📄 দু‘আর রুকন এবং তার শর্তসমূহ
দু'আর চেয়ে সম্মানের বিষয় বান্দার জন্য আর কিছু নেই। দু'আ হলো আল্লাহ তাআলার সামনে বিনীত হয়ে, নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে আশা ও ভয় নিয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করা। দু'আর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় গ্রহণ করে, তাঁর ওপর ভরসা করে এবং নিজের বিষয়াদি আল্লাহ তাআলার নিকট অর্পণ করে।
প্রিয় ভাই! আমাদের সালাফদের রাত্রি কাটত আল্লাহর ইবাদত ও দু'আ-মুনাজাত করে, আর দিন কাটত শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদের ময়দানে যুদ্ধ করে। তারা রাতে আল্লাহর ইবাদত করতেন, কাকুতি মিনতি করে দু'আ করতেন। আর দিনের বেলায় মানুষের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতেন।
দু'আ আল্লাহ তাআলার অনেক বড়ো একটি ইবাদত। যেই ইবাদত করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় বা স্থানের প্রয়োজন হয় না এবং দু'আর নির্দিষ্ট কোনো অবস্থাও নেই। রাতে-দিনে, জলে-স্থলে, সফরে-হজরে, সচ্ছলতায়-অসচ্ছলতায়, সুস্থতাবস্থায়-অসুস্থতাবস্থায়, গোপনে-প্রকাশ্যে, দাঁড়িয়ে-বসে যে-কোনো সময়, যে-কোনো অবস্থায়ই দু'আর ইবাদত করা যায়।
আল্লাহর শপথ করে বলছি, দু'আ মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অজিফা। এর মাধ্যমে বিপদের কালো মেঘগুলো কেটে যায়। দূর হয়ে যায় দুঃখের সফেদ মেঘ। চিন্তা-পেরেশানি হালকা হয়ে মনের মধ্যে এক ধরনের নিশ্চিন্ততা এবং প্রশান্তি সৃষ্টি হয়।
পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইবরাহিম আ. সম্পর্কে এসেছে, তিনি বলেছিলেন, وَأَدْعُو رَبِّي عَسَى أَلَّا أَكُونَ بِدُعَاءِ رَبِّي شَقِيًّا
'আমি আমার পালনকর্তার ইবাদত করব, তাঁকে ডাকব। আশা করি, আমার পালনকর্তার ইবাদত করে আমি বঞ্চিত হব না।'১৯
দু'আর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার রহমত অর্জিত হয়, বান্দার ইজ্জত ও তামকিন প্রতিষ্ঠা হয় এবং মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
সুতরাং দু'আ বান্দার ওপর আল্লাহ তাআলার অনেক বড়ো একটি রহমত এবং আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের বড় একটি মাধ্যম।
দু'আর অনেকগুলো শর্ত রয়েছে যা আল্লাহ তাআলা নিম্নের আয়াতে একত্র করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
اُدْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً ، إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ
'তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাকো, কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না। পৃথিবীকে কুসংস্কারমুক্ত ও ঠিক করার পর তাতে অনর্থ সৃষ্টি করো না। তাঁকে আহ্বান করো ভয় ও আশা সহকারে। নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।'২০
সাহল আত তুসতুরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, দু'আ কবুলের জন্য সাতটি শর্ত রয়েছে:
(১) কাকুতি মিনতি করে দু'আ করা।
(২) মনের মধ্যে আল্লাহ তাআলার ভয় নিয়ে দু'আ করা।
(৩) আল্লাহ তাআলার নিকট দু'আ কবুলের আশা নিয়ে দু'আ করা।
(৪) নিয়মিতভাবে দু'আ করা।
(৫) বিনয় ও একাগ্রতার সাথে দু'আ করা।
(৬) দু'আর মধ্যে সকলকেই শামিল করা। কৃপণতা না করা।
(৭) হালাল খাবার গ্রহণ করা।
দু'আর কিছু রুকন রয়েছে। যেমন:
(১) ইখলাসের সাথে দু'আ করা।
(২) গুনাহ মুক্ত হয়ে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করে আল্লাহর প্রতি সুন্দর ও উত্তম ধারণা নিয়ে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে দু'আ করা।
(৩) আল্লাহ তাআলার জাত ও সিফাতের মাধ্যমে তাঁর প্রশংসা করে দু'আ শুরু করা।
