📄 বীরত্ব ও সাহসিকতা
যুদ্ধ এবং লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বীরত্ব দেখানো অবশ্যই ধৈর্যের পরিচায়ক। এবং এর দ্বারা ভীতির উদ্রেক থেকে নিজের আত্মার উপর নিয়ন্ত্রন রাখা যায়। মানুষ যে সকল স্থানে বীরত্বকে ভাল চোখে দেখে, সে সকল স্থানে কাপুরুষতা প্রদর্শন সাহসিকতার বিরোধী বলে গণ্য।
বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে রাসুলের সীরাতের কিছু উদাহরণ দেয়া হল, আর এই উদাহরণগুলো দ্বারা মানুষ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে উত্তম আদর্শ পাবে। এই জন্যই তো তিনি অন্তর, জিহবা, তরবারী, দাঁত, দাওয়াত ও বক্তৃতা দ্বারা জিহাদ করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৫৬টি অভিযান প্রেরণ করেছেন। আর তিনি নিজে সরাসরি ২৭টি অভিযান পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে ৯টি তে নিজে প্রত্যক্ষ লড়াই করেছেন।
উদাহরণগুলো নিয়ে তুলে ধরা হলঃ
প্রথম উদাহরণঃ বদরের যুদ্ধে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বীরত্ব-
তার যে সকল অবস্থান হিকমত দ্বারা পরিপূর্ণ তার একটি হল, তিনি যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে লেকেদের সাথে পরামর্শ করেছিলেন। কেননা তিনি যুদ্ধে আনছারদের আগ্রহ বুঝার চেষ্টা করছিলেন। বাইয়াতের মধ্যে তাদের সাথে শর্ত করা হয়েছিল যে, মদীনায় থেকে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষে ঐ সমস্ত জিনিসকে প্রতিরোধ করবেন যা তারা সাধারনত নিজেদের জন্য, মাল সম্পদের রক্ষায়, সন্তান ও স্ত্রীদের নিরাপত্তার জন্য করে থাকেন। মদীনার বাহিরে প্রতিরোধ করার ব্যাপারে তাদের সাথে কোন শর্ত ছিল না। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে পরামর্শ করতে চাইলেন। তাদেরকে একত্রিত করলেন ও পরামর্শ করলেন। আবু বকর রা. দাড়ালেন এবং সুন্দরভাবে বললেন। এরপর উমার রা. দাড়ালেন ও সুন্দরভাবে বললেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূনরায় পরামর্শ চাইলেন। এইবার মিকদাদ রা. দাড়ালেন, তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ আপনাকে যে পথে চলতে নির্দেশ করেছেন আপনি সে পথে চলুন। আমরা সবাই আপনার সাথে। আল্লাহর শপথ আপনাকে আমরা তেমন বলব না যেমন বলেছিল বনী ইসরাঈল মুসা আ. কে যে 'আপনি ও আপনার প্রভু যান, যুদ্ধ করুন। আমরা এখানে বসে থাকি।' কিন্তু আমরা বলছি 'আপনি এবং আপনার প্রভূ যান যুদ্ধ করুন, আমরাও আপনাদের সাথে থেকে যুদ্ধ করব। আমরা আপনার ডানে, বামে, সামনে, পিছনে, সর্বত্র যুদ্ধ করব।' রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয় বার মানুষের সাথে পরামর্শ করলেন। আনছাররা বুঝতে পারল, তাদের মতামত চাওয়া হচ্ছে। সাআদ বিন মুআজ রা. সামনে অগ্রসর হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! মনে হয় আপনি আমাদের মতামত চাইছেন। আসলে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মতামতই চাচ্ছিলেন। কেননা তারা বাইয়াত করেছিল, দেশের মধ্যে অবস্থান করে তারা রাসূলের পক্ষে প্রতিরোধ করবে। কিন্তু যখন মদীনার বাহিরে লড়াই করার প্রশ্ন আসল তখন তাদের মতামত নেয়া খুবই জরুরী মনে করলেন। অতঃপর যখন বের হওয়ার সংকল্প করলেন, তাদের সাথে পরামর্শ করলেন, যাতে তাদের মনের অবস্থা জানতে পারেন। সাআদ রা. তাকে বললেন, 'মনে হয় আপনি ভয় পাচ্ছেন যে, আনছারদের এ অধিকার আছে তাদের নিজেদের দেশে ছাড়া আপনাকে সাহায্য করবে না। আমি আনছারদের পক্ষ থেকে বলছি ও উত্তর দিচ্ছি, আপনি যেখানে ইচ্ছা গমন করুন। যাকে ইচ্ছা নিয়ে যান। যাকে ইচ্ছা বাদ দিন। আমাদের সম্পদ থেকে যা ইচ্ছা গ্রহণ করুন এবং যা ইচ্ছা আমাদের জন্য রেখে যান। আমাদের নিকট থেকে যা গ্রহণ করবেন তা আমাদের নিকট বেশি প্রিয় তার চেয়ে যা আমাদের জন্য রেখে যাবেন। আমাদেরকে যে বিষয়ের নির্দেশ করতে চান, করুন। আমরা আপনার আদেশের অনুগত। আল্লাহর শপথ! আমাদেরকে নিয়ে চলতে চলতে যদি গামদান এর হ্রদে পৌঁছে যান, অবশ্যই আমরা আপনার সাথে চলব। ঐ সত্ত্বার শপথ! যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি আমাদেরকে এই সমুদ্রে নিয়ে পরীক্ষা করেন, আর আপনি তাতে প্রবেশ করেন, আমরাও আপনার সাথে প্রবেশ করব। আমাদের মধ্য থেকে একজনও পিছনে থাকবে না। আর আমরা এটাও অপছন্দ করব না যে, আমাদেরকে নিয়ে আগামী কালই শত্রুদের মুখোমুখী হবেন। আমরা যুদ্ধে ধৈর্যশীল, শত্রু সাক্ষাতে সত্যবাদী। আশা করি আল্লাহ তাআলা আমাদের থেকে এমন কিছু দেখাবেন যা আপনার চক্ষু শীতল করবে। আল্লাহর বরকতের উপর নির্ভর করে আমাদেরকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন।' এই বক্তব্যে রাসুলুল্লার চেহারা মুবারক আলোকিত হল। আনন্দ ফুটে উঠল এবং তাকে পুলকিত করল। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'চলো এবং সুভ সংবাদ গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহ আমার সাথে দুইটি দলের একটির অঙ্গীকার করেছেন। মনে হয় আমি এখন সে জাতির ধংস দেখতে পাচ্ছি।'
বদরের যুদ্ধে রাসুলের বিশেষ অবস্থানের মধ্যে একটি ছিল আল্লাহ তাবারকা ও তাআলার উপর তার অগাধ ভরসা। কেননা তিনি জেনেছিলেন যে, বিজয় অধিক সংখ্যক যোদ্ধ বা শক্তির কারণে আসবে না। বরং বিজয় হবে আল্লাহর সাহায্যে উপকরণ গ্রহণ ও আল্লাহর উপর ভরসা করার মাধ্যমে।
উমার বিন খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদর দিবসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের দিকে দৃষ্টি দিলেন। তাদের সংখ্যা ছিল এক হাজার। এবং তার সাথীদের সংখ্যা ছিল তিনশত তের জন। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবলার দিকে ফিরলেন, অতঃপর দু হাত উত্তোলন করে তার প্রভুর নিকট উচু কণ্ঠে সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগলেন। 'হে আল্লাহ আমাকে যা অঙ্গীকার করেছেন তা পরিপূর্ণ করে দিন, হে আল্লাহ ইসলাম অনুসারী এ দলকে যদি আপনি ধংস করে দেন তা হলে পৃথিবীতে আপনার ইবাদত করার কেহ থাকবে না।' হাত উঠিয়ে কেবলামুখী হয়ে উচ্চ কন্ঠে তার প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনায় এমনভাবে রত ছিলেন যে, তার কাধের উপর থেকে চাদর পড়ে গেল, আবু বকর রা. তার নিকট আসলেন, চাদর উঠালেন কাধের উপর ফেলে দিলেন, অতঃপর পিছনে তার গায়ে লেগে বসলেন, ও বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনার প্রভুর নিকট প্রার্থনা যথেষ্ট হয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যা আপনার জন্য অঙ্গীকার করেছেন তা আপনাকে দিবেন। তখন আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ন করলেনঃ
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمُدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِنَ المَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ الأنفال : ٩
'স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট কাতর কণ্ঠে সাহায্যের আবেদন করেছিলে। আর তিনি সেই আবেদন কবুল করেছিলেন যে, আমি তোমাদেরকে এক হাজার ফেরেস্তা দ্বারা সাহায্য করবো, যারা ধারাবাহিকভাবে আসবে।' আল্লাহ ফেরেস্তাদের মাধ্যমে রাসুলকে সাহায্য করেছেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুর নিচ থেকে বের হতে হতে বলছিলেনঃ
سَيُهْزَمُ الجُمْعُ وَيُوَلُّونَ الدُّبُرَ القمر ٤٥﴾
"এইদল শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে।”
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিযানে লড়াই করলেন এমনভাবে যে, তিনি সকলের চেয়ে শক্তিশালী ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন। রাসুলের সাথে আবু বকর রা. ছিলেন, যেমন তারা দুজন তাবুতে দুআ ও কান্নাকাটির মাধ্যমে যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলেন। অতঃপর তারা দু'জন নীচে নেমে আসলেন সকলকে উদ্বুদ্ধ করলেন। এবং দুজনই স্ব শরীরে যুদ্ধ করলেন। জিহাদের পবিত্র দু' স্তরের সমন্বয় তারা করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের চেয়ে বড় বীর ছিলেন। আলী বিন আবু তালেব রা. থেকে বর্ণিত, 'তিনি বলেন, বদর দিবসে দেখেছি, আমরা যখন তার কাছাকাছি অবস্থান করছিলাম, তিনি আমাদের চেয়ে শত্রুদের বেশি নিকটবর্তী ছিলেন, সে দিন তিনি সকলের চেয়ে কঠিন আক্রমণকারী ছিলেন।'
আলী রা. বলেন, 'যুদ্ধের দাবানল যখন জলে উঠত এবং এক জাতি আর এক জাতির মুখোমুখী হত, তখন আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করতাম। আমাদের কেহ রাসুলের চেয়ে শত্রু বাহিনীর বেশি নিকটবর্তী হতো না।'
দ্বিতীয় উদাহরণঃ উহুদের যুদ্ধে রাসুলের বীরত্ব
বীরত্বের ব্যাপারে এবং নিজ জাতির নির্যাতনে ধৈর্য ধারণ করার ব্যাপারে উহুদের যুদ্ধে তার অবস্থান ছিল অনেক উর্ধে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে বড় ধরণের লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। মুশরিকদের তুলনায় মুসলমানদের রাষ্ট্র তখন দিপ্রহারের অগ্রভাগে ছিল। আল্লাহর দুশমনেরা পিছু হটতে হটতে পালিয়ে গেল। তারা তাদের নারীদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। যখন গিরিপথ পাহাড়ারত মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী তাদের পরাজয় দেখল। তারা তাদের স্থান ত্যাগ করেছিল যেখানে রাসুল তাদেরকে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছিলেন সর্বাবস্থায়। আর এটা এ কারণে হয়েছিল যে, তারা মনে করেছিল, মুশরিকরা আর ফিরে আসবে না। অতঃপর তারা পাহাড়ের পথ খালি করে দিয়ে যুদ্ধ লব্দ সম্পদের খোঁজে চলে গেল। মুশরিকদের অশ্বারোহী দল আবার ফিরে আসল। তীরন্দাজ বাহিনী মুক্ত সীমান্ত পেল। তারা মুখোমুখী হল ও সেখানে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করল। তাদের সর্বশেষ জনও সেখানে আসল। মুসলমানদেরকে ঘিরে ফেলল। তাদের মধ্য থেকে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা শহীদি মর্যাদা দিতে চাইলেন দিলেন। এরা সংখ্যায় ছিলেন সত্তর জন। সাহাবায়ে কেরাম পিছনে সরে গেলেন এবং মুশরিকরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চারি পাশে সমবেত হল। রাসুলের চেহারা মুবারক আহত করল এবং তার নিচের ডান দিকের দাঁত ভেঙ্গে গেল। বর্মের সূঁচালো মাথা তার মাথায় বিদ্ধ হয়ে গেল। সাহাবায়ে কেরাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বাচানোর জন্য লড়াই করে যেতে থাকলেন।'
রাসুলের পাশে কুরাইশ গোত্রের দু'জন ছিল। আনছরদের মধ্য থেকে ছিল সাতজন। যখন তারা রাসুলের নিকটে এসে পড়ল এবং কাছকাছি পৌঁছল, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'যে তাদেরকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দেবে, তার জন্য জান্নাত রয়েছে, অথবা জান্নাতে সে আমার সঙ্গী হবে।' আনছারদের মধ্য থেকে একজন সামনে অগ্রসর হল শাহাদত বরণ করা পর্যন্ত লড়াই করল। অতঃপর তারা রাসুলের আরো নিকটে চলে আসল। রাসুল আবার বললেন, 'তাদেরকে যে সরিয়ে দেবে তার জন্য জান্নাত।' আনছারদের একজন অগ্রসর হল সে লড়াই করে শহীদ হয়ে গেল। এভাবে সাতজন শহীদ হয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুই সঙ্গীকে বললেন, রণাঙ্গনের সীমান্ত ছেড়ে দিয়ে আমাদের সাথীরা ঠিক কাজ করেনি।'
মুসলমারা যখন একত্রিত হল, এবং যে গিরিপথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবস্থান নিয়েছিলেন, সেখানে তারা পৌঁছলো এবং তাদের মাঝে আবু বকর, উমার, আলী, হারেস বিন ছম্মাহ আল আনছারী প্রমুখ ছিলেন। তারা যখন পাহাড়ে হেলান দিয়ে বসলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই বিন খালাফকে তার ঘোড়ায় পেলেন। সে বলছে, মুহাম্মাদ কোথায়? সে যদি বেচে যায় আজ আমার রক্ষা নেই। লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্য থেকে কে তার দিকে অগ্রসর হবে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে তার দিকে যেতে নিষেধ করলেন। অতপর যখন তার নিকটবর্তী হল, হারেস বিন ছাম্মাহ থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্শা নিয়ে নিলেন। যখন তার থেকে বর্শাটি নিলেন, সে কেঁপে উঠল এমনভাবে যেমন উটের পিঠের উপর থেকে লোম উঠালে সে কেঁপে উঠে। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সামনা-সামনি হলেন এবং তার লৌহ বর্ম ও মাথার টুপির মধ্য থেকে তার গলার লক্ষ্য-বস্তু ঠিক করে নিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে জাগায় তাকে আঘাত করলেন। আঘাতে সে তার ঘোড়ার উপর কয়েকবার চক্কর মারল। বার বার কেঁপে উঠল। আল্লাহর দুশমন যখন সামান্য আঘাতের চিহ্ন নিয়ে কুরায়েশদের নিকট ফিরে গেল। সে বলল, 'আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ আমাকে হত্যা করেছে।' তারা তাকে বলল, মনে হচ্ছে তোমার জান বের হয়ে গিয়েছে। তোমার মারাত্বক কোন ক্ষত আমরা তো দেখতে পাচ্ছি না। সে বলল, 'মুহাম্মাদ তো মক্কায় আমাকে বলেছিল, আমি তোমাকে হত্যা করব। আল্লাহর শপথ সে যদি আমার উপর থুথুও নিক্ষেপ করে তবুও আমি মনে করব সে আমাকে হত্যা করেছে।' তারা মক্কায় ফেরার পথে আল্লাহর এই শত্রু ছারফ নামক স্থানে মারা গিয়েছিল।'
তৃতীয় উদাহরণঃ হুনাইন যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বীরত্ব
হুনাইন যুদ্ধে মুসলমান এবং কাফেররা মুখোমুখী হওয়ার পর, মুসলমানরা পিছনে ফিরে পালাতে লাগল।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের দিকে তার খচ্চর হাঁকাতে আরম্ভ করলেন। অতঃপর বললেন, 'হে আব্বাস! রাত্রে গল্প- গুজব যারা করছিল তাদেরকে আহবান কর।' আব্বাস রা. উচ্চ কন্ঠের অধিকারী ছিলেন। তিনি বলেন, আমি উচ্চ স্বরে বললাম, 'রাত্রে গল্প- গুজবকারীরা কোথায়?' আল্লাহর শপথ! তারা যখন আমার কন্ঠ শুনলো তখন তাদের সহানুভূতির অবস্থা এমন ছিল, যেমন গাভীর সহানুভূতি তার বাছুরের প্রতি হয়ে থাকে। তারা বলল, 'হাজির! হাজির! কাফেরদের বিরুদ্ধে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খচ্চরের উপর বসে প্রসারিত দৃষ্টি দিয়ে তাদের যুদ্ধ দেখছিলেন। তিনি বললেন, 'এখন যুদ্ধের তীব্রতা বেড়েছে।'
এই অবস্থানেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এমন বীরত্ব প্রকাশ পেয়েছে যার থেকে অনেক মহান ব্যক্তিরা অপারগ হয়ে গিয়েছে।
বারা ইবনে আযেব রা.কে লক্ষ্য করে কোন এক ব্যক্তি তাকে বলল, 'হে আবু আমারা! তোমরা কি হুনাইনের দিনে পালিয়ে গিয়েছিলে?' তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহর শপথ! আল্লাহর রাসুল পালায়ন করেননি।
কিন্তু তার যুবক সাথীরা যারা তাড়াতাড়ি করেছিল, যাদের নিকট অস্ত্র ছিল না বা কম ছিল। তারা এমন লোকদের সাথে সামনে পড়ে গেল যারা তীর নিক্ষেপে পারদর্শী ছিল। হাওয়াযেন ও নছর গোত্রের বিরাট একটি দল সম্মিলিতভাবে তাদের উপর তীর বর্ষণ করল। তাদের নিশানা ব্যর্থ হচ্ছিল না। তারা উন্মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসল। সকলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে চলে আসল। আবু সুফিয়ান বিন হারেস রাসুলের খচ্চর টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। রাসুল নেমে পড়লেন, ও দুআ করলেন, আল্লাহর সাহায্য কামনা করে বলতেছিলেনঃ
أنا النبي لا كذب أنا ابن عبد المطلب، اللهم نزل نصرك
'আমি সত্য নবী, আমি আব্দুল মুত্তালিব এর সন্তান, হে আল্লাহ আপনার সাহায্য অবতীর্ন করুন!'
