📄 বিনয় ছত্র জয়ের জন্য উপদেশ ও বিনয় গ্রহণ
১. মানুষের মাঝে হজের ঘোষণাঃ
সুস্পষ্ট দাওয়াত, আমানত আদায়, উম্মতকে উপদেশ, আল্লাহর পথে যথাযথ সংগ্রামের পর তিনি মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দেন। তাদেরকে জানিয়ে দেন যে, তিনি দশম বছর হজব্রত পালন করবেন। মদীনাতে নয়টি বছর দাওয়াত, শিক্ষা, জিহাদে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করার পর এ ঘোষণায় উদ্দেশ্য ছিল, মানুষকে হজ ফরযের সংবাদ পৌঁছানো-যাতে তারা তার নিকট থেকে হজের বিধি-বিধান শিখে নেয় এবং তার কাজ-কথাগুলো প্রত্যক্ষ করে। এবং তাদের অসীয়ত করবেন, উপস্থিতগণ কর্তৃক অনুপস্থিতদের কাছে এ পয়গাম পৌঁছে দেয়ার জন্য। তারা যাতে ইসলামী দাওয়াতের অনুসরণ করে এবং দূরে ও কাছের সকলের নিকট তা পৌঁছে দেয়।'
জাবের রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় দশ বছর অবস্থান করেন এ সময়ে হজ করেননি। অতঃপর দশম হিজরীতে তিনি লোকদের মাঝে হজের ঘোষণা দেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ করবেন। তাই মদীনায় বিশাল একদল লোক জমায়েত হলো। তাদের সকলের আকাঙ্খা তারা রাসূলের অনুসরণ করবে। হজে তিনি যা করবেন তারাও তার মত আমল করবেন....'এ ভাবেই জাবের রাসূলের হজের কথা বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এক পর্যায় তিনি বললেন, বাইদা' নামক স্থানে তার উষ্ট্রী তাকে নিয়ে থেমে গেল। আমি আমার দৃষ্টির শেষসীমা পর্যন্ত তার সামনে পদব্রজকারী ও আরোহনকারীদের দেখতে পেলাম। অনুরূপ তার ডানে বামে ও পেছনেও দেখলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝেই ছিলেন। তার উপর আল-কুরআন অবর্তীণ হচ্ছিল এবং তিনি তার ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন। এরই মধ্যে তিনি যা আমল করেছেন আমরা ও তার সাথে আমল করতে থাকি। ... এভাবে জাবের রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হজ আদায়ের বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এক পর্যায় বললেন, 'তিনি আরাফায় পৌঁছলেন এবং নামিরাতে তার জন্য নির্মিত তাবুতে অবতরণ করলেন।'
২.আরাফয় উম্মতকে শেষ উপদেশ ও বিদায় জানানোঃ
জাবের রা. বলেন, যখন সূর্য অস্তমিত হলো 'কাসওয়া' (তার সাওয়ারী) আনার জন্য আদেশ করলেন। তাকে নিয়ে আসা হলো। 'বাতনে ওয়াদী'তে তিনি ভাষণ দিলেন এবং বললেন, 'তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের কাছে সম্মানিত। যেমন পবিত্র ও সম্মানিত তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর। জেনে রাখ! জাহেলী যুগের সকল কর্মকান্ড আমার পদতলে পিষ্ট। জাহেলী যুগের রক্তের দাবী রহিত করা হলো। প্রথম যে রক্ত দাবী রহিত করছি, তাহলো আমাদের রক্তর দাবী- ইবনে রবিয়া বিন হারিসের রক্ত- সে বনি সাআদ গোত্রে দুধ পান করতো। তাকে হুযাইল গোত্রের লোকেরা হত্যা করেছিল। জাহেলী সুদ রহিত করা হলো। প্রথম যে সুদ, যা রহিত করলাম তা হলো আমাদের সুদ আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এর সুদ- তা পুরোটি রহিত করা হলো।' আর নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর, কারণ তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং তাদের গুপ্তাঙ্গ বৈধ করেছ আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হলো, তোমরা যাকে অপছন্দ কর এমন কাউকে তারা বিছানায় স্থান দেবে না।' যদি তারা এমন কিছু করে বসে, তাহলে তাদের মৃদু শাসন কর। তাদের আহার-বিহার, পোশাক- পরিচ্ছদ তোমাদের দায়িত্বে। তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব রেখে গেলাম। যদি তা আঁকড়ে ধর তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। আর আমার ব্যাপারে তোমরা জিজ্ঞাসিত হলে কি বলবে?' উপস্থিত সাহাবীগণ বললেন, 'আমরা সাক্ষী দেব যে, আপনি রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন, আমানত আদায় করেছেন, জাতিকে উপদেশ দিয়েছেন। অতঃপর তিনি তার শাহাদত আঙ্গুলী আকাশের দিকে উত্তোলন করেন এবং মানুষের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, 'হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন! হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন! হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন!'। সমাবেশস্থল বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।
আল্লাহ তাআলা জুমার দিবসে আরাফার দিনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অবর্তীণ করেন তার বাণীঃ
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ﴿٣﴾ سورة المائدة
'আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম। তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।' এ উম্মতের উপর এটা আল্লাহর পক্ষ হতে এক বিশাল নেআমত; যে আল্লাহ তাদের জন্য তাদের দীন পরিপূর্ণ করেছেন। তাই তাদের অন্য কোন দীনের মুখাপেক্ষী হতে হবে না। তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কোন নবীর মুখাপেক্ষীরও প্রয়োজন পড়বে না। এটা এ জন্য যে, আল্লাহ তাআলা তাকে শেষ নবী বানিয়েছেন। এবং তাকে প্রেরণ করেছেন সকল জিন ইনসানের জন্য। তাই ঐ বস্তু হালাল বলে গণ্য হবে, যা তিনি হালাল বলেন। ঐ বস্তু হারাম হবে, যা তিনি হারাম বলেন। এবং তিনি যা বিধান হিসাবে বলবেন, তাই হবে বিধান। আর তিনি যত সংবাদ দিয়েছেন সবই সত্য- হক্ক, তাতে মিথ্যা - পশ্চাৎপদতা নেই।
وَتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا
"তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে পূর্ণতা লাভ করেছে।” অর্থাৎ সত্যতা সংবাদ পরিবেশনে আর ইনসাফ আদেশ ও নিষেধ প্রদানে। তাই আল্লাহ যখন তাদের জন্য দীনকে পূর্ণাঙ্গ করেছেন তাদের উপর নেয়ামত ও পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।
