📄 আল্লাহর প্রশংসা
আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করা দু'আর একটা অংশ। কুরআন ও হাদিসে আল্লাহ তাআলার যে সকল নাম ও গুনাবলির কথা উল্লেখ আছে সেগুলো ব্যতীত অন্য কোনো নামে বা গুণে আল্লাহর প্রশংসা করা যাবে না।
তোমার জীবনে যখন কঠিন মুসিবত নেমে আসবে, বিপদ মুসিবতে তোমার চারপাশটা অন্ধকার হয়ে যাবে, জমিনে দুর্ভিক্ষ নেমে আসবে, দুর্যোগে সামনে চলার পথ বন্ধ হয়ে যাবে এবং তোমার সামনে ভরসার সকল পথ বন্ধ হয়ে যাবে, তুমি তখন তোমার মালিককে ডাকো, তোমার রবের পবিত্র নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে তার নিকট দু'আ করো, সাহায্য প্রার্থনা করো। দেখবে আল্লাহ তাআলা তোমাকে সাহায্য করবেন, বিপদ থেকে তোমাকে উদ্ধার করবেন।
তুমি যখন প্রচন্ড ক্ষুধার্ত হয়ে পড়বে, ক্ষুধার তাড়নায় তুমি বিবেকশূন্য হয়ে যাবে, ভালোমন্দ কিছুই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, সামনে মৃত্যু ব্যতীত আর কিছুই দেখবে না তখন তুমি তোমার রবের পবিত্র নাম এবং গুণাবলির মাধ্যমে তাঁর নিকট দু'আ করো। সাহায্য চাও। আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করবেন।
তোমার অন্তর যখন শক্ত পাথর হয়ে যাবে, তোমার জীবনটা অপরাধ আর নাফরমানিতে ভরে উঠবে, তোমার ওপর গুনাহের পাহাড় জমে যাবে, তুমি তখন তোমার রবের পবিত্র নাম এবং গুণাবলির মাধ্যমে তাঁর নিকট দু'আ করো। সাহায্য চাও। আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করবেন।
যখন তুমি তোমার প্রিয় সন্তানটিকে হারিয়ে ফেলবে, তোমার মাথা গুঁজার ঠাইটুকুও চলে যাবে, তখন তুমি তোমার রবের পবিত্র নাম এবং গুণাবলির মাধ্যমে তাঁর নিকট দু'আ করো। সাহায্য চাও। আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করবেন।
প্রিয় ভাই ও বোন, একবার চিন্তা করে দেখুন ওই সত্তা কতই-না মহান ও মহিমান্বিত যিনি ইউনুস আ.-কে মাছের পেটের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করেছেন, নুহ আ.-কে উদ্ধার করেছেন মহাপ্লাবন থেকে। ওই সত্তা কতই-না মহান ও মহিমান্বিত যিনি ইবরাহিম আ.-এর জন্য আগুনকে শান্তিদায়ক বানিয়ে দিয়েছেন এবং মুসা আ.-এর পানিকে জমাট বাঁধিয়েছেন।
সুতরাং হে ভাই ! আপনি আপনার পবিত্র সত্তার নিকট আপনার প্রয়োজনের বিষয় প্রার্থনা করুন। আপনার বিপদে তাঁর কাছে সাহায্য চান। কারণ তিনিই একমাত্র রব, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো প্রকৃত ইলাহ নেই। সুতরাং আমরা একমাত্র তারই ইবাদত করব এবং তার নিকটই প্রার্থনা করব, তিনি মহা শক্তিশালী, সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী, তিনি মানুষকে হাসান, আবার তিনিই কাঁদান।
তিনি পথভ্রষ্টকে হিদায়াত দেন, ফকিরকে ধনী করেন, পাপীকে ক্ষমা করেন, পাপীর পাপরাশিকে গোপন রাখেন, মাজলুমকে সাহায্য করেন, জালেমকে প্রতিহত করেন। আসমান ও জমিনে তাকে প্রতিহতকারী বা তাকে ব্যর্থকারী কেউ নেই।
হে আমার রব, আপনি সকল গোপন বিষয় জানেন, অন্তরের কল্পনার বিষয়ও দেখতে পান, মানুষের মনের কথা শুনতে পান। আপনি সকল কিছুর মালিক, সকল ক্ষমতার অধিকারী। আপনি বললে হয়, না বললে কিছুই হয় না।
