📄 বিনয় ও নম্রতা
নম্রতা একটি মহৎ গুণ, এ কারণেই আল্লাহ তাআলা নম্র লোকদের প্রশংসা করেছেন। এরশাদ হচ্ছেঃ
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا ﴿٦٣﴾ الفرقان "রহমানের বান্দাগণ যখন যমীনের উপর চলে, তখন তারা খুব নম্র হয়ে চলে। আর যখন মুর্খ লোকেরা তাদেরকে সম্বোধন করে, তখন তাদেরকে শান্তির বাণী শুনিয়ে দেয়।"
মুসলমান বিনয়ী হলে, আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে মর্যাদার আসনে উন্নীত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সদকা করলে সম্পদ কমে না, ক্ষমা করলে আল্লাহ তাআলা সম্মান বাড়িয়ে দেন, আর বিনয়ী হলে মর্যাদা উঁচু করে দেন।'
আর এটি একজন মুসলমানের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষের অন্তর প্রশস্ত করে দেয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। নম্র হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলাই দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষের মাঝে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। অপরদিকে যে ব্যক্তি মানুষের উপর অহংকার করে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে তাকে অপদস্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন আবু হুরাইরা রা. ও আবু সায়ীদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অহংকার আল্লাহর পরিচ্ছদ, গর্ব তার চাদর, আল্লাহ বলেন, "যে ব্যক্তি আমার হক নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে, আমি তাকে কঠিন শাস্তি দেব।"
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অধিক মাত্রায় বিনয়ী। তার বিনয়ের কতিপয় দৃষ্টান্ত নিম্নে উল্লেখ করা হল:
(১) আদবা নামক উষ্ট্রীর ঘটনা: আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর 'আদবা' নামে একটি উষ্ট্রী ছিল। তাকে কখনও পরাজিত করা যেত না, একদা কোন এক গ্রাম্য ব্যক্তি তার একটি বাহন এনে সেটিকে পরাজিত করে ফেলল, বিষয়টি মুসলমানদের অনুভূতিকে মারাত্মকভাবে আহত করল, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আল্লাহ কোন বস্তু দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেয়ার পূর্বে সেটিকে নিচু করে দেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই হলেন আমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ। তিনি মানুষকে দাওয়াত দেয়ার সময় নম্রতা অবলম্বন করতেন।
(২) আবু মাসউদ রা. কর্তৃক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিনয়ের বর্ণনা: আবু মাসউদ রা. বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে কথা বলার সময় ভয়ে কাপতেছিল। রাসূল তাকে বললেন, 'তুমি স্বাভাবিক হয়ে কথা বল, কেননা আমি এমন এক মহিলার ছেলে, যে শুকনো গোস্ত টুকরো টুকরো করে খেয়ে জীবন ধারণ করতো।' হাকেম রহ. জরীর রা. এর বর্ণনায় কিছুটা বাড়িয়ে বলেছেন, তাহল, অতঃপর জরীর রা. এই আয়াত পাঠ করেছেন:
وَمَا أَنْتَ عَلَيْهِمْ بِجَبَّارٍ فَذَكِّرْ بِالْقُرْآنِ مَنْ يَخَافُ وَعِيدِ "তুমি তাদের প্রতি জোর-জবরদস্তিকারী নও। যে আমার শাস্তির ভয় করে তাকে তুমি কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও।”
অতএব, সকল মানুষকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ করা অতীব জরুরী। তিনি দাওয়াতী ময়দানে ছিলেন খুবই বিনয়ী। তিনি শিশুদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে তাদেরকে সালাম দিতেন। ছোট্ট বালিকা তার হাত ধরে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারত। তিনি ঘরে থাকা অবস্থায় পরিবারের খেদমত করতেন। ব্যক্তিগত কারণে কারো উপর প্রতিশোধ নিতেন না। জুতা সেলাই করতেন। কাপড়ে তালি লাগাতেন। বকরী দোহন করতেন। উটকে ঘাস খাওয়াতেন। চাকর-বাকরদের সাথে খাবার খেতেন। মিসকীনদের সাথে উঠাবসা করতেন। বিধবা ও এতিমের সাথে তাদের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য হাটতেন। কারো সাথে সাক্ষাৎ হলে প্রথমেই সালাম দিতেন। কেউ দাওয়াত দিলে তা অল্প হলেও গ্রহণ করতেন। মোটকথা তিনি নিজেকে অপদস্ত না করে ছিলেন বিনয়ী। অপচয় না করে ছিলেন দানশীল। ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী, মুমিনদের সামনে আপন বাহুকে ঝুকিয়ে দিতেন।'
(৩) অন্য নবীগণকে নিজের উপর মর্যাদা দেয়া: এক ব্যক্তি তাকে বলল: يَا خَيْرَ الْبَرِيَّةِ (হে সৃষ্টির সেরা), একথা শুনে তিনি বললেন, 'তিনি ছিলেন ইব্রাহীম আ.।" কারো একথা বলা উচিত নয় যে, আমি ইউনুসের চেয়ে উত্তম।" তিনি নবী রাসূলগনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। সকল মানুষের নেতা এতে কোন সন্দেহ নেই। তিনি নিজেই বলেন: أنا سيد الناس يوم القيامة 'কিয়ামত দিবসে আমি হবো মানবজাতির নেতা।' তা সত্ত্বেও তিনি বিনয় প্রদর্শন করতে যেয়ে এ কথাগুলো বলেছেন。
তার বিনয়ী হওয়ার আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো, তার দরজায় কোন দারোয়ান থাকতনা, তিনি রুগ্ন ব্যক্তিদের ঝাড়-ফুঁক করতেন, তাদের আরোগ্যের জন্যে দুআ করতেন, ছোট শিশুর মাথায় হাত বুলাতেন, তাদের জন্যে দুআ করতেন, তিনি তার সাহাবীদের জন্যে সুপারিশ করতেন, এবং তিনি বলতেন, 'তোমরা সুপারিশ কর, প্রতিদান পাবে, আর আল্লাহ তার নবীর যবানে যা চাইবেন তা-ই ফয়সালা করবেন।'
আনাস রা. কে তিনি আদর ও স্নেহ করে يا بني (হে ছেলে) বলে ডাক দিতেন।'
তার বিনয়ী হওয়ার আরেকটি উদাহরণ হলো: এক মহিলা মসজিদ ঝাড়ু দিত। এক রাতে সে মারা গেলে লোকজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তাকে দাফন করে ফেলল। আল্লাহর রাসূল তার মৃত্যুর কথা শুনতে পেয়ে বললেন, 'আমাকে তার কবর দেখিয়ে দাও' অতঃপর তিনি বললেন, 'নিশ্চয়ই এ সকল কবরসমূহ কবর বাসীর জন্যে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আমার দুআর মাধ্যমে তাদের কবর আলোকিত করে দেন।'
আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, 'আমি একটানা দশ বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে ছিলাম, কখনও তিনি আমার কাজে উহ! শব্দও উচ্চারণ করতেন না। যেটি করে ফেলেছি সেটির ব্যাপারে বলতেন না, 'কেন করেছ?' আর যেটি করিনি সেটির ব্যাপারে বলতেন না, 'কেন করনি?' তিনি ছিলেন মানুষের মাঝে উত্তম চরিত্রের অধিকারী।"
টিকাঃ
১ সূরা আল-ফুরকান: ৬৩ ২ সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮ • শরহে নববী (সহীহ সহীহ মুসলিম এব ব্যাখ্যা গ্রন্থ): ১৬/১৪২ * সহীহ মুসলিম: ২৬২০
২ মাদারিজুস সালেকীন: ২/৩২৮ ৩ সহীহ মুসলিম: ১৩৬৯ * সহীহ আল-বুখারী: ৪৬৩০, সহীহ মুসলিম: ২৩৭৬ * সহীহ আল-বুখারী: ৩৩৪০, সহীহ মুসলিম: ১৯৪ * সহীহ আল-বুখারী: ১২৮৩ * সহীহ আল-বুখারী: ৭২১০ * সহীহ আল-বুখারী: ১৪৩২, সহীহ মুসলিম: ২৬২৭
📄 সহনশীলতা ও ক্ষমা
আল্লাহর পথে আহবান করতে গিয়ে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। নিম্নে কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হলোঃ
এক: যে ব্যক্তি বলেছিল, এ বণ্টনে ইনসাফ করা হয়নি, তার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ:
ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, হুনাইনের যুদ্ধের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু লোককে বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিলেন। আকরা ইবনে হাবেস রা.কে একশত উট, উয়াইনাকেও তদ্রুপ দিলেন। আরবের কিছু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গকেও সেদিন বেশি দেয়া হয়েছিল। তখন এক ব্যক্তি এই বলে মন্তব্য করল যে, 'এ বণ্টনে ইনসাফ করা হয়নি। এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য ছিল না।' আমি মনে মনে বললাম, 'আল্লাহর কসম আমি এ সংবাদটি অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানিয়ে দেব।' আমি সংবাদ দিলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আল্লাহ ও তার রাসূল ইনসাফ না করলে আর কে আছে ইনসাফ করবে? মূসার উপর আল্লাহ দয়া করুন, তাকে এর চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন।' এটি দাওয়াতী ময়দানে ধৈর্য ধারণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিকমত এই ছিল যে, গণীমতের মালসমূহ দুর্বল ঈমানদারদের মাঝে বণ্টন করা, আর মজবুত ঈমানদারদেরকে তাদের ঈমানের উপর সোপর্দ করা।
দুই: যে বলেছিল আমরাই এর বেশি উপযুক্ত, তার ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ:
আবু সায়ীদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, আলী ইবনে আবু তালেব রা. ইয়েমেন থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে চামড়ার থলে ভর্তি কিছু স্বর্ণ পাঠালেন। সেগুলো তিনি চার জনের মাঝে বণ্টন করলেন; উআইনা ইবনে বদর, আকরা ইবনে হাবেস, যায়েদ আল-খাইল,' চতুর্থ জন আলকামা অথবা আমের ইবনে তুফায়েল। এক সাহাবী মন্তব্য করলো, 'আমরা তাদের তুলনায় অধিক হকদার।' কথাটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কানে পৌঁছলে, তিনি বললেন, 'তোমরা কি আমাকে বিশ্বস্ত মনে কর না? আমি আসমান- যমীনের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি। আমার নিকট সকাল-সন্ধ্যায় আসমানের সংবাদ আসে।' তখন এক ব্যক্তি দাঁড়াল, যার চোখ দুটো গর্তে ঢুকানো, গাল দুটো উঁচু, কপালটি বহির্গত, ঘন দাড়িযুক্ত, মাথা মুণ্ডানো, লুঙ্গি উপরে তোলা। সে বলল, 'হে রাসূল! আল্লাহকে ভয় করুন! রাসূল বললেন, 'এই হতভাগা, আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে আমি কি যমীনবাসীর মধ্যে অধিক অগ্রগামী নই।' বর্ণনাকারী বলেন, 'অতঃপর সে ব্যক্তি চলে গেলো, খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তার গর্দান উড়িয়ে দেব না?' তিনি বললেন, 'না, সম্ভবত লোকটি নামাজ পড়ে।' খালেদ রা. বললেন, 'এমন অনেক নামাজী আছে, যারা মনে যা নেই তা মুখে বলে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'মানুষের অন্তর ও পেট ছিঁড়ে দেখার জন্যে আমি আদিষ্ট হইনি।' অতঃপর তিনি লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এই ব্যক্তির বংশ থেকে এমন এক জাতির আবির্ভাব ঘটবে, যারা আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করবে, কিন্তু কুরআন তাদের অন্তরে প্রবেশ করবে না। তারা দীন থেকে বের হয়ে যাবে, তীর যেভাবে ধনুক থেকে বের হয়ে আসে। আমি যদি তাদেরকে পাই, তাহলে আদ জাতির মত তাদের হত্যা করে ফেলব।'
এটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহনশীলতার একটি উত্তম দৃষ্টান্ত। তিনি বাহ্যিক অবস্থা দৃষ্টে বিচার করেছেন, অন্তরে কি আছে তা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেননি। লোকটি হত্যাযোগ্য অপরাধ করেছে, কিন্তু তবুও তাকে হত্যা করেননি। যাতে করে মানুষ এ সমালোচনা করার সুযোগ না পায় যে, মুহাম্মাদ তার সাথিদেরকে হত্যা করে, বিশেষ করে লোকটি যখন নামাযী।
তিন: আমের ইবনে তোফাইল রা. এর সাথে আচরণ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমের ইবনে তোফাইল দাউসী রা. এর সাথে সহনশীলতার যে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন, তা অবিস্মরণীয়। তিনি হিজরতের পূর্বে মক্কা নগরীতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। অতঃপর তিনি আপন জাতির নিকট গিয়ে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। তিনি সর্বপ্রথম তার পরিবারের মধ্যে দাওয়াত শুরু করলেন, ফলে তার বাবা ও স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করলো। অতঃপর তার বংশ ও গোত্রের অন্যান্য লোকজনকে দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন। কিন্তু কেউই ঈমান গ্রহণ করেনি। তোফাইল রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললো, 'হে আল্লাহর রাসূল! দাউস গোত্র ধ্বংস হয়েছে, তারা কুফরী করেছে।'
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তোফাইল ইবনে আমর দাওসী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বললেন, 'দাউস গোত্র অস্বীকার করেছে, সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দুআ করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিবলামুখী হয়ে দু'হাত তুলে দুআ করলেন। লোকজন বলল, 'তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে আল্লাহ! তুমি দাউস গোত্রকে হেদায়েত দান কর এবং তাদেরকে আমার কাছে হাজির করে দাও।'
এ কাজটি দাওয়াতী মিশনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ধৈর্য ও সহনশীলতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত। তিনি দাওয়াত অস্বীকারকারীকে শাস্তি প্রদান কিংবা তাদের বিরুদ্ধে বদ-দুআ করার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করেননি। বরং তাদের হেদায়েতের জন্যে দুআ করেছেন। আল্লাহ তার দুআ কবুল করেছেন এবং তিনি স্বীয় ধৈর্য, সহনশীলতা ও তাড়াহুড়া না করার পূর্ণ প্রতিফল পেয়েছেন। ফলে তোফাইল রা. তার গোত্রের লোকজনের নিকট ফিরে গেলেন। নরম ভাষায় তাদেরকে দাওয়াত দেয়ার ফলে বহু লোক তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করলো। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বর থাকা অবস্থায় তোফাইল তার নিকট আসলেন। পরবর্তীতে দাউস গোত্রের আশি থেকে নব্বইটি পরিবার নিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য মুসলমানদের সাথে তাদের জন্যেও বরাদ্দ করলেন।” আল্লাহু আকবার।
অতএব, দায়ী ভাইদের ধৈর্য ও সহনশীলতার দিকটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা দরকার। আর তা একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ, অতঃপর নবী-আদর্শের পূর্ণ অনুশীলন ব্যতীত সম্ভব নয়।
চার: যে তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল তার সাথে
সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিমে জাবের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা নজদ অভিমুখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে অভিযানে বের হলাম। আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রচুর কাটাযুক্ত বৃক্ষ সম্বলিত উপত্যকায় অবস্থান করলাম। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাছের নীচে অবতরণ করলেন। তিনি তার তলোয়ারটি গাছের কোন এক ডালে ঝুলিয়ে রাখলেন। আমাদের কাফেলার লোকজন উপত্যকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন গাছের নীচে বিশ্রাম গ্রহণ করতে শুরু করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। এক ব্যক্তি এসে আমার তলোয়ার হাতে নিয়ে নেয়। সাথে সাথে আমি জাগ্রত হলাম, উঠে দেখি, সে আমার মাথার উপর কোষমুক্ত তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতঃপর সে বলল, 'কে তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাবে?' আমি বললাম, 'আল্লাহ।' অতঃপর দ্বিতীয়বার সে বলল, 'কে তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাবে?' আমি বললাম, 'আল্লাহ।' একথা শুনে সে তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে ফেললো, এবং বসে পড়লো। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছু বললেন না।
আল্লাহু আকবার, এটি কত বড় মহানুভবতা! এটি অন্তরে কত বড় প্রভাব ফেলে! একজন বেদুইন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে চেয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাকে ঐ ব্যক্তির হাত থেকে বাঁচালেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও ক্ষমা করে দিলেন! নিশ্চয় এটি একটি মহান চরিত্র। আল্লাহ সত্যিই বলেছেন, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন:
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
"আর নিশ্চয় তুমি মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এহেন আচরণ লোকটির জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলল, এবং পরবর্তীতে সে মুসলমান হয়েছে এবং তার মাধ্যমে অনেক মানুষ উপকৃত হয়েছে।
পাঁচ: পাদ্রী যায়েদের সাথে তার আচরণ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিশোধ গ্রহণের শক্তি থাকা সত্ত্বেও মানুষকে ক্ষমা করে দিতেন। রাগের সময় তিনি ধৈর্যধারণ করতেন। দুর্ব্যবহারকারীর সাথে ভাল ব্যবহার করতেন। উল্লেখিত উঁচুমানের চরিত্রগুলোই তার দাওয়াত কবুল করা, তার প্রতি ঈমান আনার বিষয় সুগম করে দিয়েছে। ইহুদীদের একজন বড় আলেম যায়েদ ইবনে সা'নার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আচরণ দেখিয়েছিলেন তা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।'
একদিন যায়েদ ইবনে সা'না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে তার পাওনা তাগাদা দেয়ার জন্য আসলো। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাদর ও জামা ধরে সজোড়ে টান মারলো এবং তার সাথে কঠিন ভাষা প্রয়োগ করলো। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে রূঢ় চেহারায় তাকালো, এবং বললো, 'হে মুহাম্মাদ, আমার পাওনা পরিশোধ কর, তোমরা আব্দুল মুত্তালিবের বংশধর আসলেই টাল-বাহানাকারী গোষ্ঠী।' সাহাবী উমার রা. তার দিকে তাকালেন, তার চোখদুটো ঘূর্ণায়মান নক্ষত্রের মত ঐ ব্যক্তির মাথার উপর ঘুরছে। অতঃপর তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর দুশমন! তুমি রাসূলকে যা বলেছো আমি তা শুনেছি এবং তুমি তার সাথে যা আচরণ করেছো, তা আমি দেখেছি। ঐ সত্বার কসম! যিনি তাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তিনি আমাকে ভর্ৎসনা করবেন এই ভয় না থাকলে আমি তলোয়ার দিয়ে তোমার মাথা আলাদা করে ফেলতাম। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমার রা. এর দিকে স্থিরতার সাথে মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, 'হে উমার! আমি ও সে তোমার নিকট থেকে এমন কথা শুনতে প্রস্তুত ছিলাম না। তুমি বরং আমাকে সুন্দরভাবে আদায় করার, এবং তাকে সুন্দরভাবে তাগাদা দেয়ার পরামর্শ দিতে পারতে। হে উমার! তাকে নিয়ে যাও এবং তার পাওনা পরিশোধ করে অতিরিক্ত আরো বিশ সা' খেজুর দিয়ে দাও।'
এ কাজটিই তাকে ইসলাম গ্রহণ করার উৎসাহ দিয়েছে। অতঃপর সে ঘোষণা দিল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।'
এ ঘটনার পূর্বে যায়েদ বলত, 'নবুয়্যতীর আলামতসমূহ থেকে কোন একটি আলামত তার চেহারায় ফুটে উঠতে দেখা বাকি ছিল না, তবে দুটি আলামত সম্পর্কে তখনও আমি অবগত হতে পারিনি। এক: তার অজ্ঞতার তুলনায় জ্ঞান-গরিমাই বেশি হবে। দুই: তার সাথে মূর্খতাসূলভ ব্যবহার তার সহনশীলতা বাড়িয়ে দেবে।'
সে এই ঘটনার মাধ্যমে তা পরীক্ষা করে, এবং তার সম্পর্কে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তেমনটিই পেয়েছে। অতঃপর সে ঈমান আনলো এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে অনেক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করলো, এবং তাবুকের যুদ্ধে অভিযানে শহীদ হল। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সত্যবাদিতা ও তিনি যে দিকে আহবান করছেন তা যে সত্য, এ দুই বিষয়ের উপর আখলাকের মাধ্যমে অনেক প্রমাণ পেশ করেছেন।