বর্ণিত আছে, আরাফা দিবসে এ আয়াত অবতরণ প্রাক্কালে, উমার রা. কেঁদে ছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো আপনি কাঁদছেন কেন? উত্তরে বললেন, 'এর কারণ হলো আমরা দীনের সমৃদ্ধিতে ছিলাম। এখন পূর্ণাঙ্গ করা হলো। আর কোন বস্তু পূর্ণাঙ্গ হলে তার তা আর বৃদ্ধি পায় না। সমৃদ্ধ হয় না।' তিনি যেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পূর্বাভাস দেখছিলেন এ আয়াতে।
৩. জামরাতে উম্মতকে উপদেশ দান ও বিদায় জানানোঃ
জাবের রা. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দশম তারিখে বাহনে থেকে পাথর নিক্ষেপ করতে দেখেছি এবং বলতে শুনেছি 'তোমরা আমার থেকে তোমাদের বিধি-বিধানগুলো শিখে নাও, আমি জানি না, হতে পারে এ হজের পর আমি আর হজ করব না।'
উম্মে হুসাইন রা. বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হজ পালন করেছি, এবং তাকে দেখেছি জামরাতুল আকাবা নিক্ষেপ শেষে ফেরার পথে তিনি সাওয়ারীর উপর ছিলেন। তার সাথে বেলাল ও উসামা রা. ও ছিলো। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক কথাই বললেন। তবে আমি তাকে বলতে শুনেছি, 'তোমাদের উপর যদি কোন কালো বিকলাঙ্গ কৃতদাস আমীর নিযুক্ত করা হয়, সে যদি আল্লাহর কিতাব দিয়ে তোমাদের পরিচালিত করে, তার আনুগত্য কর, অনুসরন কর।'
৪. কুরবানীর দিনে উম্মতকে উপদেশ দান ও বিদায় জানানোঃ
আবু বকরা রা. হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বহনকারী উটে বসা ছিলেন। জনৈক ব্যক্তি লাগাম ধরলেন। তিনি মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, 'তোমরা কি জানো এটা কোন দিন?' তারা বলল, 'আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভাল জানেন।' এবং তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। আমরা মনে করলাম তিনি আজকের দিনের অন্য কোন নাম ঘোষণা করবেন। অতঃপর বললেন, 'এটা কি কুরবানীর দিন নয়?' আমরা বললাম, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!' তিনি বললেন, 'এটা কোন মাস?' আমরা বললাম, 'আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভাল জানেন।' এবং তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। আমরা মনে করলাম, তিনি এ মাসের অন্য কোন নাম দেবেন। অতঃপর বললেন, 'এটা কি জিলহজ মাস নয়?' আমরা বললাম, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!' তিনি বললেন, 'এটা কোন শহর?' আমরা বললাম, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভাল জানেন।' তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। আমরা মনে করলাম, তিনি এ শহরের অন্য কোন নতুন নাম বলবেন। বললেন, 'এটা কি পবিত্র নগরী নয়?' আমরা বললাম, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহ রাসূল!' তিনি বললেন, 'তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের ইজ্জত- আব্রু, তোমাদের শরীর তোমাদের কাছে সম্মানিত ও হারাম। যেমন সম্মানিত এ নগরী, এ মাস, আজকের এ দিন। অচিরেই তোমরা তোমাদের প্রভুর সাক্ষাত লাভ করবে। তখন তোমাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। তাই আমার পর তোমরা ভ্রষ্টতার দিকে যাবে না- যা তোমাদের পরস্পরকে হত্যার দিকে ধাবিত করে। জেনে রাখ! তোমরা যারা আজ উপস্থিত আছ তারা এ বাণী পৌঁছাবে অনুপস্থিতদের কাছে। কারণ বহু বর্ণনাকারী হতে শ্রবণকারী অধিক জ্ঞানী, ও সংরক্ষণকারী হয়ে থাকে। আমি কি পৌঁছিয়েছি?' অতঃপর পেছনে গেলেন এবং দুটি লাবণ্যময় মেষ জবেহ করলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি ‘উপস্থিতিগণ অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছাবে’ এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ হতে উম্মতের জন্য অসীয়ত। তিনটি প্রশ্নের প্রতিটির পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ নীরব থাকার উদ্দেশ্য ছিল : তাদের বোধশক্তিকে উপস্থিত করা, সকলের মনোযোগ পুরোপুরি আকর্ষণ করা এং সংবাদের গুরুত্ব অনুধাবন করানো।
ইবনে উমার রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কুরবানী দিবসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামারাতে অবস্থান করেন... এবং বলেন, 'এটা হচ্ছে বড় হজের দিন। আরো বললেন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।' এবং লোকদের বিদায় জানালেন। উপস্থিত লোকেরা বলল, 'এটা বিদায় হজ।'
মীনাতে আল্লাহ সকল হাজীদের কানগুলো ব্যাপক ভাবে খুলে দিলেন, যেন কুরবানী দিবসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদত্ত খুতবা সবাই শুনতে পায়। এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুজিযা যে আল্লাহ তাদের কানে বরকত দিলেন এবং শ্রবণ শক্তিকে বৃদ্ধি করলেন। যাতে দূরে কাছে সবাই তার ভাষণ শুনতে পায়। এমনকি তারা অনেকে তাদের বাড়িতে বসে ও শুনতে পেয়ে ছিলেন।
আব্দুর রহমান বিন মুয়ায আত তাইমী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা মিনায় অবস্থানকালে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাষণ দিলেন, আর আমাদের কানগুলো খুলে দেওয়া হলো। এমনকি তিনি কি বলছেন তা আমরা গৃহে বসেও শুনছিলাম।'
৫. আইয়্যামে তাশরীকে উম্মতের জন্যে তার অসীয়ত :
জিলহজ মাসের বারো তারিখে আইয়্যামে তাশরীকের দ্বিতীয় দিন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন, এ দিনটিকে ইয়াওমুর রা'স- মাথা দিবস- বলা হতো। এ দিনে তারা জবেহকৃত পশুর মাথা আহার করতো বলে মক্কার লোকেরা এ নামে দিনটিকে উল্লেখ করতো। এবং এটা ছিল তাশরীক দিনগুলোর অন্ত র্ভুক্ত।
