📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 সহমর্মিতা ও কোমলতা

📄 সহমর্মিতা ও কোমলতা


প্রথমত: সহানুভূতিশীলতার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উৎসাহ প্রদানঃ
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, 'যাকে সহমর্মিতা বা সহানুভূতিতা প্রদান করা হল, দুনিয়া ও আখেরাতের সর্ব প্রকার কল্যাণ তাকেই প্রদান করা হল, আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, উত্তম চরিত্র এবং উত্তম প্রতিবেশী শহরকে বসবাস করার উপযোগী করে এবং তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি বিষয়ে নমনীয়তা, দয়াদ্রতা এবং সহানুভূতির প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন এবং তার কথা, কাজ ও ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এ ছাড়া সকল গুণাবলির বাস্তব প্রয়োগ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতে কলমে শিখিয়ে দিয়েছেন, যাতে প্রতিটি উম্মত তাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে তা কাজে লাগাতে পারে।
বিশেষ করে, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী দাওয়াত-কর্মী ও সংস্কারকদের এ বিষয়ে আরো বেশি সজাগ থাকতে হবে। কারণ, তাদের জন্য নম্রতা, সহনশীলতা, সহানুভূতি, তাদের দাওয়াতের ক্ষেত্রে উঠা-বসা চলাফেরা ইত্যাদিতে। মোট কথা প্রতিটি মুহূর্তে তাদের জন্য এর অনুশীলন এবং চর্চা একান্ত অপরিহার্য। উল্লেখিত হাদীস এবং পরবর্তী হাদীসগুলোতে নম্র ব্যবহার ইত্যাদির ফজীলত ও বিনয়ী হওয়ার প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া যে কোন উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়া, খারাপ আচরণ ও দুশ্চরিত্র হতে বিরত থাকা এবং খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করার প্রতিও দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
মনে রাখতে হবে, নম্রতা সকল কল্যাণের দ্বার খুলে দেয় এবং সকল প্রকার মহৎ উদ্দেশ্য নম্রতা-ভদ্রতা এবং সৎ-চরিত্রের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। যাদের মধ্যে এ সব গুণাবলি রয়েছে তাদের জন্য তাদের গন্তব্যে পৌঁছা বা উদ্দেশ্য হাসিল করা খুবই সহজ হয়।
আর নম্রতা বা সুন্দর চরিত্র দ্বারা যে সওয়াব বা পুণ্য লাভ হয়, তার বিপরীতে অন্য কোন নেক আমল দ্বারা তা কল্পনা করা দুষ্কর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভদ্রতা হতে সতর্ক করেছেন। এবং তার উম্মতের উপর কোন ধরনের কঠোরতা করা হতে সম্পূর্ণ নিষেধ করেন।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমার এ ঘরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'হে আল্লাহ! আমার উম্মতের কেউ যদি ক্ষমতাশীল হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যায়ভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তুমি তার উপর ক্ষমতা প্রয়োগ এবং কঠিন আচরণ কর।'
'আর যে ক্ষমতাশীল হওয়া সত্ত্বেও তা অন্যায়ভাবে প্রয়োগ না করে মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার ও নম্র-ভদ্র আচরণ করল, তুমি তার সাথে ভাল ব্যবহার এবং তার প্রতি দয়া কর।'
রাসূল কাউকে বিশেষ কোন কাজে প্রেরণ করলে, তাকে সহজ করা, চাপ প্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন না করার আদেশ দিতেন।
আবু মুসা আশয়ারী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে কোন কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করলে বলতেন, 'তোমরা সুসংবাদ দাও, সহজ কর এবং কঠোরতা করো না।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ যখন কোন পরিবারে কল্যাণ চান তাদেরকে নম্র হওয়ার সুযোগ দেন।'
আবু মুসা আল আশআরী ও মুআজ ইবনে জাবালকে ইয়েমেনের উদ্দেশ্যে প্রেরণের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বলেন, 'তোমরা মানুষের উপর সহজ কর। কঠিন করো না। তাদের সুসংবাদ দাও, আতঙ্কিত করো না। আনুগত্য করো মতবিরোধ করো না।
আনাস রা. হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা সহজ কর, কঠিন করো না সুসংবাদ দাও আতঙ্কিত করো না।
উল্লেখিত হাদীসগুলোর শব্দাবলীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহজ করার আদেশ এবং এর বিপরীতে কঠিন করার নিষেধ দুটোই উল্লেখ করেন। কারণ, হতে পারে কোন ব্যক্তি কখনো সহজ করল এবং কখনো কঠিন করল আবার কখনো সুসংবাদ দিল আবার কখনো আজাব এবং শাস্তির কথা শুনালো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে যদি শুধু সহজ করার কথা বলতেন, তাহলে কোন ব্যক্তি একবার বা একাধিকবার সহজ করলেই তাকে হাদীসের ভাষার মর্মার্থের প্রতি আনুগত্যশীল বলা যেত। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আলাদা ভাবে 'কঠোরতা করো না' বললেন, তখন কঠোরতার বিষয়টি সর্বাবস্থায় সর্বক্ষেত্রে এবং সকল বিষয়ে রহিত হয়ে যায়। আর হাদীসের অন্তর্নিহিত মর্মবাণী এ দিকেই নির্দেশ করেন।
অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা আনুগত্য কর, মতবিরোধ করো না।' দুটি শব্দ বলার কারণ হল, দুই জন কখনো কোন বিষয়ে এক হলেও, আবার কখনো দেখা গেল মতপার্থক্য করল। আবার কোন বিষয়ে একমত হল আবার অন্য কোন বিষয়ে একমত না ও হতে পারে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না' কথাটা আলাদাভাবে বলে দিলেন, ফলে বিচ্ছিন্ন হওয়া সব সময়ের জন্য এবং সকল ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখিত হাদীস ছাড়াও বিভিন্ন হাদীসে আল্লাহর অসংখ্য নেআমত, মহা পুরস্কার এবং আল্লাহর অপার অনুগ্রহের সু-সংবাদ দেয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান ব্যতীত শুধু আজাব-গজব, শাস্তি-ধমকি, হুমকি দিয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করা হতে নিষেধ করেন। হাদীসের নির্দেশাবলীতে 'মন রক্ষা কর, তাদের উপর কোন প্রকার কঠোরতা করো না' করা হয় ইসলামে নব দীক্ষিতদের জন্য। এ ছাড়াও প্রাপ্ত বয়স্ক ও যারা গুনাহের কাজ হতে ফিরে আসতে চায় তাদের প্রতি নমনীয় আচরণ করে ধীরে ধীরে তাদের ইসলামের অনুশাসনে অভ্যস্ত করতে হবে। হাদীসে যে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে তাতে এ ধরনের লোকদেরও ইসলামী জীবন যাপন পদ্ধতি অবলম্বন করা সহজ হয়।
ইসলামের বিধি বিধান কখনো একত্রে চাপিয়ে দেয়া হয়নি বরং ধাপে ধাপে মানুষের উপর ফরজ করা হয়েছে। ফলে যারা ইসলামে প্রবেশ করত বা প্রবেশের ইচ্ছা পোষণ করত তাদের ইসলাম পালন করা সহজ হত এবং ইসলামে দীক্ষিতের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকত। আর যদি প্রথমেই কাউকে সব কিছু চাপিয়ে দেয়া হত, তাহলে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা কমে যেত এবং কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করলেও চাপের মুখে পলায়ন করত।' এমনিভাবে জ্ঞান অর্জন, শিক্ষা দীক্ষার ক্ষেত্রে ও ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের বিভিন্ন সময় বিরতি দিতেন এবং এক দিন পর পর তালীম তরবিয়ত বা শিক্ষা মূলক বৈঠক করতেন। যাতে তারা বিরক্ত না হয় এবং অস্বস্তি অনুভব না করে।'
মোট কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন, এ উম্মতের সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী। সর্ব প্রকার কল্যাণের পথ প্রদর্শক, সংবাদ দাতা, এবং সকল অন্যায়, অনাচার, পাপাচার হতে বাধা দানকারী এবং ভীতি প্রদর্শনকারী। উম্মতকে যারা কষ্ট দেন, তাদের অভিশাপ করেন এবং যারা উম্মতের সাথে ভাল ব্যবহার করেন ও তাদের কল্যাণ কামনা করেন, তিনি তাদের জন্য দুআ ও শুভ কামনা করেন। আয়েশা রা. এর উল্লেখিত হাদীস এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
সুতরাং বলা বাহুল্য যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে কষ্ট দেয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা পরিহার করতেন। আর যারা মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করে এবং তাদের প্রতি মমতা বোধ জাগিয়ে তোলার জন্য কাজ করে তাদের বিশেষ গুরুত্ব দেন।
প্রথম দৃষ্টান্ত: ব্যভিচার করার জন্য এক যুবকের অনুমতি প্রার্থনা
আবু উমামা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একটি যুবক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন,' তার কথা শুনে উপস্থিত সবাই তাকে ভর্ৎসনা করতে লাগল এবং থামাতে চেষ্টা করল। রাসূল বললেন, 'তুমি কাছে এসো!' যুবকটি তার নিকটে গেল। তিনি বললেন, 'তুমি কি তোমার মায়ের সাথে ব্যভিচারকে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। দুনিয়ার কেউই তা পছন্দ করে না।' তারপর বললেন, 'তুমি কি তোমার মেয়ের সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন- দুনিয়ার কোনো মানুষই তা পছন্দ করবে না।' তিনি বললেন, 'তুমি তোমার বোনের সাথে অপকর্ম করতে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন- দুনিয়ার কোন মানুষ তার বোনের সাথে অপকর্ম করতে পছন্দ করবে না।' তিনি বললেন, 'তুমি কি তোমার ফুফুর সাথে অপকর্ম করতে পছন্দ কর?' সে বলল, 'কসম আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন, দুনিয়ার কোনো মানুষই তার ফুফুর সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ করে না।' তারপর বললেন, 'তুমি কি তোমার খালার সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন-দুনিয়ার কোনো মানুষই তার খালার সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ করে না।' এরপর তিনি তার শরীরে হাত রেখে বললেন, 'হে আল্লাহ! তুমি গুনাহসমূহ ক্ষমা কর এবং আত্মাকে পবিত্র কর লজ্জাস্থানকে হেফাজত কর।' সে দিন থেকে যুবকটি কখনো ব্যভিচারের দিকে মনোযোগ দেয়নি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ হতে একজন সংস্কারকের জন্য মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার, তাদের প্রতি দয়া এবং সহানুভূতির গুরুত্ব বিশেষভাবে অনুধাবন করা যায়। বিশেষ করে যারা ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার আশা করে, ঈমানকে বৃদ্ধি করার চেষ্টায় ব্যাকুল এবং ইসলামের উপর অটল অবিচল থাকার বিষয়ে প্রত্যয়ী হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাজ-কর্মে এবং আদেশ-নিষেধের মাধ্যমে প্রতিটি ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: ইহুদীর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যবহার
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, এক দল ইহুদী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বলল, 'আস্সামু আলাইকুম' (তোমাদের জন্য মৃত্যু)। আয়েশা রা. বলেন, আমি অভিশপ্ত ইহুদীদের ধোঁকা-বাজী বুঝতে পেরে বলি 'ওয়া আলাইকুমুস্লাম ওআললনাতু' (তোমাদের জন্য মৃত্যু ও অভিশাপ)। এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সাবধান! হে আয়েশা, আল্লাহ প্রতিটি কাজে নমনীয়তাকে ভালোবাসেন।' আমি বললাম, 'হে রাসূল! তারা কি বলল, আপনি তা শুনেননি?' রাসূল বললেন, 'অবশ্যই শুনেছি এবং তাদের উত্তরে আমি বলেছি ওয়া আলাইকুম (তোমাদের জন্যও)।' এ টুকুই বলাই যথেষ্ট। এবং তিনি বলেন, 'হে আয়েশা! নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা প্রতিটি কাজে নমনীয়তাকে পছন্দ করেন। নমনীয়তার উপর যে ধরনের বিনিময় এবং সওয়াব দেন, কঠোরতা এবং অন্য কোন আমলের উপর এ পরিমাণ বিনিময় ও সওয়াব দান করেন না।
তিনি আরো বলেন, 'যে কোন বিষয়ে নমনীয়তা প্রদর্শন সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করে এবং কঠোরতা প্রদর্শন তিক্ততা ছড়ায়।'
তিনি বলেন, 'নমনীয়তা হতে বঞ্চিত ব্যক্তি মানেই যাবতীয় কল্যাণ হতে বঞ্চিত।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যাকে নমনীয়তা হতে বঞ্চিত করা হয়, তাকে অবশ্যই দুনিয়া ও আখেরাতের সকল প্রকার কল্যাণ হতে বঞ্চিত করা হয়।'
আবু দারদা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যাকে নম্রতা বা ভদ্রতার ক্রিয়দাংশ প্রদান করা হয়, তাকে যাবতীয় কল্যাণেরও ক্রিয়দাংশ প্রদান করা হয়। আর যাকে নম্রতা বা ভদ্রতা হতে আংশিক বঞ্চিত করা হয়, তাকে যাবতীয় কল্যাণ হতেও আংশিক বঞ্চিত করা হয়।'
আবু দারদা হতে আরো বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল বলেন, 'যাকে নম্রতা বা ভদ্রতার ক্রিয়দাংশ দেয়া হয়, তাকে যাবতীয় কল্যাণেরও ক্রিয়দাংশ দেয়া হয়। উত্তম চরিত্র হতে কোন আমলই ভারী হতে পারে না।'
তৃতীয় দৃষ্টান্ত: মসজিদে পেশাবকারীর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
আনাস বিন মালেক রা. হতে বর্ণিত, একদা আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে মসজিদে অবস্থান করছিলাম। ঠিক এ মুহূর্তে একজন গ্রাম্য লোক এসে মসজিদে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে আরম্ভ করল। এ দেখে সাহাবারা তাকে থামানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাকে পেশাব করতে বাধা দিও না', ফলে তারা পেশাব করার জন্য সুযোগ দেন। পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাছে ডেকে বললেন, 'মসজিদ পেশাবের জায়গা নয় বরং মসজিদ হলো আল্লাহর জিকির, কুরআন তিলাওয়াত এবং নামাজের স্থান।' তারপর এক ব্যক্তিকে আদেশ দিলেন- এক বালতি পানি তার পেশাবে ঢেলে দেয়ার জন্য।
সহীহ আল-বুখারীর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এ লোকটি বলেছিল, 'হে! আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রহম কর, আমাদের দুইজন ছাড়া আর কাউকে অনুগ্রহ করো না।' আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজে দাঁড়ান। আমরাও দাঁড়াই, লোকটি নামাজে বলল, 'হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুগ্রহ কর। আমাদের ছাড়া আর কাউকে অনুগ্রহ করো না', নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেন, 'তুমি উন্মুক্ত ঝর্নাধারাকে পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিলে।'
বুখারী ছাড়া অন্যান্য হাদীসের কিতাবে এ ঘটনার ব্যাখ্যা নিম্নরূপ: আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, একজন গ্রাম্য লোক মসজিদে দুই রাকাত নামাজ পড়ে বলল, 'হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুগ্রহ কর এবং এ ছাড়া কাউকে অনুগ্রহ করো না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি উন্মুক্ত ঝর্নাধারাকে পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিলে?' এ কথা বলতে না বলতে সে মসজিদে পেশাব করতে আরম্ভ করলে সকলে দৌড়ে বাধা দিতে চেষ্টা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে, তাদের কষ্টের কারণ বা অকল্যাণের জন্য প্রেরণ করা হয়নি। তোমরা তার পেশাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও।'
তিনি বলেন, গ্রাম্য লোকটি বিষয়টি অনুধাবন করে বলল, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে আসেন। কিন্তু তিনি আমাকে কোন প্রকার ধমক দেননি, কোন মন্দ বলেননি এবং কোন প্রকার মারধর করেননি।' দেখুন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী, বিজ্ঞ এবং বুদ্ধিমান। তার আচার - আচরণ এবং কাজকর্ম সবই প্রজ্ঞাময় এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। তার আখলাক, আচার-আচরণ, নম্রতা-ভদ্রতা, নমনীয়তা, দয়ার্দ্রতা, সহনশীলতা, ক্ষমা ও ধৈর্যশীলতা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তি মাত্রই তার প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় হবে তার এবং প্রগাঢ় হবে তার ঈমান। লোকটি এমন একটি কাজ করল, তাতে রাগান্বিত হওয়া, শাস্তি যোগ্য অপরাধ মনে করা এবং শিক্ষা দেয়ার মত গর্হিত কাজ বিবেচনা করা ছাড়া উপস্থিত লোকদের সামনে আর কোন বিকল্প ছিল না। এ কারণেই সাহাবীগণ তাড়াহুড়া করে তাকে বারণ করতে লাগলেন, তার এ কাজটিকে তারা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তারা তাকে ধমক দিলেন এবং তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলেন এবং সাহাবীদের তাকে পেশাবে বাধা দেয়া হতে বিরত রেখে তার সাথে সুন্দর ব্যবহার করেন ও সুশিক্ষা দেন। এবং যখন সবাই বিরক্ত তখন তার প্রতি তিনি দয়ার্দ্র হলেন।
এটা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দয়া, সহনশীলতা এবং সুন্দর ব্যবহারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিটি কাজে এবং ব্যবহারে তিনি অনুরূপ হিকমত এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে হিকমতের সাথে শিক্ষা দেন এবং লোকটি যখন এ কথা বলে, 'হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুগ্রহ কর এবং আমাদের ছাড়া কাউকে অনুগ্রহ করো না', রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, 'তুমি বিস্তৃত জনপদকে সংকীর্ণ করে ফেললে! অর্থাৎ আল্লাহর রহমতকে। কারণ, সমস্ত কিছুই আল্লাহর রহমত দ্বারা আবৃত। আল্লাহ বলেন, 'আমার রহমত সব কিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে।'
কিন্তু দুআ করতে গিয়ে লোকটি কার্পণ্য করে এবং রহমতের দুআতে সমস্ত মাখলুককে অন্তর্ভুক্ত করেনি।
অথচ, আল্লাহ তাআলা এর বিপরীতে যারা দুআতে সমস্ত সৃষ্টিকে শামিল করেন তাদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন: وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
"আর যারা তাদের পরে আগমন করল, তারা বলে, 'হে আমাদের রব! তুমি আমাদের ক্ষমা কর এবং আমাদের পূর্বে ঈমান সহকারে যারা অতিবাহিত হয়েছে তাদেরও। আর আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের সম্পর্কে কোন বিদ্বেষ অবশিষ্ট রেখো না। হে রব! নিশ্চয় তুমি পরম দয়ালু।"
লোকটি উল্লেখিত আয়াতের বর্ণনার সম্পূর্ণ উল্টো দুআ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত নম্র, ভদ্র এবং আদরের সাথে শিক্ষা দেন। এবং এ ধরনের দুআ হতে নিষেধ করেন।
আর লোকটি পেশাব করতে আরম্ভ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাধা দেয়া হতে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। কারণ, হতে পারে বাধা দেয়ার ফলে সমস্যা আরো বাড়বে। তাই তিনি বাধা দেননি, কারণ : ১ - পেশাব করতে আরম্ভ করার পর বাধা প্রদান করলে লোকটির স্বাস্থ্যের দিক হতে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ২- অথবা পেশাব নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে শরীরের অন্যান্য স্থান, পোশাক এবং মসজিদের অন্য কোন অংশে পেশাব লেগে নাপাক হয়ে যেতে পারত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণের দিক বিবেচনা করে বাধা প্রদান হতে বিরত রাখলেন। অর্থাৎ তিনি দুটি বড় ধরনের সমস্যা এবং ক্ষতিকে প্রতিহত করেন সহনীয় দুটি ক্ষতিকে মেনে নিলেন। এবং দুটি বড় ধরনের কল্যাণ অর্জনকে প্রাধান্য দেন ছোট দুটিকে ছেড়ে দিয়ে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন বুদ্ধিমত্তা এবং হিকমতের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণকারী। তিনি যে কোন প্রেক্ষাপটে যে কোন কাজকর্ম সমাধান এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিকমতের পরিচয় দিয়ে থাকেন। ঘটনায় তিনি তার উম্মত, বিশেষ করে দাওয়াত-কর্মী বা সংস্কারকদের একজন মূর্খ অজ্ঞ, অশিক্ষিত-যার মধ্যে কোনপ্রকার হটকারিতা বা কপটতার অবকাশ নাই- কোন প্রকার কটূক্তি, হুমকি- ধমকি, কঠোরতা, কষ্ট দেয়া বা দুর্ব্যবহার ছাড়া কীভাবে শিক্ষা দিতে হয় তার একটি দৃষ্টান্ত এবং অনুপম আদর্শ স্থাপন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুপম আদর্শ- নমনীয়তা, দয়া, অনুগ্রহ, সহানুভূতিশীল আচরণ, মমতাময়ী ব্যবহার - লোকটির জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে। ফলে, সে পরবর্তী জীবনে ঘটনার বর্ণনায় কৃতজ্ঞতার সাথে বলে, 'তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে আমার দিকে অগ্রসর হন। তবে তিনি আমাকে কোন প্রকার কটূক্তি বা উচ্চবাচ্য করেননি, কোন প্রকার তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করেননি এবং মারধর করেননি।' তার কথা থেকেই বুঝা যায়, লোকটির জীবনে কেমন পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল।
চতুর্থ দৃষ্টান্ত : মুআবিয়া বিন হাকামের ঘটনা
মুআবিয়া বিন হাকাম আসলামী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন 'একদিন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে নামাজ আদায় করতে ছিলাম। ইতি মধ্যে নামাজে এক লোক হাঁচি দিলে তার উত্তরে আমি বলি 'ইয়ারহামুকাল্লাহ! (আল্লাহ তোমাকে দয়া করুন)' এ শুনে সবাই আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে আরম্ভ করল। আমি তাদের বললাম, 'হায় দুর্ভোগ! তোমাদের কি হয়েছে? তোমরা আমার দিকে এভাবে তাকাও কেন?' তারপর তারা তাদের উরুতে থাপর মারতে আরম্ভ করল। আমি বুঝতে পারলাম তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে। ফলে আমি চুপ হয়ে গেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য আমার মাতা পিতা উৎসর্গ হোক, ইতিপূর্বে আমি তার চেয়ে উত্তম কোন শিক্ষক ও এত সুন্দরভাবে শিক্ষা প্রদান করতে কাউকে দেখিনি। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে কোন গালি দিলেন না, তিরস্কার করলেন না এবং কোন মারধর করেননি। নামাজ শেষে বলেন, 'নিশ্চয় নামাজে কথা বলা সঙ্গত নয়। বরং নামাজ হলো তাসবীহ, তাকবীর এবং কুরআন তেলাওয়াত।' আমি তাকে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি জাহেলিয়‍্যাতের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলাম। আল্লাহ ইসলাম গ্রহণ করার সুযোগ দিয়েছেন। আমাদের মধ্যে কিছু লোক গণকের নিকট যায়। আমি কি গণকের নিকট যাব?' রাসূল বলেন, 'না, তুমি গণকের নিকট যেও না।' বললাম, 'আবার আমাদের মধ্যে কিছু লোক এমন আছে তারা লক্ষণ- কুলক্ষণে বিশ্বাস করে।' তিনি বললেন, 'এটা একটি কুসংস্কার, অবিশ্বাসী কাফেররা এতে বিশ্বাস করে। তবে তোমাকে এটা যেন কোন কাজ থেকে বিরত না রাখে।' তারপর আমি বলি, 'আমাদের মধ্যে কিছু লোক আছে, যারা দাগ দেয়।' রাসূল বলেন 'যদি পূর্বেকার কোন নবী এ ধরনের দাগ দিয়ে থাকে, আর যার দাগ নবীর দাগের সাথে মিলে যায়, তার জন্য দাগ দেয়া বৈধ।'
মুআবিয়া বিন হাকাম বর্ণনা করেন, 'আমার একজন দাসী ওহুদ এবং জাওয়ানিয়া নামক স্থানে ছাগল চরাত। একদিন সে বলল, 'আমার একটি ছাগল বাঘে খেয়ে ফেলেছে।' এ কথা শুনে আদম সন্তান হিসেবে স্বাভাবিকভাবে আমি খুব কষ্ট পেলাম, ফলে আমি খুব জোরে তাকে আঘাত করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে মুক্ত করে দেব কি?' রাসূল বললেন, 'তুমি তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' তাকে নিয়ে আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'আল্লাহ কোথায়?' উত্তরে সে বলল, 'আল্লাহ আকাশে।' তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি কে?' সে বলল, 'আপনি আল্লাহর রাসূল।' রাসূল বললেন, 'তাকে মুক্ত করে দাও। কারণ, সে ঈমানদার।" আল্লাহর পক্ষ হতে দেয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ কত সুমহান ও মহত্তম। তার আচরণ মুআবিয়া বিন হাকাম আঙ্গুলামীর এর জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয়। তাই সে বলে, 'আমি ইতিপূর্বে এবং পরে এর চেয়ে উত্তম কোন শিক্ষক দেখিনি।'
পঞ্চম দৃষ্টান্ত: যার হাত প্লেটে ঘুরপাক খেত তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
উমার বিন আবি সালমা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোলে বসে খাচ্ছিলাম। আমার হাত প্লেটের সব জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'হে! বালক! তুমি বিসমিল্লাহ পড়। ডান হাত দিয়ে খাও। এবং সামনে যা আছে তা হতে খাও।' তারপর হতে আমার খাওয়া এ ধরনেরই ছিল। এর ব্যতিক্রম কখনো হয়নি।'
ষষ্ঠ দৃষ্টান্ত: রমজানের দিনে স্ত্রীর সাথে সহবাসকারীর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
সালামাতা বিন সাখার আল আনছারী হতে বর্ণিত, তিনি তার হাদীসে বলেন, 'ঘর হতে বের হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে আমার বিষয়ে তাকে অবহিত করি। তিনি বলেন, 'তুমি এ কাজ করেছ?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ, হে রাসূল!' তারপর আবার বললেন, 'তুমি একাজ করেছ?' বললাম, 'এ কাজ করেছি হে আল্লাহর রাসূল!' তৃতীয় বার তিনি আমাকে বললেন, 'তুমি এ কাজ করেছ?' আমি বললাম, 'হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! আমার উপর বিধান প্রয়োগ করুন! আমি মেনে নেব।' তিনি বললেন, 'একজন দাস মুক্ত কর।' আমি হাতকে স্বীয় ঘাড়ে রেখে বলি, 'হে আল্লাহর রাসূল! যে সত্তা সত্যের পয়গাম নিয়ে আপনাকে প্রেরণ করছে, তার শপথ করে বলছি, আমি স্বীয় ঘাড় ছাড়া আর কোন কিছুরই মালিক নই।' তিনি বললেন, 'তাহলে দুই মাস রোজা রাখ।' আমি বললাম, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! রোজা রাখার কারণেই আমি এ বিপদের সম্মুখীন হলাম।' তিনি বললেন, 'তাহলে তুমি ছদকা কর।' আমি বললাম, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি আপনাকে সত্যের বাণী দিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করছেন, আমি রাত যাপন করছি ক্ষুধার্ত অবস্থায়। কারণ, রাতে খাওয়ার কোন ব্যবস্থা ছিল না।' তিনি বলেন, 'তুমি বনী জুরাইক এর ছদকার মালিকের নিকট যাও তাদের বল, তারা যেন তোমাকে দান করে। আর তা হতে এক ওসক পরিমাণ তোমার পক্ষ হতে অভাবীদের আহার দাও। আর বাকীগুলো তুমি এবং তোমার পরিবারের জন্য গ্রহণ কর।' তারপর আমি নিজ গোত্রের নিকট গিয়ে বলি, 'আমি তোমাদের মধ্যে সংকীর্ণতা দেখতে পাই এবং তোমাদের অদূরদর্শিতা অনুভব করি। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাহসী এবং বরকতময় দেখতে পাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের আদেশ করেছেন ছদকা দিতে। তোমরা আমাকে দান কর। এ কথা বলার পর তারা আমাকে দান খয়রাত করে সহযোগিতা করল।'
সপ্তম দৃষ্টান্ত: কবরের পাশে ক্রন্দন রত মহিলার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কবরের পাশে ক্রন্দনরত এক মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'তুমি আল্লাহকে ভয় কর এবং ধৈর্যধারণ কর। মহিলাটি বলল, 'তুমি আমার থেকে দূর হও। কারণ, তুমি আমার মত বিপদের সম্মুখীন হওনি।' আসলে মহিলাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে পারেনি। তারপর মহিলাকে লোক জন বলল, 'তুমি যার সাথে দুর্ব্যবহার করেছো তিন হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন সে দৌড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, 'আমি আপনাকে চিনতে পারিনি, তাই অভদ্র আচরণ করেছি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'প্রথম আঘাতেই ধৈর্য ধারণ করতে হয়।' ভাবার বিষয় হলো, একজন অজ্ঞ ব্যক্তির সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতই না সুন্দর আচরণ করেন। তাকে কোন প্রকার জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। তিরস্কার করেননি। এর চেয়ে উত্তম আদর্শ আর কার হতে পারে?