ষষ্ঠ: মুনাফিক নেতাদের সাথে তার আচরণ:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করলেন, এদিকে আউস ও খাযরাজ গোত্র আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে নেতা বানানোর ব্যাপারে একমত হয়েছিল। এমনকি দুইজন ব্যক্তিও তার মর্যাদার ব্যাপারে মতবিরোধ করেনি। ইতিপূর্বে আউস ও খাযরাজ গোত্র কোন সময় দু'গ্রুপের কারো ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছোতে পারেনি। তারা তাকে মালা পড়িয়ে নেতা বানানোর সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করল। ঠিক এমন সময় আল্লাহ তাআলা তাদের সম্মুখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উপস্থিত করলেন। যখন মুনাফিক নেতার স্বজাতি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে ইসলামের দিকে ধাবিত হতে শুরু করল, তখন তার অন্তর হিংসা-বিদ্বেষে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। এবং সে দেখল তার রাজত্ব ও ক্ষমতা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে চলে যাচ্ছে। সে যখন দেখল, তার স্বজাতি ইসলামে প্রবেশ করছে, তখন সে অপছন্দ করা সত্ত্বেও কপটতা নিয়ে, হিংসা ও বিদ্বেষসহ ইসলামে প্রবেশ করল। সে ইসলাম থেকে মানুষকে বিমুখ করা, মুসলিম জামাআতে ফাটল সৃষ্টি করা ও ইহুদীদের সহযোগিতা করার ব্যাপারে কোন প্রকার ত্রুটি করল না।
ইসলামী দাওয়াতের ব্যাপারে তার বিদ্বেষের বিষয়টি ছিল সুস্পষ্ট। কিন্তু তা ছিল সম্পূর্ণ মুনাফেকী অবস্থায়। নবী করীম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিষয়টি ধৈর্য, সহনশীলতা ও ক্ষমার দৃষ্টিতে গ্রহণ করে নিতেন। কেননা সে ইসলাম প্রকাশ করেছিল। তাছাড়া তার অনেক মুনাফিক সাথি-সঙ্গী ছিল। সে ছিল তাদের নেতা। আর তারা ছিল তার অনুসারী। নবী করীম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা ও কাজে তার প্রতি অনুগ্রহ করতেন, এবং অনেক সময় তার দুর্ব্যবহারকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখতেন। নিম্নে এ রকম কয়েকটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হল:
১- ইহুদী সম্প্রদায় বনু কুরাইযা অঙ্গীকার ভঙ্গ করার পর তাদের জন্য সুপারিশ করা
বদর যুদ্ধের পর বাজারে জনৈক মুসলিম মহিলার পোশাক খুলে ফেলা উন্মুক্ত এবং এ মহিলাকে সাহায্য করার কারণে একজন মুসলমানকে খুন করার মাধ্যমে বনু কুরাইযা অঙ্গীকার ভঙ্গ করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের বিশ মাস পর শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি শনিবার তাদের কাছে গেলেন, তাদেরকে পনেরো দিন বন্দি করে রাখলেন এবং তারা তাদের দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করল। তিনি খুব কঠিনভাবে তাদেরকে অবরোধ করলেন। আল্লাহ তাদের অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিদ্ধান্ত মেনে নেমে আসল। রাসূলের নির্দেশে তাদের উভয় হাত পিছনে বেধে দেয়া হল। তারা ছিল সাত শত জন যোদ্ধা। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হাজির হয়ে বলল, 'হে মুহাম্মাদ আমার গোলামদের উপর দয়া কর।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিতে দেরি করলে সে আবার বলল, 'হে মুহাম্মাদ তুমি তাদের উপর দয়া কর।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে, সে রাসূলের বর্ম-পোশাকের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল এবং বলল, যতক্ষণ তুমি আমার লোকদের উপর দয়া না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাকে ছাড়ব না। (তাদের মধ্যে চার শত জন ছিল বর্ম পোশাক বিহীন, আর তিন শত জন বর্ম-পোশাক পরিহিত।) তারা আমাকে লাল ও কালো জাতি থেকে হেফাযত করেছে। আর তুমি তাদেরকে এক সকালেই আমার থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাও? আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি অশুভ পরিণতির ভয় করছি। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার খাতিরে তাদেরকে ছেড়ে দিলেন।' তাদেরকে মদীনা থেকে বের হওয়ার এবং এর নিকটে বসবাস না করার আদেশ করলেন। ফলে তারা সিরিয়ার আযরাআতে চলে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাল সম্পদ গণীমত হিসাবে তার এক পঞ্চমাংশ আয়ত্ব করে নিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এহেন সুপারিশের দরুন তাকে কোন শাস্তি দিলেন না। বরং ক্ষমা করে দিলেন।
২- উহুদ যুদ্ধে রাসূলের সাথে তার আচরণ :
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধে বের হলেন। তিনি যখন মদীনা ও ওহুদের মাঝামাঝি পৌঁছলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এক তৃতীয়াংশ সেনা নিয়ে আলাদা হয়ে গেল, এবং তাদেরকে নিয়ে মদীনায় চলে আসল। জাবের রা. এর পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম তাদের পিছনে পিছনে গেলেন। অতঃপর তাদেরকে ভর্ৎসনা করলেন ও পুনরায় ফিরে যাওয়ার জন্যে উৎসাহ দিলেন। এবং তিনি বললেন, 'চলে এসো এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর। অথবা শত্রুদেরকে প্রতিহত কর।' তারা বলল, 'আমরা যদি জানতাম তোমরা অবশ্যই যুদ্ধ করবে, তাহলে ফিরে যেতাম না।' অতঃপর তাদেরকে নিন্দাবাদ করে তাদেরকে রেখে ফিরে এলেন।' এত বড় অপরাধ সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোন শাস্তি দিলেন না।
৩- আল্লাহর প্রতি আহবান করা থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাধা প্রদান:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা'দ ইবনে উবাদা রা. কে দেখতে গেলেন। পথিমধ্যে আল্লাহর শত্রু আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথে তার সাক্ষাৎ হল। তখন তার সাথে স্বীয় কওমের লোকজন উপস্থিত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহন থেকে নামলেন এবং সালাম করলেন। অতঃপর কিছুক্ষণ বসলেন। তিনি কুরআন তেলাওয়াত করে তাদেরকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিলেন। আল্লাহর কথা স্মরণ করালেন। ভয় দেখালেন ও সুসংবাদ দিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কথা শেষ করলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই দাঁড়িয়ে বলল, 'হে ব্যক্তি (নবী) আমি তোমার কথাগুলো ভালভাবে মেনে নিতে পারছি না। এগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে তুমি বাড়িতে বসে থাকলেই তো চলে। তোমার কাছে যারা আসে শুধুমাত্র তাদেরকেই এগুলো বয়ান করে শুনাও। তোমার কাছে যে আসে না, তাকে তুমি বিরক্ত কর না। কারো মজলিসে এমন কিছু নিয়ে এসো না যা সে অপছন্দ করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাজেও তাকে পাকড়াও করলেন না। বরং ক্ষমা করে দিলেন।
৪- বনী নযীরকে আপন ভূমিতে বহাল রাখার চেষ্টা করা:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার ইচ্ছা করে বনু নযীর যখন অঙ্গীকার ভঙ্গ করল, তখন তিনি তাদের নিকট মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে এই আদেশ দিয়ে প্রেরণ করলেন যে, তারা যেন এ শহর ছেড়ে চলে যায়। এদিকে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নেতৃত্বে মুনাফিকরা বলে পাঠাল, তোমরা আপন জায়গায় থাক। নিশ্চয় আমরা তোমাদেরকে শত্রুর হাতে সোপর্দ করব না। যদি তোমরা যুদ্ধের সম্মুখীন হও, তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করব। যদি তোমাদেরকে বের কের দেয়া হয়, তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে বের হয়ে যাব। ফলে ইহুদীদের মনোবল আরো চাঙ্গা হয়ে গেল। তারা চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিরোধিতা করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট গেলেন এবং তাদেরকে অবরোধ করলেন। অতঃপর আল্লাহ তাদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করলেন এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দেশান্তর করলেন। তারা খায়বর গিয়ে আশ্রয় নিল। আর তাদের কেউ কেউ সিরিয়ায় চলে গেল।' নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের এহেন নিকৃষ্ট তৎপরতার কোন শাস্তি দিলেন না।
৫- মুরাইসি যুদ্ধে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানেদের সাথে চক্রান্ত ও বিশ্বাস ঘাতকতাঃ
এ যুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এমন একটি অপমানজনক কাজ করেছে, যার কারণে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হয়ে যায়:
প্রথমত: মুনাফিকরা এ যুদ্ধে আয়েশা রা. এর প্রতি অপবাদ রচনা করে। যার নেতৃত্বে ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল।
দ্বিতীয়ত: এ যুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যা বলেছিল আল-কুরআনে তা উল্লেখ করা হয়েছে: يَقُولُونَ لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى المُدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ
‘তারা বলে, যদি আমরা মদীনায় ফিরে যাই তাহলে, আমাদের মধ্যে সম্মানিত লোকেরা লাঞ্ছিতদের বের করে দেবে।”
তৃতীয়ত: এ যুদ্ধে আল্লাহর দুশমন যা বলেছিল আল-কুরআনে তা উল্লেখ করা হয়েছে:
لَا تُنْفِقُوا عَلَى مَنْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ حَتَّى يَنْفَضُّوا
"আল্লাহর রাসূলের নিকট যারা রয়েছে তাদের জন্য তোমরা খরচ কর না, যতক্ষণ না তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।”
এর অনেক পর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্ম-কৌশল আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হল। আর উদ্ভাসিত হল ফেৎনার আগুন নিভিয়ে ফেলা ও অকল্যাণের মূলোৎপাটনের ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শিক রাজনীতি। সন্দেহ নেই, আল্লাহর অনুগ্রহ, আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের ব্যাপারে তার দূরদর্শিতা, তার প্রতি তাঁর সহনশীলতা, তার প্রতি অনুগ্রহ এবং অপমানকর অবস্থানের মোকাবিলায় মুনাফিক নেতাকে ক্ষমা করে দেয়া এ সবগুলোর পিছনে ছিল নানাবিধ হিকমত ও কৌশল।