বারা রা. বলেন যখন প্রচন্ড লড়াই শুরু হল, আমরা রাসুলের কাছাকাছি আশ্রয় গ্রহণ করেছিলাম, আমাদের মধ্যে বীর তিনিই ছিলেন যার কাছাকাছি সবাই যাচ্ছিলেন। অর্থাৎ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
মুসলিমের আর একটি বর্ণনায় সালামাতা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ভীতু অবস্থায় আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি তার শাহবা নামক খচ্চরের উপর ছিলেন। ইবনুল আকওয়াকে কম্পমান অবস্থায় দেখলাম। সবাই যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘিরে ধরল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খচ্চরের উপর থেকে নেমে পড়লেন। অতঃপর যমীন থেকে এক মুষ্টি মাটি হাতে নিলেন এবং শত্রু বাহিনীর মুখের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। তাদের চেহারা কালো হয়ে গেল। তাদের সকলের চোখ একমুষ্টি মাটিতে ভরে গেল। তারা পিছন ফিরে পালাল। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পরাজিত করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মুসলমানদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন।'
আলেমগণ বলেছেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খচ্চরে আরোহণ করা হল যুদ্ধের ময়দানে কঠিন যুদ্ধের সময় বীরত্ব এবং দৃঢ়তার চুড়ান্ত পর্যায়। তাছাড়া লোকরা তো তার নিকটেই ফিরে আসছিল। তার মাধ্যমে তারা প্রশান্তি লাভ করছিল। আর এটা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছিলেন ইচ্ছাকৃত ভাবে। কেননা, তার নিকটে অনেক প্রশিক্ষিত ঘোড়া ছিল। তা রেখে তিনি খচ্চরের পিঠে আরোহণ করেছিলেন।'
আর তার বীরত্বের প্রমাণ এটাও বহন করে যে, তিনি তার খচ্চরকে লাফাতে লাফাতে মুশরিকদের ভীড়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আর শত্রু পক্ষের লোকেরা পালাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সা. মাটিতে নেমে আসেন এমন সময় যখন সকলে তাকে ঘিরে ধরেছিল। বীরত্ব ও ধৈর্যের শেষ পর্যায় তিনি প্রদর্শন করেছেন। কেহ কেহ বলেন, 'রাসুল এমন করেছিলেন যারা মাটিতে ছিলেন তাদের সাথে একত্বতা প্রকাশের জন্য।' সাহাবীগণ হুনাইন যুদ্ধ ক্ষেত্রের সর্বত্র তার বীরত্বের আলোচনা করেছেন।
চতুর্থ উদাহরণঃ নিজ সাথীদেরকে সাহায্য করার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বীরত্ব
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোত্তম ও সবচেয়ে বেশি দানশীল, ও সবার চেয়ে সাহসী মানুষ ছিলেন। এক রাতে মদীনাবাসী একটি ভয়ানক আওয়ায শুনে ভয় পেয়ে গেল। কিছু মানুষ শব্দের দিকে চলে গেল, তারা দেখল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে আসছেন। তিনি সকলের আগে আওয়াযের দিকে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে আসছিলে আর বলছিলেন, 'তোমরা ভয় পেয়ো না, তোমরা ভয় পেয়ো না।' তিনি আবু তালহার ঘোড়ার উপর ছিলেন। তার শরীরে চাদর ছিল না। তার কাঁধের উপর ছিল একটি তরবারী। বর্ণনাকারী বলেন, তাকে আমরা বীরত্বের সমুদ্রের ন্যায় পেয়েছি। তিনি বীরত্বের সমুদ্র ছিলেন।'
এই সমস্ত উদাহরণ ও পূর্বের উদাহরণগুলি একথারই স্পষ্ট প্রমাণ যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের চেয়ে বীরত্বে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। সার্বিক বিবেচনায় এই ধরায় তার মত আর কোন সাহসী ব্যক্তি আসেনি। আর এ কথার সাক্ষ্য দিয়েছেন বড় বড় বীর বীর ও সাহসীগণও।
বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, 'যখন প্রচন্ড লড়াই শুরু হল, আমরা রাসুলের কাছাকাছি আশ্রয় গ্রহণ করছিলাম। আমাদের মধ্যে বীর তিনিই ছিলেন যার কাছাকাছি সবাই যাচ্ছিলেন। অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আনাস রা. পূর্বের হাদীসে বলেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোত্তম ও সবচেয়ে বেশি দানশীল, ও সবার চেয়ে বড় বীর মানুষ ছিলেন।'
পঞ্চম উদাহরণঃ চিন্তা ও পরিকল্পনায় তার বীরত্ব
পূর্বের এই উদাহরণগুলি তার অন্তরের বীরত্বের উদাহরণ ছিল। তার চিন্ত াগত বীরত্বের একটি উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। কেননা তার নামে হাজার হাজার বীরত্বগাথা রয়েছে। সে বীরত্ব হল, সুহায়েল বিন আমরের গোয়ার্তুমির সময়। যখন তিনি হুদাইবিয়া সন্ধির চুক্তিনামা লিখছিলেন, সে সময়ে রাসূলের অবস্থান অত্যন্ত সাহসিকতাপূর্ণ ছিল। কেননা চুক্তিপত্রে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' লেখা তিনি স্থগিত করেছিলেন। শুধু 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' লিখেছিলেন। এবং 'মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ' লেখার পরিবর্তে 'মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ' লিখতে রাজি হয়েছিলেন। ও সুহায়েলের এই শর্ত গ্রহণ করেছিলেন যে, কুরাইশদের কেহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট গেলে তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিবেন সে মুসলমান হলেও। সাহাবারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এ সকল অসম শর্তাবলীতে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থায় ধৈর্য ধরে বসেছিলেন। চুক্তিনামা লেখা শেষ হল। কিছুদিন পর স্পষ্ট বিজয় অর্জিত হল।
উল্লেখিত উদাহরণের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মিক ও বুদ্ধিমত্যা জনিত বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। দূরদৃষ্টি, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার কৃতৃত্ব তো তার আছেই। অধিকন্তু দায়ীদের প্রজ্ঞার পরিচয় হচ্ছে অধিকতর লাভবান বস্তু অর্জন করার নিমিত্তে কম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পরিহার করা। যদি তাতে কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা না থাকে।'
যা এতক্ষণ আলোচিত হয়েছে সবই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বীরত্ব ও দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত। এটা তার বীরত্বের তুলনায় সমুদ্রের এক ফোটার পরিমাণমাত্র। অন্যথায় তার বীরত্ব যদি খুজে খুজে লেখা হয়, তাহলে তো বিশাল গ্রন্থ লেখা হয়ে যাবে। প্রত্যেক মুসলমানের বিশেষ করে আল্লাহর দিকে আহবানকারীদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হল, তাদের প্রত্যেক বিষয়ে ও প্রতিটি কাজে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবে। আর এরই মাধ্যমে সফলতা এবং বিজয় আসবে। এবং ইহ জগতে ও পরকালে সৌভাগ্য লাভ করবে।
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا الأحزاب ২১
"তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ্ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাহাদের জন্য রয়েছে রাসুলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ।”
টিকাঃ
১ সহীহ আল - বুখারী ২৭৩১-২৭৩২ আহমাদ ৪র্থ খন্ড ৩২৮-৩৩১ পূঃ হাজাল হাবিব ইয়া মুহিব ৫৩২প
২ সরা আল আহযাব ২১
📄 সফর ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় কর্মোকৌশল
১। সমাজ সংস্কার ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কর্ম-কৌশল
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় পৌঁছলেন সেখানকার অধিবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রচুর মতপার্থক্য ছিল। তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্যও এক ছিল না। তারা একত্রিত হত নিজ নিজ গন্ডিতে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল পুরাতন উত্তরাধিকার সূত্রে। কিছু কিছু নতুন মতবিরোধও ছিল। মদীনার অধিবাসীরা ছিল মূলত তিনভাগে বিভক্তঃ
১- মুসলমানঃ আউস, খাজরাজ ও মুহাজেরদেরদের সমন্বয়ে।
২- মুশরিকঃ আউস, খাজরাজ ও যারা ইসলামে প্রবেশ করেনি তাদের সমন্বয়ে।
৩- ইহুদী: তারা কয়েকটি গোত্রে বিভক্ত ছিল। এদের মধ্যে বনু কাইনুকা ছিল খাজরাজ গোত্রের মিত্র। বনু নযীর ও বনু কুরাইযাহ এ দু' গোত্র ছিল আওস গোত্রের মিত্র। আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে কঠিন বিরোধ ছিল। মধ্যযুগে তাদের মধ্যে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ তাদের মধ্যে 'বুয়াসের' যুদ্ধ হয়েছিল। তার কিছু ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া তখনও তাদের মধ্যে চলমান ছিল।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মহান কৌশল তার সুন্দর কুটনীতি দ্বারা এই সমস্ত সমস্যা সুন্দর ও স্থায়ীভাবে সমাধান করতে লাগলেন। এই সমস্ত অবস্থার সমাধান ও সংশোধন এবং মুসলমানদের চিন্তা চেতনা একত্রিত করার কার্যক্রম ছিল এ রকমঃ
১- মসজিদ তৈরী এবং সেখানে একত্রিত হওয়াঃ
এই প্রথম কাজটি পরস্পরবিরোধী অন্তরগুলোকে একত্রিত করে দিল। সংশোধন এবং ঐক্য স্থাপনের ব্যাপারে প্রথম কাজ করলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এবং সকল মুসলমান তা নির্মাণের কাজে অংশ গ্রহণ করল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন তাদের ইমাম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এটাই ছিল প্রথম সেবা ও সহযোগিতা মূলক কাজ যা সমস্ত অন্তরকে এক সুতোয় গেঁথে দিল। এবং কর্মের সাধারণ লক্ষ্য স্পষ্ট করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমণের পূর্বে প্রত্যেক গোত্রে লোকদের মিলিত হওয়ার জন্য জন্য আলাদা এক একটি নির্দিষ্ট স্থান ছিল। তারা সেখানে রাত্রে বসে গল্প করত। রাতে জাগ্রত থাকত। কবিতা পাঠ করত। আর এ অবস্থা তাদের অনৈক্যেরই প্রমাণ ছিল ও অনৈক্য বিস্তারে সহায়ক ছিল। যখন মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হল, তখন তা সমস্ত مسلمانوں কেন্দ্র হয়ে গেল ও তাদের সমবেত হওয়ার স্থান হিসেবে গণ্য হল।
সব সময় তারা সেখানে সমবেত হত। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করত। তিনি তাদেরকে শিক্ষা দিতেন, পথ প্রদর্শন করতেন, দিক নির্দেশনা দিতেন।
এর মাধ্যমে সমস্ত আলাদা বৈঠকস্থলগুলো এক হয়ে গেল। সমস্ত মহল্লা এক জায়গায় চলে আসল। গোত্রগুলো কাছাকাছি আসল। উপদলগুলো ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হল। অনৈক্য ঐক্যের দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে গেল। মদীনায় কোন একাধিক দল থাকল না। বরং সকল দল একটি দলে পরিণত হল। অনেক নেতা থাকল না। বরং নেতা এজনই হয়ে গেল। তিনি হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি তার প্রভুর নিকট থেকে আদেশ নিষেধ প্রাপ্ত হন, এবং তার উম্মতকে শিক্ষা দেন। মুসলমানরা এক কাতারের ন্যায় হয়ে গেল। সমস্ত সত্তা ও চিন্তা-চেতনার পথগুলো মিলে গেল একটি মোহনায়। তাদের ঐক্য শক্তিশালী হল। আত্মাগুলো শক্তিশালী বন্ধনে আবদ্ধ হল। শরীরগুলো একে অপরকে সাহায্য করল।'
মসজিদ শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জায়গা ছিল না, বরং সেটি ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়। মুসলমানরা সেখানে ইসলামের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতো। সেখানে একত্রিত হতো, বিভিন্ন গোত্রের লোকজন পরস্পরে মিলিত হতো। যদিও জাহেলী যুগের যুদ্ধ বিগ্রহ, ঝগড়া তাদের মাধ্যে অনেকদিন পর্যন্ত ঘৃণার পরিবেশ তৈরী করে রেখেছিল। মসজিদকে তারা ঘাটি বানিয়ে নিয়েছিল সমস্ত কাজ পরিচালনার জন্য। সেখান থেকেই সব বিষয় প্রচার করা হত। পরামর্শ মূলক ও সিদ্ধান্তমূলক কাজের বৈঠকের স্থান ছিল মসজিদ।
এই জন্যই মদীনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানেই অবস্থান করেছেন, প্রথমে সেখানে মসজিদ তৈরী করছেন। যেখানে মু'মিনগন একত্রিত হবে। যখন কুবায় অবস্থান করেছেন সেখানে মসজিদ বানিয়েছেন। জুমার নামাজ আদায় করেছেন বনী সালেম বিন আউফে, যা কুবা ও মদীনার মধ্যখানে নিচু জাগায় (রানুনা) নামক স্থানে অবস্থিত। মদীনায় পৌঁছে প্রথমে মসজিদ তৈরী করলেন।
২- ইহুদীদেরকে প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা দ্বারা ইসলামের দাওয়াত দিলেন
সংস্কার ও ঐক্যের ঘাটি থেকে-যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় প্রবেশ করার পর বিণির্মান করেছিলেন- ইহুদীদের সাথে আব্দুল্লাহ বিন সাল্লামের মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করলেন এবং তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন।
আনাস রা. বর্ণনা করেন, 'আব্দুল্লাহ বিন সাল্লামের কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আসার সংবাদ পৌঁছল। তিনি রাসুলের নিকট এসে বললেন, 'আমি আপনাকে তিনটি বিষয়ে প্রশ্ন করতে চাই। যার উত্তর নবী ব্যতীত আর কেউ দিতে পারবে না। কেয়ামতের প্রথম নিদর্শন কি? জান্নাতবাসী প্রথমে কি খাবার খাবেন? সন্তান কেন তার পিতা অথবা মাতার মত হয়ে থাকে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এ প্রশ্নগুলি সম্পর্কে এখনই জিবরীল আমাকে সংবাদ দিয়েছেন।' ইবনে সাল্লাম বললেন, 'ফেরেশতাদের মধ্যে ইনিই তো ইহুদীদের শত্রু।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কেয়ামতের প্রথম আলামত হল, আগুন আসবে এবং পূর্ব পশ্চিমের মানুষকে একত্রিত করবে। প্রথম খাদ্য যা জান্নাতবাসীরা গ্রহণ করবে তা হল মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ। আর সন্তান পিতা বা মাতার মত এই কারণে যে, পুরুষ যখন নারীর সাথে মিলিত হয় কখনও পুরুষের বীর্য আগে প্রবেশ করে, তখন সন্তান তার মত আকৃতি ধারণ করে। আর যদি নারীর বীর্য আগে প্রবেশ করে তবে সন্তান তার আকৃতি ধারণ করে।'
আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসুল।' তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! ইহুদীরা মিথ্যারোপকারী জাতি। আপনি তাদেরকে আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করার পূবে যদি তারা আমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে জানতে পারে তা হলে আপনার নিকট আমার সম্পর্কে মিথ্যা বলবে।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ডেকে পাঠালেন, তারা রাসুলের নিকট আসল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, 'হে ইহুদী জাতি! তোমাদের ধংস হোক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। ঐ আল্লাহর শপথ যিনি ব্যতীত আর কোন মাবুদ নেই। তোমরা জান আমি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমি তোমাদের কাছে সত্য নিয়ে এসেছি। তোমরা ইসলামে প্রবেশ কর।' তারা বলল, 'এ সম্পর্কে আমরা কিছু জানিনা।' এ কথা তারা তিনবার বলল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, 'আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম তোমাদের মধ্যে কেমন লোক? তারা বলল, 'সে তো আমাদের নেতা। আমাদের নেতার সন্তান। আমাদের মধ্যে বড় আলেম-বিদ্বান। আমাদের বড় আলেমের সন্তান।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'সে ইসলাম গ্রহণ করলে তোমরা কি করবে?' তারা বলল, 'আল্লাহর আশ্রয়! সে ইসলাম গ্রহণ করতে পারে না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, 'সে ইসলাম গ্রহণ করলে তোমরা কি করবে?' তারা বলল, 'আল্লাহর আশ্রয়! সে ইসলাম গ্রহণ করতে পারে না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, 'সে ইসলাম গ্রহণ করলে তোমরা কি করবে?' তারা বলল, 'আল্লাহর আশ্রয়! সে ইসলাম গ্রহণ করতে পারে না।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে ইবনে সাল্লাম! তাদের সামনে বের হও?' ইবনে সাল্লাম বের হয়ে বললেন, 'হে ইহুদী সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। ঐ আল্লাহর শপথ যিনি ব্যতীত আর কোন মাবুদ নেই, তোমরা জান তিনি আল্লাহর রাসুল, তিনি সত্য নিয়ে এসেছেন। তারা সকলে বলল, 'তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তির ছেলে।' এবং তারা সকলে তার উপর আঘাত করল।
এটাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইহুদীদের নিকট থেকে সর্বপ্রথম অভিজ্ঞতা যা তিনি অর্জন করেছিলেন মদীনায় প্রবেশ করার পর।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্দর কৌশল এর মধ্য থেকে একটি হল, তিনি আব্দুল্লাহ বিন সাল্লামের ইসলামের বিষয়টি গোপন করার বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। সাথে সাথে তাদের মধ্যে তার মর্যাদার বিষয়ে প্রশ্ন করে জেনে নিলেন। যখন তারা তার প্রশংসা করল, ও তার মর্যাদা উচ্চ করে তুলে ধরল। তখনই রাসুল তাকে বের হতে নির্দেশ দিলেন। তিনি বের হলেন, ও ইসলাম প্রকাশ করলেন, এবং ইহুদীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সত্যতার ব্যাপারে যা গোপন করত তা প্রকাশ করে দিলেন। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ঐ অঙ্গীকারে আবদ্ধ করলেন যা পরবর্তীতে আলোচনায় আসবে।
৩- মুহাজের ও আনছারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সৃষ্টি করাঃ
যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মসজিদ নির্মাণ ও ইহুদীদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার মাধ্যমে শুরু করলেন তার কর্মতৎপরতা। অনুরূপভাবে মুহাজের ও আনছারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করলেন। আর এটাই হল নবুওয়তী উৎকর্ষতা, সৎপথ প্রদর্শন, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও মুহাম্মাদী প্রজ্ঞা।
তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব তৈরী করলেন আনাস বিন মালেক রা. এর ঘরে। তারা নব্বই জন ছিলেন। অর্ধেক মুহাজের, অর্ধেক আনছার। তাদের মধ্যে সহমর্মিতার বন্ধন সৃষ্টি করলেন, মৃত্যুর পর নিকট আত্মীয় না হওয়া সত্বেও পরস্পরে একে অন্যের উত্তরাধিকারী হবেন। এ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের এ নিয়ম চলতে থাকে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত। যখন আয়াত অবতীর্ণ হলঃ
وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ (الأنفال ٧٥)
"এবং আল্লাহর বিধানে আত্মীয়গণ একে অন্যের অপেক্ষা অধিক হকদার।”
তখন থেকে শুধু আত্মীয়তার ভিত্তিতে উত্তরাধিকার ফিরে আসল। ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের কারণে উত্তরাধিকার রহিত হয়ে গেল।
জাহেলী যুগের স্বজনপ্রীতি ধুয়ে মুছে গেল। শুধু ইসলামের বিধান অবশিষ্ট রইল। বংশ, বর্ণ এবং ও জাতিভেদের পার্থক্য দূর হয়ে গেল। কেহ সামনে বা পিছনে যেতে পারবে না মানুষত্ব ও তাকওয়া ব্যতীত। ভ্রাতৃত্ব, কুরবানী ও সহমর্মিতার অনুভূতিই সেখানে ছিল মুখ্য। এই ভ্রাতৃত্বের মধ্যে পরস্পরের ভালোবাসা ছিল। নতুন এই সমাজ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণে পরিপূর্ণ ছিল। আর এই ভ্রাতৃত্বের মধ্যে ইসলামের মানবিক এবং চারিত্রিক ইনসাফের শক্তিশালী রূপ ফুটে উঠেছে।
আর এই ভ্রতৃত্ব এমন অঙ্গীকার ছিল না যা শুধু কাগজে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। এমন কথাও ছিল না যা শুধু মুখে বলা হয়েছে। বরং এমনই এক ভ্রতৃত্ব ছিল যা অন্তরের পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছিল। তার প্রয়োগ হয়েছে রক্ত ও সম্পদের মাধ্যমে। শুধু মুখের কথা নয়। কথা ও কাজ, জান ও মাল, সুখ ও দুঃখের ভ্রাতৃত্ব ছিল এটি।
এই বিষয়ের উত্তম উদাহরণ ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. ও সাআদ বিন রবিইর রা. মধ্যে ভাইয়ের সম্পর্ক গড়ে দিলেন। সাআদ বললেন, 'আনছাররা জানে যে, আমি তাদের মধ্যে বেশি ধনী। আমি আমার সম্পদ দুই ভাগে ভাগ করব। অর্ধেক থাকবে আমার, আর অর্ধেক তোমার। আমার দুইজন স্ত্রী আছে। তোমার কাছে যাকে বেশি পছন্দ হয় তাকে নিয়ে নাও। আমি তাকে তালাক দিব। যখন তার তালাকের ইদ্দত পূর্ণ হয়ে যাবে, তুমি তাকে বিবাহ করবে। আব্দুর রহমান বিন আওফ রা. বললেন, 'আল্লাহ তোমার সম্পদে ও সন্তান সন্ততিতে বরকত দান করুন। তোমাদের বাজার কোথায়?' তারা তাকে বনু কায়নুকার বাজার দেখিয়ে দিল। তিনি বাজার থেকে ফিরলেন। তার হাতে পনির ও মাখনের কিছু অংশ ছিল। পরের দিনও তাই করলেন। এভাবে কাজ করতে থাকলেন। অতঃপর একদিন তার শরীরে মেহেদীর রং দেখা গেল। তা দেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেন, 'তোমার কি অবস্থা?' তিনি বললেন, 'আমি আনছারদের এক মহিলাকে বিবাহ করেছি।' রাসুল বললেন, 'মহরানা কি দিয়েছো?' তিনি বললেন, 'খেজুরের দানার ওজন পরিমান স্বর্ণ বা খেজুরের দানা পরিমান স্বর্ণ।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'অলীমা (ভৌভাতের) আয়োজন কর, একটি ছাগল দিয়ে হলেও।'
এ ভ্রাতৃত্ব ছিল একটি কল্যাণকর কৌশল এবং সঠিক কুটনীতি। এবং অনেকগুলো সমস্যা মুসলমানরা যার সম্মুখীন হচ্ছিল তার সুন্দর সমাধান ছিল এ ভ্রাতৃত্ববন্ধন।
৪- বিচক্ষণ শিক্ষা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা, আত্মশুদ্ধির বিষয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ করেছিলেন। সুন্দর চরিত্রের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করছিলেন। তাদেরকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিচ্ছিলেন ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ, ইজ্জত, সম্মান, ইবাদত, ও আনুগত্যের বিষয়ে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, 'হে মানবমন্ডলী! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, লোকদেরকে খাবার দাও, এবং রাত্রিতে নামাজ পড় যখন মানুষেরা ঘুমে থাকে, তাহলে জান্নাতে নিরাপদে প্রবেশ করতে পারবে।'
তিনি আরো বলেন, 'যার প্রতিবেশী তার কষ্ট থেকে নিরাপদে থাকবে না সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।'
'প্রকৃত মুসলমান সেই যার জিহবা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে।'
তিনি আরো বলেন, 'তোমাদের কেহ ততক্ষণ পর্যন্ত মু'মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার নিজের জন্য যা পছন্দ করবে তা তার ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করবে।'
তিনি বলেন, 'একজন মু'মিন আর একজন মু'মিনের জন্য প্রসাদের ন্যায় যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।' এ কথা বলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতের আঙ্গুলীসমূহ একটি অপরটির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখিয়ে দিলেন।
তিনি বলেন, 'তোমরা পরস্পরে হিংসা করো না, গুপ্তচরবৃত্তি করো না, পরস্পরে শত্রুতায় লিপ্ত হয়ো না, একে অন্যের পিছনে লেগে থাকবে না, একে অপরের বেচাকেনার উপর বেচাকেনা করো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে সকলে ভাই ভাই হয়ে যাও। মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তাকে অত্যাচার করবে না। সে তাকে শত্রুর হাতে অর্পণ করবে না। সে তাকে তুচ্ছ করবে না। তাকওয়া এখানেই,'- এ কথা বলে বুকের দিকে তিনবার ইশারা করলেন- কোন লোকের নিকৃষ্ট হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলমান ভাইকে অপমান করবে। প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত অন্য মুসলমানের জন্য নিষিদ্ধ হল। এমনিভাবে নিষিদ্ধ হল তার সম্পদ।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'কোন মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাইয়ের সাথে তিন রাতের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকবে। এটাও বৈধ নয়, যখন সাক্ষাত ঘটবে সে মুখ ফিরিয়ে নেবে বা অন্যজন মুখ ফিরিয়ে নেবে। তাদের দু'জনের মধ্যে সেই উত্তম যে প্রথম সালাম দেবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সোমবার বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজাগুলো খোলা হয়, যারা আল্লাহর সাথে শরীক করে না তাদের সকলকে আল্লাহ মাফ করে দেন। কিন্তু তাকে আল্লাহ মাফ করেন না, যার ভাইয়ের সাথে তার বিবাদ আছে। বলা হয়, এই দু'জনকে অবকাশ দাও, যেন সংশোধিত হয়ে যায়। এই দু'জনকে অবকাশ দাও, যেন সংশোধিত হয়ে যায়। এই দু'জনকে অবকাশ দাও, যেন সংশোধিত হয়ে যায়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমল সমূহকে পেশ করা হয় প্রত্যেক বৃহস্পতি ও সোমবার। সেদিন আল্লাহ ঐ সকল ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন যারা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করে না। কিন্তু কোন ব্যক্তির যদি তার ভাইয়ের সাথে হিংসা থাকে, তখন বলা হবে এ দুজনকে সংশোধিত হওয়া পর্যন্ত দূরে রাখ। এ দুজনকে সংশোধিত হওয়া পর্যন্ত দূরে রাখ।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমার ভাইকে সাহায্য কর। হোক সে অত্যাচারী বা অত্যাচারিত।' অনেকে প্রশ্ন করল, 'হে আল্লাহর রাসুল! একে অত্যাচারিত অবস্থায় সাহায্য করব এটা আমরা বুঝলাম। কিন্তু অত্যাচারী অবস্থায় কিভাবে সাহায্য করব?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাকে অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে রাখবে, এটাই তার সাহায্য।'
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'মুসলমানের উপর মুসলমানের ছয়টি অধিকার রয়েছে।' প্রশ্ন করা হল, 'হে আল্লাহর রাসুল সেগুলো কি?' তিনি বললেন, 'সাক্ষাতে তাকে সালাম দেবে, দাওয়াত দিলে গ্রহণ করবে, উপদেশ চাইলে উপদেশ দেবে, হাঁচি দেয়ার পর আলহামদু লিল্লাহ বললে তুমি তার উত্তর দেবে, অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাবে।'
বারা ইবনে আযেব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাতটি বিষয় গ্রহণ এবং সাতটি বিষয় বর্জনের আদেশ করেছেন। আদেশ করেছেনঃ রোগীর সেবা, জানাযায় অংশ গ্রহণ, হাঁচি দাতা আলহামদুলিল্লাহ বললে তার উত্তর প্রদান, নিমন্ত্রণকারীর নিমন্ত্রণ গ্রহণ, সালামের প্রসার, অত্যাচারিতের সাহায্য ও শপথকারীকে দায়মুক্ত করার। এবং নিষেধ করেছেন, স্বর্ণের আংটি ব্যবহার, স্বর্ণের পাত্রে আহার, উটের হাওদায় রেশম বা সিল্ক ব্যবহার, কাপড়ে সিল্কের কারুকাজ, সিল্কের পোষাক পরিধান, দীবাজ, এবং ইস্তিবরাক থেকে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, 'তোমারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমানদার হবে। আর ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি? তোমাদের এমন বস্তুর দিকে পথ নির্দেশ করব না যা করলে তোমাদের পরস্পররের ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? তাহল, তোমাদের মাঝে সালামের প্রসার কর।'
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ইসলামে কোন কাজটি উত্তম? বললেন, 'খাদ্য দান এবং পরিচিত ও অপরিচিত সবাইকে সালাম দেয়া।'
তিনি আরো বলছেন, 'মু'মিনগণের পরস্পরের বন্ধুত্ব, সহানুভূতি, সহমর্মিতার উদাহরণ হল একটি দেহের মত। যদি এর কোন একটি অঙ্গ অসুস্থ হয়ে যায় তা হলে তা পুরো শরীরে নিদ্রাহীনতা ও জ্বরের ন্যায় অনুভূত হয়।'
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে রহম বা অনুগ্রহ করে না সে অনুগ্রহ পায় না।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামআরো বলেন, 'যে মানুষের প্রতি দয়া করেনা আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, 'মুসলমানকে গালি দেওয়া হল পাপ কাজ, তাকে হত্যা করা কুফরী।'
আনসারদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এ সকল বাণী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি পৌঁছে থাক বা এর কিছু হিজরতের পূর্বে যে সব মুহাজির নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শ্রবণ করেছেন তাদের কাছ থেকে শ্রবণ করুক। এ সবই তার পক্ষ হতে সকল সাহাবীদের জন্য শিক্ষা। এবং কেয়ামত অবধি যার কাছেই এ উদ্ধৃতি পৌঁছবে তাও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বলে বিবেচিত হবে।
অনুরূপ তার আরো অনেক বাণী যা দ্বারা তিনি সাহাবীদের শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন তিনি তাদের দান করার প্রতি উৎসাহ দিতেন, দানের ফযিলত বর্ণনা করতেন যা তাদের হৃদয় মনকে আকৃষ্ট করতো। ভিক্ষাবৃত্তি নিষেধ করতেন, ধৈর্যের গুণ ও অল্পে তুষ্ট থাকার জন্য বলতেন। তাদের ইবাদতের প্রতি আগ্রহী করে তুলতেন; যাতে রয়েছে অনেক ফযিলত, সওয়াব, পুরস্কার এবং তাদেরকে অহীর সাথে নিবিড় সম্পর্ক করে দিতেন। তিনি তাদের পাঠ করে শুনাতেন। তারা ও তাকে পাঠ করে শুনাতো। এ সকলই ছিল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অবর্তমানে এগুলো হল দাঈ ও আলেম-উলামাদের দায়িত্ব। এমনিভাবে তিনি তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়কে উন্নত করেছেন। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন সুউচ্চ মূল্যবোধ। এতে করে তারা উপনীত হয়েছিলেন মানবীয় গুণাবলির সর্বোচ্চ শিখরে।
ফলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষে সম্ভব হয়ে ছিল উন্নত ও আল্লাহ-ভীরু একটি ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ যা ইতিহাসে সুপরিচিতি লাভ করেছিল। এবং যে সমাজ পতিত ছিল বর্বরতা, মূর্খতা ও কুসংস্কারের গহীন অন্ধকারে সে সমাজ পেয়েছিল তার থেকে একটি সমাধান। অতঃপর তা পরিণত হয়েছিল এমন এক সমাজে যা মানবীয় সকল গুণাবলির দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছিল। আর এটা সম্ভব হয়েছিল একমাত্র আল্লাহর রহমতে তারপরে এ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুগ্রহে। তাই আল্লাহর দিকে আহবানকারীদের কর্তব্য হল তারা তার পথ অনুসরণ করবে, এবং তার দেখানো পথেই তারা হেদায়েত অনুসন্ধান করবে।'
৫- মুহাজির ও আনসারদের প্রতিজ্ঞা এবং ইহুদীদের সন্ধি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর একটি চুক্তি সম্পাদন করেন যার মাধ্যমে জাহেলী শেওলা এবং গোত্রীয় ঝগড়া- বিবাদ বন্ধ হয়। জাহেলী তাকলীদ বা অন্ধানুকরণ করার আর কোন অবকাশ রইল না। এবং পরস্পরের এ চুক্তির মধ্যে, মুহাজির ও আনসারদের জন্য মদীনায় অবস্থানরত ইহুদীদের প্রতি সংহতি প্রদর্শনের অঙ্গীকারও ছিল। এ চুক্তি ও অঙ্গীকার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষে সমাজ সংস্কার এবং সমাজ বিনির্মাণে এক উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা। যা বিশ্বের ইতিহাসে 'মদীনা সনদ' নামে পরিচিত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির ও আনসারদের মাঝে একটি চুক্তি করলেন। তাতে ইহুদীদের সাথেও শত্রুতা ছেড়ে সন্ধি করা হয়েছিল। ইহুদীদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। তাদের সম্পদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল এবং উভয় পক্ষের কল্যাণে কতিপয় শর্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।'
এ অঙ্গীকার ছিল বিচক্ষণ ও শ্রেষ্ঠ রাজনীতির পরিচায়ক এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে পূর্ণ এক বিজ্ঞানময় সিদ্ধান্ত। যা মদীনার সকল মুসলিম ও ইহুদীদের একত্র করেছিল। তারা একটি জোটে পরিণত হয়েছিল। মদীনার উপর আক্রমনকারী যে কোন শত্রুর মোকাবেলায় দাঁড়াতে তারা সক্ষম ছিল।
এ পাঁচটি পরিকল্পনা: মসজিদ নির্মাণ, ইসলামের দিকে ইহুদীদেরকে আহবান, মুমিনদের পরস্পর ভ্রাতৃত্ব, তাদের প্রশিক্ষণ ও চুক্তি সম্পাদন।
এ পরিকল্পনার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর অনুগ্রহে সমাধান করেছিলেন মদীনায় বসবাসরত জনগোষ্ঠীর একটি তিক্ত বিরোধের। এবং প্রাচীন সকল প্রভাব, বিবাদ অপসারণ করেছেন। মুসলমানের হৃদয়ে মিলন সৃষ্টি করেছেন এবং এ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে মদীনায় নিখুত একটি শাসন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। অতঃপর এ শাসনব্যবস্থা এবং আল্লাহর দিকে আহবান মদীনা হতে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল।'
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
রাসূলুল্লাহর ভাষা অলংকার
জুবায়ের বিন মুতয়িম রা. যা বলেছেন তাতে কুরআনুল কারীম মানব মনকে প্রভাবান্বিত করে বলে প্রমাণ মিলে। তিনি বলেছেন, 'আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাগরিবের সালাতে সূরা আত-তুর পাঠ করতে শুনেছি, যখন তিনি এ আয়াতে পৌঁছলেন
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الخَالِقُونَ ﴿٣٥﴾ أَمْ خَلَقُوا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بَل لَا يُوقِنُونَ ﴿٣٦﴾ أَمْ عِنْدَهُمْ خَزَائِنُ رَبِّكَ أَمْ هُمُ المُسَيْطِرُونَ ۳۷ سورة الطور
(তারা কি কোন কিছু ব্যতীত সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? নাকি তারা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? বরং তারা তো বিশ্বাস করে না। তোমার প্রতিপালকের ভান্ডার কি তাদের নিকট রয়েছে, না তারা এ সমুদয়ের নিয়ন্ত্রক?)'