বাকার গোত্রের দুইজন লোক যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবী ছিলেন, বললেন, তাশরীক দিনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমরা খুতবা দিতে দেখেছি, আমরা তার উষ্ট্রীর কাছে ছিলাম। এটা ছিল মিনায় প্রদত্ত খুতবার মত।
আবু নাদরা রা. হতে বর্ণিত, যে ব্যক্তি তাশরীক দিবসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খুতবা শুনেছেন, তিনি আমাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হে লোক সকল! তোমাদের প্রভু একজন। তোমাদের পিতা একজন। জেনে রাখ, অনারবের উপর আরবের কোন প্রাধান্য নেই। কালোর উপর সাদারও নেই কোন শ্রেষ্ঠত্ব। সাদার ও নেই কালোর উপর কোন প্রাধান্য। তবে শ্রেষ্ঠত্ব হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে। আমি কি পৌঁছাতে পেরেছি তোমাদের কাছে? তারা বললো, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!' অতঃপর বললেন, 'এটা কোন দিন? তারা বলল, 'এটা সম্মানিত দিন।' তিনি আবার বললেন, 'এটা কোন মাস?' তারা বলল, 'এটা পবিত্র মাস।' আবার বললেন, 'এটা কোন নগরী?' তারা বলল, 'সম্মানিত নগরী।' তিনি বললেনঃ 'আল্লাহ সম্মানিত করেছেন তোমাদের পরস্পরের রক্ত, সম্পদ, ইজ্জত আব্রু, ঠিক আজকের সম্মানিত দিন, সম্মানিত মাস ও সম্মানিত নগরীর মত। আমি কি পৌঁছাতে পেরেছি?' তারা বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি পৌঁছিয়েছেন।' তিনি বললেন, 'উপস্থিতগণ অনুপস্থিতদের কাছে যেন এ বাণী পৌঁছে দেয়।'
এখানে বিদায় হজে পবিত্র স্থানসমূহে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাষণের সংক্ষেপ বর্ণিত হলো।
এর মধ্যে রয়েছে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর হাদীস- নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজে মানুষের উদ্দেশ্যে খুতবা দিলেন এবং বললেন, 'শয়তান আশাহত হয়েছে এ বিষয়ে যে, এ ভূমিতে তার উপাসনা হবে না। কিন্তু এ ছাড়া অন্য আমল যা তোমরা তুচ্ছ জ্ঞান কর, তার বিষয়ে সে উপাসনা পাওয়ার আশা করবে। অতএব! তোমরা সাবধান থেকো! আমি তোমাদের মাঝে রেখে যাচ্ছি এমন বিষয়, যা তোমরা আকড়ে ধরলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব, তাঁর নবীর সুন্নাত।'
আবু উমামাহ রা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার জাদআ উটের উপর থেকে বিদায় হজে জনতার উদ্দেশে খুতবা প্রদানকালে বলতে শুনেছি, 'হে মানব সকল! তোমরা তোমাদের প্রভুর আনুগত্য কর। পাঁচ ওয়াক্ত নামায কায়েম কর। তোমাদের সম্পদের যাকাত আদায় কর। রমযানের সিয়াম পালন কর। এবং তোমাদের শাসকের আনুগত্য কর। তাহলে তোমরা তোমাদের প্রভুর জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
এ পরিচ্ছেদের সারকথা ও শিক্ষনীয় বিষয়ঃ
১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হজের আহবানে সাড়া দিয়ে যে-ই মদীনায় উপস্থিত হয়েছেন, সে-ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথেই হজ করেছেন। জাবের রা. হতে বর্ণিত হাদীস তাই প্রমাণ করে। তিনি বলেন, মদীনায় অসংখ্য লোকের সমাগম হয়েছিল। প্রত্যেকের ইচ্ছা আল্লাহর রাসূলের অনুসরণ করবে। তিনি যা আমল করবেন তারা তা-ই করবে।
২. হাজীদের জন্য উত্তম হলো সূর্য হেলে যাওয়ার পর আরাফায় অবতরণ করা, যদি সম্ভব হয়।
৩. আরাফায় হাজীদের উদ্দেশ্যে খুতবা প্রদান করা উত্তম, এতে থাকবে মানুষের জরুরী বিষয়ের ব্যাখ্যা, তাওহীদ ও দীনের মৌলনীতির ব্যাখ্যা। তাতে সতর্ক করা হবে শিরক, বিদআত ও পাপ ও মুসলিম জাতির দিক-নির্দেশনা সম্পর্কে এবং উপদেশ থাকবে মানুষের প্রতি কুরআন এবং সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন যাপন করার।
বিদায় হজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনটি খুতবা প্রদান করেছেন। আরাফা দিবসে খুতবা, মীনায় কুরবানী দিবসের খুতবা, মীনায় জিলহজ মাসের ১২ তারিখে খুতবা। ইমাম শাফী র. এর মত হলো ইমাম অনুরূপ খুতবা দেবে। জিলহাজ মাসের সাত তারিখে' এবং এর মধ্যে আগামী খুতবার পূর্ব পর্যন্ত সব বিষয় ইমাম শিক্ষা দেবে।
৪. রক্ত, ইজ্জত, সম্পদ, শরীর ইত্যাদি পবিত্র হওয়ার বিষয় দৃঢ়ভাবে গুরুত্ব প্রদান। এক মুসলিমের জান, মাল-সম্পদ, ইয্যত-সম্মান অন্য মুসলিমের জন্য হারাম ও সম্মানিত। সে এগুলোর কোন ক্ষতি করতে পারে না। বরং এগুলোকে সম্মান করতে হবে।
৫. উদাহরণ ব্যবহার এবং একটি উপমার সাথে অন্য একটি উপমার তুলনা। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী- 'এ দিনের মত সম্মানিত, এ মাসের মত হারাম, এ শহরের মত পবিত্র।
৬. জাহেলী যুগের সকল কর্মকান্ড ও সুদ রহিত করা। এটাও জেনে রাখা যে, জাহেলী যুগের হত্যাকান্ডের কোন কেসাস নেই।
৭. ইমাম অথবা যে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে, সে প্রথমে নিজেকে এবং নিজের পরিবার থেকে শুরু করবে। কারণ এরা তার কথা গ্রহণের উপযুক্ত। এবং নবদীক্ষিত মুসলিমের সাথে ভাল আচরণ করা।
৮. সুদের মধ্যে মূলধনের অতিরিক্ত হলো হারাম। মূলধন মালিকেরই প্রাপ্য।
৯. নারী অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখা, এবং তাদের সাথে উত্তম আচরণ করা।
১০. স্ত্রীর ভরণ-পোষণ দেয়া ফরয। সে যদি কোন অন্যায় করে এর জন্য তাকে শর্তসাপেক্ষে এবং কুরআন ও সুন্নায় বর্ণিত নিয়মে শাস্তি দেয়া যাবে এবং এর ফলে যেন কোন প্রতিক্রয়া সৃষ্টি না হয়।
১১. উপদেশ হবে আল্লাহর কিতাব এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের মাধ্যমে।
১২. 'তোমরা হজের বিধানাবলী আমার থেকে গ্রহণ কর', এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ হতে আদেশ অর্থাৎ আমার এ হজে আমি যা আনয়ন করেছি- কথা, কাজ, আচরণ সবই গ্রহণ কর।