টিকাঃ
১ আহমাদ: ৫১৯
২ সহীহ মুসলিম: ১৮২৮
৩ সহীহ মুসলিম: ১৭৩২ ৪ আহমাদ: ১২১৯ * সহীহ আল বুখারী ৪৩৪৪,২৩৪৫ সহীহ মুসলিম: ১৭৩৩ * সহীহ আল বুখারী ৬৯, সহীহ মুসলিম: ১৭৩২
৪ শরহে নববী: ৪১/১২ ফাতহুল বারী: ১৬৩/১

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 ধৈর্য ও সবর

📄 ধৈর্য ও সবর


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দাওয়াতী ময়দানে এমন অসংখ্য ঘটনা আছে, যেগুলোর মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সর্বোচ্চ ত্যাগ এবং ধৈর্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি আল্লাহর নৈকট্য এবং তার থেকে বিনিময় লাভকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। এ কথা আমরা সবাই জানি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনীয় দাওয়াতের ক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় ধৈর্য ধারণ করেন। এমনকি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ধৈর্যের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। দাওয়াতী ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ধৈর্যের দৃষ্টান্ত স্থাপনের অসংখ্য ঘটনা বিদ্যমান। তবে আমরা বাস্তবমুখী কয়েকটি ঘটনা বর্ণনা করব।
প্রথম দৃষ্টান্ত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক ছাফা পাহাড়ে আরোহণ এবং সবাইকে একত্রিত করে ইসলামের দাওয়াত দেয়া
আল্লাহ তাআলা তার নবীকে সর্ব প্রথম নিকট আত্মীয়দের ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য আদেশ দেন। আল্লাহ বলেন:
وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ ﴿٢١٤﴾ وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ ﴿٢١٥﴾ فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تَعْمَلُونَ ﴿٢١٦﴾
"আর তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক কর। আর যে সব ঈমাদাররা তোমার অনুকরণ করে তাদের প্রতি বিনয়ী হও। আর যদি তারা তোমার অবাধ্য হয় তুমি তাদের বলে দাও, তোমরা যা করো তার দায় হতে আমি মুক্ত।”
তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেন। ইসলামের শক্তি প্রদর্শনের জন্য তিনি একটি অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করেন ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। যার ফলে আল্লাহ তাআলা ইসলামের দাওয়াতের ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটান। দাওয়াতের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বুদ্ধিমত্তা, তার সাহসিকতা, সহনশীলতা, সুন্দর ব্যবহার এবং ইখলাস আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ঐকান্তিক আগ্রহ- ইত্যাদি অনেক কিছুই তার জীবনীতে ফুটে উঠে।
সাথে সাথে এর একটি চিত্র এও দেখতে পাই; তা হল, যারা তাওহীদের বিরোধিতা করে, নবী ও রাসূলদের সাথে দুর্ব্যবহার ও তাদের যারা কষ্ট দেয়, তাদের পরিণতি লাঞ্ছনা বঞ্চনা এবং দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- যখন আল্লাহর বাণী وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ "আর তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক কর।" যখন অবতীর্ণ হল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করে প্রতিটি গোত্রের নাম ধরে ধরে ডাক দিলেন- হে বনী ফাহর! হে বনী আদি! এ রকমভাবে কুরাইশের সম্ভ্রান্ত বংশকে-ডাকতে আরম্ভ করেন। তার ডাক শুনে সমস্ত মানুষ একত্রিত হল। এমনকি যদি কোন ব্যক্তি না আসতে পারতো, সে একজন প্রতিনিধিকে পাঠাতো, কি বলে তা শুনার জন্য। আবু জাহেল নিজে এবং কুরাইশরা সবাই উপস্থিত হল। তারপর তিনি সবাইকে সম্বোধন করে বললেন, 'আমি যদি বলি, এ পাহাড়ের পাদদেশে অস্ত্র সজ্জিত এক বাহিনী তোমাদের উপর আক্রমণের অপেক্ষায় আছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?' সকলে এক বাক্যে বলল, 'অবশ্যই বিশ্বাস করব।' কারণ, আমরা কখনো তোমাকে মিথ্যা বলতে দেখিনি। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সতর্ক করছি ভয়াবহ শাস্তি- আল্লাহর আজাব সম্পর্কে।
এ কথা শুনে আবু লাহাব বলল, 'তোমার জন্য ধ্বংস! পুরো দিনটাই তুমি আমাদের নষ্ট করলে। এ জন্যই কি আমাদের একত্রিত করেছ?' তার এ কথার উত্তরে আয়াত নাযিল হলো। تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ -
"ধবংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার ধন সম্পদ এবং তার কোন উপার্জন কাজে আসে নাই।" আবু হুরাইরা রা. এর বর্ণনায় বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এক এক গোত্রকে আলাদা করে ডাকেন এবং প্রতিটি গোত্রকে বলেন, 'তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা কর।' এবং কলিজার টুকরা ফাতেমা রা. কে ডেকে বলেন, 'হে ফাতেমা! তুমি তোমাকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা কর। কারণ, আল্লাহ পাকড়াও হতে তোমাদের রক্ষা করার মত কোন ক্ষমতা আমি রাখি না। হাঁ, তবে আমার সাথে তোমার রক্তের সম্পর্ক থাকায় আমি তোমাকে আদর-যত্নে সিক্ত করতে পারার আশা রাখি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে যে ব্যাপক আহ্বান বা ঘোষণা দেন তা ছিল একটি ঐতিহাসিক আহ্বান ও যুগান্তকারী ঘোষণা। তাছাড়া তার সবচেয়ে নিকটতম ব্যক্তিকে বলে দিলেন, ঈমান ও আখেরাতের বিশ্বাস এবং রেসালতের স্বীকৃতিই হল তাদের সাথে সম্পর্কের মানদণ্ড। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা. কে ডেকে বললেন, 'হে ফাতেমা! তুমি তোমাকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা কর। কারণ, আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদের বিষয়ে আমাকে কোন ক্ষমতা দেয়া হয়নি।'
উলেখিত হাদীসে দেখতে পাই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাওয়াত ছিল সর্বোচ্চ তাবলীগ ও ভীতি প্রদর্শন। এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বিষয় স্পষ্ট করেন যে, কোন ব্যক্তির নাজাতের উপায় কখনো বংশ মর্যাদা, পিতা-মাতার পরিচয়, আত্মীয়তা কিংবা জাতীয়তা ইত্যাদির মানদণ্ডে হতে পারে না বরং এর মানদণ্ড হল তাওহীদ ও রিসালাতের উপর বিশ্বাস। এ ঘোষণার পর আরবদের মাঝে বংশ মর্যাদা এবং আত্মীয়তা ইত্যাদির গৌরব আর অহংকারের যে প্রবণতা ছিল, তা আর অবশিষ্ট রইল না। এবং আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি আনুগত্য ভিন্ন অন্য যে কোন উপকরণ-আত্মীয়তা, বংশ-বর্ণ ইত্যাদির ভিত্তিতে যে সব জাতীয়তা গড়ে উঠে তা একে বারে মূল্যহীন।
গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং প্রতিকুল প্রেক্ষাপটে ও তার বংশের লোকদের সর্বোচ্চ সতর্ক করলেন তিনি। তাদের ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়ার আহ্বান জানালেন। আল্লাহর কঠিন আজাব হতে ভয় দেখালেন এবং তাদের মূর্তি পূজা হতে বিরত থাকতে আহবান করলেন। কিন্তু মক্কাবাসীরা তার আহবানে সাড়াতো দিলই না বরং তারা তার মিশনের বিরোধিতা করলো। ফু দিয়ে তা নিভিয়ে দিতে সচেষ্ট হলো। কারণ, তারা বুঝতে পারল, এ আহ্বান এমন এক দাওয়াত, শত শত বছর ধরে লালন করা ঐতিহ্য এতে বিলুপ্ত হবে এবং বাপ দাদার অন্ধ অনুকরণ ব্যাহত হবে। জাহেলিয়্যাতের যে গতিধারা তাদের সমাজে অব্যাহত ছিল তার পরিসমাপ্তি ঘটবে।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিরোধিতা কোনভাবেই আমলে নেননি। বরং তার উপর আরোপিত দায়িত্ব পালনে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। কারণ, তিনি আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্বে কোন প্রকার অবহেলা করবেন না বলে বদ্ধ পরিকর। যদি সমগ্র বিশ্বের সমস্ত মানুষ তার মিশনকে প্রত্যাখ্যান বা প্রতিহত করে, তারপরও তিনি দাওয়াত অব্যাহত রাখবেন এবং বাস্তবেও তাই করেছেন। রাতদিন গোপনে-প্রকাশ্যে যাকে যেখানে পেতেন দাওয়াত দিতেই থাকতেন। তার চিন্তা চেতনায় শুধু একটি জিনিসই কাজ করতো কীভাবে মানুষকে অন্ধকার হতে বের করে আলোর পথ দেখাবেন। কীভাবে মানুষকে শিরক থেকে মুক্ত করবেন এবং তাওহীদের পতাকা তলে একত্রিত করবেন। তাকে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কার, কোন যালিমের যুলুম-অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়ন, লোভ-লালসা ও প্রলোভন কোন কিছুই বিরত রাখতে পারেনি এবং পারেনি কোন কিছুই তার গতিকে থামিয়ে দিতে।
মানুষের সম্মেলনে, অনুষ্ঠানে এবং হাটে বাজারে মোট কথা যাকে যেখানে পেতেন আল্লাহর দিকে তাকে আহবান করতেন। বিশেষ করে হজের মাওসুম- যখন পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান হতে মানুষ একত্রিত হতো- তখন এ সুযোগকে কাজে লাগাতেন। সমগ্র মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাতেন। ধনী-দরিদ্র, দুর্বল-সবল, স্থানীয়-মুসাফির, পথিক-পর্যটক এমন কোন লোক অবশিষ্ট ছিল না যাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে দাওয়াত পৌঁছাননি। এ দাওয়াতে সমস্ত মানুষ তার নিকট ছিল সম-মর্যাদার। কোন প্রকার বৈষম্য বা পার্থক্য করেননি কারো মধ্যে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, মক্কার ক্ষমতাবান লোকেরা তার শুধু বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং তাকে এবং তার অনুসারীদেরকে মানসিক, শারীরিকসহ অমানবিক নির্যাতন নিপীড়ন আরম্ভ করল। মক্কাবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লো। তারা কোন ভাবেই তাকে মেনে নিতে পারেনি এবং তাকে মেনে নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানাল। তা সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থমকে যাননি, তার মিশন চালিয়ে যেতে লাগলেন এবং ইসলামে দীক্ষিত সংখ্যালঘু মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন। গোপনে গোপনে কোন কোন পরিবারের বাড়িতে গিয়েও তাদের তালীম-তারবিয়ত, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দিতেন।
তালীম-তরবিয়ত ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমন একটি জামাত গঠনে সক্ষম হলেন, যারা তার মিশনের ধারক বাহক হিসেবে তার এ গুরু দায়িত্ব পালনে শরীক হলেন। এদের মত একটি জামাত পেয়ে তার মনে আশার সঞ্চার হলো। ধীরে ধীর তারা এমন একটি জামাতে পরিণত হল, তারা তাদের জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করতে এবং সব কিছুর উপর একমাত্র দীনকে প্রাধান্য দিতে নিজেদের সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে নিলেন। তারা দৃঢ় ঈমান এবং প্রগাঢ় বিশ্বাসের অধিকারী ছিলেন। ধৈর্য ও সহনশীলতার যে, দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে ছিল একেবারেই বিরল।
আল্লাহর আদেশের আনুগত্য এবং তার প্রতি যে প্রগাঢ় ভালোবাসা তারা দেখিয়েছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একজন আমীরের আনুগত্য এবং তার প্রয়োজনীয়তা শুধু বর্ণনা করে বুঝিয়ে দেননি বরং তা বাস্তবায়নের যে ইতিহাস আমরা তাদের মধ্যে দেখতে পাই, বর্তমান আধুনিক পৃথিবীর নেতা নেত্রীরা তা কল্পনাও করতে পারে না।
তাদেরকে কোন আদেশ বা নিষেধের জন্য বাধ্য করার প্রয়োজন হতো না। বরং রাসূলের মুখ থেকে কোন বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা মাত্রই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা পালন করার জন্য তারা ঝাঁপিয়ে পড়তো। তার আদেশের প্রতি যে ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ছিল, তার তুলনায় দুনিয়ার অন্য সবকিছুর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা তাদের নিকট ছিল নেহায়েত তুচ্ছ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, যথাযথ তালীম তারবিয়ত, অবিচল নীতি অবিরাম সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার ফলে দীনের এ আমানত এবং ওহীর এ গুরু দায়িত্ব পালনে তারা সক্ষম হন। আর আমাদের জন্য একটি চিরন্তন আদর্শের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। রাসূল আল্লাহর দীনকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও মেধার পরিচয় দেন তা চিরদিন আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বর্গের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
কুরাইশরা যখন দেখতে পেল শুধু নির্যাতন এবং দমননীতি অবলম্বন করে মুসলমানদের থামানো সম্ভব নয় তখন তারা ভিন্ন কৌশল হিসেবে একটি আপোশ প্রস্তাব নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে আসে। তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়াবী যে কোন প্রস্তাবে সম্মত করাতে প্রচেষ্টা চালায়। এদিকে রাসূলের চাচা আবু তালেব, যিনি তাকে দেখাশুনা করেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকে সাহায্য সহযোগিতা এবং আশ্রয় দিয়ে থাকেন তাকেও একটি প্রস্তাব দেয়। দাবি জানায়, তিনি যেন মুহাম্মাদকে বিরত রাখেন এবং দীনের দাওয়াত বন্ধ করে দেন।'
কুরাইশের সরদার এবং নেতারা আবু তালেবের নিকট এসে বলল, 'তুমি আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত, বয়স্ক, মর্যাদাবান এবং সম্মানী ব্যক্তি। আমরা অনুরোধ জানিয়ে ছিলাম তুমি তোমার ভাতিজাকে নিষেধ করবে। কিন্তু বাস্তবতা হল তুমি নিষেধ করোনি। আমরা জানিয়ে দিচ্ছি, আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। সে আমাদের বাপ দাদা সম্পর্কে মন্তব্য করে। আমাদের প্রতি অশুভ আচরণ করে। আমাদের উপাস্যগুলোর প্রতি কটূক্তি করে। আমরা আর বিলম্ব করতে পারব না। হয়, তুমি তাকে বিরত রাখ অন্যথায় তুমি যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। এতে হয় তোমরা ধ্বংস হবে অথবা আমরা ধ্বংস হব।'
আবু তালেব তাদের অসাধারণ হুমকি এবং সময় বেধে দেয়াকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন এবং তা আমলে নেয়ার জন্য চেষ্টা করেন। তিনি তার স্বজাতি হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা করলেন। আর এই মুহূর্তে স্বজাতি হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং তাদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার মত অনুকুল পরিবেশ তার ছিল না। তাই তিনি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হন এবং উভয় সংকটে জড়িয়ে পড়েন। একদিকে ইসলাম গ্রহণকে সহজে মেনে নিতে পারছেন না, অন্য দিকে তার ভাতিজার অপমান এবং তার উপর কোন প্রকার অন্যায় অবিচারকে সহ্য করতে পারছিলেন না।
নিরুপায় হয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, 'হে ভাতিজা! নিজ বংশের লোকেরা আমার নিকট এসে এ ধরনের কথা বার্তা বলেছে। এ বলে তিনি তাদের কথার বিবরণ শোনালেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। তারপর আবু তালেব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, 'তোমার সাধ্যের বাইরে কোন কাজ করা দরকর নাই। এমন কোন কাজের দায়িত্ব নিতে যাবে না, আমি যার সমাধান করতে পারব না। সুতরাং আমার পরামর্শ হল, তোমার স্বজাতি যে সব কাজ অপছন্দ করে তুমি সে সব কাজ হতে বিরত থাক।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চাচার কথায় একটুও কর্ণপাত করলেন না। তিনি আল্লাহর দিকে দাওয়াত এবং তাওহীদের দাওয়াত অব্যাহত রাখলেন।
আল্লাহর দিকে আহবান করতে গিয়ে কারো কোন কথায় গুরুত্ব দিতে তিনি সম্পূর্ণ নারাজ। কারণ, তিনি জানেন তিনি হকের উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বিশ্বাস করেন, তার এ দীনকে আল্লাহই সাহায্য করবেন। তার এ দাওয়াত আল্লাহ তাআলা একটি পর্যায়ে অবশ্যই পৌঁছাবেন। কিছু দিন যেতে না যেতে আবু তালেব দেখতে পেল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নীতি আদর্শের উপর অটল, অবিচল এবং কুরাইশদের দাবী অনুসারে তাওহীদের দাওয়াত তিনি কখনো ছাড়বেন না।
আবু তালেব রাসূলুল্লাহ সা. কে বললেন, 'আমি কসম করে বলছি, তারা তোমার নিকট একত্রিত হয়ে আসতে পারবে না, যতদিন না আমি মাটিতে প্রোথিত হবো এবং মাটিকে বালিশ বানাবো। তুমি নির্ভয়ে তোমার কাজ চালিয়ে যাও আর সু সংবাদ গ্রহণ কর। আর এ সুসংবাদ দ্বারা তোমার চোখকে শীতল কর।'
তৃতীয় দৃষ্টান্ত: উতবা বিন রবিয়ার ঘটনা।
হামজা বিন আব্দুল মুত্তালেব রা. এবং উমার বিন খাত্তাব রা. এ দুজনের ইসলাম গ্রহণের পর মুশরিকদের আনন্দ ঘন আকাশে ফাটল ধরলো। তাদের দুশ্চিন্তার আর অন্ত রইলো না।
এ ছাড়াও مسلمانوں সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া, প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা, ইসলামের বড় বড় দুশমনদের বিরোধিতা এবং তাদের জুলুম নির্যাতনের কোন পরোয়া না করা, ইত্যাদি বিষয় তাদের ঘুমকে হারাম করে দিল। তাদের মনের আশঙ্কা, ভয়ভীতি এবং দুশ্চিন্তা আরো বৃদ্ধি পেল।
তারপর তারা উতবা বিন রাবিয়াকে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পাঠালো। তাদের ধারণা এর কোন একটি প্রস্তাবে তাকে রাজি করানো যেতে পারে।
তাদের প্রস্তাব নিয়ে উতবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, 'হে আমার ভাতিজা! তুমি জান, তুমি আমাদের নিকট একজন উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তোমার বংশ মর্যাদা আরবের সমগ্র মানুষের চাইতে বেশি সম্ভ্রান্ত। কিন্তু তুমি তোমার স্বজাতির নিকট এমন একটি বিষয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছো যা আমরা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছি না। কারণ, তুমি আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করছো। আমাদের স্বপ্নকে ধূলিস্যাত করে দিচ্ছো। এবং আমাদের উপাস্যগুলোকে কটাক্ষ করছো। আর আমাদের বাপ দাদাদের হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্যে আঘাত হানছো।
সুতরাং তোমাকে কয়েকটি প্রস্তাব দিচ্ছি। মনোযোগ দিয়ে শুন। আশা করি যে কোন একটি প্রস্তাবে তুমি সম্মতি জ্ঞাপন করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিনীত ভাবে বললেন, 'হে আবুল ওয়ালিদ! আপনার প্রস্তাবগুলো তুলে ধরুন! তারপর সে বলল, 'যদি তোমার এ মিশনের উদ্দেশ্য টাকা পয়সা, অর্থ প্রাচুর্য হয়ে থাকে, তাহলে তোমাকে আমরা এত পরিমাণ ধন সম্পদের মালিক বানাব তাতে তুমি মক্কার মধ্যে সবার চেয়ে বেশি সম্পদশালী হবে। আর যদি তুমি নেতৃত্ব চাও, তোমাকে যাবতীয় সব কিছুর নেতা বানিয়ে দেব, তোমাকে ছাড়া একটি পাতাও তার জায়গা হতে সরবে না। আর যদি রাজত্ব চাও, তাহলে তোমাকে পুরো রাজত্ব দিয়ে দেব। আর যদি এমন হয় যে, তুমি যে সব কথা বলছ, তা কোন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যাওয়ার কারণে হয়েছে; কারণ, অনেক সময় এমন হয়, তোমার মাথা হতে বিষয়টি কোন ভাবে নামানো যাচ্ছে না। তাহলে আমরা তোমাকে উচ্চ চিকিৎসার জন্য যত অর্থের প্রয়োজন, তার সবই জোগান দেব। হতে পারে অনেক সময় মানুষের জ্ঞান বুদ্ধি কোন খেয়াল বা কল্পনার কারণে লোপ পায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব মনোযোগ দিয়ে উতবার কথা শুনতে লাগলেন। তারপর যখন কথা শেষ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমার কথা শেষ হয়েছে হে আবুল ওয়ালিদ?' বলল, 'হ্যাঁ।' তা হলে এবার আমার থেকে শোন! তারপর সে বলল, 'আচ্ছা বল।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এ আয়াতগুলো তেলাওয়াত করে শোনালেন-
حم ﴿١﴾ تَنْزِيلٌ مِنَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ﴿۲﴾ كِتَابٌ فُصِّلَتْ آيَاتُهُ قُرْآنَا عَرَبِيًّا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ﴿٣﴾ بَشِيرًا وَنَذِيرًا فَأَعْرَضَ أَكْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ ﴿٤﴾ وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي أَذَانِنَا وَقْرٌ وَمِنْ بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَامِلُونَ ﴿٥﴾
"হা-মীম। রাহমান রাহিম এর পক্ষ হতে অবতীর্ণ। এটা এমন একটি কিতাব, যাতে তাঁর নিদর্শন সমূহের ব্যাখ্যা দেয়া হয়ে থাকে, আরবী কুরআন এমন জাতির জন্য যারা জানে। যা সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী। কিন্তু অধিকাংশ লোক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সুতরাং তারা শুনবে না। আর তারা বলে, তুমি যে দিকে আহ্বান করো সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আচ্ছাদিত আর আমাদের কানে ছিপি লাগানো এবং তোমার মাঝে আর আমার মাঝে রয়েছে পর্দা। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর আর আমরা আমাদের কাজ করি।"' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াতগুলো পড়তে থাকেন। উতবা যখন কুরআনের আয়াত শুনতে পেলো তখন সে কান খাড়া করে দিলো। এবং তার দু হাত ঘাড়ের উপর রেখে হেলান দিয়ে কুরআন শুনতে আরম্ভ করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সেজদার আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন তিনি সেজদা করলেন উতবাও তার সাথে সেজদা করল। তারপর তিনি বললেন, 'হে আবুল ওয়ালিদ! 'তুমি আমার কথা শুনেছো, তুমি এখন ফিরে যেতে পার।'
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন পড়তে পড়তে যখন এ আয়াত পর্যন্ত পৌছলেন
فَإِنْ أَعْرَضُوا فَقُلْ أَنْذَرْتُكُمْ صَاعِقَةً مِثْلَ صَاعِقَةِ عَادٍ وَثَمُودَ
