📄 দান ও বদান্যতা
বদান্যতা ও মহানুভবতার দশটি স্তর রয়েছে যা নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ
(১) আত্মার বদান্যতা : আর এটাই সর্বস্তরের উঁচু মানের বদান্যতা।
(২) নেতৃত্বের বদান্যতা : দাতা তার সাধনা দিয়ে মানুষের উপকার করে। নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অপরের প্রয়োজন পূরণকে অগ্রাধিকার দেয়।
(৩) নিজের আরাম আয়েশের বদান্যতা : যিনি অন্যের উপকারের জন্য নিজের আরাম-আয়েশ ত্যাগ করেন।
(৪) ইলম ও তার শিক্ষার বদান্যতা, এটাও উঁচু স্তরের বদান্যতা, যা মাল- সম্পদের বদান্যতা থেকে উত্তম।
(৫) নিজের মান মর্যাদা দিয়ে বদান্যতা. যেমন শাফাআত ও অন্যান্য বিষয়।
(৬) শারীরিক বদান্যতা : বিভিন্নভাবে শরীরের সামর্থ্য ব্যয় করে অন্যের প্রতি বদান্যতা, যেমন দু ব্যক্তির মাঝে মীমাংসা করা ছদকাতুল্য। কোন ব্যক্তিকে যানবাহনে আরোহণে সাহায্য করা, তার পণ্য সামগ্রী তার কাছে তুলে দেয়া বা তার উপর বহন করতে তাকে সাহায্য করা ছদকাতুল্য। সুন্দর কথা বলাও ছদকাতুল্য।
(৭) ক্ষমার বদান্যতা : যেমন কেহ তাকে গালি দিল তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন বা গীবত করল বা তার জন্য অমর্যাদাকর কিছু করল।
(৮) ধৈর্যের বদান্যতা, যেমন ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করা, এটা সম্পদ দিয়ে উপকার করার চেয়ে উপকারী।
(৯) সুন্দর চরিত্রের বদান্যতা : যেমন হাস্য-ভাব, সদালাপ, এটা ধৈর্যের বদান্যতার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
(১০) মানুষের কাছে পাওনা ছেড়ে দেয়ার বদান্যতা। ফলে তিনি তা আর চাইতেন না।
প্রত্যেক স্তরের বদান্যতার জন্য অন্তরে বিশেষ বিশেষ প্রকারের প্রতিক্রিয়া রয়েছে। আল্লাহ তাআলা দাতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়ার ও কৃপণকে কমিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন।
আর আল্লাহ তাআলাই আমাদের শেষ আশ্রয়।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক প্রকারের বদান্যতা ও মহানুভবতার গুণে গুণান্বিত এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধন-সম্পদ ব্যয় করে যে বদান্যতা ও মহানুভবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তার কতিপয় দিক নিয়ে আলোচনা করা হলঃ
১ম দৃষ্টান্ত:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দানে আনাস রা. এর প্রশংসাঃ
* আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন যে, ইসলামের নামে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট কোন কিছু চাওয়া হলে দান করতেন। তিনি বলেন, তার নিকট এক ব্যক্তি আসল অতঃপর তিনি তাকে দু' পাহাড়ের মাঝখানের সব বকরী দিয়ে দিলেন। এরপর সে তার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে আসল এবং বলল হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ কর কেননা মুহাম্মাদ এমন দান করে যে, সে দারিদ্রতার ভয় করে না।'
এই মহান ঘটনাগুলো নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দান ও তার সীমাহীন বদান্যতার প্রমাণ করে।
* তিনি দান করতেন আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে মানুষকে ইসলামের প্রেরণা দেয়ার জন্য ও তাদের আত্ম প্রশান্তির জন্য। প্রথমে কোন ব্যক্তি ইসলাম প্রকাশ করত ইহকালীন সুবিধা ভোগ করার জন্য, অতঃপর আল্লাহ তার রাসূলের আকর্ষণে ও ইসলামের নূরের কারণে তার অন্তর ইসলামের প্রকৃত ঈমানের জন্য খুলে যেত এবং ইসলাম তার অন্ত রে গেঁথে যেত। তখন ইসলাম তার নিকট পৃথিবী ও তার মধ্যে যা আছে তা অপেক্ষা উত্তম হয়ে যেত।
২য় দৃষ্টান্তঃ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদান্যতা সম্পর্কে সাফওয়ানের প্রশংসা মূলক বর্ণনা:
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা অভিযানে বের হলেন, এবং তার সাথে মুসলমানরা বের হল। অতঃপর তারা হুনাইনে যুদ্ধ করলেন, আল্লাহ তাআলা তার দীন ও মুসলমানদের সাহায্য করলেন, সে দিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফওয়ান বিন উমাইয়াকে একশত বকরী দিলেন অতঃপর আরো একশত। তারপর আবার একশত, এভাবে মোট তিনশত বকরী দিলেন। সাফওয়ান বলল, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে দেয়ার মত দিয়েছেন। অথচ তিনি আমার কাছে সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত। তিনি আমাকে দিতে থাকলেন, এক সময় তিনি আমার নিকট সবচেয়ে বেশি প্রিয় হয়ে গেলেন।'
