📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 ইহুদী ও খ্রিষ্টান লেখক কর্তৃক রাসূল হিসাবে স্বীকৃতি দান

📄 ইহুদী ও খ্রিষ্টান লেখক কর্তৃক রাসূল হিসাবে স্বীকৃতি দান


১. ন্যায়পরায়ণ ইহুদী পন্ডিতদের স্বীকৃতিঃ
ইহুদী ও খৃষ্টানদের আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়ার একটি কৌশল হল, তাদের মধ্যে যারা নিরপেক্ষ, ন্যায়পরায়ণ তাদের বক্তব্যকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করা। যারা সত্য গোপন করেনি, মধ্যপন্থী, আল্লাহ সত্য গ্রহণের তাওফিক তাদের দিয়েছেন ইসলামের সমর্থনে তাদের বক্তব্য ঠিক আল্লাহর বাণী।
وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِنْ أَهْلِهَا (তাদের পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিলো) এর মত। যে সকল ইহুদী আলেম ও পন্ডিতকে খোদ ইহুদীরা তাদের ধর্মের বিদ্বান বলে স্বীকার করত এ ক্ষেত্রে তাদের কয়েকজনের বক্তব্য উপস্থাপন করা হল :
১. আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম রাদিয়াল্লাহু আনহু : যদি নবী যুগে ইহুদীদের মধ্য থেকে তাদের সর্বসম্মত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এবং তাদের শ্রেষ্ঠ নেতাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান, তাদের বিজ্ঞ পন্ডিতদের মাঝে শ্রেষ্ঠ পন্ডিতের সন্তান, তাদের খুব প্রিয় ব্যক্তিদের মাঝে প্রিয় ব্যক্তিত্ত্ব ও প্রিয় ব্যক্তির সন্তান ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করে তাহলে পৃথিবীর সকল ইহুদীদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য তা ছিল যথেষ্ট। কেমন হবে, যদি তার অনুসরণ করে ইহুদীদের আরো অসংখ্য ধর্মযাজক, পৌরোহিত- পাদী?
ঐ সেরা ব্যক্তিটি ঈমান এনেছেন আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর। আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম জেনেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় পদার্পণ করেছেন। তিনি তার সাথে সাক্ষাত করে বললেন, আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করব, যার উত্তর নবী ছাড়া অন্য কেহ অবগত নয়। অতঃপর বললেন, 'কেয়ামতের প্রথম আলামত কি? জান্নাতীদের প্রথম খাবার কি হবে? সন্তানের মাঝে পিতা অথবা মাতার আকৃতি লক্ষ্য করা যায় কেন?' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এ মাত্র জিবরীল আমাকে জানিয়েছেন এর উত্তর।' ইবনে সাল্লাম বললেন, 'ফেরেস্তাদের মাঝে ইনিইতো ইহুদীদের শত্রু।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কেয়ামতের প্রথম আলামত হল আগুন। যা পূর্ব থেকে মানুষকে ধাবিত করে পশ্চিমে নিয়ে একত্র করবে। আর জান্নাতবাসীদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজা। আর সন্তানের আকৃতির রহস্য হল, যদি সঙ্গমের সময় পুরুষের বীর্য নারীর পানির উপর প্রাধান্য লাভ করে তবে সন্তান পুরুষের মত হবে আর যদি নারীর পানি পুরুষের বীর্যের উপর প্রভাব লাভ করে তবে সন্তান নারীর আকৃতি পাবে। উত্তর শুনে ইহুদী পন্ডিত আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই, আর নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রাসূল।' তিনি আরো বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! ইহুদী বড় মিথ্যারোপকারী জাতি। আপনি তাদের জিজ্ঞেস করার আগে তারা যদি আমার ইসলাম কবুলের বিষয়টি জানতে পারে তাহলে আপনার কাছে আমার ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলবে। তাই তারা জানার আগে আমার বিষয় তাদের প্রশ্ন করুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ডেকে পাঠালেন। তারা উপস্থিত হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে ইহুদী সম্প্রদায়! আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তোমরা জান আমি আল্লাহর সত্য নবী। আমি সত্য কিতাব নিয়ে এসেছি, অতএব তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। তিনবার বলার পরও তারা বলল, 'আমরা জানিনা।' অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্ন করলেন, 'আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম সম্পর্কে তোমাদের মন্তব্য কি?' তারা বলল, 'তিনি আমাদের নেতা, নেতার ছেলে, আমাদের মাঝে মহাজ্ঞানী, এবং মহা জ্ঞানীর ছেলে, আমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ আলেম এবং আলেমের সন্তান।' রাসূল বললেন, 'যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তবে তোমারা কি মতামত দেবে?' তারা বলল, 'আল্লাহ তাকে এ থেকে রক্ষা করুক, কখনো তার ইসলাম গ্রহণ করা সম্ভব নয়।' রাসূল আবার বললেন, 'যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তবে তোমারা কি মতামত দেবে?' তারা বলল, 'আল্লাহ তাকে এ থেকে রক্ষা করুক, কখনো তার ইসলাম গ্রহণ করা সম্ভব নয়।' রাসূল আবার বললেন, 'যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তবে তোমারা কি মতামত দেবে?' তারা বলল, 'আল্লাহ তাকে এ থেকে রক্ষা করুক, কখনো তার ইসলাম গ্রহণ করা সম্ভব নয়।' নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে ইবনে সাল্লাম বেরিয়ে এসো!' আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম তাদের সম্মুখে এলেন অতঃপর ঘোষণা করলেন 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই, আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। হে ইহুদীরা আল্লাহকে ভয় কর! আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, নিশ্চয় তোমরা জানো মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, এবং তিনি সত্য নিয়ে আগমন করেছেন।' তারা বলল, 'তুমি মিথ্যা বলেছ। এ ব্যক্তি আমাদের মধ্যে নিকৃষ্ট এবং নিকৃষ্টের সন্তান।' তারা এভাবে বলেই চলল। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বের করে দিলেন।'
আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম হতে বর্ণিত, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় আগমন করলে লোকেরা তার দিকে দ্রুত ধাবিত হলো এবং বলতে লাগল, 'আল্লাহর রাসূল আগমন করেছেন! আল্লাহর রাসূল আগমন করেছেন!! আল্লাহর রাসূল আগমন করেছেন!!!' আমিও তাকে দেখতে মানুষের সাথে শামিল হলাম। অতঃপর তার মুখ মন্ডলের দিকে তাকিয়ে বুঝে ফেললাম যে, এটা কোন মিথ্যাবাদীর চেহারা হতে পারে না। তখন তার মুখ থেকে প্রথম যে কথা শুনলাম তা হল, 'হে লোক সকল! সালামের প্রসার কর। মানুষকে আহার দাও। আত্মীয়তার বন্ধনকে অটুট রাখ। মানুষ যখন ঘুমে থাকে তখন নামায পড়। তাহলে নিরাপদে আল্লাহর জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