হে আমার রব, আমি আপনার দয়া ও অনুগ্রহের ভিখারি। আপনি আমার প্রতি দয়া করুন। আমাকে হেদায়াত দান করুন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাত দান করুন。
📄 দু‘আ কবুলের আলামত
দু'আ কবুলের কিছু আলামত রয়েছে, সে আলামতগুলো প্রকাশ পেলে আপনি বুঝে নেবেন যে, আপনার দু'আ কবুল হয়েছে। দু'আর পর আপনার অন্তর যখন প্রশান্ত হবে, দিলের মধ্যে এক ধরনের সুকুন ও স্থিরতা সৃষ্টি হবে। আপনার মন নিশ্চিন্ত হয়ে এই সাক্ষ্য দিতে থাকবে যে, আমার দু'আ কবুল হয়েছে এবং আপনি আল্লাহ তাআলার দু'আ ও জিকিরের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবেন এবং আল্লাহর আদেশগুলো মেনে চলবেন এবং তার নিষেধগুলো থেকে বিরত থাকবেন।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর শপথ! দু'আ কবুলের বিষয় নিয়ে আমি চিন্তা করি না, কিন্তু দু'আ করতে পারার বিষয় নিয়ে আমার চিন্তা হয়।'
ইমাম তাহাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বান্দার দু'আ কবুল করেন এবং তার প্রয়োজন পূরণ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলাই হলেন সবকিছুর মালিক, কিন্তু কেউ তাঁর মালিক নয়। এক মুহূর্তের জন্য বান্দা আল্লাহ তাআলার রহমতের বাইরে নয়। যে নিজেকে আল্লাহর রহমতের বাইরে মনে করে—হোক সেটা এক মুহূর্তের জন্য—সে কাফির হয়ে গেল এবং ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো।'৩১
সুতরাং বান্দা যখন আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসে, তাঁর প্রতি পূর্ণ আশা, ভরসা এবং ভয় নিয়ে দু'আর সকল শর্তসমূহ আদায় করে দু'আ করে, আল্লাহ তাআলা তার দু'আ কবুল করেন। তিনি কখনো এমন দু'আ ফিরিয়ে দেন না। তবে আল্লাহ তাআলা কখনো এর ফল দ্রুত দেন, কখনো দেরিতে আবার কখনো এর ফল দুনিয়াতে না দিয়ে আখিরাতের জন্য জমা করে রেখে দেন এবং তুমি যা চেয়েছ তার চেয়েও উত্তম কিছু দান করেন।
ইবনুল কাইয়ুম রাহিমাহুল্লাহু বলেন, দু'আর তিন অবস্থা। (১) দু'আ বিপদ-মুসিবতের চেয়ে শক্তিশালী হয়, আর তখন এই দু'আ বিপদ মুসিবতকে প্রতিহত করে। (২) দু'আ বিপদ-মুসিবতের চেয়ে দুর্বল হয়ে থাকে আর তখন সে বিপদকে দূর করতে পারে না। তবে তাকে কিছুটা দুর্বল করে। (৩) দুইটার শক্তি সমপরিমাণ হয়।
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا يرد القضاء إلا الدعاء ولا يزيد في العمر إلا البر
'দু'আর মাধ্যমে তাকদির পরিবর্তন হয় এবং নেক কাজের মাধ্যমে হায়াত বৃদ্ধি পায়।'৩২
টিকাঃ
[৩১] শরহুত তাহাবিয়্যাহ।
[৩২] আস সুনান, ইমাম তিরমিজি: ২১৩৯।
📄 দেরিতে দু‘আ কবুল হওয়া
অনেক সময় বান্দা দুঃখ-দুর্দশায় লিপ্ত হয়ে আল্লাহর সমীপে দু'আ করে, তো দেখা যায় দু'আ কবুল হয় না। তখন বান্দা হতাশ হয়ে যায়, পেরেশান হয়ে আল্লাহর প্রতি বিরূপ মন্তব্য করতে থাকে, কিংবা অধৈর্য হয়ে পাপে লিপ্ত হয়ে যায়।