হজের এ সকল আহকাম তোমরা শিখে নাও, সংরক্ষণ কর, আমল কর এবং মানুষকে শিক্ষা দাও। হজের আহকাম বিষয়ে এটি একটি মৌলিক হাদীস, যা নামাজের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী صلوا كما رأيتموني أصلي (তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখ সেভাবে নামাজ পড়) এর মত।
১৩. 'সম্ভবত এরপর আমি হজ করবো না' এর মাধ্যমে উম্মতকে বিদায় জানানোর প্রতি ইঙ্গিত। এবং তাদের জানিয়ে দেয়া যে, মৃত্যু অতি নিকটে। তাদেরকে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে তার কাছ থেকে শিক্ষা নেয়ার এবং সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য। আর এ কারণেই এটাকে বিদায় হজ বলা হয়।
১৪. জ্ঞানের প্রচার প্রসারের জন্য উৎসাহ প্রদান করা, এবং এ প্রচার প্রসারের জন্য খুব বড় পন্ডিত হওয়া শর্ত নয়। কারণ, হতে পারে তারপর অন্য কেহ আসবে, যে পূর্বের ব্যক্তির চেয়ে অধিক বিদ্বান হবে। উত্তম হলো খতীব উঁচু স্থানে থাকবে যাতে সবাই দেখতে ও শুনতে পায়।
১৫. প্রশ্ন করা অতঃপর নীরব থেকে আবার তার উত্তর প্রদান, বিষয়টি শ্রোতা ও ছাত্রদের মনোযোগ আকর্ষনের একটি সুন্দর মাধ্যম।
১৬. 'ওয়ালিউল আমর' বা দায়িত্বশীল এর আদেশ সর্বদা মান্য করা। যতক্ষণ তিনি মানুষকে কুরআন অনুসারে পরিচালিত করেন। যদি তার থেকে কোন গুনাহ এবং নিষিদ্ধকাজ প্রকাশ পায় তাহলে তাকে উপদেশ দেয়া, আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া, আল্লাহর ভয় দেখানো উচিত। তবে তা হবে হিকমত ও উত্তম পদ্ধতিতে।
১৭. আল্লাহর আনুগত্য, নামায, যাকাত, রোযার নির্দেশ দেয়া এবং এ অসীয়ত করা যে মানুষের মাঝে কোন শ্রেণি বিভক্তি নেই, নেই কোন বর্ণ বিভক্তি। কিন্তু তাকওয়ার ভিত্তিতে মান-মর্যাদার স্তর নির্ণয় করা হবে।
১৮. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রকাশিত মুজিযা - কুরবানী দিবসে তার খুতবা গৃহে অবস্থান করেও মানুষেরা শুনতে পেরেছে। আল্লাহ তাআলা সকলের কানগুলো বিশেষভাবে খুলে দিয়েছেন। যা রাসূলের রিসালাতের সত্যতার আরেকটি নিদর্শন।
১৯. ইসলামী বিদ্বানদের মতে কুরবানী হলো সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এটা হাজী এবং হাজী ভিন্ন সকলের জন্য। এর মাধ্যমে হাদি' আদায় হবে না। হাদি জবেহ করা স্বতন্ত্র সুন্নাত। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনায় খুতবা প্রদান করার পর যে দুটি মেষ যবেহ করেছেন তা ঐ সকল হাদির থেকে পৃথক ছিল, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে যবেহ করেন এবং বাকীগুলো আলী রা. কে যবেহ করতে বলেছেন।
📄 মৃত ও জীবিতকে বিদায় দান
আয়েশা রা. বলেন, যখন আমার ঘরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাত্রি যাপনের পালা আসতো, তিনি শেষ রাতে বাকী নামক কবর স্থানের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যেতেন। অতঃপর তিনি বলতেন':
السلام عليكم دار قوم مؤمنين وآتاكم ما توعدون، غدا مؤجلون وإنا إن شاء الله بكم لاحقون، اللهم اغفر لأهل بقيح الغرقد.
(হে মুমিন সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতি সালাম। যা তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তাতো এসে গেছে। আগামী কাল আমাদের সময়। আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা তোমাদের সাথে যোগ দেব। হে আল্লাহ! আপনি বাকী গারকদ বাসীকে ক্ষমা করুন)
অপর একটি বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জিবরীল আমার কাছে এসেছে.. অতঃপর সে বলে, 'আপনার প্রভু আপনাকে বাকীতে দাফনকৃত কবরবাসীদের নিকট গিয়ে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন।' তখন আয়েশা রা. বলেন, হে আল্লাহর রসুল! আমি তাদের জন্য কি বলব? তিনি বললেন, 'তুমি এ কথাগুলো বলবে।'
السلام عليكم أهل الديار من المؤمنين والمسلمين ويرحم الله المستقدمين منا والمستأخرين وإنا إن شاء الله بكم لا حقون.
(তোমাদের প্রতি সালাম হে মুমিন ও মুসলিম অধিবাসীগণ! আল্লাহ আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের রহম করুন! আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো।)
ইমাম উবি রহ. বলেন, 'এ সকল কবর যিয়ারতের ঘটনা হচ্ছে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শেষ জীবনের।' এর দ্বারা প্রমাণ মিলে যে, তিনি মৃত ব্যক্তিদের থেকে বিদায় নিয়েছেন। যেমন তিনি তা করেছেন উহুদের ময়দানে শহীদগণের ক্ষেত্রেও। আর এ জন্যই তিনি বাকীর কবরবাসীদের জন্য দুআ করার নিমিত্তে শেষ রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন। আয়েশা রা. বলেন, '...আমিও তার পিছনে পিছনে চলতে শুরু করলাম। তিনি বাকীর কবর স্থানে এসে দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়ে থাকলেন। তিনবার তাদের জন্য হাত উঠালেন। অতঃপর রওয়ানা করলেন...।'
উকবা ইবনে আমের রা. বলেন, আট বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন মদীনা থেকে বের হয়ে উহুদের শহীদদের উপর নামাজ পড়লেন; যেভাবে মৃত ব্যক্তিদের জন্য জানাযা নামাজ পড়ার নিয়ম সেভাবে। অতঃপর মিম্বারে উঠে বললেন, 'তোমাদের মধ্য হতে আমিই সবার অগ্রগামী। আমি তোমাদের সকলের জন্য সাক্ষী হবো। তোমাদের সাথে আমার হাউজে কাউসারে সাক্ষাত হবে। আল্লাহর শপথ! আমি আমার এ স্থানে দাড়িয়ে হাউসে কাউসার অবলোকন করছি। আমাকে দুনিয়ার ধনভান্ডারের চাবি প্রদান করা হয়েছে। অথবা বলেছেন, দুনিয়ার চাবি প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহর শপথ! আমার পরে তোমরা আল্লাহর সাথে শরীক করবে, এ আশংকা আমি করি না। তবে, আমি দুনিয়ার বিষয়টি নিয়ে তোমাদের ব্যাপারে শঙ্কিত তোমরা দুনিয়ার ধন-সম্পদ অর্জনে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে। নিজেরা ঝগড়া ফাসাদ ও মারামারিতে লিপ্ত হবে। অতঃপর তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীরাও ধ্বংস হয়েছে।'