(৪) দু'আর শুরুতে, মাঝে এবং শেষে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরুদ পড়া। নবিজির ওপর দরুদ হলো দু'আর ডানাস্বরূপ, যা দু'আকে কবুল হওয়ার জন্য আসমানের দিকে নিয়ে যায়। এগুলোর সাথে সাথে, পবিত্র খাবার, পবিত্র পোশাক ও পবিত্র বাসস্থান এবং দু'আ কবুলের দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে দু'আ করা। এই বিষয়গুলো যখন পাওয়া যাবে তখন আমাদের দু'আ কবুল হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُم
'তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমার নিকট দু'আ করো আমি সাড়া দেব।'২১
দু'আর শর্তসমূহ যখন পূর্ণ হবে এবং দু'আ কবুলের প্রতিবন্ধক বিষয়গুলো যখন থাকবে না তখন আল্লাহর ইচ্ছায় দু'আ কবুল হবে।
টিকাঃ
[১৯] সুরা মারইয়াম: ৪৮।
[২০] সুরা আরাফ: ৫৫-৫৬।
[২১] সুরা গাফির: ৬০।
📄 সালাফদের কথা
দু'আ নিয়ে সালাফরা অনেক মূল্যবান কথা বলেছেন।
ইবনু আতা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নিশ্চয় দু'আ কবুলের জন্য কিছু রুকন (স্তম্ভ), কিছু ডানা, কিছু সবাব বা কারণ এবং কয়েকটি মুহূর্ত রয়েছে। সুতরাং দু'আর রুকনের মাধ্যমে দু'আ শক্তিশালী হয়, ডানার ওপর ভর করে সে আসমানে আল্লাহর আরশের দিকে উঠে এবং সময় হলে তা কবুল হয় এবং আসবাবগুলোর মাধ্যমে সে সফল হয়।
* দু'আর রুকনসমূহ, একাগ্রতার সাথে আল্লাহ তাআলার সামনে নিজেকে তুচ্ছ মনে করে, নিজের মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করে, আশা ও ভয় নিয়ে দু'আ করা। * দু'আর ডানা হলো, আল্লাহ তাআলার সাথে সততা। এই সততা নামক ডানা দিয়েই দু'আ আসমানে উঠে যায়। * দু'আর বিশেষ সময় হলো, রাতের শেষ প্রহর। * দু'আ কবুলের সবব বা মাধ্যম হলো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দুরুদ পাঠ করা।
একবার লোকেরা ইবরাহিম ইবনু আদহামকে প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা শাইখ, বলুন তো আমাদের দু'আ কবুল হয় না কেন? আমরা তো আল্লাহর কাছে অনেক দু'আ করি।' জবাবে তিনি বলেন, 'এর কারণ হলো, তোমরা আল্লাহ তাআলাকে চিনেছো কিন্তু তাঁর আনুগত্য করছ না। আল্লাহ তাআলা কি একথা বলেননি যে,
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ
'তোমরা আল্লাহর এবং রাসুলের অনুগত্য করো।' ২২ তোমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনেছ কিন্তু তাঁর সুন্নতের অনুসরণ করো না। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা কি একথা বলেননি যে,
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
'বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ করো, যাতে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালোবাসেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। '২৩
তোমাদেরকে কুরআন দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তোমরা কুরআন নিয়ে চিন্তা- গবেষণা করো না এবং কুরআন অনুযায়ী আমল করো না। আল্লাহ তাআলা কি তোমাদের একথা বলেননি যে,
كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ 'এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি বরকত হিসেবে অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসূহ লক্ষ করে এবং বুদ্ধিমানরা যেন তা অনুধাবন করে।' ২৪
তোমরা আল্লাহ তাআলার নিয়ামত ভক্ষণ করো কিন্তু তাঁর শুকরিয়া আদায় করো না। আল্লাহ কি তোমাদেরকে একথা বলেননি যে,
يَعْرِفُونَ نِعْمَتَ اللَّهِ ثُمَّ يُنكِرُونَهَا وَأَكْثَرُهُمُ الْكَافِرُونَ 'তারা আল্লাহর অনুগ্রহ চিনে, এরপর অস্বীকার করে এবং তাদের অধিকাংশই অকৃতজ্ঞ।'২৫
তোমরা জান্নাতের ব্যাপারে জানো কিন্তু জান্নাত তালাশ করো না, আল্লাহ তাআলা কি তোমাদেরকে একথা বলেননি যে,
وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ 'এই যে জান্নাতের উত্তরাধিকারী তোমরা হয়েছ, এটা তোমাদের কর্মের ফল।'২৬
তোমরা শয়তানকে চিনো কিন্তু শয়তান থেকে বাঁচার জন্য তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হও না বরং তোমরা তোমাদের শত্রু শয়তানেরই অনুসরণ করো। আল্লাহ কি তোমাদের এ কথা বলেননি,