আর তা হলো: এ ব্যক্তির অনেক ভক্ত ছিল, ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাদের পক্ষ থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ভয় ছিল। তাছাড়া সে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুসলমান ছিল, আর এ কারণেই যখন উমার ইবনে খাত্তাব রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে সুযোগ দিন, আমি এ মুনাফিক সর্দারের মাথা উড়িয়ে দিই।' তখন তিনি তাকে বলেছিলেন, 'তাকে ছেড়ে দাও, যাতে করে লোকেরা বলাবলি করতে না পারে যে, মুহাম্মাদ নিজ সাথিদের হত্যা করে।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তাকে হত্যা করতেন তাহলে সেটি লোকদের ইসলামে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে আতঙ্ক সৃষ্টি করত। কারণ লোকেরা আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে মুসলিম বলেই জানত। তখন তারা বলত, মুহাম্মাদ মুসলমানদের হত্যা করে। তাতে করে নতুন ভাবে বিশৃঙ্খলার জন্ম নিত আর জাতীয় স্বার্থ ব্যাহত হত।
এখানে চিন্তা করলে দেখা যাবে নবীজীর পক্ষ থেকে ইসলামের ঐক্য ও শক্তি সুদৃঢ় রাখার প্রত্যয়ে এবং বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশংকায় ছোট খাট সমস্যার ক্ষেত্রে ধৈর্য ও প্রজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে। তাছাড়া তাকে প্রকাশ্য অবস্থার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর ভিতরগত বিষয়গুলো আল্লাহ তাআলার উপর ন্যস্ত করতে আদেশ দিয়েছেন।
আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে হত্যা না করার তাৎপর্য কি, এটি উমার রা. প্রথম প্রথম বুঝতে পারেননি, তবে কিছুদিন পরে বুঝে আসে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, বিষয়টি আমি বুঝতে পেরেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্ত অবশ্যই আমার সিদ্ধান্ত অপেক্ষা অধিক বরকতময় ও কল্যাণকর।'
এভাবেই আল্লাহর পথে প্রত্যেক দাওয়াত-কর্মীকে নিজ নিজ দাওয়াতী কর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করে হিকমত ও প্রজ্ঞার রাস্তা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়।
সপ্তম দৃষ্টান্ত: ছুমামাহ বিন উসালের সাথে:
ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. সাহাবী আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল অশ্বারোহীকে নজদ অভিমুখে অভিযানে প্রেরণ করেন। তারা বনী হানীফের একলোককে ধরে নিয়ে আসল। যার নাম ছিল, 'ছুমামাহ বিন উসাল।' সে ছিল ইয়ামামাবাসীদের নেতা। তারা তাকে মসজিদের একটি খুটিতে বেঁধে রাখল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট আসলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে ছুমামাহ! আমাদের সম্পর্কে তোমার ধারণা কি?' সে বলল, 'হে মুহাম্মাদ! আমার নিকট আপনাদের সম্পর্কে ভাল ধারণাই আছে। যদি আপনি হত্যা করেন, তাহলে হত্যাপোযুক্ত লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ লোককেই অনুগ্রহ করবেন। আর আপনি যদি অর্থকড়ি নিতে চান তাহলে বলুন, আপনার ইচ্ছানুযায়ী প্রদান করা হবে।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রেখে চলে গেলেন। যখন পরের দিন আবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে ছুমামাহ! আমাদের সম্পর্কে তোমার কি ধারণা?' উত্তরে সে বলল, 'আগে যা বলেছি তা-ই, যদি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি হত্যা করেন তাহলে হত্যাযোগ্য লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অর্থ-কড়ি নিতে চান তাহলে বলুন, আপনার ইচ্ছানুযায়ী প্রদান করা হবে।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রেখে চলে গলেন। যখন পরের দিন আসল, তখন বললেন, 'হে ছুমাহ আমাদের সম্পর্কে তোমার কি ধারণা?' উত্তরে সে বলল, 'আগে যা বলেছি তা-ই, যদি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি হত্যা করেন, তাহলে হত্যাযোগ্য লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অর্থকড়ি নিতে চান তাহলে বলুন, আপনার ইচ্ছানুযায়ী প্রদান করা হবে।'
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা ছুমামাহকে মুক্ত করে দাও।' মুক্তি পেয়ে সে মসজিদের নিকটস্থ একটি খেজুর বাগানে গিয়ে গোসল করল। অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করে বলল, 'আশহাদু আল লা ইলাহা... আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোন মা'বুদ নাই আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা এবং রাসূল। হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর শপথ করে বলছি, পৃথিবীর বুকে আমার নিকট আপনার চেহারার চেয়ে অধিক ঘৃণিত কোন চেহারা ছিল না। আর এখন আপনার চেহারা অন্য সকল চেহারা অপেক্ষা আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হয়ে গেছে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার নিকট আপনার ধর্ম অপেক্ষা অধিক ঘৃণিত আর কোন ধর্ম ছিলনা, আর এখন আপনার ধর্ম অন্য সকল ধর্ম থেকে আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হয়ে গেছে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনার শহরই আমার নিকট ছিল সর্বাধিক ঘৃণিত শহর। আর এখন সেটিই আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হয়ে গেছে। আপনার প্রেরিত অশ্বারোহী বাহিনী যখন আমাকে গ্রেফতার করেছে তখন আমি উমরা পালনের নিয়ত করেছিলাম। আপনি এ বিষয়ে কি নির্দেশনা দেবেন? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সুসংবাদ দান করলেন এবং উমরা পালনের নির্দেশ দিলেন। তিনি মক্কায় আগমন করলে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, 'তুমি কি ধর্মত্যাগী হয়ে গেলে?' উত্তরে সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম বরং আমি রাসূলুল্লাহর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, 'এখন থেকে রাসূলুল্লাহর অনুমোদন ব্যতীত ইয়ামামাহ থেকে তোমাদের কাছে এক দানা গমও আর আসবে না।'
অতঃপর তিনি ইয়ামামায় চলে যান এবং ইয়ামামাবাসীকে মক্কায় কিছু রপ্তানি করতে নিষেধ করে দেন। এ অবস্থা দেখে মক্কাবাসীরা রাসূলুল্লাহর নিকট লিখল যে, 'তুমি আত্মীয়তা রক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে থাক, অথচ সে তুমিই আমাদের সাথে বন্ধন ছিন্ন করে দিলে। তুমি আমাদের পিতৃপুরুষদের তলোয়ার দ্বারা হত্যা করেছ। আর আমাদের সন্তানদের মারছ অনাহারে।' চিঠি পেয়ে রাসূলুল্লাহ ছুমামাহকে খাদ্য রপ্তানির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার নির্দেশ পাঠালেন।
আল্লামা ইবনে হাজার রহ. উল্লেখ করেছেন:
ইবনে মাজাহ নিজ সনদে ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, 'ছুমামাহর ইসলাম গ্রহণ, ইয়ামামায় প্রত্যাবর্তন, কুরাইশদের নিকট রসদ-সামগ্রী প্রেরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ সম্পর্কেও আল্লাহ তাআলার নিণেক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেছেনঃ
وَلَقَدْ أَخَذْنَاهُمْ بِالْعَذَابِ فَمَا اسْتَكَانُوا لِرَبِّهِمْ وَمَا يَتَضَرَّعُونَ
"আমি তাদের আজাবের মাধ্যমে পাকড়াও করলাম। কিন্তু তারা তাদের পালনকর্তার তরে নত হলো না এবং কাকতি মিনতিও করল না।" (সূরা মুমিনূন: ৭৬}
ইয়ামামাহ বাসীরা যখন স্বধর্মত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তখন ছুমামাহ রা. নিজ ধর্ম ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি এবং তার সম্প্রদায়ের যারা তার অনুসরণ করেছিল, তারা ইয়ামামাহ ছেড়ে এসে আলী আল - হাদরামীর সাথে মিশে বাহরাইনের মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
'আল্লাহু আকবার' কি চমৎকার সহনশীলতা ছিল নবী মুহাম্মাদের! কত উর্দ্ধে ছিল তার চিন্তা-চেতনা ও অবস্থান। তিনি অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর লোকদের মধ্যে যাদের ইসলাম ও হেদায়াত কামনা করতেন। তাদের মন রক্ষার চেষ্টা করতেন। তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ অব্যাহত রাখতেন। যাতে তাদের ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার মাধ্যমে তাদের অনুসারীবৃন্দও ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী হয় এবং ক্রমাগত ইসলামে দীক্ষিতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
এমনি করেই প্রত্যেক দাওয়াত কর্মীর কর্তব্য হবে সহনশীলতা ও অন্যায়কারীকে ক্ষমা করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা। কেননা ছুমামাহ শপথ করে বলেছে তার ঘৃণা মুহুর্তের মধ্যে ভালোবাসায় রূপান্ত রিত হয়ে গেছে। যখন সে দেখল, নবীজী তার সামনে কত সুন্দর করে সহনশীলতা, ক্ষমা ও বিনিময় বিহীন অনুগ্রহের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
আর এ ক্ষমা ও উদারতা ছুমামার জীবনে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা ও ইসলামের প্রতি অন্যদেরকে দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করেছিল।' এজন্যেই তিনি বলেছিলেন:
أهم بترك القول ثم يردني - إلى القول إنعام النبي محمد رأيت خيالا من حسام مهند - شكرت له فكي من الغل بعدما
'কথা বলব না বলে পণ করি আমি তবে মুহাম্মাদী করুণা সংকল্প ভাংতে বাধ্য করে মোরে। ভারতে তৈরি ধারালো তলোয়ার দেখে, ছায়ামূর্তি (মৃত্যু) প্রত্যক্ষ করলাম, বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ায় আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।'
অষ্টম দৃষ্টান্তঃ যে বেদুইন রাসূলুল্লাহকে চাদরসহ টান মেরেছিল তার সাথে তাঁর সহনশীল আচরণ
সাহাবী আনাস রা. বলেন, 'আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে চলছিলাম, তার গায়ে গাঢ় পাড় বিশিষ্ট একটি নাজরানী চাদর ছিল। পথিমধ্যে এক বেদুইন তাকে কাছে পেয়ে চাদর ধরে প্রচণ্ড জোরে টান মারল। আমি তাকিয়ে দেখলাম, টানের তীব্রতার কারণে চাদরের পাড়ের মোটা অংশ তার কাঁধে দাগ সেঁটে দিয়েছে। অতঃপর সে বলল, 'হে মুহাম্মাদ! তোমার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত যে সম্পদ রয়েছে তা থেকে আমাকে কিছু দিতে বল।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। অতঃপর তাকে কিছু দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
