📄 দু‘আ কবুলের আলামত
দু'আ কবুলের কিছু আলামত রয়েছে, সে আলামতগুলো প্রকাশ পেলে আপনি বুঝে নেবেন যে, আপনার দু'আ কবুল হয়েছে। দু'আর পর আপনার অন্তর যখন প্রশান্ত হবে, দিলের মধ্যে এক ধরনের সুকুন ও স্থিরতা সৃষ্টি হবে। আপনার মন নিশ্চিন্ত হয়ে এই সাক্ষ্য দিতে থাকবে যে, আমার দু'আ কবুল হয়েছে এবং আপনি আল্লাহ তাআলার দু'আ ও জিকিরের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবেন এবং আল্লাহর আদেশগুলো মেনে চলবেন এবং তার নিষেধগুলো থেকে বিরত থাকবেন।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর শপথ! দু'আ কবুলের বিষয় নিয়ে আমি চিন্তা করি না, কিন্তু দু'আ করতে পারার বিষয় নিয়ে আমার চিন্তা হয়।'
ইমাম তাহাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বান্দার দু'আ কবুল করেন এবং তার প্রয়োজন পূরণ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলাই হলেন সবকিছুর মালিক, কিন্তু কেউ তাঁর মালিক নয়। এক মুহূর্তের জন্য বান্দা আল্লাহ তাআলার রহমতের বাইরে নয়। যে নিজেকে আল্লাহর রহমতের বাইরে মনে করে—হোক সেটা এক মুহূর্তের জন্য—সে কাফির হয়ে গেল এবং ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো।'৩১
সুতরাং বান্দা যখন আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসে, তাঁর প্রতি পূর্ণ আশা, ভরসা এবং ভয় নিয়ে দু'আর সকল শর্তসমূহ আদায় করে দু'আ করে, আল্লাহ তাআলা তার দু'আ কবুল করেন। তিনি কখনো এমন দু'আ ফিরিয়ে দেন না। তবে আল্লাহ তাআলা কখনো এর ফল দ্রুত দেন, কখনো দেরিতে আবার কখনো এর ফল দুনিয়াতে না দিয়ে আখিরাতের জন্য জমা করে রেখে দেন এবং তুমি যা চেয়েছ তার চেয়েও উত্তম কিছু দান করেন।
ইবনুল কাইয়ুম রাহিমাহুল্লাহু বলেন, দু'আর তিন অবস্থা। (১) দু'আ বিপদ-মুসিবতের চেয়ে শক্তিশালী হয়, আর তখন এই দু'আ বিপদ মুসিবতকে প্রতিহত করে। (২) দু'আ বিপদ-মুসিবতের চেয়ে দুর্বল হয়ে থাকে আর তখন সে বিপদকে দূর করতে পারে না। তবে তাকে কিছুটা দুর্বল করে। (৩) দুইটার শক্তি সমপরিমাণ হয়।
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا يرد القضاء إلا الدعاء ولا يزيد في العمر إلا البر
'দু'আর মাধ্যমে তাকদির পরিবর্তন হয় এবং নেক কাজের মাধ্যমে হায়াত বৃদ্ধি পায়।'৩২
টিকাঃ
[৩১] শরহুত তাহাবিয়্যাহ।
[৩২] আস সুনান, ইমাম তিরমিজি: ২১৩৯।
📄 দেরিতে দু‘আ কবুল হওয়া
অনেক সময় বান্দা দুঃখ-দুর্দশায় লিপ্ত হয়ে আল্লাহর সমীপে দু'আ করে, তো দেখা যায় দু'আ কবুল হয় না। তখন বান্দা হতাশ হয়ে যায়, পেরেশান হয়ে আল্লাহর প্রতি বিরূপ মন্তব্য করতে থাকে, কিংবা অধৈর্য হয়ে পাপে লিপ্ত হয়ে যায়।
দু'আ কবুলের ক্ষেত্রে বিলম্ব করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে পরীক্ষা করে থাকেন। আল্লাহর প্রতি বান্দার কতটুকু ভালোবাসা জমে আছে, তা মহান রব দেখে নেন। অনুরূপভাবে মুসলিম উম্মাহ দু'আ করে কিন্তু তার দু'আর কোনো ফল দেখতে পায় না, অতঃপর সে আবার দু'আ করে এভাবে বারবার দু'আ করতে থাকে এবং সময় অনেক দীর্ঘ হতে থাকে কিন্তু সে তার দু'আ কবুলের কোনো লক্ষণ দেখতে পায় না।
তোমাকে অবশ্যই জানতে হবে যে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে পরীক্ষা করছেন তাই তোমার দু'আ কবুলে তিনি বিলম্ব করছেন। সুতরাং তোমাকে ধৈর্যের সাথে দু'আ করেই যেতে হবে। তবে সাবধান, এক্ষেত্রে শয়তান যেন তোমাকে ধোঁকা দিতে না পারে, আল্লাহর ব্যাপারে তোমাকে নিরাশ করতে না পারে। কয়েকটি বিষয় জানা থাকলে তোমার থেকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা কেটে যাবে।
(১) আল্লাহ তাআলা হলেন মালিক। সকল কিছুরই মালিকানা একমাত্র আল্লাহ তাআলার। সুতরাং কাউকে কিছু দেওয়া বা না দেওয়ার একমাত্র অধিকার তাঁর। এখানে দেওয়া না দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বিরোধিতা করার কোনো অধিকার আমাদের কারো নেই। তিনি যদি কাউকে কিছু দেন, এটা তাঁর রহমত। আর যদি না দেন এটা তাঁর ন্যায় বিচার।