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا نَّ إِنَّمَا يَدْعُو حِزْبَهُ لِيَكُونُوا مِنْ أَصْحَابِ السَّعِيرِ
'শয়তান তোমাদের শত্রু; অতএব তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ করো। সে তার দলবলকে আহ্বান করে যেন তারা জাহান্নামি হয়।'২৭
তোমরা জানো যে মৃত্যু সুনিশ্চিত কিন্তু তোমরা মৃত্যুর জন্য কোনোই প্রস্তুতি গ্রহণ করো না। আল্লাহ কি তোমাদের এ কথা বলেননি যে,
قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّونَ مِنْهُ فَإِنَّهُ مُلَاقِيكُمْ ، ثُمَّ تُرَدُّونَ إِلَى عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
'বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখোমুখি হবে, অতঃপর তোমরা অদৃশ্য, দৃশ্যের জ্ঞানী আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন সেসব কর্ম, যা তোমরা করতে।’২৮
তোমরা নিজ হাতে কত মৃতকে কবরস্থ করো কিন্তু নিজেরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো না। আল্লাহ তাআলা কি তোমাদের এ কথা বলেননি যে,
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ 'অতএব, হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ, তোমরা শিক্ষাগ্রহণ করো।'২৯
তোমরা নিজের দোষ রেখে অন্যের দোষের পিছনে লেগে থাকো। অথচ আল্লাহ তাআলা তোমাদের বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَى أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَى أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ ۖ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ۖ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ ۚ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
'মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এমন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই জালেম।'৩০
টিকাঃ
[২২] সুরা মাইদা: ৯২।
[২৩] সুরা আল ইমরান: ৩১।
[২৪] সুরা ছাদ: ২৯।
[২৫] সুরা নাহল: ৮৩।
[২৬] সুরা যুখরুফ: ৭২।
[২৭] সুরা ফাতির: ৫।
[২৮] সুরা জুমআহঃ ৮।
[২৯] সুরা হাশর: ২।
[৩০] সুরা হুজরাত: ১১।
📄 আল্লাহর প্রশংসা
আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করা দু'আর একটা অংশ। কুরআন ও হাদিসে আল্লাহ তাআলার যে সকল নাম ও গুনাবলির কথা উল্লেখ আছে সেগুলো ব্যতীত অন্য কোনো নামে বা গুণে আল্লাহর প্রশংসা করা যাবে না।
তোমার জীবনে যখন কঠিন মুসিবত নেমে আসবে, বিপদ মুসিবতে তোমার চারপাশটা অন্ধকার হয়ে যাবে, জমিনে দুর্ভিক্ষ নেমে আসবে, দুর্যোগে সামনে চলার পথ বন্ধ হয়ে যাবে এবং তোমার সামনে ভরসার সকল পথ বন্ধ হয়ে যাবে, তুমি তখন তোমার মালিককে ডাকো, তোমার রবের পবিত্র নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে তার নিকট দু'আ করো, সাহায্য প্রার্থনা করো। দেখবে আল্লাহ তাআলা তোমাকে সাহায্য করবেন, বিপদ থেকে তোমাকে উদ্ধার করবেন।
তুমি যখন প্রচন্ড ক্ষুধার্ত হয়ে পড়বে, ক্ষুধার তাড়নায় তুমি বিবেকশূন্য হয়ে যাবে, ভালোমন্দ কিছুই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, সামনে মৃত্যু ব্যতীত আর কিছুই দেখবে না তখন তুমি তোমার রবের পবিত্র নাম এবং গুণাবলির মাধ্যমে তাঁর নিকট দু'আ করো। সাহায্য চাও। আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করবেন।
তোমার অন্তর যখন শক্ত পাথর হয়ে যাবে, তোমার জীবনটা অপরাধ আর নাফরমানিতে ভরে উঠবে, তোমার ওপর গুনাহের পাহাড় জমে যাবে, তুমি তখন তোমার রবের পবিত্র নাম এবং গুণাবলির মাধ্যমে তাঁর নিকট দু'আ করো। সাহায্য চাও। আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করবেন।
যখন তুমি তোমার প্রিয় সন্তানটিকে হারিয়ে ফেলবে, তোমার মাথা গুঁজার ঠাইটুকুও চলে যাবে, তখন তুমি তোমার রবের পবিত্র নাম এবং গুণাবলির মাধ্যমে তাঁর নিকট দু'আ করো। সাহায্য চাও। আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করবেন।