এটিই হচ্ছে নবীজীর চমকপ্রদ ও উৎকর্ষপূর্ণ সহনশীলতা, উন্নততর চরিত্র, উত্তম ক্ষমা প্রদর্শন, নিজ জীবন ও সম্পদে আপতিত বিপদে ধৈর্য ধারণ এবং ইসলামপ্রিয় সহজ সরল ব্যক্তিবর্গের সাথে মার্জনাপূর্ণ অনুকরণীয় আদর্শের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াতকর্মীদের এ আদর্শের অনুকরণ একান্ত জরুরী। আরো জরুরী হচ্ছে তার সহনশীলতা, মার্জনাপূর্ণ সদাচরণ, ক্ষমা, উদারতা, প্রসন্ন মানসিকতা এবং দীন ইসলামের উপর আপতিত আঘাত উত্তম পদ্ধতিতে প্রতিহত করা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
নবম দৃষ্টান্ত: হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করে দাও, কারণ তারা বুঝে না
তার সহনশীলতার অন্যতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে, তাকে যারা বিভিন্নভাবে কষ্ট দিয়েছে, অকথ্য নির্যাতন করেছে তাদের বিরুদ্ধে বদ-দু'আ করেননি। তাদের বিরুদ্ধে বদ-দু'আ করার পূর্ণ স্বাধীনতা তার ছিল এবং এতে আল্লাহ তাআলা তাদের ধবংস করে দিতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন সহনশীল, প্রজ্ঞাময়। দূরদর্শী চিন্তা চেতনা নিয়ে কাজ করতেন। উদ্দেশ্য ছিল সুদূর প্রসারী। আর সেটি হচ্ছে তাদের অথবা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ইসলাম গ্রহণের আকাংখা। এ জন্যেইতো আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন,
'আমি যেন এখনো রাসূলুল্লাহ পানে তাকিয়ে আছি। তিনি জনৈক নবীর ঘটনা বর্ণনা করছেন, তার কওম তাকে প্রহার করে রক্তাক্ত করে ফেলেছে আর তিনি নিজ মুখাবয়ব থেকে রক্ত মুছছেন আর বলছেন,
اللهم اغفر لقومي فإنهم لا يعلمون 'হে আল্লাহ আমার জাতিকে ক্ষমা করে দিন, কারণ তারা জানে না।"
নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও সহনশীলতার প্রশংসা করেছেন এবং তাকে অনেক বড় করে দেখেছেন। যেমন সাহাবী আশজ্জ আব্দুল কায়সকে বলেন:
إن فيك خصلتين يحبهما الله : الحلم والأناة . 'নিশ্চয়ই তোমার মধ্যে এমন দু'টো স্বভাব বিদ্যমান যা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন: সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা'।’
অন্য রেওয়ায়াতে এসেছে: আশজ্জ জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ উক্ত সভাবদ্বয় কি আমিই অর্জন করেছি, না আল্লাহ আমার স্বভাবে প্রোথিত করে দিয়েছেন?' তিনি উত্তরে বললেন, 'বরং আল্লাহ তাআলাই তোমার স্বভাবে সেগুলো জুড়ে দিয়েছেন।' তখন তিনি বললেন, সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমার মধ্যে এমন দু'টো স্বভাব জুড়ে দিয়েছেন, যেগুলো আল্লাহ ও তার রাসূল পছন্দ করেন।'
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সহনশীলতা পছন্দ করতেন এবং তা নিজের মধ্যে তা লালন করতেন।
দশম দৃষ্টান্তঃ যে ইহুদী তাকে যাদু করেছিল তাকে তাকে ক্ষমা করে দেয়া
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ক্ষমা প্রদর্শনের অন্যতম একটি দৃষ্টান্ত হল, যাদুকারী ইহুদীর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন। যে তাঁকে যাদু করেছিল। তিনি কখনোই সে ইহুদীকে এ সম্পর্কে কিছু বলেননি এবং সেও তার চেহারায় মৃত্যু-পূর্ব পর্যন্ত কখনো কোন (বিরক্তিকর) কিছু দেখতে পায়নি。
টিকাঃ
১ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/২১৬, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/১৫৭। ২ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪২৭, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৪।
২ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪২৮, বিদায়া-নিহায়া: ৪/৪। * যাদুল মাআদ: ৩/১২৬।
৩ যাদুল মাআদ: ৩/১৯৪, সীরাতে ইবনে হিশাম ৩/৮, বিদায়া-নিহায়া: ৪/৫১। ৪ সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২১৮।
৪ সীরাতে ইবনে হিশাম ৩/১৯২, আল বিদায় ওয়ান নিহায়া ৪/৭৫, যাদুল মাআদ ৩/১২৭। * সহীহ আল বুখারী: ৪১৪১, সহীহ মুসলিম ২৭৭০, যাদুল মাআদ: ৩/২৫৬।
৫ সূরা মুনাফিকুন: ৮। ৬ সূরা মুনাফিকুন: ৭। ৭ সহীহ আল-বুখারী, হাদীস নং (৪৯০৫) ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং (২৫৮৪)।
৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/১৮৫, শরহে নববী ১৬/১৩৯।
৭ ফাতহুল বারী ১০/৫০৬ শারহু সহীহ মুসলিম লিন নববী ৭/১৪৬,১৪৭ ৮ সহীহ আল - বুখারী (৩৪৭৭) ও সহীহ মুসলিম (১৭৯২)
৮ সহীহ মুসলিম (১৭/২৫) ৯ বর্ণনায় আবু দাউদ, হাদীস নং (৫২২৫) এবং আহমদ (৪/২০৬ ও ৩/২৩) * বর্ণনায় আহমাদ (১৯২৮৬)
📄 দৃঢ়তা
একজন দাওয়াত-কর্মীর পক্ষে তার সকল কর্মে এবং সর্ব বিষয়ে ধৈর্য, সহনশীলতা ও দৃঢ়তার নীতি গ্রহণ করা ব্যতীত নিজ দাওয়াত কর্মে সফল হওয়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সর্ব কাজে ধীরতা ও দৃঢ়তার নীতি অবলম্বন করেছেন। অনেক নির্ভরযোগ্য ও সহীহ হাদীসের মাধ্যমে বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ আমরা এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছি।
প্রথম দৃষ্টান্ত: উসামা বিন যায়েদ রা. এর সাথে
সাহাবী উসামা বিন যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জুহায়নার হারাকাহ নামকস্থানে যুদ্ধাভিযানে প্রেরণ করলেন। আমরা প্রত্যুষে তাদের উপর চড়াও হয়েছি এবং পরাভূতও করে ফেলেছি। তিনি বলেন, আমি এবং জনৈক আনসারী সাহাবী তাদের একজনকে আঘাত করলাম। অতঃপর তাকে যখন আমরা বেষ্টন করে ফেললাম। সে বলল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তিনি বলেন, এরপর আনসারী বিরত হয়ে গেল আর আমি তাকে আমার বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে ফেললাম। আমরা মদীনায় ফিরে আসলে এ খবর নবীজীর নিকট পৌঁছে গেল। তিনি আমাকে বললেন, 'হে উসামা! সে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে?' আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেতো এটি জীবন রক্ষার্থে বলেছে।' তিনি তারপরও বললেন, 'তুমি তাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরও হত্যা করলে?' উসামা বলেন, 'নবীজী একথাটি বার বার বলে যাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে আমি এ বলে আফসোস করেছিলাম! আহ্! আমি যদি সেদিনের আগে ইসলাম গ্রহণ না করতাম।'
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে এটি অস্ত্রের ভয়ে বলেছে।' তখন তিনি বললেন, 'তাহলে তুমি তার বক্ষ বিদীর্ণ করলে না কেন? তাহলে তো জানতে পারতে সেটি সে সত্যিকারার্থে অন্তর দিয়ে বলেছিল কিনা।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'কেয়ামত দিবসে যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উপস্থিত হবে তখন তুমি তার সাথে কি করবে?' আমি বললাম, 'আপনি আমার জন্যে গুনাহ মাফের দু'আ করুন।' তিনি বললেন, 'কেয়ামত দিবসে যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উপস্থিত হবে তখন তুমি তার সাথে কি করবে?' এরপর রাসূলুল্লাহ ক্রমাগত এটিই বলে যেতে থাকলেন, অন্য কিছু বলেননি। 'কেয়ামত দিবসে যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উপস্থিত হবে তখন তুমি তার সাথে কি করবে।'
তাইতো নবীজীই ছিলেন দৃঢ়তা ও ধীরস্থিরতার ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা বড় ব্যক্তিত্ব। তিনি কোন কাফেরকে তারা আর ইসলাম গ্রহণ করবে না মর্মে যথেষ্ট রূপে নিশ্চিত না হয়ে হত্যার সিদ্ধান্ত নিতেন না।
আনাস বিন মালেক রা. বলেন, 'নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে কোন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইলে একমাত্র সকাল বেলা এবং যথেষ্ট পরিমাণে অপেক্ষা করার পর অভিযান শুরু করতেন। যদি সেখানে আযান শুনতেন, তাহলে যুদ্ধ হতে বিরত হয়ে যেতেন। আর যদি আযান না শুনতেন, তাহলে তাদের উপর হামলা করতেন...।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: যুদ্ধের প্রাক্কালে
নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদেরকে তাদের দাওয়াত কর্ম পরিচালনার ক্ষেত্রে ধীরতা ও স্থিরতার প্রশিক্ষণ দান করতেন। তার প্রশিক্ষণের একটি দিক যেমন, তিনি কোন বাহিনীকে অভিযানে প্রেরণ করলে দলনেতাকে এ মর্মে পরামর্শ দিতেনঃ
তুমি দুশমনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পূর্বে তাদের নিণেক্ত যে কোন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করার প্রতি আহ্বান করবে।
(ক) ইসলাম গ্রহণ ও হিজরতের প্রতি অথবা হিজরত ছাড়া ইসলাম গ্রহণের প্রতি। এবং তারা হবে (অধিকারের দিক দিয়ে) গ্রাম্য-বেদুইন মুসলমান সমতুল্য।
(খ) যদি তারা এতে সম্মত না হয় তাহলে জিযিয়া কর আদায় করতে বলবে।
(গ) আর এতেও অস্বীকৃতি জানালে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে যুদ্ধ শুরু করে দেবে।
তৃতীয় দৃষ্টান্ত: সালাতের ক্ষেত্রে ধীরস্থিরতা ও তাড়াহুড়া না করার প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজ সাহাবাদের প্রশিক্ষণ দানের একটি উদাহরণ: যেমন তিনি বলেন-
'ইকামত হয়ে গেলে সালাতের জন্য তোমরা অতি দ্রুততার সাথে দৌড়িয়ে আসবে না বরং হেঁটে হেঁটে শান্ত শিষ্টভাবে আসবে। এরপর যতটুকু পাবে আদায় করবে, আর যা ছুটে যাবে পূরণ করবে।'
তিনি আরো বলেন, 'সালাতের ইকামত দেয়া হলে তোমরা আমি বের হওয়ার পূর্বে দাঁড়াবে না।'
ধীরস্থিরতার মর্যাদা ও উচ্চ মাকামের করণেই আল্লাহ তাআলা সেটি ভালোবাসেন। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবী আশজ্জ কে লক্ষ করে বলেছিলেন, 'তোমার মাঝে এমন দুটো অভ্যাস বিদ্যমান যা আল্লাহ পছন্দ করেন: সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা।'
নবীরাই সাধারণত আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ এবং অনুকরণীয় আদর্শ। ধৈর্য ও সহনশীলতার সর্বোচ্চ শিখরে তাদের বিচরণ। তাদের মধ্য হতে যিনি মর্যাদার দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেন এবং তিনি সর্বাধিক সফল মানব। তিনিই হলেন সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যার কোন তুলনা বা দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে আর নেই।