(২) আল্লাহ তাআলা হলেন হাকিম বা উত্তম কর্মবিদায়ক। সকল জিনিসের হিকমত ও রহস্য তাঁর জানা। তিনি প্রতিটা বিষয়ের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবই জানেন। তুমি একটা বিষয়কে ভালো মনে করছ, হয়তো প্রকৃতপক্ষে সেটা তোমার জন্য ভালো নয়। কিন্তু তুমি এটা জানো না। এটা একমাত্র আল্লাহ তাআলা জানেন। তুমি দুনিয়ার ডাক্তারদের দিকে লক্ষ করলেও বিষয়টার রহস্য বুঝতে পারবে, তুমি বাহ্যিকভাবে দেখছ যে ডাক্তার একটা মানুষের পা কেটে ফেলছে, হ্যাঁ একজনের পা কেটে ফেলা কিন্তু অত্যন্ত নির্মম ও জঘন্য কাজ, আর তোমার কাছেও বিষয়টি তেমনই মনে হবে, কিন্তু ডাক্তার এর ভেতরের রহস্য ও হিকমত সম্পর্কে জানে। সে জানে যে, যদি এই লোকটার পা কাটা না হয় তাহলে এটা তার জন্য আরো বড় ক্ষতির কারণ হবে। সুতরাং হে ভাই! তোমার জন্য যেটা কল্যাণের আল্লাহ তাআলা তোমাকে সেটাই দেবেন, এই বিশ্বাস মনের মধ্যে দৃঢ়ভাবে রাখতে হবে।
এ বিষয়ে একটি ঘটনা শুনুন, এক লোকের স্ত্রী সন্তান প্রসবের সময় একটি কন্যাসন্তান জন্ম দিয়ে মারা গেল। লোকটির সাথে এক আল্লাহওয়ালা শাইখের পরিচয় ছিল, শাইখ তখন তাকে দ্রুত বিয়ের পরামর্শ দিলো। লোকটিও এই ভেবে বিয়ে করল যে, হয়তো এর মাধ্যমে মা-হারা ছোট্ট শিশুটির লালনপালনের ব্যবস্থা হবে, সাথে সাথে তার বংশেরও বিস্তার ঘটবে। কিন্তু বিয়ের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের কোনো সন্তান হলো না। লোকটি তখন শাইখের নিকট গিয়ে এ বিষয়ে অভিযোগ করল। শাইখ তাকে ধৈর্যধারণের পরামর্শ দিয়ে বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা হাকিম। তিনি যা কিছু করেন বান্দার ভালোর জন্যই করেন। এভাবে চার পাঁচ বছর চলে যাওয়ার পরও তাদের কোনো সন্তান হলো না। লোকটি আবারো শাইখের নিকট গিয়ে এ বিষয়ে অভিযোগ করল। শাইখ তাকে আগের মতোই ধৈর্যধারণের পরামর্শ দিয়ে বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা হাকিম। তিনি যা কিছু করেন বান্দার ভালোর জন্যই করেন। এভাবে চলতে চলতে সপ্তম বছরে গিয়ে তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলো। অতঃপর লোকটি এই খুশির সংবাদ নিয়ে যখন শাইখের নিকট গেল। শাইখ তাকে বললেন, আল্লাহ বান্দাকে যখন কিছু দান করেন অবশ্যই তার মধ্যে কোনো হিকমত থাকে আবার যখন দেওয়া থেকে বিরত থাকেন তখনো তার মধ্যে হিকমত থাকে।
কিন্তু আমরা সব সময় বিষয়টি বুঝতে পারি না। তোমাকে এতদিন সন্তান না দেওয়ার পেছনে সম্ভবত তাঁর হিকমত হলো, তোমার স্ত্রী যদি পূর্বেই সন্তান জন্ম দিতো: তাহলে সে তার সন্তান নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ত। তোমার এই মেয়েটির দিকে খেয়ালই রাখত না।
ভাই আমার! আল্লাহ তাআলা হাকিম। কোনো কাজই তাঁর হিকমত থেকে খালি নয়। কিন্তু আমরা সব সময় তা বুঝতে পারি না। বরং আল্লাহ তাআলার ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট থেকে ধৈর্যধারণ করার মধ্যেই আমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। এ বিষয়টিও তো তোমার জানা থাকতে হবে যে, কখনো কখনো কোনো বিষয় দ্রুত আসাটা ক্ষতিকর আর দেরিতে আসাটা মঙ্গলজনক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا يزال العبد بخير ما لم يستعجل، يقول: دعوت فلم يستجب لي
'বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকে যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে। সে বলে, আমি দু'আ করেছি কিন্তু আমার দু'আ কবুল হয়নি।'৩৩
(৩) কখনো কখনো তোমার নিজের কারণেই তোমার দু'আ কবুল হয় না। তোমার মধ্যে হয়তো এমন কোনো দোষ ও সমস্যা থাকে যা তোমার দু'আ কবুলের জন্য প্রতিবন্ধক। সুতরাং তুমি তোমার সমস্যা ও ত্রুটিগুলো অনুসন্ধান করো তাহলেই সঠিক বিষয়টা বুঝতে পারবে।