দু'আ কবুলের ক্ষেত্রে বিলম্ব করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে পরীক্ষা করে থাকেন। আল্লাহর প্রতি বান্দার কতটুকু ভালোবাসা জমে আছে, তা মহান রব দেখে নেন। অনুরূপভাবে মুসলিম উম্মাহ দু'আ করে কিন্তু তার দু'আর কোনো ফল দেখতে পায় না, অতঃপর সে আবার দু'আ করে এভাবে বারবার দু'আ করতে থাকে এবং সময় অনেক দীর্ঘ হতে থাকে কিন্তু সে তার দু'আ কবুলের কোনো লক্ষণ দেখতে পায় না।
তোমাকে অবশ্যই জানতে হবে যে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে পরীক্ষা করছেন তাই তোমার দু'আ কবুলে তিনি বিলম্ব করছেন। সুতরাং তোমাকে ধৈর্যের সাথে দু'আ করেই যেতে হবে। তবে সাবধান, এক্ষেত্রে শয়তান যেন তোমাকে ধোঁকা দিতে না পারে, আল্লাহর ব্যাপারে তোমাকে নিরাশ করতে না পারে। কয়েকটি বিষয় জানা থাকলে তোমার থেকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা কেটে যাবে।
(১) আল্লাহ তাআলা হলেন মালিক। সকল কিছুরই মালিকানা একমাত্র আল্লাহ তাআলার। সুতরাং কাউকে কিছু দেওয়া বা না দেওয়ার একমাত্র অধিকার তাঁর। এখানে দেওয়া না দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বিরোধিতা করার কোনো অধিকার আমাদের কারো নেই। তিনি যদি কাউকে কিছু দেন, এটা তাঁর রহমত। আর যদি না দেন এটা তাঁর ন্যায় বিচার।
(২) আল্লাহ তাআলা হলেন হাকিম বা উত্তম কর্মবিদায়ক। সকল জিনিসের হিকমত ও রহস্য তাঁর জানা। তিনি প্রতিটা বিষয়ের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবই জানেন। তুমি একটা বিষয়কে ভালো মনে করছ, হয়তো প্রকৃতপক্ষে সেটা তোমার জন্য ভালো নয়। কিন্তু তুমি এটা জানো না। এটা একমাত্র আল্লাহ তাআলা জানেন। তুমি দুনিয়ার ডাক্তারদের দিকে লক্ষ করলেও বিষয়টার রহস্য বুঝতে পারবে, তুমি বাহ্যিকভাবে দেখছ যে ডাক্তার একটা মানুষের পা কেটে ফেলছে, হ্যাঁ একজনের পা কেটে ফেলা কিন্তু অত্যন্ত নির্মম ও জঘন্য কাজ, আর তোমার কাছেও বিষয়টি তেমনই মনে হবে, কিন্তু ডাক্তার এর ভেতরের রহস্য ও হিকমত সম্পর্কে জানে। সে জানে যে, যদি এই লোকটার পা কাটা না হয় তাহলে এটা তার জন্য আরো বড় ক্ষতির কারণ হবে। সুতরাং হে ভাই! তোমার জন্য যেটা কল্যাণের আল্লাহ তাআলা তোমাকে সেটাই দেবেন, এই বিশ্বাস মনের মধ্যে দৃঢ়ভাবে রাখতে হবে।
এ বিষয়ে একটি ঘটনা শুনুন, এক লোকের স্ত্রী সন্তান প্রসবের সময় একটি কন্যাসন্তান জন্ম দিয়ে মারা গেল। লোকটির সাথে এক আল্লাহওয়ালা শাইখের পরিচয় ছিল, শাইখ তখন তাকে দ্রুত বিয়ের পরামর্শ দিলো। লোকটিও এই ভেবে বিয়ে করল যে, হয়তো এর মাধ্যমে মা-হারা ছোট্ট শিশুটির লালনপালনের ব্যবস্থা হবে, সাথে সাথে তার বংশেরও বিস্তার ঘটবে। কিন্তু বিয়ের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের কোনো সন্তান হলো না। লোকটি তখন শাইখের নিকট গিয়ে এ বিষয়ে অভিযোগ করল। শাইখ তাকে ধৈর্যধারণের পরামর্শ দিয়ে বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা হাকিম। তিনি যা কিছু করেন বান্দার ভালোর জন্যই করেন। এভাবে চার পাঁচ বছর চলে যাওয়ার পরও তাদের কোনো সন্তান হলো না। লোকটি আবারো শাইখের নিকট গিয়ে এ বিষয়ে অভিযোগ করল। শাইখ তাকে আগের মতোই ধৈর্যধারণের পরামর্শ দিয়ে বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা হাকিম। তিনি যা কিছু করেন বান্দার ভালোর জন্যই করেন। এভাবে চলতে চলতে সপ্তম বছরে গিয়ে তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলো। অতঃপর লোকটি এই খুশির সংবাদ নিয়ে যখন শাইখের নিকট গেল। শাইখ তাকে বললেন, আল্লাহ বান্দাকে যখন কিছু দান করেন অবশ্যই তার মধ্যে কোনো হিকমত থাকে আবার যখন দেওয়া থেকে বিরত থাকেন তখনো তার মধ্যে হিকমত থাকে।
