করেন, মানুষের দোষত্রুটি গোপন করেন, মাজলুমকে সাহায্য করেন।
হে পরাক্রমশালী মাবুদ, আপনি আমাদের অবস্থাকে পরিবর্তন করে দিন। আমাদেরকে আপনার প্রিয় বান্দা বানিয়ে দিন। আমাদেরকে রাতের সন্যাসী আর দিনের লড়াকু বীর বানিয়ে দিন।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের ইসলামের খাদিম বানান। আপনার দ্বীনের জন্য আমাদের কবুল করেন।
أتهزأ بالدعاء وتزدريه وما تدري بما صنع الدعاء
سهام الليل لا تخطي ولكن لها أمد وللأمد انقضاء
'তুমি কি দু'আ নিয়ে ঠাট্টা করো এবং তাকে তুচ্ছ মনে করো? তুমি তো জানো না যে দু'আ কি করতে পারে। রাতের তীর কখনো লক্ষভ্রষ্ট হয় না। কিন্তু তার নির্দিষ্ট একটা সময় রয়েছে সেই সময়েই তা কবুল হবে।'
📄 কার মাধ্যমে উম্মাহর বিজয় আসবে?
এই উম্মাহর বিজয় আসবে ওইসকল আবেদিন, সালেহিন, সাদেকিন ও মুজাহিদিনদের মাধ্যমে, যারা কুরআন-হাদিসকে অনুসরণ করে। তাদের পরিচয় হলো:
'তারা হলো রাতের ইবাদতকারী। রাতের অন্ধকার যখন গভীর হয় তারা তখন রবের দরবারে অশ্রু ঝরায়। লুকায়িত সিংহ। জিহাদের ডাক আসলে মৃত্যুর দিকে ছুটে যায়, আর এটাকে তারা স্বপ্ন পূরণের মাধ্যম বানায়।'
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহু বলেন, কুরআন তেলাওয়াতকারী তিন প্রকার। (১) যারা কুরআনকে পণ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
(২) যারা কুরআনের হুদুদ বাদ দিয়ে শুধু হরফকে গ্রহণ করে।
(৩) যারা কুরআনকে তাদের অন্তরের প্রতিষেধক হিসেবে গ্রহণ করে এবং কুরআনকে নিজেদের পথপ্রদর্শক বানায়।
এই তৃতীয় প্রকার লোকদের মাধ্যমেই উম্মাহর বিজয় আসবে। এবং এদের কারণেই জমিনে বৃষ্টি বর্ষণ হয়।
ইয়ামামার যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যবাহিনী যখন মুসাইলামাতুল কাজজাব ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সারিবদ্ধ হলো তখন মুহাজিরদের ঝান্ডাবাহী হযরত সালেম মাওলা আবি হুজায়ফাকে মুসলমানরা বলল, আমরা আশঙ্কা করছি যে, আপনার দিক থেকে (শত্রুর) আক্রমণ আসবে। তখন তিনি বলেছিলেন, যদি আমার দিক থেকে আক্রমণ আসে তাহলে আমি কতই-না নিকৃষ্ট কুরআনের বাহক।
কুতাইবা ইবনু মুসলিম রহ. যেদিন তুরকিদের মুখোমুখি হন, তার আগের রাতে তিনি আল্লাহর ইবাদত করে এবং তাঁর নিকট দু'আ-মুনাজাতে প্রচুর পরিমাণে কান্নাকাটি করেন। অতঃপর সকালে মুহাম্মদ ইবনুল ওয়াসির ব্যাপারে লোকদের নিকট জিজ্ঞেস করেন যে, তিনি এখন কোথায়? লোকেরা তাকে খুঁজতে খুঁজতে তার তাবুর কাছে এসে দেখেন, তিনি নামাজ আদায় করছেন এবং আসমানের দিকে আঙুল তুলে আল্লাহর দরবারে দু'আ করছেন। তারা কুতাইবা ইবনু মুসলিমের নিকট ফিরে এসে তার এ অবস্থা বর্ণনা করল। কুতাইবা ইবনু মুসলিম তখন বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, মুহাম্মদ ইবনু ওয়াসির একটা আঙুল আমার নিকট এক হাজার ধারালো তরবারির চেয়ে এবং এক হাজার সুঠাম দেহী যুবকের চেয়েও উত্তম।
আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন মিশরের বাবেলিয়নদের দূর্গ অবরোধ করলেন, তখন তিনি হজরত উমর ইবন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু- এর নিকট চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী পাঠানোর অনুরোধ করে একটি চিঠি পাঠিয়ে তাতে লিখেন, এদের সাহায্যে তিনি পূর্ণ মিশর বিজয় সম্পন্ন করতে চান। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু জুবাইর ইবনলু আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নেতৃত্বে মাত্র চারজন লোকের একটি কাফেলা পাঠালেন এবং আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট চিঠিতে লিখলেন, আমি তোমার নিকট জুবাইর ইবনলু আওয়ামের নেতৃত্বে চারজন লোক পাঠিয়েছি। যাদের প্রত্যেকে এক হাজার লোকের সমান। আর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একথা বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন, 'যেই বাহিনীর মধ্যে মিকদাদ থাকবে আল্লাহর ইচ্ছায় তারা কখনো পরাজিত হবে না।'
হ্যাঁ! এমন লোকদের মাধ্যমেই উম্মাহর বিজয় আসে। এরা সর্বদা আল্লাহর জিকির করতে থাকে। তাদের চেহারা দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের নুর বিচ্ছুরিত হতে থাকে। এদের ব্যাপারে হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
