📄 অসুস্থতার সূচনা ও 'আবু বকর রা. কে ইমামতির দায়িত্ব প্রদান
নবুওয়তের দশম বছর হজ সম্পাদন শেষে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতেই অবস্থান করেন। জিলহজের বাকি অংশ, মহররম এবং সফর মাসে তিনি সুস্থই ছিলেন। এ সময়ে তিনি উসামা বিন যায়েদকে প্রধান করে একটি সৈন্যদল গঠন করেন। মুসলিম মুজাহিদগণ যার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল। সফর মাসের প্রায় শেষ অংশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থতা বোধ করতে আরম্ভ করেন। ২২ সফর, ২৯ সফর আবার কেউ সফর পরবর্তী রবিউল আউয়ালের প্রথমাংশের কথাও বলেছে। এ সময়ের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের শহীদগণের জন্য জানাযার ন্যায় নামাজ পড়েছেন। বাকীর কবরস্থানে গিয়ে সালাম করেছেন এবং শেষ বারের মত তাদের জন্য দুআ করেছেন। একবার বাকী হতে ফেরার সময় দেখেন, আয়েশা রা. মাথার ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। আর বলছেন, হায় মাথা! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমার বলার প্রয়োজন নেই, বরং আমিই বলছি, আমার মাথা ব্যথা করছে। হায় মাথা!' আয়েশা রা. বলেন, এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আয়েশা, তোমার এতে অসুবিধা কোথায়? তুমি যদি আমার আগে মারা যাও, আমি তোমার কাফনের ব্যবস্থা করব, তোমার জানাযার নামাজ পড়ব এবং আমি নিজেই তোমার দাফন ক্রিয়া সম্পন্ন করব।' আয়েশা রা. বলেন, আমি বললাম, 'আমি মারা গেলে তো মজাই হবে, আরেক জন নারী নিয়ে আমার ঘরে নতুন করে সংসার পাততে পারবেন।' আয়েশা রা. বলেন, 'এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন।' অসুস্থতা বাড়তে বাড়তে তীব্র আকার ধারণ করল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মায়মুনার ঘরে। তিনি সকল স্ত্রীদের ডেকে আমার ঘরে অসুস্থকালীন সময়টি থাকার অনুমতি নিলেন।
আয়েশা রা. বলেন, প্রথম যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসুস্থতা আরম্ভ হয়, তখন তিনি মায়মুনার ঘরে অবস্থান করছিলেন। ধীরে ধীরে রোগ বৃদ্ধি পেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল স্ত্রীদের কাছে আমার ঘরে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। সকলে আমার ঘরে থাকার জন্য মত দিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে আব্বাস রা. এবং অপর এক জন লোকের কাঁধে ভর করে, মাটির সাথে পা হেচরে হেচরে আমার ঘরে প্রবেশ করেন। আয়েশা রা. বলতেন, আমার ঘরে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুখ বৃদ্ধি পায়, তখন তিনি বললেন, 'পরিস্কার সাত কলস পানি আমার গায়ে ঢেলে দাও, আমি যাতে সুস্থ হয়ে লোকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলতে পারি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপর স্ত্রী হাফসা রা. এর গোসল খানায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বসিয়ে আমরা তার উপর সে কলসগুলোর পানি ঢালতে থাকি। এক সময় হাতের ইশারায় বলতে লাগলেন যে, 'তোমরা যথেষ্ট করেছো।' অতঃপর সকলের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেলেন, সবাইকে নিয়ে নামাজ পড়লেন এবং সকলকে সম্বোধন করে ভাষণ দিলেন।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন তিনি বলেন, 'লোকজন কি নামাজ পড়ে নিয়েছে?' আমরা বললাম, 'না, তারা নামাজ পড়েনি। হে আল্লাহর রাসূল! তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।' তিনি বললেন, 'গোসলখানায় আমার জন্য কিছু পানি রাখ।' আমরা পানি রেখে দিলাম। তিনি গা ধুয়ে নিলেন। অতঃপর খুব কষ্ট করে উঠতে চাইলেন, সক্ষম হলেন না। বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। হুশ ফিরে আসলে আবার বলেন, 'লোকজন কি নামাজ পড়ে নিয়েছে?' আমরা বললাম, 'না, আল্লাহর রাসূল! তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।' তিনি বললেন, 'গোসলখানায় আমার জন্য কিছু পানি রাখ।' আয়েশা বললেন, আমরা পানি রেখে দিলাম। তিনি বসে গাঁ ধুলেন। অতঃপর উঠে দাড়াতে চাইলেন, কিন্তু সক্ষম হলেন না, বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। আবার হুশ ফিরে এলে বলেন, 'লোকজন কি নামাজ পড়ে নিয়েছে?' আমরা বললাম, 'না, তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, 'গোসলখানায় আমার জন্য কিছু পানি রাখ। আমরা পানি রেখে দিলাম, তিনি বসে গাঁ ধুয়ে নিলেন। অতঃপর উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু সক্ষম হলেন না। বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। আবার হুশ ফিরে পেয়ে জিজ্ঞাসা করেন, 'লোকজন কি নামাজ পড়ে নিয়েছে?' আমরা বললাম, 'না, তারা আপনার অপেক্ষা করছে, হে আল্লাহর রাসূল! আয়েশা রা. বলেন, তখন লোকজন এশার নামাজের জন্য মসজিদে বসে বসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অপেক্ষা করতে ছিল। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন লোক পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, 'আবু বকরকে নামাজ পড়াতে বল। লোকটি এসে আবু বকরকে বলল, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে নামাজ পড়াতে বলেছেন।' আবু বকর রা. ছিলেন কোমল হৃদয়ের মানুষ। তিনি উমার রা.