তখন আমার মনটা উড়াল দেয়ার উপক্রম হয়েছিল। এটা আমার হৃদয়ে ঈমানের প্রথম প্রবেশ।'
কুরআন যেমন মানুষের মনকে প্রভাবান্বিত করে তেমনি ভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসও মানব মনে প্রভাব ফেলে। কারণ এটা হচ্ছে দ্বিতীয় অহী। এটা মানব মনকে প্রভাবান্বিত করবেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী এবং তার ভাষা-অলঙ্কার মানব মনকে যে কিভাবে প্রভাবিত করে এর কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হল:
প্রথম দৃষ্টান্ত: দিমাদ রা. এর ঘটনা
দিমাদ রা. যখন মক্কায় আগমন করলো - সে জিন তাড়ানোর ঝাড় ফুঁক করতো। সে শুনতে পেল মক্কাবাসী বলছে মুহাম্মাদ পাগল। তিনি বললেন যদি আমি এ ব্যক্তিকে পেতাম হয়তবা আল্লাহ তাকে আমার হাতে সুস্থতা দান করতেন। অতঃপর বলল 'হে মুহাম্মদ আমি এ ধরণের বাতাসের চিকিৎসা করে থাকি। আর আল্লাহ আমার হাতে যাকে ইচ্ছা সুস্থতা দান করেন, তোমার প্রয়োজন আছে কি আমার চিকিৎসা নেয়ার?' নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
إن الحمد لله، نحمده ونستعينه، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادي له، وأشهد أن لا أله إلا الله وحده لا شريك له، وأن محمداً عبده ورسوله. أما بعد
'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তার প্রশংসা করছি। তার নিকট আমরা সাহায্য কামনা করছি। যাকে আল্লাহ হেদায়েত দেন তাকে পথভ্রষ্টকারী কেউ নেই। এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে হেদায়েত দানকারী কেউ নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল।' অতঃপর দিমাদ বললো, 'আপনার এ বাক্যগুলো আবার বলুন', রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার বললেন। অতঃপর দিমাদ রা. বললো, আমি গনকের কথা শুনেছি। যাদুকরের কথা শুনেছি। শনেছি কবিদের কথাও কিন্তু এ ধরণের বাক্য কখনো শুনেনি। এ বাক্যগুলো অতল সমুদ্রে গিয়ে পৌঁছেছে।' এরপর বললো, 'আপনার হাত প্রসারিত করুন। আপনার হাতে ইসলামের শপথ নেব।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার গোত্রের পক্ষে শপথ নেবে না?' সে বলল, 'আমার গোত্রের পক্ষেও।'
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: তোফায়েল বিন আমর রা. এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাষা-অলঙ্কার বিষয়ে একটি ঘটনা
তোফায়েল বিন আমর রা. এর থেকে জানা যায়। সে ছিল কবি ও গোত্র প্রধান। মক্কায় আগমন করলে কুরাইশের লোকেরা তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ বিষয় ভীতি প্রদর্শন করলো। তাকে বলল, মুহাম্মাদের কথাগুলো যাদুর মত। তার থেকে সাবধান থেকো। যেন সে তোমার এবং গোত্রের মধ্যে তার কথা প্রবেশ করাতে না পারে। যেমন আমাদের মাঝে করেছে। সে স্বামী স্ত্রীর মাঝে, পিতা পুত্রের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করে থাকে। এভাবে তারা তাকে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকলো। তাদের এ প্রচারে প্রভাবিত হয়ে সে শপথ করল, কানে তুলা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করবে। প্রবেশ করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্পর্কে কথাগুলো তাকে ভাবিয়ে তুললো। মনে মনে বললো, আমি একজন সাহসী ও স্থির মানুষ। আমার কাছে তো বিষয়টি অস্পষ্ট থাকবে না। ভাল হোক বা মন্দ হোক। অবশ্যই আমি তার কাছ থেকে শুনবো। যদি বিষয় সঠিক হয় গ্রহণ করব। ভাল না লাগলে প্রত্যাখ্যান করব। এরপর কান থেকে তুলা ফেলে দিল। এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী শুনলো। বলল, 'এর চেয়ে সুন্দর কথা জীবনে আর শুনতে পাইনি।' সে রাসূলের সাথে তার বাড়ি গেল এবং তাকে সব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে অবগত করালো। এবং বললো, 'আপনার ধর্ম আমার কাছে পেশ করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেশ করলেন। সে ইসলাম গ্রহণ করল।
তাই যারা আল্লাহর পথে আহবান করে তাদের কর্তব্য হল মানুষকে ইসলামের দিকে আহবানে কুরআন এবং হাদীসের প্রতি লক্ষ্য রাখা।
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
মুজিযা-অলৌকিকতা
জ্ঞান ও যুক্তির দাবী হল, ইহুদী খৃষ্টান এবং অন্যান্য কাফেরদের ইসলামে দাওয়াত কালে নিজ নবুওয়াতের দলীল এবং অকাট্য প্রমাণাদি তাদের কাছে বর্ণনা করা। যাতে তার রিসালত যে সকল মানুষের জন্য, এ বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যায়।
এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে তার নবুওয়াত এবং রিসালাতের সামগ্রিকতার দলীল- প্রমাণ ও নিদর্শন অনেক। যা গনণা করে শেষ করা যাবে না।
তবে সকল প্রকার প্রমাণাদি ও নিদর্শন দুটি প্রকারে সীমাবদ্ধ করা যায়:
(ক) সে সব মুজিযা বা অলৌকিকত্ব অতীতে ঘটেছে এবং বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে জানা গেছে যেমন, মুসা ও ঈসা আ. এর মুজিযা।
(খ) সে সকল মুজিযা কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যেমন আল- কুরআন, ইলম, ঈমান। এগুলো তার নবুওয়তের নিদর্শন। এমনিভাবে তার আনীত শরীয়ত, নিদর্শনাবলী, যা আল্লাহ কোন কোন সময় তার উম্মতের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। দলীল প্রমাণের মাধ্যমে তার ধর্মের আত্মপ্রকাশ করা। এবং তার পূর্বেকার কিতাবে তার গুণাবলি উল্লেখ থাকা ইত্যাদি।' এ সকল মুজিযা অনেক ব্যাপক-বিস্তৃত যা গণনা করা সম্ভব নয়। তবে তার নবুওয়াত প্রমাণ করা ও তার রিসালাতের সামগ্রিকতার কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করব।
প্রথম বিষয়: আল-কুরআনের মুজিযাসমূহ
দ্বিতীয় বিষয়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রকাশিত দৃশ্যমান মুজিযাসমূহ
প্রথম বিষয়: কুরআনের মুজিযা যা দিয়ে চ্যালেঞ্জের সময় বিরোধী পক্ষ পরাজিত হয়।
এ হল এক অলৌকিক বস্তু যা মানুষ ব্যক্তিগত এবং দলীয় উভয়ভাবে কুরআনের সাদৃশ্য গ্রন্থ বা সূরা রচনায় অক্ষম হয়েছে। এ মুজিযা আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির হাতেই দিয়ে থাকেন যাকে আল্লাহ নবুওয়ত ও রিসালাতের জন্য নির্বাচন করেন। তার সত্যতা এবং তার রিসালাতের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অবর্তীর্ণ কুরআন- আল্লাহর কালাম বা বাণী। এটা অনেক বড় মুজিযা। যা সকল কালে, সকল যুগে অব্যাহত থাকবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য মুজিযা হয়ে থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সকল নবী কে সেই পরিমাণ নিদর্শন দেয়া হয়েছে যা তার উপর ঈমান আনায়নকারীর জন্য পর্যাপ্ত হয়। আমি প্রাপ্ত হয়েছি অহী যা আল্লাহ আমার কাছে প্রেরণ করেছেন। আমি আশাবাদী, অনুসারীর দিক দিয়ে কেয়ামতে আমি তাদের সকলে চেয়ে শ্রেষ্ঠ হব।
এ কথা দ্বারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুজিযা শুধু কুরআনে সীমাবদ্ধ করা উদ্দেশ্য নয়। এটাও বলা উদ্দেশ্য নয় যে, তিনি কোন দৃশ্যমান মুজিযা নিয়ে আসেননি। বরং উদ্দেশ্য হল কুরআন হচ্ছে বড় মুজিযা যা বিশেষভাবে আল্লাহ তাআলা এ রাসূলের জন্যই নির্ধারণ করেছেন। কারণ প্রত্যেক নবীকে নির্দিষ্ট মুজিযা প্রদান করা হয়েছে যা দিয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ করেন তার জাতিকে। প্রত্যেক নবীর মুজিযা তার জাতির অবস্থার সাথে সঙ্গতি পূর্ণ হয়ে থাকে। তাইতো দেখা যায় ফেরাআউনের সময়ে যাদুর ব্যাপক প্রচলন থাকায় মুসা আলাইহিস সালাম তার নিকট লাঠি নিয়ে আগমন করেন। লাঠি দিয়ে এমন কাজই করলেন যা যাদুকররা করত। এর মাধ্যমে তিনি যাদুকরদের পরাজিত করলেন। কিন্তু মুজিযার এ পদ্ধতি অন্য নবীদের বেলায় ব্যবহৃত হয়নি।
ঈসা আ. এর যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির যুগ ছিল। তখন ঈসা আ. আগমন করলেন এমন মুজিযা নিয়ে আসলেন, যা সকল ডাক্তার ও চিকিৎসককে অক্ষম বানিয়ে দিল। যেমন মৃতকে জীবিত করা, শ্বেতী রোগ ভাল করা, কুষ্ঠ রোগ নিরাময় করা। তখনকার চিকিৎসা-বিজ্ঞান ও চিকিৎসকরা ঈসা আ. এর কাছে পরাজিত হল।
টিকাঃ
১ সহীহ আল - বুখারী ৩৩২৯ শব্দ সহীহ আল - বুখারীর তিন অধ্যায় থেকে আল-বিদায়া ওয়ান- নিহায়া ৩য় খন্ড ২১০ পূঃ
২ 'হাজাল হাবিব ইয়া মুহিব ১৭৮ পৃঃ
৩ সুরা আল-আনফাল ৭৫ * যাদুল মাআদ ৩য় খন্ড ৬৩পৃঃ, আর-রহীকুল মাখতুম ১৮০ পৃঃ * তারিখে ইসলামী মাহমুদ সাকের ২য় খন্ড ১৬৫, ফিকহুস সীরাহ ১৯২ পৃঃ
৪ আল জাওয়াবুস সাহীহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ। ১/১৪৪,১৬৬। ৫ সূরা আল-আরাফ১৫৮। * সূরা আল-ফুরকান ০১।
📄 যুলিয়া-অলৌকিকতা
জ্ঞান ও যুক্তির দাবী হল, ইহুদী খৃষ্টান এবং অন্যান্য কাফেরদের ইসলামে দাওয়াত কালে নিজ নবুওয়াতের দলীল এবং অকাট্য প্রমাণাদি তাদের কাছে বর্ণনা করা। যাতে তার রিসালত যে সকল মানুষের জন্য, এ বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যায়।
এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে তার নবুওয়াত এবং রিসালাতের সামগ্রিকতার দলীল- প্রমাণ ও নিদর্শন অনেক। যা গনণা করে শেষ করা যাবে না।
তবে সকল প্রকার প্রমাণাদি ও নিদর্শন দুটি প্রকারে সীমাবদ্ধ করা যায়:
(ক) সে সব মুজিযা বা অলৌকিকত্ব অতীতে ঘটেছে এবং বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে জানা গেছে যেমন, মুসা ও ঈসা আ. এর মুজিযা।
(খ) সে সকল মুজিযা কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যেমন আল- কুরআন, ইলম, ঈমান। এগুলো তার নবুওয়তের নিদর্শন। এমনিভাবে তার আনীত শরীয়ত, নিদর্শনাবলী, যা আল্লাহ কোন কোন সময় তার উম্মতের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। দলীল প্রমাণের মাধ্যমে তার ধর্মের আত্মপ্রকাশ করা। এবং তার পূর্বেকার কিতাবে তার গুণাবলি উল্লেখ থাকা ইত্যাদি।' এ সকল মুজিযা অনেক ব্যাপক-বিস্তৃত যা গণনা করা সম্ভব নয়। তবে তার নবুওয়াত প্রমাণ করা ও তার রিসালাতের সামগ্রিকতার কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করব।
প্রথম বিষয়: আল-কুরআনের মুজিযাসমূহ
দ্বিতীয় বিষয়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রকাশিত দৃশ্যমান মুজিযাসমূহ
প্রথম বিষয়: কুরআনের মুজিযা যা দিয়ে চ্যালেঞ্জের সময় বিরোধী পক্ষ পরাজিত হয়।
এ হল এক অলৌকিক বস্তু যা মানুষ ব্যক্তিগত এবং দলীয় উভয়ভাবে কুরআনের সাদৃশ্য গ্রন্থ বা সূরা রচনায় অক্ষম হয়েছে। এ মুজিযা আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির হাতেই দিয়ে থাকেন যাকে আল্লাহ নবুওয়ত ও রিসালাতের জন্য নির্বাচন করেন। তার সত্যতা এবং তার রিসালাতের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অবর্তীর্ণ কুরআন- আল্লাহর কালাম বা বাণী। এটা অনেক বড় মুজিযা। যা সকল কালে, সকল যুগে অব্যাহত থাকবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য মুজিযা হয়ে থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সকল নবী কে সেই পরিমাণ নিদর্শন দেয়া হয়েছে যা তার উপর ঈমান আনায়নকারীর জন্য পর্যাপ্ত হয়। আমি প্রাপ্ত হয়েছি অহী যা আল্লাহ আমার কাছে প্রেরণ করেছেন। আমি আশাবাদী, অনুসারীর দিক দিয়ে কেয়ামতে আমি তাদের সকলে চেয়ে শ্রেষ্ঠ হব।
এ কথা দ্বারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুজিযা শুধু কুরআনে সীমাবদ্ধ করা উদ্দেশ্য নয়। এটাও বলা উদ্দেশ্য নয় যে, তিনি কোন দৃশ্যমান মুজিযা নিয়ে আসেননি। বরং উদ্দেশ্য হল কুরআন হচ্ছে বড় মুজিযা যা বিশেষভাবে আল্লাহ তাআলা এ রাসূলের জন্যই নির্ধারণ করেছেন। কারণ প্রত্যেক নবীকে নির্দিষ্ট মুজিযা প্রদান করা হয়েছে যা দিয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ করেন তার জাতিকে। প্রত্যেক নবীর মুজিযা তার জাতির অবস্থার সাথে সঙ্গতি পূর্ণ হয়ে থাকে। তাইতো দেখা যায় ফেরাআউনের সময়ে যাদুর ব্যাপক প্রচলন থাকায় মুসা আলাইহিস সালাম তার নিকট লাঠি নিয়ে আগমন করেন। লাঠি দিয়ে এমন কাজই করলেন যা যাদুকররা করত। এর মাধ্যমে তিনি যাদুকরদের পরাজিত করলেন। কিন্তু মুজিযার এ পদ্ধতি অন্য নবীদের বেলায় ব্যবহৃত হয়নি।
ঈসা আ. এর যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির যুগ ছিল। তখন ঈসা আ. আগমন করলেন এমন মুজিযা নিয়ে আসলেন, যা সকল ডাক্তার ও চিকিৎসককে অক্ষম বানিয়ে দিল। যেমন মৃতকে জীবিত করা, শ্বেতী রোগ ভাল করা, কুষ্ঠ রোগ নিরাময় করা। তখনকার চিকিৎসা-বিজ্ঞান ও চিকিৎসকরা ঈসা আ. এর কাছে পরাজিত হল। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ ছিল ভাষা, সাহিত্য কবিতা, ভাষা অলংকার ও বাগ্মীতার শ্রেষ্ঠ যুগ।
এর বিপরীতে আল্লাহ তাআলা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মুজিযা হিসাবে দিলেন আল-কুরআন, যার সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেন,
لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ ﴿٤٢﴾ سورة فصلت