আল্লাহ তাআলা এ রাব্বানী, ধার্মিক আলেম আব্দুল্লাহ বিন সাল্লামের প্রশংসা করেছেন। সাআদা বিন আবু ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'যমীনে বিচরণকারী কারো ব্যাপারে 'লোকটি জান্নাতবাসী' বলতে আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শুনিনি, তবে আব্দুল্লাহ বিন সাল্লামের ব্যাপারে বলেছেন' এবং বলেনঃ
وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى مِثْلِهِ
'বনী ইসরাঈলের একজন এর অনুরূপ সাক্ষ্য দিল।' আয়াতটি তার ব্যাপারে অবর্তীণ হয়েছে।
২. যায়েদ বিন সুয়ানাহ- ইহুদী পাদ্রী :
তিনি বললেন, নবুওয়াতের যত আলামত আছে, সবগুলো আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে পেয়েছি যখন তার চেহারায় দৃষ্টি দিলাম। তবে দুটি আলামত সম্পর্কে তাকে যাচাই করা বাকি থেকে যায়। তা হলঃ
১. অজ্ঞতার উপর তার ধৈর্য প্রাধান্য পেয়ে থাকে, ২. তার প্রতি অজ্ঞতাপূর্ন আচরণ তার মাঝে অজ্ঞতাকে বৃদ্ধি না করে সহিষ্ণুতাকে প্রবল করে। এ দুটিও যাচাই করার পর আমি আমার গন্তব্য পেয়ে যাই। হে উমার! তুমি সাক্ষী থাক, আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে ধর্ম, এবং মুহাম্মাদকে নবী হিসাবে গ্রহণ করে সন্তুষ্ট হলাম। তোমাকে আরো সাক্ষী করছি, আমার প্রচুর সম্পদ রয়েছে, তার অর্ধেক উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য দিয়ে দিলাম। উমার রা. বললেন, তোমার এ দান উম্মতে মুহাম্মাদীর অংশ বিশেষের উপর নয় কি? কারণ তুমি তো সবাইকে পাবে না। আমি বললাম, 'হ্যাঁ, কিছু অংশের উপর।' অতঃপর আমরা উভয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হলাম। বললাম, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই, আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'
এ যায়েদ বিন সুয়ানাহ রাসূলের প্রতি ঈমান আনলেন। তাকে সত্যায়ন করলেন। তার কাছে দীক্ষা নিলেন এবং তার সাথে অনেক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করলেন। অতঃপর তাবুক অভিযানে থাকা অবস্থায় মৃত্যু বরন করেন।
৩. যে ইসলাম গ্রহণ করল মৃত্যুর সময়ঃ
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবু বকর রা. উমার রা. একজন ইহুদী আলেমের নিকট আসলেন। যে ছিল তাওরাতের প্রচারক। সে তার প্রিয় সন্তানের মৃত্যু শয্যায় শোকে সান্তনা স্বরূপ তাওরাত পাঠ করছিলো। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমাকে ঐ আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি তাওরাত নাযিল করেছেন, তুমি কি তোমার কিতাবে আমার গুণাবলি ও মক্কা হতে আমাকে বের করে দেওয়া সম্পর্কে তথ্যাবলী পেয়েছো?' সে মাথা দিয়ে ইংগিত করে বলল, 'না।' তার ছেলে বলল, 'হায়! যিনি তাওরাত নাযিল করেছেন তার শপথ করে বলছি, 'আমরা আপনার গুণাবলি ও আপনাকে দেশ থেকে বহিস্কার করে দেয়ার বিষয় তাওরাতে পেয়েছি। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই, এবং নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রাসূল।' এরপর সে মৃত্যু বরণ করল। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'ইহুদীকে তোমাদের ভাই থেকে পৃথক করে দাও তারপর এর কাফনের ব্যবস্থা করা হলো, তাকে সুগন্ধি মাখানো হলো এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযা আদায় করেন।'
এ তিনটি ঘটনা যা উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হল, এগুলোতে ইহুদী ধর্মযাজকদের এ স্বীকৃতি রয়েছে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য, এবং তার গুণাবলি তাওরাতে উল্লেখ রয়েছে। এবং ইহুদী সম্প্রদায় তাদের ছেলে মেয়েকে যে রূপ চিনতে পারে অনুরূপ তারা চিনে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। আল্লাহ বলেনঃ
وَقُلِ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ
"বল, সত্য তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে প্রেরিত; সুতরাং যার ইচ্ছা বিশ্বাসকরুক এবং যার ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করুক।"
৪. ইহুদীদের মধ্য থেকে যে মৃত্যু শয্যায় মুসলমান হলোঃ
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একজন ইহুদী যুবক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমত করতো সে অসুস্থ হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখার উদ্দেশে এসে মাথার পাশে বসলেন এবং তার উদ্দেশ্যে বললেন, 'ইসলাম গ্রহণ কর।' যুবকটি তার পিতার দিকে তাকালো। পিতা বলল, 'আবুল কাসেম (মুহাম্মাদ) এর আনুগত্য কর' যুবকটি মুসলমান হয়ে গেল। নাসায়ীর বর্ণনা মতে- অতঃপর যুবকটি বলল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।' অতঃপর নবী কারীম বেরোবার সময় বললেন, 'সমস্ত প্রসংশা আল্লাহর জন্য যিনি তাকে আগুন থেকে রক্ষা করলেন।'
দ্বিতীয়তঃ ন্যায়পরায়ণ খ্রিষ্টান পন্ডিতের থেকে স্বীকৃতিঃ
আল্লাহর দিকে আহবানের কৌশলের মধ্যে, একটি হলো খ্রিষ্টানদেরকে আল্লাহর দিকে আহবানের সময় তাদের ন্যায়পরায়ন আলেম-পন্ডিতদের স্বীকৃতিকে এবং তাদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদেরকে প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করা। এটা وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِنْ أَهْلِهَا ﴿٢٦﴾ سورة يوسف 'পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিল' এর মত।
এখানে কতিপয়ের বিবরণ দেয়া হল:
১. নাজ্জাসী- ইথিওপিয়ার সম্রাট
জাফর বিন আবু তালেব রা. যখন নাজ্জাসীর সামনে সূরা মারইয়ামের প্রথম থেকে পাঠ করলেন। নাজ্জাসী এমনভাবে কেঁদে ফেলে যে চোখের পানিতে তার দাঁড়ি ভেজে যায় এবং তার পরিষদবর্গও তেলাওয়াত শুনে কেঁদে ফেলে। নাজ্জাসী প্রতিনিধিকে বলেছিলো, 'তোমাদের সাথি মুহাম্মাদ ঈসা ইবনে মারইয়াম সম্পর্কে কি বলে?' জাফর বললেন, 'তার বিষয় তিনি বলেন যা কোরআনে আছে, 'ঈসা আল্লাহর রূহ, এবং তার কালেমা। আল্লাহ তাকে পাঠিয়েছেন বাতুল- কুমারী মারিয়ামের মধ্যে- যাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি।' অতঃপর নাজ্জাসী একটি লাঠি উত্তোলন করলো এবং বললোঃ 'ওহে পুরোহিত ও সাধু সন্ন্যাসী সম্প্রদায়! তোমরা ঈসা সম্পর্কে যা বল তা এরচেয়ে বেশি কিছু নয়।' এবং প্রতিনিধিকে বলল, 'শুভেচ্ছা তোমাদেরকে এবং তোমরা যার নিকট থেকে এসেছো তাকেও শুভেচ্ছা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি তিনি আল্লাহর রাসূল। আর তিনি সেই ব্যক্তিত্ব যার ব্যাপারে ঈসা সুভ সংবাদ দিয়েছে। যদি আমি রাজত্ব পরিচালনার দায়িত্বে না থাকতাম তাহলে অবশ্যই আমি তার নিকট আসতাম এবং তার পাদুকায় চুমো খেতাম।"
২. সালমান আল- ফারেসী রা.