উকবা রা. বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিম্বারের উপরে এটাই আমার সর্বশেষ দেখা।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত ব্যক্তিদের থেকে বিদায় নেয়ার বিষয়টি এ হাদীসের ভাষা থেকেই স্পষ্ট। কারণ ভাষণটি ছিল তার জীবনের শেষের ঘটনা। মৃত ব্যক্তিদের থেকে বিদায় নেয়ার উদাহরণ হচ্ছে, বাকী কবরস্থানে গিয়ে কবরবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, উহুদের শহীদদের জন্য দুআ করা এবং স্বশরীরে তাদের যিয়ারত থেকে ফিরে আসা।
এ পরিচ্ছেদের সারকথা ও শিক্ষনীয় বিষয়:
১. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মতদের কল্যাণ করার জন্য আপ্রান চেষ্টা করেছেন। জীবিত এবং মৃত সকলের কল্যাণ কামনায় ব্রতী ছিলেন। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ: আট বছর গত হওয়ার পরও তিনি উহুদের শহীদদের উপর জানাযার ন্যায় নামাজ পড়েছেন। বাকীর কবরস্থানে কবরবাসীদের যিয়ারত করেছেন এবং তাদের জন্য দুআ করেছেন। জীবিত ব্যক্তিদের উপদেশ, নসীহত ও কল্যাণের নির্দেশনা দিয়েছেন। এমন কোনো কল্যাণ নেই, যা তিনি স্বীয় উম্মতকে বলেননি। এমন কোনো অকল্যাণও নেই, যা থেকে তিনি নিজ উম্মতকে সতর্ক করেননি।
২. যাকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া এবং তার ঐশ্বর্য প্রদান করেছেন, তাকে দুনিয়ার চাক্যচিক্য থেকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। তার উচিত অশুভ পরিণতির ভয় করা। দুনিয়া নিয়ে আত্মতুষ্টিতে না থাকা। এ ব্যাপারে কারো সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ না হওয়া। বরং নিজের কাছে যা আছে, তা আল্লাহর সন্তুষ্টিতে ব্যবহার করা।
টিকাঃ
১ বাকিউল গারকাদ: মদীনাবাসীদের কবর স্থান। গাকাদ মূলতঃ একপ্রকার কাটা গাছ, এখানে কোনো এক সময় এ গাছগুলো ছিল, তাই এর নাম হয়ে গেছে গারকাদ বলে। নববির ব্যাখ্যা গ্রন্থ ৭/৪৬, ইমাম উব্বির ব্যাখ্যা গ্রন্থ ৪/৩৯০ * সহীহ মুসলিম : ৯৭৪
📄 অসুস্থতার সূচনা ও 'আবু বকর রা. কে ইমামতির দায়িত্ব প্রদান
নবুওয়তের দশম বছর হজ সম্পাদন শেষে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতেই অবস্থান করেন। জিলহজের বাকি অংশ, মহররম এবং সফর মাসে তিনি সুস্থই ছিলেন। এ সময়ে তিনি উসামা বিন যায়েদকে প্রধান করে একটি সৈন্যদল গঠন করেন। মুসলিম মুজাহিদগণ যার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল। সফর মাসের প্রায় শেষ অংশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থতা বোধ করতে আরম্ভ করেন। ২২ সফর, ২৯ সফর আবার কেউ সফর পরবর্তী রবিউল আউয়ালের প্রথমাংশের কথাও বলেছে। এ সময়ের মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের শহীদগণের জন্য জানাযার ন্যায় নামাজ পড়েছেন। বাকীর কবরস্থানে গিয়ে সালাম করেছেন এবং শেষ বারের মত তাদের জন্য দুআ করেছেন। একবার বাকী হতে ফেরার সময় দেখেন, আয়েশা রা. মাথার ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। আর বলছেন, হায় মাথা! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমার বলার প্রয়োজন নেই, বরং আমিই বলছি, আমার মাথা ব্যথা করছে। হায় মাথা!' আয়েশা রা. বলেন, এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আয়েশা, তোমার এতে অসুবিধা কোথায়? তুমি যদি আমার আগে মারা যাও, আমি তোমার কাফনের ব্যবস্থা করব, তোমার জানাযার নামাজ পড়ব এবং আমি নিজেই তোমার দাফন ক্রিয়া সম্পন্ন করব।' আয়েশা রা. বলেন, আমি বললাম, 'আমি মারা গেলে তো মজাই হবে, আরেক জন নারী নিয়ে আমার ঘরে নতুন করে সংসার পাততে পারবেন।' আয়েশা রা. বলেন, 'এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন।' অসুস্থতা বাড়তে বাড়তে তীব্র আকার ধারণ করল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মায়মুনার ঘরে। তিনি সকল স্ত্রীদের ডেকে আমার ঘরে অসুস্থকালীন সময়টি থাকার অনুমতি নিলেন।
আয়েশা রা. বলেন, প্রথম যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসুস্থতা আরম্ভ হয়, তখন তিনি মায়মুনার ঘরে অবস্থান করছিলেন। ধীরে ধীরে রোগ বৃদ্ধি পেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল স্ত্রীদের কাছে আমার ঘরে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। সকলে আমার ঘরে থাকার জন্য মত দিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে আব্বাস রা. এবং অপর এক জন লোকের কাঁধে ভর করে, মাটির সাথে পা হেচরে হেচরে আমার ঘরে প্রবেশ করেন। আয়েশা রা. বলতেন, আমার ঘরে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুখ বৃদ্ধি পায়, তখন তিনি বললেন, 'পরিস্কার সাত কলস পানি আমার গায়ে ঢেলে দাও, আমি যাতে সুস্থ হয়ে লোকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলতে পারি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপর স্ত্রী হাফসা রা. এর গোসল খানায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বসিয়ে আমরা তার উপর সে কলসগুলোর পানি ঢালতে থাকি। এক সময় হাতের ইশারায় বলতে লাগলেন যে, 'তোমরা যথেষ্ট করেছো।' অতঃপর সকলের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেলেন, সবাইকে নিয়ে নামাজ পড়লেন এবং সকলকে সম্বোধন করে ভাষণ দিলেন।