📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী 📄 সহনশীলতা ও ক্ষমা

📄 সহনশীলতা ও ক্ষমা


আল্লাহর পথে আহবান করতে গিয়ে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। নিম্নে কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হলোঃ
এক: যে ব্যক্তি বলেছিল, এ বণ্টনে ইনসাফ করা হয়নি, তার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ:
ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, হুনাইনের যুদ্ধের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু লোককে বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিলেন। আকরা ইবনে হাবেস রা.কে একশত উট, উয়াইনাকেও তদ্রুপ দিলেন। আরবের কিছু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গকেও সেদিন বেশি দেয়া হয়েছিল। তখন এক ব্যক্তি এই বলে মন্তব্য করল যে, 'এ বণ্টনে ইনসাফ করা হয়নি। এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য ছিল না।' আমি মনে মনে বললাম, 'আল্লাহর কসম আমি এ সংবাদটি অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানিয়ে দেব।' আমি সংবাদ দিলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আল্লাহ ও তার রাসূল ইনসাফ না করলে আর কে আছে ইনসাফ করবে? মূসার উপর আল্লাহ দয়া করুন, তাকে এর চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন।' এটি দাওয়াতী ময়দানে ধৈর্য ধারণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিকমত এই ছিল যে, গণীমতের মালসমূহ দুর্বল ঈমানদারদের মাঝে বণ্টন করা, আর মজবুত ঈমানদারদেরকে তাদের ঈমানের উপর সোপর্দ করা।
দুই: যে বলেছিল আমরাই এর বেশি উপযুক্ত, তার ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ:
আবু সায়ীদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, আলী ইবনে আবু তালেব রা. ইয়েমেন থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে চামড়ার থলে ভর্তি কিছু স্বর্ণ পাঠালেন। সেগুলো তিনি চার জনের মাঝে বণ্টন করলেন; উআইনা ইবনে বদর, আকরা ইবনে হাবেস, যায়েদ আল-খাইল,' চতুর্থ জন আলকামা অথবা আমের ইবনে তুফায়েল। এক সাহাবী মন্তব্য করলো, 'আমরা তাদের তুলনায় অধিক হকদার।' কথাটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কানে পৌঁছলে, তিনি বললেন, 'তোমরা কি আমাকে বিশ্বস্ত মনে কর না? আমি আসমান- যমীনের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি। আমার নিকট সকাল-সন্ধ্যায় আসমানের সংবাদ আসে।' তখন এক ব্যক্তি দাঁড়াল, যার চোখ দুটো গর্তে ঢুকানো, গাল দুটো উঁচু, কপালটি বহির্গত, ঘন দাড়িযুক্ত, মাথা মুণ্ডানো, লুঙ্গি উপরে তোলা। সে বলল, 'হে রাসূল! আল্লাহকে ভয় করুন! রাসূল বললেন, 'এই হতভাগা, আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে আমি কি যমীনবাসীর মধ্যে অধিক অগ্রগামী নই।' বর্ণনাকারী বলেন, 'অতঃপর সে ব্যক্তি চলে গেলো, খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তার গর্দান উড়িয়ে দেব না?' তিনি বললেন, 'না, সম্ভবত লোকটি নামাজ পড়ে।' খালেদ রা. বললেন, 'এমন অনেক নামাজী আছে, যারা মনে যা নেই তা মুখে বলে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'মানুষের অন্তর ও পেট ছিঁড়ে দেখার জন্যে আমি আদিষ্ট হইনি।' অতঃপর তিনি লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এই ব্যক্তির বংশ থেকে এমন এক জাতির আবির্ভাব ঘটবে, যারা আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করবে, কিন্তু কুরআন তাদের অন্তরে প্রবেশ করবে না। তারা দীন থেকে বের হয়ে যাবে, তীর যেভাবে ধনুক থেকে বের হয়ে আসে। আমি যদি তাদেরকে পাই, তাহলে আদ জাতির মত তাদের হত্যা করে ফেলব।'
এটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহনশীলতার একটি উত্তম দৃষ্টান্ত। তিনি বাহ্যিক অবস্থা দৃষ্টে বিচার করেছেন, অন্তরে কি আছে তা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেননি। লোকটি হত্যাযোগ্য অপরাধ করেছে, কিন্তু তবুও তাকে হত্যা করেননি। যাতে করে মানুষ এ সমালোচনা করার সুযোগ না পায় যে, মুহাম্মাদ তার সাথিদেরকে হত্যা করে, বিশেষ করে লোকটি যখন নামাযী।
তিন: আমের ইবনে তোফাইল রা. এর সাথে আচরণ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমের ইবনে তোফাইল দাউসী রা. এর সাথে সহনশীলতার যে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন, তা অবিস্মরণীয়। তিনি হিজরতের পূর্বে মক্কা নগরীতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। অতঃপর তিনি আপন জাতির নিকট গিয়ে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। তিনি সর্বপ্রথম তার পরিবারের মধ্যে দাওয়াত শুরু করলেন, ফলে তার বাবা ও স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করলো। অতঃপর তার বংশ ও গোত্রের অন্যান্য লোকজনকে দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন। কিন্তু কেউই ঈমান গ্রহণ করেনি। তোফাইল রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললো, 'হে আল্লাহর রাসূল! দাউস গোত্র ধ্বংস হয়েছে, তারা কুফরী করেছে।'
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তোফাইল ইবনে আমর দাওসী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বললেন, 'দাউস গোত্র অস্বীকার করেছে, সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দুআ করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিবলামুখী হয়ে দু'হাত তুলে দুআ করলেন। লোকজন বলল, 'তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে আল্লাহ! তুমি দাউস গোত্রকে হেদায়েত দান কর এবং তাদেরকে আমার কাছে হাজির করে দাও।'
এ কাজটি দাওয়াতী মিশনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ধৈর্য ও সহনশীলতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত। তিনি দাওয়াত অস্বীকারকারীকে শাস্তি প্রদান কিংবা তাদের বিরুদ্ধে বদ-দুআ করার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করেননি। বরং তাদের হেদায়েতের জন্যে দুআ করেছেন। আল্লাহ তার দুআ কবুল করেছেন এবং তিনি স্বীয় ধৈর্য, সহনশীলতা ও তাড়াহুড়া না করার পূর্ণ প্রতিফল পেয়েছেন। ফলে তোফাইল রা. তার গোত্রের লোকজনের নিকট ফিরে গেলেন। নরম ভাষায় তাদেরকে দাওয়াত দেয়ার ফলে বহু লোক তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করলো। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বর থাকা অবস্থায় তোফাইল তার নিকট আসলেন। পরবর্তীতে দাউস গোত্রের আশি থেকে নব্বইটি পরিবার নিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য মুসলমানদের সাথে তাদের জন্যেও বরাদ্দ করলেন।” আল্লাহু আকবার।
অতএব, দায়ী ভাইদের ধৈর্য ও সহনশীলতার দিকটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা দরকার। আর তা একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ, অতঃপর নবী-আদর্শের পূর্ণ অনুশীলন ব্যতীত সম্ভব নয়।
চার: যে তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল তার সাথে
সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিমে জাবের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা নজদ অভিমুখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে অভিযানে বের হলাম। আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রচুর কাটাযুক্ত বৃক্ষ সম্বলিত উপত্যকায় অবস্থান করলাম। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাছের নীচে অবতরণ করলেন। তিনি তার তলোয়ারটি গাছের কোন এক ডালে ঝুলিয়ে রাখলেন। আমাদের কাফেলার লোকজন উপত্যকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন গাছের নীচে বিশ্রাম গ্রহণ করতে শুরু করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। এক ব্যক্তি এসে আমার তলোয়ার হাতে নিয়ে নেয়। সাথে সাথে আমি জাগ্রত হলাম, উঠে দেখি, সে আমার মাথার উপর কোষমুক্ত তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতঃপর সে বলল, 'কে তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাবে?' আমি বললাম, 'আল্লাহ।' অতঃপর দ্বিতীয়বার সে বলল, 'কে তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাবে?' আমি বললাম, 'আল্লাহ।' একথা শুনে সে তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে ফেললো, এবং বসে পড়লো। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছু বললেন না।
আল্লাহু আকবার, এটি কত বড় মহানুভবতা! এটি অন্তরে কত বড় প্রভাব ফেলে! একজন বেদুইন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে চেয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাকে ঐ ব্যক্তির হাত থেকে বাঁচালেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও ক্ষমা করে দিলেন! নিশ্চয় এটি একটি মহান চরিত্র। আল্লাহ সত্যিই বলেছেন, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন:
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
"আর নিশ্চয় তুমি মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এহেন আচরণ লোকটির জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলল, এবং পরবর্তীতে সে মুসলমান হয়েছে এবং তার মাধ্যমে অনেক মানুষ উপকৃত হয়েছে।
পাঁচ: পাদ্রী যায়েদের সাথে তার আচরণ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিশোধ গ্রহণের শক্তি থাকা সত্ত্বেও মানুষকে ক্ষমা করে দিতেন। রাগের সময় তিনি ধৈর্যধারণ করতেন। দুর্ব্যবহারকারীর সাথে ভাল ব্যবহার করতেন। উল্লেখিত উঁচুমানের চরিত্রগুলোই তার দাওয়াত কবুল করা, তার প্রতি ঈমান আনার বিষয় সুগম করে দিয়েছে। ইহুদীদের একজন বড় আলেম যায়েদ ইবনে সা'নার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আচরণ দেখিয়েছিলেন তা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।'
একদিন যায়েদ ইবনে সা'না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে তার পাওনা তাগাদা দেয়ার জন্য আসলো। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাদর ও জামা ধরে সজোড়ে টান মারলো এবং তার সাথে কঠিন ভাষা প্রয়োগ করলো। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে রূঢ় চেহারায় তাকালো, এবং বললো, 'হে মুহাম্মাদ, আমার পাওনা পরিশোধ কর, তোমরা আব্দুল মুত্তালিবের বংশধর আসলেই টাল-বাহানাকারী গোষ্ঠী।' সাহাবী উমার রা. তার দিকে তাকালেন, তার চোখদুটো ঘূর্ণায়মান নক্ষত্রের মত ঐ ব্যক্তির মাথার উপর ঘুরছে। অতঃপর তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর দুশমন! তুমি রাসূলকে যা বলেছো আমি তা শুনেছি এবং তুমি তার সাথে যা আচরণ করেছো, তা আমি দেখেছি। ঐ সত্বার কসম! যিনি তাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তিনি আমাকে ভর্ৎসনা করবেন এই ভয় না থাকলে আমি তলোয়ার দিয়ে তোমার মাথা আলাদা করে ফেলতাম। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমার রা. এর দিকে স্থিরতার সাথে মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, 'হে উমার! আমি ও সে তোমার নিকট থেকে এমন কথা শুনতে প্রস্তুত ছিলাম না। তুমি বরং আমাকে সুন্দরভাবে আদায় করার, এবং তাকে সুন্দরভাবে তাগাদা দেয়ার পরামর্শ দিতে পারতে। হে উমার! তাকে নিয়ে যাও এবং তার পাওনা পরিশোধ করে অতিরিক্ত আরো বিশ সা' খেজুর দিয়ে দাও।'
এ কাজটিই তাকে ইসলাম গ্রহণ করার উৎসাহ দিয়েছে। অতঃপর সে ঘোষণা দিল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।'
এ ঘটনার পূর্বে যায়েদ বলত, 'নবুয়্যতীর আলামতসমূহ থেকে কোন একটি আলামত তার চেহারায় ফুটে উঠতে দেখা বাকি ছিল না, তবে দুটি আলামত সম্পর্কে তখনও আমি অবগত হতে পারিনি। এক: তার অজ্ঞতার তুলনায় জ্ঞান-গরিমাই বেশি হবে। দুই: তার সাথে মূর্খতাসূলভ ব্যবহার তার সহনশীলতা বাড়িয়ে দেবে।'
সে এই ঘটনার মাধ্যমে তা পরীক্ষা করে, এবং তার সম্পর্কে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তেমনটিই পেয়েছে। অতঃপর সে ঈমান আনলো এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে অনেক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করলো, এবং তাবুকের যুদ্ধে অভিযানে শহীদ হল। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সত্যবাদিতা ও তিনি যে দিকে আহবান করছেন তা যে সত্য, এ দুই বিষয়ের উপর আখলাকের মাধ্যমে অনেক প্রমাণ পেশ করেছেন।
ষষ্ঠ: মুনাফিক নেতাদের সাথে তার আচরণ:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করলেন, এদিকে আউস ও খাযরাজ গোত্র আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে নেতা বানানোর ব্যাপারে একমত হয়েছিল। এমনকি দুইজন ব্যক্তিও তার মর্যাদার ব্যাপারে মতবিরোধ করেনি। ইতিপূর্বে আউস ও খাযরাজ গোত্র কোন সময় দু'গ্রুপের কারো ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছোতে পারেনি। তারা তাকে মালা পড়িয়ে নেতা বানানোর সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করল। ঠিক এমন সময় আল্লাহ তাআলা তাদের সম্মুখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উপস্থিত করলেন। যখন মুনাফিক নেতার স্বজাতি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে ইসলামের দিকে ধাবিত হতে শুরু করল, তখন তার অন্তর হিংসা-বিদ্বেষে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। এবং সে দেখল তার রাজত্ব ও ক্ষমতা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে চলে যাচ্ছে। সে যখন দেখল, তার স্বজাতি ইসলামে প্রবেশ করছে, তখন সে অপছন্দ করা সত্ত্বেও কপটতা নিয়ে, হিংসা ও বিদ্বেষসহ ইসলামে প্রবেশ করল। সে ইসলাম থেকে মানুষকে বিমুখ করা, মুসলিম জামাআতে ফাটল সৃষ্টি করা ও ইহুদীদের সহযোগিতা করার ব্যাপারে কোন প্রকার ত্রুটি করল না।
ইসলামী দাওয়াতের ব্যাপারে তার বিদ্বেষের বিষয়টি ছিল সুস্পষ্ট। কিন্তু তা ছিল সম্পূর্ণ মুনাফেকী অবস্থায়। নবী করীম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিষয়টি ধৈর্য, সহনশীলতা ও ক্ষমার দৃষ্টিতে গ্রহণ করে নিতেন। কেননা সে ইসলাম প্রকাশ করেছিল। তাছাড়া তার অনেক মুনাফিক সাথি-সঙ্গী ছিল। সে ছিল তাদের নেতা। আর তারা ছিল তার অনুসারী। নবী করীম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা ও কাজে তার প্রতি অনুগ্রহ করতেন, এবং অনেক সময় তার দুর্ব্যবহারকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখতেন। নিম্নে এ রকম কয়েকটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হল:
১- ইহুদী সম্প্রদায় বনু কুরাইযা অঙ্গীকার ভঙ্গ করার পর তাদের জন্য সুপারিশ করা
বদর যুদ্ধের পর বাজারে জনৈক মুসলিম মহিলার পোশাক খুলে ফেলা উন্মুক্ত এবং এ মহিলাকে সাহায্য করার কারণে একজন মুসলমানকে খুন করার মাধ্যমে বনু কুরাইযা অঙ্গীকার ভঙ্গ করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের বিশ মাস পর শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি শনিবার তাদের কাছে গেলেন, তাদেরকে পনেরো দিন বন্দি করে রাখলেন এবং তারা তাদের দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করল। তিনি খুব কঠিনভাবে তাদেরকে অবরোধ করলেন। আল্লাহ তাদের অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিদ্ধান্ত মেনে নেমে আসল। রাসূলের নির্দেশে তাদের উভয় হাত পিছনে বেধে দেয়া হল। তারা ছিল সাত শত জন যোদ্ধা। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হাজির হয়ে বলল, 'হে মুহাম্মাদ আমার গোলামদের উপর দয়া কর।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিতে দেরি করলে সে আবার বলল, 'হে মুহাম্মাদ তুমি তাদের উপর দয়া কর।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে, সে রাসূলের বর্ম-পোশাকের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল এবং বলল, যতক্ষণ তুমি আমার লোকদের উপর দয়া না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাকে ছাড়ব না। (তাদের মধ্যে চার শত জন ছিল বর্ম পোশাক বিহীন, আর তিন শত জন বর্ম-পোশাক পরিহিত।) তারা আমাকে লাল ও কালো জাতি থেকে হেফাযত করেছে। আর তুমি তাদেরকে এক সকালেই আমার থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাও? আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি অশুভ পরিণতির ভয় করছি। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার খাতিরে তাদেরকে ছেড়ে দিলেন।' তাদেরকে মদীনা থেকে বের হওয়ার এবং এর নিকটে বসবাস না করার আদেশ করলেন। ফলে তারা সিরিয়ার আযরাআতে চলে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাল সম্পদ গণীমত হিসাবে তার এক পঞ্চমাংশ আয়ত্ব করে নিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এহেন সুপারিশের দরুন তাকে কোন শাস্তি দিলেন না। বরং ক্ষমা করে দিলেন।
২- উহুদ যুদ্ধে রাসূলের সাথে তার আচরণ :
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধে বের হলেন। তিনি যখন মদীনা ও ওহুদের মাঝামাঝি পৌঁছলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এক তৃতীয়াংশ সেনা নিয়ে আলাদা হয়ে গেল, এবং তাদেরকে নিয়ে মদীনায় চলে আসল। জাবের রা. এর পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম তাদের পিছনে পিছনে গেলেন। অতঃপর তাদেরকে ভর্ৎসনা করলেন ও পুনরায় ফিরে যাওয়ার জন্যে উৎসাহ দিলেন। এবং তিনি বললেন, 'চলে এসো এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর। অথবা শত্রুদেরকে প্রতিহত কর।' তারা বলল, 'আমরা যদি জানতাম তোমরা অবশ্যই যুদ্ধ করবে, তাহলে ফিরে যেতাম না।' অতঃপর তাদেরকে নিন্দাবাদ করে তাদেরকে রেখে ফিরে এলেন।' এত বড় অপরাধ সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোন শাস্তি দিলেন না।
৩- আল্লাহর প্রতি আহবান করা থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাধা প্রদান:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা'দ ইবনে উবাদা রা. কে দেখতে গেলেন। পথিমধ্যে আল্লাহর শত্রু আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথে তার সাক্ষাৎ হল। তখন তার সাথে স্বীয় কওমের লোকজন উপস্থিত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহন থেকে নামলেন এবং সালাম করলেন। অতঃপর কিছুক্ষণ বসলেন। তিনি কুরআন তেলাওয়াত করে তাদেরকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিলেন। আল্লাহর কথা স্মরণ করালেন। ভয় দেখালেন ও সুসংবাদ দিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কথা শেষ করলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই দাঁড়িয়ে বলল, 'হে ব্যক্তি (নবী) আমি তোমার কথাগুলো ভালভাবে মেনে নিতে পারছি না। এগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে তুমি বাড়িতে বসে থাকলেই তো চলে। তোমার কাছে যারা আসে শুধুমাত্র তাদেরকেই এগুলো বয়ান করে শুনাও। তোমার কাছে যে আসে না, তাকে তুমি বিরক্ত কর না। কারো মজলিসে এমন কিছু নিয়ে এসো না যা সে অপছন্দ করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাজেও তাকে পাকড়াও করলেন না। বরং ক্ষমা করে দিলেন।
৪- বনী নযীরকে আপন ভূমিতে বহাল রাখার চেষ্টা করা:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার ইচ্ছা করে বনু নযীর যখন অঙ্গীকার ভঙ্গ করল, তখন তিনি তাদের নিকট মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে এই আদেশ দিয়ে প্রেরণ করলেন যে, তারা যেন এ শহর ছেড়ে চলে যায়। এদিকে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নেতৃত্বে মুনাফিকরা বলে পাঠাল, তোমরা আপন জায়গায় থাক। নিশ্চয় আমরা তোমাদেরকে শত্রুর হাতে সোপর্দ করব না। যদি তোমরা যুদ্ধের সম্মুখীন হও, তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করব। যদি তোমাদেরকে বের কের দেয়া হয়, তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে বের হয়ে যাব। ফলে ইহুদীদের মনোবল আরো চাঙ্গা হয়ে গেল। তারা চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিরোধিতা করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট গেলেন এবং তাদেরকে অবরোধ করলেন। অতঃপর আল্লাহ তাদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করলেন এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দেশান্তর করলেন। তারা খায়বর গিয়ে আশ্রয় নিল। আর তাদের কেউ কেউ সিরিয়ায় চলে গেল।' নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের এহেন নিকৃষ্ট তৎপরতার কোন শাস্তি দিলেন না।
৫- মুরাইসি যুদ্ধে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানেদের সাথে চক্রান্ত ও বিশ্বাস ঘাতকতাঃ
এ যুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এমন একটি অপমানজনক কাজ করেছে, যার কারণে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হয়ে যায়:
প্রথমত: মুনাফিকরা এ যুদ্ধে আয়েশা রা. এর প্রতি অপবাদ রচনা করে। যার নেতৃত্বে ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল।
দ্বিতীয়ত: এ যুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যা বলেছিল আল-কুরআনে তা উল্লেখ করা হয়েছে: يَقُولُونَ لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى المُدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ
‘তারা বলে, যদি আমরা মদীনায় ফিরে যাই তাহলে, আমাদের মধ্যে সম্মানিত লোকেরা লাঞ্ছিতদের বের করে দেবে।”
তৃতীয়ত: এ যুদ্ধে আল্লাহর দুশমন যা বলেছিল আল-কুরআনে তা উল্লেখ করা হয়েছে:
لَا تُنْفِقُوا عَلَى مَنْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ حَتَّى يَنْفَضُّوا
"আল্লাহর রাসূলের নিকট যারা রয়েছে তাদের জন্য তোমরা খরচ কর না, যতক্ষণ না তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।”
এর অনেক পর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্ম-কৌশল আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হল। আর উদ্ভাসিত হল ফেৎনার আগুন নিভিয়ে ফেলা ও অকল্যাণের মূলোৎপাটনের ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শিক রাজনীতি। সন্দেহ নেই, আল্লাহর অনুগ্রহ, আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের ব্যাপারে তার দূরদর্শিতা, তার প্রতি তাঁর সহনশীলতা, তার প্রতি অনুগ্রহ এবং অপমানকর অবস্থানের মোকাবিলায় মুনাফিক নেতাকে ক্ষমা করে দেয়া এ সবগুলোর পিছনে ছিল নানাবিধ হিকমত ও কৌশল।
আর তা হলো: এ ব্যক্তির অনেক ভক্ত ছিল, ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাদের পক্ষ থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ভয় ছিল। তাছাড়া সে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুসলমান ছিল, আর এ কারণেই যখন উমার ইবনে খাত্তাব রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে সুযোগ দিন, আমি এ মুনাফিক সর্দারের মাথা উড়িয়ে দিই।' তখন তিনি তাকে বলেছিলেন, 'তাকে ছেড়ে দাও, যাতে করে লোকেরা বলাবলি করতে না পারে যে, মুহাম্মাদ নিজ সাথিদের হত্যা করে।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তাকে হত্যা করতেন তাহলে সেটি লোকদের ইসলামে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে আতঙ্ক সৃষ্টি করত। কারণ লোকেরা আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে মুসলিম বলেই জানত। তখন তারা বলত, মুহাম্মাদ মুসলমানদের হত্যা করে। তাতে করে নতুন ভাবে বিশৃঙ্খলার জন্ম নিত আর জাতীয় স্বার্থ ব্যাহত হত।
এখানে চিন্তা করলে দেখা যাবে নবীজীর পক্ষ থেকে ইসলামের ঐক্য ও শক্তি সুদৃঢ় রাখার প্রত্যয়ে এবং বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশংকায় ছোট খাট সমস্যার ক্ষেত্রে ধৈর্য ও প্রজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে। তাছাড়া তাকে প্রকাশ্য অবস্থার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর ভিতরগত বিষয়গুলো আল্লাহ তাআলার উপর ন্যস্ত করতে আদেশ দিয়েছেন।
আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে হত্যা না করার তাৎপর্য কি, এটি উমার রা. প্রথম প্রথম বুঝতে পারেননি, তবে কিছুদিন পরে বুঝে আসে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, বিষয়টি আমি বুঝতে পেরেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্ত অবশ্যই আমার সিদ্ধান্ত অপেক্ষা অধিক বরকতময় ও কল্যাণকর।'
এভাবেই আল্লাহর পথে প্রত্যেক দাওয়াত-কর্মীকে নিজ নিজ দাওয়াতী কর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করে হিকমত ও প্রজ্ঞার রাস্তা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়।
সপ্তম দৃষ্টান্ত: ছুমামাহ বিন উসালের সাথে:
ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. সাহাবী আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল অশ্বারোহীকে নজদ অভিমুখে অভিযানে প্রেরণ করেন। তারা বনী হানীফের একলোককে ধরে নিয়ে আসল। যার নাম ছিল, 'ছুমামাহ বিন উসাল।' সে ছিল ইয়ামামাবাসীদের নেতা। তারা তাকে মসজিদের একটি খুটিতে বেঁধে রাখল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট আসলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে ছুমামাহ! আমাদের সম্পর্কে তোমার ধারণা কি?' সে বলল, 'হে মুহাম্মাদ! আমার নিকট আপনাদের সম্পর্কে ভাল ধারণাই আছে। যদি আপনি হত্যা করেন, তাহলে হত্যাপোযুক্ত লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ লোককেই অনুগ্রহ করবেন। আর আপনি যদি অর্থকড়ি নিতে চান তাহলে বলুন, আপনার ইচ্ছানুযায়ী প্রদান করা হবে।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রেখে চলে গেলেন। যখন পরের দিন আবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে ছুমামাহ! আমাদের সম্পর্কে তোমার কি ধারণা?' উত্তরে সে বলল, 'আগে যা বলেছি তা-ই, যদি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি হত্যা করেন তাহলে হত্যাযোগ্য লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অর্থ-কড়ি নিতে চান তাহলে বলুন, আপনার ইচ্ছানুযায়ী প্রদান করা হবে।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রেখে চলে গলেন। যখন পরের দিন আসল, তখন বললেন, 'হে ছুমাহ আমাদের সম্পর্কে তোমার কি ধারণা?' উত্তরে সে বলল, 'আগে যা বলেছি তা-ই, যদি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি হত্যা করেন, তাহলে হত্যাযোগ্য লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অর্থকড়ি নিতে চান তাহলে বলুন, আপনার ইচ্ছানুযায়ী প্রদান করা হবে।'
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা ছুমামাহকে মুক্ত করে দাও।' মুক্তি পেয়ে সে মসজিদের নিকটস্থ একটি খেজুর বাগানে গিয়ে গোসল করল। অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করে বলল, 'আশহাদু আল লা ইলাহা... আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোন মা'বুদ নাই আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা এবং রাসূল। হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর শপথ করে বলছি, পৃথিবীর বুকে আমার নিকট আপনার চেহারার চেয়ে অধিক ঘৃণিত কোন চেহারা ছিল না। আর এখন আপনার চেহারা অন্য সকল চেহারা অপেক্ষা আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হয়ে গেছে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার নিকট আপনার ধর্ম অপেক্ষা অধিক ঘৃণিত আর কোন ধর্ম ছিলনা, আর এখন আপনার ধর্ম অন্য সকল ধর্ম থেকে আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হয়ে গেছে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনার শহরই আমার নিকট ছিল সর্বাধিক ঘৃণিত শহর। আর এখন সেটিই আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হয়ে গেছে। আপনার প্রেরিত অশ্বারোহী বাহিনী যখন আমাকে গ্রেফতার করেছে তখন আমি উমরা পালনের নিয়ত করেছিলাম। আপনি এ বিষয়ে কি নির্দেশনা দেবেন? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সুসংবাদ দান করলেন এবং উমরা পালনের নির্দেশ দিলেন। তিনি মক্কায় আগমন করলে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, 'তুমি কি ধর্মত্যাগী হয়ে গেলে?' উত্তরে সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম বরং আমি রাসূলুল্লাহর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, 'এখন থেকে রাসূলুল্লাহর অনুমোদন ব্যতীত ইয়ামামাহ থেকে তোমাদের কাছে এক দানা গমও আর আসবে না।'
অতঃপর তিনি ইয়ামামায় চলে যান এবং ইয়ামামাবাসীকে মক্কায় কিছু রপ্তানি করতে নিষেধ করে দেন। এ অবস্থা দেখে মক্কাবাসীরা রাসূলুল্লাহর নিকট লিখল যে, 'তুমি আত্মীয়তা রক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে থাক, অথচ সে তুমিই আমাদের সাথে বন্ধন ছিন্ন করে দিলে। তুমি আমাদের পিতৃপুরুষদের তলোয়ার দ্বারা হত্যা করেছ। আর আমাদের সন্তানদের মারছ অনাহারে।' চিঠি পেয়ে রাসূলুল্লাহ ছুমামাহকে খাদ্য রপ্তানির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার নির্দেশ পাঠালেন।
আল্লামা ইবনে হাজার রহ. উল্লেখ করেছেন:
ইবনে মাজাহ নিজ সনদে ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, 'ছুমামাহর ইসলাম গ্রহণ, ইয়ামামায় প্রত্যাবর্তন, কুরাইশদের নিকট রসদ-সামগ্রী প্রেরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ সম্পর্কেও আল্লাহ তাআলার নিণেক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেছেনঃ
وَلَقَدْ أَخَذْنَاهُمْ بِالْعَذَابِ فَمَا اسْتَكَانُوا لِرَبِّهِمْ وَمَا يَتَضَرَّعُونَ
"আমি তাদের আজাবের মাধ্যমে পাকড়াও করলাম। কিন্তু তারা তাদের পালনকর্তার তরে নত হলো না এবং কাকতি মিনতিও করল না।" (সূরা মুমিনূন: ৭৬}
ইয়ামামাহ বাসীরা যখন স্বধর্মত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তখন ছুমামাহ রা. নিজ ধর্ম ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি এবং তার সম্প্রদায়ের যারা তার অনুসরণ করেছিল, তারা ইয়ামামাহ ছেড়ে এসে আলী আল - হাদরামীর সাথে মিশে বাহরাইনের মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
'আল্লাহু আকবার' কি চমৎকার সহনশীলতা ছিল নবী মুহাম্মাদের! কত উর্দ্ধে ছিল তার চিন্তা-চেতনা ও অবস্থান। তিনি অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর লোকদের মধ্যে যাদের ইসলাম ও হেদায়াত কামনা করতেন। তাদের মন রক্ষার চেষ্টা করতেন। তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ অব্যাহত রাখতেন। যাতে তাদের ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার মাধ্যমে তাদের অনুসারীবৃন্দও ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী হয় এবং ক্রমাগত ইসলামে দীক্ষিতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
এমনি করেই প্রত্যেক দাওয়াত কর্মীর কর্তব্য হবে সহনশীলতা ও অন্যায়কারীকে ক্ষমা করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা। কেননা ছুমামাহ শপথ করে বলেছে তার ঘৃণা মুহুর্তের মধ্যে ভালোবাসায় রূপান্ত রিত হয়ে গেছে। যখন সে দেখল, নবীজী তার সামনে কত সুন্দর করে সহনশীলতা, ক্ষমা ও বিনিময় বিহীন অনুগ্রহের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
আর এ ক্ষমা ও উদারতা ছুমামার জীবনে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা ও ইসলামের প্রতি অন্যদেরকে দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করেছিল।' এজন্যেই তিনি বলেছিলেন:
أهم بترك القول ثم يردني - إلى القول إنعام النبي محمد رأيت خيالا من حسام مهند - شكرت له فكي من الغل بعدما
'কথা বলব না বলে পণ করি আমি তবে মুহাম্মাদী করুণা সংকল্প ভাংতে বাধ্য করে মোরে। ভারতে তৈরি ধারালো তলোয়ার দেখে, ছায়ামূর্তি (মৃত্যু) প্রত্যক্ষ করলাম, বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ায় আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।'
অষ্টম দৃষ্টান্তঃ যে বেদুইন রাসূলুল্লাহকে চাদরসহ টান মেরেছিল তার সাথে তাঁর সহনশীল আচরণ
সাহাবী আনাস রা. বলেন, 'আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে চলছিলাম, তার গায়ে গাঢ় পাড় বিশিষ্ট একটি নাজরানী চাদর ছিল। পথিমধ্যে এক বেদুইন তাকে কাছে পেয়ে চাদর ধরে প্রচণ্ড জোরে টান মারল। আমি তাকিয়ে দেখলাম, টানের তীব্রতার কারণে চাদরের পাড়ের মোটা অংশ তার কাঁধে দাগ সেঁটে দিয়েছে। অতঃপর সে বলল, 'হে মুহাম্মাদ! তোমার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত যে সম্পদ রয়েছে তা থেকে আমাকে কিছু দিতে বল।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। অতঃপর তাকে কিছু দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
এটিই হচ্ছে নবীজীর চমকপ্রদ ও উৎকর্ষপূর্ণ সহনশীলতা, উন্নততর চরিত্র, উত্তম ক্ষমা প্রদর্শন, নিজ জীবন ও সম্পদে আপতিত বিপদে ধৈর্য ধারণ এবং ইসলামপ্রিয় সহজ সরল ব্যক্তিবর্গের সাথে মার্জনাপূর্ণ অনুকরণীয় আদর্শের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াতকর্মীদের এ আদর্শের অনুকরণ একান্ত জরুরী। আরো জরুরী হচ্ছে তার সহনশীলতা, মার্জনাপূর্ণ সদাচরণ, ক্ষমা, উদারতা, প্রসন্ন মানসিকতা এবং দীন ইসলামের উপর আপতিত আঘাত উত্তম পদ্ধতিতে প্রতিহত করা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
নবম দৃষ্টান্ত: হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করে দাও, কারণ তারা বুঝে না
তার সহনশীলতার অন্যতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে, তাকে যারা বিভিন্নভাবে কষ্ট দিয়েছে, অকথ্য নির্যাতন করেছে তাদের বিরুদ্ধে বদ-দু'আ করেননি। তাদের বিরুদ্ধে বদ-দু'আ করার পূর্ণ স্বাধীনতা তার ছিল এবং এতে আল্লাহ তাআলা তাদের ধবংস করে দিতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন সহনশীল, প্রজ্ঞাময়। দূরদর্শী চিন্তা চেতনা নিয়ে কাজ করতেন। উদ্দেশ্য ছিল সুদূর প্রসারী। আর সেটি হচ্ছে তাদের অথবা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ইসলাম গ্রহণের আকাংখা। এ জন্যেইতো আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন,
'আমি যেন এখনো রাসূলুল্লাহ পানে তাকিয়ে আছি। তিনি জনৈক নবীর ঘটনা বর্ণনা করছেন, তার কওম তাকে প্রহার করে রক্তাক্ত করে ফেলেছে আর তিনি নিজ মুখাবয়ব থেকে রক্ত মুছছেন আর বলছেন,
اللهم اغفر لقومي فإنهم لا يعلمون 'হে আল্লাহ আমার জাতিকে ক্ষমা করে দিন, কারণ তারা জানে না।"
নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও সহনশীলতার প্রশংসা করেছেন এবং তাকে অনেক বড় করে দেখেছেন। যেমন সাহাবী আশজ্জ আব্দুল কায়সকে বলেন:
إن فيك خصلتين يحبهما الله : الحلم والأناة . 'নিশ্চয়ই তোমার মধ্যে এমন দু'টো স্বভাব বিদ্যমান যা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন: সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা'।’
অন্য রেওয়ায়াতে এসেছে: আশজ্জ জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ উক্ত সভাবদ্বয় কি আমিই অর্জন করেছি, না আল্লাহ আমার স্বভাবে প্রোথিত করে দিয়েছেন?' তিনি উত্তরে বললেন, 'বরং আল্লাহ তাআলাই তোমার স্বভাবে সেগুলো জুড়ে দিয়েছেন।' তখন তিনি বললেন, সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমার মধ্যে এমন দু'টো স্বভাব জুড়ে দিয়েছেন, যেগুলো আল্লাহ ও তার রাসূল পছন্দ করেন।'
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সহনশীলতা পছন্দ করতেন এবং তা নিজের মধ্যে তা লালন করতেন।
দশম দৃষ্টান্তঃ যে ইহুদী তাকে যাদু করেছিল তাকে তাকে ক্ষমা করে দেয়া
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ক্ষমা প্রদর্শনের অন্যতম একটি দৃষ্টান্ত হল, যাদুকারী ইহুদীর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন। যে তাঁকে যাদু করেছিল। তিনি কখনোই সে ইহুদীকে এ সম্পর্কে কিছু বলেননি এবং সেও তার চেহারায় মৃত্যু-পূর্ব পর্যন্ত কখনো কোন (বিরক্তিকর) কিছু দেখতে পায়নি。