কিন্তু আমরা সব সময় বিষয়টি বুঝতে পারি না। তোমাকে এতদিন সন্তান না দেওয়ার পেছনে সম্ভবত তাঁর হিকমত হলো, তোমার স্ত্রী যদি পূর্বেই সন্তান জন্ম দিতো: তাহলে সে তার সন্তান নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ত। তোমার এই মেয়েটির দিকে খেয়ালই রাখত না।
ভাই আমার! আল্লাহ তাআলা হাকিম। কোনো কাজই তাঁর হিকমত থেকে খালি নয়। কিন্তু আমরা সব সময় তা বুঝতে পারি না। বরং আল্লাহ তাআলার ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট থেকে ধৈর্যধারণ করার মধ্যেই আমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। এ বিষয়টিও তো তোমার জানা থাকতে হবে যে, কখনো কখনো কোনো বিষয় দ্রুত আসাটা ক্ষতিকর আর দেরিতে আসাটা মঙ্গলজনক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا يزال العبد بخير ما لم يستعجل، يقول: دعوت فلم يستجب لي
'বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকে যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে। সে বলে, আমি দু'আ করেছি কিন্তু আমার দু'আ কবুল হয়নি।'৩৩
(৩) কখনো কখনো তোমার নিজের কারণেই তোমার দু'আ কবুল হয় না। তোমার মধ্যে হয়তো এমন কোনো দোষ ও সমস্যা থাকে যা তোমার দু'আ কবুলের জন্য প্রতিবন্ধক। সুতরাং তুমি তোমার সমস্যা ও ত্রুটিগুলো অনুসন্ধান করো তাহলেই সঠিক বিষয়টা বুঝতে পারবে।
ইবরাহিম আল খাওয়াস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একবার তিনি অসৎ কাজে বাধা প্রদানের জন্য বের হলেন, তখন তার কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করে তার পথ রুদ্ধ করে দাঁড়াল। তাকে সামনে চলতে বাধা দিলো। তিনি তখন ফিরে এসে মসজিদে প্রবেশ করে সালাত আদায় করলেন এবং আল্লাহর দরবারে তাওবা-ইস্তেগফার করে অনেক কান্নাকাটি করলেন, অতঃপর তিনি যখন বের হলেন তখন কুকুরটি লেজ নেড়ে নেড়ে তাকে স্বাগত জানাল। এরপর তিনি তার আপন উদ্দেশ্যের দিকে গেলেন। এ সম্পর্কে পরে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ওখানে একটা খারাপ কাজ ছিল যা প্রতিহত করবার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু আমার মধ্যে পাপ ও গুনাহ ছিল যার কারণে কুকুরটি আমাকে বাধা দিয়েছে। অতঃপর আমি ফিরে এসে তাওবা ইস্তেগফার করলাম।