প্রিয় ভাই ও বোন, একবার চিন্তা করে দেখুন ওই সত্তা কতই-না মহান ও মহিমান্বিত যিনি ইউনুস আ.-কে মাছের পেটের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করেছেন, নুহ আ.-কে উদ্ধার করেছেন মহাপ্লাবন থেকে। ওই সত্তা কতই-না মহান ও মহিমান্বিত যিনি ইবরাহিম আ.-এর জন্য আগুনকে শান্তিদায়ক বানিয়ে দিয়েছেন এবং মুসা আ.-এর পানিকে জমাট বাঁধিয়েছেন।
সুতরাং হে ভাই ! আপনি আপনার পবিত্র সত্তার নিকট আপনার প্রয়োজনের বিষয় প্রার্থনা করুন। আপনার বিপদে তাঁর কাছে সাহায্য চান। কারণ তিনিই একমাত্র রব, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো প্রকৃত ইলাহ নেই। সুতরাং আমরা একমাত্র তারই ইবাদত করব এবং তার নিকটই প্রার্থনা করব, তিনি মহা শক্তিশালী, সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী, তিনি মানুষকে হাসান, আবার তিনিই কাঁদান।
তিনি পথভ্রষ্টকে হিদায়াত দেন, ফকিরকে ধনী করেন, পাপীকে ক্ষমা করেন, পাপীর পাপরাশিকে গোপন রাখেন, মাজলুমকে সাহায্য করেন, জালেমকে প্রতিহত করেন। আসমান ও জমিনে তাকে প্রতিহতকারী বা তাকে ব্যর্থকারী কেউ নেই।
হে আমার রব, আপনি সকল গোপন বিষয় জানেন, অন্তরের কল্পনার বিষয়ও দেখতে পান, মানুষের মনের কথা শুনতে পান। আপনি সকল কিছুর মালিক, সকল ক্ষমতার অধিকারী। আপনি বললে হয়, না বললে কিছুই হয় না।
হে আমার রব, আমি আপনার দয়া ও অনুগ্রহের ভিখারি। আপনি আমার প্রতি দয়া করুন। আমাকে হেদায়াত দান করুন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাত দান করুন。
📄 দু‘আ কবুলের আলামত
দু'আ কবুলের কিছু আলামত রয়েছে, সে আলামতগুলো প্রকাশ পেলে আপনি বুঝে নেবেন যে, আপনার দু'আ কবুল হয়েছে। দু'আর পর আপনার অন্তর যখন প্রশান্ত হবে, দিলের মধ্যে এক ধরনের সুকুন ও স্থিরতা সৃষ্টি হবে। আপনার মন নিশ্চিন্ত হয়ে এই সাক্ষ্য দিতে থাকবে যে, আমার দু'আ কবুল হয়েছে এবং আপনি আল্লাহ তাআলার দু'আ ও জিকিরের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবেন এবং আল্লাহর আদেশগুলো মেনে চলবেন এবং তার নিষেধগুলো থেকে বিরত থাকবেন।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর শপথ! দু'আ কবুলের বিষয় নিয়ে আমি চিন্তা করি না, কিন্তু দু'আ করতে পারার বিষয় নিয়ে আমার চিন্তা হয়।'
ইমাম তাহাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বান্দার দু'আ কবুল করেন এবং তার প্রয়োজন পূরণ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলাই হলেন সবকিছুর মালিক, কিন্তু কেউ তাঁর মালিক নয়। এক মুহূর্তের জন্য বান্দা আল্লাহ তাআলার রহমতের বাইরে নয়। যে নিজেকে আল্লাহর রহমতের বাইরে মনে করে—হোক সেটা এক মুহূর্তের জন্য—সে কাফির হয়ে গেল এবং ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো।'৩১
সুতরাং বান্দা যখন আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসে, তাঁর প্রতি পূর্ণ আশা, ভরসা এবং ভয় নিয়ে দু'আর সকল শর্তসমূহ আদায় করে দু'আ করে, আল্লাহ তাআলা তার দু'আ কবুল করেন। তিনি কখনো এমন দু'আ ফিরিয়ে দেন না। তবে আল্লাহ তাআলা কখনো এর ফল দ্রুত দেন, কখনো দেরিতে আবার কখনো এর ফল দুনিয়াতে না দিয়ে আখিরাতের জন্য জমা করে রেখে দেন এবং তুমি যা চেয়েছ তার চেয়েও উত্তম কিছু দান করেন।
ইবনুল কাইয়ুম রাহিমাহুল্লাহু বলেন, দু'আর তিন অবস্থা। (১) দু'আ বিপদ-মুসিবতের চেয়ে শক্তিশালী হয়, আর তখন এই দু'আ বিপদ মুসিবতকে প্রতিহত করে। (২) দু'আ বিপদ-মুসিবতের চেয়ে দুর্বল হয়ে থাকে আর তখন সে বিপদকে দূর করতে পারে না। তবে তাকে কিছুটা দুর্বল করে। (৩) দুইটার শক্তি সমপরিমাণ হয়।
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا يرد القضاء إلا الدعاء ولا يزيد في العمر إلا البر
'দু'আর মাধ্যমে তাকদির পরিবর্তন হয় এবং নেক কাজের মাধ্যমে হায়াত বৃদ্ধি পায়।'৩২
টিকাঃ
[৩১] শরহুত তাহাবিয়্যাহ।
[৩২] আস সুনান, ইমাম তিরমিজি: ২১৩৯।