টিকাঃ
১ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/২১৬, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/১৫৭। ২ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪২৭, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৪।
২ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪২৮, বিদায়া-নিহায়া: ৪/৪। * যাদুল মাআদ: ৩/১২৬।
৩ যাদুল মাআদ: ৩/১৯৪, সীরাতে ইবনে হিশাম ৩/৮, বিদায়া-নিহায়া: ৪/৫১। ৪ সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২১৮।
৪ সীরাতে ইবনে হিশাম ৩/১৯২, আল বিদায় ওয়ান নিহায়া ৪/৭৫, যাদুল মাআদ ৩/১২৭। * সহীহ আল বুখারী: ৪১৪১, সহীহ মুসলিম ২৭৭০, যাদুল মাআদ: ৩/২৫৬।
৫ সূরা মুনাফিকুন: ৮। ৬ সূরা মুনাফিকুন: ৭। ৭ সহীহ আল-বুখারী, হাদীস নং (৪৯০৫) ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং (২৫৮৪)।
৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/১৮৫, শরহে নববী ১৬/১৩৯।
৭ ফাতহুল বারী ১০/৫০৬ শারহু সহীহ মুসলিম লিন নববী ৭/১৪৬,১৪৭ ৮ সহীহ আল - বুখারী (৩৪৭৭) ও সহীহ মুসলিম (১৭৯২)
৮ সহীহ মুসলিম (১৭/২৫) ৯ বর্ণনায় আবু দাউদ, হাদীস নং (৫২২৫) এবং আহমদ (৪/২০৬ ও ৩/২৩) * বর্ণনায় আহমাদ (১৯২৮৬)