"যদি তারা বিমুখ হয়, তুমি তাদের বল আমি তোমাদের ভয়ংকর শাস্তির ভয় দেখাচ্ছি যে ভয়ংকর শাস্তি সামুদ এবং আদ জাতির অনুরূপ।” তখন উতবা বিচলিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং সে তার হাতকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখে রেখে বলল, 'আমি আল্লাহর কসম দিচ্ছি এবং আত্মীয়তার কসম দিচ্ছি, তুমি এ দাওয়াত হতে বিরত থাক।' এ কথা বলে সে দৌড়ে তার নিজ গোত্রের নিকট চলে গেল। এমনভাবে দৌড় দিল, যেন বিদ্যুৎ তার মাথার উপর পড়ছিলো। গিয়ে কুরাইশদের পরামর্শ দিল, তারা যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামায় এবং তাকে তার আপন অবস্থায় কাজ করতে ছেড়ে দেয়। সে বার বার তাদের বুঝানোর জন্য চেষ্টা চালায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শুনানোর জন্য এ আয়াতকে নির্বাচন করেন। কারণ, তিনি যাতে উতবাকে বুঝাতে সক্ষম হন, রিসালাত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাকীকত কি হতে পারে। আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের জন্য এমন এক কিতাব নিয়ে এসেছেন, যদ্বারা তিনি তাদের পথভ্রষ্টতা হতে বের করে সৎপথে পরিচালনা করেন। তাদের তিনি অন্ধকার হতে বের করে আলোর পথ দেখান। তাদের তিনি জাহান্নাম হতে বাঁচান এবং জান্নাতের সন্ধান দেন। আর তিনি নিজেই সকলের পূর্বে এর ধারক বাহক। তাই এ দীনের পরিপূর্ণ বিশ্বাস সর্বপ্রথম তাকেই করতে হবে এবং সর্বপ্রথম তাকেই তার বিধান সম্পর্কে জানতে হবে। আল্লাহ যখন সমগ্র মানুষকে কোন নির্দেশ দেন, তা মানার বিষয়ে সর্ব প্রথম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই সর্বাধিক বিবেচ্য ব্যক্তি। তিনি কোন রাজত্ব চান না এবং কোন টাকা পয়সা চান না। এবং কোন ইজ্জত-সম্মান চান না। আল্লাহ তাআলা তাকে সব কিছুর সুযোগ দেন এবং তিনি তা হতে নিজেকে বিরত রাখেন। ক্ষণস্থায়ী জীবনের মালামালের প্রতি লোভ-লালসা বলতে কিছুই তার ছিল না। কারণ, তিনি তার দাওয়াতে সত্যবাদী আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ঐকান্তিক।'
তার এ অবস্থান, তাকে আল্লাহর পক্ষ হতে যে প্রজ্ঞা ও পরম ধৈর্য দেয়া হয়েছে, তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। তিনি তার দাওয়াত এবং মিশনকে সামনে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। কোন ধন-সম্পদ অর্থ-প্রাচুর্য নারী- বাড়ী, গাড়ী এবং রাজত্ব কোন কিছুকেই তার বিনিময় প্রাধান্য দেননি এবং স্থান কাল পাত্র বেধে এমন কথা পেশ করলেন যা তখনকার সময়ের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। মনে রাখতে হবে একেই বলে হিকমত এবং সর্বোত্তম আদর্শ।
চতুর্থ দৃষ্টান্ত: আবু জাহেলের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
কাফেররা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিল তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেয়াসহ ইসলামে প্রবেশকারী মুসলমানদের উপর নির্যাতনের সাথে সাথে ইসলামের জাগরণকে ঠেকাতে সব ধরনের কলা কৌশল এবং অপপ্রচার চালিয়ে যাবে। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিভিন্ন ভাবে অপবাদ দিতে লাগল, তারা তাকে পাগল, যাদুকর, গণক, মিথ্যুক ইত্যাদি বলে গালি গালাজ করতে আরম্ভ করে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অটল অবিচল। তাদের কথায় কোন প্রকার কর্ণপাত করেননি। আল্লাহর রহমত এবং আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করার আশায় সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের পক্ষ হতে এমন কষ্টের সম্মুখীন হন যে, কোন ঈমানদার এত কষ্টের সম্মুখীন হননি। আবু জাহেল তার মাথাকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে এবং তাকে দুনিয়া থেকে চির বিদায় দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাকে হেফাজত করেন এবং আবু জাহেলের ষড়যন্ত্রকে তারই বিপক্ষে প্রয়োগ করেন। আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু জাহেল তার সাথীদের জিজ্ঞাসা করল, 'মুহাম্মাদ কি তোমাদের সম্মুখে চেহারা মাটিতে মেশায়?' বলা হল, 'অবশ্যই, 'সে আমাদের সম্মুখে মাথা মাটিতে ঝুঁকায়।' এ কথা শোনে সে বলল, 'লাত এবং উযযার কসম করে বলছি, আমি যদি তাকে মাটিতে মাথা ঝোঁকানো অবস্থায় দেখতে পাই, তার গর্দানকে পদপৃষ্ঠ করব অথবা তার চেহারাকে ধূলা বালিতে মিশিয়ে দেব।' তারপর একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত আদায় করতে ছিলেন। দেখতে পেয়ে আবু জাহেল তার গর্দান পদপৃষ্টর করার জন্য তার দিকে অগ্রসর হল। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে এল, হঠাৎ সে পিছু হঠতে আরম্ভ করল এবং দু-হাত দিয়ে নিজেকে আত্মরক্ষা করতে আরম্ভ করল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'তোমার কি হয়েছে, তুমি এমন করছো কেন?' তখন সে উত্তর দিল, 'আমি আমার এবং তার মাঝে আগুনের একটি পরিখা দেখতে পাই এবং তাতে অসংখ্য ডানা দেখতে পাই।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যদি সে আমার কাছে আসতো, তাহলে ফেরেশতারা তাকে টুকরা টুকরা করে ফেলতো।' তারপর এ ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযেল করেন - থেকে সুরা আলাকের শেষ পর্যন্ত।'
كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى
আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঐ দুর্বৃত্ত এবং অন্যান্য দুর্বৃত্তের হাত হতে রক্ষা করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল প্রকার কষ্ট, জুলুম নির্যাতন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নীরবে সয়ে যান এবং তার জান, মাল ও সময় আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেন।
পঞ্চম দৃষ্টান্ত: রাসূলের পিঠে উটের ভুঁড়ি রাখা
এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ বিন মাসুদ রা. বর্ণনা করেন, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহর পাশে নামাজ আদায় করতে ছিলেন। আবু জাহেল এবং তার সাথি- সঙ্গীরা এক সাথে বসা ছিল। বিগত দিন একটি উট জবেহ করা হয়েছিল। আবু জাহেল বলল, 'কে উটের ভুঁড়িটি নিয়ে আসবে এবং মুহাম্মাদ যখন সেজদা করবে তার পিঠের উপর রেখে দেবে।' তারপর তার দলের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট যে ব্যক্তি, সে উষ্ট্রের ভুঁড়িটি নিয়ে আসল' এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেজদা করলে তার দুই কাঁধের উপর রেখে তারা হাসাহাসি করতে আরম্ভ করে। তারা হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ডলে পড়তো। আমি পুরো বিষয়টি দেখতে পেলাম, যদি কোন ক্ষমতা থাকতো তা হলে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পৃষ্ট হতে তা সরিয়ে নিতাম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেজদায় পড়ে রইলেন। কোনভাবে মাথা উঠাতে পারছিলেন না। এক লোক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এ দৃশ্য দেখে ফাতেমা রা. কে সংবাদ দেন। তিনি খবর শোনামাত্র দৌড়ে আসেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাথা থেকে উটের ভুঁড়ি নামালেন। তারপর তাদের গালি গালাজ করতে লাগলেন। নামাজ শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চ আওয়াজে তাদের জন্য বদ দুআ করতে আরম্ভ করেন। আর তার অভ্যাস ছিল, যখন দুআ করতেন, তিন বার দুআ করতেন। আবার যদি কোন কিছু চাইতেন, তিন বার চাইতেন। রাসূল বললেন, 'হে আল্লাহ! তুমি কুরাইশদের শাস্তি দাও।' তিনবার বলেন। যখন তারা রাসূল এর বদ দুআর আওয়াজ শুনতে পেল, তাদের হাসি বন্ধ হয়ে গেল। এবং তারা তার দুআকে ভয় করতে আরম্ভ করে। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নাম ধরে ধরে বদ দুআ করে বললেন, 'হে আল্লাহ তুমি আবু জাহেল ইবনে হিশামকে ধ্বংস কর, উতবা বিন রাবিয়াকে ধ্বংস কর, শাইবা বিন রাবিয়া, ওয়ালিদ বিন উতবা, উমাইয়া বিন খালফ, উকবা বিন আবি মুয়িতকে ধবংস কর।' এভাবে তিনি সাত জন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন আমি সপ্তম ব্যক্তির নাম ভুলে যাই। আল্লাহর কসম করে বলছি, যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্যের পয়গাম নিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করেন, তিনি যাদের নাম নেন, তাদের সবাইকে বদর যুদ্ধের দিন দিন অধঃমুখে হয়ে পড়ে থাকতে দেখি। তারপর তাদের বদর গর্তে নিক্ষেপ করা হল।'
ষষ্ঠ দৃষ্টান্ত: মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সবচেয়ে কঠিন যে আচরণ করে তার বর্ণনা
সহীহ আল-বুখারীতে উরওয়াহ বিন যুবায়ের হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আসকে বলি, মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সবচেয়ে খারাপ যে আচরণ করেছে আপনি আমাকে তার বিবরণ দিন। তিনি বলেন, 'একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহর পাশে নামাজ আদায় করতে ছিলেন এ অবস্থায় উকবা বিন আবি মুয়াইত এসে রাসুলের গলা চেপে ধরে এবং তার শরীরের কাপড়কে তার গলায় পেঁছিয়ে দেয়, তারপর সে খুব জোরে গলা চাপা দিলো, আবু বকর রা. এসে তার গলাও চেপে ধরলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দিলেন এবং বললেন,
أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَبِّكُمْ
'তোমরা এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করবে যে বলে, আমার প্রতিপালক আল্লাহ! এবং তিনি তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রমাণসমূহ নিয়ে এসেছেন?'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীদের উপর মুশরিকদের নির্যাতনের আর কোন অন্ত রইল না। তাদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে অনেকেই সাহায্য চাইলেন এবং আল্লাহর কাছে দুআ প্রার্থনা করতে এবং তাঁর সাহায্য কামনা করতে বলেন।
তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সাহায্য লাভে প্রত্যয়ী ছিলেন এবং আল্লাহর মদদ তার পক্ষেই হবে এ বিশ্বাস তার পুরোপুরি ছিল। কারণ, তিনি জানতেন শেষ শুভপরিণতি একমাত্র মুত্তাকীদের পক্ষেই হয়ে থাকে এবং তারাই পরিশেষে সফলকাম হয়। খাব্বাব ইবনুল আরত রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি চাদরকে বালিশ বানিয়ে কাবা শরীফের ছায়ায় শুয়ে আছেন এ অবস্থায় তার নিকট গিয়ে অভিযোগের স্বরে আমরা বললাম, 'মুশরিকদের নির্যাতনে আমরা অসহায় হয়ে পড়ছি, আপনি কি আমাদের জন্য বিজয় প্রার্থনা করবেন না? আমাদের জন্য দুআ করবেন না?' উত্তরে তিনি বলেন, 'তোমাদের পূর্বের লোকদের নির্যাতনের অবস্থা ছিল তাদের কোন এক লোককে ধরে আনা হতো এবং মাটিতে তার জন্য কূপ খনন করে তাকে এ কূপে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হতো। অথবা একটি কাঠ কাটার করাত দিয়ে মাথার উপর হতে নীচ পর্যন্ত কেটে দুই টুকরা করা হত এবং তাদের শরীরকে লোহার চিরুনি দ্বারা চিরুনি করা হতো। শরীরের হাড় ও রগ হতে গোস্তকে আলাদা করে ফেলতো, তারপরও তাদের আল্লাহর ধর্ম থেকে বিন্দু পরিমাণও দূরে সরানো যেত না। আল্লাহর কসম করে বলছি, আল্লাহ তার দীনকে পরিপূর্ণতা দান করবেন। ফলে এমন একটি সময় আসবে যখন একজন লোক 'সানাআ' হতে 'হাদ্রামাউত' পর্যন্ত এমন নিরাপদে ভ্রমণ করবে যে, সে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। ছাগলের জন্য বাঘকে হুমকি মনে করবে না। কিন্তু তোমরা অতি তাড়াতাড়ি চাচ্ছো।'
মোট কথা, مسلمانوں এবং বিশেষ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর তারা বিরামহীন নির্যাতন চালাতো এবং তাদের সর্ব প্রকার কষ্ট, যন্ত্রনা, مسلمانوں সহ্য করতে হতো। কারণ, তাদের একমাত্র অপরাধ, তারা আল্লাহর দীনকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছে। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করেছে। হক ও সত্যের উপর অটল ও অবিচল থেকেছে। জাহেলিয়‍্যাতকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের কুসংস্কার এবং প্রতিমা পূজাকে বর্জন করেছে। এ ছাড়া তাদের আর কী অপরাধ ছিল?
সপ্তম দৃষ্টান্ত: আবু লাহাবের স্ত্রীর ঘটনা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের পক্ষ হতে কঠিন নির্যাতনের সম্মুখীন হন।
এমনকি তাকে এবং তার আনীত দীনকে অপমান করার উদ্দেশ্যে তার নামের মধ্যে পর্যন্ত বিকৃতি আনতে কোন প্রকার কুণ্ঠা বোধ করেনি। তাদের শত্রুতা এবং বিরোধীতা ধর্মীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তা তার ব্যক্তি পর্যায়েও নিয়ে আসে।
কুরাইশরা রাসুলের প্রতি তাদের অযৌক্তিক দুশমনী ও বাড়াবাড়িতে সীমা ছড়িয়ে যায়। যে নাম দ্বারা তার প্রশংসা বুঝায় তা পরিবর্তন করে, তার জন্য একটি বিপরীত নাম রাখে। যার অর্থ প্রকৃত নামের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা 'মুজাম্মাম' বলে তার নামকরণ করে। আর যখন তার নাম আলোচনা করত, বলত 'মুজাম্মাম এ কাজ করেছে এবং মুজাম্মাম এখানে এসেছে।' অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রসিদ্ধ নাম হলো মুহাম্মাদ। মুজাম্মাম বলে কোন নাম তার নেই।
কিন্তু তার পরিণতিতে দেখা গেল, যে উদ্দেশ্যে এসব অপকর্মের আশ্রয় নিল, তা তাদের জন্য হিতে বিপরীত আকার ধারণ করল।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এতে তোমরা আশ্চর্য বোধ কর না যে, আল্লাহ কীভাবে আমার থেকে কুরাইশদের গালি ফিরিয়ে নেন এবং তাদের অভিশাপ দেন। তারা মুজম্মামকে গালি দিত এবং মুজাম্মামকে অভিশাপ করতো আর আমিতো মুজাম্মাম নই, আমি মুহাম্মাদ।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পাঁচটি নাম ছিল' তার একটি নামও মুজাম্মাম ছিল না।
আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল তার সম্পর্কে এবং তার স্বামী সম্পর্কে কুরআনে অবতীর্ণ চিরন্তন বাণীর কথা শুনে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসল, রাসূল তখন কাবা গৃহের পাশে বসা ছিলেন। তার সাথে ছিল আবু বকর রা.। আর আবু লাহাবের স্ত্রীর হাতে এক মুষ্টি পাথর ছিল। সে যখন তাদের নিকটে এসে পৌঁছলো আল্লাহ তার দৃষ্টি শক্তি কেড়ে নিলেন। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আর দেখতে পেল না। শুধু মাত্র আবু বকরকে দেখতে পেল। তার উপর পর চড়াও হয়ে বলল, 'হে আবু বকর তোমার সাথি কোথায়? শুনতে পেলাম সে আমার দুর্নাম করে, শপথ করে বলছি, যদি তাকে পেতাম, আমি তার মুখে এ পাথরগুলো ছুড়ে মারতাম।' মনে রেখো, আমি একজন কবি এবং তার বদনাম করতে আমিও কার্পণ্য করব না। তারপর সে এ কাব্যাংশ আবৃতি করেঃ 'আমি মুজাম্মামের নাফরমানি করি, তার নির্দেশের অমান্য করি এবং তার দীনকে ঘৃণা করি।'
মুশরিকরা রাসূল এবং তার অনুসারীদের কষ্ট দেয়া অব্যাহত রাখল এবং মুসলমানদের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পেতে লাগল তাদের নির্যাতনের মাত্রা এবং মুসলমানদের প্রতি তাদের হিংসা বিদ্বেষ তত প্রকট আকার ধারণ করল। তারা তাদের প্রতি বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি এবং বদনাম রটাতে অপচেষ্টা চালাত।
তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুসলমানদের দুরাবস্থা দেখতে পান এবং তিনি নিজেই একমাত্র আল্লাহর হেফাজতে বেচে আছেন এবং চাচা আবু তালেব তাকে সহযোগিতা করলেও সে মুসলমানদের কোন উপকার করতে পারছে না তাদের উপর যে ধরণের নির্যাতন চলছে তা সে কোন ভাবেই ঠেকাতে পারে না। এভাবে মুসলমানদের দিনকাল অতিবাহিত হচ্ছিল, এরই মধ্যে অনেকে মারা যেত আবার কেউ কেউ অন্ধ হয়ে যেত আবার কেউ অর্ধাঙ্গ আবার কেউ বিকলাঙ্গ হয়ে যেত।
বাধ্য হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথীদের আবিসিনিয়ায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার অনুমতি দেন। ফলে উসমান বিন আফ্ফানের নেতৃত্বে বার জন পুরুষ এবং চার জন মহিলা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তারা সাগর তীরে পৌছলে আল্লাহ তাদের জন্য দুটি নৌকার ব্যবস্থা করেন। তা দ্বার তারা তাদের গন্তব্য আবিসিনিয়ায় পৌছতে সক্ষম হন। তখন নবুওয়তের পঞ্চম বছরের রজব মাস।
এদিকে কুরাইশরা তাদের সন্ধানে ঘর থেকে বের হলো এবং সাগরের তীর পর্যন্ত গিয়ে উপস্থিত হলো। কিন্তু তাদেরই দুর্ভাগ্য সেখানে গিয়ে তারা কাউকে পায়নি। তারপর তারা সেখান থেকে ক্রুদ্ধ হয়ে মক্কায় ফিরে আসে।
পরবর্তীতে আবিসিনিয়ায় একটি মিথ্যা সংবাদ পৌছলো যে, কুরাইশরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের অনেকেই মুসলমান হয়ে গেছে। তাই তারা পুনরায় মক্কায় ফিরে আসেন।
কিন্তু তারা মক্কায় ফিরে এসে যখন জানতে পারেন এ খবরটা ছিল মিথ্যা-অপপ্রচার এবং এও জানতে পারেন, মুশরিকরা পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন মুসলমানদের আরো বেশি কষ্ট দেয়। তাই তাদের কেউ কেউ অন্যের আশ্রয় নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন আবার কেউ গোপনে মক্কায় প্রবেশ করেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসুদ রা. আশ্রয় প্রার্থনা করে মক্কায় প্রবেশ করেন।
এ ঘটনার পর হতে মুসলমানদের উপর নির্যাতন আরো বেড়ে যায় এবং আরো কঠিন অত্যাচারের সম্মুখীন হন।
তাদের জুলুম নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয়বার তাদের আবিসিনিয়ায় হিজরত করার অনুমতি দেন। দ্বিতীয়বার যারা হিজরত করেন তাদের সংখ্যা হল আশি জন। তাদের মধ্যে ছিলেন আম্মার বিন ইয়াসার এবং নয়জন মহিলা। তারা সে দেশে নাজ্জাশী বাদশার আশীর্বাদে নিরাপদে বসবাস করতে থাকলেন। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতে কুরাইশরা যখন জানতে পারল তখন তারা বিভিন্ন প্রকার উপঢৌকন নিয়ে নাজ্জাশী বাদশার নিকট দূত প্রেরণ করে। যেন সে আশ্রিত মুসলমানদের তার দেশ থেকে বের করে দেয় ও আবার মুশরিকদের নিকট ফেরত পাঠায়।'
অষ্টম দৃষ্টান্ত: উপত্যকায় রাসূলের বন্দি জীবন
যখন কুরাইশরা ইসলামের প্রচার প্রসার, ব্যাপকভাবে মানুষের ইসলাম গ্রহণ, ইথিওপিয়ায় মুহাজিরদের সম্মান ও নিরাপদ আশ্রয় ও কুরাইশ প্রতিনিধি দল নিরাশ হয়ে ফিরে আসার ব্যাপারগুলো অবলোকন করল, তখন ইসলামের অনুসারীদের প্রতি তাদের ক্রোধ বেড়ে গেল এবং তারা বনী হাশেম, বনী আব্দুল মুত্তালিব ও বনী আবদে মানাফের বিরুদ্ধে পরস্পর চুক্তি সম্পাদন করতে একত্র হল। তারা তাদের সাথে লেনদেন করবে না। পরস্পর বিবাহ শাদী করবে না। কথা বার্তা বলবে না ও উঠা বসা করবে না। যাকে বলা যায় অবরোধ বা বয়কট। এ অবরোধ চলতে থাকবে যতক্ষণ না তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের হাতে সমর্পণ করবে। অতঃপর একটি চুক্তিনামা লিখে কাবার ছাদে ঝুলিয়ে দিল।
ফলে আবু লাহাব ব্যতীত বনী হাশেম ও বনী আব্দুল মুত্তালিবের কাফের মুসলিম সকলে এক পক্ষ অবলম্বন করল। তারা মুসলিমদের সাথে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল। আবু লাহাব এদের গোত্রভুক্ত হওয়া সত্বেও সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বনী হাশেম ও বনী আব্দুল মুত্তালিবের বিরুদ্ধে কুরাইশদের সমর্থক থেকে গেল। নবুওয়তের সপ্তম বছরে মুহাররম মাসের শুরুর দিকের কোন এক রাত্রিতে আবু তালেব ঘাঁটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবরুদ্ধ করা হল। তারা সেখানে আবদ্ধ সংকীর্ণতা ও খাদ্য সমাগ্রীর অভাব এবং বিচ্ছিন্নাবস্থায় তিন বছর যাবৎ অবরোধের দিনগুলো অতিবাহিত করলেন। এমনি হয়েছিল যে, ঘাটির আড়াল থেকে ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের কান্নাকাটির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চুক্তিপত্রের সম্পর্কে অবহিত করলেন যে, একটি উই পোকা পাঠিয়ে জোর, জুলুম, আত্মীয়তা ছিন্নের চুক্তির সব লেখা খাইয়ে দিয়েছেন। শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার নামটি অবশিষ্ট আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে সকলকে সংবাদ দিলেন। ফলে একজন কুরাইশদের কাছে গেল এবং সংবাদ দিল যে, মুহাম্মাদ চুক্তিপত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা বলছে। যদি সে এতে মিথ্যাবাদী হয় তাহলে আমরা তাকে তোমাদের হাতে দিয়ে দেব। আর যদি সত্যবাদী হয় তাহলে তোমাদের এই অবরোধ ও বয়কট থেকে ফিরে আসতে হবে। তারা বলল, 'তুমি ঠিকই বলেছ।' অতঃপর তারা কাগজের টুকরাটি নামিয়ে আনল। যখন তারা এই বিষয়টি রাসূলের কথামত দেখতে পেল তখন তাদের কুফরী আরো বেড়ে গেল। নবুয়তের দশম বছরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথীরা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে থেকে বের হয়ে আসলেন। এর ছয় মাস পর আবু তালেব মৃত্যুবরণ করল। তার মৃত্যুর তিন দিন পর খাদিজা রা. ইন্তেকাল করেন।' কেউ কেউ অন্য মতও প্রকাশ করেছেন। বয়কট ও অবরোধ অবসানের পর অল্প দিনের ব্যবধানে আবু তালেব ও খাদিজার ইন্তেকাল হয়ে গেল। ফলে রাসূলের উপর তার সম্প্রদায়ের নির্বোধরা দুঃসাহসিকতার সাথে, প্রকাশ্যে, আরো বেশি উৎপীড়ন-নিপীড়ন করতে থাকল। যার কারণে তার দুঃচিন্তা বেড়ে গেল এবং তাদের থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন। এবং তিনি তায়েফে চলে গেলেন এ আশায় যে, তায়েফবাসীরা তার ডাকে সাড়া দেবে। তাকে আশ্রয় দেবে। তাকে তার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য করবে। সেখানেও কেউ তাকে আশ্রয় দেয়নি, কেউ সাহায্য করেনি। এবং তারা তাকে আরো বেশি কষ্ট দিয়েছে এবং তার সম্প্রদায়ে চেয়ে বেশি অত্যাচার করেছে।'
নবম দৃষ্টান্ত: তায়েফ বাসীর সাথে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