ইবরাহিম আল খাওয়াস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার তিনি অসৎ কাজে বাধা প্রদানের জন্য বের হলেন, তখন তার কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করে তার পথ রুদ্ধ করে দাঁড়াল। তাকে সামনে চলতে বাধা দিলো। তিনি তখন ফিরে এসে মসজিদে প্রবেশ করে সালাত আদায় করলেন এবং আল্লাহর দরবারে তাওবা-ইস্তেগফার করে অনেক কান্নাকাটি করলেন, অতঃপর তিনি যখন বের হলেন তখন কুকুরটি লেজ নেড়ে নেড়ে তাকে স্বাগত জানাল। এরপর তিনি তার আপন উদ্দেশ্যের দিকে গেলেন। এ সম্পর্কে পরে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ওখানে একটা খারাপ কাজ ছিল যা প্রতিহত করবার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু আমার মধ্যে পাপ ও গুনাহ ছিল যার কারণে কুকুরটি আমাকে বাধা দিয়েছে। অতঃপর আমি ফিরে এসে তাওবা ইস্তেগফার করলাম।
(৪) তুমি ভালোভাবে তোমার উদ্দেশ্য যাচাই করো, অনুসন্ধান করে দেখো কেন তুমি এই জিনিসটা চাচ্ছ? এতে তোমার উদ্দেশ্য কি? যেমন তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট সম্পদ চাইলে, অথবা ক্ষমতা বা সম্মান চাইলে অথবা অন্য কোনো জিনিস তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট চাইলে। এখন তোমাকে ভাবতে হবে যে, তুমি এগুলো কেন চাচ্ছ? তুমি কি সম্পদ চাচ্ছ আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের ক্ষেত্রে তা ব্যয় করার জন্য এবং তাঁর ইবাদতে আরো মনোযোগী হওয়ার জন্য? তুমি কি সম্মান চাচ্ছ, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য? নাকি তোমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে? তুমি কেন এগুলো চাচ্ছ? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো এ সকল বিষয় থেকে পানাহ চেয়েছেন। তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করে বলতেন, 'হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এমন স্বাস্থ্য থেকে পানাহ চাই, যা আমাকে আপনার থেকে উদাসীন করে রাখবে। অথবা এমন ধনাঢ্যতা থেকে যা আমাকে উদ্ধত করে তুলবে।
আল্লাহর নবি নুহ আ.-ও আল্লাহ তাআলার নিকট এমন বিষয় থেকে পানাহ চেয়েছেন। পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে'
قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ * وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ
'(নুহ আ. বলেন) হে আমার পালনকর্তা আমার যা জানা নেই এমন কোনো দরখাস্ত করা হতে আমি আপনার কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, দয়া না করেন, তাহলে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব। ৩৪
(৫) কখনো কখনো বিপদ-মুসিবতে পতিত হওয়াটা মানুষের জন্য আল্লাহর দিকে ফিরে আসার উপলক্ষ হয়। আবার বিপদ-মসিবত কেটে যাওয়া আল্লাহর থেকে দূরে সরার কারণ হয়। তোমার যখন প্রয়োজন থাকে তখন তুমি আল্লাহর সামনে বিনীত হও, কাকুতি-মিনতি করে আল্লাহ তাআলার দরবারে দু'আ করো। কিন্তু প্রয়োজন পূরণ হলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাও।
অনেক মানুষই তো বিপদ কেটে গেলে আগের অবস্থায় ফিরে যায়, নাফরমানির কাজে লিপ্ত হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ وَإِذَا أَنْعَمْنَا عَلَى الْإِنسَانِ أَعْرَضَ وَنَأَى بِجَانِبِهِ وَإِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ كَانَ يَئُوسًا قُلْ كُلٌّ يَعْمَلُ عَلَى شَاكِلَتِهِ فَرَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَنْ هُوَ أَهْدَى سَبِيلًا
'আমি মানুষকে নেয়ামত দান করলে সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অহংকারে দূরে সরে যায়। যখন তাকে কোনো অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে একেবারে হতাশ হয়ে পড়ে। বলুন, প্রত্যেকেই নিজ রীতি অনুযায়ী কাজ করে। অতঃপর আপনার পালনকর্তা বিশেষরূপে জানেন, কে সর্বাপেক্ষা নির্ভুল পথে আছে।'৩৫
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অনেক সময় তোমার ওপর বিভিন্ন বিপদ মুসিবত দিয়ে থাকেন যেন তুমি তার দিকে ফিরে আসো। তুমি তার সামনে বিনীত হও। আর এই বিপদটা তোমার জন্য বিপদ নয় বরং এই বিপদ তোমার জন্য রহমত। আর বিপদটা যদি শুধুই বিপদ থাকে, এটা আল্লাহর দিকে ফিরে আসার উপলক্ষ না হয়, তাহলে এটা আরো বড় বিপদ। মহা বিপদ। আর যেই বিপদ তোমাকে আল্লাহর সামনে এনে দাঁড় করায় তা বিপদের সুরতে তোমার জন্য রহমত।