"এতে কোন মিথ্যা অনুপ্রবেশ করবেনা- অগ্র হতেও নয়, পশ্চাত হতেও নয়। এটা প্রজ্ঞাবান, প্রশংসনীয় আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ।” তবে আল-কুরআনের মুজিযা অন্য সকল মুজিযা থেকে ভিন্ন। কারণ এটি এক স্থায়ী দলীল ও চ্যালেঞ্জ যা যুগ যুগ ধরে অব্যাহত থাকবে। কখনো এটাকে পরাজিত করা যাবে না। কখনো এর বিকল্প রচনা করা সম্ভব হবে না। অন্যান্য নবী রাসূলদের মুজিযা ও চ্যালেঞ্জ তাদের জীবনের সাথে সাথে শেষ হয়ে গেছে। তাদের নবুওয়াত কালের ঘটনাবলী পরবর্তীতে শুধু শিক্ষনীয় ইতিহাস। আর আল-কুরআন এটা এখনো সুপ্রতিষ্ঠিত চলমান প্রমাণ ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিরাজ করছে। মনে হয় যেন শ্রোতা এ প্রমাণটি এ মাত্র আল্লাহর রাসূলের মূখ থেকে শুনেছেন। এ পরিপূর্ণ প্রমাণ অব্যাহত থাকার কারণেই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- আমি আশাবাদী কিয়ামত দিবসে অন্য নবীদের চেয়ে আমার অনুসারী বেশি হবে। কুরআন সুস্পষ্ট নিদর্শন ও মুজিযা হল সকল দিক থেকে: শব্দের দিক থেকে, ছন্দের দিক থেকে, শব্দার্থ প্রকাশে, অলঙ্কারের দিক থেকে, অর্থ তাৎপর্য নির্দেশের দিক থেকে, আল্লাহর নামসমূহ, গুণাবলি এবং তার ফেরেস্তা সম্পর্কীয় সংবাদ এবং লক্ষ্য উদ্দেশের দিক থেকে। এ ছাড়াও আরো বিভিন্ন দিক রয়েছে যা জ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন।
উদাহরণ স্বরূপ এখানে মাত্র চার প্রকার উল্লেখ করছি-
১. বিস্ময়কর ভাষা অলঙ্কার
কুরআনে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে অলৌকিক ভাষা অলঙ্কার, শব্দ গাঁথুনী যা চ্যালেঞ্জ করল জিন ইনসানকে এরূপ একটি কুরআন পেশ করার জন্য। তারা অক্ষম হলো। আল্লাহ বলেন:
قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا - سورة الإسراء
"বল, যদি মানুষ ও জিন সমবেত হয় এই কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য, যদিও তারা পরস্পরকে সাহায্য করে, তারা এর অনুরূপ কুরআন আনয়ন করতে পারবে না।”
أَمْ يَقُولُونَ تَقَوَّلَهُ بَلْ لَا يُؤْمِنُونَ ﴿٣٣﴾ فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِثْلِهِ إِنْ كَانُوا صَادِقِينَ ﴿٣٤﴾ سورة الطور
"তারা কি বলে এ কুরআন তার নিজের বানানো? বরং তারা বিশ্বাস করতে চায়না। তারা যদি সত্যবাদী হয় তবে এর সদৃশ বানানো কিছু উপস্থিত করুক।” এ চ্যালেঞ্জের তারা কেটে পড়ল। কেউই সামনে আসেনি। অতঃপর তাদের অবকাশ দেয়া হলো এবং অনুরূপ দশটি সূরার চ্যালেঞ্জ দেয়া হলো
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ . سورة هود
“তবে কি তারা বলে যে, ওটা সে নিজেই রচনা করেছে? তুমি বলে দাও, তাহলে তোমরাও ওর অনুরূপ রচিত দশটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।”
অতঃপর তারা এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণে অপারগ হলো, অক্ষম হয়ে গেল। তাদের আবার সুযোগ দেয়া হলো:
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِثْلِهِ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ﴿۳۸﴾ سورة يونس
"তারা কি এরূপ বলে যে, এটা তার স্বরচিত? তুমি বলে দাও, 'তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরাই আনয়ন কর এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাকে নিতে পার ডেকে নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।”
হিজরতের পর মদীনায় আবার এ চ্যালেঞ্জের পূনরাবৃত্তি করা হলো:
وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ﴿۲۳﴾ فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا وَلَنْ تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ ﴿٢٤﴾ سورة البقرة
"এবং আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, তাতে তোমরা যদি সন্দিহান হও তবে তৎ সদৃশ একটি সূরা তৈরি করে নিয়ে এসো এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সাহায্যকারীদেরকেও ডেকে নাও; যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অনন্তর যদি তোমরা তা করতে না পার এবং তোমরা তা কখনও করতে পারবে না, তা হলে তোমরা সেই জাহান্নামকে ভয় কর যার ইন্ধন মানুষ ও প্রস্তরপুঞ্জ যা অবিশ্বাসীদের জন্যে প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে।”
আল্লাহর বাণী ، فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا وَلَنْ تَفْعَلُوا অনন্তর যদি তোমরা তা করতে না পার এবং তোমরা তা কখনও করতে পারবেনা, অর্থাৎ যদি অতীতে না পেরে থাক ভবিষ্যতেও পারবেনা' দ্বারা চ্যালেঞ্জ প্রমাণিত হলো, তারা এর মত একটি সূরা ভবিষ্যতেও পেশ করতে পারবে না, যেমনটি একটু পূর্বে বলে দেয়া হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা অবস্থানকালে তাকে বলার জন্য আল্লাহ তাআলা আদেশ করলেনঃ
قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا ﴿۸۸﴾ سورة الإسراء
"বল, যদি মানুষ ও জিন সমবেত হয় এই কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য, যদিও তারা পরস্পরকে সাহায্য করে, তারা এর অনুরূপ কুরআন আনয়ন করতে পারবে না।”
আল্লাহর আদেশের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য এ চ্যালেঞ্জ ব্যাপক করা হয়। সকল মাখলুকের মাঝে এ খবর দেয়া যে তাদের পক্ষে এ রূপ একটি কুরআন পেশ করা অসম্ভব, যদিও তারা সবাই একত্র হয়ে একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা করে। এ চ্যালেঞ্জ সকল মাখলুকের জন্য। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি চ্যালেঞ্জ শুনেছে যে কুরআন শ্রবণ করেছে এবং জেনেছে বিশেষ ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ সকলেই। এবং এটা জেনেছে এরপরও কেউ এর মত একটি গ্রন্থ পেশ করতে পারেনি। এমনকি তারা এর মত একটি সূরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেরণকাল হতে আজ পর্যন্ত পেশ করতে পারেনি। এভাবেই চ্যালেঞ্জ বহাল আছে এবং থাকবে। আল-কুরআন অন্তর্ভুক্ত করেছে হাজারো মুজিযা। কারণ তার রয়েছে একশত চৌদ্দটি সূরা। আর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার প্রয়াস চালানো হলো একটি সূরায়। তা ও আবার কুরআনের সবচে ক্ষুদ্র সূরা আল কাউসার- মাত্র তিনটি ছোট আয়াত। সর্বসম্মতভাবে কুরআনে ছয় হাজার দুইশত আয়াতের চেয়ে কিছু বেশি আয়াত আছে। আর আল কাউসারের পরিমাণ হলো কয়েকটি আয়াত মাত্র। অথবা বলা যায় দীর্ঘ একটি আয়াত যার উপর একটি সূরার নাম প্রয়োগ হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো চ্যালেঞ্জ ও অলৌকিকতা ও বিরোধী পক্ষের পরাজয়।
যার আত্মা আছে অথবা মু'মিন অবস্থায় মনোযোগ সহকারে কুরআন শুনলে তার আর কোন প্রমাণের প্রয়োজন নেই।
২. গায়েব সম্পর্কীয় সংবাদ
কুরআনের অলৌকিকত্ব হলো তাতে অনেকগুলো গায়েবের সংবাদকে শামিল কারেছে। যা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরও জানা ছিল না। এবং তার মত অন্য কোন মানুষের জানার কোন পথও ছিল না। এটা প্রমাণ করে কুরআন আল্লাহর কালাম এতে কোন প্রকার গোপনীয়তা নেই।
وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَأْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُبِينٍ ﴿٥٩﴾ سورة الأنعام
"গায়েব বা অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই নিকট রয়েছে; তিনি ছাড়া আর কেউই তা জ্ঞাত নয়। স্থল ও জলভাগের সব কিছুই তিনি অবগত রয়েছেন। তার অবগতি ব্যতীত বৃক্ষ হতে একটি পাতাও ঝরে না এবং ভূ-পৃষ্ঠের অন্ধকারের মধ্যে একটি দানাও পড়ে না। এমনভাবে কোন সরস ও নিরস বস্তুও পতিত হয় না; সমস্ত বস্তুই সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।"
গায়েব সম্পর্কীয় সংবাদ বিভিন্ন প্রকারঃ
প্রথম প্রকারঃ অতীতের গায়েব, এটা প্রকাশ করেছে বিস্ময়কর ঘটনাবলী যা মক্কার কুরাইশ সমাজ জানত না। এবং যাবতীয় সংবাদ যা আল্লাহ অতীত কাল সম্পর্কে জানিয়েছেন।
দ্বিতীয় প্রকারঃ বর্তমানের অজানা সংবাদ যা আল্লাহ তাঁর রাসূলকে জানিয়েছেন। যেমন মুনাফিকদের গোপন সংবাদ। কতিপয় মুসলমান থেকে ভূল সংঘটিত হওয়া এছাড়া আরো অন্যান্য সংবাদ যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানত না, তিনি তার রাসূলকে তা অবগত করিয়েছেন।
তৃতীয় প্রকারঃ ভবিষ্যত গায়েব। যা আল্লাহ তাঁর রাসূলকে ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্বে জানিয়েছেন এবং পরে তা ঘটেছে যা সংবাদ দিয়েছেন। এসব বিষয় নির্দেশ করে, কুরআন আল্লাহর কালাম এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।
৩. ধর্মীয় অলৌকিকত্ব
আল কুরআনুল কারীম পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ। এতে সকল যুগের, সব স্থানের মানুষের প্রয়োজনীয় সমূহ নিদের্শনা বিদ্যমান। কারণ, এ কুরআন যিনি অবতীর্ণ করেছেন, তিনি সর্ব বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত। তিনি মানব জাতি সৃষ্টি করেছেন। তার কল্যাণ, অকল্যাণ, উপকার, অপকার তিনি-ই সব চেয়ে বেশি ভাল জানেন। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেন, সে সিদ্ধান্ত হিকমত ও প্রজ্ঞার শীর্ষ স্থানের মর্যাদা পায়। এরশাদ হচ্ছেঃ
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الخُبِيرُ
"জেনে রাখ! যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জনেন। তিনি হচ্ছেন বিজ্ঞ দয়ালু, সর্ব জ্ঞানের অধিকারী।"'
আমরা বিভিন্ন সংস্থার অবস্থা ও মানব রচিত আইনের প্রতি একটু গভীর দৃষ্টি দিলেই দেখব যে, পরিবেশ, স্থান ও কালের পরিবর্তনের সামনে প্রচলিত আইনের অসহায়ত্ব আর নিঃশর্ত আত্মসমর্থন, কত নির্মম, নির্লজ্জ! যার প্রেক্ষিতে বার বার প্রয়োজন হয় সংস্করণ, সংযোজন ও বিয়োজন ইত্যাদির। আজকে যা প্রনয়ণ করছে, আগামী কাল তা বাতিল করছে। কারণ, ত্রুটি, বিচ্যুতি ও অজ্ঞতা হল মনুষ্য প্রকৃতি। তাই এক সাথে কিংবা সম্মিলিতভাবে মানুষের পক্ষে সর্বকাল ও সর্বযুগের উপযোগী করে আইন ও বিধান প্রনয়ণ করা সম্ভব নয়।
মানব জাতিকে নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের চরিত্র সংশোধনের সামনে সংস্থা ও সংগঠনের এটাই বড় ব্যর্থতা। এর বিপরীতে আল-কুরআন সকল ত্রুটি হতে মুক্ত ও পবিত্র, মানুষের স্বার্থ ও কল্যাণের জিম্মাদার। ইহকাল ও পরকালের পাথেয়। যদি মানুষ এর অনুসরণ করে এবং এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كَبِيرًا ﴿الإسراء : ٩﴾
"এ কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল। এবং যে সকল মু'মিন সৎকর্ম করে, তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান করে যে, তাদের জন্য রয়েছে বড় প্রতিদান।" মোট কথা: আল্লাহর কিতাব যে ধর্ম ও শরীয়ত নিয়ে এসেছে, তার মধ্যে তিনটি মানবস্বার্থ প্রধান্য দেয়া হয়েছে:
প্রথম মানবস্বার্থ: ছয়টি বস্তুর উপর থেকে বিকৃতি, হুমকি ও শংকা দূরভীত করা, তা হল: ধর্ম, জীবন, বিবেক, মনুষ্য বংশ, সম্মান ও সম্পদ হেফাজত করা।
দ্বিতীয় মানবস্বার্থ: মানুষের প্রয়োজনসমূহ অক্ষত রাখা ও সামনে পেশ করা, প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের উপকারী বস্তুগুলো উপার্জনের জন্য কুরআন বিরাট এক ময়দান উম্মুক্ত করে রেখেছে; সাথে সাথে ক্ষতিকর প্রতিটি পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।
তৃতীয় মানবস্বার্থ: উত্তম চরিত্র ও উত্তম স্বভাব অর্জন করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ। কুরআনুল কারীম আর্ন্তজাতিক পর্যায়ের মানবিক সকল সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে, যা মানুষের ক্ষমতা ও সাধ্যের বাইরে ছিল। এমন কোন দিক নেই, যেখানে সে কোনো নির্দেশনা দেয়নি। মরণের আগে ও পরে মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট সব ব্যাপারেই সে ইনসাফপূর্ণ ও ন্যায় সঙ্গত বিধান রচনা করে দিয়েছে।
৪. আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের ব্যাপারে অসাধারণত্ব
পবিত্র কুরআনের আরেকটি অলৌকিকত্ব হচ্ছে, অনাগত বিষয় সম্পর্কে সংবাদ প্রদান। যার সত্যতা বর্তমান বিজ্ঞান বের করতে সক্ষম হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الحُقُّ أَوَلَمْ يَكْفِ بِرَبِّكَ أَنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ ﴿فصلت:٥٣﴾
"আমি সত্বরই তাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ চতুর্দিকে দেখিয়ে দেব এবং তাদের নিজেদের ভিতরও। যাতে তাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তিনিই হচ্ছেন সত্য। তোমার রবের জন্য এতটুকু কি যথেষ্ট নয় যে, তিনি সব জিনিসের উপর দৃশ্যমান ও সাক্ষ্য।"
আল্লাহর এ ওয়াদা শেষ যুগে এসে বাস্তবে পরিণত হয়েছে। মানুষ সূক্ষ সূক্ষ যন্ত্রপাতির মাধ্যমে দিগন্তে দিগন্তে সে সকল জিনিস অবলোকন করছে। যেমন, উড়োজাহাজ, ডুবু জাহাজ ইত্যাদির মাধ্যমে। মানুষ এসব জিনিসের সবেমাত্র মালিক হয়েছে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে এর সংবাদ দিয়েছেন। যা আল-কুরআনের সত্যতা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সত্যতার প্রমাণ।
আধুনিক বিজ্ঞানের এ অলৌকিকত্ব সব জায়গাতেই বিকশিত হয়েছে: আসমানে-যমীনে, সমুদ্রে-মরু ভূমিতে, মানুষের মধ্যে, জীব জন্তুর মধ্যে, বৃক্ষ-তরুলতা ও কীট পতঙ্গের ভিতর সর্বত্রই। যার উদাহরণ এখানে পেশ করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় বিষয়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রকাশিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মুজিযাসমূহ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অস্বাভাবিক অনেক ঘটনা রয়েছে, যে গুলোর গণনা সম্ভব নয়। এখানে আমরা নমুনার জন্য নয় প্রকার অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করব:
প্রথম প্রকার: আসমানী মুজেজা বা অলৌকিক ঘটনা, যেমন:
১. চন্দ্র দ্বি খণ্ডিত হওয়া:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সত্যবাদীতা প্রমাণের এটি অনন্য ঘটনা। মক্কার কাফেররা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুরোধ করল তার নবী হওয়ার একটি প্রমাণ দেখানোর জন্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে চন্দ্র দ্বি খণ্ডিত করে দেখালেন। তারা স্পষ্টভাবে হেরা পর্বতকে চন্দ্রের দু টুকরার মাঝখানে দেখেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ ﴿١﴾ وَإِنْ يَرَوْا آيَةً يُعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُسْتَمِرٌ ﴿۲﴾ وَكَذَّبُوا وَاتَّبَعُوا أَهْوَاءَهُمْ وَكُلُّ أَمْرٍ مُسْتَقِرٌّ ﴿۳﴾