সালমান আল- ফারেসীর ঘটনাতো আশ্চর্য জনক। তিনি খ্রিষ্টানদের একদল বড় জ্ঞানীদের মাঝে জীবন যাপন করছিলেন। যখন তিনি ঐ আলেমদের মধ্যে সর্বশেষ আলেমের সাথে রোমের আমুরিয়াতে ছিলেন, তার মৃত্যু সন্নিকটে এলে সে সালমান আল ফারেসীকে এ বলে অন্তিম উপদেশ দিল যে, 'পবিত্র ভূমি থেকে প্রেরিত, এমন একজন নবীর যুগ তুমি পাবে, যার হিজরতের স্থান হবে দুই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে একটি অনুর্বর ভূমির খেজুর গাছ বিশিষ্ট একটি অঞ্চলের দিকে। তার মধ্যে নবুওয়তের অনেক আলামত থাকবে। দুই স্কন্দের মধ্য স্থানে নবুওয়তের সীলমোহর থাকেব। তিনি উপহার গ্রহণ করবেন। তবে সাদকা খাবেন না। অতএব তোমার যদি ঐ শহরে যাওয়ার সুযোগ হয়, তবে তুমি তাই কর। কারণ তুমি তার নবুওয়ত কালের একেবারে সন্নিকটে।' সালমান আল-ফারেসী যাত্রা করলো এবং সে সব আলামাত প্রত্যক্ষ করলো যা তাকে বলা হয়েছে অতঃপর, সে ইসলাম গ্রহণ করলো।'
৩. রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসঃ
পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট হিরাক্লিয়াস (Heraclius) আবু সুফিয়ানের সাক্ষাৎকার গ্রহণ শেষে বললঃ আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'সে প্রতারণা করে কিনা?' তুমি বললে, 'না।' রাসূলগণ এমনি হন তারা প্রতারণা করেন না। তোমাকে প্রশ্ন করলাম, তিনি কি করতে আদেশ করে? তুমি বললে, 'তিনি আদেশ করেন আল্লাহর বন্দেগী করতে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করতে এবং নিষেধ করেন মূতির আরাধনা হতে। আর আদেশ করে নামায আদায় করতে, সত্য বলতে, নীতি নৈতিকতার উপর চলতে।' তুমি যা বলেছো তা যদি সত্য হয়, তবে তিনি আমার দু' পায়ের অংশটুকু পর্যন্ত অধিকার করবেন। আমি তার আগমন সম্পর্কে জানতাম। তবে তিনি তোমাদের মধ্য থেকে আসবে বলে ধরণা করিনি। যদি আমি তার কাছে পৌঁছতে সক্ষম হবো বলে মনে করতাম, তবে অবশ্যই সাক্ষাতের চেষ্টা করতাম। যদি আমি তার কাছে উপস্থিত হতাম, তাহলে অবশ্যই আমি তার কদম ধুয়ে দিতাম।' অতঃপর বললেন, 'হে রোমানগণ! যদি তোমাদের সুপথ ও কামিয়াবী কামনা কর, এবং তোমাদের রাজ্য স্থিতি কামনা কর? তবে এই নবীর বাইয়াত গ্রহণ কর।' কিন্তু হিরাক্লিয়াস রাজ্য আকঁড়ে থাকতে চাইলো, ত্যাগ করতে চাইলো না। তাই ইসলাম গ্রহণ করতে পারেনি।
এ সব ঘটনা প্রমাণ বহন করে যে, আহলে কিতাবের ন্যায়পরায়ণ ও নীতিবানরা আল্লাহর রাসূলের জন্য প্রস্তুত ছিলো, এবং তিনি যে আল্লাহর সত্য রাসূল তা স্বীকার করেছিল। তাই পরবর্তীতে কোন মিথ্যাবাদীর মিথ্যা বা ছিদ্র অনুসন্ধান গ্রহণ যোগ্য নয়।
খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিরাট একদল ইসলাম গ্রহণ করেছে, এবং সাক্ষ্য দিয়েছে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল সমগ্র মানুষের জন্যই। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
ذَلِكَ بِأَنَّ مِنْهُمْ قِسِّيسِينَ وَرُهْبَانًا وَأَنَّهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ ﴿٨٢﴾ سورة المائدة
"তাদের মধ্যে বহু জ্ঞানপিপাসু আলেম এবং বহু সংসার বিরাগী দরবেশ রয়েছে, আর এই কারণে যে, তারা অহংকারী নয়।”
তাই যুক্তির কথা হলো সকল খ্রিষ্টানগণ তাদের ন্যায়পরায়ণ, সত্যানুরাগী, ধর্মপ্রাণ বিদ্বানদের পথ অনুসরণ করবে এবং তারা আল্লাহর আনুগত্য করবে।

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 তাঁর শেষ জীবনের শ্রেষ্ঠ-কর্ম

📄 তাঁর শেষ জীবনের শ্রেষ্ঠ-কর্ম


নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন কাজ করতেন সুনিশ্চিত ও নিয়মিত ভাবে করতেন। তিনি বলেন, 'নিশ্চয় আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আমল হলো, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা স্বল্প হয়।
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক রমজান মাসে দশ দিন ইতিকাফ করতেন। যে বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান ঐ বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেছিলেন। তার নিকট কুরআন পেশ করা হতো বছরে একবার। তবে যে বছর তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান ঐ বছর কুরআন দু'বার পেশ করা হয়।
আয়েশা রা, হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মৃত্যুর পূর্বক্ষণে বেশি বেশি বলতেনঃ
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ
'হে আল্লাহ তোমার পবিত্রতা ঘোষণা এবং তোমার প্রশংসা করছি, তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি, এবং তোমার কাছে তাওবা করছি।'
আয়েশা রা. বললেন, আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! এ বাক্যগুলো কি, যা আপনি উদ্ভাবন করে বলছেন?' তিনি বললেন, 'আমার উম্মতের মধ্যে আমার জন্য একটি নিদর্শন তৈরী করা হয়েছে। আমি যখন তা দেখি তখন এগুলো বলি। তা হল,
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ
এ সূরা সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস উমার রা. কে বললেনঃ
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ
"যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় .." এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যু সংবাদ। এটা আমি জানি। উমার রা. বললেন, 'আপনি যা জানেন আমি তা-ই জানি।'