শাইখ ইয়াহইয়া আল বাক্কা এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি একবার আল্লাহ তাআলাকে স্বপ্নে দেখেন। স্বপ্নে তিনি আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞেস করে বলেন, হে আমার রব! আমি আপনার নিকট কতবার দু'আ করেছি কিন্তু আপনি আমার দু'আ কবুল করেননি। আপনি আমার ডাকে সাড়া দেননি। তখন আল্লাহ তাকে বলেন, ইয়াহইয়া! আমি তোমার ডাক শুনতে পছন্দ করি।
(অর্থাৎ ইয়াহইয়া! তোমার বিপদ কেটে গেলে, মুসিবত দূর হলে তো তুমি আমাকে আর আগের মতো ডাকবে না। কিন্তু তোমার ডাক যে আমার অনেক পছন্দের। আমি তোমার ডাক অনেক পছন্দ করি, আমি তোমাকে ভালোবাসি।)
আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَا مِنْ مُسْلِمٍ دَعَا اللهَ تَعَالَى إِلَّا أَجَابَهُ: فَإِمَّا أَنْ يُعَجِّلَهَا وَإِمَّا أَنْ يُؤَخِّرَهَا، وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ
'প্রতিটি মুসলমানের দু'আই আল্লাহ তাআলা কবুল করেন। অতঃপর হয়তো তার ফল দ্রুত দেন অথবা দেরিতে দেন। আবার কখনো সেটাকে তার আখিরাতের জন্য জমা রেখে দেন।'৩৬
ভাই আমার! মানুষ যখন কিয়ামতের দিন দেখবে, তার যে দু'আগুলো দুনিয়াতে কবুল হয়েছিল সেগুলো শেষ হয়ে গেছে, আর যে দু'আগুলো কবুল হয়নি; তার সওয়াব বাকি রয়েছে, তখন সে আফসোস করে বলবে— হায়, আমার একটি দু'আও যদি দুনিয়াতে কবুল না হত!
সুতরাং হে প্রিয় বন্ধু, তুমি বিষয়গুলো ভালভাবে বুঝো এবং তোমার মধ্যে থেকে সকল ধরণের সংশয় এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা দূর করে আল্লাহর নিকট দু'আ করতে থাকো। মনে রাখবে তোমার দু'আ কবুল না হওয়াটা হয়তো তোমার কল্যাণের জন্য, অথবা তোমার গুনাহের কারণে। সুতরাং তুমি তোমার সকল বিষয় আল্লাহ তাআলার নিকট ন্যস্ত করো।
টিকাঃ
[৩৩] সহিহ বুখারি: ১৭১।
[৩৪] সুরা হুদ: ৪৭।
[৩৫] সুরা ইসরা: ৮৩-৮৪।
[৩৬] আল হাকেম: ৫৪৭৮।
📄 দু‘আর আদব
দু'আর কিছু আদব রয়েছে, নিচে দু'আর আদবগুলো থেকে কয়েকটি আদব তুলে দেওয়া হলো:
• দু'আর শুরুতে তাওবা করা।
গুনাহ ও পাপের কারণে আল্লাহ তাআলা মানুষের ওপর অসন্তুষ্ট হন এবং তাদের ওপর বিভিন্ন ধরণের বিপদ-মুসিবত নেমে আসে। সুতরাং কারো ওপর যখন এমন কঠিন বিপদ ও মুসিবত নেমে আসে যার থেকে মুক্তি পাওয়াটা তার জন্য অনেক কঠিন হয়ে যায়। তখন আল্লাহর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করা এবং তাঁর নিকট দু'আ করা ব্যতীত বিকল্প কোনো পথ থাকে না। তুমি সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবা ও ইস্তেগফার করবে। কেননা তাওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে মানুষের গুনাহ মাফ হয় এবং তার ওপর থেকে বিপদ মুসিবত দূর হয়।
তুমি যদি তাওবা এবং দু'আ করার পরও দু'আ কবুলের কোনো নিদর্শন না দেখতে পাও, তাহলে তুমি ভালোভাবে অনুসন্ধান করে দেখো, হয়তো তোমার তাওবা সঠিক হয়নি। তাওবার শর্তগুলো পূর্ণ হয়নি। তুমি হয়তো তাওবার একটি শর্ত পালন করেছ বাকিগুলো পূর্ণ হয়নি। তাই তোমাকে প্রথমে তাওবার সকল শর্ত আদায় করে তারপর দু'আ করতে হবে। ইনশাআল্লাহ! তোমার দু'আ কবুল হবে। বিপদ কেটে যাবে।
📄 তাওবার শর্তসমূহ
তাওবা কবুলের অনেকগুলো শর্ত রয়েছে। এখানে তাওবার কয়েকটা বড়ো বড়ো শর্ত উল্লেখ্য করছি।
(১) লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
(২) গুনাহের কাজকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া।
(৩) আর কখনো এমন গুনাহে জড়াবে না এমন সংকল্প করা।
এখন তুমি যদি গুনাহ ছেড়ে দাও এবং আর কখনো এমন গুনাহ করবে না— এমন সংকল্প করো কিন্তু তুমি লজ্জিত হলে না, অনুতপ্ত হলে না, তাহলে কিন্তু তোমার তাওবা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। অনুরূপভাবে তুমি অনুতপ্ত হলে, গুনাহও ছেড়ে দিলে কিন্তু দৃঢ় সংকল্প করলে না তাহলেও তোমার তাওবা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।