কে বললেন, 'উমার! আপনি নামাজ পড়ান।' উমার রা. তাকে বললেন, 'আপনি এর জন্য আমার চেয়ে বেশি উপযোগী।' আয়েশা রা. বলেন, 'কয়েক দিন আবু বকর নামাজ পড়ালেন। এরপর যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে কিছুটা হালকা মনে করলেন, তখন তিনি দু'জন লোকের কাধে ভর করে জোহর নামাজের জন্য মসজিদে গেলেন। আবু বকর রা. অন্যান্য সাহাবাদের নিয়ে নামাজ পড়তে ছিলেন। আবু বকর রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে পিছনে সরে আসার প্রস্তুতি নিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশারা করে পিছে সরে আসতে বারণ করলেন। তাদের দু'জনকে বললেন, 'আমাকে তার পাশে বসিয়ে দাও।' আবু বকর দাড়িয়ে দাড়িয়ে রাসূল রা. এর অনুসরণ করছেন, অন্যান্য লোকজন আবু বকরকে অনুসরণ করছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে বসে নামাজ পড়ছেন।' এ নামাজটি ছিল জোহরের, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আবু বকরকে ইমাম বানানোর ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খুব আগ্রহ ছিল। এ জন্য তিনি বার বার তাগিদও করেছেন। আয়েশা রা. বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসুখ বেড়ে যাওয়ার পর বেলাল এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামাজের সংবাদ দিলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আবু বকরকে নামাজ পড়াতে বল।' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আবু বকর কোমল হৃদয়ের মানুষ। যখন সে নামাজ পড়াতে দাড়াবে, তখন মানুষ তার আওয়াজ শুনতে পাবে না। আপনি বরং উমারকে নামাজ পড়াতে বলুন।' তিনি বললেন, 'আবু বকরকে বল নামাজের ইমামতি করার জন্য।' তখন আমি হাফসাকে বললাম, 'তুমি বল, আবু বকর কোমল হৃদয়ের মানুষ, আপনার জায়গায় সে দাড়ালে মানুষ তার আওয়াজ শুনতে পাবে না। আপনি যদি উমারকে হুকুম করতেন...' সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাই বলল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বলেন, 'তোমরা তো ইউসুফকে ধোকা দেয়া নারীদের মতো হয়ে গেছ। আবু বকরকে বল, সে নামাজের ইমামতি করবে।' হাফসা আয়েশাকে লক্ষ্য করে বললেন, 'আমি আপনার কাছ থেকে কোনো ভাল কিছুর আশা করতে পারি না।' আয়েশা রা. বলেন, 'তারা সকলে আবু বকরকে নামাজ পড়াতে বলে। আবু বকর নামাজ আরম্ভ করলেন। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কিছু সুস্থতা অনুভব করলেন। তখন তিনি দু'জন ব্যক্তির কাঁধে ভর করে মসজিদে রওয়ানা হলেন। তার পা দু'টি মাটিতে হেচরে চলছিল। এভাবেই তিনি মসজিদে প্রবেশ করেন। আবু বকর টের পেয়ে পিছু হটতে লাগলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশারা করে নিজ স্থানে স্থির থাকতে বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অগ্রসর হয়ে আবু বকরের ডান পাশে বসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে বসে নামাজের ইমামতি করছেন, আর আবু বকর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ করছেন, অন্যান্য মানুষ অনুসরণ করছে আবু বকরকে।'
যে কারণে আয়েশা রা. আবু বকরের ইমামতি অপছন্দ করেছেন তা হল, আয়েশা রা. বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বার বার আবু বকরের ইমামিতে আপত্তি জানানোর কারণ ছিল যে, এটাকে মানুষ অশুভ লক্ষণ মনে করবে। আমি এটাকে আবু বকর হতে হটাতে চেয়ে ছিলাম। আর এ জন্যই তাকে ও হাফসাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরাতো ইউসুফের সাথে প্রতারণাকারী নারীদের মতো।'
ইবনে কাসির রহ. বলেন, 'নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরকে ইমামতির জন্য প্রাধান্য দিয়েছেন। এর অর্থ, তিনি সকল সাহাবাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী এবং কুরআন ভাল করে তেলাওয়াত করতে পারেন। সহীহ মুসলিমে আছে, 'ভাল করে কুরআন তেলাওয়াতকারীই ইমামতি করবে..." আর আবু বকরের মধ্যে এ সকল গুনই বিদ্যমান ছিল।
এ পরিচ্ছেদের সারকথা ও শিক্ষনীয় বিষয়ঃ
১. উহুদের শহীদ ও বাকী কবরস্থানে শায়িত কবরবাসীদের যিয়ারত করা, তাদের জন্য দুআ করা মুস্তাহাব। তবে এর জন্য স্বতন্ত্রভাবে সফর করা কিংবা এতে কোনো ধরনের বেদআতের সংমিশ্রন অনাকাঙ্খিত ও পরিত্যাজ্য।
২. স্বামীর জন্য নিজ স্ত্রীর গোসল, কাফন-দাফন ইত্যাদির বৈধতা। তদ্রুপ নারীর জন্য নিজ স্বামীর গোসল, কাফন-দাফন ইত্যাদির বৈধতা প্রমাণিত হয়।
৩. মুমুর্ষ অবস্থায় কোনো অসুবিধার কারণে একাধিক স্ত্রীর বর্তমানে এক স্ত্রীর ঘরে থাকার জন্য অন্যান্য স্ত্রীদের থেকে অনুমতি নেয়া। তারা অনুমিত দিলে ভাল। অন্যথায় লটারীর মাধ্যমে নির্ণয় করা হবে।
৪. মানব প্রকৃতি, রোগ ও বেহুশ হওয়া থেকে নবীগণও নিরাপদ নয়। তবে তারা উম্মাদ হন না। কারণ এটা একটা বড় ত্রুটি; এ থেকে নবীগণ মুক্ত। এর দ্বারা তাদের সওয়াব বৃদ্ধি পায়, মর্যাদা উন্নত হয় এবং অন্যদেরও সান্ত্বনা মিলে। এর আরেকটি ইতিবাচক দিক হল, নবীদের মধ্যে অলৌকিক নিদর্শন, সুস্পষ্ট প্রমাণাদি দেখে অনেকের বিভ্রান্তির সম্ভাবনা ছিল। এর দ্বারা তাদের ভ্রম দূর হবে। তারাও দেখে নিবে যে, নবীগণও আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীতে নিজের ক্ষতি কিংবা উপকার করতে সক্ষম নন।