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী 📄 দৃঢ়তা

📄 দৃঢ়তা


একজন দাওয়াত-কর্মীর পক্ষে তার সকল কর্মে এবং সর্ব বিষয়ে ধৈর্য, সহনশীলতা ও দৃঢ়তার নীতি গ্রহণ করা ব্যতীত নিজ দাওয়াত কর্মে সফল হওয়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সর্ব কাজে ধীরতা ও দৃঢ়তার নীতি অবলম্বন করেছেন। অনেক নির্ভরযোগ্য ও সহীহ হাদীসের মাধ্যমে বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ আমরা এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছি।
প্রথম দৃষ্টান্ত: উসামা বিন যায়েদ রা. এর সাথে
সাহাবী উসামা বিন যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জুহায়নার হারাকাহ নামকস্থানে যুদ্ধাভিযানে প্রেরণ করলেন। আমরা প্রত্যুষে তাদের উপর চড়াও হয়েছি এবং পরাভূতও করে ফেলেছি। তিনি বলেন, আমি এবং জনৈক আনসারী সাহাবী তাদের একজনকে আঘাত করলাম। অতঃপর তাকে যখন আমরা বেষ্টন করে ফেললাম। সে বলল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তিনি বলেন, এরপর আনসারী বিরত হয়ে গেল আর আমি তাকে আমার বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে ফেললাম। আমরা মদীনায় ফিরে আসলে এ খবর নবীজীর নিকট পৌঁছে গেল। তিনি আমাকে বললেন, 'হে উসামা! সে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে?' আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেতো এটি জীবন রক্ষার্থে বলেছে।' তিনি তারপরও বললেন, 'তুমি তাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরও হত্যা করলে?' উসামা বলেন, 'নবীজী একথাটি বার বার বলে যাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে আমি এ বলে আফসোস করেছিলাম! আহ্! আমি যদি সেদিনের আগে ইসলাম গ্রহণ না করতাম।'
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে এটি অস্ত্রের ভয়ে বলেছে।' তখন তিনি বললেন, 'তাহলে তুমি তার বক্ষ বিদীর্ণ করলে না কেন? তাহলে তো জানতে পারতে সেটি সে সত্যিকারার্থে অন্তর দিয়ে বলেছিল কিনা।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'কেয়ামত দিবসে যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উপস্থিত হবে তখন তুমি তার সাথে কি করবে?' আমি বললাম, 'আপনি আমার জন্যে গুনাহ মাফের দু'আ করুন।' তিনি বললেন, 'কেয়ামত দিবসে যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উপস্থিত হবে তখন তুমি তার সাথে কি করবে?' এরপর রাসূলুল্লাহ ক্রমাগত এটিই বলে যেতে থাকলেন, অন্য কিছু বলেননি। 'কেয়ামত দিবসে যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উপস্থিত হবে তখন তুমি তার সাথে কি করবে।'
তাইতো নবীজীই ছিলেন দৃঢ়তা ও ধীরস্থিরতার ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা বড় ব্যক্তিত্ব। তিনি কোন কাফেরকে তারা আর ইসলাম গ্রহণ করবে না মর্মে যথেষ্ট রূপে নিশ্চিত না হয়ে হত্যার সিদ্ধান্ত নিতেন না।
আনাস বিন মালেক রা. বলেন, 'নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে কোন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইলে একমাত্র সকাল বেলা এবং যথেষ্ট পরিমাণে অপেক্ষা করার পর অভিযান শুরু করতেন। যদি সেখানে আযান শুনতেন, তাহলে যুদ্ধ হতে বিরত হয়ে যেতেন। আর যদি আযান না শুনতেন, তাহলে তাদের উপর হামলা করতেন...।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: যুদ্ধের প্রাক্কালে
নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদেরকে তাদের দাওয়াত কর্ম পরিচালনার ক্ষেত্রে ধীরতা ও স্থিরতার প্রশিক্ষণ দান করতেন। তার প্রশিক্ষণের একটি দিক যেমন, তিনি কোন বাহিনীকে অভিযানে প্রেরণ করলে দলনেতাকে এ মর্মে পরামর্শ দিতেনঃ
তুমি দুশমনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পূর্বে তাদের নিণেক্ত যে কোন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করার প্রতি আহ্বান করবে।
(ক) ইসলাম গ্রহণ ও হিজরতের প্রতি অথবা হিজরত ছাড়া ইসলাম গ্রহণের প্রতি। এবং তারা হবে (অধিকারের দিক দিয়ে) গ্রাম্য-বেদুইন মুসলমান সমতুল্য।
(খ) যদি তারা এতে সম্মত না হয় তাহলে জিযিয়া কর আদায় করতে বলবে।
(গ) আর এতেও অস্বীকৃতি জানালে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে যুদ্ধ শুরু করে দেবে।
তৃতীয় দৃষ্টান্ত: সালাতের ক্ষেত্রে ধীরস্থিরতা ও তাড়াহুড়া না করার প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজ সাহাবাদের প্রশিক্ষণ দানের একটি উদাহরণ: যেমন তিনি বলেন-
'ইকামত হয়ে গেলে সালাতের জন্য তোমরা অতি দ্রুততার সাথে দৌড়িয়ে আসবে না বরং হেঁটে হেঁটে শান্ত শিষ্টভাবে আসবে। এরপর যতটুকু পাবে আদায় করবে, আর যা ছুটে যাবে পূরণ করবে।'
তিনি আরো বলেন, 'সালাতের ইকামত দেয়া হলে তোমরা আমি বের হওয়ার পূর্বে দাঁড়াবে না।'
ধীরস্থিরতার মর্যাদা ও উচ্চ মাকামের করণেই আল্লাহ তাআলা সেটি ভালোবাসেন। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবী আশজ্জ কে লক্ষ করে বলেছিলেন, 'তোমার মাঝে এমন দুটো অভ্যাস বিদ্যমান যা আল্লাহ পছন্দ করেন: সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা।'
নবীরাই সাধারণত আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ এবং অনুকরণীয় আদর্শ। ধৈর্য ও সহনশীলতার সর্বোচ্চ শিখরে তাদের বিচরণ। তাদের মধ্য হতে যিনি মর্যাদার দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেন এবং তিনি সর্বাধিক সফল মানব। তিনিই হলেন সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যার কোন তুলনা বা দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে আর নেই।
চতুর্থ দৃষ্টান্ত: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুদ্ধনীতি প্রসঙ্গে
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শত্রুদের কোন এলাকায় প্রভাত উদ্ভাসিত হওয়ার পরই আক্রমণ করতেন। প্রথমে আযানের প্রতি কর্ণপাত করতেন, যদি ঐ এলাকা হতে আযানের আওয়াজ ভেসে উঠত, তখন আর আক্রমণ করতেন না। অন্যথায় তাদের উপর আক্রমণ চালাতেন।
একবার এক ব্যক্তিকে 'আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর' বলতে শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'লোকটি স্বভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত।' তারপর লোকটি 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' বললে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'লোকটি জাহান্নামের আজাব হতে মুক্তি পেল।'
আনাস রা. হতে বর্ণিত, 'কোন সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রভাতের পূর্বে তাদের উপর কোন ধরনের আক্রমণ করতেন না এবং তিনি আযান শোনার অপেক্ষা করতেন। আযান শোনা গেলে আক্রমণ হতে বিরত থাকতেন। আর আযান না শুনলে তাদের উপর আক্রমণ চালাতেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে, কত সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং শত্রুদের উপর আক্রমণে কোন প্রকার তাড়াহুড়া করতেন না, এটা তারই একটি প্রমাণ।
আব্দুলহ বিন সারজাস আল-মুযানি রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সুন্দর বেশভূসা, ধীরস্থিরতা এবং মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা নবুওয়তের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ।'
এতে প্রমাণিত হয় প্রত্যেক বিষয়ে ধীরস্থিরতা এবং গতিশীলতা উত্তম ও প্রশংসিত। তবে আখেরাতের বিষয়ে শরীয়তের মূলনীতি অনুসরণ করার শর্তে তাড়াহুড়া করা, কাজ যথাসম্ভব দ্রুত সম্পন্ন করা এবং প্রতিযোগী হওয়া অবশ্যই ভাল, প্রশংসনীয় এবং শুভ লক্ষণ। এ ধরনের প্রতিযোগী হওয়া এবং তাড়াহুড়া করাকে আল্লাহ অবশ্যই পছন্দ করেন।