সুতরাং অবশ্যই তোমাকে তাওবার শর্তগুলো পূর্ণ করতে হবে। তুমি প্রথমে সঠিকভাবে তাওবা করো তারপর দু'আ করতে থাকো, তুমি ক্লান্ত হয়ো না। কারণ, কখনো কখনো দেরিতে দু'আ কবুল হওয়ার মধ্যেও কল্যাণ থাকে।
ইবলিস যদি তোমার কাছে এসে বলে, 'এভাবে আর কত দু'আ করবি? দেখিস না আল্লাহ তোর ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না? তোর দু'আ কবুল হবে না। তাই এবার দু'আ বন্ধ করে অন্য পথ দেখো।' তখন তুমি তাকে বলবে, 'আমি দু'আর মাধ্যমে আমার রবের ইবাদত করছি। আমি নিশ্চিত আমার দু'আ কবুল হবেই। আমার জন্য যা কল্যাণের তাই আমার প্রতিপালক আমার জন্য নির্ধারণ করবেন। হয়তো দেরিতে দু'আ কবুল হওয়ার মধ্যে আমার জন্য কল্যাণ রয়েছে। আমি আমার রবের রহমত থেকে কখনোই নিরাশ হবো না। আমি তাকে ডাকতেই থাকব। ডাকতেই থাকব।' আল্লাহ তাআলা তো কখনো কখনো নবি-রাসুলদের দু'আও দেরিতে কবুল করেছেন। যেমন: কুরআনে এসেছে, আল্লাহ তাআলা বলেন,
حَتَّى إِذَا اسْتَيْأَسَ الرُّسُلُ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ قَدْ كُذِبُوا جَاءَهُمْ نَصْرُنَا فَنُجِّيَ مَن نَّشَاءُ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُنَا عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ
'এমনকি যখন পয়গম্বরগণ নৈরাশ্যে পতিত হয়ে যেতেন, এমনকি এরূপ ধারণা করতে শুরু করতেন যে তাদের অনুমান বুঝি মিথ্যায় পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছে। অতঃপর আমি যাদের চেয়েছি তারা উদ্ধার পেয়েছে। আমার শান্তি অপরাধী সম্প্রদায় থেকে প্রতিহত হয় না।'৩৭
প্রিয় ভাই ও বোন! দু'আ করা আল্লাহ তাআলার অনেক বড়ো একটা ইবাদত। সুতরাং দু'আর ফল যদি প্রকাশ নাও পায় তবুও তো দু'আর মাধ্যমে তোমার ইবাদত হয়ে যাচ্ছে। অতএব তুমি দু'আ করতেই থাকো এবং করতেই থাকো।
তবে সাবধান! দুনিয়াবী কোনো জিনিস সরাসরি চাইবে না, বরং আল্লাহ তাআলার নিকট কল্যাণকর জিনিস চাইবে। কারণ তুমি তো জানো না যে এর মধ্যে তোমার জন্য কল্যাণ রয়েছে নাকি ক্ষতি? হয়তো একটা জিনিস তোমার নিকট ভালো মনে হলো কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটা তোমার জন্য ক্ষতিকর। আবার এর উল্টোটাও হতে পারে। তাই তুমি সর্বদা আল্লাহ তাআলার নিকট কল্যাণকর জিনিস চাইবে। তুমি বলবে, হে আমার রব! আমার জন্য যা কল্যাণের তা তুমি আমাকে দান করো। হে আল্লাহ! ওমুক জিনিসটা যদি আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে আমাকে তা দান করো। প্রিয় ভাই! আমরা যদি দুনিয়াবী কোনো একটা কাজ করতে গেলে মানুষের সাথে পরামর্শ করে ভালোটা বেছে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারি, তাহলে আল্লাহ তাআলার নিকট কোনোকিছু চাইলে কেন ভালোটা চাইব না? কেন আল্লাহর কাছ থেকে আমার জন্য কল্যাণের জিনিসটা চেয়ে নেব না? অথচ আল্লাহ তাআলা হলেন আলিম। তিনি গোপন-প্রকাশ্য সকল জিনিস জানেন। তিনি জানেন আমার জন্য কোনটা কল্যাণের আর কোনটা অকল্যাণের, কিন্তু আমি তা জানি না। তাই আল্লাহ তাআলার নিকট যখন কিছু চাইব তখন ভালো ও কল্যাণকর জিনিস চাইব।
দু'আর আরেকটি আদব হলো, কাকুতি-মিনতি করে দু'আ করা। তুমি যখন আল্লাহ তাআলার কাছে কিছু চাইবে, তখন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে কাকুতি- মিনতি করে দু'আ করবে। তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমার কথা শুনবেন এবং তোমার দু'আ কবুল করবেন।
দু'আর আরেকটি আদব হলো, নিজের অসহায়ত্ব এবং প্রয়োজনগ্রস্ততা আল্লাহ তাআলার সামনে তুলে ধরে দু'আ করা। তুমি আল্লাহ তাআলার কাছে দু'আ করে বলো, হে আমার রব! আপনি এই অসহায় বান্দার প্রতি দয়া করুন, আপনি ব্যতীত তার আর কোনো দয়াকারী এবং সাহায্যকারী নেই। আপনি ব্যতীত তার কোনো আশ্রয়দাতা নেই, তাকে উদ্ধারকারী তো একমাত্র আপনিই সুতরাং হে আল্লাহ! আপনি এই অসহায় বান্দাকে সাহায্য করুন, আপনার নিকট আশ্রয় দান করুন, বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করুন। হে আল্লাহ! আমি জানি আপনি রহমান, রহিম। আপনি কারো হাত ফিরিয়ে দেন না। হে আল্লাহ, আপনি কাউকে সাহায্য করলে তা প্রতিহতকারী কেউ নেই এবং আপনি কারো সাহায্য ছেড়ে দিলে তাকে সাহায্যকারী কেউ নেই। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সাহায্য করুন, আমার অপরাধগুলো ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! আপনি ব্যতীত আমার সাহায্যকারী কেউ নেই এবং আমার অপরাধ ক্ষমাকারী কেউ নেই। হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রতি দয়া করুন। আমাকে মাফ করে দিন। আমায় ক্ষমা করুন।