৫. বেহুশ হয়ে গেলে গাঁ ধুয়ে নেয়া মুস্তাহাব। এর দ্বারা বেহুש অবস্থার ক্লান্তিভাব দূর হয়, শক্তি ফিরে আসে এবং শরীরের তাপ কমে।
৬. ইমামের আসতে সামান্য দেরী হলে, মুসল্লীগণ তার অপেক্ষা করবে, আর যদি তার আসতে অনেক দেরী হয়, মুসল্লীদেরও কষ্ট হয়, তবে উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী সেই নামাজ পড়াবে।
৭. সকল সাহাবাদের উপর আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। এর ঘটনায় তার এবং অন্যদের জন্যও ইঙ্গিত যে, খেলাফতের উপযুক্ত একমাত্র তিনিই। কারণ, সাধারণ জনগণ নিয়ে নামাজ পড়ার অধিকার একমাত্র খলীফারই। দ্বিতীয়ত, সাহাবায়ে কেরাম নিজেরাও বলেছেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকে আমাদের দ্বীনের জন্য মনোনীত করেছেন, আমরা তাকে আমাদের দুনিয়ার জন্যও মনোনীত করলাম।'
৮. জামাতে অংশ গ্রহণ করা অসম্ভব এমন কোনো কারণ থাকলে ইমাম বা খলীফা অন্য কাউকে প্রতিনিধি করতে পারেন। তবে, সে যেন সকলের চেয়ে উত্তম ব্যক্তি হয়।
৯. উমর রা. এর ফজিলতের বিষয়টি লক্ষণীয়। কারণ, আবু বকর রা. তার উপর নির্ভর করেছেন, তাকে নামাজ পড়াতে অনুরোধ করেছেন। অন্য কাউকে নামাজ পড়াতে বলেননি।
১০. সম্মুখে প্রশংসা করার বৈধতা: যদি অহংবোধ, গরিমার আশংকা না থাকে। এ হাদীসে উমার রা. আবু বকর রা. কে 'আপনি এর জন্য উপযুক্ত বলে' তার সম্মুখে প্রসংশা করেছেন।
১১. উপযুক্ত ব্যক্তিদের গুরু দায়িত্ব গ্রহণ না করার বৈধতা প্রমাণিত হল, যদি সেখানে এমন কেউ বিদ্যমান থাকে, যে উত্তম রূপে সে দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে পারবে।
১২. প্রতিনিধিত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিও অপর নির্ভরযোগ্য কাউকে খলীফা বা প্রতিনিধি করার অধিকার রাখে। যেমন এখানে আবু বকর রা. উমার রা. কে প্রতিনিধি বানাতে চেয়েছেন।
১৩. যে সকল ইবাদত সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে, তার মধ্যে নামাজ গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত।
১৪. সে সময় জীবিত নয়জন স্ত্রীদের ভেতর আয়েশা রা. এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হল।
১৫. আদব, সম্মান, মর্যাদা ও স্থান কাল বিবেচনায় রেখে খলীফাদের পরামর্শ দেয়ার বৈধতা প্রমাণিত হয়।
১৬. কোনো কারণ বশত মুক্তাদিদের ইমামের পাশে দাড়ানোর বৈধতা প্রমাণিত হয়। যেমন তাকবীর পৌঁছানোর জন্য, জায়গার সংকীর্ণতার দরুন, নারীদের জন্য নারী ইমাম হলে, মুক্তাদী একজন হলে এবং বস্ত্রহীন লোকদের ইমাম হলে ইত্যাদির ক্ষেত্রে।
১৭. ইমামের তাকবীর শোনা না গেলে মুক্তাদিদের উচ্চ স্বরে তাকবীর বলার বৈধতা।
১৮. পূর্ণ অক্ষম না হলে জামাতে অবশ্যই উপস্থিত হওয়া।
১৯. সাধারণ জ্ঞানী ও উত্তম ব্যক্তিদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী ও পরহেজগার ব্যক্তিই ইমামতির অধিক হকদার।
২০. ইমাম হলেন অনুসরণীয় ব্যক্তি। সে যখন বসে নামাজ পড়বে, মুক্তাদিগণও বসে নামাজ পড়বে। সে যখন দাড়িয়ে নামাজ পড়বে, মুক্তাদিগণও দাড়িয়ে নামাজ পড়বে।
২১. নামাজে কাঁদাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদা নিষেধ。
টিকাঃ
১ ইবনে হিশাম: ৪/৩২০ আল-বিদায়া ও আল-নেহায়া ৫/২২৪ ফাতহুল বারী: ৮/১২৯-১৩০ আহমদ: ৬/১৪৪ সুনানে দারামি: ৮০ ২ ইবনে হিশাম: ৪/৩২০ আল-বিদায়া ও আল-নেহায়া ৫/২২৩-২৩১ কেউ কেউ বলেছেন ঘটনাটি হল সফরের ২৯ তারিখ, বৃহস্পতিবারের। তের দিন ছিলেন অসুস্থ অবস্থায়। এটাই অনেকের বক্তব্য। ফাতহুল বারী: ৮/১২৯ * সহীহ আল বুখারী ১৯৮, সহীহ মুসলিম: ৪১৮
২ সহীহ আল-বুখারী ৬৮৭, সহীহ মুসলিম ৪১৮ ৩ কারো ধারণা এ নামাজটি ছিল, ফজরের। তাদের দলিল, ইবনে আব্বাস হতে আরকাম বিন শারাহবিল এর রেওয়াতে। আবু বকর যেখানে শেষ করেছেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে কেরাত পড়া আরাম্ভ করেছেন। ইবনে মাজার বর্ণাকৃত এ হাদিসটির সনদ যদিও হাসান, তবে এর দ্বারা দলিল দেয়া সংঘত নয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরের অতি নিকটে গিয়েছেন ফলে কেরাত শুনেছেন এরও তো সম্ভাবনা রয়েছে। তার ব্যাপারে আছে, আস্তে কেরাত পড়ার নামাজেও তিনি অনেক সময় অপরকে শুনার মতো আওয়াজ করে কেরাত পড়তেন। যেমন আবু কাতাদার হাদীসে এর প্রমাণ বিদ্যমান আছে। এর পরেও যদি মেনে নেই যে, জোরে কেরাত পড়ার নামাজ ছিল, তবু প্রমাণিত হয় না যে, এটা ফজরের নামাজ ছিল, বরং মাগরিবের নামাজ হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা রয়েছে। সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিমে উম্মে ফজল হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: আমি মাগরিবের সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে والمرسلات عرفا সুরা পড়তে শুনেছি। এর পরে কোনো দিন জমাতের সহিত নামাজ পড়েননি, ইহধাম ত্যাগ করে যান। সহীহ আল-সহীহ আল বুখারী ৭৬৩, ৪৪২৯ সহীহ সহীহ মুসলিম ৪৬২, ইবনে হাজার রহ. বলেন, নাসায়ীর একটি বর্ণনায় আছে, উম্মে ফজল যে নামাজের কথা উল্লেখ করেছে, সে নামাজ তার বাড়িতে ছিল। ইমাম শাফি রহ. বলেছেন, যে অসুখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন, সে অসুখে এক ওয়াক্ত নামাজ শুধু মসজিদে পড়েছেন। আর সেটা এ নামাজই যে নামাজে তিনি বসে নামাজ পড়েছেন এবং যেখানে আবু বকর প্রথমে ইমাম ছিল পরবর্তীতে মুক্তাদি হয়েছেন। আর অন্যদের তাকবীর শুনাতেন। আল-ফাতহ: ২/১৭৫