"কেয়ামত নিকটবর্তী হয়ে গেছে এবং চন্দ্র দু টুকরা হয়ে গেছে। তারা যখন-ই কোনো আয়াত দেখে, তখন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে এবং বলে এটা হচ্ছে প্রচলিত যাদু। তারা মিথ্যারোপ করেছে এবং তারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে। প্রতিটি জিনিস-ই যথা সময়ের জন্য স্থিরকৃত।”
২. ইসরা ও মিরাজ:
এ রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উর্ধ্ব জগত তথা আসমনের উপরে গমন। এর বিবরণ কুরআনে বর্ণিত আছে এবং হাদীসের দ্বারাও বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ المُسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى المُسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آَيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴿۱﴾
"মহান সে সত্ত্বা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মসজিদুল হারাম থেকে আল মসজিদুল আকসা পর্যন্ত। যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি। যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনেক বড় ঘটনা। অল্প সময়ের মধ্যে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত তার ইসরা বা রাত্রিকালিন ভ্রমন সম্পন্ন হয় এবং সেখান থেকে তাকে আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। অতঃপর সেখানে এমন জায়গায় গিয়েছেন, যেখানে গিয়ে ভাগ্যলীপির আওয়াজ শুনেছেন, জান্নাত দেখেছেন। এবং এখানেই নামাজ ফরজ হয়। সকাল হওয়ার আগে আগেই মক্কায় ফিরে আসেন। এ খবর শুনে কাফেররা এটাকে মিথ্যা বলে অভিহিত করল এবং তার কাছে এর প্রমাণ চাইল। যেমন তারা রাসূলের কাছে বায়তুল মুকাদ্দাসের আকৃতি ও বিবরণ জানতে চাইল। কারণ, তারা জানতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে বায়তুল মুকাদ্দাস দেখেননি। আল্লাহ তার সামনে বায়তুল মুকাদ্দাস পেশ করে দিলেন আর তারা যা যা প্রশ্ন করছিল, তিনি তার সঠিক উত্তর দিয়ে দিলেন। আরো অনেক নিদর্শন তিনি দেখেছেন উর্ধ্ব জগতে।
দ্বিতীয় প্রকার: শুন্য জগতের মুজেজা বা অলৌকিক ঘটনা:
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মেঘমালার আনুগত্য করণঃ
আল্লাহ তাআলার নির্দেশে মেঘমালার আগমন, প্রত্যাগমন এবং বৃষ্টি বর্ষণ সব কিছুই করেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুআর বরকতে হয়ছিল।
২. বাতাসের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাহায্য করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا "স্বরণ কর, যখন শত্রু বাহিনী তোমাদের নিকট চলে এসে ছিল, আমি তাদের উপর প্রেরণ করি সৈন্য বাহিনী এবং বাতাস যা তোমরা দেখনি।" আল্লাহ তাআলা আহযাবের যুদ্ধে শত্রু বাহিনীর উপর এ প্রবল বাতাস প্রেরণ করে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমাকে পূর্ব দিগন্ত থেকে আগত বাতাস দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। আর আদ সম্প্রদায়কে পশ্চিমা বাতাস দ্বারা ধবংস করা হয়েছে।'
তৃতীয় প্রকার: জীব-জন্তুর ভিতর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনুগত্য করণঃ
মানুষ, জিন এবং চতুষ্পদ জন্তু। এ অধ্যায়টি খুবই দীর্ঘ। কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা হল:
(ক) মানুষের ভেতর তার ক্ষমতা প্রয়োগ:
১. আলী রা. তার চোখে ব্যথা অনুভব করতে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চোখের উপর থু থু দেন, ফলে তার চোখ ভাল হয়ে যায়। তার মনে হচ্ছিল, তার কোনো ব্যথা ছিল না।'
২. আব্দুল্লাহ ইবেন আতীকের পা ভেঙ্গে গিয়ে ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পা মালিশ করে দিলেন। ফলে তার পা ভাল হয়ে গেল। যেমন ইতিপূর্বে সেখানো কোনো ব্যাথা ছিল না।'
৩. সালামাতা ইবনুল আকওয়া খায়বারের যুদ্ধে পায়ে ব্যথা পেয়ে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে দম করে দেন। ফলে পরে কখনো তাতে ব্যথা অনুভব হয়নি।'
(খ) জিন এবং শয়তানের উপর তার কর্তৃত্ব
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিনদেরকে মানুষদের মধ্য হতে বের করে দিতেন। শুধু এ বাক্যের মাধ্যমে যে, 'ও আল্লাহর দুশমন বের হয়ে যাও।'
২. উসমান ইবনে আবিল আসের সীনা থেকে তিনি শয়তান তাড়িয়ে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত দিয়ে উসমানের সীনায় তিন বার আঘাত করেন এবং তার মুখে থু থু দেন। অতঃপর বলেন, 'আল্লাহর দুশমন বের হয়ে যাও।' এরকম তিন বার করেছেন। তার পর থেকে আর শয়তান কখনো উসমানের কাছে আসেনি।
(গ) জীব জন্তুর উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কর্তৃত্ব
১. এ রকম ঘটনা অনেক বার হয়েছে। একবার উট এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেজদা করেছে। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'আল্লাহর রাসূল! চতুষ্পদ জন্তু আর গাছ-পালা আপনাকে সেজদা করে, তার চেয়ে আমরাই আপনাকে সেজদা করার বেশি হকদার।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা তোমাদের রবের এবাদত কর এবং তোমাদের ভাইদের সম্মান কর। যদি আমি কাউকে সেজদা করার নিদের্শ দিতাম তবে অবশ্যই নারীদের বলতাম, স্বামীদের সেজদা করার জন্য...'
চতুর্থ প্রকার: গাছ, ফল এবং লাকড়ির উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কর্তৃত্ব
(ক) গাছের উপর তার প্রভাব:
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সফর অবস্থায় গ্রামের একজন লোক তার কাছে আসল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। সে ব্যক্তি বলল, আপনার কথার প্রমাণ কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'সালামা নামক এ বৃক্ষটি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাছটিকে কাছে ডাকলেন, গাছটি ছিল ময়দানের প্রান্তে। গাছটি মাটি চিরে চিরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে এসে উপস্থিত হল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তিন বার সাক্ষ্য দিতে বললেন। সে তিন বার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা মত সাক্ষ্য দিল। অতঃপর সে তার জায়গায় চলে গেল।
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে থাকাকালীন প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার ইচ্ছা করলেন। কিন্তু পর্দা করার কিছু পেলেন না। একটি গাছের ডাল ধরে বললেন, 'আল্লাহর হুকুমে তুমি আমার অনুসরণ কর।' সে লাগাম যুক্ত উটের ন্যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ করল। অতঃপর আরেকটি গাছের নিকট এসে তদ্রূপ বললেন। সে গাছও তা-ই করল। অতঃপর উভয় গাছকে মিলে যাওয়ার নিদের্শ দিলেন। উভয় গাছ মিলে গেল। প্রয়োজন সেরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয় গাছকে স্ব স্ব স্থানে ফিরে যেতে বললেন। উভয় গাছ স্ব স্ব স্থানে ফিরে গেল।'
(খ) ফলের উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রভাব
গ্রামের এক ব্যক্তি এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, 'আপনি নবী এটা কিভাবে বিশ্বাস করব?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমি যদি এ খেজুর গাছ হতে খেজুর ডেকে নিয়ে আসি, তবে কি তুমি বিশ্বাস করবে- আমি আল্লাহর রাসূল?' অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আহ্বান করলেন। গাছ থেকে খেজুর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট চলে আসল। অতঃপর তাকে পূর্বের জায়গায় চলে যেতে বললেন, 'ফিরে যাও।' বে পূর্বের জায়গায় চলে গেল। ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে লোকটি ইসলাম গ্রহণ করল।'
(গ) কাঠের উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রভাব:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় জুমার দিন একটি খেজুর গাছের সাথে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মিম্বার নিমার্ণ করা হল এবং তাতে উঠে তিনি খুতবা দিতে আরম্ভ করলেন। গাছটি বাচ্চার মত কাঁদতে লাগল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বরকত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে গরুর মত ঢেকুর তুলতে লাগল গাছটি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরলেন, তখনও সে কাঁদতে ছিল। অতঃপর তার উপর হাত বুলিয়ে দিলেন, অবশেষে সে চুপ করল।'
পঞ্চম প্রকার: পাহাড় এবং পাথর কর্তৃক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনুগত্য স্বীকার
(ক) পাহাড়ের আনুগত্য স্বীকার:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ পাড়ারের উপর উঠলেন। তার সাথে ছিল আবু বকর, উমার এবং উসমান রা.। পাহাড়টি কাঁপতে লাগল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পা দ্বারা আঘাত করে বললেন, 'স্থির হও উহুদ।' তোমার উপর আছে একজন নবী, একজন সিদ্দীক এবং দু'জন শহীদ।”
(খ) পাথরের আনুগত্য স্বীকার:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমি এখনো সে পাথরটি চিনি, যে পাথরটি আমাকে নবুওয়ত প্রাপ্তির আগেও সালাম করত।'
(গ) যমীনের উপর তার প্রভাব:
যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইনের ময়দানে ছিলেন এবং যুদ্ধ প্রচণ্ড আকার ধারণ করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার খচ্চর থেকে নেমে এক মুষ্টি মাটি হাতে নিলেন এবং শত্রু বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে বললেন, 'চেহারাগুলো মলিন করে দাও।' আল্লাহ শত্রু দলের এমন কোনো মানুষ বাকি রাখেননি, যার চোখে সে মাটি যায়নি। অতঃপর আল্লাহ তাদের পরাস্ত করেন এবং মুসলমানগণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিজেদের মধ্যে বণ্টন করেন।'
ষষ্ঠ প্রকার: পানির নিঃসরণ এবং খানা, পানীয় ও ফলফলাদিতে বরকত
(ক) পানির উৎসরণ এবং পানীয় বৃদ্ধি পাওয়া:
এ ধরনের অসাধারণ ঘটনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে অনেক বার ঘটেছে। তন্মধ্যে:
১. হুদাইবিয়াতে সকলে পিপাসার্ত হয়ে গিয়ে ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাত একটি পাত্রের ভিতর রাখলেন, সাথে সাথে তার আঙ্গুল থেকে ঝর্ণার ন্যায় পানি বের হতে লাগল। তারা সকলে সেখান থেকে পান করল, অজু করল। জাবেরকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'তোমরা কত জন ছিলে?' তিনি বললেন, 'আমরা যদি এক লাখও হতাম, তাহলেও যথেষ্ট হত। তবে আমরা ছিলাম পনের শত মানুষের মত।'
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকে এসে দেখেন এখানকার কুপগুলো খুব ছোট ছোট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে এর থেকে অল্প অল্প পানি জমা করা হল। তিনি তাতে হাত এবং চেহারা ধুয়ে পুনরায় সেখানে পানি রেখে দিলেন আর সাথে সাথে ঝর্ণার ন্যায় পানি বের হতে লাগল। সে কুপটি এখন পর্যন্ত অবশিষ্ট আছে।'
৩. আবু হুরায়রা রা. এর দুধের পাত্রের ঘটনা। যে পাত্রের দুধ এতো বেশি হয়ে ছিল যে, সকল মেহমান খাওয়ার পরও অতিরিক্ত ছিল।
(খ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কল্যাণে খানা বৃদ্ধি, বরকত লাভ, যেমন:
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চৌদ্দশত সাহাবায়ে কেরাম নিয়ে রণাঙ্গনে ছিলেন। এক সময় সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সাথে ছিল সামান্য খাদ্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দস্তরখান বিছিয়ে নিজ নিজ খানা সেখানে উপস্থিত করার নিদের্শ দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কল্যাণের স্পর্শ পেয়ে খানাতে প্রচুর বরকত হল। সকলে সে খানা ভক্ষণ করল এবং স্ব স্ব পাত্রে জমা করে রাখল।
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম খন্দক যুদ্ধে তিন দিন পর্যন্ত কোনো খানা গ্রহণ করেননি। জাবের রা. একটি উট জবেহ করে আনল এবং তার স্ত্রী আটা পিষে দিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডাক দিয়ে সকলকে তার খানার প্রতি আহ্বান জানালেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে আটার খামির এবং গোস্তের পাত্রের মধ্যে মুখের লালা দিলেন, ফলে খানা বরকতময় হয়ে গেল। জাবের রা. আল্লাহর শপথ করে বলেন, আমরা এক হাজার জন ছিলাম। সকলে খানা খেয়ে চলে আসলাম। তবুও আমাদের খানা যে পরিমাণ ছিল, সেরূপই থাকল। পাত্রগুলো খাদ্যে পূর্ণ ছিল। আটার খামির বাকি ছিল। আমার ধারণা সে খামির দিয়ে আরো রুটি তৈরী করা যেত। এ অধ্যায়টি খুবই বড়, সবগুলো আলোচনা করা সল্প পরিসরে সম্ভব নয়।
(গ) ফল ও শষ্যের বৃদ্ধি। যেমন:
১. এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে কিছু খানা চাইল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আধা অসাক তথা ত্রিশ সা'র (বাহাত্তর কেজির) মত আটা প্রদান করলেন। সে এবং তার পরিবার তা থেকে খেতে ছিল। মোটেই শেষ হচ্ছিল না। ফলে একদিন মেপে দেখল। অতঃপর এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘটনাটি জানাল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তোমরা না মাপতে, তবে এর থেকে খেতে থাকতে বহু দিন।'