চতুর্থ দৃষ্টান্ত: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুদ্ধনীতি প্রসঙ্গে
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শত্রুদের কোন এলাকায় প্রভাত উদ্ভাসিত হওয়ার পরই আক্রমণ করতেন। প্রথমে আযানের প্রতি কর্ণপাত করতেন, যদি ঐ এলাকা হতে আযানের আওয়াজ ভেসে উঠত, তখন আর আক্রমণ করতেন না। অন্যথায় তাদের উপর আক্রমণ চালাতেন।
একবার এক ব্যক্তিকে 'আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর' বলতে শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'লোকটি স্বভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত।' তারপর লোকটি 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' বললে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'লোকটি জাহান্নামের আজাব হতে মুক্তি পেল।'
আনাস রা. হতে বর্ণিত, 'কোন সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রভাতের পূর্বে তাদের উপর কোন ধরনের আক্রমণ করতেন না এবং তিনি আযান শোনার অপেক্ষা করতেন। আযান শোনা গেলে আক্রমণ হতে বিরত থাকতেন। আর আযান না শুনলে তাদের উপর আক্রমণ চালাতেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে, কত সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং শত্রুদের উপর আক্রমণে কোন প্রকার তাড়াহুড়া করতেন না, এটা তারই একটি প্রমাণ।
আব্দুলহ বিন সারজাস আল-মুযানি রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সুন্দর বেশভূসা, ধীরস্থিরতা এবং মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা নবুওয়তের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ।'
এতে প্রমাণিত হয় প্রত্যেক বিষয়ে ধীরস্থিরতা এবং গতিশীলতা উত্তম ও প্রশংসিত। তবে আখেরাতের বিষয়ে শরীয়তের মূলনীতি অনুসরণ করার শর্তে তাড়াহুড়া করা, কাজ যথাসম্ভব দ্রুত সম্পন্ন করা এবং প্রতিযোগী হওয়া অবশ্যই ভাল, প্রশংসনীয় এবং শুভ লক্ষণ। এ ধরনের প্রতিযোগী হওয়া এবং তাড়াহুড়া করাকে আল্লাহ অবশ্যই পছন্দ করেন।
📄 সহমর্মিতা ও কোমলতা
প্রথমত: সহানুভূতিশীলতার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উৎসাহ প্রদানঃ
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, 'যাকে সহমর্মিতা বা সহানুভূতিতা প্রদান করা হল, দুনিয়া ও আখেরাতের সর্ব প্রকার কল্যাণ তাকেই প্রদান করা হল, আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, উত্তম চরিত্র এবং উত্তম প্রতিবেশী শহরকে বসবাস করার উপযোগী করে এবং তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি বিষয়ে নমনীয়তা, দয়াদ্রতা এবং সহানুভূতির প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন এবং তার কথা, কাজ ও ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এ ছাড়া সকল গুণাবলির বাস্তব প্রয়োগ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতে কলমে শিখিয়ে দিয়েছেন, যাতে প্রতিটি উম্মত তাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে তা কাজে লাগাতে পারে।
বিশেষ করে, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী দাওয়াত-কর্মী ও সংস্কারকদের এ বিষয়ে আরো বেশি সজাগ থাকতে হবে। কারণ, তাদের জন্য নম্রতা, সহনশীলতা, সহানুভূতি, তাদের দাওয়াতের ক্ষেত্রে উঠা-বসা চলাফেরা ইত্যাদিতে। মোট কথা প্রতিটি মুহূর্তে তাদের জন্য এর অনুশীলন এবং চর্চা একান্ত অপরিহার্য। উল্লেখিত হাদীস এবং পরবর্তী হাদীসগুলোতে নম্র ব্যবহার ইত্যাদির ফজীলত ও বিনয়ী হওয়ার প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া যে কোন উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়া, খারাপ আচরণ ও দুশ্চরিত্র হতে বিরত থাকা এবং খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করার প্রতিও দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
মনে রাখতে হবে, নম্রতা সকল কল্যাণের দ্বার খুলে দেয় এবং সকল প্রকার মহৎ উদ্দেশ্য নম্রতা-ভদ্রতা এবং সৎ-চরিত্রের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। যাদের মধ্যে এ সব গুণাবলি রয়েছে তাদের জন্য তাদের গন্তব্যে পৌঁছা বা উদ্দেশ্য হাসিল করা খুবই সহজ হয়।
আর নম্রতা বা সুন্দর চরিত্র দ্বারা যে সওয়াব বা পুণ্য লাভ হয়, তার বিপরীতে অন্য কোন নেক আমল দ্বারা তা কল্পনা করা দুষ্কর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভদ্রতা হতে সতর্ক করেছেন। এবং তার উম্মতের উপর কোন ধরনের কঠোরতা করা হতে সম্পূর্ণ নিষেধ করেন।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমার এ ঘরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'হে আল্লাহ! আমার উম্মতের কেউ যদি ক্ষমতাশীল হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যায়ভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তুমি তার উপর ক্ষমতা প্রয়োগ এবং কঠিন আচরণ কর।'
'আর যে ক্ষমতাশীল হওয়া সত্ত্বেও তা অন্যায়ভাবে প্রয়োগ না করে মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার ও নম্র-ভদ্র আচরণ করল, তুমি তার সাথে ভাল ব্যবহার এবং তার প্রতি দয়া কর।'
রাসূল কাউকে বিশেষ কোন কাজে প্রেরণ করলে, তাকে সহজ করা, চাপ প্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন না করার আদেশ দিতেন।
আবু মুসা আশয়ারী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে কোন কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করলে বলতেন, 'তোমরা সুসংবাদ দাও, সহজ কর এবং কঠোরতা করো না।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ যখন কোন পরিবারে কল্যাণ চান তাদেরকে নম্র হওয়ার সুযোগ দেন।'
আবু মুসা আল আশআরী ও মুআজ ইবনে জাবালকে ইয়েমেনের উদ্দেশ্যে প্রেরণের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বলেন, 'তোমরা মানুষের উপর সহজ কর। কঠিন করো না। তাদের সুসংবাদ দাও, আতঙ্কিত করো না। আনুগত্য করো মতবিরোধ করো না।
আনাস রা. হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা সহজ কর, কঠিন করো না সুসংবাদ দাও আতঙ্কিত করো না।
উল্লেখিত হাদীসগুলোর শব্দাবলীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহজ করার আদেশ এবং এর বিপরীতে কঠিন করার নিষেধ দুটোই উল্লেখ করেন। কারণ, হতে পারে কোন ব্যক্তি কখনো সহজ করল এবং কখনো কঠিন করল আবার কখনো সুসংবাদ দিল আবার কখনো আজাব এবং শাস্তির কথা শুনালো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে যদি শুধু সহজ করার কথা বলতেন, তাহলে কোন ব্যক্তি একবার বা একাধিকবার সহজ করলেই তাকে হাদীসের ভাষার মর্মার্থের প্রতি আনুগত্যশীল বলা যেত। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আলাদা ভাবে 'কঠোরতা করো না' বললেন, তখন কঠোরতার বিষয়টি সর্বাবস্থায় সর্বক্ষেত্রে এবং সকল বিষয়ে রহিত হয়ে যায়। আর হাদীসের অন্তর্নিহিত মর্মবাণী এ দিকেই নির্দেশ করেন।
অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা আনুগত্য কর, মতবিরোধ করো না।' দুটি শব্দ বলার কারণ হল, দুই জন কখনো কোন বিষয়ে এক হলেও, আবার কখনো দেখা গেল মতপার্থক্য করল। আবার কোন বিষয়ে একমত হল আবার অন্য কোন বিষয়ে একমত না ও হতে পারে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না' কথাটা আলাদাভাবে বলে দিলেন, ফলে বিচ্ছিন্ন হওয়া সব সময়ের জন্য এবং সকল ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখিত হাদীস ছাড়াও বিভিন্ন হাদীসে আল্লাহর অসংখ্য নেআমত, মহা পুরস্কার এবং আল্লাহর অপার অনুগ্রহের সু-সংবাদ দেয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান ব্যতীত শুধু আজাব-গজব, শাস্তি-ধমকি, হুমকি দিয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করা হতে নিষেধ করেন। হাদীসের নির্দেশাবলীতে 'মন রক্ষা কর, তাদের উপর কোন প্রকার কঠোরতা করো না' করা হয় ইসলামে নব দীক্ষিতদের জন্য। এ ছাড়াও প্রাপ্ত বয়স্ক ও যারা গুনাহের কাজ হতে ফিরে আসতে চায় তাদের প্রতি নমনীয় আচরণ করে ধীরে ধীরে তাদের ইসলামের অনুশাসনে অভ্যস্ত করতে হবে। হাদীসে যে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে তাতে এ ধরনের লোকদেরও ইসলামী জীবন যাপন পদ্ধতি অবলম্বন করা সহজ হয়।
ইসলামের বিধি বিধান কখনো একত্রে চাপিয়ে দেয়া হয়নি বরং ধাপে ধাপে মানুষের উপর ফরজ করা হয়েছে। ফলে যারা ইসলামে প্রবেশ করত বা প্রবেশের ইচ্ছা পোষণ করত তাদের ইসলাম পালন করা সহজ হত এবং ইসলামে দীক্ষিতের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকত। আর যদি প্রথমেই কাউকে সব কিছু চাপিয়ে দেয়া হত, তাহলে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা কমে যেত এবং কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করলেও চাপের মুখে পলায়ন করত।' এমনিভাবে জ্ঞান অর্জন, শিক্ষা দীক্ষার ক্ষেত্রে ও ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের বিভিন্ন সময় বিরতি দিতেন এবং এক দিন পর পর তালীম তরবিয়ত বা শিক্ষা মূলক বৈঠক করতেন। যাতে তারা বিরক্ত না হয় এবং অস্বস্তি অনুভব না করে।'
মোট কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন, এ উম্মতের সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী। সর্ব প্রকার কল্যাণের পথ প্রদর্শক, সংবাদ দাতা, এবং সকল অন্যায়, অনাচার, পাপাচার হতে বাধা দানকারী এবং ভীতি প্রদর্শনকারী। উম্মতকে যারা কষ্ট দেন, তাদের অভিশাপ করেন এবং যারা উম্মতের সাথে ভাল ব্যবহার করেন ও তাদের কল্যাণ কামনা করেন, তিনি তাদের জন্য দুআ ও শুভ কামনা করেন। আয়েশা রা. এর উল্লেখিত হাদীস এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