من عادى لي ولياً فقد آذنته بالحرب 'যে আমার ওলির সাথে শত্রুতা করবে আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি।'
এরাই তো ওইসকল লোক, যাদের মধ্য থেকে কেউ যখন বলে, হে আমার রব! সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমার কী প্রয়োজন বলো, হে আমার বান্দা? এরা তো রাতের অন্ধকারে আল্লাহর ইবাদত করে এবং তাহাজ্জুদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আর তির নিক্ষেপ করে। আল্লাহ তাআলা যখন নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবুওয়াতের মহান দায়িত্ব দিলেন তখন ওহির মাধ্যমে তাকে বলে দিলেন,
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا نِصْفَهُ أَوِ انقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلًا ثَقِيلًا إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا
'হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রিতে দণ্ডায়মান হোন কিছু অংশ বাদ দিয়ে; অর্ধরাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছু কম অথবা তদপেক্ষা বেশি এবং কুরআন তেলাওয়াত করুন সুবিন্যস্তভাবে ও স্পষ্টভাবে। আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। নিশ্চয় ইবাদতের জন্যে রাত্রিতে ওঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল।'৫৭
নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সাহাবিদেরকে তাহাজ্জুদ ও রাতে আল্লাহর দরবারে দু'আ মুনাজাতের ওপর অভ্যস্ত করে গড়ে তুলেছেন। যেমন: আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন-
إِنَّ رَبَّكَ يَعْلَمُ أَنَّكَ تَقُومُ أَدْنَى مِن ثُلُثَيِ اللَّيْلِ وَنِصْفَهُ وَثُلُثَهُ وَطَائِفَةٌ مِّنَ الَّذِينَ مَعَكَ
'আপনার পালনকর্তা জানেন, আপনি ইবাদতের জন্যে দণ্ডায়মান হোন রাত্রির প্রায় দুই তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ ও তৃতীয়াংশ এবং আপনার সঙ্গীদের একটি দলও দণ্ডায়মান হয়। '৫৮
কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তাহাজ্জুদের জন্য একমাত্র খাঁটি মুনিনগণ উঠতে পারেন কারণ মুনাফিক তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে পারে না।
টিকাঃ
[৫৭] সুরা মুজাম্মিল: ১-৬।
[৫৮] সুরা মুজাম্মিল: ২০।
📄 তুমিও হতে পারবে অনেক কিছু
তুমি যদি সালেহিনদের কাতারে শামিল হতে চাও, তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষরাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে দু'আ করতে হবে।
তুমি যদি দরিদ্র হও এবং আল্লাহর নিকট তোমার দারিদ্রতা থেকে মুক্তি কামনা করতে চাও, তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষরাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে দু'আ করতে হবে।
তুমি যদি মাজলুম হয়ে থাকো এবং আল্লাহর নিকট সাহায্য চাও, তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষরাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে দু'আ করতে হবে।
তুমি যদি পাপ ও পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি চাও, তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষ রাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে ক্ষমা চাইতে হবে।
তুমি যদি অসুস্থ হয়ে থাকো এবং আল্লাহ তাআলার নিকট সুস্থতা কামনা করতে চাও, তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষরাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে দু'আ করতে হবে।
তুমি যদি বন্ধ্যা ও নিঃসন্তান হয়ে থাকো এবং তুমি সন্তান কামনা করো; তাহলে অবশ্যই তোমাকে শেষরাতে তাহাজ্জুদে তেলাওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করে দু'আ করতে হবে। সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
عليكم بقيام الليل فإنه دأب الصالحين قبلكم، ومقربة لكم إلى ربكم، ومكفرة للسيئات، وملهاة عن الإثم، ومطردة لداء الجسد