(৪) তুমি ভালোভাবে তোমার উদ্দেশ্য যাচাই করো, অনুসন্ধান করে দেখো কেন তুমি এই জিনিসটা চাচ্ছ? এতে তোমার উদ্দেশ্য কি? যেমন তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট সম্পদ চাইলে, অথবা ক্ষমতা বা সম্মান চাইলে অথবা অন্য কোনো জিনিস তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট চাইলে। এখন তোমাকে ভাবতে হবে যে, তুমি এগুলো কেন চাচ্ছ? তুমি কি সম্পদ চাচ্ছ আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের ক্ষেত্রে তা ব্যয় করার জন্য এবং তাঁর ইবাদতে আরো মনোযোগী হওয়ার জন্য? তুমি কি সম্মান চাচ্ছ, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য? নাকি তোমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে? তুমি কেন এগুলো চাচ্ছ? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো এ সকল বিষয় থেকে পানাহ চেয়েছেন। তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ করে বলতেন, 'হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এমন স্বাস্থ্য থেকে পানাহ চাই, যা আমাকে আপনার থেকে উদাসীন করে রাখবে। অথবা এমন ধনাঢ্যতা থেকে যা আমাকে উদ্ধত করে তুলবে।
আল্লাহর নবি নুহ আ.-ও আল্লাহ তাআলার নিকট এমন বিষয় থেকে পানাহ চেয়েছেন। পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে'
قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ * وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ
'(নুহ আ. বলেন) হে আমার পালনকর্তা আমার যা জানা নেই এমন কোনো দরখাস্ত করা হতে আমি আপনার কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, দয়া না করেন, তাহলে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব। ৩৪
(৫) কখনো কখনো বিপদ-মুসিবতে পতিত হওয়াটা মানুষের জন্য আল্লাহর দিকে ফিরে আসার উপলক্ষ হয়। আবার বিপদ-মসিবত কেটে যাওয়া আল্লাহর থেকে দূরে সরার কারণ হয়। তোমার যখন প্রয়োজন থাকে তখন তুমি আল্লাহর সামনে বিনীত হও, কাকুতি-মিনতি করে আল্লাহ তাআলার দরবারে দু'আ করো। কিন্তু প্রয়োজন পূরণ হলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাও।
অনেক মানুষই তো বিপদ কেটে গেলে আগের অবস্থায় ফিরে যায়, নাফরমানির কাজে লিপ্ত হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ وَإِذَا أَنْعَمْنَا عَلَى الْإِنسَانِ أَعْرَضَ وَنَأَى بِجَانِبِهِ وَإِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ كَانَ يَئُوسًا قُلْ كُلٌّ يَعْمَلُ عَلَى شَاكِلَتِهِ فَرَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَنْ هُوَ أَهْدَى سَبِيلًا
'আমি মানুষকে নেয়ামত দান করলে সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অহংকারে দূরে সরে যায়। যখন তাকে কোনো অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে একেবারে হতাশ হয়ে পড়ে। বলুন, প্রত্যেকেই নিজ রীতি অনুযায়ী কাজ করে। অতঃপর আপনার পালনকর্তা বিশেষরূপে জানেন, কে সর্বাপেক্ষা নির্ভুল পথে আছে।'৩৫
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অনেক সময় তোমার ওপর বিভিন্ন বিপদ মুসিবত দিয়ে থাকেন যেন তুমি তার দিকে ফিরে আসো। তুমি তার সামনে বিনীত হও। আর এই বিপদটা তোমার জন্য বিপদ নয় বরং এই বিপদ তোমার জন্য রহমত। আর বিপদটা যদি শুধুই বিপদ থাকে, এটা আল্লাহর দিকে ফিরে আসার উপলক্ষ না হয়, তাহলে এটা আরো বড় বিপদ। মহা বিপদ। আর যেই বিপদ তোমাকে আল্লাহর সামনে এনে দাঁড় করায় তা বিপদের সুরতে তোমার জন্য রহমত।