কারো মত হলো, এ সূরাটি বিদায় হজের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনায় অবস্থান কালে জিলহাজ্ব মাসের দশম তারিখে অবর্তীণ হয়।' কারো মত হলো আইয়‍্যামে তাশরীকের দিবসগুলোতে সূরাটি অবর্তীণ হয়। তাবারানি বর্ণনা করেন, এ সূরা নাযিলের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরকালের বিষয়ে আমল জোরদার করেন। আয়েশা রা. বলেন, এর প্রেক্ষিতে রাসূল রুকু ও সিজদায় অধিক পরিমাণে বলতেন,
سبحانك اللهم ربنا وبحمدك اللهم اغفر لي
'তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করছি হে আমার প্রতিপালক আল্লাহ! আর তা তোমার প্রশংসার সাথে। হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করো।'
প্রকৃত পক্ষে এতে তিনি কুরআনেরই প্রতি ধধ্বনি করছিলেন যা সূরা আন-নাছর এ বলা হয়েছে
فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
"তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের কৃতজ্ঞতাবাচক পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি তো সর্বাপেক্ষা অধিক তাওবা গ্রহণকারী।"
সারকথা:
এ অধ্যায়ে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে। এর মধে মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়টি নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. নিয়মিত নেক আমলের প্রতি উৎসাহ প্রদান। অনিয়মিত অধিক আমলের চেয়ে নিয়মিত অল্প আমল অনেক উত্তম। কারণ নিয়মিত আমলের মাধ্যমে নেকআমল, আল্লাহর স্মরণ, ইবাদত, মুরাকাবা, আন্ত রিকতা, সৃষ্টিকর্তার প্রতি আগ্রহ অব্যাহত থাকে।
২. যে কোন ইবাদতে নিজের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে আশংকা থাকে যে, বিরক্ত হয়ে সে ঐ কাজ ছেড়ে দেবে।
৩. মুসলিম ব্যক্তি যখনই বার্ধক্যে উপনীত হয়, তার সাধ্যানুযায়ী সে নেক কাজে অধিক সময় ব্যয় করে। যাতে সে আল্লাহর সাথে ভালভাবে সাক্ষাত করতে পারে, কারণ আমলের মূল্যায়ন শেষে হয়।

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 বিনয় ছত্র জয়ের জন্য উপদেশ ও বিনয় গ্রহণ

📄 বিনয় ছত্র জয়ের জন্য উপদেশ ও বিনয় গ্রহণ


১. মানুষের মাঝে হজের ঘোষণাঃ
সুস্পষ্ট দাওয়াত, আমানত আদায়, উম্মতকে উপদেশ, আল্লাহর পথে যথাযথ সংগ্রামের পর তিনি মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দেন। তাদেরকে জানিয়ে দেন যে, তিনি দশম বছর হজব্রত পালন করবেন। মদীনাতে নয়টি বছর দাওয়াত, শিক্ষা, জিহাদে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করার পর এ ঘোষণায় উদ্দেশ্য ছিল, মানুষকে হজ ফরযের সংবাদ পৌঁছানো-যাতে তারা তার নিকট থেকে হজের বিধি-বিধান শিখে নেয় এবং তার কাজ-কথাগুলো প্রত্যক্ষ করে। এবং তাদের অসীয়ত করবেন, উপস্থিতগণ কর্তৃক অনুপস্থিতদের কাছে এ পয়গাম পৌঁছে দেয়ার জন্য। তারা যাতে ইসলামী দাওয়াতের অনুসরণ করে এবং দূরে ও কাছের সকলের নিকট তা পৌঁছে দেয়।'
জাবের রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় দশ বছর অবস্থান করেন এ সময়ে হজ করেননি। অতঃপর দশম হিজরীতে তিনি লোকদের মাঝে হজের ঘোষণা দেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ করবেন। তাই মদীনায় বিশাল একদল লোক জমায়েত হলো। তাদের সকলের আকাঙ্খা তারা রাসূলের অনুসরণ করবে। হজে তিনি যা করবেন তারাও তার মত আমল করবেন....'এ ভাবেই জাবের রাসূলের হজের কথা বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এক পর্যায় তিনি বললেন, বাইদা' নামক স্থানে তার উষ্ট্রী তাকে নিয়ে থেমে গেল। আমি আমার দৃষ্টির শেষসীমা পর্যন্ত তার সামনে পদব্রজকারী ও আরোহনকারীদের দেখতে পেলাম। অনুরূপ তার ডানে বামে ও পেছনেও দেখলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝেই ছিলেন। তার উপর আল-কুরআন অবর্তীণ হচ্ছিল এবং তিনি তার ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন। এরই মধ্যে তিনি যা আমল করেছেন আমরা ও তার সাথে আমল করতে থাকি। ... এভাবে জাবের রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হজ আদায়ের বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এক পর্যায় বললেন, 'তিনি আরাফায় পৌঁছলেন এবং নামিরাতে তার জন্য নির্মিত তাবুতে অবতরণ করলেন।'
২.আরাফয় উম্মতকে শেষ উপদেশ ও বিদায় জানানোঃ
জাবের রা. বলেন, যখন সূর্য অস্তমিত হলো 'কাসওয়া' (তার সাওয়ারী) আনার জন্য আদেশ করলেন। তাকে নিয়ে আসা হলো। 'বাতনে ওয়াদী'তে তিনি ভাষণ দিলেন এবং বললেন, 'তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের কাছে সম্মানিত। যেমন পবিত্র ও সম্মানিত তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর। জেনে রাখ! জাহেলী যুগের সকল কর্মকান্ড আমার পদতলে পিষ্ট। জাহেলী যুগের রক্তের দাবী রহিত করা হলো। প্রথম যে রক্ত দাবী রহিত করছি, তাহলো আমাদের রক্তর দাবী- ইবনে রবিয়া বিন হারিসের রক্ত- সে বনি সাআদ গোত্রে দুধ পান করতো। তাকে হুযাইল গোত্রের লোকেরা হত্যা করেছিল। জাহেলী সুদ রহিত করা হলো। প্রথম যে সুদ, যা রহিত করলাম তা হলো আমাদের সুদ আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এর সুদ- তা পুরোটি রহিত করা হলো।' আর নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর, কারণ তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং তাদের গুপ্তাঙ্গ বৈধ করেছ আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হলো, তোমরা যাকে অপছন্দ কর এমন কাউকে তারা বিছানায় স্থান দেবে না।' যদি তারা এমন কিছু করে বসে, তাহলে তাদের মৃদু শাসন কর। তাদের আহার-বিহার, পোশাক- পরিচ্ছদ তোমাদের দায়িত্বে। তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব রেখে গেলাম। যদি তা আঁকড়ে ধর তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। আর আমার ব্যাপারে তোমরা জিজ্ঞাসিত হলে কি বলবে?' উপস্থিত সাহাবীগণ বললেন, 'আমরা সাক্ষী দেব যে, আপনি রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন, আমানত আদায় করেছেন, জাতিকে উপদেশ দিয়েছেন। অতঃপর তিনি তার শাহাদত আঙ্গুলী আকাশের দিকে উত্তোলন করেন এবং মানুষের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, 'হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন! হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন! হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন!'। সমাবেশস্থল বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।