প্রিয় ভাই! আমরা যখন এভাবে আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করব, আল্লাহ তাআলা তখন আমাদের দু'আ শুনবেন। কবুল করবেন। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
" قَالَ اللَّهِ يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أُبَالِي يَا ابْنَ آدَمَ لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ وَلَا أُبَالِي يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً "
'আল্লাহ তাআলা বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি যতদিন আমাকে ডাকতে থাকবে এবং আমার কাছে আশা করতে থাকবে তোমার পাপ যাই হোক না কেন আমি তা ক্ষমা করে দেব, এতে আমার কোনো পরোয়া নেই। হে আদমসন্তান! তোমার পাপরাশি যদি আকাশের মেঘমালায়ও উপনীত হয়, এরপর তুমি যদি আমার কাছে ক্ষমা চাও, তবুও আমি সব ক্ষমা করে দেব, এতে আমার কোনো পরোয়া নেই। হে আদমসন্তান! তুমি যদি জমিন পরিমাণ পাপরাশি নিয়েও আমার কাছে এসে উপস্থিত হও, আর আমার সঙ্গে যদি কিছুর শরিক না করে থাকো, তবে আমি সেই পরিমাণ ক্ষমা ও মাগফিরাত তোমাকে দান করব। ৩৮
প্রিয় ভাই! তুমি শোনো, আল্লাহর নবি মুসা আ. আল্লাহর নিকট দু'আ করে বলেছেন,
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
'হে আমার পালনকর্তা, তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ নাজিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী।'৩৯
ইয়াকুব আ. আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করে বলেন,
إِنَّمَا أَشْكُو بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ
'আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি। '৪০
ইউসুফ আ. দু'আ করে বলেন,
رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُن مِّنَ الْجَاهِلِينَ
'হে পালনকর্তা, তারা আমাকে যে কাজের দিকে আহ্বান করে, তার চেয়ে আমি কারাগারই পছন্দ করি। যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার ওপর থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। '৪১
জাকারিয়া আ. নিভৃতে আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করে বলেন,
رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُن بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِن وَرَائِي وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ . وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا
'হে আমার পালনকর্তা, আমার অস্থি ও বয়স ভারাবনত হয়েছে; বার্ধক্যে মস্তক শুভ্র হয়েছে। হে আমার পালনকর্তা! আপনাকে ডেকে আমি কখনো বিফলমনোরথ হইনি। আমি ভয় করি, আমার পর আমার উত্তরাধিকারের বিষয়ে এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা; কাজেই আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাকে একজন কর্তব্যপালনকারী দান করুন। সে আমার স্থলাভিষিক্ত হবে ইয়াকুব বংশের এবং হে আমার পালনকর্তা! তাকে করুন সন্তোষজনক। '৪২
অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে বলেন,
يَا زَكَرِيَّا إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَامٍ اسْمُهُ يَحْيَى لَمْ نَجْعَل لَّهُ مِن قَبْلُ سَمِيًّا
'হে জাকারিয়া, আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি। তার নাম হবে ইয়াহইয়া। ইতঃপূর্বে এই নামে আমি কারো নামকরণ করিনি। '৪৩
আল্লাহর নবি আইয়ুব আ. বলেন,
أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
'আমি দুঃখকষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও সর্বশ্রেষ্ট দয়াবান। '৪৪
ইউনুস আ. তিন স্তর অন্ধকারের ভেতর থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করেন। রাতের অন্ধকার, সমুদ্রের পানির নিচের অন্ধকার এবং মাছের পেটের অন্ধকার। আর আল্লাহ তাআলা সাত আসমানের ওপর থেকে তার ডাকে সাড়া দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَذَا النُّونِ إِذ ذَّهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَن لَّن نَّقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنجِي الْمُؤْمِنِينَ
'এবং মাছওয়ালার কথা স্মরণ করুন, তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন, অতঃপর মনে করেছিলেন যে আমি তাঁকে ধৃত করতে পারব না। অতঃপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহ্বান করলেন তুমি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই; তুমি নির্দোষ আমি গুনাহগার। অতঃপর আমি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আমি এমনিভাবে বিশ্ববাসীদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি।'৪৫
ইবরাহিম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন জিবরাইল আ. তাকে এসে বলেন, আপনার কোনো প্রয়োজন আছে কি? তখন তিনি বলেন, যদি আপনার পক্ষ থেকে হয় তাহলে না, আর যদি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হয় তাহলে হ্যাঁ। আর তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য যথেষ্ট এবং উত্তম তত্ত্বাবধায়ক হয়ে যান। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَأَرَادُوا بِهِ كَيْدًا فَجَعَلْنَاهُمُ الْأَخْسَرِينَ
'আমি বললাম, হে অগ্নি, তুমি ইবরাহিমের ওপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। তারা ইবরাহিমের বিরুদ্ধে ফন্দি আঁটতে চাইল, অতঃপর আমি তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ করে দিলাম।'৪৬
মুসা এবং হারুন আ. যখন ফেরাউনের নিকট গমন করেন তখন তারা আল্লাহর দরবারে দু'আ করে বলেন,
قَالَا رَبَّنَا إِنَّنَا نَخَافُ أَن يَفْرُطَ عَلَيْنَا أَوْ أَن يَطْغَىٰ قَالَ لَا تَخَافَا إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
'তারা বলল, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা আশঙ্কা করি যে, সে আমাদের প্রতি জুলুম করবে কিংবা উত্তেজিত হয়ে উঠবে। আল্লাহ বললেন, তোমরা ভয় করো না, আমি তোমাদের সাথে আছি, আমি শুনি ও দেখি। '৪৭
আল্লাহ তাআলার সামনে বিনীত ও ছোটো হয়ে, নিজের তুচ্ছতা ও হীনতা প্রকাশ করে, বান্দা যখন দু'আ করে আল্লাহ তাআলা তখন খুশি হন। বান্দার এই অবস্থাটা আল্লাহ তাআলার নিকট অনেক অনেক প্রিয়।
প্রিয় ভাই ও বোন! তুমি আল্লাহ তাআলার সামনে দুই হাত তুলে বলো, হে আল্লাহ! আমি ছোটো তুমি বড়ো, আমি তুচ্ছ তুমি মহান, আমি হীন অপদস্থ আর তুমি মহৎ সম্মানিত। আমি দুর্বল আর তুমি শাক্তিশালী, আমি অসহায় ফকির আর তুমি ধনী দানশীল। হে মহান আরশের অধিপতি! মহান দাতা! এই অসহায় বান্দা তোমার দরবারে হাত তুলেছে তুমি তার হাতকে খালি ফিরিয়ে দিয়ো না। হে আল্লাহ! তুমি এই অসহায় বান্দার দু'আ কবুল করো। এভাবে তুমি যখন আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করবে, আল্লাহ তাআলা খুশি হবেন। তিনি তোমার দু'আ কবুল করবেন। তোমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে তোমার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন।
প্রিয় ভাই ও বোন! তুমি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। বিপদ- মুসিবতের সময়ই তো প্রকৃত ইমান প্রকাশ পায়। বিপদ যত বৃদ্ধি পায় মুমিনের দু'আও তত পৃদ্ধি পায়। যদিও সে দু'আর কোনো বাহ্যিক ফল দেখে না, কিন্তু আল্লাহ তাআলার নিকট তার আশা-ভরসা কমে না, সে নিরাশ না হয়ে আরো বেশি আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করতে থাকে। সে বিশ্বাস করে, হয়তো এর মধ্যে কোনো কল্যাণ রয়েছে। তাই সে ধৈর্যধারণ করে আরো বেশি আল্লাহর সামনে বিনীত হয় এবং তাওবা ও ইস্তেগফার করে বেশি বেশি দু'আ করে যায়।