২. জাবের রা. এর পিতা ঋণগ্রস্থ ছিল। তার বাগানে যে পরিমাণ খেজুর ছিল, তাতে তাদের যথেষ্ট হত না। জাবের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট মাপার জন্য সে খেজুর উপস্থিত করল, তিনি তার ভেতর জাবের রা. এর প্রয়োজন মোতাবেক মেপে দিলেন। জাবের রা. বলেন সে খেজুর আমার কাছেই ছিল, মনে হচ্ছিল, তা যেন কমছে না।
সপ্তম প্রকার : আল্লাহর ফেরেশতাদের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাহায্য প্রদান:
১. হিজরত প্রক্কালে: আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِينَ كَفَرُوا السُّفْلَى وَكَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا "আল্লাহ তাআলা তার উপর সাকিনা নামক বিশেষ অনুগ্রহ অবতীর্ণ করেন। এবং তাকে তিনি এমন এক সৈন্যবাহিনী দ্বারা শক্তিশালী করেছেন, যা তোমরা দেখনি। আল্লাহ কাফেরদের বাক্য ছোট করে দিয়েছেন। মূলতঃ আল্লাহর বাক্যই মহান।"
২. বদর প্রান্তে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِنَ المَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ
"স্বরণ কর! যখন তোমরা স্বীয় রবের নিকট ফরিয়াদ করতে ছিলে, তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন যে, আমি তোমাদেরকে এক হাজার ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য করব।”
৩. উহুদ ময়দানে জিবরীল ও মিকাইল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ডানে এবং বামে থেকে যুদ্ধ করেছে।
৪. খন্দকের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودُ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا
"স্বরণ কর! যখন তোমাদের নিকট সৈন্য বাহিনী এসে উপস্থিত হয়েছিল। আমি তাদের উপর বাতাস এবং বিশেষ এক সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেছি, যা তোমরা দেখনি।"
৫. বনু কুরাইযা যুদ্ধের সময়, খন্দকের যুদ্ধ থেকে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্ত্র রেখে গোসল করার পর, জিবরীল এসে বললো, 'কি, অস্ত্র রেখে দিয়েছেন?' আমরা তো এখনো অস্ত্র রাখিনি। শত্রু বাহিনীকে ধাওয়া করুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোথায়? অতঃপর বনু কুরাইযার প্রতি ইংগিত করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ স্থান অভিমুখে অভিযানে বের হলেন। আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে তাকে বিজয় দিলেন।
৬. হুনাইন যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَأَنْزَلَ جُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَعَذَّبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ ﴿۲۶﴾ سورة التوبة "এবং তিনি এমন সৈন্যদল নাযিল করলেন, যাদেরকে তোমরা দেখনি। আর তিনি কাফিরদেরকে শাস্তি প্রদান করলেন; আর এটা হচ্ছে কাফিরদের কর্মফল।”
অষ্টম প্রকার: তার শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহ যথেষ্ট হওয়া এবং তাকে মানুষ থেকে রক্ষা করা
এই প্রকারটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রিসালতের সত্যতার ওপর বড় নিদর্শনসমূহের মধ্য থেকে একটি। এ প্রকারের উদাহরণঃ
১. মুশরিক এবং উপহাসকারীদের বিরুদ্ধে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হওয়াঃ
ফলে তারা কোন কুমতলব নিয়ে তার কাছে পৌঁছাতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ المُشْرِكِينَ ﴿۹٤﴾ إِنَّا كَفَيْنَاكَ المُسْتَهْزِئِينَ ﴿۹٥﴾ سورة الحجر "অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ, তা প্রকাশ্যে প্রচার কর, এবং মুশরিকদের উপেক্ষা কর। আমিই যথেষ্ট তোমার জন্যে বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে”
২. ইহুদী খ্রিষ্টানের মোকাবেলায় আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হওয়াঃ আল্লাহ বলেনঃ
فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنْتُمْ بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوْا وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ﴿۱۳۷﴾ سورة البقرة
“তোমরা যেরূপ বিশ্বাস স্থাপন করেছ, তারাও যদি তদ্রূপ বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে নিশ্চয় তারা সুপথ প্রাপ্ত হবে; এবং যদি তারা ফিরে যায় তবে তারা বিচ্ছিন্নতায় পতিত। অতএব এখন তাদের ব্যাপারে আপনার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই মহা শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।"
৩. এবং সকল মানুষ থেকে তাকে সুরক্ষা করা: আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ ﴿٦٧﴾ سورة المائدة
“হে রাসূল! যা কিছু তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমার উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে তা তুমি পৌঁছে দাও। আর যদি এরূপ না কর, তবে তুমি আল্লাহর পয়গাম পৌঁছাওনি বলে বিবেচিত হবে। আর আল্লাহ তোমাকে মানুষ হতে সুরক্ষিত রাখবেন।”
এবং এটা এক ব্যাপক বার্তা যে, আল্লাহ তাকে সকল মানুষ থেকে নিরাপত্তা দিবেন। কারণ উল্লেখিত তিনটি তথ্যই সংঘটিত হয়েছে যা আল্লাহ তাআলা জানালেন। আল্লাহই তার শত্রুর বিরুদ্ধে যথেষ্ট ছিলেন বিভিন্ন অলৌকিক নিয়মে। শত্রুর আধিক্য, শক্তি সামর্থ্য বেশি হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাকে বিজয়ী করেছেন, এবং যারা তার বিরোধিতা করেছে তাদেরকে শাস্তি দিয়েছেন।
এমনি একটি ঘটনা- জনৈক খ্রিষ্টান ইসলাম গ্রহণ করে। সূরা বাকারা, ও আলে ইমরান পড়ে এবং সে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর লেখক হিসাবে কাজ শুরু করে। এরপর সে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে আবার খ্রিষ্টান হয়ে যায়। সে বলত, আমি যা লিখতাম মুহাম্মাদ এর বাহিরে আর কিছু জানতো না। আল্লাহর ইচ্ছায় লোকটির আকস্মিক মৃত্যু হয়। গোত্রের লোকেরা তাকে মাটিতে পুঁতে রাখলো। প্রত্যুষে তাকে মাটির উপর পাওয়া গেল। তারা খুব গভীর গর্ত করে আবার তাকে মাটিতে পুঁতে রাখলো। এবারও প্রত্যুষে তাকে মাটির উপর নিক্ষপ্ত অবস্থায় পাওয়া গেল। তারা আবার আরো গভীর করে গর্ত করে তাকে পুঁতে রাখলো, সকালে দেখা গেল সে আজো নিক্ষিপ্ত অবস্থায় যমীনের উপরে পড়ে আছে। মানুষ বুঝল এটা কোন মানুষের কাজ নয়, তাই তারা পতিত অবস্থায়ই তার লাশ রেখে ফিরে গেল।'
নবম প্রকার : তার দুআ কবুল হওয়া
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করেছেন এবং তার কবুল হওয়ার বিষয় মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। এটা দিবা লোকের মত স্পষ্ট এবং এর সংখ্যা গণনা করে শেষ করা যাবে না। তা বিস্তারিত বর্ণনা করার ক্ষেত্রও এটা নয়। তবে উদাহরণ স্বরূপ কয়েকটি উল্লেখ করা যেতে পারে:
১.নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনাস রা. জন্য দুআ করতে যেয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ! তাকে সন্তান ও সম্পদে বৃদ্ধি দান কর, এবং যা দিয়েছ তাতে বরকত দাও' তার হায়াত বৃদ্ধি কর, তার গুনাহ ক্ষমা কর' আনাস বললেন, আল্লাহর শপথ! 'নিশ্চয় আমার সম্পদ অনেক হয়েছে, আমার সন্তান সন্ততি এক শতের মত। আমার মেয়ে আমিনা আমাকে সংবাদ দিয়েছে, আমার বংশের একশত উনত্রিশ জন লোককে বসরার হিজাজে দাফন করা হয়েছে।
তার একটি বাগান ছিল। তাতে বছরে দুবার ফল আসত। বাগানের মাঝে এমন ফুল ছিল, যা থেকে মেশকের সুগন্ধি আসতো।'
২. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু হুরায়রা রা. এর মায়ের হেদায়েতের জন্য দুআ করলে ততক্ষণাৎ দুআ কবুল হয় এবং তার মা মুসলমান হয়ে যায়।
৩. উরওয়া বিন আবু যায়েদ আল বারিকি রা. এর জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'আ করলেন, 'হে আল্লাহ! তার ক্রয় বিক্রয়ে বরকত দাও।' ফলে তিনি বাড়ি ফেরার পূর্ব মূহুর্তে কুফা শহরে অবস্থান কালে ব্যবসায় চল্লিশ হাজার আয় করেন। তার অবস্থা এমন হয় যে, মাটি বিক্রয় করলে তাতেও তিনি লাভবান হতেন।
৪. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কতিপয় শত্রুর বিরুদ্ধে বদ দু'আ করলে তা কবুল হয়। যেমন আবু জাহেল, উমাইয়্যা, উকবা, উতবা প্রমুখ।
৫. বদর যুদ্ধের সময় দু'আ, হুনাইন যুদ্ধের সময় দু'আ, সূরাকা বিন মালেকের জন্যে দু'আ ইত্যাদি সবগুলোই কবুল হয়েছে।'
প্রকৃত কথা হলো- সুবিচারক জ্ঞানী এবং ধর্মানুরাগী এসব দলীল ও শিহরণ সৃষ্টিকারী প্রমাণাদির সামনে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য। এবং তার ঈমান গ্রহণ না করে অন্য উপায় ও থাকে না। তাই সে হৃদয় মন থেকে উচ্চারণ করে 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই, এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।'
টিকাঃ
১ আল জাওয়াবুস সাহীহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ। ১/১৪৪,১৬৬। ২ সূরা আল-আরাফ১৫৮। * সূরা আল-ফুরকান ০১।
২ الداعي إلى الإسلام . * সহীহ আল বুখারী ৪৯৮১, সহীহ মুসলিম ১৫২
৩ সূরা আল-আনআম, ১৯। ৪ সূরা আলে ইমরান.২০। * সূরা আল আহযাব, ৪০।
৪ সূরা আম্বিয়া, ১০৭। ৫ সূরা সাবা, ২৮। ৬ সহীহ আল-বুখারী, ৪৩৮, সহীহ মুসলিম, ৫২১। * সহীহ আল-বুখারী, বাবু খাতামিন নাবিয়্যিন, ৩৫৩৫, সহীহ মুসলিম ২২৮৬।
৫ সহীহ মুসলিম, ১৫৩। ৬ সূরা আল-আনআম, ১০৪। * সূরা আল-কাহফ, ২৯।
৬ হিদায়াতুল হায়ারা ফি আজবিবাতিল ইয়াহুদে ওয়ান নাসারা, পৃ ৫১৪-৫২৫।
৭ প্রমাণিত যে, নবী স. আরো অনেকের ব্যাপারে জান্নাতবাসী বলে সুসংবাদ দিয়েছেন, তম্মধ্যে আশারা মুবাশিরা, কারো কারো মত হলো সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাসের উদ্দেশ্য ছিল তখনকার সময় যারা জীবিত তারা। কারণ আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম তাদের পর ও জীবিত ছিলেন। আশারা মুবাশিরার মধ্যে তার সময় সা'দ ও সাঈদ ছাড়া আর কেহ অবশিষ্ট ছিল না। তাছাড়া 'যারা যমীনে বিচরণ করছেন' এ উক্তিটি সা'দা বিন আবু ওয়াক্কাস রা. এর নিজস্ব মন্তব্য। ফাতহুল বারি ১২৯-১৩০/৭।
৮ হিদায়াতুল হিয়ারা ৫২৫। ৯ সূরা মায়েদা, ৮২। ১০ সহীহ আল-বুখারী ৪৯৯৮, সহীহ মুসলিম, ৭৮২। ১১ সহীহ আল-বুখারী ৪৪৩৩, সহীহ মুসলিম, ২৪৫০। ১২ সহীহ আল-বুখারী, ৪৪৩০।
৯ জুল হুলাইফার একটি এলাকার নাম। ১০ কারো কারো মত এ সংখ্যা ৯০ হাজার কারো কারো মত হলো এক লক্ষ ত্রিশ হাজার- ফাতহুল মালিকুল মাবুদ ১০৫/২/৯ ১১ অর্থাৎ তিনি জাহেলি সকল কর্ম কান্ড বাতিল করে দিলেন অতএব এটার আর কোন কার্যকরিতা নাই । ফাতহুল মালিকিল মাবুদ ১৮/২।
১০ এর দ্বারা উদ্দেশ্য যা মূল ধনের অতিরিক্ত, করণ মূল ধন মালিক পাবে। ১১ কালেমার অর্থ ১. সম্মান জনক ভাবে বিদায় এবং সুন্দর ভাবে গ্রহণ ২. লাইলাহ ইল্লাল্লাহ ৩.ইজাব ও কবুল ৪. এর দ্বারা কোরআনের সূরা নিসার ৩ নং আয়াত উদ্দেশ্য 'তোমাদের মনমত দুইটি ও তিনটি ও চারটিকে বিয়ে কর; ইসলামী বিদ্বানগণ এটিকেই বিশুদ্ধ মত বলে মনে করেন কারণ এতে উল্লেখিত সবগুলো অর্থ এসে যায়। ফাতহুল মালিকল মা'বুদ ১৯/২। ১২ অর্থাৎ নারী অথবা পরুষ কাউকে যেন স্ত্রী ঘরে আসতে অনুমতি নাদেয়। এর দ্বারা এ উদ্দেশ্য নয় যে, তারা যেন ব্যভিচারির অনুমতি নাদেয় কারণ জিনা সর্বাবস্থায় হারাম স্বামী পছন্দ হোক অথবা অপছন্দ। প্রাগুপ্ত। १३ অর্থাৎ তোমাদের মাঝে এমন বস্তু রেখে গেলাম যদি তা বিশ্বাসে ও আমলে মজবুত হয় ত তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না, আর তা হলো আল্লাহর কিতাব যা সামনে পেছনে কোন দিক থেকে বাতিল আসতে পারে না, হাদীসের উল্লেখ এজন্যে করা হয়নি, কারণ কোরআন হলো দ্বীনের মূল, অথবা এ জন্যে যে কোরআনেই তো হাদীসের অনুসরণ করতে বলেছে। ফাতহুল মালিকিল মা'বুদ, ২০/২। ১৪ সহীহ মুসলিম, ১২১৮। ১৫ কারো কারো মত হলো একলক্ষ্য ত্রিশ হাজার ফাতহুল মালিকিল মা'বুদ ১০৫/২।
১১ ইবনে কাসির ১২/২। ১২ সহীহ মুসলিম, ১২৯৭। ১৩ সহীহ মুসলিম, ১২৯৮।
১২ হাদি বলা হয়: হজের অংশ হিসাবে যে পশু জবেহ করা হয়। १३ ফাতহুল বারী ৫৭৭,৫৭৪/৩ ফাতহুল মালিকিল মাবুদ।
১৩ বাকিউল গারকাদ: মদীনাবাসীদের কবর স্থান। গাকাদ মূলতঃ একপ্রকার কাটা গাছ, এখানে কোনো এক সময় এ গাছগুলো ছিল, তাই এর নাম হয়ে গেছে গারকাদ বলে। নববির ব্যাখ্যা গ্রন্থ ৭/৪৬, ইমাম উব্বির ব্যাখ্যা গ্রন্থ ৪/৩৯০ ১৪ সহীহ মুসলিম : ৯৭৪
১৪ ইবনে হিশাম: ৪/৩২০ আল-বিদায়া ও আল-নেহায়া ৫/২২৪ ফাতহুল বারী: ৮/১২৯-১৩০ আহমদ: ৬/১৪৪ সুনানে দারামি: ৮০ ১৫ ইবনে হিশাম: ৪/৩২০ আল-বিদায়া ও আল-নেহায়া ৫/২২৩-২৩১ কেউ কেউ বলেছেন ঘটনাটি হল সফরের ২৯ তারিখ, বৃহস্পতিবারের। তের দিন ছিলেন অসুস্থ অবস্থায়। এটাই অনেকের বক্তব্য। ফাতহুল বারী: ৮/১২৯ * সহীহ আল বুখারী ১৯৮, সহীহ মুসলিম: ৪১৮
১৫ সহীহ আল-বুখারী ৬৮৭, সহীহ মুসলিম ৪১৮ ১৬ কারো ধারণা এ নামাজটি ছিল, ফজরের। তাদের দলিল, ইবনে আব্বাস হতে আরকাম বিন শারাহবিল এর রেওয়াতে। আবু বকর যেখানে শেষ করেছেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে কেরাত পড়া আরাম্ভ করেছেন। ইবনে মাজার বর্ণাকৃত এ হাদিসটির সনদ যদিও হাসান, তবে এর দ্বারা দলিল দেয়া সংঘত নয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরের অতি নিকটে গিয়েছেন ফলে কেরাত শুনেছেন এরও তো সম্ভাবনা রয়েছে। তার ব্যাপারে আছে, আস্তে কেরাত পড়ার নামাজেও তিনি অনেক সময় অপরকে শুনার মতো আওয়াজ করে কেরাত পড়তেন। যেমন আবু কাতাদার হাদীসে এর প্রমাণ বিদ্যমান আছে। এর পরেও যদি মেনে নেই যে, জোরে কেরাত পড়ার নামাজ ছিল, তবু প্রমাণিত হয় না যে, এটা ফজরের নামাজ ছিল, বরং মাগরিবের নামাজ হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা রয়েছে। সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিমে উম্মে ফজল হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: আমি মাগরিবের সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে والمرسلات عرفا সুরা পড়তে শুনেছি। এর পরে কোনো দিন জমাতের সহিত নামাজ পড়েননি, ইহধাম ত্যাগ করে যান। সহীহ আল-সহীহ আল বুখারী ৭৬৩, ৪৪২৯ সহীহ সহীহ মুসলিম ৪৬২, ইবনে হাজার রহ. বলেন, নাসায়ীর একটি বর্ণনায় আছে, উম্মে ফজল যে নামাজের কথা উল্লেখ করেছে, সে নামাজ তার বাড়িতে ছিল। ইমাম শাফি রহ. বলেছেন, যে অসুখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন, সে অসুখে এক ওয়াক্ত নামাজ শুধু মসজিদে পড়েছেন। আর সেটা এ নামাজই যে নামাজে তিনি বসে নামাজ পড়েছেন এবং যেখানে আবু বকর প্রথমে ইমাম ছিল পরবর্তীতে মুক্তাদি হয়েছেন। আর অন্যদের তাকবীর শুনাতেন। আল-ফাতহ: ২/১৭৫