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন তিনি বলেন, 'লোকজন কি নামাজ পড়ে নিয়েছে?' আমরা বললাম, 'না, তারা নামাজ পড়েনি। হে আল্লাহর রাসূল! তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।' তিনি বললেন, 'গোসলখানায় আমার জন্য কিছু পানি রাখ।' আমরা পানি রেখে দিলাম। তিনি গা ধুয়ে নিলেন। অতঃপর খুব কষ্ট করে উঠতে চাইলেন, সক্ষম হলেন না। বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। হুশ ফিরে আসলে আবার বলেন, 'লোকজন কি নামাজ পড়ে নিয়েছে?' আমরা বললাম, 'না, আল্লাহর রাসূল! তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।' তিনি বললেন, 'গোসলখানায় আমার জন্য কিছু পানি রাখ।' আয়েশা বললেন, আমরা পানি রেখে দিলাম। তিনি বসে গাঁ ধুলেন। অতঃপর উঠে দাড়াতে চাইলেন, কিন্তু সক্ষম হলেন না, বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। আবার হুশ ফিরে এলে বলেন, 'লোকজন কি নামাজ পড়ে নিয়েছে?' আমরা বললাম, 'না, তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, 'গোসলখানায় আমার জন্য কিছু পানি রাখ। আমরা পানি রেখে দিলাম, তিনি বসে গাঁ ধুয়ে নিলেন। অতঃপর উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু সক্ষম হলেন না। বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। আবার হুশ ফিরে পেয়ে জিজ্ঞাসা করেন, 'লোকজন কি নামাজ পড়ে নিয়েছে?' আমরা বললাম, 'না, তারা আপনার অপেক্ষা করছে, হে আল্লাহর রাসূল! আয়েশা রা. বলেন, তখন লোকজন এশার নামাজের জন্য মসজিদে বসে বসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অপেক্ষা করতে ছিল। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন লোক পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, 'আবু বকরকে নামাজ পড়াতে বল। লোকটি এসে আবু বকরকে বলল, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে নামাজ পড়াতে বলেছেন।' আবু বকর রা. ছিলেন কোমল হৃদয়ের মানুষ। তিনি উমার রা.কে বললেন, 'উমার! আপনি নামাজ পড়ান।' উমার রা. তাকে বললেন, 'আপনি এর জন্য আমার চেয়ে বেশি উপযোগী।' আয়েশা রা. বলেন, 'কয়েক দিন আবু বকর নামাজ পড়ালেন। এরপর যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে কিছুটা হালকা মনে করলেন, তখন তিনি দু'জন লোকের কাধে ভর করে জোহর নামাজের জন্য মসজিদে গেলেন। আবু বকর রা. অন্যান্য সাহাবাদের নিয়ে নামাজ পড়তে ছিলেন। আবু বকর রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে পিছনে সরে আসার প্রস্তুতি নিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশারা করে পিছে সরে আসতে বারণ করলেন। তাদের দু'জনকে বললেন, 'আমাকে তার পাশে বসিয়ে দাও।' আবু বকর দাড়িয়ে দাড়িয়ে রাসূল রা. এর অনুসরণ করছেন, অন্যান্য লোকজন আবু বকরকে অনুসরণ করছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে বসে নামাজ পড়ছেন।' এ নামাজটি ছিল জোহরের, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আবু বকরকে ইমাম বানানোর ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খুব আগ্রহ ছিল। এ জন্য তিনি বার বার তাগিদও করেছেন। আয়েশা রা. বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসুখ বেড়ে যাওয়ার পর বেলাল এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামাজের সংবাদ দিলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আবু বকরকে নামাজ পড়াতে বল।' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আবু বকর কোমল হৃদয়ের মানুষ। যখন সে নামাজ পড়াতে দাড়াবে, তখন মানুষ তার আওয়াজ শুনতে পাবে না। আপনি বরং উমারকে নামাজ পড়াতে বলুন।' তিনি বললেন, 'আবু বকরকে বল নামাজের ইমামতি করার জন্য।' তখন আমি হাফসাকে বললাম, 'তুমি বল, আবু বকর কোমল হৃদয়ের মানুষ, আপনার জায়গায় সে দাড়ালে মানুষ তার আওয়াজ শুনতে পাবে না। আপনি যদি উমারকে হুকুম করতেন...' সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাই বলল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বলেন, 'তোমরা তো ইউসুফকে ধোকা দেয়া নারীদের মতো হয়ে গেছ। আবু বকরকে বল, সে নামাজের ইমামতি করবে।' হাফসা আয়েশাকে লক্ষ্য করে বললেন, 'আমি আপনার কাছ থেকে কোনো ভাল কিছুর আশা করতে পারি না।' আয়েশা রা. বলেন, 'তারা সকলে আবু বকরকে নামাজ পড়াতে বলে। আবু বকর নামাজ আরম্ভ করলেন। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কিছু সুস্থতা অনুভব করলেন। তখন তিনি দু'জন ব্যক্তির কাঁধে ভর করে মসজিদে রওয়ানা হলেন। তার পা দু'টি মাটিতে হেচরে চলছিল। এভাবেই তিনি মসজিদে প্রবেশ করেন। আবু বকর টের পেয়ে পিছু হটতে লাগলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশারা করে নিজ স্থানে স্থির থাকতে বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অগ্রসর হয়ে আবু বকরের ডান পাশে বসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে বসে নামাজের ইমামতি করছেন, আর আবু বকর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ করছেন, অন্যান্য মানুষ অনুসরণ করছে আবু বকরকে।'
যে কারণে আয়েশা রা. আবু বকরের ইমামতি অপছন্দ করেছেন তা হল, আয়েশা রা. বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বার বার আবু বকরের ইমামিতে আপত্তি জানানোর কারণ ছিল যে, এটাকে মানুষ অশুভ লক্ষণ মনে করবে। আমি এটাকে আবু বকর হতে হটাতে চেয়ে ছিলাম। আর এ জন্যই তাকে ও হাফসাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরাতো ইউসুফের সাথে প্রতারণাকারী নারীদের মতো।'
ইবনে কাসির রহ. বলেন, 'নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরকে ইমামতির জন্য প্রাধান্য দিয়েছেন। এর অর্থ, তিনি সকল সাহাবাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী এবং কুরআন ভাল করে তেলাওয়াত করতে পারেন। সহীহ মুসলিমে আছে, 'ভাল করে কুরআন তেলাওয়াতকারীই ইমামতি করবে..." আর আবু বকরের মধ্যে এ সকল গুনই বিদ্যমান ছিল।