সুতরাং বলা বাহুল্য যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে কষ্ট দেয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা পরিহার করতেন। আর যারা মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করে এবং তাদের প্রতি মমতা বোধ জাগিয়ে তোলার জন্য কাজ করে তাদের বিশেষ গুরুত্ব দেন।
প্রথম দৃষ্টান্ত: ব্যভিচার করার জন্য এক যুবকের অনুমতি প্রার্থনা
আবু উমামা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একটি যুবক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন,' তার কথা শুনে উপস্থিত সবাই তাকে ভর্ৎসনা করতে লাগল এবং থামাতে চেষ্টা করল। রাসূল বললেন, 'তুমি কাছে এসো!' যুবকটি তার নিকটে গেল। তিনি বললেন, 'তুমি কি তোমার মায়ের সাথে ব্যভিচারকে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। দুনিয়ার কেউই তা পছন্দ করে না।' তারপর বললেন, 'তুমি কি তোমার মেয়ের সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন- দুনিয়ার কোনো মানুষই তা পছন্দ করবে না।' তিনি বললেন, 'তুমি তোমার বোনের সাথে অপকর্ম করতে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন- দুনিয়ার কোন মানুষ তার বোনের সাথে অপকর্ম করতে পছন্দ করবে না।' তিনি বললেন, 'তুমি কি তোমার ফুফুর সাথে অপকর্ম করতে পছন্দ কর?' সে বলল, 'কসম আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন, দুনিয়ার কোনো মানুষই তার ফুফুর সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ করে না।' তারপর বললেন, 'তুমি কি তোমার খালার সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ কর?' সে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা পছন্দ করি না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন-দুনিয়ার কোনো মানুষই তার খালার সাথে অপকর্ম করাকে পছন্দ করে না।' এরপর তিনি তার শরীরে হাত রেখে বললেন, 'হে আল্লাহ! তুমি গুনাহসমূহ ক্ষমা কর এবং আত্মাকে পবিত্র কর লজ্জাস্থানকে হেফাজত কর।' সে দিন থেকে যুবকটি কখনো ব্যভিচারের দিকে মনোযোগ দেয়নি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ হতে একজন সংস্কারকের জন্য মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার, তাদের প্রতি দয়া এবং সহানুভূতির গুরুত্ব বিশেষভাবে অনুধাবন করা যায়। বিশেষ করে যারা ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার আশা করে, ঈমানকে বৃদ্ধি করার চেষ্টায় ব্যাকুল এবং ইসলামের উপর অটল অবিচল থাকার বিষয়ে প্রত্যয়ী হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাজ-কর্মে এবং আদেশ-নিষেধের মাধ্যমে প্রতিটি ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: ইহুদীর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যবহার
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, এক দল ইহুদী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বলল, 'আস্সামু আলাইকুম' (তোমাদের জন্য মৃত্যু)। আয়েশা রা. বলেন, আমি অভিশপ্ত ইহুদীদের ধোঁকা-বাজী বুঝতে পেরে বলি 'ওয়া আলাইকুমুস্লাম ওআললনাতু' (তোমাদের জন্য মৃত্যু ও অভিশাপ)। এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সাবধান! হে আয়েশা, আল্লাহ প্রতিটি কাজে নমনীয়তাকে ভালোবাসেন।' আমি বললাম, 'হে রাসূল! তারা কি বলল, আপনি তা শুনেননি?' রাসূল বললেন, 'অবশ্যই শুনেছি এবং তাদের উত্তরে আমি বলেছি ওয়া আলাইকুম (তোমাদের জন্যও)।' এ টুকুই বলাই যথেষ্ট। এবং তিনি বলেন, 'হে আয়েশা! নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা প্রতিটি কাজে নমনীয়তাকে পছন্দ করেন। নমনীয়তার উপর যে ধরনের বিনিময় এবং সওয়াব দেন, কঠোরতা এবং অন্য কোন আমলের উপর এ পরিমাণ বিনিময় ও সওয়াব দান করেন না।
তিনি আরো বলেন, 'যে কোন বিষয়ে নমনীয়তা প্রদর্শন সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করে এবং কঠোরতা প্রদর্শন তিক্ততা ছড়ায়।'
তিনি বলেন, 'নমনীয়তা হতে বঞ্চিত ব্যক্তি মানেই যাবতীয় কল্যাণ হতে বঞ্চিত।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যাকে নমনীয়তা হতে বঞ্চিত করা হয়, তাকে অবশ্যই দুনিয়া ও আখেরাতের সকল প্রকার কল্যাণ হতে বঞ্চিত করা হয়।'
আবু দারদা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যাকে নম্রতা বা ভদ্রতার ক্রিয়দাংশ প্রদান করা হয়, তাকে যাবতীয় কল্যাণেরও ক্রিয়দাংশ প্রদান করা হয়। আর যাকে নম্রতা বা ভদ্রতা হতে আংশিক বঞ্চিত করা হয়, তাকে যাবতীয় কল্যাণ হতেও আংশিক বঞ্চিত করা হয়।'
আবু দারদা হতে আরো বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল বলেন, 'যাকে নম্রতা বা ভদ্রতার ক্রিয়দাংশ দেয়া হয়, তাকে যাবতীয় কল্যাণেরও ক্রিয়দাংশ দেয়া হয়। উত্তম চরিত্র হতে কোন আমলই ভারী হতে পারে না।'
তৃতীয় দৃষ্টান্ত: মসজিদে পেশাবকারীর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
আনাস বিন মালেক রা. হতে বর্ণিত, একদা আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে মসজিদে অবস্থান করছিলাম। ঠিক এ মুহূর্তে একজন গ্রাম্য লোক এসে মসজিদে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে আরম্ভ করল। এ দেখে সাহাবারা তাকে থামানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাকে পেশাব করতে বাধা দিও না', ফলে তারা পেশাব করার জন্য সুযোগ দেন। পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাছে ডেকে বললেন, 'মসজিদ পেশাবের জায়গা নয় বরং মসজিদ হলো আল্লাহর জিকির, কুরআন তিলাওয়াত এবং নামাজের স্থান।' তারপর এক ব্যক্তিকে আদেশ দিলেন- এক বালতি পানি তার পেশাবে ঢেলে দেয়ার জন্য।
সহীহ আল-বুখারীর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এ লোকটি বলেছিল, 'হে! আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রহম কর, আমাদের দুইজন ছাড়া আর কাউকে অনুগ্রহ করো না।' আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজে দাঁড়ান। আমরাও দাঁড়াই, লোকটি নামাজে বলল, 'হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুগ্রহ কর। আমাদের ছাড়া আর কাউকে অনুগ্রহ করো না', নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেন, 'তুমি উন্মুক্ত ঝর্নাধারাকে পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিলে।'
বুখারী ছাড়া অন্যান্য হাদীসের কিতাবে এ ঘটনার ব্যাখ্যা নিম্নরূপ: আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, একজন গ্রাম্য লোক মসজিদে দুই রাকাত নামাজ পড়ে বলল, 'হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুগ্রহ কর এবং এ ছাড়া কাউকে অনুগ্রহ করো না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি উন্মুক্ত ঝর্নাধারাকে পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিলে?' এ কথা বলতে না বলতে সে মসজিদে পেশাব করতে আরম্ভ করলে সকলে দৌড়ে বাধা দিতে চেষ্টা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে, তাদের কষ্টের কারণ বা অকল্যাণের জন্য প্রেরণ করা হয়নি। তোমরা তার পেশাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও।'
তিনি বলেন, গ্রাম্য লোকটি বিষয়টি অনুধাবন করে বলল, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে আসেন। কিন্তু তিনি আমাকে কোন প্রকার ধমক দেননি, কোন মন্দ বলেননি এবং কোন প্রকার মারধর করেননি।' দেখুন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী, বিজ্ঞ এবং বুদ্ধিমান। তার আচার - আচরণ এবং কাজকর্ম সবই প্রজ্ঞাময় এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। তার আখলাক, আচার-আচরণ, নম্রতা-ভদ্রতা, নমনীয়তা, দয়ার্দ্রতা, সহনশীলতা, ক্ষমা ও ধৈর্যশীলতা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তি মাত্রই তার প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় হবে তার এবং প্রগাঢ় হবে তার ঈমান। লোকটি এমন একটি কাজ করল, তাতে রাগান্বিত হওয়া, শাস্তি যোগ্য অপরাধ মনে করা এবং শিক্ষা দেয়ার মত গর্হিত কাজ বিবেচনা করা ছাড়া উপস্থিত লোকদের সামনে আর কোন বিকল্প ছিল না। এ কারণেই সাহাবীগণ তাড়াহুড়া করে তাকে বারণ করতে লাগলেন, তার এ কাজটিকে তারা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তারা তাকে ধমক দিলেন এবং তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলেন এবং সাহাবীদের তাকে পেশাবে বাধা দেয়া হতে বিরত রেখে তার সাথে সুন্দর ব্যবহার করেন ও সুশিক্ষা দেন। এবং যখন সবাই বিরক্ত তখন তার প্রতি তিনি দয়ার্দ্র হলেন।
এটা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দয়া, সহনশীলতা এবং সুন্দর ব্যবহারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিটি কাজে এবং ব্যবহারে তিনি অনুরূপ হিকমত এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে হিকমতের সাথে শিক্ষা দেন এবং লোকটি যখন এ কথা বলে, 'হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুগ্রহ কর এবং আমাদের ছাড়া কাউকে অনুগ্রহ করো না', রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, 'তুমি বিস্তৃত জনপদকে সংকীর্ণ করে ফেললে! অর্থাৎ আল্লাহর রহমতকে। কারণ, সমস্ত কিছুই আল্লাহর রহমত দ্বারা আবৃত। আল্লাহ বলেন, 'আমার রহমত সব কিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে।'
কিন্তু দুআ করতে গিয়ে লোকটি কার্পণ্য করে এবং রহমতের দুআতে সমস্ত মাখলুককে অন্তর্ভুক্ত করেনি।
অথচ, আল্লাহ তাআলা এর বিপরীতে যারা দুআতে সমস্ত সৃষ্টিকে শামিল করেন তাদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন: وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
"আর যারা তাদের পরে আগমন করল, তারা বলে, 'হে আমাদের রব! তুমি আমাদের ক্ষমা কর এবং আমাদের পূর্বে ঈমান সহকারে যারা অতিবাহিত হয়েছে তাদেরও। আর আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের সম্পর্কে কোন বিদ্বেষ অবশিষ্ট রেখো না। হে রব! নিশ্চয় তুমি পরম দয়ালু।"