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী 📄 সহমর্মিতা ও কোমলতা

📄 সহমর্মিতা ও কোমলতা


প্রথমত: সহানুভূতিশীলতার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উৎসাহ প্রদানঃ
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, 'যাকে সহমর্মিতা বা সহানুভূতিতা প্রদান করা হল, দুনিয়া ও আখেরাতের সর্ব প্রকার কল্যাণ তাকেই প্রদান করা হল, আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, উত্তম চরিত্র এবং উত্তম প্রতিবেশী শহরকে বসবাস করার উপযোগী করে এবং তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি বিষয়ে নমনীয়তা, দয়াদ্রতা এবং সহানুভূতির প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন এবং তার কথা, কাজ ও ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এ ছাড়া সকল গুণাবলির বাস্তব প্রয়োগ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতে কলমে শিখিয়ে দিয়েছেন, যাতে প্রতিটি উম্মত তাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে তা কাজে লাগাতে পারে।
বিশেষ করে, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী দাওয়াত-কর্মী ও সংস্কারকদের এ বিষয়ে আরো বেশি সজাগ থাকতে হবে। কারণ, তাদের জন্য নম্রতা, সহনশীলতা, সহানুভূতি, তাদের দাওয়াতের ক্ষেত্রে উঠা-বসা চলাফেরা ইত্যাদিতে। মোট কথা প্রতিটি মুহূর্তে তাদের জন্য এর অনুশীলন এবং চর্চা একান্ত অপরিহার্য। উল্লেখিত হাদীস এবং পরবর্তী হাদীসগুলোতে নম্র ব্যবহার ইত্যাদির ফজীলত ও বিনয়ী হওয়ার প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া যে কোন উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়া, খারাপ আচরণ ও দুশ্চরিত্র হতে বিরত থাকা এবং খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করার প্রতিও দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
মনে রাখতে হবে, নম্রতা সকল কল্যাণের দ্বার খুলে দেয় এবং সকল প্রকার মহৎ উদ্দেশ্য নম্রতা-ভদ্রতা এবং সৎ-চরিত্রের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। যাদের মধ্যে এ সব গুণাবলি রয়েছে তাদের জন্য তাদের গন্তব্যে পৌঁছা বা উদ্দেশ্য হাসিল করা খুবই সহজ হয়।
আর নম্রতা বা সুন্দর চরিত্র দ্বারা যে সওয়াব বা পুণ্য লাভ হয়, তার বিপরীতে অন্য কোন নেক আমল দ্বারা তা কল্পনা করা দুষ্কর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভদ্রতা হতে সতর্ক করেছেন। এবং তার উম্মতের উপর কোন ধরনের কঠোরতা করা হতে সম্পূর্ণ নিষেধ করেন।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমার এ ঘরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'হে আল্লাহ! আমার উম্মতের কেউ যদি ক্ষমতাশীল হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যায়ভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তুমি তার উপর ক্ষমতা প্রয়োগ এবং কঠিন আচরণ কর।'
'আর যে ক্ষমতাশীল হওয়া সত্ত্বেও তা অন্যায়ভাবে প্রয়োগ না করে মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার ও নম্র-ভদ্র আচরণ করল, তুমি তার সাথে ভাল ব্যবহার এবং তার প্রতি দয়া কর।'
রাসূল কাউকে বিশেষ কোন কাজে প্রেরণ করলে, তাকে সহজ করা, চাপ প্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন না করার আদেশ দিতেন।
আবু মুসা আশয়ারী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে কোন কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করলে বলতেন, 'তোমরা সুসংবাদ দাও, সহজ কর এবং কঠোরতা করো না।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ যখন কোন পরিবারে কল্যাণ চান তাদেরকে নম্র হওয়ার সুযোগ দেন।'
আবু মুসা আল আশআরী ও মুআজ ইবনে জাবালকে ইয়েমেনের উদ্দেশ্যে প্রেরণের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বলেন, 'তোমরা মানুষের উপর সহজ কর। কঠিন করো না। তাদের সুসংবাদ দাও, আতঙ্কিত করো না। আনুগত্য করো মতবিরোধ করো না।
আনাস রা. হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা সহজ কর, কঠিন করো না সুসংবাদ দাও আতঙ্কিত করো না।
উল্লেখিত হাদীসগুলোর শব্দাবলীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহজ করার আদেশ এবং এর বিপরীতে কঠিন করার নিষেধ দুটোই উল্লেখ করেন। কারণ, হতে পারে কোন ব্যক্তি কখনো সহজ করল এবং কখনো কঠিন করল আবার কখনো সুসংবাদ দিল আবার কখনো আজাব এবং শাস্তির কথা শুনালো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে যদি শুধু সহজ করার কথা বলতেন, তাহলে কোন ব্যক্তি একবার বা একাধিকবার সহজ করলেই তাকে হাদীসের ভাষার মর্মার্থের প্রতি আনুগত্যশীল বলা যেত। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আলাদা ভাবে 'কঠোরতা করো না' বললেন, তখন কঠোরতার বিষয়টি সর্বাবস্থায় সর্বক্ষেত্রে এবং সকল বিষয়ে রহিত হয়ে যায়। আর হাদীসের অন্তর্নিহিত মর্মবাণী এ দিকেই নির্দেশ করেন।
অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা আনুগত্য কর, মতবিরোধ করো না।' দুটি শব্দ বলার কারণ হল, দুই জন কখনো কোন বিষয়ে এক হলেও, আবার কখনো দেখা গেল মতপার্থক্য করল। আবার কোন বিষয়ে একমত হল আবার অন্য কোন বিষয়ে একমত না ও হতে পারে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না' কথাটা আলাদাভাবে বলে দিলেন, ফলে বিচ্ছিন্ন হওয়া সব সময়ের জন্য এবং সকল ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখিত হাদীস ছাড়াও বিভিন্ন হাদীসে আল্লাহর অসংখ্য নেআমত, মহা পুরস্কার এবং আল্লাহর অপার অনুগ্রহের সু-সংবাদ দেয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান ব্যতীত শুধু আজাব-গজব, শাস্তি-ধমকি, হুমকি দিয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করা হতে নিষেধ করেন। হাদীসের নির্দেশাবলীতে 'মন রক্ষা কর, তাদের উপর কোন প্রকার কঠোরতা করো না' করা হয় ইসলামে নব দীক্ষিতদের জন্য। এ ছাড়াও প্রাপ্ত বয়স্ক ও যারা গুনাহের কাজ হতে ফিরে আসতে চায় তাদের প্রতি নমনীয় আচরণ করে ধীরে ধীরে তাদের ইসলামের অনুশাসনে অভ্যস্ত করতে হবে। হাদীসে যে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে তাতে এ ধরনের লোকদেরও ইসলামী জীবন যাপন পদ্ধতি অবলম্বন করা সহজ হয়।
ইসলামের বিধি বিধান কখনো একত্রে চাপিয়ে দেয়া হয়নি বরং ধাপে ধাপে মানুষের উপর ফরজ করা হয়েছে। ফলে যারা ইসলামে প্রবেশ করত বা প্রবেশের ইচ্ছা পোষণ করত তাদের ইসলাম পালন করা সহজ হত এবং ইসলামে দীক্ষিতের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকত। আর যদি প্রথমেই কাউকে সব কিছু চাপিয়ে দেয়া হত, তাহলে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা কমে যেত এবং কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করলেও চাপের মুখে পলায়ন করত।' এমনিভাবে জ্ঞান অর্জন, শিক্ষা দীক্ষার ক্ষেত্রে ও ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের বিভিন্ন সময় বিরতি দিতেন এবং এক দিন পর পর তালীম তরবিয়ত বা শিক্ষা মূলক বৈঠক করতেন। যাতে তারা বিরক্ত না হয় এবং অস্বস্তি অনুভব না করে।'
মোট কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন, এ উম্মতের সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী। সর্ব প্রকার কল্যাণের পথ প্রদর্শক, সংবাদ দাতা, এবং সকল অন্যায়, অনাচার, পাপাচার হতে বাধা দানকারী এবং ভীতি প্রদর্শনকারী। উম্মতকে যারা কষ্ট দেন, তাদের অভিশাপ করেন এবং যারা উম্মতের সাথে ভাল ব্যবহার করেন ও তাদের কল্যাণ কামনা করেন, তিনি তাদের জন্য দুআ ও শুভ কামনা করেন। আয়েশা রা. এর উল্লেখিত হাদীস এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
সুতরাং বলা বাহুল্য যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে কষ্ট দেয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা পরিহার করতেন। আর যারা মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করে এবং তাদের প্রতি মমতা বোধ জাগিয়ে তোলার জন্য কাজ করে তাদের বিশেষ গুরুত্ব দেন।
প্রথম দৃষ্টান্ত: ব্যভিচার করার জন্য এক যুবকের অনুমতি প্রার্থনা
আবু উমামা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একটি যুবক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন,' তার কথা শুনে উপস্থিত সবাই তাকে ভর্ৎসনা করতে লাগল এবং থামাতে চেষ্টা করল। রাসূল বললেন, 'তুমি কাছে এসো!' যুবকটি তার নিকটে গেল। তিনি বললেন, 'তুমি কি তোমার মায়ের সাথে ব্যভিচারকে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। দুনিয়ার কেউই তা পছন্দ করে না।' তারপর বললেন, 'তুমি কি তোমার মেয়ের সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন- দুনিয়ার কোনো মানুষই তা পছন্দ করবে না।' তিনি বললেন, 'তুমি তোমার বোনের সাথে অপকর্ম করতে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন- দুনিয়ার কোন মানুষ তার বোনের সাথে অপকর্ম করতে পছন্দ করবে না।' তিনি বললেন, 'তুমি কি তোমার ফুফুর সাথে অপকর্ম করতে পছন্দ কর?' সে বলল, 'কসম আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন, দুনিয়ার কোনো মানুষই তার ফুফুর সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ করে না।' তারপর বললেন, 'তুমি কি তোমার খালার সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন-দুনিয়ার কোনো মানুষই তার খালার সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ করে না।' এরপর তিনি তার শরীরে হাত রেখে বললেন, 'হে আল্লাহ! তুমি গুনাহসমূহ ক্ষমা কর এবং আত্মাকে পবিত্র কর লজ্জাস্থানকে হেফাজত কর।' সে দিন থেকে যুবকটি কখনো ব্যভিচারের দিকে মনোযোগ দেয়নি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ হতে একজন সংস্কারকের জন্য মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার, তাদের প্রতি দয়া এবং সহানুভূতির গুরুত্ব বিশেষভাবে অনুধাবন করা যায়। বিশেষ করে যারা ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার আশা করে, ঈমানকে বৃদ্ধি করার চেষ্টায় ব্যাকুল এবং ইসলামের উপর অটল অবিচল থাকার বিষয়ে প্রত্যয়ী হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাজ-কর্মে এবং আদেশ-নিষেধের মাধ্যমে প্রতিটি ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: ইহুদীর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যবহার
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, এক দল ইহুদী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বলল, 'আস্সামু আলাইকুম' (তোমাদের জন্য মৃত্যু)। আয়েশা রা. বলেন, আমি অভিশপ্ত ইহুদীদের ধোঁকা-বাজী বুঝতে পেরে বলি 'ওয়া আলাইকুমুস্লাম ওআললনাতু' (তোমাদের জন্য মৃত্যু ও অভিশাপ)। এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সাবধান! হে আয়েশা, আল্লাহ প্রতিটি কাজে নমনীয়তাকে ভালোবাসেন।' আমি বললাম, 'হে রাসূল! তারা কি বলল, আপনি তা শুনেননি?' রাসূল বললেন, 'অবশ্যই শুনেছি এবং তাদের উত্তরে আমি বলেছি ওয়া আলাইকুম (তোমাদের জন্যও)।' এ টুকুই বলাই যথেষ্ট। এবং তিনি বলেন, 'হে আয়েশা! নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা প্রতিটি কাজে নমনীয়তাকে পছন্দ করেন। নমনীয়তার উপর যে ধরনের বিনিময় এবং সওয়াব দেন, কঠোরতা এবং অন্য কোন আমলের উপর এ পরিমাণ বিনিময় ও সওয়াব দান করেন না।
তিনি আরো বলেন, 'যে কোন বিষয়ে নমনীয়তা প্রদর্শন সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করে এবং কঠোরতা প্রদর্শন তিক্ততা ছড়ায়।'
তিনি বলেন, 'নমনীয়তা হতে বঞ্চিত ব্যক্তি মানেই যাবতীয় কল্যাণ হতে বঞ্চিত।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যাকে নমনীয়তা হতে বঞ্চিত করা হয়, তাকে অবশ্যই দুনিয়া ও আখেরাতের সকল প্রকার কল্যাণ হতে বঞ্চিত করা হয়।'
আবু দারদা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যাকে নম্রতা বা ভদ্রতার ক্রিয়দাংশ প্রদান করা হয়, তাকে যাবতীয় কল্যাণেরও ক্রিয়দাংশ প্রদান করা হয়। আর যাকে নম্রতা বা ভদ্রতা হতে আংশিক বঞ্চিত করা হয়, তাকে যাবতীয় কল্যাণ হতেও আংশিক বঞ্চিত করা হয়।'
আবু দারদা হতে আরো বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল বলেন, 'যাকে নম্রতা বা ভদ্রতার ক্রিয়দাংশ দেয়া হয়, তাকে যাবতীয় কল্যাণেরও ক্রিয়দাংশ দেয়া হয়। উত্তম চরিত্র হতে কোন আমলই ভারী হতে পারে না।'
তৃতীয় দৃষ্টান্ত: মসজিদে পেশাবকারীর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
আনাস বিন মালেক রা. হতে বর্ণিত, একদা আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে মসজিদে অবস্থান করছিলাম। ঠিক এ মুহূর্তে একজন গ্রাম্য লোক এসে মসজিদে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে আরম্ভ করল। এ দেখে সাহাবারা তাকে থামানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাকে পেশাব করতে বাধা দিও না', ফলে তারা পেশাব করার জন্য সুযোগ দেন। পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাছে ডেকে বললেন, 'মসজিদ পেশাবের জায়গা নয় বরং মসজিদ হলো আল্লাহর জিকির, কুরআন তিলাওয়াত এবং নামাজের স্থান।' তারপর এক ব্যক্তিকে আদেশ দিলেন- এক বালতি পানি তার পেশাবে ঢেলে দেয়ার জন্য।
সহীহ আল-বুখারীর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এ লোকটি বলেছিল, 'হে! আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রহম কর, আমাদের দুইজন ছাড়া আর কাউকে অনুগ্রহ করো না।' আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজে দাঁড়ান। আমরাও দাঁড়াই, লোকটি নামাজে বলল, 'হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুগ্রহ কর। আমাদের ছাড়া আর কাউকে অনুগ্রহ করো না', নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেন, 'তুমি উন্মুক্ত ঝর্নাধারাকে পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিলে।'
বুখারী ছাড়া অন্যান্য হাদীসের কিতাবে এ ঘটনার ব্যাখ্যা নিম্নরূপ: আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, একজন গ্রাম্য লোক মসজিদে দুই রাকাত নামাজ পড়ে বলল, 'হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুগ্রহ কর এবং এ ছাড়া কাউকে অনুগ্রহ করো না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি উন্মুক্ত ঝর্নাধারাকে পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিলে?' এ কথা বলতে না বলতে সে মসজিদে পেশাব করতে আরম্ভ করলে সকলে দৌড়ে বাধা দিতে চেষ্টা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে, তাদের কষ্টের কারণ বা অকল্যাণের জন্য প্রেরণ করা হয়নি। তোমরা তার পেশাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও।'
তিনি বলেন, গ্রাম্য লোকটি বিষয়টি অনুধাবন করে বলল, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে আসেন। কিন্তু তিনি আমাকে কোন প্রকার ধমক দেননি, কোন মন্দ বলেননি এবং কোন প্রকার মারধর করেননি।' দেখুন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী, বিজ্ঞ এবং বুদ্ধিমান। তার আচার - আচরণ এবং কাজকর্ম সবই প্রজ্ঞাময় এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। তার আখলাক, আচার-আচরণ, নম্রতা-ভদ্রতা, নমনীয়তা, দয়ার্দ্রতা, সহনশীলতা, ক্ষমা ও ধৈর্যশীলতা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তি মাত্রই তার প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় হবে তার এবং প্রগাঢ় হবে তার ঈমান। লোকটি এমন একটি কাজ করল, তাতে রাগান্বিত হওয়া, শাস্তি যোগ্য অপরাধ মনে করা এবং শিক্ষা দেয়ার মত গর্হিত কাজ বিবেচনা করা ছাড়া উপস্থিত লোকদের সামনে আর কোন বিকল্প ছিল না। এ কারণেই সাহাবীগণ তাড়াহুড়া করে তাকে বারণ করতে লাগলেন, তার এ কাজটিকে তারা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তারা তাকে ধমক দিলেন এবং তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলেন এবং সাহাবীদের তাকে পেশাবে বাধা দেয়া হতে বিরত রেখে তার সাথে সুন্দর ব্যবহার করেন ও সুশিক্ষা দেন। এবং যখন সবাই বিরক্ত তখন তার প্রতি তিনি দয়ার্দ্র হলেন।
এটা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দয়া, সহনশীলতা এবং সুন্দর ব্যবহারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিটি কাজে এবং ব্যবহারে তিনি অনুরূপ হিকমত এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে হিকমতের সাথে শিক্ষা দেন এবং লোকটি যখন এ কথা বলে, 'হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুগ্রহ কর এবং আমাদের ছাড়া কাউকে অনুগ্রহ করো না', রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, 'তুমি বিস্তৃত জনপদকে সংকীর্ণ করে ফেললে! অর্থাৎ আল্লাহর রহমতকে। কারণ, সমস্ত কিছুই আল্লাহর রহমত দ্বারা আবৃত। আল্লাহ বলেন, 'আমার রহমত সব কিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে।'
কিন্তু দুআ করতে গিয়ে লোকটি কার্পণ্য করে এবং রহমতের দুআতে সমস্ত মাখলুককে অন্তর্ভুক্ত করেনি।
অথচ, আল্লাহ তাআলা এর বিপরীতে যারা দুআতে সমস্ত সৃষ্টিকে শামিল করেন তাদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন: وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
"আর যারা তাদের পরে আগমন করল, তারা বলে, 'হে আমাদের রব! তুমি আমাদের ক্ষমা কর এবং আমাদের পূর্বে ঈমান সহকারে যারা অতিবাহিত হয়েছে তাদেরও। আর আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের সম্পর্কে কোন বিদ্বেষ অবশিষ্ট রেখো না। হে রব! নিশ্চয় তুমি পরম দয়ালু।"
লোকটি উল্লেখিত আয়াতের বর্ণনার সম্পূর্ণ উল্টো দুআ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত নম্র, ভদ্র এবং আদরের সাথে শিক্ষা দেন। এবং এ ধরনের দুআ হতে নিষেধ করেন।
আর লোকটি পেশাব করতে আরম্ভ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাধা দেয়া হতে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। কারণ, হতে পারে বাধা দেয়ার ফলে সমস্যা আরো বাড়বে। তাই তিনি বাধা দেননি, কারণ : ১ - পেশাব করতে আরম্ভ করার পর বাধা প্রদান করলে লোকটির স্বাস্থ্যের দিক হতে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ২- অথবা পেশাব নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে শরীরের অন্যান্য স্থান, পোশাক এবং মসজিদের অন্য কোন অংশে পেশাব লেগে নাপাক হয়ে যেতে পারত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণের দিক বিবেচনা করে বাধা প্রদান হতে বিরত রাখলেন। অর্থাৎ তিনি দুটি বড় ধরনের সমস্যা এবং ক্ষতিকে প্রতিহত করেন সহনীয় দুটি ক্ষতিকে মেনে নিলেন। এবং দুটি বড় ধরনের কল্যাণ অর্জনকে প্রাধান্য দেন ছোট দুটিকে ছেড়ে দিয়ে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন বুদ্ধিমত্তা এবং হিকমতের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণকারী। তিনি যে কোন প্রেক্ষাপটে যে কোন কাজকর্ম সমাধান এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিকমতের পরিচয় দিয়ে থাকেন। ঘটনায় তিনি তার উম্মত, বিশেষ করে দাওয়াত-কর্মী বা সংস্কারকদের একজন মূর্খ অজ্ঞ, অশিক্ষিত-যার মধ্যে কোনপ্রকার হটকারিতা বা কপটতার অবকাশ নাই- কোন প্রকার কটূক্তি, হুমকি- ধমকি, কঠোরতা, কষ্ট দেয়া বা দুর্ব্যবহার ছাড়া কীভাবে শিক্ষা দিতে হয় তার একটি দৃষ্টান্ত এবং অনুপম আদর্শ স্থাপন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুপম আদর্শ- নমনীয়তা, দয়া, অনুগ্রহ, সহানুভূতিশীল আচরণ, মমতাময়ী ব্যবহার - লোকটির জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে। ফলে, সে পরবর্তী জীবনে ঘটনার বর্ণনায় কৃতজ্ঞতার সাথে বলে, 'তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে আমার দিকে অগ্রসর হন। তবে তিনি আমাকে কোন প্রকার কটূক্তি বা উচ্চবাচ্য করেননি, কোন প্রকার তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করেননি এবং মারধর করেননি।' তার কথা থেকেই বুঝা যায়, লোকটির জীবনে কেমন পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল।
চতুর্থ দৃষ্টান্ত : মুআবিয়া বিন হাকামের ঘটনা
মুআবিয়া বিন হাকাম আসলামী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন 'একদিন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে নামাজ আদায় করতে ছিলাম। ইতি মধ্যে নামাজে এক লোক হাঁচি দিলে তার উত্তরে আমি বলি 'ইয়ারহামুকাল্লাহ! (আল্লাহ তোমাকে দয়া করুন)' এ শুনে সবাই আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে আরম্ভ করল। আমি তাদের বললাম, 'হায় দুর্ভোগ! তোমাদের কি হয়েছে? তোমরা আমার দিকে এভাবে তাকাও কেন?' তারপর তারা তাদের উরুতে থাপর মারতে আরম্ভ করল। আমি বুঝতে পারলাম তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে। ফলে আমি চুপ হয়ে গেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য আমার মাতা পিতা উৎসর্গ হোক, ইতিপূর্বে আমি তার চেয়ে উত্তম কোন শিক্ষক ও এত সুন্দরভাবে শিক্ষা প্রদান করতে কাউকে দেখিনি। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে কোন গালি দিলেন না, তিরস্কার করলেন না এবং কোন মারধর করেননি। নামাজ শেষে বলেন, 'নিশ্চয় নামাজে কথা বলা সঙ্গত নয়। বরং নামাজ হলো তাসবীহ, তাকবীর এবং কুরআন তেলাওয়াত।' আমি তাকে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি জাহেলিয়‍্যাতের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলাম। আল্লাহ ইসলাম গ্রহণ করার সুযোগ দিয়েছেন। আমাদের মধ্যে কিছু লোক গণকের নিকট যায়। আমি কি গণকের নিকট যাব?' রাসূল বলেন, 'না, তুমি গণকের নিকট যেও না।' বললাম, 'আবার আমাদের মধ্যে কিছু লোক এমন আছে তারা লক্ষণ- কুলক্ষণে বিশ্বাস করে।' তিনি বললেন, 'এটা একটি কুসংস্কার, অবিশ্বাসী কাফেররা এতে বিশ্বাস করে। তবে তোমাকে এটা যেন কোন কাজ থেকে বিরত না রাখে।' তারপর আমি বলি, 'আমাদের মধ্যে কিছু লোক আছে, যারা দাগ দেয়।' রাসূল বলেন 'যদি পূর্বেকার কোন নবী এ ধরনের দাগ দিয়ে থাকে, আর যার দাগ নবীর দাগের সাথে মিলে যায়, তার জন্য দাগ দেয়া বৈধ।'
মুআবিয়া বিন হাকাম বর্ণনা করেন, 'আমার একজন দাসী ওহুদ এবং জাওয়ানিয়া নামক স্থানে ছাগল চরাত। একদিন সে বলল, 'আমার একটি ছাগল বাঘে খেয়ে ফেলেছে।' এ কথা শুনে আদম সন্তান হিসেবে স্বাভাবিকভাবে আমি খুব কষ্ট পেলাম, ফলে আমি খুব জোরে তাকে আঘাত করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে মুক্ত করে দেব কি?' রাসূল বললেন, 'তুমি তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' তাকে নিয়ে আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'আল্লাহ কোথায়?' উত্তরে সে বলল, 'আল্লাহ আকাশে।' তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি কে?' সে বলল, 'আপনি আল্লাহর রাসূল।' রাসূল বললেন, 'তাকে মুক্ত করে দাও। কারণ, সে ঈমানদার।" আল্লাহর পক্ষ হতে দেয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ কত সুমহান ও মহত্তম। তার আচরণ মুআবিয়া বিন হাকাম আঙ্গুলামীর এর জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয়। তাই সে বলে, 'আমি ইতিপূর্বে এবং পরে এর চেয়ে উত্তম কোন শিক্ষক দেখিনি।'
পঞ্চম দৃষ্টান্ত: যার হাত প্লেটে ঘুরপাক খেত তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
উমার বিন আবি সালমা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোলে বসে খাচ্ছিলাম। আমার হাত প্লেটের সব জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'হে! বালক! তুমি বিসমিল্লাহ পড়। ডান হাত দিয়ে খাও। এবং সামনে যা আছে তা হতে খাও।' তারপর হতে আমার খাওয়া এ ধরনেরই ছিল। এর ব্যতিক্রম কখনো হয়নি।'
ষষ্ঠ দৃষ্টান্ত: রমজানের দিনে স্ত্রীর সাথে সহবাসকারীর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
সালামাতা বিন সাখার আল আনছারী হতে বর্ণিত, তিনি তার হাদীসে বলেন, 'ঘর হতে বের হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে আমার বিষয়ে তাকে অবহিত করি। তিনি বলেন, 'তুমি এ কাজ করেছ?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ, হে রাসূল!' তারপর আবার বললেন, 'তুমি একাজ করেছ?' বললাম, 'এ কাজ করেছি হে আল্লাহর রাসূল!' তৃতীয় বার তিনি আমাকে বললেন, 'তুমি এ কাজ করেছ?' আমি বললাম, 'হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! আমার উপর বিধান প্রয়োগ করুন! আমি মেনে নেব।' তিনি বললেন, 'একজন দাস মুক্ত কর।' আমি হাতকে স্বীয় ঘাড়ে রেখে বলি, 'হে আল্লাহর রাসূল! যে সত্তা সত্যের পয়গাম নিয়ে আপনাকে প্রেরণ করছে, তার শপথ করে বলছি, আমি স্বীয় ঘাড় ছাড়া আর কোন কিছুরই মালিক নই।' তিনি বললেন, 'তাহলে দুই মাস রোজা রাখ।' আমি বললাম, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! রোজা রাখার কারণেই আমি এ বিপদের সম্মুখীন হলাম।' তিনি বললেন, 'তাহলে তুমি ছদকা কর।' আমি বললাম, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি আপনাকে সত্যের বাণী দিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করছেন, আমি রাত যাপন করছি ক্ষুধার্ত অবস্থায়। কারণ, রাতে খাওয়ার কোন ব্যবস্থা ছিল না।' তিনি বলেন, 'তুমি বনী জুরাইক এর ছদকার মালিকের নিকট যাও তাদের বল, তারা যেন তোমাকে দান করে। আর তা হতে এক ওসক পরিমাণ তোমার পক্ষ হতে অভাবীদের আহার দাও। আর বাকীগুলো তুমি এবং তোমার পরিবারের জন্য গ্রহণ কর।' তারপর আমি নিজ গোত্রের নিকট গিয়ে বলি, 'আমি তোমাদের মধ্যে সংকীর্ণতা দেখতে পাই এবং তোমাদের অদূরদর্শিতা অনুভব করি। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাহসী এবং বরকতময় দেখতে পাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের আদেশ করেছেন ছদকা দিতে। তোমরা আমাকে দান কর। এ কথা বলার পর তারা আমাকে দান খয়রাত করে সহযোগিতা করল।'
সপ্তম দৃষ্টান্ত: কবরের পাশে ক্রন্দন রত মহিলার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কবরের পাশে ক্রন্দনরত এক মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'তুমি আল্লাহকে ভয় কর এবং ধৈর্যধারণ কর। মহিলাটি বলল, 'তুমি আমার থেকে দূর হও। কারণ, তুমি আমার মত বিপদের সম্মুখীন হওনি।' আসলে মহিলাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে পারেনি। তারপর মহিলাকে লোক জন বলল, 'তুমি যার সাথে দুর্ব্যবহার করেছো তিন হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন সে দৌড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, 'আমি আপনাকে চিনতে পারিনি, তাই অভদ্র আচরণ করেছি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'প্রথম আঘাতেই ধৈর্য ধারণ করতে হয়।' ভাবার বিষয় হলো, একজন অজ্ঞ ব্যক্তির সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতই না সুন্দর আচরণ করেন। তাকে কোন প্রকার জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। তিরস্কার করেননি। এর চেয়ে উত্তম আদর্শ আর কার হতে পারে?