📄 তাঁর শ্রেষ্ঠ ভাষাসমূহ ও মানুষের জন্য উপদেশ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে বৃহস্পতিবার ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রদান করেন। এতে তিনি আবু বকর সিদ্দীকের শ্রেষ্টত্বের কথা বর্ণনা করেন। যদিও তিনি এর আগেই সকল সাহাবীকে তার আনুগত্য করার ব্যাপারে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি মুমূর্ষ অবস্থায় যা লিখতে চেয়ে ছিলেন, এখানে সম্ভবত তাই বর্ণনা করে দিয়েছেন। এ ভাষণের পূর্বে তিনি গোসল করেছেন। তার গাঁয়ে পরিস্কার সাত কলস পানি ঢালা হয়েছে। অন্যান্য হাদীসের ভাষ্যমতে সাত সংখ্যাটি তিনি বরকতের জন্য গ্রহণ করেছেন। মূল কথা হল, তিনি গোসল করেছেন, ঘর থেকে বের হয়ে নামাজ পড়েছেন, অতঃপর ভাষণ দিয়েছেন। জুনদাব রা. বলেন, মুত্যুর পাঁচ দিন পূর্বে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'আমি ঘোষণা করছি, তোমাদের কেউ আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু নয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা ইবরাহীমের ন্যায় আমাকেও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আমার উম্মতের কাউকে খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) বানালে অবশ্যই আবু বকরকে বানাতাম। খুব ভালকরে শুনে নাও, তোমাদের পূর্বের লোকেরা নবীগণের কবর এবং নেককার লোকদের কবরগুলোকে মসজিদ বানাত। সাবধান! তোমরা কিন্তু কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করবে না। আমি এর থেকে তোমাদের নিষেধ করছি।'
আবু সাইদ খুদরী রা. বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন খুতবায় বলেন, 'আল্লাহ তাআলা তার এক বান্দাকে দুনিয়ার চাকচিক্য এবং নিজের কাছে রক্ষিত নেআমতসমূহ হতে কোনো একটি নির্বাচন করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। সে বান্দা আল্লাহর কাছে রক্ষিত নেআমতকেই প্রধান্য দিয়েছেন।' এ কথা শুনে আবু বকর রা. কেঁদে ফেললেন। এবং বললেন, 'আপনার প্রতি আমাদের মাতা, পিতা সকলেই উৎসর্গ।' আমরা তার কাণ্ড দেখে আশ্চর্য হলাম। লোকজন বলাবলি করল, 'এ বৃদ্ধের কীর্তি দেখ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সংবাদ দিচ্ছেন যে, আল্লাহ এক বান্দাকে দুনিয়ার চাকচিক্য এবং তাঁর নিকট রক্ষিত নেআমতসমূহের ভেতর একটি বাছাই করে নেয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন, আর সে আল্লাহর কাছে রক্ষিত নেআমতকেই প্রাধান্য দিয়েছে। এ কথা শুনে আবু বকর তার মাতা পিতাকে উৎসর্গ করছে।' পরে জানলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই ছিলেন সে বান্দা। আবু বকর ছিলেন, আমাদের ভেতর সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আবু বকর তুমি কেঁদো না। সঙ্গ ও সম্পদ দিয়ে সবচেয়ে বেশি উপকার করছে আমাকে আবু বকর। আমার উম্মত হতে আমি যদি কাউকে খলিল রূপে গ্রহণ করতাম তবে অবশ্যই আবু বকরকে গ্রহণ করতাম। তবে, এখন তার সাথে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও সখ্যতা অটুট থাকবে। মসজিদের ভেতর কারো দরজা খুলে রাখা যাবে না, শুধু আবু বকরের দরজা ব্যতীত।'
এ পরিচ্ছেদের সারকথা ও শিক্ষনীয় বিষয়ঃ
১. মসজিদে নববীতে শুধু আবু বকরের দরজা বহাল রাখার অনুমিত, সে সব ইঙ্গিতের একটি, যার ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, আবু বকরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরবর্তী খলীফা বা প্রতিনিধি।
২. আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্ব। সে সকলের চাইতে অধিক জ্ঞানী, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট সে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। এ বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়।
৩. আখেরাতকে দুনিয়ার উপর প্রাধান্য দেয়া। এবং এ অনুভূতি জাগ্রত করা যে, দুনিয়াতে এক মুহূর্ত থাকার উদ্দেশ্য হল, আখেরাতের জন্য কাজ করা। অর্থাৎ দুনিয়াতে বেশি বেশি নেককাজ করা।
৪. উপকারীর উপকার স্বীকার করা। যে ব্যক্তি মানুষের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না, সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করতে পারে না।
৫. কবরকে মসজিদে রূপান্তরিত না করার ব্যাপারে সাবধানতা। কোনো কবরকে মসজিদের ভিতর না ঢুকানো কিংবা কোনো ছবি মসজিদের ভেতর না রাখা। যে এ সব করে, সে অভিশপ্ত। সে আল্লাহর নিকট অতি নিকৃষ্টতর; সে যে কেউ হোক।
৬. সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজেদের জান, মাল এবং মাতা-পিতা ও সন্তানাদি হতে বেশি মহব্বত করতেন。
টিকাঃ
১ সহীহ মুসলিম: ৫৩২ * সহীহ আল-বুখারী ৪৬৬, ৩৬৫৪, ৩৯০৪, সহীহ মুসলিম ২৩৮২
📄 অসুস্থতার বৃদ্ধি, বিদায় গ্রহণ ও ওসীয়ত