নবুয়তের দশম বছরে শাওয়াল মাসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ বাসীর উদ্দেশ্যে বের হলেন। তার ধারণা ছিল যে, তিনি সকীফ গোত্রে তার দাওয়াতের প্রতি সাড়া ও সাহায্য পাবেন। তার সাথে ছিল আজাদ কৃত গোলাম যায়েদ বিন হারেসা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথিমধ্যে যে গোত্রের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতেন তাদের ইসলামের দাওয়াত দেন। তবে তাদের কেউ তার ডাকে সাড়া দেয়নি।
যখন তিনি তায়েফে পৌঁছলেন তখন সেখানকার নেতাদের নিয়ে বসলেন এবং ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তার দাওয়াতে তারা কোন ভাল উত্তর দেয়নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে দশদিন অবস্থান করেন। এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় লোকদের কাছে গিয়ে ইসলামের কথা বলেন। তাতে ও ভাল কোন সাড়া পাননি। বরং তারা বলল, 'তুমি আমাদের দেশ থেকে বের হও! আমরা তোমার দাওয়াত গ্রহণ করতে পারলাম না।' তারা তাদের নির্বোধ ও বাচ্চাদেরকে তার প্রতি ক্ষেপিয়ে তার পিছনে লেলিয়ে দিল। অতঃপর যখন তিনি বের হতে ইচ্ছা করলেন তখন নির্বোধরা তার পিছু ধরল। তারা দু সারি হয়ে তাকে পাথর নিক্ষেপ করল। অকথ্য ভাষায় গালাগালি করল এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পাথর নিক্ষেপ করে তার জুতাদ্বয় রক্তে রঞ্জিত করে দিল। আর যায়েদ বিন হারেসা নিজেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রক্ষা করতে ছিলেন। যার কারণে তার মাথা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ থেকে দুশ্চিন্তা ও ভগ্ন হৃদয় নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। মক্কায় আসার পথে আল্লাহ তাআলা পাহাড়-পর্বতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাসহ জিবরীলকে পাঠান। সে তার কাছে অনুমতি চাচ্ছিল যে, দুটি পাহাড় যা তায়েফ ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত তা মক্কাবাসীর উপর নিক্ষেপ করতে।' আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছে কি উহুদ যুদ্ধের দিন অপেক্ষা আরো কোন ভয়ানক দিন এসেছে?' তিনি বললেন যে, আমি তোমার সম্প্রদায় থেকে যে কষ্ট পাওয়ার তাতো পেয়েছি। তবে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি আকাবার দিন। যখন আমি ইবনে আবদে ইয়ালীল বিন আবদে কিলালের কাছে দাওয়াত পেশ করলাম তারা আমার আহ্বানে সাড়া না দেয়ায় আমি চিন্তিত বেহুশ অবস্থায় চলে এলাম। 'কারনুস শাআলব' নামক স্থানে এসে সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে মাথা উত্তোলন করি তখন আমি একটি খন্ডমেঘ দেখতে পাই, যা আমাকে ছায়া দিচ্ছে। মেঘের দিকে তাকালে জিবরীলকে দেখি। অতঃপর সে আমাকে ডেকে বলল, 'আল্লাহ তাআলা আপনার সম্প্রদায়ের কথা ও তাদের উত্তর শুনেছেন।'
তিনি আপনার নিকট পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়েজিত ফেরেস্তাকে পাঠিয়েছেন। আপনি তাদের ব্যাপারে যে শান্তি চান তাকে নির্দেশ করতে পারেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তা আমাকে আওয়াজ দিল এবং আমাকে সালাম দিল। অতঃপর বলল, 'হে মুহাম্মাদ! আপনার জাতি আপনাকে যা বলেছে আল্লাহ তাআলা তা শুনেছেন। আর আমিতো পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়েজিত ফেরেস্তা। আমার প্রভু আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। তাদের ব্যাপারে আপনার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য। যদি আপনি চান তাহলে দু পর্বতের মাঝে তাদেরকে মিশিয়ে দেব।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'বরং আমি চাই যে, আল্লাহ তাআলা তাদের পরবর্তী বংশধর থেকে এমন প্রজন্ম বের করবেন যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে যার কোন শরীক নাই। এবং তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এ উত্তরের মধ্যে তার অনন্য ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে। এবং তার যে মহান চরিত্র ছিল, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাকে সাহায্য করেছিলেন, তাও প্রকাশ পেয়েছে।
এর মাধ্যমে তার জাতির প্রতি তার দয়া, ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। আর এটাই আল্লাহ তাআলার এ বাণীর সাথে মিলে যায়:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهَ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ( سورة آل عمران (١٥٩) 'অতএব আল্লাহর অনুগ্রহ এই যে, তুমি তাদের প্রতি কোমল চিত্ত হয়ে গেছ। আর তুমি যদি কর্কশভাষী, কঠোর হৃদয় হতে, তবে নিশ্চয়ই তারা তোমার সংস্পর্শ হতে ফিরে যেত।'
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ﴿سورة الأنبياء ١٠٧﴾ 'আমি তো তোমাকে সৃষ্টিকুলের প্রতি শুধু রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি।'
আল্লাহ তাআলার অগণিত সালাত ও সালাম তার উপর বর্ষিত হউক।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'নাখলা' নামক স্থানে বেশ কয়েকদিন অবস্থান করলেন। এবং মক্কায় ফিরে আসতে সংকল্প করলেন। ইসলাম ও আল্লাহর শ্বাশত রেসালাত পেশ করার ব্যাপারে তার প্রথম পরিকল্পনা নতুন করে আরম্ভ করার ইচ্ছা করলেন নতুন উদ্যমে। তখনই যায়েদ বিন হারেসা রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, 'তাদের কাছে নতুন করে কিভাবে যাবেন? তারা তো আপনাকে বের করে দিয়েছে।' যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে যায়েদ! তুমি যা দেখতে পাচ্ছো, আল্লাহ তাআলা এর থেকে বের হওয়ার কোন রাস্তা দেখিয়ে দিবেন। আল্লাহ তার দীনের সাহায্য করবেন ও তার নবীকে বিজয় দান করবেন। এরপর চলতে চলতে মক্কায় পৌঁছলেন। একজনকে 'খুজাআ' গোত্রের মুতয়েম বিন আদীর নিকট তার আশ্রয় প্রার্থনা করে পাঠালেন। মুতয়েম সাড়া দিলেন। তার সন্তান ও গোত্রের লোকদেরকে ডেকে বললেন, তোমরা যুদ্ধাস্ত্র ধর এবং কাবা ঘরের কোণায় অবস্থান গ্রহণ কর। কেননা, আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশ্রয় দিয়েছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়েদ বিন হারেসা রা. কে সাথে নিয়ে প্রবেশ করে কাবা ঘরে গিয়ে যাত্রা শেষ করলেন। মুতয়েম বিন আদী তার সওয়ারীর উপর দাঁড়িয়ে ডাক দিয়ে বললেন, 'হে কুরাইশ গোত্র! আমি মুহাম্মাদকে আশ্রয় দিয়েছি। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ তার সাথে বিদ্রুপ করবে না।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকনে ইয়ামানির কাছে গেলেন তা স্পর্শ করলেন। এবং দু রাকাত নামায আদায় করলেন। এরপর নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন। মুতয়েম বিন আদী ও তার সন্তানেরা তার বাড়িতে প্রবেশ করা পর্যন্ত তাকে অস্ত্র দ্বারা পরিবেষ্টন করে রেখেছিলো।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে এই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন তায়েফ সফরে, এটা তার দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অদম্য ইচ্ছার স্পষ্ট প্রমাণ। এবং মানুষেরা তার দাওয়াতে সাড়া না দেয়ায় তিনি আশাহত হননি। যখন প্রথম প্রান্তরে কোন বাধা এসে উপস্থিত হয়েছে, তখন দাওয়াতের নতুন প্রান্তর খুঁজেছেন।
এর মধ্যে এ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রজ্ঞার শিক্ষক ছিলেন। আর এটা এ কারণে যে, তিনি যখন তায়েফ আসলেন তখন সমস্ত দলপতি ও তায়েফের সাকীফ গোত্রের প্রধানকে দাওয়াতের জন্য বাছাই করলেন। আর এটা তো জানা কথাই, তারা দাওয়াত গ্রহণ করলে সমস্ত তায়েফবাসীর দাওয়াত গ্রহণ করবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দুই পা থেকে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার মধ্যে একথার সব চেয়ে বড় প্রমাণ যে, আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াতের কাজে কতবড় কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করেছেন তিনি।
নিজের জাতি ও তায়েফবাসীর উপর তার বদ-দুআ না করা, আর পর্বতসমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তার পক্ষ থেকে তাদেরকে দুই পাহাড়ের মধ্যে ধবংস করার প্রস্তাবে সম্মতি না দেয়ার মধ্যে আরো বড় উদাহরণ যে, দায়ীর দাওয়াত গ্রহণ না করলে তাকে কত পরিমাণ ধৈয ধারণ করতে হয়। এবং তাদের হেদায়েত না পাওয়ার কারণে নিরাশ হওয়া যাবে না। হতে পারে আল্লাহ পরবর্তীতে তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন কাউকে বের করবেন, যে এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তার সাথে কাউকে শরীক করবে না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কৌশলের মধ্য থেকে ছিল, মুতয়েম বিন আদির আশ্রয় গ্রহণ করার পূর্বে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেননি। আর এভাবেই দায়ীর উচিত এমন কাউকে তালাশ করা যে তাকে শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করবে, যাতে সে চাহিদা অনুযায়ী দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে পারে।'
দশম উদাহরণঃ ব্যবসায়ী ও মওসুমী লোকদের কাছে তার দাওয়াত উপস্থাপন-
নবুওতের দশম বর্ষে জিলকদ মাসে তায়েফ থেকে মক্কায় ফেরার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াতের কাজ শুরু করলেন। তিনি সেখানকার মওসুমী বাজারগুলোতে যেতে আরম্ভ করলেন। যেমন, উকাজ, মাজান্নাহ, জিল-মাজাজ ইত্যাদি যে সমস্ত বাজারে আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা উপস্থিত হতো ব্যবসার উদ্দেশ্যে, কবিতা পাঠের আসরে যোগ দেয়ার জন্য। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সমস্ত গোত্রের নিকট নিজেকে উপস্থাপন করলেন আল্লাহর দিকে তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে। একই বছর হজের মওসুম আসল তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের প্রতিটি গোত্রের নিকট গেলেন। তাদের নিকট ইসলাম উপস্থাপন করলেন, যেমন তিনি তাদেরকে নবুওতের চতুর্থ বর্ষ থেকে দাওয়াত দিতেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু বিভিন্ন গোত্রের কাছে ইসলাম পেশ করে ক্ষ্যান্ত থাকেননি, বরং ব্যক্তির কাছেও ইসলামের দাওয়াত পেশ করেছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমস্ত মানুষদেরকে উৎসাহ দিতেন সফলতার দিকে।
আব্দুর রহমান বিন আবিজ যানাদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি আমাকে সংবাদ দিল, যে রবিয়াহ বিন আব্বাদ বলে পরিচিত। সে বনি দাইল গোত্রের এবং জাহেলী যুগের লোক ছিলো। সে বলল, আমি জাহেলী যুগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিল মাজাজ বাজারে দেখলাম। তিনি বলছেন, 'হে মানব সকল! তোমরা বল, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই, তা হলে তোমরা সফলকাম হবে।' এ অবস্থায় লোকেরা তার পাশে জড়ো হয়ে আছে। এবং তার পিছনে প্রশস্ত চেহারার এক ব্যক্তি দাড়িয়ে আছে। সে বড় বড় ব্যাকা চোখের অধিকারী। সে বলছে, 'এই মুহাম্মদ নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছে, সে মিথ্যাবাদী।' যেখানইে তিনি যাচ্ছেন, এ লোকটি তার পিছনে পিছনে যাচ্ছে। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম। তারা আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বংশ পরিচয় উল্লেখ করল এবং বলল, 'সাথের এ লোকটি তার চাচা আবু লাহাব।'
অন্যান্য আরবের মত আউস এবং খাজরাজ গোত্রের লোকেরাও হজ করত। কিন্তু ইহুদীরা হজ করত না। যখন আনছাররা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অবস্থা এবং দাওয়াতকে দেখল তখন বুঝতে পারল যে, ইনিই সেই লোক যার সম্পর্কে ইহুদীরা তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তাই তারা ইহুদীদের আগে ঈমান আনতে চাইল। কিন্তু তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাতে এ বছর বাইয়াত গ্রহণ করল না। মদীনায় ফিরে গেল।
নবুওতের একাদশ বর্ষে হজের মওসুমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন গোত্রের নিকট উপস্থিত হলেন। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাদের নিকট উপস্থিত হচ্ছিলেন, সে সময় মিনার গিরিপথে ইয়াসরেবের ছয় যুবককে পেলেন। তাদের নিকট ইসলাম পেশ করলেন। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত কবুল করলেন। তারা ইসলামের দীক্ষা নিয়ে তাদের জাতির নিকট ফিরে গেলেন।'
অতঃপর বছর ঘুরে নতুন বছর আসল। নবুওতের দ্বাদশ বর্ষে লোকেরা হজে করতে আসল। ইয়াসরেবের হাজীদের মধ্য থেকে বারজন আসল। এদের মধ্যে গত বছরের ছয়জনের পাঁচজনও ছিল। অঙ্গীকার অনুযায়ী মিনার গিরিপথে তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে মিলিত হল ও ইসলাম গ্রহণ করল। এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করল। যা ইতিহাসে বাইয়াতুন নিসা নামে পরিচিত।
উবাদাহ বিন ছামেত রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাহদের একটি দল পরিবেষ্টিত অবস্থায় বললেন, 'আস! তোমরা আমার নিকট বাইয়াত গ্রহণ কর। শপথ কর এ কথার উপর যে, তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে শরীক করবে না। চুরি করবে না। ব্যভিচারে লিপ্ত হবে না। তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। তোমাদের নিজের কৃত অপরাধকে অন্যের উপর অপবাদ হিসেবে চাপিয়ে দেবে না। কোন ন্যায় কাজে আমার অবাধ্য হবে না। যে এ অঙ্গীকারগুলো পরিপূর্ণরূপে পালন করবে তার প্রতিদান আল্লাহর দায়িত্বে। আর যে ব্যক্তি এর মধ্য থেকে কোন কাজ করে ফেলবে, অতঃপর পৃথিবীতে তাকে শাস্তি দেয়া হলে তা তার জন্য কাফ্ফারা হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি এর মধ্য থেকে কোন কাজ করে, অতঃপর আল্লাহ গোপন রাখেন, তাহলে তার বিষয়টি আল্লাহর নিকট অর্পিত। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন অথবা মাফ করে দিতে পারেন।' এই কথাগুলোর উপর আমরা তার নিকট বাইয়াত (শপথ) গ্রহণ করলাম।'
যখন বাইয়াতের কাজ সম্পন্ন হল, এবং হজ মওসুম শেষ হল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে মুছআব বিন উমায়ের রা. কে পাঠালেন মুসলমানদেরকে ইসলামী শরীয়ত শিক্ষা ও ইসলাম প্রচারের কাজ করার জন্য। তিনি তার দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালন করলেন। নবুওতের ত্রয়োদশ বর্ষে হজের মওসুমে হজ পালনের জন্য ইয়াসরেব থেকে তিয়াত্তর জন পুরুষ এবং দুইজন মহিলা উপস্থত হলেন এবং তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করলেন।
যখন তারা মক্কায় আসল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকাবায় তাদের সাথে বৈঠকের ব্যবস্থা করলে তারা সময়মত সেখানে উপস্থিত হল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে কথা বললেন। অতপর তারা বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনার নিকট কি বিষয়ের উপর বাইয়াত গ্রহণ করব? তিনি বললেন, 'তোমরা আমার নিকট বাইয়াত করবে সুখ ও দুঃখ সর্বাস্থায় আমার আনুগত্য করবে এবং আমার কথা শুনবে। সুখে দুঃখে খরচ করবে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে। এক আল্লাহর কথা বলবে। এ বিষয়ে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারের ভয় করবে না। এবং আমাকে সাহায্য করবে। আমার কাছ থেকে বাধা দেবে ঐ সমস্ত জিনিস যা তোমরা তোমাদের নিজের থেকে ও স্ত্রীদের থেকে এবং সন্তানদের থেকে বাধা দিয়ে থাক। তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।' তারা সবাই উঠে রাসুলের কাছাকাছি গেল এবং তার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করল।
আর এই বাইয়াত অনুষ্ঠিত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জন্য বারজন নেতা ঠিক করে দিলেন, যারা তাদের গোত্র প্রধান হবেন। নয়জন ছিল খাজরাজ গোত্রের এবং তিনজন ছিল আওস গোত্রের। অতঃপর তারা ইয়াসরেবে ফিরে গেল। এবং সেখানে পৌঁছার পর তারা ইসলাম প্রকাশ করল। আল্লাহর প্রতি দাওয়াতে তাদের দ্বারা অনেক খেদমত হল।'
দ্বিতীয় আকাবার বাইয়াতের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের জন্য একটি আবাসভূমি প্রতিষ্ঠায় সফল হলেন। সংবাদটি অধিকহারে মক্কায় প্রচার হল এবং কুরায়েশদের নিকট এ কথা প্রমাণ হল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইয়াসরেববাসীদের নিকট থেকে বাইয়াত গ্রহণ করেছেন। এতে মক্কায় যারা মুসলমান হয়েছিল তাদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেল। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিলেন। মুসলমানরা হিজরত করল। কুরাইশরা বৈঠকে বসল। তখন নবুওয়তের চতুর্দশ বর্ষে ২৬শে ছফর তারিখ। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করার বিষয়ে একমত হল। এ সংবাদ অহীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দিলেন। তার সুন্দর কৌশল ছিল। তিনি আলী রা. কে নির্দেশ দিলেন, সে যেন আজ রাতে তার বিছানায় ঘুমায়। মুশরিকরা দরজার ফাক দিয়ে আলী রা. কে দেখে মুহাম্মাদ ভেবে অপেক্ষা করতে থকল। এ অবস্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বের হয়ে গেলেন এবং আবু বকরকে সাথে নিয়ে মদীনায় হিজরত করলেন।
আর এই মহান অবস্থান যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গ্রহণ করেছিলেন, স্পষ্ট প্রমাণ যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কৌশল বা হিকমত অবলম্বন করেছেন, এবং তিনি ধৈর্য্য ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আর তিনি যখন জানতে পারলেন যে, কুরাইশরা সীমালংঘন করেছে ও দাওয়াতকে অস্বীকার করেছে তখন এমন একটি স্থান তালাশ করেছেন, যাকে ইসলামী দাওয়াতের ঘাটি বানাবেন। তিনি শুধু এ পরিকল্পনা করেই ক্ষ্যান্ত হননি, বরং তাদের নিকট থেকে ইসলামকে সাহায্য করার ব্যাপারে বাইয়াত ও অঙ্গীকার নিয়েছেন। এ কাজটি সম্পন্ন হয়েছে দুটি সম্মেলনের মাধ্যমে প্রথম আকাবার বাইয়াত, অতঃপর দ্বিতীয় আকাবার বাইয়াত। তিনি একটি স্থানকে দাওয়াতের ঘাটি বানাবেন বলে খুঁজছিলেন যখন তা পেয়ে গেলেন এবং দাওয়াতের সাহায্যকারীও পেয়ে গেলেন। তিনি তার সাথীদেরকে হিজরতের অনুমতি দিলেন। যখন তার বিরুদ্ধে কুরায়েশরা চক্রান্ত করল তখন তিনি কৌশল অবলম্বন করলেন।। আর এ কাজটিকে কাপুরুষতা ধরা হয় না, বা মৃত্যু থেকে পলায়নও বলা যায় না। হ্যাঁ আল্লাহর উপর ভরসা করে উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা যায়। আর এই প্রজ্ঞাপূর্ণ কুটনীতিই হল দাওয়াতের সফলতার কারণ। আল্লাহর দিকে আহবানকারীদের এমনই হওয়া উচিত, কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন তাদের আদার্শ ও নেতা।'
একাদশ উদাহরণঃ তার মুখমন্ডল ক্ষতবিক্ষত হল এবং দানদান মুবারক শহীদ হল
সাহল বিন সাআদ রা. থেকে বর্ণিত, তাকে প্রশ্ন করা হল, উহুদ দিবসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আহত হওয়া সম্পর্কে। তিনি বললেন, 'তার মুখমন্ডল আহত হল, এবং তার দাঁতগুলো ভেঙ্গে গেল। বর্মের ভাঙ্গা অংশ তার মাথায় প্রবেশ করল। ফাতেমা রা. রক্ত পরিস্কার করছিলেন, এবং আলী রা. রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছিলেন। যখন দেখলেন রক্ত বন্ধ না হয়ে আরো বেশি পরিমাণে বের হচ্ছে তখন ফাতেমা চাটাইতে আগুন ধরিয়ে দিলেন, পুড়ে ছাই হয়ে গেল। অতঃপর তা ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন, তখনই রক্ত বন্ধ হয়ে গেল।'
আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কঠিন কষ্ট বরদাশত করছিলেন। যার মহত্বের কাছে পাহাড়ও কেঁপে উঠে। তিনি এমন এক নবী, যিনি এ অবস্থায়ও তার জাতির বিরুদ্ধে বদ-দুআ করেননি। বরং তাদের জন্য ক্ষমার দু'আ করেছেন। কেননা তারা বুঝে না।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এখনো মনে হয় আমি রাসুলের দিকে চেয়ে আছি আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য কোন নবীর ঘটনা বর্ণনা করছেন যাকে তার জাতি মেরেছে। এ অবস্থায় তিনি চোখ থেকে পানি মুছছিলেন। এবং বলছিলেন, 'হে আল্লাহ! আমার জাতিকে মাফ করে দিন তারা বুঝে না।'
সমস্ত নবীগণ এবং তাদের মধ্যে সবার উপরে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্য ও সহনশীলতা, ক্ষমা, ও দয়ার মূর্ত প্রতীক ছিলেন। তিনি তার জাতির জন্য ক্ষমা ও করণার সকল দ্বার খুলে দিয়েছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর অভিশাপ ঐ জাতির উপর অধিক হারে পতিত হয়, যে জাতি তাদের রাসুলের সাথে এ আচরণ করে। এ কথা বলার সময় তিনি তার দাঁতের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। আল্লাহ তাআলার ক্রোধ কঠোরতর হল এমন ব্যক্তির উপর, যে আল্লাহর রাসুল এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল।
উহুদ দিবসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আহত হওয়ার মধ্যে দাওয়াত-কর্মীদের জন্য সান্তনা রয়েছে; তারা আল্লাহর রাস্তায় তাদের শরীরে যে কষ্ট বরদাশত করবে, অথবা তাদের স্বাধীনতা হরণ করা হবে অথবা তাদেরকে যে নির্যাতন করা হবে সে সকল বিষয়ে তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রাপ্ত হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন উত্তম আদর্শ। তাকে যখন কষ্ট দেওয়া হয়েছে আর তিনি তাতে ধৈর্য ধারণ করেছেন। তাহলে অন্য দাওয়াত-কর্মীদের তো তা বরদাশত করতেই হবে।'