টিকাঃ
১ আহমাদ: ৫১৯
২ সহীহ মুসলিম: ১৮২৮
৩ সহীহ মুসলিম: ১৭৩২ ৪ আহমাদ: ১২১৯ * সহীহ আল বুখারী ৪৩৪৪,২৩৪৫ সহীহ মুসলিম: ১৭৩৩ * সহীহ আল বুখারী ৬৯, সহীহ মুসলিম: ১৭৩২
৪ শরহে নববী: ৪১/১২ ফাতহুল বারী: ১৬৩/১

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী 📄 ধৈর্য ও সবর

📄 ধৈর্য ও সবর


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দাওয়াতী ময়দানে এমন অসংখ্য ঘটনা আছে, যেগুলোর মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সর্বোচ্চ ত্যাগ এবং ধৈর্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি আল্লাহর নৈকট্য এবং তার থেকে বিনিময় লাভকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। এ কথা আমরা সবাই জানি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনীয় দাওয়াতের ক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় ধৈর্য ধারণ করেন। এমনকি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ধৈর্যের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। দাওয়াতী ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ধৈর্যের দৃষ্টান্ত স্থাপনের অসংখ্য ঘটনা বিদ্যমান। তবে আমরা বাস্তবমুখী কয়েকটি ঘটনা বর্ণনা করব।
প্রথম দৃষ্টান্ত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক ছাফা পাহাড়ে আরোহণ এবং সবাইকে একত্রিত করে ইসলামের দাওয়াত দেয়া
আল্লাহ তাআলা তার নবীকে সর্ব প্রথম নিকট আত্মীয়দের ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য আদেশ দেন। আল্লাহ বলেন:
وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ ﴿٢١٤﴾ وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ ﴿٢١٥﴾ فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تَعْمَلُونَ ﴿٢١٦﴾
"আর তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক কর। আর যে সব ঈমাদাররা তোমার অনুকরণ করে তাদের প্রতি বিনয়ী হও। আর যদি তারা তোমার অবাধ্য হয় তুমি তাদের বলে দাও, তোমরা যা করো তার দায় হতে আমি মুক্ত।”
তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেন। ইসলামের শক্তি প্রদর্শনের জন্য তিনি একটি অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করেন ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। যার ফলে আল্লাহ তাআলা ইসলামের দাওয়াতের ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটান। দাওয়াতের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বুদ্ধিমত্তা, তার সাহসিকতা, সহনশীলতা, সুন্দর ব্যবহার এবং ইখলাস আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ঐকান্তিক আগ্রহ- ইত্যাদি অনেক কিছুই তার জীবনীতে ফুটে উঠে।
সাথে সাথে এর একটি চিত্র এও দেখতে পাই; তা হল, যারা তাওহীদের বিরোধিতা করে, নবী ও রাসূলদের সাথে দুর্ব্যবহার ও তাদের যারা কষ্ট দেয়, তাদের পরিণতি লাঞ্ছনা বঞ্চনা এবং দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- যখন আল্লাহর বাণী وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ "আর তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক কর।" যখন অবতীর্ণ হল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করে প্রতিটি গোত্রের নাম ধরে ধরে ডাক দিলেন- হে বনী ফাহর! হে বনী আদি! এ রকমভাবে কুরাইশের সম্ভ্রান্ত বংশকে-ডাকতে আরম্ভ করেন। তার ডাক শুনে সমস্ত মানুষ একত্রিত হল। এমনকি যদি কোন ব্যক্তি না আসতে পারতো, সে একজন প্রতিনিধিকে পাঠাতো, কি বলে তা শুনার জন্য। আবু জাহেল নিজে এবং কুরাইশরা সবাই উপস্থিত হল। তারপর তিনি সবাইকে সম্বোধন করে বললেন, 'আমি যদি বলি, এ পাহাড়ের পাদদেশে অস্ত্র সজ্জিত এক বাহিনী তোমাদের উপর আক্রমণের অপেক্ষায় আছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?' সকলে এক বাক্যে বলল, 'অবশ্যই বিশ্বাস করব।' কারণ, আমরা কখনো তোমাকে মিথ্যা বলতে দেখিনি। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সতর্ক করছি ভয়াবহ শাস্তি- আল্লাহর আজাব সম্পর্কে।
এ কথা শুনে আবু লাহাব বলল, 'তোমার জন্য ধ্বংস! পুরো দিনটাই তুমি আমাদের নষ্ট করলে। এ জন্যই কি আমাদের একত্রিত করেছ?' তার এ কথার উত্তরে আয়াত নাযিল হলো। تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ -
"ধবংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার ধন সম্পদ এবং তার কোন উপার্জন কাজে আসে নাই।" আবু হুরাইরা রা. এর বর্ণনায় বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এক এক গোত্রকে আলাদা করে ডাকেন এবং প্রতিটি গোত্রকে বলেন, 'তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা কর।' এবং কলিজার টুকরা ফাতেমা রা. কে ডেকে বলেন, 'হে ফাতেমা! তুমি তোমাকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা কর। কারণ, আল্লাহ পাকড়াও হতে তোমাদের রক্ষা করার মত কোন ক্ষমতা আমি রাখি না। হাঁ, তবে আমার সাথে তোমার রক্তের সম্পর্ক থাকায় আমি তোমাকে আদর-যত্নে সিক্ত করতে পারার আশা রাখি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে যে ব্যাপক আহ্বান বা ঘোষণা দেন তা ছিল একটি ঐতিহাসিক আহ্বান ও যুগান্তকারী ঘোষণা। তাছাড়া তার সবচেয়ে নিকটতম ব্যক্তিকে বলে দিলেন, ঈমান ও আখেরাতের বিশ্বাস এবং রেসালতের স্বীকৃতিই হল তাদের সাথে সম্পর্কের মানদণ্ড। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা রা. কে ডেকে বললেন, 'হে ফাতেমা! তুমি তোমাকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা কর। কারণ, আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদের বিষয়ে আমাকে কোন ক্ষমতা দেয়া হয়নি।'
উলেখিত হাদীসে দেখতে পাই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাওয়াত ছিল সর্বোচ্চ তাবলীগ ও ভীতি প্রদর্শন। এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বিষয় স্পষ্ট করেন যে, কোন ব্যক্তির নাজাতের উপায় কখনো বংশ মর্যাদা, পিতা-মাতার পরিচয়, আত্মীয়তা কিংবা জাতীয়তা ইত্যাদির মানদণ্ডে হতে পারে না বরং এর মানদণ্ড হল তাওহীদ ও রিসালাতের উপর বিশ্বাস। এ ঘোষণার পর আরবদের মাঝে বংশ মর্যাদা এবং আত্মীয়তা ইত্যাদির গৌরব আর অহংকারের যে প্রবণতা ছিল, তা আর অবশিষ্ট রইল না। এবং আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি আনুগত্য ভিন্ন অন্য যে কোন উপকরণ-আত্মীয়তা, বংশ-বর্ণ ইত্যাদির ভিত্তিতে যে সব জাতীয়তা গড়ে উঠে তা একে বারে মূল্যহীন।
গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং প্রতিকুল প্রেক্ষাপটে ও তার বংশের লোকদের সর্বোচ্চ সতর্ক করলেন তিনি। তাদের ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়ার আহ্বান জানালেন। আল্লাহর কঠিন আজাব হতে ভয় দেখালেন এবং তাদের মূর্তি পূজা হতে বিরত থাকতে আহবান করলেন। কিন্তু মক্কাবাসীরা তার আহবানে সাড়াতো দিলই না বরং তারা তার মিশনের বিরোধিতা করলো। ফু দিয়ে তা নিভিয়ে দিতে সচেষ্ট হলো। কারণ, তারা বুঝতে পারল, এ আহ্বান এমন এক দাওয়াত, শত শত বছর ধরে লালন করা ঐতিহ্য এতে বিলুপ্ত হবে এবং বাপ দাদার অন্ধ অনুকরণ ব্যাহত হবে। জাহেলিয়্যাতের যে গতিধারা তাদের সমাজে অব্যাহত ছিল তার পরিসমাপ্তি ঘটবে।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিরোধিতা কোনভাবেই আমলে নেননি। বরং তার উপর আরোপিত দায়িত্ব পালনে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। কারণ, তিনি আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্বে কোন প্রকার অবহেলা করবেন না বলে বদ্ধ পরিকর। যদি সমগ্র বিশ্বের সমস্ত মানুষ তার মিশনকে প্রত্যাখ্যান বা প্রতিহত করে, তারপরও তিনি দাওয়াত অব্যাহত রাখবেন এবং বাস্তবেও তাই করেছেন। রাতদিন গোপনে-প্রকাশ্যে যাকে যেখানে পেতেন দাওয়াত দিতেই থাকতেন। তার চিন্তা চেতনায় শুধু একটি জিনিসই কাজ করতো কীভাবে মানুষকে অন্ধকার হতে বের করে আলোর পথ দেখাবেন। কীভাবে মানুষকে শিরক থেকে মুক্ত করবেন এবং তাওহীদের পতাকা তলে একত্রিত করবেন। তাকে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কার, কোন যালিমের যুলুম-অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়ন, লোভ-লালসা ও প্রলোভন কোন কিছুই বিরত রাখতে পারেনি এবং পারেনি কোন কিছুই তার গতিকে থামিয়ে দিতে।
মানুষের সম্মেলনে, অনুষ্ঠানে এবং হাটে বাজারে মোট কথা যাকে যেখানে পেতেন আল্লাহর দিকে তাকে আহবান করতেন। বিশেষ করে হজের মাওসুম- যখন পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান হতে মানুষ একত্রিত হতো- তখন এ সুযোগকে কাজে লাগাতেন। সমগ্র মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাতেন। ধনী-দরিদ্র, দুর্বল-সবল, স্থানীয়-মুসাফির, পথিক-পর্যটক এমন কোন লোক অবশিষ্ট ছিল না যাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে দাওয়াত পৌঁছাননি। এ দাওয়াতে সমস্ত মানুষ তার নিকট ছিল সম-মর্যাদার। কোন প্রকার বৈষম্য বা পার্থক্য করেননি কারো মধ্যে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, মক্কার ক্ষমতাবান লোকেরা তার শুধু বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং তাকে এবং তার অনুসারীদেরকে মানসিক, শারীরিকসহ অমানবিক নির্যাতন নিপীড়ন আরম্ভ করল। মক্কাবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লো। তারা কোন ভাবেই তাকে মেনে নিতে পারেনি এবং তাকে মেনে নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানাল। তা সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থমকে যাননি, তার মিশন চালিয়ে যেতে লাগলেন এবং ইসলামে দীক্ষিত সংখ্যালঘু মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন। গোপনে গোপনে কোন কোন পরিবারের বাড়িতে গিয়েও তাদের তালীম-তারবিয়ত, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দিতেন।
তালীম-তরবিয়ত ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমন একটি জামাত গঠনে সক্ষম হলেন, যারা তার মিশনের ধারক বাহক হিসেবে তার এ গুরু দায়িত্ব পালনে শরীক হলেন। এদের মত একটি জামাত পেয়ে তার মনে আশার সঞ্চার হলো। ধীরে ধীর তারা এমন একটি জামাতে পরিণত হল, তারা তাদের জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করতে এবং সব কিছুর উপর একমাত্র দীনকে প্রাধান্য দিতে নিজেদের সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে নিলেন। তারা দৃঢ় ঈমান এবং প্রগাঢ় বিশ্বাসের অধিকারী ছিলেন। ধৈর্য ও সহনশীলতার যে, দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে ছিল একেবারেই বিরল।
আল্লাহর আদেশের আনুগত্য এবং তার প্রতি যে প্রগাঢ় ভালোবাসা তারা দেখিয়েছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একজন আমীরের আনুগত্য এবং তার প্রয়োজনীয়তা শুধু বর্ণনা করে বুঝিয়ে দেননি বরং তা বাস্তবায়নের যে ইতিহাস আমরা তাদের মধ্যে দেখতে পাই, বর্তমান আধুনিক পৃথিবীর নেতা নেত্রীরা তা কল্পনাও করতে পারে না।
তাদেরকে কোন আদেশ বা নিষেধের জন্য বাধ্য করার প্রয়োজন হতো না। বরং রাসূলের মুখ থেকে কোন বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা মাত্রই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা পালন করার জন্য তারা ঝাঁপিয়ে পড়তো। তার আদেশের প্রতি যে ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ছিল, তার তুলনায় দুনিয়ার অন্য সবকিছুর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা তাদের নিকট ছিল নেহায়েত তুচ্ছ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, যথাযথ তালীম তারবিয়ত, অবিচল নীতি অবিরাম সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার ফলে দীনের এ আমানত এবং ওহীর এ গুরু দায়িত্ব পালনে তারা সক্ষম হন। আর আমাদের জন্য একটি চিরন্তন আদর্শের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। রাসূল আল্লাহর দীনকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও মেধার পরিচয় দেন তা চিরদিন আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বর্গের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
কুরাইশরা যখন দেখতে পেল শুধু নির্যাতন এবং দমননীতি অবলম্বন করে মুসলমানদের থামানো সম্ভব নয় তখন তারা ভিন্ন কৌশল হিসেবে একটি আপোশ প্রস্তাব নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে আসে। তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়াবী যে কোন প্রস্তাবে সম্মত করাতে প্রচেষ্টা চালায়। এদিকে রাসূলের চাচা আবু তালেব, যিনি তাকে দেখাশুনা করেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকে সাহায্য সহযোগিতা এবং আশ্রয় দিয়ে থাকেন তাকেও একটি প্রস্তাব দেয়। দাবি জানায়, তিনি যেন মুহাম্মাদকে বিরত রাখেন এবং দীনের দাওয়াত বন্ধ করে দেন।'
কুরাইশের সরদার এবং নেতারা আবু তালেবের নিকট এসে বলল, 'তুমি আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত, বয়স্ক, মর্যাদাবান এবং সম্মানী ব্যক্তি। আমরা অনুরোধ জানিয়ে ছিলাম তুমি তোমার ভাতিজাকে নিষেধ করবে। কিন্তু বাস্তবতা হল তুমি নিষেধ করোনি। আমরা জানিয়ে দিচ্ছি, আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। সে আমাদের বাপ দাদা সম্পর্কে মন্তব্য করে। আমাদের প্রতি অশুভ আচরণ করে। আমাদের উপাস্যগুলোর প্রতি কটূক্তি করে। আমরা আর বিলম্ব করতে পারব না। হয়, তুমি তাকে বিরত রাখ অন্যথায় তুমি যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। এতে হয় তোমরা ধ্বংস হবে অথবা আমরা ধ্বংস হব।'
আবু তালেব তাদের অসাধারণ হুমকি এবং সময় বেধে দেয়াকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন এবং তা আমলে নেয়ার জন্য চেষ্টা করেন। তিনি তার স্বজাতি হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা করলেন। আর এই মুহূর্তে স্বজাতি হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং তাদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার মত অনুকুল পরিবেশ তার ছিল না। তাই তিনি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হন এবং উভয় সংকটে জড়িয়ে পড়েন। একদিকে ইসলাম গ্রহণকে সহজে মেনে নিতে পারছেন না, অন্য দিকে তার ভাতিজার অপমান এবং তার উপর কোন প্রকার অন্যায় অবিচারকে সহ্য করতে পারছিলেন না।
নিরুপায় হয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, 'হে ভাতিজা! নিজ বংশের লোকেরা আমার নিকট এসে এ ধরনের কথা বার্তা বলেছে। এ বলে তিনি তাদের কথার বিবরণ শোনালেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। তারপর আবু তালেব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, 'তোমার সাধ্যের বাইরে কোন কাজ করা দরকর নাই। এমন কোন কাজের দায়িত্ব নিতে যাবে না, আমি যার সমাধান করতে পারব না। সুতরাং আমার পরামর্শ হল, তোমার স্বজাতি যে সব কাজ অপছন্দ করে তুমি সে সব কাজ হতে বিরত থাক।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চাচার কথায় একটুও কর্ণপাত করলেন না। তিনি আল্লাহর দিকে দাওয়াত এবং তাওহীদের দাওয়াত অব্যাহত রাখলেন।
আল্লাহর দিকে আহবান করতে গিয়ে কারো কোন কথায় গুরুত্ব দিতে তিনি সম্পূর্ণ নারাজ। কারণ, তিনি জানেন তিনি হকের উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বিশ্বাস করেন, তার এ দীনকে আল্লাহই সাহায্য করবেন। তার এ দাওয়াত আল্লাহ তাআলা একটি পর্যায়ে অবশ্যই পৌঁছাবেন। কিছু দিন যেতে না যেতে আবু তালেব দেখতে পেল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নীতি আদর্শের উপর অটল, অবিচল এবং কুরাইশদের দাবী অনুসারে তাওহীদের দাওয়াত তিনি কখনো ছাড়বেন না।
আবু তালেব রাসূলুল্লাহ সা. কে বললেন, 'আমি কসম করে বলছি, তারা তোমার নিকট একত্রিত হয়ে আসতে পারবে না, যতদিন না আমি মাটিতে প্রোথিত হবো এবং মাটিকে বালিশ বানাবো। তুমি নির্ভয়ে তোমার কাজ চালিয়ে যাও আর সু সংবাদ গ্রহণ কর। আর এ সুসংবাদ দ্বারা তোমার চোখকে শীতল কর।'
তৃতীয় দৃষ্টান্ত: উতবা বিন রবিয়ার ঘটনা।
হামজা বিন আব্দুল মুত্তালেব রা. এবং উমার বিন খাত্তাব রা. এ দুজনের ইসলাম গ্রহণের পর মুশরিকদের আনন্দ ঘন আকাশে ফাটল ধরলো। তাদের দুশ্চিন্তার আর অন্ত রইলো না।
এ ছাড়াও مسلمانوں সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া, প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা, ইসলামের বড় বড় দুশমনদের বিরোধিতা এবং তাদের জুলুম নির্যাতনের কোন পরোয়া না করা, ইত্যাদি বিষয় তাদের ঘুমকে হারাম করে দিল। তাদের মনের আশঙ্কা, ভয়ভীতি এবং দুশ্চিন্তা আরো বৃদ্ধি পেল।
তারপর তারা উতবা বিন রাবিয়াকে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পাঠালো। তাদের ধারণা এর কোন একটি প্রস্তাবে তাকে রাজি করানো যেতে পারে।
তাদের প্রস্তাব নিয়ে উতবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, 'হে আমার ভাতিজা! তুমি জান, তুমি আমাদের নিকট একজন উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তোমার বংশ মর্যাদা আরবের সমগ্র মানুষের চাইতে বেশি সম্ভ্রান্ত। কিন্তু তুমি তোমার স্বজাতির নিকট এমন একটি বিষয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছো যা আমরা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছি না। কারণ, তুমি আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করছো। আমাদের স্বপ্নকে ধূলিস্যাত করে দিচ্ছো। এবং আমাদের উপাস্যগুলোকে কটাক্ষ করছো। আর আমাদের বাপ দাদাদের হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্যে আঘাত হানছো।
সুতরাং তোমাকে কয়েকটি প্রস্তাব দিচ্ছি। মনোযোগ দিয়ে শুন। আশা করি যে কোন একটি প্রস্তাবে তুমি সম্মতি জ্ঞাপন করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিনীত ভাবে বললেন, 'হে আবুল ওয়ালিদ! আপনার প্রস্তাবগুলো তুলে ধরুন! তারপর সে বলল, 'যদি তোমার এ মিশনের উদ্দেশ্য টাকা পয়সা, অর্থ প্রাচুর্য হয়ে থাকে, তাহলে তোমাকে আমরা এত পরিমাণ ধন সম্পদের মালিক বানাব তাতে তুমি মক্কার মধ্যে সবার চেয়ে বেশি সম্পদশালী হবে। আর যদি তুমি নেতৃত্ব চাও, তোমাকে যাবতীয় সব কিছুর নেতা বানিয়ে দেব, তোমাকে ছাড়া একটি পাতাও তার জায়গা হতে সরবে না। আর যদি রাজত্ব চাও, তাহলে তোমাকে পুরো রাজত্ব দিয়ে দেব। আর যদি এমন হয় যে, তুমি যে সব কথা বলছ, তা কোন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যাওয়ার কারণে হয়েছে; কারণ, অনেক সময় এমন হয়, তোমার মাথা হতে বিষয়টি কোন ভাবে নামানো যাচ্ছে না। তাহলে আমরা তোমাকে উচ্চ চিকিৎসার জন্য যত অর্থের প্রয়োজন, তার সবই জোগান দেব। হতে পারে অনেক সময় মানুষের জ্ঞান বুদ্ধি কোন খেয়াল বা কল্পনার কারণে লোপ পায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব মনোযোগ দিয়ে উতবার কথা শুনতে লাগলেন। তারপর যখন কথা শেষ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমার কথা শেষ হয়েছে হে আবুল ওয়ালিদ?' বলল, 'হ্যাঁ।' তা হলে এবার আমার থেকে শোন! তারপর সে বলল, 'আচ্ছা বল।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এ আয়াতগুলো তেলাওয়াত করে শোনালেন-
حم ﴿١﴾ تَنْزِيلٌ مِنَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ﴿۲﴾ كِتَابٌ فُصِّلَتْ آيَاتُهُ قُرْآنَا عَرَبِيًّا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ﴿٣﴾ بَشِيرًا وَنَذِيرًا فَأَعْرَضَ أَكْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ ﴿٤﴾ وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي أَذَانِنَا وَقْرٌ وَمِنْ بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَامِلُونَ ﴿٥﴾
"হা-মীম। রাহমান রাহিম এর পক্ষ হতে অবতীর্ণ। এটা এমন একটি কিতাব, যাতে তাঁর নিদর্শন সমূহের ব্যাখ্যা দেয়া হয়ে থাকে, আরবী কুরআন এমন জাতির জন্য যারা জানে। যা সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী। কিন্তু অধিকাংশ লোক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সুতরাং তারা শুনবে না। আর তারা বলে, তুমি যে দিকে আহ্বান করো সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আচ্ছাদিত আর আমাদের কানে ছিপি লাগানো এবং তোমার মাঝে আর আমার মাঝে রয়েছে পর্দা। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর আর আমরা আমাদের কাজ করি।"' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াতগুলো পড়তে থাকেন। উতবা যখন কুরআনের আয়াত শুনতে পেলো তখন সে কান খাড়া করে দিলো। এবং তার দু হাত ঘাড়ের উপর রেখে হেলান দিয়ে কুরআন শুনতে আরম্ভ করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সেজদার আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন তিনি সেজদা করলেন উতবাও তার সাথে সেজদা করল। তারপর তিনি বললেন, 'হে আবুল ওয়ালিদ! 'তুমি আমার কথা শুনেছো, তুমি এখন ফিরে যেতে পার।'
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন পড়তে পড়তে যখন এ আয়াত পর্যন্ত পৌছলেন
فَإِنْ أَعْرَضُوا فَقُلْ أَنْذَرْتُكُمْ صَاعِقَةً مِثْلَ صَاعِقَةِ عَادٍ وَثَمُودَ