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থতা বোধ করলে সুরায়ে নাস, ফালাক এবং ইখলাস পড়ে পড়ে নিজের উপর দম করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যু কালীন অসুস্থতা যখন বেড়ে গেল, তখন আমি উক্ত সুরাগুলো পড়ে দম করতাম। অন্য বর্ণনায় আছে, আমি তার উপর দম করতাম এবং বরকতের জন্য তারই হাত দিয়ে মালিশ করতাম। ইবনে শিহাব জুহরী রহ. বলেন, 'আয়েশা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে দম করতেন, অতঃপর তারই হাত দিয়ে চেহারা মালিশ করতেন।
সহীহ মুসলিমে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে সুরায়ে নাস, ফালাক এবং ইখলাস পড়ে দম করতেন। যখন তিনি নিজেই শেষবারে মত অসুস্থ হলেন, তখন আমি নিজে এ সুরাগুলো পড়ে তার উপর দম করি, আর তারই হাত দিয়ে তাকে মালিশ করি। কারণ, তার হাত আমার হাতের চেয়ে বেশি বরকতপূর্ণ।
আয়েশা রা বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সকল স্ত্রীগণ তার নিকট জড়ো হয়ে বসে ছিল। এমন সময় ফাতেমা হাঁটে হাঁটে তার কাছে আসে। তার হাঁটার ধরণ ছিল, রাসূলের হাঁটার ন্যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'স্বাগতম! আসো আমার মেয়ে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডানে অথবা বায়ে বসালেন। অতঃপর তার সাথে কানে কানে কিছু কথা বললেন, যা শুনে ফাতেমা কাঁদলেন। দ্বিতীয়বার তার সাথে কানে কানে কথা বললেন, এবার ফাতেমা হাসলেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কেঁদেছো কেন? সে বলল, আমি রাসূলের গোপনে বলা কথা কাউকে বলতে চাই না। আমি বললাম, 'কাঁদার সাথে সাথে এতো দ্রুত হাসতে আজকের মত তোমাকে আর কখনো দেখেনি।' আমি তাকে বললাম, 'আরে আমাদের রেখে শুধু তোমার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপন কথা বললেন, তারপরও তুমি কাঁদো?' আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেছেন?' সে বলল, 'আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা গোপনে বলেছেন তা ফাঁস করতে পারি না।' যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন, তখন আমি তাকে বলি, 'তোমাকে আমার আত্মীয়তার কথা স্বরণ করিয়ে বলছি, তুমি বল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেছিলেন?' ফাতেমা বলল, 'এখন বলতে পারি। প্রথমবার তিনি আমাকে বললেন, 'জিবরীল প্রতি বছর একবার করে আমার সাথে কুরআনের অনুশীলন করে, এ বছর দু'বার করেছে। আমার মনে হচ্ছে, আমার মৃত্যু সময় ঘনিয়ে এসেছে। তুমি তাকওয়ার অবলম্বন কর এবং ধৈর্যধারণ কর। আমি তোমার জন্য খুব ভাল এক পূর্বসূরী।' আপনি যে আমাকে কাঁদতে দেখেছেন, তার কারণ ছিল এটা। তিনি আমার অস্থিরতা দেখে দ্বিতীয়বার বললেন, 'ফাতেমা! তুমি মুমিনদের সকল নারীদের নেত্রী অথবা বলেছেন, তুমি এ উম্মতের সকল নারীদের শ্রেষ্ঠতম। এতে কি তুমি সন্তুষ্ট নয়?' আপনি যে আমাকে হাসতে দেখেছেন, তার কারণ ছিল এটা।" আরেকটি বর্ণনায় আছে, 'তিনি আমাকে বলেছেন, আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সাথে মিলিত হবে।'
ফাতেমার হাসার কারণ ছিল, তিনি সকল মু'মিন নারীদের নেত্রী এবং তিনিই সর্ব প্রথম রাসূলের পরিবারের মধ্য থেকে তার সাথে মিলিত হবেন। কান্নার কারণ ছিল, তিনি নিজের মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছেন এ জন্য। ইবনে হাজার রহ. বলেন, 'ইমাম নাসায়ী রহ. ফাতেমার কান্নার দু'টি কারণ উল্লেখ করেছেন।' একটি হল, সুসংবাদ; যে তিনি এ উম্মতের নারীদের নেত্রী। অপরটি হল, তিনি রাসূলের সাথে সবার আগে মিলিত হবেন। সকল ঐতিহাসিকগণ এক মত যে, ফাতেমা রা. রাসূলের ওফাতের পর রাসূলের পরিবারের মধ্যে সকলের আগে ইন্তেকাল করেন। এমনকি রাসূলের স্ত্রীদেরও আগে।'
আয়েশা রা. বলেন, 'কাউকে আমি রাসূলের চেয়ে বেশি মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতে দেখিনি।'
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট প্রবেশ করে দেখি, তিনি খুব জ্বরাক্রান্ত হয়ে আছেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর জ্বরের প্রকোপ খুব বেশি। তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তোমাদের দু'জনের উপর যে পরিমাণ জ্বর আসে, একা আমার উপর সে পরিমাণ জ্বর এসেছে। আমি বললাম, 'এর কারণ হল, আপনাকে দ্বিগুন সওয়াব দেয়া হয়।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি ঠিক-ই বলেছ। যে কোনো মুসলমানের গাঁয়ে কাঁটা কিংবা তার চেয়ে ছোট কোনো জিনিস বিদ্ধ হলেও আল্লাহ এর বিনিময়ে গুনাহ ঝরিয়ে দেন, যেমন গাছ তার পাতা ঝরিয়ে ফেলে।'
আয়েশা রা. এবং ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তারা বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর যখন জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পেল, তখন তিনি একটি নকশি চাদর চেহারার উপর টেনে তুলছিলেন, আর রেখে দিচ্ছিলেন। যখন জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পেত, মুখ হতে কাপড় সরিয়ে নিতেন। এমন অবস্থায় তিনি বললেন, 'ইহুদী ও খৃষ্টানদের উপর আল্লাহর অভিশম্পাত। তারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছে।' তিনি তাদের কর্ম হতে আমাদের সতর্ক করছিলেন।