'তোমরা অবশ্যই কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদ আদায় করবে। কারণ তা ছিল তোমাদের পূর্ববর্তী সালেহিনদের অভ্যাস ও সাধনা। এর মাধ্যমে তোমাদের রবের নৈকট্য হাসিল হবে। তোমাদের পাপসমূহ মাফ হবে। এটা তোমাদেরকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে রাখবে এবং রুগ্ন-ব্যাধিকে শরীর থেকে দূরে রাখবে। [৫৯]
টিকাঃ
[৫৯] তাবরানি ফিল কাবির।
📄 একটি প্রশ্ন
ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, দিনে নফল নামাজ আদায় করার চেয়ে রাতে নফল নামাজ আদায় করা উত্তম। আর এর তুলনা হলো প্রকাশ্যে সাদাকাহ করা এবং গোপনে সাদাকাহ করার মতো।
রাতের নফল নামাজ দিনের নামাজের চেয়ে উত্তম ও ফজিলতপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো, রাতের নামাজে থাকে অধিক পরিমাণে ইখলাস এবং তা গোপনে হওয়ার কারণে লৌকিকতামুক্ত।
যারা রাত্রি জেগে আল্লাহর ইবাদত করে, সালাত আদায় করে, জিকির- আজকার করে এবং তাঁর নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করে
আল্লাহ তাআলা তাদের প্রশংসা করে বলেন,
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
'তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।'৬০
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ
'এবং শেষরাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী।'৬১
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا 'এবং যারা রাত্রিযাপন করে পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে ও দণ্ডায়মান হয়ে। '৬২
নিশ্চয় যারা রাত্রি জেগে আল্লাহর ইবাদত করে, তার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করে তারা অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাআলা এই দুইজনের মাঝে পার্থক্য করার জন্য বলেন,
أَمَّنْ هُوَ قَانِتُ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
'যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সেজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে ইবাদত করে, পরকালের আশঙ্কা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না; বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।'৬৩
রাতে দু'আ-ইবাদতকারীদের বৈশিষ্ট্য-
* আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ভালোবাসেন। * আল্লাহ তাআলা তাদের নিয়ে গর্ব করেন। * আল্লাহ তাআলা তাদের দু'আ কবুল করেন।
আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা তিন প্রকার মানুষকে ভালোবাসেন, তাদেরকে দেখে তিনি হাসেন এবং তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান করেন।
১. ওই ব্যক্তি, যখন যুদ্ধের জন্য বাহিনী প্রকাশ পায় তখন সে আল্লাহ তাআলাকে খুশি করার জন্য নিজের সর্বস্ব দিয়ে যুদ্ধ করে। অতঃপর হয়তো সে শহিদ হয় নয়তো আল্লাহ তাআলা তাকে বিজয় দান করেন। তখন আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদেরকে) বলেন, তোমরা আমার এই বান্দাকে দেখো, কীভাবে সে আমার জন্য ধৈর্যধারণ করেছে।
২. ওই ব্যক্তি যার সুন্দর স্ত্রী রয়েছে এবং নরম সুন্দর বিছানা রয়েছে, কিন্তু সে রাতে উঠে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে, তার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করে। তখন আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতাদের নিকট গর্ব করে) বলেন, আমার বান্দা শাহওয়াত ও প্রবৃত্তিকে ছুড়ে ফেলে আমার জিকির করছে, সে চাইলে তো শুয়েও থাকতে পারত।
৩. ওই ব্যক্তি, যে এক মুসাফির দলের সাথে সফর করে, যারা রাত্রির প্রথমে চলতে থাকে অতঃপর বিশ্রামের জন্য ঘুমিয়ে যায় আর সে সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় শেষরাতে উঠে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে, তার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করে। ৬৪
সালাফদের একজন বলেছেন, কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের নামাজে দীর্ঘ তেলাওয়াত এবং রাতের শেষভাগে আল্লাহর নিকট দু'আ-ইস্তেগফার কিয়ামতের দিনের সেই দীর্ঘ দণ্ডায়মানকে সহজ করে দেবে। এখানে অনেকেই একটা প্রশ্ন করতে পারেন যে, কীভাবে শেষরাতে জাগ্রত হওয়া যায়?