"যদি তারা বিমুখ হয়, তুমি তাদের বল আমি তোমাদের ভয়ংকর শাস্তির ভয় দেখাচ্ছি যে ভয়ংকর শাস্তি সামুদ এবং আদ জাতির অনুরূপ।” তখন উতবা বিচলিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং সে তার হাতকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখে রেখে বলল, 'আমি আল্লাহর কসম দিচ্ছি এবং আত্মীয়তার কসম দিচ্ছি, তুমি এ দাওয়াত হতে বিরত থাক।' এ কথা বলে সে দৌড়ে তার নিজ গোত্রের নিকট চলে গেল। এমনভাবে দৌড় দিল, যেন বিদ্যুৎ তার মাথার উপর পড়ছিলো। গিয়ে কুরাইশদের পরামর্শ দিল, তারা যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামায় এবং তাকে তার আপন অবস্থায় কাজ করতে ছেড়ে দেয়। সে বার বার তাদের বুঝানোর জন্য চেষ্টা চালায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শুনানোর জন্য এ আয়াতকে নির্বাচন করেন। কারণ, তিনি যাতে উতবাকে বুঝাতে সক্ষম হন, রিসালাত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাকীকত কি হতে পারে। আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের জন্য এমন এক কিতাব নিয়ে এসেছেন, যদ্বারা তিনি তাদের পথভ্রষ্টতা হতে বের করে সৎপথে পরিচালনা করেন। তাদের তিনি অন্ধকার হতে বের করে আলোর পথ দেখান। তাদের তিনি জাহান্নাম হতে বাঁচান এবং জান্নাতের সন্ধান দেন। আর তিনি নিজেই সকলের পূর্বে এর ধারক বাহক। তাই এ দীনের পরিপূর্ণ বিশ্বাস সর্বপ্রথম তাকেই করতে হবে এবং সর্বপ্রথম তাকেই তার বিধান সম্পর্কে জানতে হবে। আল্লাহ যখন সমগ্র মানুষকে কোন নির্দেশ দেন, তা মানার বিষয়ে সর্ব প্রথম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই সর্বাধিক বিবেচ্য ব্যক্তি। তিনি কোন রাজত্ব চান না এবং কোন টাকা পয়সা চান না। এবং কোন ইজ্জত-সম্মান চান না। আল্লাহ তাআলা তাকে সব কিছুর সুযোগ দেন এবং তিনি তা হতে নিজেকে বিরত রাখেন। ক্ষণস্থায়ী জীবনের মালামালের প্রতি লোভ-লালসা বলতে কিছুই তার ছিল না। কারণ, তিনি তার দাওয়াতে সত্যবাদী আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ঐকান্তিক।'
তার এ অবস্থান, তাকে আল্লাহর পক্ষ হতে যে প্রজ্ঞা ও পরম ধৈর্য দেয়া হয়েছে, তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। তিনি তার দাওয়াত এবং মিশনকে সামনে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। কোন ধন-সম্পদ অর্থ-প্রাচুর্য নারী- বাড়ী, গাড়ী এবং রাজত্ব কোন কিছুকেই তার বিনিময় প্রাধান্য দেননি এবং স্থান কাল পাত্র বেধে এমন কথা পেশ করলেন যা তখনকার সময়ের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। মনে রাখতে হবে একেই বলে হিকমত এবং সর্বোত্তম আদর্শ।
চতুর্থ দৃষ্টান্ত: আবু জাহেলের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
কাফেররা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিল তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেয়াসহ ইসলামে প্রবেশকারী মুসলমানদের উপর নির্যাতনের সাথে সাথে ইসলামের জাগরণকে ঠেকাতে সব ধরনের কলা কৌশল এবং অপপ্রচার চালিয়ে যাবে। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিভিন্ন ভাবে অপবাদ দিতে লাগল, তারা তাকে পাগল, যাদুকর, গণক, মিথ্যুক ইত্যাদি বলে গালি গালাজ করতে আরম্ভ করে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অটল অবিচল। তাদের কথায় কোন প্রকার কর্ণপাত করেননি। আল্লাহর রহমত এবং আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করার আশায় সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের পক্ষ হতে এমন কষ্টের সম্মুখীন হন যে, কোন ঈমানদার এত কষ্টের সম্মুখীন হননি। আবু জাহেল তার মাথাকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে এবং তাকে দুনিয়া থেকে চির বিদায় দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাকে হেফাজত করেন এবং আবু জাহেলের ষড়যন্ত্রকে তারই বিপক্ষে প্রয়োগ করেন। আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু জাহেল তার সাথীদের জিজ্ঞাসা করল, 'মুহাম্মাদ কি তোমাদের সম্মুখে চেহারা মাটিতে মেশায়?' বলা হল, 'অবশ্যই, 'সে আমাদের সম্মুখে মাথা মাটিতে ঝুঁকায়।' এ কথা শোনে সে বলল, 'লাত এবং উযযার কসম করে বলছি, আমি যদি তাকে মাটিতে মাথা ঝোঁকানো অবস্থায় দেখতে পাই, তার গর্দানকে পদপৃষ্ঠ করব অথবা তার চেহারাকে ধূলা বালিতে মিশিয়ে দেব।' তারপর একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত আদায় করতে ছিলেন। দেখতে পেয়ে আবু জাহেল তার গর্দান পদপৃষ্টর করার জন্য তার দিকে অগ্রসর হল। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে এল, হঠাৎ সে পিছু হঠতে আরম্ভ করল এবং দু-হাত দিয়ে নিজেকে আত্মরক্ষা করতে আরম্ভ করল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'তোমার কি হয়েছে, তুমি এমন করছো কেন?' তখন সে উত্তর দিল, 'আমি আমার এবং তার মাঝে আগুনের একটি পরিখা দেখতে পাই এবং তাতে অসংখ্য ডানা দেখতে পাই।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যদি সে আমার কাছে আসতো, তাহলে ফেরেশতারা তাকে টুকরা টুকরা করে ফেলতো।' তারপর এ ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযেল করেন - থেকে সুরা আলাকের শেষ পর্যন্ত।'
كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى
আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঐ দুর্বৃত্ত এবং অন্যান্য দুর্বৃত্তের হাত হতে রক্ষা করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল প্রকার কষ্ট, জুলুম নির্যাতন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নীরবে সয়ে যান এবং তার জান, মাল ও সময় আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেন।
পঞ্চম দৃষ্টান্ত: রাসূলের পিঠে উটের ভুঁড়ি রাখা
এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ বিন মাসুদ রা. বর্ণনা করেন, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহর পাশে নামাজ আদায় করতে ছিলেন। আবু জাহেল এবং তার সাথি- সঙ্গীরা এক সাথে বসা ছিল। বিগত দিন একটি উট জবেহ করা হয়েছিল। আবু জাহেল বলল, 'কে উটের ভুঁড়িটি নিয়ে আসবে এবং মুহাম্মাদ যখন সেজদা করবে তার পিঠের উপর রেখে দেবে।' তারপর তার দলের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট যে ব্যক্তি, সে উষ্ট্রের ভুঁড়িটি নিয়ে আসল' এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেজদা করলে তার দুই কাঁধের উপর রেখে তারা হাসাহাসি করতে আরম্ভ করে। তারা হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ডলে পড়তো। আমি পুরো বিষয়টি দেখতে পেলাম, যদি কোন ক্ষমতা থাকতো তা হলে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পৃষ্ট হতে তা সরিয়ে নিতাম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেজদায় পড়ে রইলেন। কোনভাবে মাথা উঠাতে পারছিলেন না। এক লোক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এ দৃশ্য দেখে ফাতেমা রা. কে সংবাদ দেন। তিনি খবর শোনামাত্র দৌড়ে আসেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাথা থেকে উটের ভুঁড়ি নামালেন। তারপর তাদের গালি গালাজ করতে লাগলেন। নামাজ শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চ আওয়াজে তাদের জন্য বদ দুআ করতে আরম্ভ করেন। আর তার অভ্যাস ছিল, যখন দুআ করতেন, তিন বার দুআ করতেন। আবার যদি কোন কিছু চাইতেন, তিন বার চাইতেন। রাসূল বললেন, 'হে আল্লাহ! তুমি কুরাইশদের শাস্তি দাও।' তিনবার বলেন। যখন তারা রাসূল এর বদ দুআর আওয়াজ শুনতে পেল, তাদের হাসি বন্ধ হয়ে গেল। এবং তারা তার দুআকে ভয় করতে আরম্ভ করে। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নাম ধরে ধরে বদ দুআ করে বললেন, 'হে আল্লাহ তুমি আবু জাহেল ইবনে হিশামকে ধ্বংস কর, উতবা বিন রাবিয়াকে ধ্বংস কর, শাইবা বিন রাবিয়া, ওয়ালিদ বিন উতবা, উমাইয়া বিন খালফ, উকবা বিন আবি মুয়িতকে ধবংস কর।' এভাবে তিনি সাত জন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন আমি সপ্তম ব্যক্তির নাম ভুলে যাই। আল্লাহর কসম করে বলছি, যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্যের পয়গাম নিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করেন, তিনি যাদের নাম নেন, তাদের সবাইকে বদর যুদ্ধের দিন দিন অধঃমুখে হয়ে পড়ে থাকতে দেখি। তারপর তাদের বদর গর্তে নিক্ষেপ করা হল।'
ষষ্ঠ দৃষ্টান্ত: মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সবচেয়ে কঠিন যে আচরণ করে তার বর্ণনা
সহীহ আল-বুখারীতে উরওয়াহ বিন যুবায়ের হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আসকে বলি, মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সবচেয়ে খারাপ যে আচরণ করেছে আপনি আমাকে তার বিবরণ দিন। তিনি বলেন, 'একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহর পাশে নামাজ আদায় করতে ছিলেন এ অবস্থায় উকবা বিন আবি মুয়াইত এসে রাসুলের গলা চেপে ধরে এবং তার শরীরের কাপড়কে তার গলায় পেঁছিয়ে দেয়, তারপর সে খুব জোরে গলা চাপা দিলো, আবু বকর রা. এসে তার গলাও চেপে ধরলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দিলেন এবং বললেন,
أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَبِّكُمْ
'তোমরা এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করবে যে বলে, আমার প্রতিপালক আল্লাহ! এবং তিনি তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রমাণসমূহ নিয়ে এসেছেন?'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীদের উপর মুশরিকদের নির্যাতনের আর কোন অন্ত রইল না। তাদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে অনেকেই সাহায্য চাইলেন এবং আল্লাহর কাছে দুআ প্রার্থনা করতে এবং তাঁর সাহায্য কামনা করতে বলেন।
তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সাহায্য লাভে প্রত্যয়ী ছিলেন এবং আল্লাহর মদদ তার পক্ষেই হবে এ বিশ্বাস তার পুরোপুরি ছিল। কারণ, তিনি জানতেন শেষ শুভপরিণতি একমাত্র মুত্তাকীদের পক্ষেই হয়ে থাকে এবং তারাই পরিশেষে সফলকাম হয়। খাব্বাব ইবনুল আরত রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি চাদরকে বালিশ বানিয়ে কাবা শরীফের ছায়ায় শুয়ে আছেন এ অবস্থায় তার নিকট গিয়ে অভিযোগের স্বরে আমরা বললাম, 'মুশরিকদের নির্যাতনে আমরা অসহায় হয়ে পড়ছি, আপনি কি আমাদের জন্য বিজয় প্রার্থনা করবেন না? আমাদের জন্য দুআ করবেন না?' উত্তরে তিনি বলেন, 'তোমাদের পূর্বের লোকদের নির্যাতনের অবস্থা ছিল তাদের কোন এক লোককে ধরে আনা হতো এবং মাটিতে তার জন্য কূপ খনন করে তাকে এ কূপে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হতো। অথবা একটি কাঠ কাটার করাত দিয়ে মাথার উপর হতে নীচ পর্যন্ত কেটে দুই টুকরা করা হত এবং তাদের শরীরকে লোহার চিরুনি দ্বারা চিরুনি করা হতো। শরীরের হাড় ও রগ হতে গোস্তকে আলাদা করে ফেলতো, তারপরও তাদের আল্লাহর ধর্ম থেকে বিন্দু পরিমাণও দূরে সরানো যেত না। আল্লাহর কসম করে বলছি, আল্লাহ তার দীনকে পরিপূর্ণতা দান করবেন। ফলে এমন একটি সময় আসবে যখন একজন লোক 'সানাআ' হতে 'হাদ্রামাউত' পর্যন্ত এমন নিরাপদে ভ্রমণ করবে যে, সে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। ছাগলের জন্য বাঘকে হুমকি মনে করবে না। কিন্তু তোমরা অতি তাড়াতাড়ি চাচ্ছো।'
মোট কথা, مسلمانوں এবং বিশেষ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর তারা বিরামহীন নির্যাতন চালাতো এবং তাদের সর্ব প্রকার কষ্ট, যন্ত্রনা, مسلمانوں সহ্য করতে হতো। কারণ, তাদের একমাত্র অপরাধ, তারা আল্লাহর দীনকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছে। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করেছে। হক ও সত্যের উপর অটল ও অবিচল থেকেছে। জাহেলিয়‍্যাতকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের কুসংস্কার এবং প্রতিমা পূজাকে বর্জন করেছে। এ ছাড়া তাদের আর কী অপরাধ ছিল?
সপ্তম দৃষ্টান্ত: আবু লাহাবের স্ত্রীর ঘটনা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের পক্ষ হতে কঠিন নির্যাতনের সম্মুখীন হন।
এমনকি তাকে এবং তার আনীত দীনকে অপমান করার উদ্দেশ্যে তার নামের মধ্যে পর্যন্ত বিকৃতি আনতে কোন প্রকার কুণ্ঠা বোধ করেনি। তাদের শত্রুতা এবং বিরোধীতা ধর্মীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তা তার ব্যক্তি পর্যায়েও নিয়ে আসে।
কুরাইশরা রাসুলের প্রতি তাদের অযৌক্তিক দুশমনী ও বাড়াবাড়িতে সীমা ছড়িয়ে যায়। যে নাম দ্বারা তার প্রশংসা বুঝায় তা পরিবর্তন করে, তার জন্য একটি বিপরীত নাম রাখে। যার অর্থ প্রকৃত নামের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা 'মুজাম্মাম' বলে তার নামকরণ করে। আর যখন তার নাম আলোচনা করত, বলত 'মুজাম্মাম এ কাজ করেছে এবং মুজাম্মাম এখানে এসেছে।' অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রসিদ্ধ নাম হলো মুহাম্মাদ। মুজাম্মাম বলে কোন নাম তার নেই।
কিন্তু তার পরিণতিতে দেখা গেল, যে উদ্দেশ্যে এসব অপকর্মের আশ্রয় নিল, তা তাদের জন্য হিতে বিপরীত আকার ধারণ করল।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এতে তোমরা আশ্চর্য বোধ কর না যে, আল্লাহ কীভাবে আমার থেকে কুরাইশদের গালি ফিরিয়ে নেন এবং তাদের অভিশাপ দেন। তারা মুজম্মামকে গালি দিত এবং মুজাম্মামকে অভিশাপ করতো আর আমিতো মুজাম্মাম নই, আমি মুহাম্মাদ।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পাঁচটি নাম ছিল' তার একটি নামও মুজাম্মাম ছিল না।
আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল তার সম্পর্কে এবং তার স্বামী সম্পর্কে কুরআনে অবতীর্ণ চিরন্তন বাণীর কথা শুনে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসল, রাসূল তখন কাবা গৃহের পাশে বসা ছিলেন। তার সাথে ছিল আবু বকর রা.। আর আবু লাহাবের স্ত্রীর হাতে এক মুষ্টি পাথর ছিল। সে যখন তাদের নিকটে এসে পৌঁছলো আল্লাহ তার দৃষ্টি শক্তি কেড়ে নিলেন। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আর দেখতে পেল না। শুধু মাত্র আবু বকরকে দেখতে পেল। তার উপর পর চড়াও হয়ে বলল, 'হে আবু বকর তোমার সাথি কোথায়? শুনতে পেলাম সে আমার দুর্নাম করে, শপথ করে বলছি, যদি তাকে পেতাম, আমি তার মুখে এ পাথরগুলো ছুড়ে মারতাম।' মনে রেখো, আমি একজন কবি এবং তার বদনাম করতে আমিও কার্পণ্য করব না। তারপর সে এ কাব্যাংশ আবৃতি করেঃ 'আমি মুজাম্মামের নাফরমানি করি, তার নির্দেশের অমান্য করি এবং তার দীনকে ঘৃণা করি।'
মুশরিকরা রাসূল এবং তার অনুসারীদের কষ্ট দেয়া অব্যাহত রাখল এবং মুসলমানদের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পেতে লাগল তাদের নির্যাতনের মাত্রা এবং মুসলমানদের প্রতি তাদের হিংসা বিদ্বেষ তত প্রকট আকার ধারণ করল। তারা তাদের প্রতি বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি এবং বদনাম রটাতে অপচেষ্টা চালাত।
তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুসলমানদের দুরাবস্থা দেখতে পান এবং তিনি নিজেই একমাত্র আল্লাহর হেফাজতে বেচে আছেন এবং চাচা আবু তালেব তাকে সহযোগিতা করলেও সে মুসলমানদের কোন উপকার করতে পারছে না তাদের উপর যে ধরণের নির্যাতন চলছে তা সে কোন ভাবেই ঠেকাতে পারে না। এভাবে মুসলমানদের দিনকাল অতিবাহিত হচ্ছিল, এরই মধ্যে অনেকে মারা যেত আবার কেউ কেউ অন্ধ হয়ে যেত আবার কেউ অর্ধাঙ্গ আবার কেউ বিকলাঙ্গ হয়ে যেত।
বাধ্য হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথীদের আবিসিনিয়ায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার অনুমতি দেন। ফলে উসমান বিন আফ্ফানের নেতৃত্বে বার জন পুরুষ এবং চার জন মহিলা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তারা সাগর তীরে পৌছলে আল্লাহ তাদের জন্য দুটি নৌকার ব্যবস্থা করেন। তা দ্বার তারা তাদের গন্তব্য আবিসিনিয়ায় পৌছতে সক্ষম হন। তখন নবুওয়তের পঞ্চম বছরের রজব মাস।
এদিকে কুরাইশরা তাদের সন্ধানে ঘর থেকে বের হলো এবং সাগরের তীর পর্যন্ত গিয়ে উপস্থিত হলো। কিন্তু তাদেরই দুর্ভাগ্য সেখানে গিয়ে তারা কাউকে পায়নি। তারপর তারা সেখান থেকে ক্রুদ্ধ হয়ে মক্কায় ফিরে আসে।
পরবর্তীতে আবিসিনিয়ায় একটি মিথ্যা সংবাদ পৌছলো যে, কুরাইশরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের অনেকেই মুসলমান হয়ে গেছে। তাই তারা পুনরায় মক্কায় ফিরে আসেন।
কিন্তু তারা মক্কায় ফিরে এসে যখন জানতে পারেন এ খবরটা ছিল মিথ্যা-অপপ্রচার এবং এও জানতে পারেন, মুশরিকরা পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন মুসলমানদের আরো বেশি কষ্ট দেয়। তাই তাদের কেউ কেউ অন্যের আশ্রয় নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন আবার কেউ গোপনে মক্কায় প্রবেশ করেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসুদ রা. আশ্রয় প্রার্থনা করে মক্কায় প্রবেশ করেন।
এ ঘটনার পর হতে মুসলমানদের উপর নির্যাতন আরো বেড়ে যায় এবং আরো কঠিন অত্যাচারের সম্মুখীন হন।
তাদের জুলুম নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয়বার তাদের আবিসিনিয়ায় হিজরত করার অনুমতি দেন। দ্বিতীয়বার যারা হিজরত করেন তাদের সংখ্যা হল আশি জন। তাদের মধ্যে ছিলেন আম্মার বিন ইয়াসার এবং নয়জন মহিলা। তারা সে দেশে নাজ্জাশী বাদশার আশীর্বাদে নিরাপদে বসবাস করতে থাকলেন। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতে কুরাইশরা যখন জানতে পারল তখন তারা বিভিন্ন প্রকার উপঢৌকন নিয়ে নাজ্জাশী বাদশার নিকট দূত প্রেরণ করে। যেন সে আশ্রিত মুসলমানদের তার দেশ থেকে বের করে দেয় ও আবার মুশরিকদের নিকট ফেরত পাঠায়।'
অষ্টম দৃষ্টান্ত: উপত্যকায় রাসূলের বন্দি জীবন
যখন কুরাইশরা ইসলামের প্রচার প্রসার, ব্যাপকভাবে মানুষের ইসলাম গ্রহণ, ইথিওপিয়ায় মুহাজিরদের সম্মান ও নিরাপদ আশ্রয় ও কুরাইশ প্রতিনিধি দল নিরাশ হয়ে ফিরে আসার ব্যাপারগুলো অবলোকন করল, তখন ইসলামের অনুসারীদের প্রতি তাদের ক্রোধ বেড়ে গেল এবং তারা বনী হাশেম, বনী আব্দুল মুত্তালিব ও বনী আবদে মানাফের বিরুদ্ধে পরস্পর চুক্তি সম্পাদন করতে একত্র হল। তারা তাদের সাথে লেনদেন করবে না। পরস্পর বিবাহ শাদী করবে না। কথা বার্তা বলবে না ও উঠা বসা করবে না। যাকে বলা যায় অবরোধ বা বয়কট। এ অবরোধ চলতে থাকবে যতক্ষণ না তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের হাতে সমর্পণ করবে। অতঃপর একটি চুক্তিনামা লিখে কাবার ছাদে ঝুলিয়ে দিল।
ফলে আবু লাহাব ব্যতীত বনী হাশেম ও বনী আব্দুল মুত্তালিবের কাফের মুসলিম সকলে এক পক্ষ অবলম্বন করল। তারা মুসলিমদের সাথে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল। আবু লাহাব এদের গোত্রভুক্ত হওয়া সত্বেও সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বনী হাশেম ও বনী আব্দুল মুত্তালিবের বিরুদ্ধে কুরাইশদের সমর্থক থেকে গেল। নবুওয়তের সপ্তম বছরে মুহাররম মাসের শুরুর দিকের কোন এক রাত্রিতে আবু তালেব ঘাঁটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবরুদ্ধ করা হল। তারা সেখানে আবদ্ধ সংকীর্ণতা ও খাদ্য সমাগ্রীর অভাব এবং বিচ্ছিন্নাবস্থায় তিন বছর যাবৎ অবরোধের দিনগুলো অতিবাহিত করলেন। এমনি হয়েছিল যে, ঘাটির আড়াল থেকে ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের কান্নাকাটির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চুক্তিপত্রের সম্পর্কে অবহিত করলেন যে, একটি উই পোকা পাঠিয়ে জোর, জুলুম, আত্মীয়তা ছিন্নের চুক্তির সব লেখা খাইয়ে দিয়েছেন। শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার নামটি অবশিষ্ট আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে সকলকে সংবাদ দিলেন। ফলে একজন কুরাইশদের কাছে গেল এবং সংবাদ দিল যে, মুহাম্মাদ চুক্তিপত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা বলছে। যদি সে এতে মিথ্যাবাদী হয় তাহলে আমরা তাকে তোমাদের হাতে দিয়ে দেব। আর যদি সত্যবাদী হয় তাহলে তোমাদের এই অবরোধ ও বয়কট থেকে ফিরে আসতে হবে। তারা বলল, 'তুমি ঠিকই বলেছ।' অতঃপর তারা কাগজের টুকরাটি নামিয়ে আনল। যখন তারা এই বিষয়টি রাসূলের কথামত দেখতে পেল তখন তাদের কুফরী আরো বেড়ে গেল। নবুয়তের দশম বছরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথীরা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে থেকে বের হয়ে আসলেন। এর ছয় মাস পর আবু তালেব মৃত্যুবরণ করল। তার মৃত্যুর তিন দিন পর খাদিজা রা. ইন্তেকাল করেন।' কেউ কেউ অন্য মতও প্রকাশ করেছেন। বয়কট ও অবরোধ অবসানের পর অল্প দিনের ব্যবধানে আবু তালেব ও খাদিজার ইন্তেকাল হয়ে গেল। ফলে রাসূলের উপর তার সম্প্রদায়ের নির্বোধরা দুঃসাহসিকতার সাথে, প্রকাশ্যে, আরো বেশি উৎপীড়ন-নিপীড়ন করতে থাকল। যার কারণে তার দুঃচিন্তা বেড়ে গেল এবং তাদের থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন। এবং তিনি তায়েফে চলে গেলেন এ আশায় যে, তায়েফবাসীরা তার ডাকে সাড়া দেবে। তাকে আশ্রয় দেবে। তাকে তার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য করবে। সেখানেও কেউ তাকে আশ্রয় দেয়নি, কেউ সাহায্য করেনি। এবং তারা তাকে আরো বেশি কষ্ট দিয়েছে এবং তার সম্প্রদায়ে চেয়ে বেশি অত্যাচার করেছে।'
নবম দৃষ্টান্ত: তায়েফ বাসীর সাথে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