আয়েশা রা. বলেন, আমরা রাসূলের অসুস্থ অবস্থায় আলোচনা করতে ছিলাম। এমন সময় উম্মে সালামা এবং উম্মে হাবীবা হাবশার (ইথিওপিয়ার) গীর্জা এবং তাতে দেখা ছবির স্মৃতি নিয়ে আলোচনা করতে ছিলো। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাদের অভ্যাস হল, তাদের মধ্যে কোনো ভাল লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করত এবং তাতে তার ছবি অংকন করে রাখত। তারা আল্লাহর কাছে কেয়ামতের দিন সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি হিসেবে পরিগনিত হবে।'
আয়েশা রা. হতে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সর্বশেষ অসুস্থতায় বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ইহুদী ও খৃষ্টানদের উপর অভিশম্পাত করুন, তারা নিজেদের নবীদের কবরসমূহকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছে।' আয়েশা রা. বলেন, যদি সে আশংকা না থাকত, তবে রাসূলের কবরও উচু করা হতো। আমার আশংকা হচ্ছে একে মসজিদে রূপান্তরিত করা হবে।'
আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে পরিণত করো না, আবার আমার কবরকে উৎসবের স্থান বানিয়ো না। তোমরা আমার উপর দরুদ পড়। তোমরা যেখানেই থাক, তোমাদের দরুদ আমার পর্যন্ত পৌঁছে যায়।'
আনাস রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থতার প্রকোপে বেহুש হয়ে যাচ্ছিলেন। এ অবস্থা দেখে ফাতেমা রা. বলেন, 'হায় বিপদ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'তোমার পিতার উপর আজকের পর আর কোনো বিপদ নেই।' ইন্তেকাল হয়ে গেলে, ফাতেমা রা. বলেন, 'হে আমার প্রাণের পিতা! আপনি আল্লাহর ডাকে সারা দিয়েছেন। হে আমার প্রাণের পিতা! আপনার ঠিকানা জান্নাতুল ফেরদাউস। হে আমার প্রাণের পিতা! আপনার বিয়োগ ব্যথা জিবরীলের নিকট প্রকাশ করছি। যখন দাফনকর্ম শেষ হল, ফাতেম রা. বললেন, 'হে আনাস! রাসূলের উপর কিভাবে তোমরা মাটি রাখলে! তোমাদের মন কিভাবে সায় দিল?'
এ পরিচ্ছেদের সারকথা ও শিক্ষনীয় বিষয়ঃ
১. কুরআন এবং হাদীসে বর্ণিত বিভিন্ন সুরা ও দুআ-জিকির দিয়ে ঝাড় ফুক করা মুস্তাহাব। বিশেষ করে সুরা নাস, সূরাফালাক এবং সুরা ইখলাসের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট সকল বস্তুর অনিষ্ট হতে আশ্রয় চাওয়া।
২. ফাতেমার প্রতি রাসুলের বিশেষ দৃষ্টি ও আন্তরিক মহব্বত। যেমন, তিনি স্বাগতম বলে ফাতেমাকে কাছে নিয়েছেন। আরো বর্ণিত আছে, ফাতেমা যখন রাসুলের কাছে যেতেন, তখন তাকে তিনি কাছে বসাতেন, চুমু খেতেন, দাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাতেন। তদ্রুপ ফাতেমাও রাসুলের সাথে করতেন, যখন তিনি তার বাড়িতে যেতেন।
৩. এ ঘটনা থেকে জানা যায়, মেয়েদের সাথে সদাচারণ করা, তাদের শিক্ষা-দীক্ষা এবং আচার ব্যবহারের তালিম দেয়া জরুরী বিষয়, রাসুলের সুন্নত। এবং তারা যখন বড় হয়ে যাবে, তখন তাদের জন্য সৎ পাত্রের ব্যবস্থা করা।
৪. বাচ্চাদের উচিত পিতা, মাতার প্রতি যত্নশীল হওয়া। তাদের অবাধ্যতা কিংবা নাফরমানী না করা। করলে আল্লাহর শাস্তির উপযুক্ত হয়ে যাবে।
৫. রাসুলের সত্যতার প্রমাণ যে, তিনি সংবাদ দিয়েছেন, ফাতেমা সবার আগে তার সাথে মিলিত হবে। বাস্তবে তা-ই হয়েছে।
৬. পরপারে যাওয়ার কথা শুনে ঈমানদারদের খুশী হওয়া। এর অর্থ এ নয় যে, কোনো বিপদ-মুসিবতের কারণে মৃত্যু কামনা করা। বরং নেক আমেলের সুযোগ মনে করে দুনিয়ার জীবনকে সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করা। হাদীসে এসেছে মানুষ মারা গেলে তার সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি জিনিস ব্যতীত। তাই জীবনকে সুযোগ মনে করে কাজ করতে থাকা মু'মিনের কর্তব্য।
৭. মৃত্যু ঘনিয়ে এলে মুমুর্ষ ব্যক্তির উচিত পরিবারের লোকজনকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়া। যেমন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমাকে দিয়েছেন।
৮. ফাতেমা রা. এর ফজিলত, তিনি সকল মুমিন নারীদের নেত্রী।
৯. অসুস্থ ব্যক্তিরা যদি স্বীয় অসুস্থতাকে সওয়াব মনে করে, আল্লাহ এর বিনিময়ে সওয়াব দিবেন, গুনাহ মাফ করবেন এবং জান্নাতে সুউচ্চ স্থানের যোগ্য করে গড়ে তুলবেন। দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি মুসীবতের সম্মুখীন হন নবী ও রাসূলগণ। এরপর যারা তাদের সাথে নীতি, আদর্শ ও আকীদা-বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করে তারা। যেহেতু তারা ধৈর্য ও আল্লাহ নির্ভরতায় সবার উর্ধ্বে। তারা আরো জানেন এগুলো আল্লাহর নেআমত ও প্রতিদান বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। এর মধ্য দিয়ে তাদের ধৈর্য ও সন্তুষ্টির পরীক্ষা নেয়া হবে। কম মর্যাদার হওয়া সত্ত্বেও নবী ও রাসূলদের অনুসরণ, আনুগত্য এবং ঘনিষ্টতার কারণে তাদের সাথে সম্পৃক্ত হবে। এতে সম্ভাব্য রহস্য হয়তো এটা যে, বিপদ-মুসিবত নেআমতের বিপরীতে প্রদান করা হয়। সুতরাং যার উপর আল্লাহর নেআমত বেশি হবে, তার উপর বিপদ-মুসিবতও বেশি হবে, সন্দেহ নেই। এ জন্যই পরাধীন ব্যক্তির উপর স্বাধীন ব্যক্তির অর্ধেক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমাদের ভেতর যে স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হবে, তাকে দ্বিগুন শ্বাস্তি দেয়া হবে।” শক্তিশালী ব্যক্তির উপর বড় বোঝাটাই রাখা হয়। দুর্বলের সাথে সহানুভূতি দেখানো হয়। তবে এটা ঠিক যে, যার ঈমান দৃঢ়, তার জন্য মুসিবত সহনীয়। কারণ, তার ধারণা মুসিবতের বিনিময়ে সওয়াব অর্জিত হবে, বিধায় তার জন্য মুসিবত সহনীয় হয়ে যায়। আবার কেউ মনে করে, এটা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে। তাই তার তাকদীরের উপর বিশ্বাস রেখে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়। কোনও আপত্তি জানায় না।