হে ভাই ও বোন! তোমরা যারা দ্রুত দু'আ কবুলের আশা করো এবং দ্রুত দু'আর ফল না পেলে হা-হুতাশ করো তারা দুর্বল ইমানের অধিকারী। সে মনে করে যে, দ্রুত দু'আর ফল পাওয়া তার অধিকার, যেন সে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে দু'আর বিনিময় চাচ্ছে। হে ভাই ও বোন, তোমরা কি শোনোনি যে, ইয়াকুব আ. আশি বছর পর্যন্ত আল্লাহর তাআলার নিকট দু'আ করেছেন, অতঃপর যখন তার মুসিবত আরো বৃদ্ধি পেল, ইউসুফ আ.-এর সাথে বিন ইয়ামিনও হারিয়ে গেল, তিনি তখনো হাল ছাড়লেন না, তিনি বললেন,
عَسَى اللَّهُ أَن يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا لَّ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'সম্ভবত আল্লাহ তাদের সবাইকে একসঙ্গে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। তিনি সুবিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'৪৮
এ অর্থটাই আল্লাহ তাআলা কুরআনের অন্য আয়াতে এভাবে বলেছেন,
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ * أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ
'তোমাদের কি এই ধারণা যে, তোমরা জান্নাতে চলে যাবে, অথচ সে লোকদের অবস্থা অতিক্রম করোনি যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে। তাদের ওপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। আর এমনিভাবে শিহরিত হতে হয়েছে যাতে নবি ও তাঁর প্রতি যারা ইমান এনেছিল তাদেরকে পর্যন্ত এ কথা বলতে হয়েছে যে, কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য! তোমরা শোনে নাও, আল্লাহর সাহায্য একান্তই নিকটবর্তী।'৪৯
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
حَتَّى إِذَا اسْتَيْأَسَ الرُّسُلُ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ قَدْ كُذِبُوا جَاءَهُمْ نَصْرُنَا فَنُجِّيَ مَن نَّشَاءُ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُنَا عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ
'এমনকি যখন পয়গম্বরগণ নৈরাশ্যে পতিত হয়ে যেতেন, এমনকি এরূপ ধারণা করতে শুরু করতেন যে, তাদের অনুমান বুঝি মিথ্যায় পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছে। অতঃপর আমি যাদের চেয়েছি তারা উদ্ধার পেয়েছে। আমার শাস্তি অপরাধী সম্প্রদায় থেকে প্রতিহত হয় না।'৫০
সুতরাং এ আয়াত থেকে এ বিষয়টা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায় যে, রাসুলগণ এবং মুমিনগণের যখন বিপদ এসেছে, তারা দীর্ঘকাল পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করেছেন। তাদের ওপর যতই বিপদ এসেছে তাঁরা দু'আ করেছেন এবং দু'আ করেছেন।
আর এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'বান্দা যতক্ষণ না তাড়াহুড়া করে, ততক্ষণ সে কল্যাণের মধ্যেই থাকে। তখন উপস্থিত লোকেরা বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কীভাবে তাড়াহুড়া করা হয়? তিনি বলেন, সে বলে আমি দু'আ করেছি কিন্তু আমার দু'আ কবুল করা হয়নি। '৫১
সুতরাং হে প্রিয় ভাই ও বোন! তুমি তোমার বিপদের সময়কে দীর্ঘ মনে করো না, দু'আর ক্ষেত্রে ক্লান্তি অনুভব করো না। তুমি দু'আকে ইবাদত মনে করে দু'আ করতে থাকো। তোমার বিপদ যেন হয় তোমার রবের দিকে ফিরে আসার কারণ। তুমি আল্লাহর দয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়ো না। যদিও তোমার বিপদের সময় হয় অনেক দীর্ঘ।
টিকাঃ
[৩৭] সুরা ইউসুফ: ১১০।
[৩৮] তিরমিজি: ৩৫৪০।
[৩৯] সুরা কাসাস: ২৪।
[৪০] সুরা ইউসুফ: ৮৬।
[৪১] সুরা ইউসুফ: ৩৩।
[৪২] সুরা মারইয়াম: ৪-৬।
[৪৩] সুরা মারইয়াম: ৭।
[৪৪] সুরা আম্বিয়া: ৮৩।
[৪৫] সুরা আম্বিয়া: ৭-৮৮।
[৪৬] সুরা আম্বিয়া: ৬৯-৭০।
[৪৭] সুরা তাহা: ৪৫-৪৬।
[৪৮] সুরা ইউসুফ: ৮৩।
[৪৯] সুরা বাকারা: ২১৪।
[৫০] সুরা ইউসুফ: ১১০।
[৫১] সহিহ বুখারি: ১৭৭।