টিকাঃ
১ সহীহ আল বুখারী: ৪৭৭০, সহীহ মুসলিম: ২০৮ আয়াত: সুরা মাসাদ: ১-২ ২ সহীহ আল বুখারী ৪৭৭১, সহীহ মুসলিম ২০৬
২ 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪১/৩
৩ সহীহ আল - বুখারী ফতহুলবারী সহ ৭ম খন্ড ২১৯ পৃঃ সনদকে হাফেজ ইবনে হাজার হাসান বলেছেন।
৪ তারিখে ইসলাম মাহমুদ শাকেরের ২য় খন্ড ১৪২ পৃঃ পূঃ রহিকুল মাখতুম ১৪৩ পৃঃ ইবনে হিশাম ২য় খন্ড ৩৯ পৃঃ বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩য় খন্ড ১৫৮ পৃঃ ৫ ইবনে হিশام ২য় খন্ড ৯৫ পৃঃ বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩য় খন্ড ১৭৫ পৃঃ জাদুল মায়াদ ৩য় খন্ড ৫৪ পূঃ সিরাতে নববী মুস্তফা সুবায়ী রচিত ৬১ পৃঃ ওয়া হাজাল হাবিব ইয়া মুহিব ১৬৫ প
৫ সহীহ আল - বুখারী ৩৪৭৭ সহীহ মুসলিম ১৭৯২ শরহে নববী ১২খন্ড ১৪৮ পৃঃ