এ পরিচ্ছেদের সারকথা ও শিক্ষনীয় বিষয়ঃ
১. উহুদের শহীদ ও বাকী কবরস্থানে শায়িত কবরবাসীদের যিয়ারত করা, তাদের জন্য দুআ করা মুস্তাহাব। তবে এর জন্য স্বতন্ত্রভাবে সফর করা কিংবা এতে কোনো ধরনের বেদআতের সংমিশ্রন অনাকাঙ্খিত ও পরিত্যাজ্য।
২. স্বামীর জন্য নিজ স্ত্রীর গোসল, কাফন-দাফন ইত্যাদির বৈধতা। তদ্রুপ নারীর জন্য নিজ স্বামীর গোসল, কাফন-দাফন ইত্যাদির বৈধতা প্রমাণিত হয়।
৩. মুমুর্ষ অবস্থায় কোনো অসুবিধার কারণে একাধিক স্ত্রীর বর্তমানে এক স্ত্রীর ঘরে থাকার জন্য অন্যান্য স্ত্রীদের থেকে অনুমতি নেয়া। তারা অনুমিত দিলে ভাল। অন্যথায় লটারীর মাধ্যমে নির্ণয় করা হবে।
৪. মানব প্রকৃতি, রোগ ও বেহুশ হওয়া থেকে নবীগণও নিরাপদ নয়। তবে তারা উম্মাদ হন না। কারণ এটা একটা বড় ত্রুটি; এ থেকে নবীগণ মুক্ত। এর দ্বারা তাদের সওয়াব বৃদ্ধি পায়, মর্যাদা উন্নত হয় এবং অন্যদেরও সান্ত্বনা মিলে। এর আরেকটি ইতিবাচক দিক হল, নবীদের মধ্যে অলৌকিক নিদর্শন, সুস্পষ্ট প্রমাণাদি দেখে অনেকের বিভ্রান্তির সম্ভাবনা ছিল। এর দ্বারা তাদের ভ্রম দূর হবে। তারাও দেখে নিবে যে, নবীগণও আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীতে নিজের ক্ষতি কিংবা উপকার করতে সক্ষম নন।
৫. বেহুশ হয়ে গেলে গাঁ ধুয়ে নেয়া মুস্তাহাব। এর দ্বারা বেহুש অবস্থার ক্লান্তিভাব দূর হয়, শক্তি ফিরে আসে এবং শরীরের তাপ কমে।
৬. ইমামের আসতে সামান্য দেরী হলে, মুসল্লীগণ তার অপেক্ষা করবে, আর যদি তার আসতে অনেক দেরী হয়, মুসল্লীদেরও কষ্ট হয়, তবে উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী সেই নামাজ পড়াবে।
৭. সকল সাহাবাদের উপর আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। এর ঘটনায় তার এবং অন্যদের জন্যও ইঙ্গিত যে, খেলাফতের উপযুক্ত একমাত্র তিনিই। কারণ, সাধারণ জনগণ নিয়ে নামাজ পড়ার অধিকার একমাত্র খলীফারই। দ্বিতীয়ত, সাহাবায়ে কেরাম নিজেরাও বলেছেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকে আমাদের দ্বীনের জন্য মনোনীত করেছেন, আমরা তাকে আমাদের দুনিয়ার জন্যও মনোনীত করলাম।'
৮. জামাতে অংশ গ্রহণ করা অসম্ভব এমন কোনো কারণ থাকলে ইমাম বা খলীফা অন্য কাউকে প্রতিনিধি করতে পারেন। তবে, সে যেন সকলের চেয়ে উত্তম ব্যক্তি হয়।
৯. উমর রা. এর ফজিলতের বিষয়টি লক্ষণীয়। কারণ, আবু বকর রা. তার উপর নির্ভর করেছেন, তাকে নামাজ পড়াতে অনুরোধ করেছেন। অন্য কাউকে নামাজ পড়াতে বলেননি।
১০. সম্মুখে প্রশংসা করার বৈধতা: যদি অহংবোধ, গরিমার আশংকা না থাকে। এ হাদীসে উমার রা. আবু বকর রা. কে 'আপনি এর জন্য উপযুক্ত বলে' তার সম্মুখে প্রসংশা করেছেন।
১১. উপযুক্ত ব্যক্তিদের গুরু দায়িত্ব গ্রহণ না করার বৈধতা প্রমাণিত হল, যদি সেখানে এমন কেউ বিদ্যমান থাকে, যে উত্তম রূপে সে দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে পারবে।
১২. প্রতিনিধিত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিও অপর নির্ভরযোগ্য কাউকে খলীফা বা প্রতিনিধি করার অধিকার রাখে। যেমন এখানে আবু বকর রা. উমার রা. কে প্রতিনিধি বানাতে চেয়েছেন।
১৩. যে সকল ইবাদত সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে, তার মধ্যে নামাজ গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত।
১৪. সে সময় জীবিত নয়জন স্ত্রীদের ভেতর আয়েশা রা. এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হল।
১৫. আদব, সম্মান, মর্যাদা ও স্থান কাল বিবেচনায় রেখে খলীফাদের পরামর্শ দেয়ার বৈধতা প্রমাণিত হয়।
১৬. কোনো কারণ বশত মুক্তাদিদের ইমামের পাশে দাড়ানোর বৈধতা প্রমাণিত হয়। যেমন তাকবীর পৌঁছানোর জন্য, জায়গার সংকীর্ণতার দরুন, নারীদের জন্য নারী ইমাম হলে, মুক্তাদী একজন হলে এবং বস্ত্রহীন লোকদের ইমাম হলে ইত্যাদির ক্ষেত্রে।
১৭. ইমামের তাকবীর শোনা না গেলে মুক্তাদিদের উচ্চ স্বরে তাকবীর বলার বৈধতা।
১৮. পূর্ণ অক্ষম না হলে জামাতে অবশ্যই উপস্থিত হওয়া।
১৯. সাধারণ জ্ঞানী ও উত্তম ব্যক্তিদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী ও পরহেজগার ব্যক্তিই ইমামতির অধিক হকদার।
২০. ইমাম হলেন অনুসরণীয় ব্যক্তি। সে যখন বসে নামাজ পড়বে, মুক্তাদিগণও বসে নামাজ পড়বে। সে যখন দাড়িয়ে নামাজ পড়বে, মুক্তাদিগণও দাড়িয়ে নামাজ পড়বে।
২১. নামাজে কাঁদাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদা নিষেধ。
টিকাঃ
১ ইবনে হিশাম: ৪/৩২০ আল-বিদায়া ও আল-নেহায়া ৫/২২৪ ফাতহুল বারী: ৮/১২৯-১৩০ আহমদ: ৬/১৪৪ সুনানে দারামি: ৮০ ২ ইবনে হিশাম: ৪/৩২০ আল-বিদায়া ও আল-নেহায়া ৫/২২৩-২৩১ কেউ কেউ বলেছেন ঘটনাটি হল সফরের ২৯ তারিখ, বৃহস্পতিবারের। তের দিন ছিলেন অসুস্থ অবস্থায়। এটাই অনেকের বক্তব্য। ফাতহুল বারী: ৮/১২৯ * সহীহ আল বুখারী ১৯৮, সহীহ মুসলিম: ৪১৮