লোকটি উল্লেখিত আয়াতের বর্ণনার সম্পূর্ণ উল্টো দুআ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত নম্র, ভদ্র এবং আদরের সাথে শিক্ষা দেন। এবং এ ধরনের দুআ হতে নিষেধ করেন।
আর লোকটি পেশাব করতে আরম্ভ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাধা দেয়া হতে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। কারণ, হতে পারে বাধা দেয়ার ফলে সমস্যা আরো বাড়বে। তাই তিনি বাধা দেননি, কারণ : ১ - পেশাব করতে আরম্ভ করার পর বাধা প্রদান করলে লোকটির স্বাস্থ্যের দিক হতে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ২- অথবা পেশাব নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে শরীরের অন্যান্য স্থান, পোশাক এবং মসজিদের অন্য কোন অংশে পেশাব লেগে নাপাক হয়ে যেতে পারত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণের দিক বিবেচনা করে বাধা প্রদান হতে বিরত রাখলেন। অর্থাৎ তিনি দুটি বড় ধরনের সমস্যা এবং ক্ষতিকে প্রতিহত করেন সহনীয় দুটি ক্ষতিকে মেনে নিলেন। এবং দুটি বড় ধরনের কল্যাণ অর্জনকে প্রাধান্য দেন ছোট দুটিকে ছেড়ে দিয়ে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন বুদ্ধিমত্তা এবং হিকমতের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণকারী। তিনি যে কোন প্রেক্ষাপটে যে কোন কাজকর্ম সমাধান এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিকমতের পরিচয় দিয়ে থাকেন। ঘটনায় তিনি তার উম্মত, বিশেষ করে দাওয়াত-কর্মী বা সংস্কারকদের একজন মূর্খ অজ্ঞ, অশিক্ষিত-যার মধ্যে কোনপ্রকার হটকারিতা বা কপটতার অবকাশ নাই- কোন প্রকার কটূক্তি, হুমকি- ধমকি, কঠোরতা, কষ্ট দেয়া বা দুর্ব্যবহার ছাড়া কীভাবে শিক্ষা দিতে হয় তার একটি দৃষ্টান্ত এবং অনুপম আদর্শ স্থাপন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুপম আদর্শ- নমনীয়তা, দয়া, অনুগ্রহ, সহানুভূতিশীল আচরণ, মমতাময়ী ব্যবহার - লোকটির জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে। ফলে, সে পরবর্তী জীবনে ঘটনার বর্ণনায় কৃতজ্ঞতার সাথে বলে, 'তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে আমার দিকে অগ্রসর হন। তবে তিনি আমাকে কোন প্রকার কটূক্তি বা উচ্চবাচ্য করেননি, কোন প্রকার তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করেননি এবং মারধর করেননি।' তার কথা থেকেই বুঝা যায়, লোকটির জীবনে কেমন পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল।
চতুর্থ দৃষ্টান্ত : মুআবিয়া বিন হাকামের ঘটনা
মুআবিয়া বিন হাকাম আসলামী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন 'একদিন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে নামাজ আদায় করতে ছিলাম। ইতি মধ্যে নামাজে এক লোক হাঁচি দিলে তার উত্তরে আমি বলি 'ইয়ারহামুকাল্লাহ! (আল্লাহ তোমাকে দয়া করুন)' এ শুনে সবাই আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে আরম্ভ করল। আমি তাদের বললাম, 'হায় দুর্ভোগ! তোমাদের কি হয়েছে? তোমরা আমার দিকে এভাবে তাকাও কেন?' তারপর তারা তাদের উরুতে থাপর মারতে আরম্ভ করল। আমি বুঝতে পারলাম তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে। ফলে আমি চুপ হয়ে গেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য আমার মাতা পিতা উৎসর্গ হোক, ইতিপূর্বে আমি তার চেয়ে উত্তম কোন শিক্ষক ও এত সুন্দরভাবে শিক্ষা প্রদান করতে কাউকে দেখিনি। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে কোন গালি দিলেন না, তিরস্কার করলেন না এবং কোন মারধর করেননি। নামাজ শেষে বলেন, 'নিশ্চয় নামাজে কথা বলা সঙ্গত নয়। বরং নামাজ হলো তাসবীহ, তাকবীর এবং কুরআন তেলাওয়াত।' আমি তাকে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি জাহেলিয়্যাতের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলাম। আল্লাহ ইসলাম গ্রহণ করার সুযোগ দিয়েছেন। আমাদের মধ্যে কিছু লোক গণকের নিকট যায়। আমি কি গণকের নিকট যাব?' রাসূল বলেন, 'না, তুমি গণকের নিকট যেও না।' বললাম, 'আবার আমাদের মধ্যে কিছু লোক এমন আছে তারা লক্ষণ- কুলক্ষণে বিশ্বাস করে।' তিনি বললেন, 'এটা একটি কুসংস্কার, অবিশ্বাসী কাফেররা এতে বিশ্বাস করে। তবে তোমাকে এটা যেন কোন কাজ থেকে বিরত না রাখে।' তারপর আমি বলি, 'আমাদের মধ্যে কিছু লোক আছে, যারা দাগ দেয়।' রাসূল বলেন 'যদি পূর্বেকার কোন নবী এ ধরনের দাগ দিয়ে থাকে, আর যার দাগ নবীর দাগের সাথে মিলে যায়, তার জন্য দাগ দেয়া বৈধ।'
মুআবিয়া বিন হাকাম বর্ণনা করেন, 'আমার একজন দাসী ওহুদ এবং জাওয়ানিয়া নামক স্থানে ছাগল চরাত। একদিন সে বলল, 'আমার একটি ছাগল বাঘে খেয়ে ফেলেছে।' এ কথা শুনে আদম সন্তান হিসেবে স্বাভাবিকভাবে আমি খুব কষ্ট পেলাম, ফলে আমি খুব জোরে তাকে আঘাত করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে মুক্ত করে দেব কি?' রাসূল বললেন, 'তুমি তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' তাকে নিয়ে আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'আল্লাহ কোথায়?' উত্তরে সে বলল, 'আল্লাহ আকাশে।' তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি কে?' সে বলল, 'আপনি আল্লাহর রাসূল।' রাসূল বললেন, 'তাকে মুক্ত করে দাও। কারণ, সে ঈমানদার।" আল্লাহর পক্ষ হতে দেয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ কত সুমহান ও মহত্তম। তার আচরণ মুআবিয়া বিন হাকাম আঙ্গুলামীর এর জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয়। তাই সে বলে, 'আমি ইতিপূর্বে এবং পরে এর চেয়ে উত্তম কোন শিক্ষক দেখিনি।'
পঞ্চম দৃষ্টান্ত: যার হাত প্লেটে ঘুরপাক খেত তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
উমার বিন আবি সালমা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোলে বসে খাচ্ছিলাম। আমার হাত প্লেটের সব জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'হে! বালক! তুমি বিসমিল্লাহ পড়। ডান হাত দিয়ে খাও। এবং সামনে যা আছে তা হতে খাও।' তারপর হতে আমার খাওয়া এ ধরনেরই ছিল। এর ব্যতিক্রম কখনো হয়নি।'
ষষ্ঠ দৃষ্টান্ত: রমজানের দিনে স্ত্রীর সাথে সহবাসকারীর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
সালামাতা বিন সাখার আল আনছারী হতে বর্ণিত, তিনি তার হাদীসে বলেন, 'ঘর হতে বের হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে আমার বিষয়ে তাকে অবহিত করি। তিনি বলেন, 'তুমি এ কাজ করেছ?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ, হে রাসূল!' তারপর আবার বললেন, 'তুমি একাজ করেছ?' বললাম, 'এ কাজ করেছি হে আল্লাহর রাসূল!' তৃতীয় বার তিনি আমাকে বললেন, 'তুমি এ কাজ করেছ?' আমি বললাম, 'হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! আমার উপর বিধান প্রয়োগ করুন! আমি মেনে নেব।' তিনি বললেন, 'একজন দাস মুক্ত কর।' আমি হাতকে স্বীয় ঘাড়ে রেখে বলি, 'হে আল্লাহর রাসূল! যে সত্তা সত্যের পয়গাম নিয়ে আপনাকে প্রেরণ করছে, তার শপথ করে বলছি, আমি স্বীয় ঘাড় ছাড়া আর কোন কিছুরই মালিক নই।' তিনি বললেন, 'তাহলে দুই মাস রোজা রাখ।' আমি বললাম, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! রোজা রাখার কারণেই আমি এ বিপদের সম্মুখীন হলাম।' তিনি বললেন, 'তাহলে তুমি ছদকা কর।' আমি বললাম, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি আপনাকে সত্যের বাণী দিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করছেন, আমি রাত যাপন করছি ক্ষুধার্ত অবস্থায়। কারণ, রাতে খাওয়ার কোন ব্যবস্থা ছিল না।' তিনি বলেন, 'তুমি বনী জুরাইক এর ছদকার মালিকের নিকট যাও তাদের বল, তারা যেন তোমাকে দান করে। আর তা হতে এক ওসক পরিমাণ তোমার পক্ষ হতে অভাবীদের আহার দাও। আর বাকীগুলো তুমি এবং তোমার পরিবারের জন্য গ্রহণ কর।' তারপর আমি নিজ গোত্রের নিকট গিয়ে বলি, 'আমি তোমাদের মধ্যে সংকীর্ণতা দেখতে পাই এবং তোমাদের অদূরদর্শিতা অনুভব করি। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাহসী এবং বরকতময় দেখতে পাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের আদেশ করেছেন ছদকা দিতে। তোমরা আমাকে দান কর। এ কথা বলার পর তারা আমাকে দান খয়রাত করে সহযোগিতা করল।'
সপ্তম দৃষ্টান্ত: কবরের পাশে ক্রন্দন রত মহিলার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আচরণ
আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কবরের পাশে ক্রন্দনরত এক মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'তুমি আল্লাহকে ভয় কর এবং ধৈর্যধারণ কর। মহিলাটি বলল, 'তুমি আমার থেকে দূর হও। কারণ, তুমি আমার মত বিপদের সম্মুখীন হওনি।' আসলে মহিলাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে পারেনি। তারপর মহিলাকে লোক জন বলল, 'তুমি যার সাথে দুর্ব্যবহার করেছো তিন হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন সে দৌড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, 'আমি আপনাকে চিনতে পারিনি, তাই অভদ্র আচরণ করেছি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'প্রথম আঘাতেই ধৈর্য ধারণ করতে হয়।' ভাবার বিষয় হলো, একজন অজ্ঞ ব্যক্তির সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতই না সুন্দর আচরণ করেন। তাকে কোন প্রকার জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। তিরস্কার করেননি। এর চেয়ে উত্তম আদর্শ আর কার হতে পারে?
টিকাঃ
১ আহমাদ: ৫১৯
২ সহীহ মুসলিম: ১৮২৮
৩ সহীহ মুসলিম: ১৭৩২ ৪ আহমাদ: ১২১৯ * সহীহ আল বুখারী ৪৩৪৪,২৩৪৫ সহীহ মুসলিম: ১৭৩৩ * সহীহ আল বুখারী ৬৯, সহীহ মুসলিম: ১৭৩২
৪ শরহে নববী: ৪১/১২ ফাতহুল বারী: ১৬৩/১