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 বীরত্ব ও সাহসিকতা

📄 বীরত্ব ও সাহসিকতা


যুদ্ধ এবং লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বীরত্ব দেখানো অবশ্যই ধৈর্যের পরিচায়ক। এবং এর দ্বারা ভীতির উদ্রেক থেকে নিজের আত্মার উপর নিয়ন্ত্রন রাখা যায়। মানুষ যে সকল স্থানে বীরত্বকে ভাল চোখে দেখে, সে সকল স্থানে কাপুরুষতা প্রদর্শন সাহসিকতার বিরোধী বলে গণ্য।
বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে রাসুলের সীরাতের কিছু উদাহরণ দেয়া হল, আর এই উদাহরণগুলো দ্বারা মানুষ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে উত্তম আদর্শ পাবে। এই জন্যই তো তিনি অন্তর, জিহবা, তরবারী, দাঁত, দাওয়াত ও বক্তৃতা দ্বারা জিহাদ করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৫৬টি অভিযান প্রেরণ করেছেন। আর তিনি নিজে সরাসরি ২৭টি অভিযান পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে ৯টি তে নিজে প্রত্যক্ষ লড়াই করেছেন।
উদাহরণগুলো নিয়ে তুলে ধরা হলঃ
প্রথম উদাহরণঃ বদরের যুদ্ধে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বীরত্ব-
তার যে সকল অবস্থান হিকমত দ্বারা পরিপূর্ণ তার একটি হল, তিনি যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে লেকেদের সাথে পরামর্শ করেছিলেন। কেননা তিনি যুদ্ধে আনছারদের আগ্রহ বুঝার চেষ্টা করছিলেন। বাইয়াতের মধ্যে তাদের সাথে শর্ত করা হয়েছিল যে, মদীনায় থেকে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষে ঐ সমস্ত জিনিসকে প্রতিরোধ করবেন যা তারা সাধারনত নিজেদের জন্য, মাল সম্পদের রক্ষায়, সন্তান ও স্ত্রীদের নিরাপত্তার জন্য করে থাকেন। মদীনার বাহিরে প্রতিরোধ করার ব্যাপারে তাদের সাথে কোন শর্ত ছিল না। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে পরামর্শ করতে চাইলেন। তাদেরকে একত্রিত করলেন ও পরামর্শ করলেন। আবু বকর রা. দাড়ালেন এবং সুন্দরভাবে বললেন। এরপর উমার রা. দাড়ালেন ও সুন্দরভাবে বললেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূনরায় পরামর্শ চাইলেন। এইবার মিকদাদ রা. দাড়ালেন, তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ আপনাকে যে পথে চলতে নির্দেশ করেছেন আপনি সে পথে চলুন। আমরা সবাই আপনার সাথে। আল্লাহর শপথ আপনাকে আমরা তেমন বলব না যেমন বলেছিল বনী ইসরাঈল মুসা আ. কে যে 'আপনি ও আপনার প্রভু যান, যুদ্ধ করুন। আমরা এখানে বসে থাকি।' কিন্তু আমরা বলছি 'আপনি এবং আপনার প্রভূ যান যুদ্ধ করুন, আমরাও আপনাদের সাথে থেকে যুদ্ধ করব। আমরা আপনার ডানে, বামে, সামনে, পিছনে, সর্বত্র যুদ্ধ করব।' রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয় বার মানুষের সাথে পরামর্শ করলেন। আনছাররা বুঝতে পারল, তাদের মতামত চাওয়া হচ্ছে। সাআদ বিন মুআজ রা. সামনে অগ্রসর হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! মনে হয় আপনি আমাদের মতামত চাইছেন। আসলে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মতামতই চাচ্ছিলেন। কেননা তারা বাইয়াত করেছিল, দেশের মধ্যে অবস্থান করে তারা রাসূলের পক্ষে প্রতিরোধ করবে। কিন্তু যখন মদীনার বাহিরে লড়াই করার প্রশ্ন আসল তখন তাদের মতামত নেয়া খুবই জরুরী মনে করলেন। অতঃপর যখন বের হওয়ার সংকল্প করলেন, তাদের সাথে পরামর্শ করলেন, যাতে তাদের মনের অবস্থা জানতে পারেন। সাআদ রা. তাকে বললেন, 'মনে হয় আপনি ভয় পাচ্ছেন যে, আনছারদের এ অধিকার আছে তাদের নিজেদের দেশে ছাড়া আপনাকে সাহায্য করবে না। আমি আনছারদের পক্ষ থেকে বলছি ও উত্তর দিচ্ছি, আপনি যেখানে ইচ্ছা গমন করুন। যাকে ইচ্ছা নিয়ে যান। যাকে ইচ্ছা বাদ দিন। আমাদের সম্পদ থেকে যা ইচ্ছা গ্রহণ করুন এবং যা ইচ্ছা আমাদের জন্য রেখে যান। আমাদের নিকট থেকে যা গ্রহণ করবেন তা আমাদের নিকট বেশি প্রিয় তার চেয়ে যা আমাদের জন্য রেখে যাবেন। আমাদেরকে যে বিষয়ের নির্দেশ করতে চান, করুন। আমরা আপনার আদেশের অনুগত। আল্লাহর শপথ! আমাদেরকে নিয়ে চলতে চলতে যদি গামদান এর হ্রদে পৌঁছে যান, অবশ্যই আমরা আপনার সাথে চলব। ঐ সত্ত্বার শপথ! যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি আমাদেরকে এই সমুদ্রে নিয়ে পরীক্ষা করেন, আর আপনি তাতে প্রবেশ করেন, আমরাও আপনার সাথে প্রবেশ করব। আমাদের মধ্য থেকে একজনও পিছনে থাকবে না। আর আমরা এটাও অপছন্দ করব না যে, আমাদেরকে নিয়ে আগামী কালই শত্রুদের মুখোমুখী হবেন। আমরা যুদ্ধে ধৈর্যশীল, শত্রু সাক্ষাতে সত্যবাদী। আশা করি আল্লাহ তাআলা আমাদের থেকে এমন কিছু দেখাবেন যা আপনার চক্ষু শীতল করবে। আল্লাহর বরকতের উপর নির্ভর করে আমাদেরকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন।' এই বক্তব্যে রাসুলুল্লার চেহারা মুবারক আলোকিত হল। আনন্দ ফুটে উঠল এবং তাকে পুলকিত করল। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'চলো এবং সুভ সংবাদ গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহ আমার সাথে দুইটি দলের একটির অঙ্গীকার করেছেন। মনে হয় আমি এখন সে জাতির ধংস দেখতে পাচ্ছি।'
বদরের যুদ্ধে রাসুলের বিশেষ অবস্থানের মধ্যে একটি ছিল আল্লাহ তাবারকা ও তাআলার উপর তার অগাধ ভরসা। কেননা তিনি জেনেছিলেন যে, বিজয় অধিক সংখ্যক যোদ্ধ বা শক্তির কারণে আসবে না। বরং বিজয় হবে আল্লাহর সাহায্যে উপকরণ গ্রহণ ও আল্লাহর উপর ভরসা করার মাধ্যমে।
উমার বিন খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদর দিবসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের দিকে দৃষ্টি দিলেন। তাদের সংখ্যা ছিল এক হাজার। এবং তার সাথীদের সংখ্যা ছিল তিনশত তের জন। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবলার দিকে ফিরলেন, অতঃপর দু হাত উত্তোলন করে তার প্রভুর নিকট উচু কণ্ঠে সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগলেন। 'হে আল্লাহ আমাকে যা অঙ্গীকার করেছেন তা পরিপূর্ণ করে দিন, হে আল্লাহ ইসলাম অনুসারী এ দলকে যদি আপনি ধংস করে দেন তা হলে পৃথিবীতে আপনার ইবাদত করার কেহ থাকবে না।' হাত উঠিয়ে কেবলামুখী হয়ে উচ্চ কন্ঠে তার প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনায় এমনভাবে রত ছিলেন যে, তার কাধের উপর থেকে চাদর পড়ে গেল, আবু বকর রা. তার নিকট আসলেন, চাদর উঠালেন কাধের উপর ফেলে দিলেন, অতঃপর পিছনে তার গায়ে লেগে বসলেন, ও বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনার প্রভুর নিকট প্রার্থনা যথেষ্ট হয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যা আপনার জন্য অঙ্গীকার করেছেন তা আপনাকে দিবেন। তখন আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ন করলেনঃ
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمُدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِنَ المَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ الأنفال : ٩
'স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট কাতর কণ্ঠে সাহায্যের আবেদন করেছিলে। আর তিনি সেই আবেদন কবুল করেছিলেন যে, আমি তোমাদেরকে এক হাজার ফেরেস্তা দ্বারা সাহায্য করবো, যারা ধারাবাহিকভাবে আসবে।' আল্লাহ ফেরেস্তাদের মাধ্যমে রাসুলকে সাহায্য করেছেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুর নিচ থেকে বের হতে হতে বলছিলেনঃ
سَيُهْزَمُ الجُمْعُ وَيُوَلُّونَ الدُّبُرَ القمر ٤٥﴾
"এইদল শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে।”
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিযানে লড়াই করলেন এমনভাবে যে, তিনি সকলের চেয়ে শক্তিশালী ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন। রাসুলের সাথে আবু বকর রা. ছিলেন, যেমন তারা দুজন তাবুতে দুআ ও কান্নাকাটির মাধ্যমে যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলেন। অতঃপর তারা দু'জন নীচে নেমে আসলেন সকলকে উদ্বুদ্ধ করলেন। এবং দুজনই স্ব শরীরে যুদ্ধ করলেন। জিহাদের পবিত্র দু' স্তরের সমন্বয় তারা করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের চেয়ে বড় বীর ছিলেন। আলী বিন আবু তালেব রা. থেকে বর্ণিত, 'তিনি বলেন, বদর দিবসে দেখেছি, আমরা যখন তার কাছাকাছি অবস্থান করছিলাম, তিনি আমাদের চেয়ে শত্রুদের বেশি নিকটবর্তী ছিলেন, সে দিন তিনি সকলের চেয়ে কঠিন আক্রমণকারী ছিলেন।'
আলী রা. বলেন, 'যুদ্ধের দাবানল যখন জলে উঠত এবং এক জাতি আর এক জাতির মুখোমুখী হত, তখন আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করতাম। আমাদের কেহ রাসুলের চেয়ে শত্রু বাহিনীর বেশি নিকটবর্তী হতো না।'
দ্বিতীয় উদাহরণঃ উহুদের যুদ্ধে রাসুলের বীরত্ব
বীরত্বের ব্যাপারে এবং নিজ জাতির নির্যাতনে ধৈর্য ধারণ করার ব্যাপারে উহুদের যুদ্ধে তার অবস্থান ছিল অনেক উর্ধে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে বড় ধরণের লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। মুশরিকদের তুলনায় মুসলমানদের রাষ্ট্র তখন দিপ্রহারের অগ্রভাগে ছিল। আল্লাহর দুশমনেরা পিছু হটতে হটতে পালিয়ে গেল। তারা তাদের নারীদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। যখন গিরিপথ পাহাড়ারত মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী তাদের পরাজয় দেখল। তারা তাদের স্থান ত্যাগ করেছিল যেখানে রাসুল তাদেরকে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছিলেন সর্বাবস্থায়। আর এটা এ কারণে হয়েছিল যে, তারা মনে করেছিল, মুশরিকরা আর ফিরে আসবে না। অতঃপর তারা পাহাড়ের পথ খালি করে দিয়ে যুদ্ধ লব্দ সম্পদের খোঁজে চলে গেল। মুশরিকদের অশ্বারোহী দল আবার ফিরে আসল। তীরন্দাজ বাহিনী মুক্ত সীমান্ত পেল। তারা মুখোমুখী হল ও সেখানে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করল। তাদের সর্বশেষ জনও সেখানে আসল। মুসলমানদেরকে ঘিরে ফেলল। তাদের মধ্য থেকে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা শহীদি মর্যাদা দিতে চাইলেন দিলেন। এরা সংখ্যায় ছিলেন সত্তর জন। সাহাবায়ে কেরাম পিছনে সরে গেলেন এবং মুশরিকরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চারি পাশে সমবেত হল। রাসুলের চেহারা মুবারক আহত করল এবং তার নিচের ডান দিকের দাঁত ভেঙ্গে গেল। বর্মের সূঁচালো মাথা তার মাথায় বিদ্ধ হয়ে গেল। সাহাবায়ে কেরাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বাচানোর জন্য লড়াই করে যেতে থাকলেন।'
রাসুলের পাশে কুরাইশ গোত্রের দু'জন ছিল। আনছরদের মধ্য থেকে ছিল সাতজন। যখন তারা রাসুলের নিকটে এসে পড়ল এবং কাছকাছি পৌঁছল, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'যে তাদেরকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দেবে, তার জন্য জান্নাত রয়েছে, অথবা জান্নাতে সে আমার সঙ্গী হবে।' আনছারদের মধ্য থেকে একজন সামনে অগ্রসর হল শাহাদত বরণ করা পর্যন্ত লড়াই করল। অতঃপর তারা রাসুলের আরো নিকটে চলে আসল। রাসুল আবার বললেন, 'তাদেরকে যে সরিয়ে দেবে তার জন্য জান্নাত।' আনছারদের একজন অগ্রসর হল সে লড়াই করে শহীদ হয়ে গেল। এভাবে সাতজন শহীদ হয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুই সঙ্গীকে বললেন, রণাঙ্গনের সীমান্ত ছেড়ে দিয়ে আমাদের সাথীরা ঠিক কাজ করেনি।'
মুসলমারা যখন একত্রিত হল, এবং যে গিরিপথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবস্থান নিয়েছিলেন, সেখানে তারা পৌঁছলো এবং তাদের মাঝে আবু বকর, উমার, আলী, হারেস বিন ছম্মাহ আল আনছারী প্রমুখ ছিলেন। তারা যখন পাহাড়ে হেলান দিয়ে বসলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই বিন খালাফকে তার ঘোড়ায় পেলেন। সে বলছে, মুহাম্মাদ কোথায়? সে যদি বেচে যায় আজ আমার রক্ষা নেই। লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্য থেকে কে তার দিকে অগ্রসর হবে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে তার দিকে যেতে নিষেধ করলেন। অতপর যখন তার নিকটবর্তী হল, হারেস বিন ছাম্মাহ থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্শা নিয়ে নিলেন। যখন তার থেকে বর্শাটি নিলেন, সে কেঁপে উঠল এমনভাবে যেমন উটের পিঠের উপর থেকে লোম উঠালে সে কেঁপে উঠে। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সামনা-সামনি হলেন এবং তার লৌহ বর্ম ও মাথার টুপির মধ্য থেকে তার গলার লক্ষ্য-বস্তু ঠিক করে নিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে জাগায় তাকে আঘাত করলেন। আঘাতে সে তার ঘোড়ার উপর কয়েকবার চক্কর মারল। বার বার কেঁপে উঠল। আল্লাহর দুশমন যখন সামান্য আঘাতের চিহ্ন নিয়ে কুরায়েশদের নিকট ফিরে গেল। সে বলল, 'আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ আমাকে হত্যা করেছে।' তারা তাকে বলল, মনে হচ্ছে তোমার জান বের হয়ে গিয়েছে। তোমার মারাত্বক কোন ক্ষত আমরা তো দেখতে পাচ্ছি না। সে বলল, 'মুহাম্মাদ তো মক্কায় আমাকে বলেছিল, আমি তোমাকে হত্যা করব। আল্লাহর শপথ সে যদি আমার উপর থুথুও নিক্ষেপ করে তবুও আমি মনে করব সে আমাকে হত্যা করেছে।' তারা মক্কায় ফেরার পথে আল্লাহর এই শত্রু ছারফ নামক স্থানে মারা গিয়েছিল।'
তৃতীয় উদাহরণঃ হুনাইন যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বীরত্ব
হুনাইন যুদ্ধে মুসলমান এবং কাফেররা মুখোমুখী হওয়ার পর, মুসলমানরা পিছনে ফিরে পালাতে লাগল।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের দিকে তার খচ্চর হাঁকাতে আরম্ভ করলেন। অতঃপর বললেন, 'হে আব্বাস! রাত্রে গল্প- গুজব যারা করছিল তাদেরকে আহবান কর।' আব্বাস রা. উচ্চ কন্ঠের অধিকারী ছিলেন। তিনি বলেন, আমি উচ্চ স্বরে বললাম, 'রাত্রে গল্প- গুজবকারীরা কোথায়?' আল্লাহর শপথ! তারা যখন আমার কন্ঠ শুনলো তখন তাদের সহানুভূতির অবস্থা এমন ছিল, যেমন গাভীর সহানুভূতি তার বাছুরের প্রতি হয়ে থাকে। তারা বলল, 'হাজির! হাজির! কাফেরদের বিরুদ্ধে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খচ্চরের উপর বসে প্রসারিত দৃষ্টি দিয়ে তাদের যুদ্ধ দেখছিলেন। তিনি বললেন, 'এখন যুদ্ধের তীব্রতা বেড়েছে।'
এই অবস্থানেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এমন বীরত্ব প্রকাশ পেয়েছে যার থেকে অনেক মহান ব্যক্তিরা অপারগ হয়ে গিয়েছে।
বারা ইবনে আযেব রা.কে লক্ষ্য করে কোন এক ব্যক্তি তাকে বলল, 'হে আবু আমারা! তোমরা কি হুনাইনের দিনে পালিয়ে গিয়েছিলে?' তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহর শপথ! আল্লাহর রাসুল পালায়ন করেননি।
কিন্তু তার যুবক সাথীরা যারা তাড়াতাড়ি করেছিল, যাদের নিকট অস্ত্র ছিল না বা কম ছিল। তারা এমন লোকদের সাথে সামনে পড়ে গেল যারা তীর নিক্ষেপে পারদর্শী ছিল। হাওয়াযেন ও নছর গোত্রের বিরাট একটি দল সম্মিলিতভাবে তাদের উপর তীর বর্ষণ করল। তাদের নিশানা ব্যর্থ হচ্ছিল না। তারা উন্মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসল। সকলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে চলে আসল। আবু সুফিয়ান বিন হারেস রাসুলের খচ্চর টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। রাসুল নেমে পড়লেন, ও দুআ করলেন, আল্লাহর সাহায্য কামনা করে বলতেছিলেনঃ
أنا النبي لا كذب أنا ابن عبد المطلب، اللهم نزل نصرك
'আমি সত্য নবী, আমি আব্দুল মুত্তালিব এর সন্তান, হে আল্লাহ আপনার সাহায্য অবতীর্ন করুন!'
বারা রা. বলেন যখন প্রচন্ড লড়াই শুরু হল, আমরা রাসুলের কাছাকাছি আশ্রয় গ্রহণ করেছিলাম, আমাদের মধ্যে বীর তিনিই ছিলেন যার কাছাকাছি সবাই যাচ্ছিলেন। অর্থাৎ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
মুসলিমের আর একটি বর্ণনায় সালামাতা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ভীতু অবস্থায় আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি তার শাহবা নামক খচ্চরের উপর ছিলেন। ইবনুল আকওয়াকে কম্পমান অবস্থায় দেখলাম। সবাই যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘিরে ধরল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খচ্চরের উপর থেকে নেমে পড়লেন। অতঃপর যমীন থেকে এক মুষ্টি মাটি হাতে নিলেন এবং শত্রু বাহিনীর মুখের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। তাদের চেহারা কালো হয়ে গেল। তাদের সকলের চোখ একমুষ্টি মাটিতে ভরে গেল। তারা পিছন ফিরে পালাল। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পরাজিত করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মুসলমানদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন।'
আলেমগণ বলেছেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খচ্চরে আরোহণ করা হল যুদ্ধের ময়দানে কঠিন যুদ্ধের সময় বীরত্ব এবং দৃঢ়তার চুড়ান্ত পর্যায়। তাছাড়া লোকরা তো তার নিকটেই ফিরে আসছিল। তার মাধ্যমে তারা প্রশান্তি লাভ করছিল। আর এটা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছিলেন ইচ্ছাকৃত ভাবে। কেননা, তার নিকটে অনেক প্রশিক্ষিত ঘোড়া ছিল। তা রেখে তিনি খচ্চরের পিঠে আরোহণ করেছিলেন।'
আর তার বীরত্বের প্রমাণ এটাও বহন করে যে, তিনি তার খচ্চরকে লাফাতে লাফাতে মুশরিকদের ভীড়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আর শত্রু পক্ষের লোকেরা পালাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সা. মাটিতে নেমে আসেন এমন সময় যখন সকলে তাকে ঘিরে ধরেছিল। বীরত্ব ও ধৈর্যের শেষ পর্যায় তিনি প্রদর্শন করেছেন। কেহ কেহ বলেন, 'রাসুল এমন করেছিলেন যারা মাটিতে ছিলেন তাদের সাথে একত্বতা প্রকাশের জন্য।' সাহাবীগণ হুনাইন যুদ্ধ ক্ষেত্রের সর্বত্র তার বীরত্বের আলোচনা করেছেন।
চতুর্থ উদাহরণঃ নিজ সাথীদেরকে সাহায্য করার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বীরত্ব
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোত্তম ও সবচেয়ে বেশি দানশীল, ও সবার চেয়ে সাহসী মানুষ ছিলেন। এক রাতে মদীনাবাসী একটি ভয়ানক আওয়ায শুনে ভয় পেয়ে গেল। কিছু মানুষ শব্দের দিকে চলে গেল, তারা দেখল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে আসছেন। তিনি সকলের আগে আওয়াযের দিকে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে আসছিলে আর বলছিলেন, 'তোমরা ভয় পেয়ো না, তোমরা ভয় পেয়ো না।' তিনি আবু তালহার ঘোড়ার উপর ছিলেন। তার শরীরে চাদর ছিল না। তার কাঁধের উপর ছিল একটি তরবারী। বর্ণনাকারী বলেন, তাকে আমরা বীরত্বের সমুদ্রের ন্যায় পেয়েছি। তিনি বীরত্বের সমুদ্র ছিলেন।'
এই সমস্ত উদাহরণ ও পূর্বের উদাহরণগুলি একথারই স্পষ্ট প্রমাণ যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের চেয়ে বীরত্বে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। সার্বিক বিবেচনায় এই ধরায় তার মত আর কোন সাহসী ব্যক্তি আসেনি। আর এ কথার সাক্ষ্য দিয়েছেন বড় বড় বীর বীর ও সাহসীগণও।
বারা ইবনে আযেব রা. বলেন, 'যখন প্রচন্ড লড়াই শুরু হল, আমরা রাসুলের কাছাকাছি আশ্রয় গ্রহণ করছিলাম। আমাদের মধ্যে বীর তিনিই ছিলেন যার কাছাকাছি সবাই যাচ্ছিলেন। অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আনাস রা. পূর্বের হাদীসে বলেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোত্তম ও সবচেয়ে বেশি দানশীল, ও সবার চেয়ে বড় বীর মানুষ ছিলেন।'
পঞ্চম উদাহরণঃ চিন্তা ও পরিকল্পনায় তার বীরত্ব
পূর্বের এই উদাহরণগুলি তার অন্তরের বীরত্বের উদাহরণ ছিল। তার চিন্ত াগত বীরত্বের একটি উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। কেননা তার নামে হাজার হাজার বীরত্বগাথা রয়েছে। সে বীরত্ব হল, সুহায়েল বিন আমরের গোয়ার্তুমির সময়। যখন তিনি হুদাইবিয়া সন্ধির চুক্তিনামা লিখছিলেন, সে সময়ে রাসূলের অবস্থান অত্যন্ত সাহসিকতাপূর্ণ ছিল। কেননা চুক্তিপত্রে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' লেখা তিনি স্থগিত করেছিলেন। শুধু 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' লিখেছিলেন। এবং 'মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ' লেখার পরিবর্তে 'মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ' লিখতে রাজি হয়েছিলেন। ও সুহায়েলের এই শর্ত গ্রহণ করেছিলেন যে, কুরাইশদের কেহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট গেলে তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিবেন সে মুসলমান হলেও। সাহাবারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এ সকল অসম শর্তাবলীতে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থায় ধৈর্য ধরে বসেছিলেন। চুক্তিনামা লেখা শেষ হল। কিছুদিন পর স্পষ্ট বিজয় অর্জিত হল।
উল্লেখিত উদাহরণের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মিক ও বুদ্ধিমত্যা জনিত বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। দূরদৃষ্টি, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার কৃতৃত্ব তো তার আছেই। অধিকন্তু দায়ীদের প্রজ্ঞার পরিচয় হচ্ছে অধিকতর লাভবান বস্তু অর্জন করার নিমিত্তে কম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পরিহার করা। যদি তাতে কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা না থাকে।'
যা এতক্ষণ আলোচিত হয়েছে সবই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বীরত্ব ও দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত। এটা তার বীরত্বের তুলনায় সমুদ্রের এক ফোটার পরিমাণমাত্র। অন্যথায় তার বীরত্ব যদি খুজে খুজে লেখা হয়, তাহলে তো বিশাল গ্রন্থ লেখা হয়ে যাবে। প্রত্যেক মুসলমানের বিশেষ করে আল্লাহর দিকে আহবানকারীদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হল, তাদের প্রত্যেক বিষয়ে ও প্রতিটি কাজে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবে। আর এরই মাধ্যমে সফলতা এবং বিজয় আসবে। এবং ইহ জগতে ও পরকালে সৌভাগ্য লাভ করবে।
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا الأحزاب ২১
"তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ্ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাহাদের জন্য রয়েছে রাসুলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ।”