নবুয়তের দশম বছরে শাওয়াল মাসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ বাসীর উদ্দেশ্যে বের হলেন। তার ধারণা ছিল যে, তিনি সকীফ গোত্রে তার দাওয়াতের প্রতি সাড়া ও সাহায্য পাবেন। তার সাথে ছিল আজাদ কৃত গোলাম যায়েদ বিন হারেসা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথিমধ্যে যে গোত্রের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতেন তাদের ইসলামের দাওয়াত দেন। তবে তাদের কেউ তার ডাকে সাড়া দেয়নি।
যখন তিনি তায়েফে পৌঁছলেন তখন সেখানকার নেতাদের নিয়ে বসলেন এবং ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তার দাওয়াতে তারা কোন ভাল উত্তর দেয়নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে দশদিন অবস্থান করেন। এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় লোকদের কাছে গিয়ে ইসলামের কথা বলেন। তাতে ও ভাল কোন সাড়া পাননি। বরং তারা বলল, 'তুমি আমাদের দেশ থেকে বের হও! আমরা তোমার দাওয়াত গ্রহণ করতে পারলাম না।' তারা তাদের নির্বোধ ও বাচ্চাদেরকে তার প্রতি ক্ষেপিয়ে তার পিছনে লেলিয়ে দিল। অতঃপর যখন তিনি বের হতে ইচ্ছা করলেন তখন নির্বোধরা তার পিছু ধরল। তারা দু সারি হয়ে তাকে পাথর নিক্ষেপ করল। অকথ্য ভাষায় গালাগালি করল এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পাথর নিক্ষেপ করে তার জুতাদ্বয় রক্তে রঞ্জিত করে দিল। আর যায়েদ বিন হারেসা নিজেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রক্ষা করতে ছিলেন। যার কারণে তার মাথা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ থেকে দুশ্চিন্তা ও ভগ্ন হৃদয় নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। মক্কায় আসার পথে আল্লাহ তাআলা পাহাড়-পর্বতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাসহ জিবরীলকে পাঠান। সে তার কাছে অনুমতি চাচ্ছিল যে, দুটি পাহাড় যা তায়েফ ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত তা মক্কাবাসীর উপর নিক্ষেপ করতে।' আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছে কি উহুদ যুদ্ধের দিন অপেক্ষা আরো কোন ভয়ানক দিন এসেছে?' তিনি বললেন যে, আমি তোমার সম্প্রদায় থেকে যে কষ্ট পাওয়ার তাতো পেয়েছি। তবে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি আকাবার দিন। যখন আমি ইবনে আবদে ইয়ালীল বিন আবদে কিলালের কাছে দাওয়াত পেশ করলাম তারা আমার আহ্বানে সাড়া না দেয়ায় আমি চিন্তিত বেহুশ অবস্থায় চলে এলাম। 'কারনুস শাআলব' নামক স্থানে এসে সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে মাথা উত্তোলন করি তখন আমি একটি খন্ডমেঘ দেখতে পাই, যা আমাকে ছায়া দিচ্ছে। মেঘের দিকে তাকালে জিবরীলকে দেখি। অতঃপর সে আমাকে ডেকে বলল, 'আল্লাহ তাআলা আপনার সম্প্রদায়ের কথা ও তাদের উত্তর শুনেছেন।'
তিনি আপনার নিকট পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়েজিত ফেরেস্তাকে পাঠিয়েছেন। আপনি তাদের ব্যাপারে যে শান্তি চান তাকে নির্দেশ করতে পারেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তা আমাকে আওয়াজ দিল এবং আমাকে সালাম দিল। অতঃপর বলল, 'হে মুহাম্মাদ! আপনার জাতি আপনাকে যা বলেছে আল্লাহ তাআলা তা শুনেছেন। আর আমিতো পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়েজিত ফেরেস্তা। আমার প্রভু আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। তাদের ব্যাপারে আপনার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য। যদি আপনি চান তাহলে দু পর্বতের মাঝে তাদেরকে মিশিয়ে দেব।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'বরং আমি চাই যে, আল্লাহ তাআলা তাদের পরবর্তী বংশধর থেকে এমন প্রজন্ম বের করবেন যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে যার কোন শরীক নাই। এবং তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এ উত্তরের মধ্যে তার অনন্য ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে। এবং তার যে মহান চরিত্র ছিল, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাকে সাহায্য করেছিলেন, তাও প্রকাশ পেয়েছে।
এর মাধ্যমে তার জাতির প্রতি তার দয়া, ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। আর এটাই আল্লাহ তাআলার এ বাণীর সাথে মিলে যায়:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهَ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ( سورة آل عمران (١٥٩) 'অতএব আল্লাহর অনুগ্রহ এই যে, তুমি তাদের প্রতি কোমল চিত্ত হয়ে গেছ। আর তুমি যদি কর্কশভাষী, কঠোর হৃদয় হতে, তবে নিশ্চয়ই তারা তোমার সংস্পর্শ হতে ফিরে যেত।'
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ﴿سورة الأنبياء ١٠٧﴾ 'আমি তো তোমাকে সৃষ্টিকুলের প্রতি শুধু রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি।'
আল্লাহ তাআলার অগণিত সালাত ও সালাম তার উপর বর্ষিত হউক।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'নাখলা' নামক স্থানে বেশ কয়েকদিন অবস্থান করলেন। এবং মক্কায় ফিরে আসতে সংকল্প করলেন। ইসলাম ও আল্লাহর শ্বাশত রেসালাত পেশ করার ব্যাপারে তার প্রথম পরিকল্পনা নতুন করে আরম্ভ করার ইচ্ছা করলেন নতুন উদ্যমে। তখনই যায়েদ বিন হারেসা রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, 'তাদের কাছে নতুন করে কিভাবে যাবেন? তারা তো আপনাকে বের করে দিয়েছে।' যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে যায়েদ! তুমি যা দেখতে পাচ্ছো, আল্লাহ তাআলা এর থেকে বের হওয়ার কোন রাস্তা দেখিয়ে দিবেন। আল্লাহ তার দীনের সাহায্য করবেন ও তার নবীকে বিজয় দান করবেন। এরপর চলতে চলতে মক্কায় পৌঁছলেন। একজনকে 'খুজাআ' গোত্রের মুতয়েম বিন আদীর নিকট তার আশ্রয় প্রার্থনা করে পাঠালেন। মুতয়েম সাড়া দিলেন। তার সন্তান ও গোত্রের লোকদেরকে ডেকে বললেন, তোমরা যুদ্ধাস্ত্র ধর এবং কাবা ঘরের কোণায় অবস্থান গ্রহণ কর। কেননা, আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশ্রয় দিয়েছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়েদ বিন হারেসা রা. কে সাথে নিয়ে প্রবেশ করে কাবা ঘরে গিয়ে যাত্রা শেষ করলেন। মুতয়েম বিন আদী তার সওয়ারীর উপর দাঁড়িয়ে ডাক দিয়ে বললেন, 'হে কুরাইশ গোত্র! আমি মুহাম্মাদকে আশ্রয় দিয়েছি। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ তার সাথে বিদ্রুপ করবে না।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকনে ইয়ামানির কাছে গেলেন তা স্পর্শ করলেন। এবং দু রাকাত নামায আদায় করলেন। এরপর নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন। মুতয়েম বিন আদী ও তার সন্তানেরা তার বাড়িতে প্রবেশ করা পর্যন্ত তাকে অস্ত্র দ্বারা পরিবেষ্টন করে রেখেছিলো।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে এই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন তায়েফ সফরে, এটা তার দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অদম্য ইচ্ছার স্পষ্ট প্রমাণ। এবং মানুষেরা তার দাওয়াতে সাড়া না দেয়ায় তিনি আশাহত হননি। যখন প্রথম প্রান্তরে কোন বাধা এসে উপস্থিত হয়েছে, তখন দাওয়াতের নতুন প্রান্তর খুঁজেছেন।
এর মধ্যে এ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রজ্ঞার শিক্ষক ছিলেন। আর এটা এ কারণে যে, তিনি যখন তায়েফ আসলেন তখন সমস্ত দলপতি ও তায়েফের সাকীফ গোত্রের প্রধানকে দাওয়াতের জন্য বাছাই করলেন। আর এটা তো জানা কথাই, তারা দাওয়াত গ্রহণ করলে সমস্ত তায়েফবাসীর দাওয়াত গ্রহণ করবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দুই পা থেকে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার মধ্যে একথার সব চেয়ে বড় প্রমাণ যে, আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াতের কাজে কতবড় কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করেছেন তিনি।
নিজের জাতি ও তায়েফবাসীর উপর তার বদ-দুআ না করা, আর পর্বতসমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তার পক্ষ থেকে তাদেরকে দুই পাহাড়ের মধ্যে ধবংস করার প্রস্তাবে সম্মতি না দেয়ার মধ্যে আরো বড় উদাহরণ যে, দায়ীর দাওয়াত গ্রহণ না করলে তাকে কত পরিমাণ ধৈয ধারণ করতে হয়। এবং তাদের হেদায়েত না পাওয়ার কারণে নিরাশ হওয়া যাবে না। হতে পারে আল্লাহ পরবর্তীতে তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন কাউকে বের করবেন, যে এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তার সাথে কাউকে শরীক করবে না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কৌশলের মধ্য থেকে ছিল, মুতয়েম বিন আদির আশ্রয় গ্রহণ করার পূর্বে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেননি। আর এভাবেই দায়ীর উচিত এমন কাউকে তালাশ করা যে তাকে শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করবে, যাতে সে চাহিদা অনুযায়ী দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে পারে।'
দশম উদাহরণঃ ব্যবসায়ী ও মওসুমী লোকদের কাছে তার দাওয়াত উপস্থাপন-
নবুওতের দশম বর্ষে জিলকদ মাসে তায়েফ থেকে মক্কায় ফেরার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াতের কাজ শুরু করলেন। তিনি সেখানকার মওসুমী বাজারগুলোতে যেতে আরম্ভ করলেন। যেমন, উকাজ, মাজান্নাহ, জিল-মাজাজ ইত্যাদি যে সমস্ত বাজারে আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা উপস্থিত হতো ব্যবসার উদ্দেশ্যে, কবিতা পাঠের আসরে যোগ দেয়ার জন্য। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সমস্ত গোত্রের নিকট নিজেকে উপস্থাপন করলেন আল্লাহর দিকে তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে। একই বছর হজের মওসুম আসল তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের প্রতিটি গোত্রের নিকট গেলেন। তাদের নিকট ইসলাম উপস্থাপন করলেন, যেমন তিনি তাদেরকে নবুওতের চতুর্থ বর্ষ থেকে দাওয়াত দিতেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু বিভিন্ন গোত্রের কাছে ইসলাম পেশ করে ক্ষ্যান্ত থাকেননি, বরং ব্যক্তির কাছেও ইসলামের দাওয়াত পেশ করেছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমস্ত মানুষদেরকে উৎসাহ দিতেন সফলতার দিকে।
আব্দুর রহমান বিন আবিজ যানাদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি আমাকে সংবাদ দিল, যে রবিয়াহ বিন আব্বাদ বলে পরিচিত। সে বনি দাইল গোত্রের এবং জাহেলী যুগের লোক ছিলো। সে বলল, আমি জাহেলী যুগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিল মাজাজ বাজারে দেখলাম। তিনি বলছেন, 'হে মানব সকল! তোমরা বল, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই, তা হলে তোমরা সফলকাম হবে।' এ অবস্থায় লোকেরা তার পাশে জড়ো হয়ে আছে। এবং তার পিছনে প্রশস্ত চেহারার এক ব্যক্তি দাড়িয়ে আছে। সে বড় বড় ব্যাকা চোখের অধিকারী। সে বলছে, 'এই মুহাম্মদ নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছে, সে মিথ্যাবাদী।' যেখানইে তিনি যাচ্ছেন, এ লোকটি তার পিছনে পিছনে যাচ্ছে। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম। তারা আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বংশ পরিচয় উল্লেখ করল এবং বলল, 'সাথের এ লোকটি তার চাচা আবু লাহাব।'
অন্যান্য আরবের মত আউস এবং খাজরাজ গোত্রের লোকেরাও হজ করত। কিন্তু ইহুদীরা হজ করত না। যখন আনছাররা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অবস্থা এবং দাওয়াতকে দেখল তখন বুঝতে পারল যে, ইনিই সেই লোক যার সম্পর্কে ইহুদীরা তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তাই তারা ইহুদীদের আগে ঈমান আনতে চাইল। কিন্তু তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাতে এ বছর বাইয়াত গ্রহণ করল না। মদীনায় ফিরে গেল।
নবুওতের একাদশ বর্ষে হজের মওসুমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন গোত্রের নিকট উপস্থিত হলেন। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাদের নিকট উপস্থিত হচ্ছিলেন, সে সময় মিনার গিরিপথে ইয়াসরেবের ছয় যুবককে পেলেন। তাদের নিকট ইসলাম পেশ করলেন। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত কবুল করলেন। তারা ইসলামের দীক্ষা নিয়ে তাদের জাতির নিকট ফিরে গেলেন।'
অতঃপর বছর ঘুরে নতুন বছর আসল। নবুওতের দ্বাদশ বর্ষে লোকেরা হজে করতে আসল। ইয়াসরেবের হাজীদের মধ্য থেকে বারজন আসল। এদের মধ্যে গত বছরের ছয়জনের পাঁচজনও ছিল। অঙ্গীকার অনুযায়ী মিনার গিরিপথে তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে মিলিত হল ও ইসলাম গ্রহণ করল। এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করল। যা ইতিহাসে বাইয়াতুন নিসা নামে পরিচিত।
উবাদাহ বিন ছামেত রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাহদের একটি দল পরিবেষ্টিত অবস্থায় বললেন, 'আস! তোমরা আমার নিকট বাইয়াত গ্রহণ কর। শপথ কর এ কথার উপর যে, তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে শরীক করবে না। চুরি করবে না। ব্যভিচারে লিপ্ত হবে না। তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। তোমাদের নিজের কৃত অপরাধকে অন্যের উপর অপবাদ হিসেবে চাপিয়ে দেবে না। কোন ন্যায় কাজে আমার অবাধ্য হবে না। যে এ অঙ্গীকারগুলো পরিপূর্ণরূপে পালন করবে তার প্রতিদান আল্লাহর দায়িত্বে। আর যে ব্যক্তি এর মধ্য থেকে কোন কাজ করে ফেলবে, অতঃপর পৃথিবীতে তাকে শাস্তি দেয়া হলে তা তার জন্য কাফ্ফারা হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি এর মধ্য থেকে কোন কাজ করে, অতঃপর আল্লাহ গোপন রাখেন, তাহলে তার বিষয়টি আল্লাহর নিকট অর্পিত। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন অথবা মাফ করে দিতে পারেন।' এই কথাগুলোর উপর আমরা তার নিকট বাইয়াত (শপথ) গ্রহণ করলাম।'
যখন বাইয়াতের কাজ সম্পন্ন হল, এবং হজ মওসুম শেষ হল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে মুছআব বিন উমায়ের রা. কে পাঠালেন মুসলমানদেরকে ইসলামী শরীয়ত শিক্ষা ও ইসলাম প্রচারের কাজ করার জন্য। তিনি তার দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালন করলেন। নবুওতের ত্রয়োদশ বর্ষে হজের মওসুমে হজ পালনের জন্য ইয়াসরেব থেকে তিয়াত্তর জন পুরুষ এবং দুইজন মহিলা উপস্থত হলেন এবং তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করলেন।
যখন তারা মক্কায় আসল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকাবায় তাদের সাথে বৈঠকের ব্যবস্থা করলে তারা সময়মত সেখানে উপস্থিত হল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে কথা বললেন। অতপর তারা বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনার নিকট কি বিষয়ের উপর বাইয়াত গ্রহণ করব? তিনি বললেন, 'তোমরা আমার নিকট বাইয়াত করবে সুখ ও দুঃখ সর্বাস্থায় আমার আনুগত্য করবে এবং আমার কথা শুনবে। সুখে দুঃখে খরচ করবে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে। এক আল্লাহর কথা বলবে। এ বিষয়ে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারের ভয় করবে না। এবং আমাকে সাহায্য করবে। আমার কাছ থেকে বাধা দেবে ঐ সমস্ত জিনিস যা তোমরা তোমাদের নিজের থেকে ও স্ত্রীদের থেকে এবং সন্তানদের থেকে বাধা দিয়ে থাক। তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।' তারা সবাই উঠে রাসুলের কাছাকাছি গেল এবং তার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করল।
আর এই বাইয়াত অনুষ্ঠিত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জন্য বারজন নেতা ঠিক করে দিলেন, যারা তাদের গোত্র প্রধান হবেন। নয়জন ছিল খাজরাজ গোত্রের এবং তিনজন ছিল আওস গোত্রের। অতঃপর তারা ইয়াসরেবে ফিরে গেল। এবং সেখানে পৌঁছার পর তারা ইসলাম প্রকাশ করল। আল্লাহর প্রতি দাওয়াতে তাদের দ্বারা অনেক খেদমত হল।'
দ্বিতীয় আকাবার বাইয়াতের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের জন্য একটি আবাসভূমি প্রতিষ্ঠায় সফল হলেন। সংবাদটি অধিকহারে মক্কায় প্রচার হল এবং কুরায়েশদের নিকট এ কথা প্রমাণ হল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইয়াসরেববাসীদের নিকট থেকে বাইয়াত গ্রহণ করেছেন। এতে মক্কায় যারা মুসলমান হয়েছিল তাদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেল। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিলেন। মুসলমানরা হিজরত করল। কুরাইশরা বৈঠকে বসল। তখন নবুওয়তের চতুর্দশ বর্ষে ২৬শে ছফর তারিখ। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করার বিষয়ে একমত হল। এ সংবাদ অহীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দিলেন। তার সুন্দর কৌশল ছিল। তিনি আলী রা. কে নির্দেশ দিলেন, সে যেন আজ রাতে তার বিছানায় ঘুমায়। মুশরিকরা দরজার ফাক দিয়ে আলী রা. কে দেখে মুহাম্মাদ ভেবে অপেক্ষা করতে থকল। এ অবস্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বের হয়ে গেলেন এবং আবু বকরকে সাথে নিয়ে মদীনায় হিজরত করলেন।
আর এই মহান অবস্থান যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গ্রহণ করেছিলেন, স্পষ্ট প্রমাণ যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কৌশল বা হিকমত অবলম্বন করেছেন, এবং তিনি ধৈর্য্য ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আর তিনি যখন জানতে পারলেন যে, কুরাইশরা সীমালংঘন করেছে ও দাওয়াতকে অস্বীকার করেছে তখন এমন একটি স্থান তালাশ করেছেন, যাকে ইসলামী দাওয়াতের ঘাটি বানাবেন। তিনি শুধু এ পরিকল্পনা করেই ক্ষ্যান্ত হননি, বরং তাদের নিকট থেকে ইসলামকে সাহায্য করার ব্যাপারে বাইয়াত ও অঙ্গীকার নিয়েছেন। এ কাজটি সম্পন্ন হয়েছে দুটি সম্মেলনের মাধ্যমে প্রথম আকাবার বাইয়াত, অতঃপর দ্বিতীয় আকাবার বাইয়াত। তিনি একটি স্থানকে দাওয়াতের ঘাটি বানাবেন বলে খুঁজছিলেন যখন তা পেয়ে গেলেন এবং দাওয়াতের সাহায্যকারীও পেয়ে গেলেন। তিনি তার সাথীদেরকে হিজরতের অনুমতি দিলেন। যখন তার বিরুদ্ধে কুরায়েশরা চক্রান্ত করল তখন তিনি কৌশল অবলম্বন করলেন।। আর এ কাজটিকে কাপুরুষতা ধরা হয় না, বা মৃত্যু থেকে পলায়নও বলা যায় না। হ্যাঁ আল্লাহর উপর ভরসা করে উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা যায়। আর এই প্রজ্ঞাপূর্ণ কুটনীতিই হল দাওয়াতের সফলতার কারণ। আল্লাহর দিকে আহবানকারীদের এমনই হওয়া উচিত, কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন তাদের আদার্শ ও নেতা।'
একাদশ উদাহরণঃ তার মুখমন্ডল ক্ষতবিক্ষত হল এবং দানদান মুবারক শহীদ হল
সাহল বিন সাআদ রা. থেকে বর্ণিত, তাকে প্রশ্ন করা হল, উহুদ দিবসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আহত হওয়া সম্পর্কে। তিনি বললেন, 'তার মুখমন্ডল আহত হল, এবং তার দাঁতগুলো ভেঙ্গে গেল। বর্মের ভাঙ্গা অংশ তার মাথায় প্রবেশ করল। ফাতেমা রা. রক্ত পরিস্কার করছিলেন, এবং আলী রা. রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছিলেন। যখন দেখলেন রক্ত বন্ধ না হয়ে আরো বেশি পরিমাণে বের হচ্ছে তখন ফাতেমা চাটাইতে আগুন ধরিয়ে দিলেন, পুড়ে ছাই হয়ে গেল। অতঃপর তা ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন, তখনই রক্ত বন্ধ হয়ে গেল।'
আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কঠিন কষ্ট বরদাশত করছিলেন। যার মহত্বের কাছে পাহাড়ও কেঁপে উঠে। তিনি এমন এক নবী, যিনি এ অবস্থায়ও তার জাতির বিরুদ্ধে বদ-দুআ করেননি। বরং তাদের জন্য ক্ষমার দু'আ করেছেন। কেননা তারা বুঝে না।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এখনো মনে হয় আমি রাসুলের দিকে চেয়ে আছি আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য কোন নবীর ঘটনা বর্ণনা করছেন যাকে তার জাতি মেরেছে। এ অবস্থায় তিনি চোখ থেকে পানি মুছছিলেন। এবং বলছিলেন, 'হে আল্লাহ! আমার জাতিকে মাফ করে দিন তারা বুঝে না।'
সমস্ত নবীগণ এবং তাদের মধ্যে সবার উপরে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্য ও সহনশীলতা, ক্ষমা, ও দয়ার মূর্ত প্রতীক ছিলেন। তিনি তার জাতির জন্য ক্ষমা ও করণার সকল দ্বার খুলে দিয়েছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর অভিশাপ ঐ জাতির উপর অধিক হারে পতিত হয়, যে জাতি তাদের রাসুলের সাথে এ আচরণ করে। এ কথা বলার সময় তিনি তার দাঁতের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। আল্লাহ তাআলার ক্রোধ কঠোরতর হল এমন ব্যক্তির উপর, যে আল্লাহর রাসুল এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল।
উহুদ দিবসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আহত হওয়ার মধ্যে দাওয়াত-কর্মীদের জন্য সান্তনা রয়েছে; তারা আল্লাহর রাস্তায় তাদের শরীরে যে কষ্ট বরদাশত করবে, অথবা তাদের স্বাধীনতা হরণ করা হবে অথবা তাদেরকে যে নির্যাতন করা হবে সে সকল বিষয়ে তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রাপ্ত হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন উত্তম আদর্শ। তাকে যখন কষ্ট দেওয়া হয়েছে আর তিনি তাতে ধৈর্য ধারণ করেছেন। তাহলে অন্য দাওয়াত-কর্মীদের তো তা বরদাশত করতেই হবে।'