আল্লাহ তাআলা জুমার দিবসে আরাফার দিনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অবর্তীণ করেন তার বাণীঃ
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ﴿٣﴾ سورة المائدة
'আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম। তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।' এ উম্মতের উপর এটা আল্লাহর পক্ষ হতে এক বিশাল নেআমত; যে আল্লাহ তাদের জন্য তাদের দীন পরিপূর্ণ করেছেন। তাই তাদের অন্য কোন দীনের মুখাপেক্ষী হতে হবে না। তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কোন নবীর মুখাপেক্ষীরও প্রয়োজন পড়বে না। এটা এ জন্য যে, আল্লাহ তাআলা তাকে শেষ নবী বানিয়েছেন। এবং তাকে প্রেরণ করেছেন সকল জিন ইনসানের জন্য। তাই ঐ বস্তু হালাল বলে গণ্য হবে, যা তিনি হালাল বলেন। ঐ বস্তু হারাম হবে, যা তিনি হারাম বলেন। এবং তিনি যা বিধান হিসাবে বলবেন, তাই হবে বিধান। আর তিনি যত সংবাদ দিয়েছেন সবই সত্য- হক্ক, তাতে মিথ্যা - পশ্চাৎপদতা নেই।
وَتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا
"তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে পূর্ণতা লাভ করেছে।” অর্থাৎ সত্যতা সংবাদ পরিবেশনে আর ইনসাফ আদেশ ও নিষেধ প্রদানে। তাই আল্লাহ যখন তাদের জন্য দীনকে পূর্ণাঙ্গ করেছেন তাদের উপর নেয়ামত ও পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।
বর্ণিত আছে, আরাফা দিবসে এ আয়াত অবতরণ প্রাক্কালে, উমার রা. কেঁদে ছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো আপনি কাঁদছেন কেন? উত্তরে বললেন, 'এর কারণ হলো আমরা দীনের সমৃদ্ধিতে ছিলাম। এখন পূর্ণাঙ্গ করা হলো। আর কোন বস্তু পূর্ণাঙ্গ হলে তার তা আর বৃদ্ধি পায় না। সমৃদ্ধ হয় না।' তিনি যেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পূর্বাভাস দেখছিলেন এ আয়াতে।
৩. জামরাতে উম্মতকে উপদেশ দান ও বিদায় জানানোঃ
জাবের রা. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দশম তারিখে বাহনে থেকে পাথর নিক্ষেপ করতে দেখেছি এবং বলতে শুনেছি 'তোমরা আমার থেকে তোমাদের বিধি-বিধানগুলো শিখে নাও, আমি জানি না, হতে পারে এ হজের পর আমি আর হজ করব না।'
উম্মে হুসাইন রা. বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হজ পালন করেছি, এবং তাকে দেখেছি জামরাতুল আকাবা নিক্ষেপ শেষে ফেরার পথে তিনি সাওয়ারীর উপর ছিলেন। তার সাথে বেলাল ও উসামা রা. ও ছিলো। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক কথাই বললেন। তবে আমি তাকে বলতে শুনেছি, 'তোমাদের উপর যদি কোন কালো বিকলাঙ্গ কৃতদাস আমীর নিযুক্ত করা হয়, সে যদি আল্লাহর কিতাব দিয়ে তোমাদের পরিচালিত করে, তার আনুগত্য কর, অনুসরন কর।'
৪. কুরবানীর দিনে উম্মতকে উপদেশ দান ও বিদায় জানানোঃ
আবু বকরা রা. হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বহনকারী উটে বসা ছিলেন। জনৈক ব্যক্তি লাগাম ধরলেন। তিনি মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, 'তোমরা কি জানো এটা কোন দিন?' তারা বলল, 'আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভাল জানেন।' এবং তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। আমরা মনে করলাম তিনি আজকের দিনের অন্য কোন নাম ঘোষণা করবেন। অতঃপর বললেন, 'এটা কি কুরবানীর দিন নয়?' আমরা বললাম, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!' তিনি বললেন, 'এটা কোন মাস?' আমরা বললাম, 'আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভাল জানেন।' এবং তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। আমরা মনে করলাম, তিনি এ মাসের অন্য কোন নাম দেবেন। অতঃপর বললেন, 'এটা কি জিলহজ মাস নয়?' আমরা বললাম, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!' তিনি বললেন, 'এটা কোন শহর?' আমরা বললাম, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভাল জানেন।' তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। আমরা মনে করলাম, তিনি এ শহরের অন্য কোন নতুন নাম বলবেন। বললেন, 'এটা কি পবিত্র নগরী নয়?' আমরা বললাম, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহ রাসূল!' তিনি বললেন, 'তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের ইজ্জত- আব্রু, তোমাদের শরীর তোমাদের কাছে সম্মানিত ও হারাম। যেমন সম্মানিত এ নগরী, এ মাস, আজকের এ দিন। অচিরেই তোমরা তোমাদের প্রভুর সাক্ষাত লাভ করবে। তখন তোমাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। তাই আমার পর তোমরা ভ্রষ্টতার দিকে যাবে না- যা তোমাদের পরস্পরকে হত্যার দিকে ধাবিত করে। জেনে রাখ! তোমরা যারা আজ উপস্থিত আছ তারা এ বাণী পৌঁছাবে অনুপস্থিতদের কাছে। কারণ বহু বর্ণনাকারী হতে শ্রবণকারী অধিক জ্ঞানী, ও সংরক্ষণকারী হয়ে থাকে। আমি কি পৌঁছিয়েছি?' অতঃপর পেছনে গেলেন এবং দুটি লাবণ্যময় মেষ জবেহ করলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি ‘উপস্থিতিগণ অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছাবে’ এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ হতে উম্মতের জন্য অসীয়ত। তিনটি প্রশ্নের প্রতিটির পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ নীরব থাকার উদ্দেশ্য ছিল : তাদের বোধশক্তিকে উপস্থিত করা, সকলের মনোযোগ পুরোপুরি আকর্ষণ করা এং সংবাদের গুরুত্ব অনুধাবন করানো।