টিকাঃ
১ সহীহ আল - বুখারী ২৭৩১-২৭৩২ আহমাদ ৪র্থ খন্ড ৩২৮-৩৩১ পূঃ হাজাল হাবিব ইয়া মুহিব ৫৩২প
২ সরা আল আহযাব ২১

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 সফর ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় কর্মোকৌশল

📄 সফর ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় কর্মোকৌশল


১। সমাজ সংস্কার ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কর্ম-কৌশল
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় পৌঁছলেন সেখানকার অধিবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রচুর মতপার্থক্য ছিল। তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্যও এক ছিল না। তারা একত্রিত হত নিজ নিজ গন্ডিতে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল পুরাতন উত্তরাধিকার সূত্রে। কিছু কিছু নতুন মতবিরোধও ছিল। মদীনার অধিবাসীরা ছিল মূলত তিনভাগে বিভক্তঃ
১- মুসলমানঃ আউস, খাজরাজ ও মুহাজেরদেরদের সমন্বয়ে।
২- মুশরিকঃ আউস, খাজরাজ ও যারা ইসলামে প্রবেশ করেনি তাদের সমন্বয়ে।
৩- ইহুদী: তারা কয়েকটি গোত্রে বিভক্ত ছিল। এদের মধ্যে বনু কাইনুকা ছিল খাজরাজ গোত্রের মিত্র। বনু নযীর ও বনু কুরাইযাহ এ দু' গোত্র ছিল আওস গোত্রের মিত্র। আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে কঠিন বিরোধ ছিল। মধ্যযুগে তাদের মধ্যে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ তাদের মধ্যে 'বুয়াসের' যুদ্ধ হয়েছিল। তার কিছু ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া তখনও তাদের মধ্যে চলমান ছিল।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মহান কৌশল তার সুন্দর কুটনীতি দ্বারা এই সমস্ত সমস্যা সুন্দর ও স্থায়ীভাবে সমাধান করতে লাগলেন। এই সমস্ত অবস্থার সমাধান ও সংশোধন এবং মুসলমানদের চিন্তা চেতনা একত্রিত করার কার্যক্রম ছিল এ রকমঃ
১- মসজিদ তৈরী এবং সেখানে একত্রিত হওয়াঃ
এই প্রথম কাজটি পরস্পরবিরোধী অন্তরগুলোকে একত্রিত করে দিল। সংশোধন এবং ঐক্য স্থাপনের ব্যাপারে প্রথম কাজ করলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এবং সকল মুসলমান তা নির্মাণের কাজে অংশ গ্রহণ করল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন তাদের ইমাম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এটাই ছিল প্রথম সেবা ও সহযোগিতা মূলক কাজ যা সমস্ত অন্তরকে এক সুতোয় গেঁথে দিল। এবং কর্মের সাধারণ লক্ষ্য স্পষ্ট করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমণের পূর্বে প্রত্যেক গোত্রে লোকদের মিলিত হওয়ার জন্য জন্য আলাদা এক একটি নির্দিষ্ট স্থান ছিল। তারা সেখানে রাত্রে বসে গল্প করত। রাতে জাগ্রত থাকত। কবিতা পাঠ করত। আর এ অবস্থা তাদের অনৈক্যেরই প্রমাণ ছিল ও অনৈক্য বিস্তারে সহায়ক ছিল। যখন মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হল, তখন তা সমস্ত مسلمانوں কেন্দ্র হয়ে গেল ও তাদের সমবেত হওয়ার স্থান হিসেবে গণ্য হল।
সব সময় তারা সেখানে সমবেত হত। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করত। তিনি তাদেরকে শিক্ষা দিতেন, পথ প্রদর্শন করতেন, দিক নির্দেশনা দিতেন।
এর মাধ্যমে সমস্ত আলাদা বৈঠকস্থলগুলো এক হয়ে গেল। সমস্ত মহল্লা এক জায়গায় চলে আসল। গোত্রগুলো কাছাকাছি আসল। উপদলগুলো ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হল। অনৈক্য ঐক্যের দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে গেল। মদীনায় কোন একাধিক দল থাকল না। বরং সকল দল একটি দলে পরিণত হল। অনেক নেতা থাকল না। বরং নেতা এজনই হয়ে গেল। তিনি হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি তার প্রভুর নিকট থেকে আদেশ নিষেধ প্রাপ্ত হন, এবং তার উম্মতকে শিক্ষা দেন। মুসলমানরা এক কাতারের ন্যায় হয়ে গেল। সমস্ত সত্তা ও চিন্তা-চেতনার পথগুলো মিলে গেল একটি মোহনায়। তাদের ঐক্য শক্তিশালী হল। আত্মাগুলো শক্তিশালী বন্ধনে আবদ্ধ হল। শরীরগুলো একে অপরকে সাহায্য করল।'
মসজিদ শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জায়গা ছিল না, বরং সেটি ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়। মুসলমানরা সেখানে ইসলামের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতো। সেখানে একত্রিত হতো, বিভিন্ন গোত্রের লোকজন পরস্পরে মিলিত হতো। যদিও জাহেলী যুগের যুদ্ধ বিগ্রহ, ঝগড়া তাদের মাধ্যে অনেকদিন পর্যন্ত ঘৃণার পরিবেশ তৈরী করে রেখেছিল। মসজিদকে তারা ঘাটি বানিয়ে নিয়েছিল সমস্ত কাজ পরিচালনার জন্য। সেখান থেকেই সব বিষয় প্রচার করা হত। পরামর্শ মূলক ও সিদ্ধান্তমূলক কাজের বৈঠকের স্থান ছিল মসজিদ।
এই জন্যই মদীনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানেই অবস্থান করেছেন, প্রথমে সেখানে মসজিদ তৈরী করছেন। যেখানে মু'মিনগন একত্রিত হবে। যখন কুবায় অবস্থান করেছেন সেখানে মসজিদ বানিয়েছেন। জুমার নামাজ আদায় করেছেন বনী সালেম বিন আউফে, যা কুবা ও মদীনার মধ্যখানে নিচু জাগায় (রানুনা) নামক স্থানে অবস্থিত। মদীনায় পৌঁছে প্রথমে মসজিদ তৈরী করলেন।
২- ইহুদীদেরকে প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা দ্বারা ইসলামের দাওয়াত দিলেন
সংস্কার ও ঐক্যের ঘাটি থেকে-যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় প্রবেশ করার পর বিণির্মান করেছিলেন- ইহুদীদের সাথে আব্দুল্লাহ বিন সাল্লামের মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করলেন এবং তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে লাগলেন।
আনাস রা. বর্ণনা করেন, 'আব্দুল্লাহ বিন সাল্লামের কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আসার সংবাদ পৌঁছল। তিনি রাসুলের নিকট এসে বললেন, 'আমি আপনাকে তিনটি বিষয়ে প্রশ্ন করতে চাই। যার উত্তর নবী ব্যতীত আর কেউ দিতে পারবে না। কেয়ামতের প্রথম নিদর্শন কি? জান্নাতবাসী প্রথমে কি খাবার খাবেন? সন্তান কেন তার পিতা অথবা মাতার মত হয়ে থাকে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এ প্রশ্নগুলি সম্পর্কে এখনই জিবরীল আমাকে সংবাদ দিয়েছেন।' ইবনে সাল্লাম বললেন, 'ফেরেশতাদের মধ্যে ইনিই তো ইহুদীদের শত্রু।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কেয়ামতের প্রথম আলামত হল, আগুন আসবে এবং পূর্ব পশ্চিমের মানুষকে একত্রিত করবে। প্রথম খাদ্য যা জান্নাতবাসীরা গ্রহণ করবে তা হল মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ। আর সন্তান পিতা বা মাতার মত এই কারণে যে, পুরুষ যখন নারীর সাথে মিলিত হয় কখনও পুরুষের বীর্য আগে প্রবেশ করে, তখন সন্তান তার মত আকৃতি ধারণ করে। আর যদি নারীর বীর্য আগে প্রবেশ করে তবে সন্তান তার আকৃতি ধারণ করে।'
আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসুল।' তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! ইহুদীরা মিথ্যারোপকারী জাতি। আপনি তাদেরকে আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করার পূবে যদি তারা আমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে জানতে পারে তা হলে আপনার নিকট আমার সম্পর্কে মিথ্যা বলবে।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ডেকে পাঠালেন, তারা রাসুলের নিকট আসল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, 'হে ইহুদী জাতি! তোমাদের ধংস হোক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। ঐ আল্লাহর শপথ যিনি ব্যতীত আর কোন মাবুদ নেই। তোমরা জান আমি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমি তোমাদের কাছে সত্য নিয়ে এসেছি। তোমরা ইসলামে প্রবেশ কর।' তারা বলল, 'এ সম্পর্কে আমরা কিছু জানিনা।' এ কথা তারা তিনবার বলল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, 'আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম তোমাদের মধ্যে কেমন লোক? তারা বলল, 'সে তো আমাদের নেতা। আমাদের নেতার সন্তান। আমাদের মধ্যে বড় আলেম-বিদ্বান। আমাদের বড় আলেমের সন্তান।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'সে ইসলাম গ্রহণ করলে তোমরা কি করবে?' তারা বলল, 'আল্লাহর আশ্রয়! সে ইসলাম গ্রহণ করতে পারে না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, 'সে ইসলাম গ্রহণ করলে তোমরা কি করবে?' তারা বলল, 'আল্লাহর আশ্রয়! সে ইসলাম গ্রহণ করতে পারে না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, 'সে ইসলাম গ্রহণ করলে তোমরা কি করবে?' তারা বলল, 'আল্লাহর আশ্রয়! সে ইসলাম গ্রহণ করতে পারে না।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে ইবনে সাল্লাম! তাদের সামনে বের হও?' ইবনে সাল্লাম বের হয়ে বললেন, 'হে ইহুদী সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। ঐ আল্লাহর শপথ যিনি ব্যতীত আর কোন মাবুদ নেই, তোমরা জান তিনি আল্লাহর রাসুল, তিনি সত্য নিয়ে এসেছেন। তারা সকলে বলল, 'তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তির ছেলে।' এবং তারা সকলে তার উপর আঘাত করল।
এটাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইহুদীদের নিকট থেকে সর্বপ্রথম অভিজ্ঞতা যা তিনি অর্জন করেছিলেন মদীনায় প্রবেশ করার পর।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্দর কৌশল এর মধ্য থেকে একটি হল, তিনি আব্দুল্লাহ বিন সাল্লামের ইসলামের বিষয়টি গোপন করার বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। সাথে সাথে তাদের মধ্যে তার মর্যাদার বিষয়ে প্রশ্ন করে জেনে নিলেন। যখন তারা তার প্রশংসা করল, ও তার মর্যাদা উচ্চ করে তুলে ধরল। তখনই রাসুল তাকে বের হতে নির্দেশ দিলেন। তিনি বের হলেন, ও ইসলাম প্রকাশ করলেন, এবং ইহুদীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সত্যতার ব্যাপারে যা গোপন করত তা প্রকাশ করে দিলেন। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ঐ অঙ্গীকারে আবদ্ধ করলেন যা পরবর্তীতে আলোচনায় আসবে।
৩- মুহাজের ও আনছারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সৃষ্টি করাঃ
যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মসজিদ নির্মাণ ও ইহুদীদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার মাধ্যমে শুরু করলেন তার কর্মতৎপরতা। অনুরূপভাবে মুহাজের ও আনছারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করলেন। আর এটাই হল নবুওয়তী উৎকর্ষতা, সৎপথ প্রদর্শন, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও মুহাম্মাদী প্রজ্ঞা।
তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব তৈরী করলেন আনাস বিন মালেক রা. এর ঘরে। তারা নব্বই জন ছিলেন। অর্ধেক মুহাজের, অর্ধেক আনছার। তাদের মধ্যে সহমর্মিতার বন্ধন সৃষ্টি করলেন, মৃত্যুর পর নিকট আত্মীয় না হওয়া সত্বেও পরস্পরে একে অন্যের উত্তরাধিকারী হবেন। এ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের এ নিয়ম চলতে থাকে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত। যখন আয়াত অবতীর্ণ হলঃ
وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ (الأنفال ٧٥)
"এবং আল্লাহর বিধানে আত্মীয়গণ একে অন্যের অপেক্ষা অধিক হকদার।”
তখন থেকে শুধু আত্মীয়তার ভিত্তিতে উত্তরাধিকার ফিরে আসল। ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের কারণে উত্তরাধিকার রহিত হয়ে গেল।
জাহেলী যুগের স্বজনপ্রীতি ধুয়ে মুছে গেল। শুধু ইসলামের বিধান অবশিষ্ট রইল। বংশ, বর্ণ এবং ও জাতিভেদের পার্থক্য দূর হয়ে গেল। কেহ সামনে বা পিছনে যেতে পারবে না মানুষত্ব ও তাকওয়া ব্যতীত। ভ্রাতৃত্ব, কুরবানী ও সহমর্মিতার অনুভূতিই সেখানে ছিল মুখ্য। এই ভ্রাতৃত্বের মধ্যে পরস্পরের ভালোবাসা ছিল। নতুন এই সমাজ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণে পরিপূর্ণ ছিল। আর এই ভ্রাতৃত্বের মধ্যে ইসলামের মানবিক এবং চারিত্রিক ইনসাফের শক্তিশালী রূপ ফুটে উঠেছে।
আর এই ভ্রতৃত্ব এমন অঙ্গীকার ছিল না যা শুধু কাগজে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। এমন কথাও ছিল না যা শুধু মুখে বলা হয়েছে। বরং এমনই এক ভ্রতৃত্ব ছিল যা অন্তরের পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছিল। তার প্রয়োগ হয়েছে রক্ত ও সম্পদের মাধ্যমে। শুধু মুখের কথা নয়। কথা ও কাজ, জান ও মাল, সুখ ও দুঃখের ভ্রাতৃত্ব ছিল এটি।
এই বিষয়ের উত্তম উদাহরণ ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. ও সাআদ বিন রবিইর রা. মধ্যে ভাইয়ের সম্পর্ক গড়ে দিলেন। সাআদ বললেন, 'আনছাররা জানে যে, আমি তাদের মধ্যে বেশি ধনী। আমি আমার সম্পদ দুই ভাগে ভাগ করব। অর্ধেক থাকবে আমার, আর অর্ধেক তোমার। আমার দুইজন স্ত্রী আছে। তোমার কাছে যাকে বেশি পছন্দ হয় তাকে নিয়ে নাও। আমি তাকে তালাক দিব। যখন তার তালাকের ইদ্দত পূর্ণ হয়ে যাবে, তুমি তাকে বিবাহ করবে। আব্দুর রহমান বিন আওফ রা. বললেন, 'আল্লাহ তোমার সম্পদে ও সন্তান সন্ততিতে বরকত দান করুন। তোমাদের বাজার কোথায়?' তারা তাকে বনু কায়নুকার বাজার দেখিয়ে দিল। তিনি বাজার থেকে ফিরলেন। তার হাতে পনির ও মাখনের কিছু অংশ ছিল। পরের দিনও তাই করলেন। এভাবে কাজ করতে থাকলেন। অতঃপর একদিন তার শরীরে মেহেদীর রং দেখা গেল। তা দেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেন, 'তোমার কি অবস্থা?' তিনি বললেন, 'আমি আনছারদের এক মহিলাকে বিবাহ করেছি।' রাসুল বললেন, 'মহরানা কি দিয়েছো?' তিনি বললেন, 'খেজুরের দানার ওজন পরিমান স্বর্ণ বা খেজুরের দানা পরিমান স্বর্ণ।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'অলীমা (ভৌভাতের) আয়োজন কর, একটি ছাগল দিয়ে হলেও।'
এ ভ্রাতৃত্ব ছিল একটি কল্যাণকর কৌশল এবং সঠিক কুটনীতি। এবং অনেকগুলো সমস্যা মুসলমানরা যার সম্মুখীন হচ্ছিল তার সুন্দর সমাধান ছিল এ ভ্রাতৃত্ববন্ধন।
৪- বিচক্ষণ শিক্ষা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা, আত্মশুদ্ধির বিষয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ করেছিলেন। সুন্দর চরিত্রের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করছিলেন। তাদেরকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিচ্ছিলেন ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ, ইজ্জত, সম্মান, ইবাদত, ও আনুগত্যের বিষয়ে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, 'হে মানবমন্ডলী! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, লোকদেরকে খাবার দাও, এবং রাত্রিতে নামাজ পড় যখন মানুষেরা ঘুমে থাকে, তাহলে জান্নাতে নিরাপদে প্রবেশ করতে পারবে।'
তিনি আরো বলেন, 'যার প্রতিবেশী তার কষ্ট থেকে নিরাপদে থাকবে না সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।'
'প্রকৃত মুসলমান সেই যার জিহবা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে।'
তিনি আরো বলেন, 'তোমাদের কেহ ততক্ষণ পর্যন্ত মু'মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার নিজের জন্য যা পছন্দ করবে তা তার ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করবে।'
তিনি বলেন, 'একজন মু'মিন আর একজন মু'মিনের জন্য প্রসাদের ন্যায় যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।' এ কথা বলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতের আঙ্গুলীসমূহ একটি অপরটির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখিয়ে দিলেন।
তিনি বলেন, 'তোমরা পরস্পরে হিংসা করো না, গুপ্তচরবৃত্তি করো না, পরস্পরে শত্রুতায় লিপ্ত হয়ো না, একে অন্যের পিছনে লেগে থাকবে না, একে অপরের বেচাকেনার উপর বেচাকেনা করো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে সকলে ভাই ভাই হয়ে যাও। মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তাকে অত্যাচার করবে না। সে তাকে শত্রুর হাতে অর্পণ করবে না। সে তাকে তুচ্ছ করবে না। তাকওয়া এখানেই,'- এ কথা বলে বুকের দিকে তিনবার ইশারা করলেন- কোন লোকের নিকৃষ্ট হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলমান ভাইকে অপমান করবে। প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত অন্য মুসলমানের জন্য নিষিদ্ধ হল। এমনিভাবে নিষিদ্ধ হল তার সম্পদ।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'কোন মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাইয়ের সাথে তিন রাতের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকবে। এটাও বৈধ নয়, যখন সাক্ষাত ঘটবে সে মুখ ফিরিয়ে নেবে বা অন্যজন মুখ ফিরিয়ে নেবে। তাদের দু'জনের মধ্যে সেই উত্তম যে প্রথম সালাম দেবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সোমবার বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজাগুলো খোলা হয়, যারা আল্লাহর সাথে শরীক করে না তাদের সকলকে আল্লাহ মাফ করে দেন। কিন্তু তাকে আল্লাহ মাফ করেন না, যার ভাইয়ের সাথে তার বিবাদ আছে। বলা হয়, এই দু'জনকে অবকাশ দাও, যেন সংশোধিত হয়ে যায়। এই দু'জনকে অবকাশ দাও, যেন সংশোধিত হয়ে যায়। এই দু'জনকে অবকাশ দাও, যেন সংশোধিত হয়ে যায়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমল সমূহকে পেশ করা হয় প্রত্যেক বৃহস্পতি ও সোমবার। সেদিন আল্লাহ ঐ সকল ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন যারা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করে না। কিন্তু কোন ব্যক্তির যদি তার ভাইয়ের সাথে হিংসা থাকে, তখন বলা হবে এ দুজনকে সংশোধিত হওয়া পর্যন্ত দূরে রাখ। এ দুজনকে সংশোধিত হওয়া পর্যন্ত দূরে রাখ।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমার ভাইকে সাহায্য কর। হোক সে অত্যাচারী বা অত্যাচারিত।' অনেকে প্রশ্ন করল, 'হে আল্লাহর রাসুল! একে অত্যাচারিত অবস্থায় সাহায্য করব এটা আমরা বুঝলাম। কিন্তু অত্যাচারী অবস্থায় কিভাবে সাহায্য করব?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাকে অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে রাখবে, এটাই তার সাহায্য।'