রাত্রিতে উঠে আল্লাহ তাআলার ইবাদত-বন্দেগি করা এবং তার নিকট দু'আ- ইস্তেগফার করতে পারার জন্য অনেকগুলো শর্ত রয়েছে, নিম্নে কয়েকটি শর্ত পেশ করা হলো-
* মন থেকে সত্যিসত্যিই ইখলাসের সাথে রাতে উঠার ব্যপারে আন্তরিক হতে হবে।
* অন্তরকে সকল ধরনের হিংসা-বিদ্ধেষ থেকে মুক্ত রেখে তাতে একমাত্র আল্লাহ ও আখিরাতের চিন্তাকেই স্থান দিতে হবে। দাউদ আত তাঈ রাহিমাহুল্লাহ শেষরাতে আল্লাহ তাআলার নিকট মুনাজাত করে বলতেন, হে আল্লাহ! আমার অন্তরে তোমার চিন্তার সামনে আমার অন্য সকল চিন্তা বিলীন হয়ে গেছে। এখন শুধুমাত্র তোমার চিন্তাই বাকি রয়েছে। তোমার চিন্তা আমার মাঝে এবং নিদ্রাহীন রাত্রিযাপনের মাঝে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে।
আল্লাহর ভয় এবং দুনিয়াবিমুখতা। কারণ যে আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় পায় সে নিদ্রাহীন থাকে, আর যে নিদ্রাহীন থাকে সেই তার উদ্দেশ্যে পৌঁছতে পারে। কারণ যে ব্যক্তি আখিরাতের ভয়াবহতা এবং জাহান্নামের কঠিন শাস্তি নিয়ে চিন্তা করে তার ঘুম চলে যায় এবং সে এর থেকে বাঁচার জন্য সতর্ক হয়। যেমন: তাউস রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয় জাহান্নামের চিন্তাই আবেদদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর নেককার বান্দারা তো সেই দিন থেকেই কিয়ামুল লাইল তথা রাত জেগে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি এবং তার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার এর ব্যাপারে পূর্ণ সজাগ থাকে, যেদিন এই আয়াত প্রথম তেলাওয়াত হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
'তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।'৬৫
কিয়ামুল লাইলের ব্যাপারে হাদিসে এসেছে,
عَنْ عَلِيَّ، قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " إِنَّ فِي الْجَنَّةِ غُرَفًا تُرَى ظُهُورُهَا مِنْ بُطُونِهَا وَبُطُونُهَا مِنْ ظُهُورِهَا " . فَقَامَ أَعْرَابِيُّ فَقَالَ لِمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ " لِمَنْ أَطَابَ الْكَلَامَ وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ وَأَدَامَ الصَّيَامَ وَصَلَّى لِلَّهِ بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامُ
'আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে একটি প্রাসাদ রয়েছে যার ভেতর থেকে বাহির এবং বাহির থেকে ভেতর দেখা যাবে। তখন জনৈক বেদুইন (গ্রাম্য ব্যক্তি) উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এটি কার হবে? তিনি বললেন, এটি হবে তার যে ভালো কথা বলে, অন্যকে আহার করায়, সর্বদা রোজা রাখে এবং যখন রাতে সব মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন সে উঠে সালাত (তাহাজ্জুদ) আদায় করে। ৬৬
শেষরাতে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করা এবং তার নিকট দু'আ-ইস্তেগফার করতে পারার আরেকটি মাধ্যম হলো, আল্লাহর মুহব্বত। আল্লাহ তাআলাকে যদি কেই সত্যিকারের মুহব্বত করে, তাহলে সে অবশ্যই অবশ্যই আঁধার রাতে তাহাজ্জুদ পড়বে।
এক আবেদ বলেছেন, রাতের আগমন আমার মধ্যে একধরনের আনন্দের প্লাবন নিয়ে আসে। কারণ, আমি তখন আমার রবের সাথে একান্তে কথা বলতে পারি। আর দিনের আগমন আমার মধ্যে দুঃখের ছায়া ফেলে।
আলি আল বাক্কার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, গত চল্লিশ বছরে দিবসের আগমনের চেয়ে দুঃখের কিছু নেই আমার কাছে।
শদের ক্ষেপণাস্ত্র কত দূরে আঘাত হানে? বড়োজোড় আট হাজার বা দশ হাজার মাইল? কিন্তু প্রিয় ভাই ও বোন, তুমি কি জানো দু'আর পাল্লা কত মাইল? দু'আর অস্ত্র মহাকাশ অতিক্রম করে আল্লাহর আরশে গিয়ে পৌছে। এবার শোনো দু'আ কি করতে পারে-
টিকাঃ
[৬০] সুরা সাজদাহ: ১৬।
[৬১] সুরা আলে ইমরান: ১৭।
[৬২] সুরা ফুরকান: ৬৪।
[৬৩] সুরা ঝুমার: ৯।
[৬৪] আত তারগিব ওয়াত তারহিব: ১/২৪৫।
[৬৫] সুরা সাজদাহ: ১৬।
[৬৬] তিরমিজি: ১৯৯০।