ইবনে উমার রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কুরবানী দিবসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামারাতে অবস্থান করেন... এবং বলেন, 'এটা হচ্ছে বড় হজের দিন। আরো বললেন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।' এবং লোকদের বিদায় জানালেন। উপস্থিত লোকেরা বলল, 'এটা বিদায় হজ।'
মীনাতে আল্লাহ সকল হাজীদের কানগুলো ব্যাপক ভাবে খুলে দিলেন, যেন কুরবানী দিবসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদত্ত খুতবা সবাই শুনতে পায়। এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুজিযা যে আল্লাহ তাদের কানে বরকত দিলেন এবং শ্রবণ শক্তিকে বৃদ্ধি করলেন। যাতে দূরে কাছে সবাই তার ভাষণ শুনতে পায়। এমনকি তারা অনেকে তাদের বাড়িতে বসে ও শুনতে পেয়ে ছিলেন।
আব্দুর রহমান বিন মুয়ায আত তাইমী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা মিনায় অবস্থানকালে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাষণ দিলেন, আর আমাদের কানগুলো খুলে দেওয়া হলো। এমনকি তিনি কি বলছেন তা আমরা গৃহে বসেও শুনছিলাম।'
৫. আইয়‍্যামে তাশরীকে উম্মতের জন্যে তার অসীয়ত :
জিলহজ মাসের বারো তারিখে আইয়‍্যামে তাশরীকের দ্বিতীয় দিন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন, এ দিনটিকে ইয়াওমুর রা'স- মাথা দিবস- বলা হতো। এ দিনে তারা জবেহকৃত পশুর মাথা আহার করতো বলে মক্কার লোকেরা এ নামে দিনটিকে উল্লেখ করতো। এবং এটা ছিল তাশরীক দিনগুলোর অন্ত র্ভুক্ত।
বাকার গোত্রের দুইজন লোক যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবী ছিলেন, বললেন, তাশরীক দিনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমরা খুতবা দিতে দেখেছি, আমরা তার উষ্ট্রীর কাছে ছিলাম। এটা ছিল মিনায় প্রদত্ত খুতবার মত।
আবু নাদরা রা. হতে বর্ণিত, যে ব্যক্তি তাশরীক দিবসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খুতবা শুনেছেন, তিনি আমাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হে লোক সকল! তোমাদের প্রভু একজন। তোমাদের পিতা একজন। জেনে রাখ, অনারবের উপর আরবের কোন প্রাধান্য নেই। কালোর উপর সাদারও নেই কোন শ্রেষ্ঠত্ব। সাদার ও নেই কালোর উপর কোন প্রাধান্য। তবে শ্রেষ্ঠত্ব হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে। আমি কি পৌঁছাতে পেরেছি তোমাদের কাছে? তারা বললো, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!' অতঃপর বললেন, 'এটা কোন দিন? তারা বলল, 'এটা সম্মানিত দিন।' তিনি আবার বললেন, 'এটা কোন মাস?' তারা বলল, 'এটা পবিত্র মাস।' আবার বললেন, 'এটা কোন নগরী?' তারা বলল, 'সম্মানিত নগরী।' তিনি বললেনঃ 'আল্লাহ সম্মানিত করেছেন তোমাদের পরস্পরের রক্ত, সম্পদ, ইজ্জত আব্রু, ঠিক আজকের সম্মানিত দিন, সম্মানিত মাস ও সম্মানিত নগরীর মত। আমি কি পৌঁছাতে পেরেছি?' তারা বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি পৌঁছিয়েছেন।' তিনি বললেন, 'উপস্থিতগণ অনুপস্থিতদের কাছে যেন এ বাণী পৌঁছে দেয়।'
এখানে বিদায় হজে পবিত্র স্থানসমূহে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাষণের সংক্ষেপ বর্ণিত হলো।
এর মধ্যে রয়েছে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর হাদীস- নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজে মানুষের উদ্দেশ্যে খুতবা দিলেন এবং বললেন, 'শয়তান আশাহত হয়েছে এ বিষয়ে যে, এ ভূমিতে তার উপাসনা হবে না। কিন্তু এ ছাড়া অন্য আমল যা তোমরা তুচ্ছ জ্ঞান কর, তার বিষয়ে সে উপাসনা পাওয়ার আশা করবে। অতএব! তোমরা সাবধান থেকো! আমি তোমাদের মাঝে রেখে যাচ্ছি এমন বিষয়, যা তোমরা আকড়ে ধরলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব, তাঁর নবীর সুন্নাত।'
আবু উমামাহ রা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার জাদআ উটের উপর থেকে বিদায় হজে জনতার উদ্দেশে খুতবা প্রদানকালে বলতে শুনেছি, 'হে মানব সকল! তোমরা তোমাদের প্রভুর আনুগত্য কর। পাঁচ ওয়াক্ত নামায কায়েম কর। তোমাদের সম্পদের যাকাত আদায় কর। রমযানের সিয়াম পালন কর। এবং তোমাদের শাসকের আনুগত্য কর। তাহলে তোমরা তোমাদের প্রভুর জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
এ পরিচ্ছেদের সারকথা ও শিক্ষনীয় বিষয়ঃ
১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হজের আহবানে সাড়া দিয়ে যে-ই মদীনায় উপস্থিত হয়েছেন, সে-ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথেই হজ করেছেন। জাবের রা. হতে বর্ণিত হাদীস তাই প্রমাণ করে। তিনি বলেন, মদীনায় অসংখ্য লোকের সমাগম হয়েছিল। প্রত্যেকের ইচ্ছা আল্লাহর রাসূলের অনুসরণ করবে। তিনি যা আমল করবেন তারা তা-ই করবে।
২. হাজীদের জন্য উত্তম হলো সূর্য হেলে যাওয়ার পর আরাফায় অবতরণ করা, যদি সম্ভব হয়।