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'মুসলমানের উপর মুসলমানের ছয়টি অধিকার রয়েছে।' প্রশ্ন করা হল, 'হে আল্লাহর রাসুল সেগুলো কি?' তিনি বললেন, 'সাক্ষাতে তাকে সালাম দেবে, দাওয়াত দিলে গ্রহণ করবে, উপদেশ চাইলে উপদেশ দেবে, হাঁচি দেয়ার পর আলহামদু লিল্লাহ বললে তুমি তার উত্তর দেবে, অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাবে।'
বারা ইবনে আযেব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাতটি বিষয় গ্রহণ এবং সাতটি বিষয় বর্জনের আদেশ করেছেন। আদেশ করেছেনঃ রোগীর সেবা, জানাযায় অংশ গ্রহণ, হাঁচি দাতা আলহামদুলিল্লাহ বললে তার উত্তর প্রদান, নিমন্ত্রণকারীর নিমন্ত্রণ গ্রহণ, সালামের প্রসার, অত্যাচারিতের সাহায্য ও শপথকারীকে দায়মুক্ত করার। এবং নিষেধ করেছেন, স্বর্ণের আংটি ব্যবহার, স্বর্ণের পাত্রে আহার, উটের হাওদায় রেশম বা সিল্ক ব্যবহার, কাপড়ে সিল্কের কারুকাজ, সিল্কের পোষাক পরিধান, দীবাজ, এবং ইস্তিবরাক থেকে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, 'তোমারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমানদার হবে। আর ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি? তোমাদের এমন বস্তুর দিকে পথ নির্দেশ করব না যা করলে তোমাদের পরস্পররের ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? তাহল, তোমাদের মাঝে সালামের প্রসার কর।'
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ইসলামে কোন কাজটি উত্তম? বললেন, 'খাদ্য দান এবং পরিচিত ও অপরিচিত সবাইকে সালাম দেয়া।'
তিনি আরো বলছেন, 'মু'মিনগণের পরস্পরের বন্ধুত্ব, সহানুভূতি, সহমর্মিতার উদাহরণ হল একটি দেহের মত। যদি এর কোন একটি অঙ্গ অসুস্থ হয়ে যায় তা হলে তা পুরো শরীরে নিদ্রাহীনতা ও জ্বরের ন্যায় অনুভূত হয়।'
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে রহম বা অনুগ্রহ করে না সে অনুগ্রহ পায় না।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামআরো বলেন, 'যে মানুষের প্রতি দয়া করেনা আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, 'মুসলমানকে গালি দেওয়া হল পাপ কাজ, তাকে হত্যা করা কুফরী।'
আনসারদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এ সকল বাণী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি পৌঁছে থাক বা এর কিছু হিজরতের পূর্বে যে সব মুহাজির নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শ্রবণ করেছেন তাদের কাছ থেকে শ্রবণ করুক। এ সবই তার পক্ষ হতে সকল সাহাবীদের জন্য শিক্ষা। এবং কেয়ামত অবধি যার কাছেই এ উদ্ধৃতি পৌঁছবে তাও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বলে বিবেচিত হবে।
অনুরূপ তার আরো অনেক বাণী যা দ্বারা তিনি সাহাবীদের শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন তিনি তাদের দান করার প্রতি উৎসাহ দিতেন, দানের ফযিলত বর্ণনা করতেন যা তাদের হৃদয় মনকে আকৃষ্ট করতো। ভিক্ষাবৃত্তি নিষেধ করতেন, ধৈর্যের গুণ ও অল্পে তুষ্ট থাকার জন্য বলতেন। তাদের ইবাদতের প্রতি আগ্রহী করে তুলতেন; যাতে রয়েছে অনেক ফযিলত, সওয়াব, পুরস্কার এবং তাদেরকে অহীর সাথে নিবিড় সম্পর্ক করে দিতেন। তিনি তাদের পাঠ করে শুনাতেন। তারা ও তাকে পাঠ করে শুনাতো। এ সকলই ছিল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অবর্তমানে এগুলো হল দাঈ ও আলেম-উলামাদের দায়িত্ব। এমনিভাবে তিনি তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়কে উন্নত করেছেন। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন সুউচ্চ মূল্যবোধ। এতে করে তারা উপনীত হয়েছিলেন মানবীয় গুণাবলির সর্বোচ্চ শিখরে।
ফলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষে সম্ভব হয়ে ছিল উন্নত ও আল্লাহ-ভীরু একটি ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ যা ইতিহাসে সুপরিচিতি লাভ করেছিল। এবং যে সমাজ পতিত ছিল বর্বরতা, মূর্খতা ও কুসংস্কারের গহীন অন্ধকারে সে সমাজ পেয়েছিল তার থেকে একটি সমাধান। অতঃপর তা পরিণত হয়েছিল এমন এক সমাজে যা মানবীয় সকল গুণাবলির দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছিল। আর এটা সম্ভব হয়েছিল একমাত্র আল্লাহর রহমতে তারপরে এ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুগ্রহে। তাই আল্লাহর দিকে আহবানকারীদের কর্তব্য হল তারা তার পথ অনুসরণ করবে, এবং তার দেখানো পথেই তারা হেদায়েত অনুসন্ধান করবে।'
৫- মুহাজির ও আনসারদের প্রতিজ্ঞা এবং ইহুদীদের সন্ধি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর একটি চুক্তি সম্পাদন করেন যার মাধ্যমে জাহেলী শেওলা এবং গোত্রীয় ঝগড়া- বিবাদ বন্ধ হয়। জাহেলী তাকলীদ বা অন্ধানুকরণ করার আর কোন অবকাশ রইল না। এবং পরস্পরের এ চুক্তির মধ্যে, মুহাজির ও আনসারদের জন্য মদীনায় অবস্থানরত ইহুদীদের প্রতি সংহতি প্রদর্শনের অঙ্গীকারও ছিল। এ চুক্তি ও অঙ্গীকার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষে সমাজ সংস্কার এবং সমাজ বিনির্মাণে এক উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা। যা বিশ্বের ইতিহাসে 'মদীনা সনদ' নামে পরিচিত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির ও আনসারদের মাঝে একটি চুক্তি করলেন। তাতে ইহুদীদের সাথেও শত্রুতা ছেড়ে সন্ধি করা হয়েছিল। ইহুদীদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। তাদের সম্পদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল এবং উভয় পক্ষের কল্যাণে কতিপয় শর্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।'
এ অঙ্গীকার ছিল বিচক্ষণ ও শ্রেষ্ঠ রাজনীতির পরিচায়ক এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে পূর্ণ এক বিজ্ঞানময় সিদ্ধান্ত। যা মদীনার সকল মুসলিম ও ইহুদীদের একত্র করেছিল। তারা একটি জোটে পরিণত হয়েছিল। মদীনার উপর আক্রমনকারী যে কোন শত্রুর মোকাবেলায় দাঁড়াতে তারা সক্ষম ছিল।
এ পাঁচটি পরিকল্পনা: মসজিদ নির্মাণ, ইসলামের দিকে ইহুদীদেরকে আহবান, মুমিনদের পরস্পর ভ্রাতৃত্ব, তাদের প্রশিক্ষণ ও চুক্তি সম্পাদন।
এ পরিকল্পনার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর অনুগ্রহে সমাধান করেছিলেন মদীনায় বসবাসরত জনগোষ্ঠীর একটি তিক্ত বিরোধের। এবং প্রাচীন সকল প্রভাব, বিবাদ অপসারণ করেছেন। মুসলমানের হৃদয়ে মিলন সৃষ্টি করেছেন এবং এ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে মদীনায় নিখুত একটি শাসন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। অতঃপর এ শাসনব্যবস্থা এবং আল্লাহর দিকে আহবান মদীনা হতে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল।'
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
রাসূলুল্লাহর ভাষা অলংকার
জুবায়ের বিন মুতয়িম রা. যা বলেছেন তাতে কুরআনুল কারীম মানব মনকে প্রভাবান্বিত করে বলে প্রমাণ মিলে। তিনি বলেছেন, 'আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাগরিবের সালাতে সূরা আত-তুর পাঠ করতে শুনেছি, যখন তিনি এ আয়াতে পৌঁছলেন
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الخَالِقُونَ ﴿٣٥﴾ أَمْ خَلَقُوا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بَل لَا يُوقِنُونَ ﴿٣٦﴾ أَمْ عِنْدَهُمْ خَزَائِنُ رَبِّكَ أَمْ هُمُ المُسَيْطِرُونَ ۳۷ سورة الطور
(তারা কি কোন কিছু ব্যতীত সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? নাকি তারা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? বরং তারা তো বিশ্বাস করে না। তোমার প্রতিপালকের ভান্ডার কি তাদের নিকট রয়েছে, না তারা এ সমুদয়ের নিয়ন্ত্রক?)'
তখন আমার মনটা উড়াল দেয়ার উপক্রম হয়েছিল। এটা আমার হৃদয়ে ঈমানের প্রথম প্রবেশ।'
কুরআন যেমন মানুষের মনকে প্রভাবান্বিত করে তেমনি ভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসও মানব মনে প্রভাব ফেলে। কারণ এটা হচ্ছে দ্বিতীয় অহী। এটা মানব মনকে প্রভাবান্বিত করবেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী এবং তার ভাষা-অলঙ্কার মানব মনকে যে কিভাবে প্রভাবিত করে এর কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হল:
প্রথম দৃষ্টান্ত: দিমাদ রা. এর ঘটনা
দিমাদ রা. যখন মক্কায় আগমন করলো - সে জিন তাড়ানোর ঝাড় ফুঁক করতো। সে শুনতে পেল মক্কাবাসী বলছে মুহাম্মাদ পাগল। তিনি বললেন যদি আমি এ ব্যক্তিকে পেতাম হয়তবা আল্লাহ তাকে আমার হাতে সুস্থতা দান করতেন। অতঃপর বলল 'হে মুহাম্মদ আমি এ ধরণের বাতাসের চিকিৎসা করে থাকি। আর আল্লাহ আমার হাতে যাকে ইচ্ছা সুস্থতা দান করেন, তোমার প্রয়োজন আছে কি আমার চিকিৎসা নেয়ার?' নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
إن الحمد لله، نحمده ونستعينه، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادي له، وأشهد أن لا أله إلا الله وحده لا شريك له، وأن محمداً عبده ورسوله. أما بعد
'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তার প্রশংসা করছি। তার নিকট আমরা সাহায্য কামনা করছি। যাকে আল্লাহ হেদায়েত দেন তাকে পথভ্রষ্টকারী কেউ নেই। এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে হেদায়েত দানকারী কেউ নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল।' অতঃপর দিমাদ বললো, 'আপনার এ বাক্যগুলো আবার বলুন', রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার বললেন। অতঃপর দিমাদ রা. বললো, আমি গনকের কথা শুনেছি। যাদুকরের কথা শুনেছি। শনেছি কবিদের কথাও কিন্তু এ ধরণের বাক্য কখনো শুনেনি। এ বাক্যগুলো অতল সমুদ্রে গিয়ে পৌঁছেছে।' এরপর বললো, 'আপনার হাত প্রসারিত করুন। আপনার হাতে ইসলামের শপথ নেব।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার গোত্রের পক্ষে শপথ নেবে না?' সে বলল, 'আমার গোত্রের পক্ষেও।'
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: তোফায়েল বিন আমর রা. এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাষা-অলঙ্কার বিষয়ে একটি ঘটনা
তোফায়েল বিন আমর রা. এর থেকে জানা যায়। সে ছিল কবি ও গোত্র প্রধান। মক্কায় আগমন করলে কুরাইশের লোকেরা তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ বিষয় ভীতি প্রদর্শন করলো। তাকে বলল, মুহাম্মাদের কথাগুলো যাদুর মত। তার থেকে সাবধান থেকো। যেন সে তোমার এবং গোত্রের মধ্যে তার কথা প্রবেশ করাতে না পারে। যেমন আমাদের মাঝে করেছে। সে স্বামী স্ত্রীর মাঝে, পিতা পুত্রের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করে থাকে। এভাবে তারা তাকে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকলো। তাদের এ প্রচারে প্রভাবিত হয়ে সে শপথ করল, কানে তুলা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করবে। প্রবেশ করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্পর্কে কথাগুলো তাকে ভাবিয়ে তুললো। মনে মনে বললো, আমি একজন সাহসী ও স্থির মানুষ। আমার কাছে তো বিষয়টি অস্পষ্ট থাকবে না। ভাল হোক বা মন্দ হোক। অবশ্যই আমি তার কাছ থেকে শুনবো। যদি বিষয় সঠিক হয় গ্রহণ করব। ভাল না লাগলে প্রত্যাখ্যান করব। এরপর কান থেকে তুলা ফেলে দিল। এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী শুনলো। বলল, 'এর চেয়ে সুন্দর কথা জীবনে আর শুনতে পাইনি।' সে রাসূলের সাথে তার বাড়ি গেল এবং তাকে সব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে অবগত করালো। এবং বললো, 'আপনার ধর্ম আমার কাছে পেশ করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেশ করলেন। সে ইসলাম গ্রহণ করল।
তাই যারা আল্লাহর পথে আহবান করে তাদের কর্তব্য হল মানুষকে ইসলামের দিকে আহবানে কুরআন এবং হাদীসের প্রতি লক্ষ্য রাখা।
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
মুজিযা-অলৌকিকতা
জ্ঞান ও যুক্তির দাবী হল, ইহুদী খৃষ্টান এবং অন্যান্য কাফেরদের ইসলামে দাওয়াত কালে নিজ নবুওয়াতের দলীল এবং অকাট্য প্রমাণাদি তাদের কাছে বর্ণনা করা। যাতে তার রিসালত যে সকল মানুষের জন্য, এ বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যায়।
এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে তার নবুওয়াত এবং রিসালাতের সামগ্রিকতার দলীল- প্রমাণ ও নিদর্শন অনেক। যা গনণা করে শেষ করা যাবে না।
তবে সকল প্রকার প্রমাণাদি ও নিদর্শন দুটি প্রকারে সীমাবদ্ধ করা যায়:
(ক) সে সব মুজিযা বা অলৌকিকত্ব অতীতে ঘটেছে এবং বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে জানা গেছে যেমন, মুসা ও ঈসা আ. এর মুজিযা।
(খ) সে সকল মুজিযা কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যেমন আল- কুরআন, ইলম, ঈমান। এগুলো তার নবুওয়তের নিদর্শন। এমনিভাবে তার আনীত শরীয়ত, নিদর্শনাবলী, যা আল্লাহ কোন কোন সময় তার উম্মতের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। দলীল প্রমাণের মাধ্যমে তার ধর্মের আত্মপ্রকাশ করা। এবং তার পূর্বেকার কিতাবে তার গুণাবলি উল্লেখ থাকা ইত্যাদি।' এ সকল মুজিযা অনেক ব্যাপক-বিস্তৃত যা গণনা করা সম্ভব নয়। তবে তার নবুওয়াত প্রমাণ করা ও তার রিসালাতের সামগ্রিকতার কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করব।
প্রথম বিষয়: আল-কুরআনের মুজিযাসমূহ
দ্বিতীয় বিষয়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রকাশিত দৃশ্যমান মুজিযাসমূহ
প্রথম বিষয়: কুরআনের মুজিযা যা দিয়ে চ্যালেঞ্জের সময় বিরোধী পক্ষ পরাজিত হয়।
এ হল এক অলৌকিক বস্তু যা মানুষ ব্যক্তিগত এবং দলীয় উভয়ভাবে কুরআনের সাদৃশ্য গ্রন্থ বা সূরা রচনায় অক্ষম হয়েছে। এ মুজিযা আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির হাতেই দিয়ে থাকেন যাকে আল্লাহ নবুওয়ত ও রিসালাতের জন্য নির্বাচন করেন। তার সত্যতা এবং তার রিসালাতের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অবর্তীর্ণ কুরআন- আল্লাহর কালাম বা বাণী। এটা অনেক বড় মুজিযা। যা সকল কালে, সকল যুগে অব্যাহত থাকবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য মুজিযা হয়ে থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সকল নবী কে সেই পরিমাণ নিদর্শন দেয়া হয়েছে যা তার উপর ঈমান আনায়নকারীর জন্য পর্যাপ্ত হয়। আমি প্রাপ্ত হয়েছি অহী যা আল্লাহ আমার কাছে প্রেরণ করেছেন। আমি আশাবাদী, অনুসারীর দিক দিয়ে কেয়ামতে আমি তাদের সকলে চেয়ে শ্রেষ্ঠ হব।
এ কথা দ্বারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুজিযা শুধু কুরআনে সীমাবদ্ধ করা উদ্দেশ্য নয়। এটাও বলা উদ্দেশ্য নয় যে, তিনি কোন দৃশ্যমান মুজিযা নিয়ে আসেননি। বরং উদ্দেশ্য হল কুরআন হচ্ছে বড় মুজিযা যা বিশেষভাবে আল্লাহ তাআলা এ রাসূলের জন্যই নির্ধারণ করেছেন। কারণ প্রত্যেক নবীকে নির্দিষ্ট মুজিযা প্রদান করা হয়েছে যা দিয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ করেন তার জাতিকে। প্রত্যেক নবীর মুজিযা তার জাতির অবস্থার সাথে সঙ্গতি পূর্ণ হয়ে থাকে। তাইতো দেখা যায় ফেরাআউনের সময়ে যাদুর ব্যাপক প্রচলন থাকায় মুসা আলাইহিস সালাম তার নিকট লাঠি নিয়ে আগমন করেন। লাঠি দিয়ে এমন কাজই করলেন যা যাদুকররা করত। এর মাধ্যমে তিনি যাদুকরদের পরাজিত করলেন। কিন্তু মুজিযার এ পদ্ধতি অন্য নবীদের বেলায় ব্যবহৃত হয়নি।
ঈসা আ. এর যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির যুগ ছিল। তখন ঈসা আ. আগমন করলেন এমন মুজিযা নিয়ে আসলেন, যা সকল ডাক্তার ও চিকিৎসককে অক্ষম বানিয়ে দিল। যেমন মৃতকে জীবিত করা, শ্বেতী রোগ ভাল করা, কুষ্ঠ রোগ নিরাময় করা। তখনকার চিকিৎসা-বিজ্ঞান ও চিকিৎসকরা ঈসা আ. এর কাছে পরাজিত হল।

টিকাঃ
১ সহীহ আল - বুখারী ৩৩২৯ শব্দ সহীহ আল - বুখারীর তিন অধ্যায় থেকে আল-বিদায়া ওয়ান- নিহায়া ৩য় খন্ড ২১০ পূঃ
২ 'হাজাল হাবিব ইয়া মুহিব ১৭৮ পৃঃ
৩ সুরা আল-আনফাল ৭৫ * যাদুল মাআদ ৩য় খন্ড ৬৩পৃঃ, আর-রহীকুল মাখতুম ১৮০ পৃঃ * তারিখে ইসলামী মাহমুদ সাকের ২য় খন্ড ১৬৫, ফিকহুস সীরাহ ১৯২ পৃঃ
৪ আল জাওয়াবুস সাহীহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ। ১/১৪৪,১৬৬। ৫ সূরা আল-আরাফ১৫৮। * সূরা আল-ফুরকান ০১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00