১৬ সহীহ আল - বুখারী ৪৪৩৯, ৫০১৬, ৫৭৩৫, ৫৭৫১, সহীহ মুসলিম ২১৯২, এ আমলটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমের সময়ও করতেন। তিনি ঘুমের সময় সুরায়ে নাস, ফালাক এবং ইখলাস পড়ে হাতের উপর দম করে চেহারা এবং হাত পৌঁছে এমন সকল স্থান মেসেজ করতেন। সহীহ আল - বুখারী ৫৭৪৮ ১৭ সহীহ মুসলিম ২১৯২
১৭ সূরা আল-আহযাব : ৩০
১৮ সহীহ আল - বুখারী ৪৪৩৬, ৪৪৩৭, ৪৪৬৩, ৪৫৮৬, ৬৩৪৮, ৬৫০৯ সহীহ মুসলিম ২৪৪৪
১৯ সহীহ আল বুখারী ৮৯০, সহীহ মুসলিম: ২৪৪৪ ২০ সুরা আন-নিসা: ৬৯ ২১ ফাতহুল বারি: ৮/১৩৮ ইমাম নববীর ব্যাখা গ্রন্থ: ১৫/২১৯ * সহীহ আল বুখারী ৬৫০৭, সহীহ মুসলিম: ২৬৮৩
২০ সহীহ আল বুখারী ৪৪২৮ ২১ ফাহুল বারী: ৮/১৩১
২২ সহীহ আল বুখারী ৩৬১৭, সহীহ মুসলিম, ২৭৮১। ২৩ সহীহ মুসলিম, ২৪৮০। २४ আল-আদাবুল মুফরাদ, ৬৫৩। ২৫ সহীহ মুসলিম, ২৪৮১,১৪৩।
২২ সুরা যুমার: ৩০ ২৩ সুরা আম্বিয়া: ৩৪ ২৪ সূরা আলে ইমরান: ১৮৫
২৩ সহীহ আল বুখারী ১১৪১, ১৪২, ৩/১১৩, ৩৬৬৭, ৩৬৬৮, ৭/১৯, ৪৪৫২, ৪৪৫৩,৪৪৫৪, ৮/১৪৫ ২৪ সুরা আলে ইমরান: ১৪৪
📄 মানব ও জিনের প্রতি তাঁর কোলাহলের সর্বজনীনতা
প্রকৃত কথা হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সব বিষয় নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন তা বাস্তবায়ন করা সকলের দায়িত্ব। জিন-ইনসান, আরব-অনারব, ইহুদী-খ্রিষ্টান, আগুন পূজারী, সূর্য পূজারী, রাজা- প্রজাসহ সকল সৃষ্টিজীবের জন্য আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহকে পেতে হলে প্রকাশ্যে এবং গোপনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনুগত্য ছাড়া অন্য কোন পথ নেই। এমনকি তার নবুওয়ত কালে যদি মুসা বা ঈসা কিংবা অন্য কোন নবী জীবিত থাকতেন, তবে তাদের উপরও তার আনুগত্য করা অপরিহার্য হত।
যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُمْ مِنْ كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُصَدِّقُ لِمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرُنَّهُ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِي قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُمْ مِنَ الشَّاهِدِينَ ﴿٨١﴾ فَمَنْ تَوَلَّى بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴿٨٢﴾
'এবং আল্লাহ যখন নবীগণের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, আমি তোমাদেরকে গ্রন্থ ও দৃঢ় প্রজ্ঞা যা দান করলাম তারপর যখন একজন রাসূল আগমন করবেন, যিনি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান কিতাবের সত্যতা স্বীকার করবেন। তখন তোমরা অবশ্যই তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তার সাহায্যকারী হবে; তিনি আরও বলেছিলেনঃ তোমরা কি অঙ্গীকার গ্রহণ করলে এবং এর দায়িত্বের বোঝা গ্রহণ করলে? তারা বলেছিল, 'আমরা স্বীকার করলাম।' তিনি বললেন, 'তবে তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষীগণের অন্তর্ভূন্ত রইলাম। সূতরাং এরপরে যারা ফিরে যাবে, তারাই দুষ্কার্যকারী।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আল্লাহ কোন নবী প্রেরণ করেননি তবে তার কাছ থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, যদি তোমার জীবিত থাকাকালে মুহাম্মাদ প্রেরিত হয় তবে অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবেন এবং তাকে সাহায্য করবেন। এবং তার প্রতি এ আদেশ ও ছিল যে, তার উম্মত থেকেও সে এ অঙ্গীকার নিবে যে তাদের জীবদ্বশায় মুহাম্মাদ প্রেরিত হলে তারা তার প্রতি ঈমান আনয়ন করবে এবং তাকে সাহায্য করবে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আজকে যদি মূসা তোমাদের মাঝে জীবিত থাকতো তাকেও আমার আনুগত্য করতে হতো।'
যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সার্বজনীন রিসালাতের বিরোধীতা করে, সে দু কারণের কোন এক কারণে তা করে থাকে।
১. বিরুদ্ধাচরণকারী ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত; তবে তার রিসালত শুধু আরব জাতির জন্য।
২. বিরুদ্ধাচরণকারীরা তার রিসালত অস্বীকার করে আংশিকভাবে, আবার তাদের কেহ পূর্ণভাবে।
যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রিসালাতকে স্বীকার করে, তবে সে তার রিসালতকে শুধু আরব জাতির জন্য নির্দিষ্ট করে। এ ব্যক্তির জন্য অবশ্যই জরুরী আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপর অবর্তীণ সব কিছুকে সত্যায়ন করা। তম্মধ্যে আছে তার রিসালতের সামগ্রিকতা এবং রিসালতে মুহাম্মাদী ব্যতীত অন্যগুলো রহিত হওয়া। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন, তিনি প্রেরিত হয়েছেন সকল মানুষের জন্য। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূত প্রেরণ করেছেন এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কিসরা, কায়সার, নাজ্জাসীসহ অন্যান্য রাষ্ট্র প্রধানের নিকট ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত চিঠি পাঠিয়েছেন। এবং মুশরিকদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। এবং ইহুদী, খ্রিষ্টানদের সাথে লড়াই করেছেন। তাদের বংশধরদের গ্রেফতার করেছেন। তাদের উপর জিযিয়া কর ধার্য্য করেছেন। যদি আপনি তাকে আল্লাহর প্রেরিত নবী হিসাবে স্বীকার করেন তখন তার কথাগুলোকে ও তিনি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছেন তা সবই বিশ্বাস করতে হবে, মেনে নিতে হবে আপনাকে। নয়তো আপনি নিজেকে নিজ বিশ্বাসে পরস্পর বিরোধী রোগে আক্রান্ত বলে প্রমাণিত করবেন।
যে ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রিসালতকে অস্বীকার করে, তার জন্য বক্তব্য হল- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রিসালতের সত্যতার উপর রয়েছে অকাট্য দলিল-প্রমাণ। এখনও কুরআনের মুজিযা জিন- ইনসানের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসাবে বিরাজ করছে। তাই তাকে হয়তবা সুপ্রতিষ্ঠিত মুজিযাকে খণ্ডন ও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে, নয়তবা তাকে স্বীকার করে নিতে হবে এর বক্তব্য। যদি রিসালাতকে স্বীকার করে অবশ্যই তাকে মেনে নিতে হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক বর্ণিত সকল কিছু। যদি অহংকারী- বিদ্বেষী হয় তবে তাকে অবশ্যই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট প্রেরিত কুরআনের মত একটি কিতাব পেশ করতে হবে। এটা করতে গেলে নিঃসন্দেহে সে কলঙ্ক ও দোষে পতিত হতে হবে। কারণ ভাষা সাহিত্যিক ও অলংকারবিদরা যুগ যুগ ধরে এতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে সন্দেহের কোন কারণ নেই পরবর্তিতে যারা আসবে তাদেরও ব্যর্থ হতে হবে, কারণ কুরআন সুপ্রতিষ্ঠিত অলৌকিক গ্রন্থ অনন্ত কালের জন্য।
এর মধ্য দিয়ে কুরআন অনুযায়ী আমল করার, এবং কুরআন মত বিচার ফায়সালা করার অবশ্যকতা প্রমাণিত হয়। কুরআন তো স্পষ্টভাবে বলেছে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন সকল মানুষের জন্য। এবং নবীদের মধ্যে তিনি শেষ নবী। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ ﴿١٥٨﴾
"বলে দাও, হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের সকলের জন্যে সেই আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি, যিনি আকাশমণ্ডল ও ভূ মন্ডলের সার্বভৌম একচ্ছত্র মালিক, তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই, তিনি জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান, সুতরাং আল্লাহর প্রতি এবং তার সেই বার্তাবাহক নিরক্ষর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ঈমান আনয়ন কর। যে (নবী) আল্লাহতে ও তার কালামে বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে। তোমরা তারই অনুসরণ কর, আশা করা যায় তোমরা সরল সঠিক পথের সন্ধান পাবে।"
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا
"কত মহান তিনি, যিনি তার বান্দার প্রতি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্যে সতর্ককারী হতে পারেন।"
আল্লাহ তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সতর্ক করার জন্য আদেশ করছেন। আল্লাহ বলেনঃ
وَأُوحِيَ إِلَيَّ هَذَا الْقُرْآنُ لِأُنْذِرَكُمْ بِهِ وَمَنْ بَلَغَ
"আর এ কুরআন আমার নিকট অহীর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে, যেন আমি তোমাদেরকে এবং যাদের নিকট এটা পৌঁছবে তাদের সকলকে এর দ্বারা সতর্ক ও সাবধান করি।” যার কাছে কুরআন পৌঁছেছে তাদের প্রত্যেকের জন্য এটা এক স্পষ্ট ঘোষণা।
আহলে কিতাব (ইহুদী ও খৃষ্টানদের) রিসালাতে মুহাম্মদীর অর্ন্তভূক্ত বলে আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ
وَقُلْ لِلَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ وَالْأُمِّيِّينَ أَأَسْلَمْتُمْ فَإِنْ أَسْلَمُوا فَقَدِ اهْتَدَوْا وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلَاغُ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ
"যাদেরকে গ্রন্থ প্রদান করা হয়েছে ও যারা নিরক্ষর তাদেরকে বল, তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করেছো? নিশ্চয়ই তারা সুপথ পেয়ে যাবে যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর যদি তারা ফিরে যায়, তবে তোমার উপর দায়িত্ব তো শুধু পৌঁছে দেয়া মাত্র। আর আল্লাহ বান্দাদের প্রতি সম্যক দ্রষ্টা।”
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ
"মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী"
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ "আমি তো তোমাকে সৃষ্টিকুলের প্রতি শুধু রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি”
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ ﴿۲۸﴾ سورة سبأ "আমি তোমাকে সমগ্র মানব জাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানেনা।”
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষকে এ বার্তা পৌছে দিয়েছেন যে, তিনি নবীদের মধ্যে সর্বশেষ নবী এবং তার রিসালত হচ্ছে সার্বজনীন এক রিসালাত। তিনি বলেন, 'আমাকে পাঁচটি বস্তু প্রদান করা হয়েছে যা ইতোপূর্বে আর কোন নবীকে দেয়া হয়নি। তম্মধ্যে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, অন্যান্য নবীদের প্রেরণ করা হতো নির্দিষ্ট কাওমের প্রতি, আর আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে সকল মানুষের প্রতি....।'
তিনি আরো বলেনঃ 'আমার এবং আমার পূর্ববর্তী নবীদের উদাহরণ হল ঐ ব্যক্তির মত যে খুব সুন্দর করে একটি প্রাসাদ তৈরী করল, তবে একটি কোণের একটি ইট বাদ থেকে গেল, (ঐ জায়গাটি খালি ও অপরিচ্ছন্ন) লোকেরা দেখে বিস্মিত হয়ে বলতে লাগল, 'আহা! যদি এ ইট খানি দেওয়া হতো কতইনা ভাল হতো! তিনি বলেন, 'আমি ঐ কাঙ্খিত বস্তুটি, এবং আমি নবীদের মাঝে শেষ নবী।'
জ্বিন- ইনসান সকলের জন্য সর্বত্র ও সর্বকালে-তার প্রেরণ কাল হতে মহাপ্রলয় পর্যন্ত তার রিসালত ব্যাপক হওয়া এবং রিসালতসমূহের মধ্যে সর্বশেষ রিসালত হওয়া, সন্দেহাতীত প্রমান করে তার পরে ঐশী বাণীর আগমন ও নবুওয়ত প্রাপ্তির অবসান করা হয়েছে সম্পূর্ণভাবে। এবং ইবাদত ও বিধান প্রণয়নের জন্য কুরআন ও সুন্নাহ ছাড়া আর কোন মূলনীতি নেই। আর এটার দাবী হল, তার রিসালতের ব্যাপকতাকে বিশ্বাস করার এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণ করার। তিনি বলেন, 'যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন এ উম্মতের ইহুদী এবং খ্রিষ্টানদের যে কেউ আমার সর্ম্পকে জানবে এবং আমার উপর প্রেরিত রিসালাতকে বিশ্বাস না করে মৃত্যু বরণ করবে তাহলে সে জাহান্নামীদের অর্ন্তভূক্ত হবে।'
আল্লাহর অনুগ্রহে- রিসালাতে মুহাম্মদীর সার্বজনীন ও সামগ্রিতা সকল জিন-ইনসানের জন্যে প্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে- কেয়ামত অবধি সর্বত্র ও সর্বকালে।
قَدْ جَاءَكُمْ بَصَائِرُ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنْ أَبْصَرَ فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ عَمِيَ فَعَلَيْهَا وَمَا أَنَا عَلَيْكُمْ بِحَفِيظٌ "নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে সত্য দর্শনের উপায়সমূহ পৌঁছেছে। এবং যে ব্যক্তি নিজে গভীর দৃষ্টিতে অবলোকন করবে, সে নিজেরই কল্যাণ সাধন করবে, আর যে অন্ধ থাকবে সে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর আমি তো তোমাদের প্রহরী নই।”
وَقُلِ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ "বলঃ সত্য তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে প্রেরিত; সুতরাং যার ইচ্ছা বিশ্বাস করুক ও যার ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করুক।”