২ সহীহ আল-বুখারী ৬৮৭, সহীহ মুসলিম ৪১৮ ৩ কারো ধারণা এ নামাজটি ছিল, ফজরের। তাদের দলিল, ইবনে আব্বাস হতে আরকাম বিন শারাহবিল এর রেওয়াতে। আবু বকর যেখানে শেষ করেছেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে কেরাত পড়া আরাম্ভ করেছেন। ইবনে মাজার বর্ণাকৃত এ হাদিসটির সনদ যদিও হাসান, তবে এর দ্বারা দলিল দেয়া সংঘত নয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরের অতি নিকটে গিয়েছেন ফলে কেরাত শুনেছেন এরও তো সম্ভাবনা রয়েছে। তার ব্যাপারে আছে, আস্তে কেরাত পড়ার নামাজেও তিনি অনেক সময় অপরকে শুনার মতো আওয়াজ করে কেরাত পড়তেন। যেমন আবু কাতাদার হাদীসে এর প্রমাণ বিদ্যমান আছে। এর পরেও যদি মেনে নেই যে, জোরে কেরাত পড়ার নামাজ ছিল, তবু প্রমাণিত হয় না যে, এটা ফজরের নামাজ ছিল, বরং মাগরিবের নামাজ হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা রয়েছে। সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিমে উম্মে ফজল হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: আমি মাগরিবের সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে والمرسلات عرفا সুরা পড়তে শুনেছি। এর পরে কোনো দিন জমাতের সহিত নামাজ পড়েননি, ইহধাম ত্যাগ করে যান। সহীহ আল-সহীহ আল বুখারী ৭৬৩, ৪৪২৯ সহীহ সহীহ মুসলিম ৪৬২, ইবনে হাজার রহ. বলেন, নাসায়ীর একটি বর্ণনায় আছে, উম্মে ফজল যে নামাজের কথা উল্লেখ করেছে, সে নামাজ তার বাড়িতে ছিল। ইমাম শাফি রহ. বলেছেন, যে অসুখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন, সে অসুখে এক ওয়াক্ত নামাজ শুধু মসজিদে পড়েছেন। আর সেটা এ নামাজই যে নামাজে তিনি বসে নামাজ পড়েছেন এবং যেখানে আবু বকর প্রথমে ইমাম ছিল পরবর্তীতে মুক্তাদি হয়েছেন। আর অন্যদের তাকবীর শুনাতেন। আল-ফাতহ: ২/১৭৫
📄 তাঁর শ্রেষ্ঠ ভাষাসমূহ ও মানুষের জন্য উপদেশ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে বৃহস্পতিবার ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রদান করেন। এতে তিনি আবু বকর সিদ্দীকের শ্রেষ্টত্বের কথা বর্ণনা করেন। যদিও তিনি এর আগেই সকল সাহাবীকে তার আনুগত্য করার ব্যাপারে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি মুমূর্ষ অবস্থায় যা লিখতে চেয়ে ছিলেন, এখানে সম্ভবত তাই বর্ণনা করে দিয়েছেন। এ ভাষণের পূর্বে তিনি গোসল করেছেন। তার গাঁয়ে পরিস্কার সাত কলস পানি ঢালা হয়েছে। অন্যান্য হাদীসের ভাষ্যমতে সাত সংখ্যাটি তিনি বরকতের জন্য গ্রহণ করেছেন। মূল কথা হল, তিনি গোসল করেছেন, ঘর থেকে বের হয়ে নামাজ পড়েছেন, অতঃপর ভাষণ দিয়েছেন। জুনদাব রা. বলেন, মুত্যুর পাঁচ দিন পূর্বে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'আমি ঘোষণা করছি, তোমাদের কেউ আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু নয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা ইবরাহীমের ন্যায় আমাকেও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আমার উম্মতের কাউকে খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) বানালে অবশ্যই আবু বকরকে বানাতাম। খুব ভালকরে শুনে নাও, তোমাদের পূর্বের লোকেরা নবীগণের কবর এবং নেককার লোকদের কবরগুলোকে মসজিদ বানাত। সাবধান! তোমরা কিন্তু কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করবে না। আমি এর থেকে তোমাদের নিষেধ করছি।'
আবু সাইদ খুদরী রা. বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন খুতবায় বলেন, 'আল্লাহ তাআলা তার এক বান্দাকে দুনিয়ার চাকচিক্য এবং নিজের কাছে রক্ষিত নেআমতসমূহ হতে কোনো একটি নির্বাচন করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। সে বান্দা আল্লাহর কাছে রক্ষিত নেআমতকেই প্রধান্য দিয়েছেন।' এ কথা শুনে আবু বকর রা. কেঁদে ফেললেন। এবং বললেন, 'আপনার প্রতি আমাদের মাতা, পিতা সকলেই উৎসর্গ।' আমরা তার কাণ্ড দেখে আশ্চর্য হলাম। লোকজন বলাবলি করল, 'এ বৃদ্ধের কীর্তি দেখ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সংবাদ দিচ্ছেন যে, আল্লাহ এক বান্দাকে দুনিয়ার চাকচিক্য এবং তাঁর নিকট রক্ষিত নেআমতসমূহের ভেতর একটি বাছাই করে নেয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন, আর সে আল্লাহর কাছে রক্ষিত নেআমতকেই প্রাধান্য দিয়েছে। এ কথা শুনে আবু বকর তার মাতা পিতাকে উৎসর্গ করছে।' পরে জানলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই ছিলেন সে বান্দা। আবু বকর ছিলেন, আমাদের ভেতর সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আবু বকর তুমি কেঁদো না। সঙ্গ ও সম্পদ দিয়ে সবচেয়ে বেশি উপকার করছে আমাকে আবু বকর। আমার উম্মত হতে আমি যদি কাউকে খলিল রূপে গ্রহণ করতাম তবে অবশ্যই আবু বকরকে গ্রহণ করতাম। তবে, এখন তার সাথে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও সখ্যতা অটুট থাকবে। মসজিদের ভেতর কারো দরজা খুলে রাখা যাবে না, শুধু আবু বকরের দরজা ব্যতীত।'
এ পরিচ্ছেদের সারকথা ও শিক্ষনীয় বিষয়ঃ
১. মসজিদে নববীতে শুধু আবু বকরের দরজা বহাল রাখার অনুমিত, সে সব ইঙ্গিতের একটি, যার ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, আবু বকরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরবর্তী খলীফা বা প্রতিনিধি।
২. আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্ব। সে সকলের চাইতে অধিক জ্ঞানী, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট সে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। এ বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়।
৩. আখেরাতকে দুনিয়ার উপর প্রাধান্য দেয়া। এবং এ অনুভূতি জাগ্রত করা যে, দুনিয়াতে এক মুহূর্ত থাকার উদ্দেশ্য হল, আখেরাতের জন্য কাজ করা। অর্থাৎ দুনিয়াতে বেশি বেশি নেককাজ করা।
৪. উপকারীর উপকার স্বীকার করা। যে ব্যক্তি মানুষের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না, সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করতে পারে না।
৫. কবরকে মসজিদে রূপান্তরিত না করার ব্যাপারে সাবধানতা। কোনো কবরকে মসজিদের ভিতর না ঢুকানো কিংবা কোনো ছবি মসজিদের ভেতর না রাখা। যে এ সব করে, সে অভিশপ্ত। সে আল্লাহর নিকট অতি নিকৃষ্টতর; সে যে কেউ হোক।
৬. সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজেদের জান, মাল এবং মাতা-পিতা ও সন্তানাদি হতে বেশি মহব্বত করতেন。
টিকাঃ
১ সহীহ মুসলিম: ৫৩২ * সহীহ আল-বুখারী ৪৬৬, ৩৬৫৪, ৩৯০৪, সহীহ মুসলিম ২৩৮২