আনাস রা. বলেন কোন কোন ব্যক্তি দুনিয়ার সুবিধার্থে ইসলাম গ্রহণ করত ইসলাম গ্রহণ মাত্রই তার নিকট তা দুনিয়া ও তার ধন-সম্পদ অপেক্ষায় উত্তম হয়ে যেত।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাউকে দুর্বল ঈমান ওয়ালা দেখলে তাকে প্রচুর পরিমাণে দান করতেন। তিনি বলেন, 'আমি যখন কোন ব্যক্তিকে দান করি। তার থেকে আমার অন্য কিছু উদ্দেশ্য থাকে। তাহল তাকে যেন উপুর করে আগুনে নিক্ষেপ করা না হয়।' অর্থ্যাত তাকে শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত করা আমার দানের একটি উদ্দেশ্য। এজন্যই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশদের এক এক জনকে একশো করে উট দিতেন।
৩য় দৃষ্টান্তঃ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুশরিক মহিলার সাথে যে আচরণ করেছেন
• মুশরিক মহিলা যে পানির মশক নিয়ে যাচ্ছিল তার সাথে রাসূলের মহৎ চরিত্রের বর্ণনাঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মশক থেকে সাহাবীদের পানি পান করার পর সে আগের তুলনায় দু মশক আরো বেশি পানি ভরা অবস্থায় ফিরে গেল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবীদের বললেন তার জন্য যে খেজুর আটা, সাতু আছে তা নিয়ে এসো। তারা তার জন্য অনেক খাদ্য একত্র করলেন এবং তা একটি কাপড়ে রাখলেন, তার উটে তা বহন করিয়ে দিলেন কাপড়টি তার সামনে রাখলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন যে, 'তুমি এগুলো নিয়ে যাও ও তোমার পরিবারকে খেতে দাও। আর জেনে রাখ! আমরা তোমার কিছু কমিয়ে দেয়নি। তোমার থেকে কিছুই গ্রহণ করিনি। আল্লাহই আমাদের পানি পান করিয়েছেন।'
এ ঘটনায় আরো বর্ণিত আছে, যে মহিলাটি তার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে গিয়ে বলল, 'আমি সবচেয়ে বড় যাদুকরের কাছ থেকে এসেছি অবশ্য তার লোকেরা তাকে নবী বলে জানে।' আল্লাহ তাআলা ঐ মহিলার কারণে একটি সমাজকে হেদায়াত দান করলেন। ফলে সে ও তারা সকলে ইসলাম গ্রহণ করল।'
আরেক বর্ণনায় আছে যে, মুসলমানরা তার আশে পাশের মুশরিকদের আক্রমণ করত কিন্তু সে এলাকায় তারা আক্রমণ করত না, যেখানে সে মহিলা রয়েছে।
সে মহিলা একদিন তার সম্প্রদায়কে বলল, 'এই সম্প্রদায় (মুসলিমগন) নিজেদের স্বার্থে তোমাদের দাওয়াত দেয় আমি তা মনে করি না। অতএব তোমরা কি ইসলামের অংশ নিবে?' অতঃপর তারা তার কথা মেনে ইসলাম গ্রহণ করল।'
এই মহিলার ইসলাম গ্রহণের দুটি কারণ:
১ম কারণ: যা সে অবলোকন করেছে: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবারা তার মশক দুটো থেকে থেকে পানি নিয়েছে তবে তার পানি কোন অংশে কমেনি। এটা নবীর অলৌকিকতা যা তার রিসালতের সত্যতার পরিচায়ক।
২য় কারণ :
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বদান্যতা: যখন তিনি সাহাবীদের তার জন্য খাদ্য পানীয় একত্র করতে আদেশ করলেন তখন তারা তার জন্য অনেক খাদ্য- পানীয় একত্র করলেন।
আর তার সম্প্রদায় তার কথায় ইসলাম গ্রহণ করল। কারণ, মুসলমানরা নবীর আদেশে তার সম্প্রদায়কে দেখাশোনা করত, তাদের ইসলামে আকৃষ্ট করার জন্য। এটাই পরে তাদের ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়।
এই উপরোক্ত দৃষ্টান্তসমূহ রাসূলের বদান্যতার কিছু নমুনামাত্র। এ থেকে আমাদের রাসূলের অনুসরণ তার শিক্ষা, দাওয়াতে তার আদর্শ ও সর্বক্ষেত্রে তাকে আলোকবর্তিকা হিসাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন。
টিকাঃ
১ সহীহ আল বুখারী ৫৮০/৬ ২ সহীহ আল বুখারী ৪৪৮/১
📄 ন্যায়পরায়ণতা
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ন্যায়পরায়ণতার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, 'সাত ব্যক্তিকে আরশের ছায়ায় স্থান দেয়া হবে, যে দিন আরশের ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না। এদের মধ্যে আছেন ন্যায়পরায়ণ শাসক....'