৩. আরাফায় হাজীদের উদ্দেশ্যে খুতবা প্রদান করা উত্তম, এতে থাকবে মানুষের জরুরী বিষয়ের ব্যাখ্যা, তাওহীদ ও দীনের মৌলনীতির ব্যাখ্যা। তাতে সতর্ক করা হবে শিরক, বিদআত ও পাপ ও মুসলিম জাতির দিক-নির্দেশনা সম্পর্কে এবং উপদেশ থাকবে মানুষের প্রতি কুরআন এবং সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন যাপন করার।
বিদায় হজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনটি খুতবা প্রদান করেছেন। আরাফা দিবসে খুতবা, মীনায় কুরবানী দিবসের খুতবা, মীনায় জিলহজ মাসের ১২ তারিখে খুতবা। ইমাম শাফী র. এর মত হলো ইমাম অনুরূপ খুতবা দেবে। জিলহাজ মাসের সাত তারিখে' এবং এর মধ্যে আগামী খুতবার পূর্ব পর্যন্ত সব বিষয় ইমাম শিক্ষা দেবে।
৪. রক্ত, ইজ্জত, সম্পদ, শরীর ইত্যাদি পবিত্র হওয়ার বিষয় দৃঢ়ভাবে গুরুত্ব প্রদান। এক মুসলিমের জান, মাল-সম্পদ, ইয্যত-সম্মান অন্য মুসলিমের জন্য হারাম ও সম্মানিত। সে এগুলোর কোন ক্ষতি করতে পারে না। বরং এগুলোকে সম্মান করতে হবে।
৫. উদাহরণ ব্যবহার এবং একটি উপমার সাথে অন্য একটি উপমার তুলনা। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী- 'এ দিনের মত সম্মানিত, এ মাসের মত হারাম, এ শহরের মত পবিত্র।
৬. জাহেলী যুগের সকল কর্মকান্ড ও সুদ রহিত করা। এটাও জেনে রাখা যে, জাহেলী যুগের হত্যাকান্ডের কোন কেসাস নেই।
৭. ইমাম অথবা যে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে, সে প্রথমে নিজেকে এবং নিজের পরিবার থেকে শুরু করবে। কারণ এরা তার কথা গ্রহণের উপযুক্ত। এবং নবদীক্ষিত মুসলিমের সাথে ভাল আচরণ করা।
৮. সুদের মধ্যে মূলধনের অতিরিক্ত হলো হারাম। মূলধন মালিকেরই প্রাপ্য।
৯. নারী অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখা, এবং তাদের সাথে উত্তম আচরণ করা।
১০. স্ত্রীর ভরণ-পোষণ দেয়া ফরয। সে যদি কোন অন্যায় করে এর জন্য তাকে শর্তসাপেক্ষে এবং কুরআন ও সুন্নায় বর্ণিত নিয়মে শাস্তি দেয়া যাবে এবং এর ফলে যেন কোন প্রতিক্রয়া সৃষ্টি না হয়।
১১. উপদেশ হবে আল্লাহর কিতাব এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের মাধ্যমে।
১২. 'তোমরা হজের বিধানাবলী আমার থেকে গ্রহণ কর', এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ হতে আদেশ অর্থাৎ আমার এ হজে আমি যা আনয়ন করেছি- কথা, কাজ, আচরণ সবই গ্রহণ কর।
হজের এ সকল আহকাম তোমরা শিখে নাও, সংরক্ষণ কর, আমল কর এবং মানুষকে শিক্ষা দাও। হজের আহকাম বিষয়ে এটি একটি মৌলিক হাদীস, যা নামাজের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী صلوا كما رأيتموني أصلي (তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখ সেভাবে নামাজ পড়) এর মত।
১৩. 'সম্ভবত এরপর আমি হজ করবো না' এর মাধ্যমে উম্মতকে বিদায় জানানোর প্রতি ইঙ্গিত। এবং তাদের জানিয়ে দেয়া যে, মৃত্যু অতি নিকটে। তাদেরকে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে তার কাছ থেকে শিক্ষা নেয়ার এবং সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য। আর এ কারণেই এটাকে বিদায় হজ বলা হয়।
১৪. জ্ঞানের প্রচার প্রসারের জন্য উৎসাহ প্রদান করা, এবং এ প্রচার প্রসারের জন্য খুব বড় পন্ডিত হওয়া শর্ত নয়। কারণ, হতে পারে তারপর অন্য কেহ আসবে, যে পূর্বের ব্যক্তির চেয়ে অধিক বিদ্বান হবে। উত্তম হলো খতীব উঁচু স্থানে থাকবে যাতে সবাই দেখতে ও শুনতে পায়।
১৫. প্রশ্ন করা অতঃপর নীরব থেকে আবার তার উত্তর প্রদান, বিষয়টি শ্রোতা ও ছাত্রদের মনোযোগ আকর্ষনের একটি সুন্দর মাধ্যম।
১৬. 'ওয়ালিউল আমর' বা দায়িত্বশীল এর আদেশ সর্বদা মান্য করা। যতক্ষণ তিনি মানুষকে কুরআন অনুসারে পরিচালিত করেন। যদি তার থেকে কোন গুনাহ এবং নিষিদ্ধকাজ প্রকাশ পায় তাহলে তাকে উপদেশ দেয়া, আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া, আল্লাহর ভয় দেখানো উচিত। তবে তা হবে হিকমত ও উত্তম পদ্ধতিতে।
১৭. আল্লাহর আনুগত্য, নামায, যাকাত, রোযার নির্দেশ দেয়া এবং এ অসীয়ত করা যে মানুষের মাঝে কোন শ্রেণি বিভক্তি নেই, নেই কোন বর্ণ বিভক্তি। কিন্তু তাকওয়ার ভিত্তিতে মান-মর্যাদার স্তর নির্ণয় করা হবে।
১৮. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রকাশিত মুজিযা - কুরবানী দিবসে তার খুতবা গৃহে অবস্থান করেও মানুষেরা শুনতে পেরেছে। আল্লাহ তাআলা সকলের কানগুলো বিশেষভাবে খুলে দিয়েছেন। যা রাসূলের রিসালাতের সত্যতার আরেকটি নিদর্শন।
১৯. ইসলামী বিদ্বানদের মতে কুরবানী হলো সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এটা হাজী এবং হাজী ভিন্ন সকলের জন্য। এর মাধ্যমে হাদি' আদায় হবে না। হাদি জবেহ করা স্বতন্ত্র সুন্নাত। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনায় খুতবা প্রদান করার পর যে দুটি মেষ যবেহ করেছেন তা ঐ সকল হাদির থেকে পৃথক ছিল, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে যবেহ করেন এবং বাকীগুলো আলী রা. কে যবেহ করতে বলেছেন।

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 মৃত ও জীবিতকে বিদায় দান

📄 মৃত ও জীবিতকে বিদায় দান


আয়েশা রা. বলেন, যখন আমার ঘরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাত্রি যাপনের পালা আসতো, তিনি শেষ রাতে বাকী নামক কবর স্থানের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যেতেন। অতঃপর তিনি বলতেন':
السلام عليكم دار قوم مؤمنين وآتاكم ما توعدون، غدا مؤجلون وإنا إن شاء الله بكم لاحقون، اللهم اغفر لأهل بقيح الغرقد.