শাইখ ইয়াহইয়া আল বাক্কা এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি একবার আল্লাহ তাআলাকে স্বপ্নে দেখেন। স্বপ্নে তিনি আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞেস করে বলেন, হে আমার রব! আমি আপনার নিকট কতবার দু'আ করেছি কিন্তু আপনি আমার দু'আ কবুল করেননি। আপনি আমার ডাকে সাড়া দেননি। তখন আল্লাহ তাকে বলেন, ইয়াহইয়া! আমি তোমার ডাক শুনতে পছন্দ করি।
(অর্থাৎ ইয়াহইয়া! তোমার বিপদ কেটে গেলে, মুসিবত দূর হলে তো তুমি আমাকে আর আগের মতো ডাকবে না। কিন্তু তোমার ডাক যে আমার অনেক পছন্দের। আমি তোমার ডাক অনেক পছন্দ করি, আমি তোমাকে ভালোবাসি।)
আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَا مِنْ مُسْلِمٍ دَعَا اللهَ تَعَالَى إِلَّا أَجَابَهُ: فَإِمَّا أَنْ يُعَجِّلَهَا وَإِمَّا أَنْ يُؤَخِّرَهَا، وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ
'প্রতিটি মুসলমানের দু'আই আল্লাহ তাআলা কবুল করেন। অতঃপর হয়তো তার ফল দ্রুত দেন অথবা দেরিতে দেন। আবার কখনো সেটাকে তার আখিরাতের জন্য জমা রেখে দেন।'৩৬
ভাই আমার! মানুষ যখন কিয়ামতের দিন দেখবে, তার যে দু'আগুলো দুনিয়াতে কবুল হয়েছিল সেগুলো শেষ হয়ে গেছে, আর যে দু'আগুলো কবুল হয়নি; তার সওয়াব বাকি রয়েছে, তখন সে আফসোস করে বলবে— হায়, আমার একটি দু'আও যদি দুনিয়াতে কবুল না হত!
সুতরাং হে প্রিয় বন্ধু, তুমি বিষয়গুলো ভালভাবে বুঝো এবং তোমার মধ্যে থেকে সকল ধরণের সংশয় এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা দূর করে আল্লাহর নিকট দু'আ করতে থাকো। মনে রাখবে তোমার দু'আ কবুল না হওয়াটা হয়তো তোমার কল্যাণের জন্য, অথবা তোমার গুনাহের কারণে। সুতরাং তুমি তোমার সকল বিষয় আল্লাহ তাআলার নিকট ন্যস্ত করো।
টিকাঃ
[৩৩] সহিহ বুখারি: ১৭১।
[৩৪] সুরা হুদ: ৪৭।
[৩৫] সুরা ইসরা: ৮৩-৮৪।
[৩৬] আল হাকেম: ৫৪৭৮।
📄 দু‘আর আদব
দু'আর কিছু আদব রয়েছে, নিচে দু'আর আদবগুলো থেকে কয়েকটি আদব তুলে দেওয়া হলো:
• দু'আর শুরুতে তাওবা করা।
গুনাহ ও পাপের কারণে আল্লাহ তাআলা মানুষের ওপর অসন্তুষ্ট হন এবং তাদের ওপর বিভিন্ন ধরণের বিপদ-মুসিবত নেমে আসে। সুতরাং কারো ওপর যখন এমন কঠিন বিপদ ও মুসিবত নেমে আসে যার থেকে মুক্তি পাওয়াটা তার জন্য অনেক কঠিন হয়ে যায়। তখন আল্লাহর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করা এবং তাঁর নিকট দু'আ করা ব্যতীত বিকল্প কোনো পথ থাকে না। তুমি সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবা ও ইস্তেগফার করবে। কেননা তাওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে মানুষের গুনাহ মাফ হয় এবং তার ওপর থেকে বিপদ মুসিবত দূর হয়।
তুমি যদি তাওবা এবং দু'আ করার পরও দু'আ কবুলের কোনো নিদর্শন না দেখতে পাও, তাহলে তুমি ভালোভাবে অনুসন্ধান করে দেখো, হয়তো তোমার তাওবা সঠিক হয়নি। তাওবার শর্তগুলো পূর্ণ হয়নি। তুমি হয়তো তাওবার একটি শর্ত পালন করেছ বাকিগুলো পূর্ণ হয়নি। তাই তোমাকে প্রথমে তাওবার সকল শর্ত আদায় করে তারপর দু'আ করতে হবে। ইনশাআল্লাহ! তোমার দু'আ কবুল হবে। বিপদ কেটে যাবে।