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরা রহমানের ডান পার্শ্বে নূরের মঞ্চে আরোহণ করবে। আসলে আল্লাহর দুটো হাতই ডান হাত। যে সকল ব্যক্তি তাদের শাসন কার্যে, পরিবার পরিচালনায় ও অধীনস্থদের ব্যাপারে ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করেছে তারা এ মর্যাদার অধিকারী হবে।'
ন্যায়পরায়ণতার ক্ষেত্র হল বিশাল-বিস্তৃত। দেশ শাসনে ন্যায়পরায়ণতা, বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা, আল্লাহর আইন ও বিধান প্রয়োগে ন্যায়পরায়ণতা, মানুষের সাথে লেনদেন করার ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা, মানুষের মধ্যে সালিশ ও মীমাংসার ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি, শত্রুদের সাথে আচার-আচরণে ন্যায়পরায়ণতা, সন্তান- সন্ততির ব্যাপারে ন্যায়, স্ত্রী পরিজনের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ন্যায় বিচারের কয়েকটি দৃষ্টান্ত: প্রথম দৃষ্টান্ত : মাখযুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত মহিলা একবার চুরি করল। মহিলার এ বিষয়টি কুরাইশদের ভাবিয়ে তুলল। কারণ বংশের দিক দিয়ে সে ছিল অত্যন্ত সম্মানিত। তারা মহিলার শাস্তি মওকুফ করতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট মধ্যস্থ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল। তারা বলল যে, 'কে এ বিষয়ে রাসূলের সাথে কথা বলতে পারে?' তারা মত দিল, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় ব্যক্তি হল উসামা বিন যায়েদ। সে-ই এ দুঃসাহস দেখাতে পারে। অতঃপর এ মহিলাকে রাসূলুল্লাহর দারবারে আনা হল। তারপর তার ব্যাপারে উসামাহ বিন যায়েদ রা. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট শাস্তি মওকুফের সুপারিশ করলেন। তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল এবং বললেন, 'তুমি কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তির ব্যাপারে সুপারিশ করছ?' অতঃপর উসামা বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।' এরপর বিকেলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন, তিনি আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন, অতঃপর বললেন, 'শুনে রাখ! তোমাদের পূর্ববর্তীগণ ধ্বংস হয়েছে এজন্য যে, তাদের মধ্যে কেউ কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তারা তাকে শাস্তি ব্যতীত ছেড়ে দিত। আর যখন কোন দুর্বল ব্যক্তি চুরি করত তাহলে তারা তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আর আমি ঐ সত্ত্বার শপথ করে বলছি যার হাতে আমার জীবন, যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করে তাহলে আমি তার হাত কেটে দেব।' এরপর সে মহিলার হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দেয়া হল। আয়েশা রা. বলেন, 'সে মহিলা পরে সুন্দর তাওবা করেছে, বিবাহ করেছে। মাঝে মাঝে সে আমার কাছে আসত। আমি তার প্রয়োজনের কথাগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে উপস্থাপন করতাম।'
ন্যায়পরায়ণতা হল অন্যায়-অবিচারের বিপরীত। আল্লাহ তাআলা সর্বক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দিয়েছেন। সকল কথায় ও সকল কাজে। তিনি বলেছেন:
وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى "যখন তোমরা কথা বলবে ন্যায়সংগতভাবে বলবে, আত্মীয়-স্বজন সম্পর্কে হলেও।"
وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ "যখন তোমরা মানুষের মাঝে বিচার-ফয়সালা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে।”