১০. কবরকে মসজিদে রূপান্তরিত করা কিংবা মসজিদের ভিতর কবর প্রবেশ করানো হতে বিরত থাকা। যে এ রকম কাজ করবে, সে অভিশপ্ত। কেয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সে সর্ব নিকৃষ্ট জীব হিসেবে পরিগণিত হবে। এটা রাসুলের গুরুত্বপূর্ণ উপদেশের একটি। মুত্যুর পাঁচ দিন আগে তিনি এ কথা বলে গেছেন。
টিকাঃ
১ সহীহ আল - বুখারী ৪৪৩৯, ৫০১৬, ৫৭৩৫, ৫৭৫১, সহীহ মুসলিম ২১৯২, এ আমলটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমের সময়ও করতেন। তিনি ঘুমের সময় সুরায়ে নাস, ফালাক এবং ইখলাস পড়ে হাতের উপর দম করে চেহারা এবং হাত পৌঁছে এমন সকল স্থান মেসেজ করতেন। সহীহ আল - বুখারী ৫৭৪৮ ২ সহীহ মুসলিম ২১৯২
২ সূরা আল-আহযাব : ৩০
📄 ইন্তেকাল পূর্ব অধ্যায়
ইবেন আব্বাস রা. বলেন, বৃহস্পতিবার দিন রসুলের অসুখ প্রচণ্ড আকার ধারণ করলে তিনি বলেন, 'আমার কাছে কিছু একটা নিয়ে আসো, আমি তোমাদের জন্য একটি উপদেশনামা লিখে দেই। যার পরে তোমাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।' সাহাবারা এ নিয়ে পরস্পর দ্বিধাদ্বন্দে লিপ্ত হয়ে গেল। অথচ রাসুলের সামনে এমন করা উচিত ছিল না। কেউ বলল, 'এখন রসুলের উপর রোগের প্রকোপ খুব বেশি, তোমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব রয়েছে, আমাদের জন্য এ কিতাবই যথেষ্ট।' ঘরে উপবিষ্ট লোকজন মতদ্বৈততায় লিপ্ত হয়ে গেল। কেউ বলল, 'কিছু একটা সামনে দাও, তোমাদের জন্য কিছু লিখে দিক, তাহলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না।' অন্যেরা অন্য কিছু বলতে ছিল। যখন হৈ চৈ আর দ্বিরুক্তি কথাবার্তা বৃদ্ধি পেল, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা আমার এখান থেকে দূরে সরে যাও।' আরেকটি বর্ণনায় আছে, তিনি বলেছেন, 'আমি যে অবস্থায় আছি, সেভাবে থাকতে দাও, তোমাদের কথা শুনার চেয়ে এটাই আমার জন্য উত্তম। আমি তোমাদেরকে তিনটি উপদেশ দিচ্ছি, জাজিরাতুল আরব তথা আরব উপদ্বীপ থেকে মুশরিকদের বের করে দেবে। আগত মুসাফিরের দল, পথিক ও মেহমানদের মেহমানদারী এবং আমার নীতি অনুসারে তাদের সাহায্য, সহযোগিতা প্রদান করবে। তৃতীয়টি ভুলে গেছেন, অথবা তিনি বলেছেন, আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।" ইবনে হাজার রহ. বলেন, সেই কঠিন মুহূর্তে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ তিনটি উপদেশ দিয়েছেন। এর দ্বারা বুঝে আসে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা লিখতে চেয়েছেন, তা লেখা জরুরী ছিল না। কেননা যদি জরুরী হতো, তাহলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকে বিরত থাকতেন না। অধিকন্তু যারা এর প্রতিবন্ধক হয়েছে, তাদের উপর শাস্তি নাযিল হত। পারতপক্ষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখে হলেও বলে দিতেন। যেমন তিনি বলেছেন, মুশরিকদেরকে বের করে দিতে। তার পরেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েক দিন জীবিত ছিলেন, তার থেকে অনেক হাদীস সাহাবায়ে কেরাম লিপিবদ্ধ করেছেন, হতে পারে তার মধ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জরুরী সে বিষয়কেও বলে দেয়া হয়েছে, যা তিনি লিখতে চেয়ে ছিলেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
তৃতীয় উপদেশের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা আছে যে, সে উপদেশ হচ্ছে আল- কুরআন। অথবা উসামা বিন যায়েদের সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করার উপদেশ। অথবা নামাজ এবং অধীনস্থদের ব্যাপারে কিংবা তার কবরকে ঈদ-উৎসবের স্থান না বানানোর উপদেশ। এ সকল উপদেশ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রমাণিত আছে।'
আব্দুল্লাহ বিন আবি আওফা রা. কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি কোনো অসীয়ত করে গেছেন? তিনি বললেন, 'আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে উপদেশ দিয়েছেন।' আল্লাহর কিতাবের অসীয়তের অর্থ হল, তার অর্থ ও শব্দ সংরক্ষণ করা। এর সম্মান করা, অসম্মান না করা এবং এর অনুসরণ করা। আদেশগুলো পালন করা। নিষেধ হতে বিরত থাকা। রীতিমত এর তেলাওয়াত করা, শিক্ষা দেয়া ও শিক্ষা গ্রহণ করা ইত্যাদি।