(হে মুমিন সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতি সালাম। যা তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তাতো এসে গেছে। আগামী কাল আমাদের সময়। আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা তোমাদের সাথে যোগ দেব। হে আল্লাহ! আপনি বাকী গারকদ বাসীকে ক্ষমা করুন)
অপর একটি বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জিবরীল আমার কাছে এসেছে.. অতঃপর সে বলে, 'আপনার প্রভু আপনাকে বাকীতে দাফনকৃত কবরবাসীদের নিকট গিয়ে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন।' তখন আয়েশা রা. বলেন, হে আল্লাহর রসুল! আমি তাদের জন্য কি বলব? তিনি বললেন, 'তুমি এ কথাগুলো বলবে।'
السلام عليكم أهل الديار من المؤمنين والمسلمين ويرحم الله المستقدمين منا والمستأخرين وإنا إن شاء الله بكم لا حقون.
(তোমাদের প্রতি সালাম হে মুমিন ও মুসলিম অধিবাসীগণ! আল্লাহ আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের রহম করুন! আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো।)
ইমাম উবি রহ. বলেন, 'এ সকল কবর যিয়ারতের ঘটনা হচ্ছে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শেষ জীবনের।' এর দ্বারা প্রমাণ মিলে যে, তিনি মৃত ব্যক্তিদের থেকে বিদায় নিয়েছেন। যেমন তিনি তা করেছেন উহুদের ময়দানে শহীদগণের ক্ষেত্রেও। আর এ জন্যই তিনি বাকীর কবরবাসীদের জন্য দুআ করার নিমিত্তে শেষ রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন। আয়েশা রা. বলেন, '...আমিও তার পিছনে পিছনে চলতে শুরু করলাম। তিনি বাকীর কবর স্থানে এসে দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়ে থাকলেন। তিনবার তাদের জন্য হাত উঠালেন। অতঃপর রওয়ানা করলেন...।'
উকবা ইবনে আমের রা. বলেন, আট বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন মদীনা থেকে বের হয়ে উহুদের শহীদদের উপর নামাজ পড়লেন; যেভাবে মৃত ব্যক্তিদের জন্য জানাযা নামাজ পড়ার নিয়ম সেভাবে। অতঃপর মিম্বারে উঠে বললেন, 'তোমাদের মধ্য হতে আমিই সবার অগ্রগামী। আমি তোমাদের সকলের জন্য সাক্ষী হবো। তোমাদের সাথে আমার হাউজে কাউসারে সাক্ষাত হবে। আল্লাহর শপথ! আমি আমার এ স্থানে দাড়িয়ে হাউসে কাউসার অবলোকন করছি। আমাকে দুনিয়ার ধনভান্ডারের চাবি প্রদান করা হয়েছে। অথবা বলেছেন, দুনিয়ার চাবি প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহর শপথ! আমার পরে তোমরা আল্লাহর সাথে শরীক করবে, এ আশংকা আমি করি না। তবে, আমি দুনিয়ার বিষয়টি নিয়ে তোমাদের ব্যাপারে শঙ্কিত তোমরা দুনিয়ার ধন-সম্পদ অর্জনে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে। নিজেরা ঝগড়া ফাসাদ ও মারামারিতে লিপ্ত হবে। অতঃপর তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীরাও ধ্বংস হয়েছে।'
উকবা রা. বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিম্বারের উপরে এটাই আমার সর্বশেষ দেখা।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত ব্যক্তিদের থেকে বিদায় নেয়ার বিষয়টি এ হাদীসের ভাষা থেকেই স্পষ্ট। কারণ ভাষণটি ছিল তার জীবনের শেষের ঘটনা। মৃত ব্যক্তিদের থেকে বিদায় নেয়ার উদাহরণ হচ্ছে, বাকী কবরস্থানে গিয়ে কবরবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, উহুদের শহীদদের জন্য দুআ করা এবং স্বশরীরে তাদের যিয়ারত থেকে ফিরে আসা।
এ পরিচ্ছেদের সারকথা ও শিক্ষনীয় বিষয়:
১. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মতদের কল্যাণ করার জন্য আপ্রান চেষ্টা করেছেন। জীবিত এবং মৃত সকলের কল্যাণ কামনায় ব্রতী ছিলেন। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ: আট বছর গত হওয়ার পরও তিনি উহুদের শহীদদের উপর জানাযার ন্যায় নামাজ পড়েছেন। বাকীর কবরস্থানে কবরবাসীদের যিয়ারত করেছেন এবং তাদের জন্য দুআ করেছেন। জীবিত ব্যক্তিদের উপদেশ, নসীহত ও কল্যাণের নির্দেশনা দিয়েছেন। এমন কোনো কল্যাণ নেই, যা তিনি স্বীয় উম্মতকে বলেননি। এমন কোনো অকল্যাণও নেই, যা থেকে তিনি নিজ উম্মতকে সতর্ক করেননি।
২. যাকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া এবং তার ঐশ্বর্য প্রদান করেছেন, তাকে দুনিয়ার চাক্যচিক্য থেকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। তার উচিত অশুভ পরিণতির ভয় করা। দুনিয়া নিয়ে আত্মতুষ্টিতে না থাকা। এ ব্যাপারে কারো সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ না হওয়া। বরং নিজের কাছে যা আছে, তা আল্লাহর সন্তুষ্টিতে ব্যবহার করা।

টিকাঃ
১ বাকিউল গারকাদ: মদীনাবাসীদের কবর স্থান। গাকাদ মূলতঃ একপ্রকার কাটা গাছ, এখানে কোনো এক সময় এ গাছগুলো ছিল, তাই এর নাম হয়ে গেছে গারকাদ বলে। নববির ব্যাখ্যা গ্রন্থ ৭/৪৬, ইমাম উব্বির ব্যাখ্যা গ্রন্থ ৪/৩৯০ * সহীহ মুসলিম : ৯৭৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00