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: নোমান ইবনে বশীর ও তার ছেলের ব্যাপারে: নুমান বিন বশীর মিম্বরে বসে বলেন যে, আমার পিতা আমাকে অতিরিক্ত দান করলেন কিন্তু উমরাহ বিনতে রাওয়াহা অসন্তোষ প্রকাশ করে বললেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে যেয়ে ফয়সালা ব্যতীত আমি এটা মেনে নিব না।' অতঃপর বশীর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে আসলেন এবং বললেন, 'আমি উমরাহ বিনতে রাওয়াহার ঘরে আমার ছেলেকে অতিরিক্ত সম্পদ দান করেছি। অতঃপর সে আমাকে আদেশ করেছে আপনার অনুমোদন নেয়ার জন্য। হে আল্লাহর রাসূল!' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কি তোমার সব ছেলেকে এভাবে অতিরিক্ত দিয়েছ?' তিনি বললেন, 'না', রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমার ছেলেদের মধ্যে ন্যায় সঙ্গত আচরণ কর।' বশীর ফিরে চলে গেল এবং তার অতিরিক্ত দান ফিরিয়ে নিল।
আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার কি আরো সন্তান আছে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, আছে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কি সবাইকে এ রকম দিয়েছো?' বললো, 'না,' রাসূল বললেন, 'তাহলে আমি অন্যায় অবিচারের সাক্ষী হতে পারি না।'
এ হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তানদের ব্যাপারে ন্যায়-ভিত্তিক আচরণ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখতে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের শায়খ ইমাম আব্দুল আযীয ইবনে বায রহ. বলেছেন, এ হাদীস দিয়ে স্পষ্ট প্রমাণিত হল যে, সন্তানদের মধ্যে কাউকে বেশি দেয়া জায়েয নয়। এটা তাদের মধ্যে বৈষম্য ও শত্রুতা সৃষ্টির নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে।
তৃতীয় দৃষ্টান্ত: স্ত্রী পরিজনের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ন্যায়ভিত্তিক আচরণ
স্ত্রীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ন্যায়পরায়ণতার বাস্তবায়ন করেছেন যথাযথভাবে। তিনি যতটুকু সম্ভব রাত্রি যাপন, খাদ্য-বস্ত্র দান, স্থায়ী বা অস্থায়ী সর্বাবস্থায় সকল বিষয়ে তাদের মধ্যে পরিপূর্ণ সমভাগে ভাগ-বণ্টন করেছেন। তিনি প্রত্যেকের নিকট এক রাত্র করে অবস্থান করতেন। নিজের হাতে যা রয়েছে তা তাদের প্রত্যেকের উপর সমভাবে খরচ করতেন। প্রত্যেকের জন্য একটি করে কক্ষ নির্মাণ করেছেন। যখন তিনি ভ্রমণে যেতেন তখন তাদের মধ্যে লটারি দিতেন। যার ভাগ্যে লটারি আসত তাকে নিয়ে সফরে যেতেন। এ ব্যাপারে তিনি শিথিলতা করতেন না। এ সমতা ছিল তার আমরণ। তার অসুস্থ অবস্থায় তাদের পালা অনুসারে তাকে প্রত্যেক স্ত্রীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হত। আর যখন এটা করা অসম্ভব হয়ে গেল, তখন সকলে বুঝে নিল যে, তিনি আয়েশার ঘরে থাকতে চান। তারা সকলে আয়েশার ঘরে চিকিৎসা করার অনুমতি দিল। তিনি সেখানে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অবস্থান করলেন। এত পরিমাণ সমতা রক্ষা করা সত্ত্বেও তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করছেন এবং বলেন- اللهم هذا قسمي فيما أملك، فلا تلمني فيما تملك لا أملك 'হে আল্লাহ এ হল আমার ভাগ-বণ্টন। যার মালিক আমি। আর আপনি যার মালিক আমি যার ক্ষমতা রাখি না, সে ব্যাপারে আমাকে তিরস্কার করবেন না।”
অর্থ্যাত বৈষয়িক ভাগ-বণ্টনে আমি সমতার বাস্তবায়ন করলাম কিন্তু আমি অন্তরের মালিক নই। কাজেই আমার অন্তর যদি করো প্রতি ঝুঁকে যায় তবে সে জন্য আমাকে আপনি শাস্তি দেবেন না। অন্তরের উপর ক্ষমতা তো আপনারই।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক স্ত্রীর দিকে অন্য স্ত্রীর তুলনায় বেশি ঝুঁকে যেতে নিষেধ করেছেন এবং তিনি বলেছেন- যার দুজন স্ত্রী রয়েছে অতঃপর সে একটার দিকে বেশি ঝুঁকে যায় সে কেয়ামতের দিন এক পার্শ্ব বাঁকা অবস্থায় উপস্থিত হবে।