পবিত্র কুরআনের ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন জায়গায় উপদেশ প্রদান করেছেন। আরাফা এবং মিনার খুতবাতে, মক্কা হতে প্রত্যাবর্তনের সময় গাদিরে খুমের নিকট। তিনি বলেছেন, '... আমি তোমাদের মাঝে দু'টি জিনিস রেখে যাচ্ছি : একটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। এতে রয়েছে পথ নিদের্শনা, আলোকবর্তিকা। এটা আল্লাহর শক্ত রজ্জু। যে এটাকে আঁকড়ে ধরবে, সে সৎ পথে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। আর যে এটাকে ছেড়ে দেবে, সে পথভ্রষ্ট হবে। তোমরা আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধর এবং এর দ্বারা অটল-অবিচলতার সাথে পরিচালিত হও।' তিনি কুরআন প্রসংগের পরে বলেন, 'এবং আমার পরিবারবর্গ, তাদের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহর কথা স্বরণ করিয়ে দিচ্ছি...' তিনবার বলেছেন। মৃত্যুর সময় তিনি আল্লাহর কুরআনের উপদেশ দিয়েছেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামা বিন যায়েদের সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করার নিদের্শও দিয়েছেন। ইবনে হাজার রহ. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর মাত্র দু'দিন আগে, শনিবার দিন উসামা বিন যায়েদের সৈন্যবাহিনী গঠন করেন। এর প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল রাসুলের অসুস্থতারও আগে। সফর মাসের শেষে রোমের সাথে যুদ্ধের জন্য মুসলিম সৈনিকরা প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামাকে ডেকে বলেন, 'তোমার পিতার শাহাদাতের ময়দানের পানে ধাবিত হও। সে দিকে ঘোড়া চালাও। আমি তোমাকে এ সেনাদলের দায়িত্ব প্রদান করলাম...' তৃতীয় দিন তার অসুখের সূচনা হয়। তিনি নিজ হাতে উসামা বিন যায়েদের পতাকা তৈরী করে দিলেন, উসামা তার হাত থেকে পতাকা তুলে নেন। উসামার সাথে মুহাজির, আনসারদের বড় বড় সাহাবী সঙ্গী হলেন। অতঃপর রাসুলের রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পেল। তিনি বললেন, 'উসামার সৈন্যদল পাঠিয়ে দাও।' আবু বকর রা. খলীফা হয়ে উসামার সৈন্যদল প্রেরণ করেন। বিশ দিন পর্যন্ত সফর করলেন, তার পিতার যুদ্ধের ময়দানে পৌঁছানোর জন্য। তিনি খুব পারঙ্গমতার সহিত যুদ্ধ করলেন। অবশেষে অনেক গণীমত নিয়ে বিজয় বেশে ফিরে আসেন।'
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সৈন্যদল পাঠিয়েছেন, যার দায়িত্ব দিয়েছেন উসামা বিন যায়েদকে। এতে কেউ কেউ তার নেতৃত্বে আপত্তি জানাতে ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এখন তোমরা তার নেতৃত্বে আপত্তি জানাচ্ছ, এক সময় তার পিতার নেতৃত্বেও তোমরা আপত্তি জানিয়েছিলে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, সে-ই নেতৃত্বের উপযুক্ত। তার পিতা যেমন আমার কাছে সবার চেয়ে বেশি প্রিয় ছিল, সেও আমার নিকট সবার চেয়ে বেশি প্রিয়।' রাসুলের ইন্তেকালের সময় উসামার বয়স ছিল আঠারো বছর।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ এবং অধীনস্থদের ব্যাপারেও উপদেশ বাণী প্রদান করেছেন। আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মৃত্যুকালীন সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অধিকাংশ উপদেশ-ই ছিল এরকম যে, 'নামাজ! নামাজ! আর তোমাদের যারা অধীনস্থ! বলতে বলতে তার বুকের ঢেকুর আরম্ভ হয়ে যেত। তবুও মুখে উচ্চারণ করতেই থাকতেন।' আলী রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সর্বশেষ বাণী ছিল: 'নামাজ! নামাজ! আর তোমাদের অধীনস্থ যারা!
এ পরিচ্ছেদের সারকথা ও শিক্ষনীয় বিষয়ঃ
১. জাযিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপ হতে মুশরিকদের বের করা অবশ্য কর্তব্য। মৃত্যুকালীন সময়ে এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরাসরি নিদের্শ দিয়েছেন। যা উমার রা. স্বীয় খেলাফতের শুরুতেই বাস্তবায়ন করেন। মুরতাদদের সাথে বোঝা-পড়া আর যুদ্ধ-বিগ্রহ করতে করতেই আবু বকর রা. এর খেলাফত যুগ শেষ হয়ে যায়। তাই তার পক্ষে এ হুকুম পালন করা সম্ভব হয়নি।
২. আগত মেহমান ও পথিকদের মেহমানদারী, সম্মান এবং উপযুক্ত হাদিয়া ইত্যাদি প্রদান করা। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং করতেন। আর এটা তার নিদের্শও বটে।
৩. কুরআনের শব্দ ও অর্থের প্রতি যত্নশীল হওয়া, একে সম্মান করা, হেফাজত করা, এর মধ্যে যা কিছু আছে তার অনুসরণ করা, এর আদেশ-নিষেধগুলো যথাযথ পালন করা এবং রীতিমত এর তেলাওয়াত করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন জায়গায় এর জন্য উপদেশ দিয়েছেন। এর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।
৪. নামাজের গুরুত্ব; কারণ কালিমায়ে শাহাদাতের পরই এর স্থান। মুমুর্ষ মুহূর্তেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য অসীয়ত করেছেন।
৫. অধীনস্থ কর্মী ও দাস-দাসীদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন থাকা। যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যু মুহূর্তেও এর জন্য তাগিদ দিয়েছেন।
৬. উসামা বিন যায়েদের ফজিলত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেনা প্রধান বানিয়েছেন। যখন অনেক শীর্ষস্থানীয় মুহাজির ও আনসার সাহাবায়ে কেরাম উপস্থিত ছিলেন। অধিকন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ হুকুম বাস্তবায়ন করার নিদের্শও প্রদান করেছেন।
৭. আবু বকর রা এর ফজিলত। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপদেশ পালন করেছেন, উসামা বিন যায়েদের সৈন্য বাহিনীর লক্ষ্য পরিবর্তন করেননি। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
"যারা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আদেশের বিরোধিতা করে, তাদের উচিত ফেতনা অথবা মর্মন্তুদ শাস্তির আক্রমন হতে সতর্ক থাকে।"