টিকাঃ
১ সহীহ আল বুখারী: ৪৭৭০, সহীহ মুসলিম: ২০৮ আয়াত: সুরা মাসাদ: ১-২ ২ সহীহ আল বুখারী ৪৭৭১, সহীহ মুসলিম ২০৬
২ 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪১/৩
৩ সহীহ আল - বুখারী ফতহুলবারী সহ ৭ম খন্ড ২১৯ পৃঃ সনদকে হাফেজ ইবনে হাজার হাসান বলেছেন।
৪ তারিখে ইসলাম মাহমুদ শাকেরের ২য় খন্ড ১৪২ পৃঃ পূঃ রহিকুল মাখতুম ১৪৩ পৃঃ ইবনে হিশাম ২য় খন্ড ৩৯ পৃঃ বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩য় খন্ড ১৫৮ পৃঃ ৫ ইবনে হিশام ২য় খন্ড ৯৫ পৃঃ বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩য় খন্ড ১৭৫ পৃঃ জাদুল মায়াদ ৩য় খন্ড ৫৪ পূঃ সিরাতে নববী মুস্তফা সুবায়ী রচিত ৬১ পৃঃ ওয়া হাজাল হাবিব ইয়া মুহিব ১৬৫ প
৫ সহীহ আল - বুখারী ৩৪৭৭ সহীহ মুসলিম ১৭৯২ শরহে নববী ১২খন্ড ১৪৮ পৃঃ

ফন্ট সাইজ
15px
17px