অত্র হাদীসখানার মাধ্যমে যে আন্তরিক টানের ব্যাপারে মানুষের ইচ্ছাশক্তি কার্যকর, তা হারাম সাব্যস্ত হয়। আর যেটি মানুষের আয়ত্বের বাইরে, সেটি সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا "আল্লাহ তাআলা কাউকে সামর্থ্যের বাইরে আদেশ করেন না।”
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ "তোমরা আল্লাহকে সামর্থ্য অনুযায়ী ভয় কর।" তিনি আরো বলেন:
وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ المُيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالمُعَلَّقَةِ "আর তোমরা চাইলেও স্ত্রীদের মাঝে সমতা বজায় রাখতে পারবে না। অতএব, তোমরা কারো প্রতি পূর্ণ ঝুঁকে পড়ো না, ফলে একজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় ছেড়ে দেবে।" উল্লেখিত হাদীসের সতর্ক বাণী শুধুমাত্র তার ক্ষেত্রে, যে ইচ্ছাকৃত বৈষম্যমূলক আচরণ করে। আর সে কেয়ামত দিবসে মুখের এক পার্শ্ব বক্র অবস্থায় উঠবে। এটি একটি স্পষ্ট শাস্তি। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শিক্ষা হলো, যে ব্যক্তি কুমারী নারী বিবাহ করবে, সে সাত দিন একাধারে তার সাথে অবস্থান করবে, এবং এরপর থেকে সকল স্ত্রীদের মাঝে সঙ্গ দেয়ার পালা বণ্টন শুরু করবে, যদি তার একাধিক স্ত্রী থাকে। আনাস রা. এর হাদীসে বর্ণিত আছে -
من السنة إذا تزوج الرجل البكر على الثيب أقام عندها سبعاً ثم قسم، وإذا تزوج الثيب أقام عندها ثلاثا ثم قسم.
"কোন ব্যক্তি অন্য স্ত্রী থাকা অবস্থায় যদি কুমারী মেয়ে বিবাহ করে, তার সাথে একাধারে সাত দিন রাত্রিযাপন করবে, অতঃপর পালা বণ্টন শুরু করবে। আর যদি অকুমারী নারী বিবাহ করে, তাহলে তিন দিন অবস্থান করে পালা বণ্টন শুরু করবে।' উম্মে সালামা রা. এর বর্ণনা- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাকে বিবাহ করলেন, তখন তার সাথে তিন দিন অবস্থান করেছেন এবং বলেছেন, 'তোমার কোন সমস্যা নেই, ইচ্ছা করলে আমি তোমার নিকট সাত দিন থাকতে পারি, তবে তোমার ঘরে সাত দিন রাত্রিযাপন করলে অন্য স্ত্রীদের ঘরেও সাত দিন করে থাকতে হবে।'" আয়েশা রা. কর্তৃক বর্ণিত- সাওদা বিনতে যামআ রা. স্বীয় দিনটি আয়েশা রা. কে দান করেছেন, ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্যে নিজের ও সাওদার উভয় দিন তার কাছে যাপন করতেন। আয়েশা রা. থেকে আরো বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালা বণ্টনের ক্ষেত্রে আমাদের কাউকে কারো উপর প্রাধান্য দিতেন না। খুব কম দিনই তিনি আমাদের সকলের কাছে যেতেন। তবে গভীর মেলা-মেশা করা ব্যতীত সকলের নিকটবর্তী হতেন। সর্বশেষ তার নিকট গিয়ে রাত্রি যাপন করতেন, যার পালা রয়েছে। সাওদা রা. বয়স্ক হয়ে যখন এই আশঙ্কা করলেন যে, রাসূল হয়তোবা তাকে দূরে ঠেলে দেবেন, তখন বলেছিলেন, আমি আমার দিনটি আয়েশাকে দিয়ে দিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেন, আয়েশা রা. বলেন, 'সাওদা এবং তার মত মহিলাদের ব্যাপারেই নিগোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় -
وَإِنِ امْرَأَةٌ خَافَتْ مِنْ بَعْلِهَا نُشُوزًا أَوْ إِعْرَاضًا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يُصْلِحَا بَيْنَهُمَا صُلْحًا
"যদি কোন নারী তার স্বামীর পক্ষ থেকে রূঢ়তা কিংবা উপেক্ষার আশঙ্কা করে, তবে তারা পরস্পর আপোশ করে নিলে তাদের কোন গুনাহ নেই।”
ইবনে বায রহ. ঘটনাটি বর্ণনা করে মন্তব্য করেছেন, 'এর দ্বারা বুঝা গেল, যদি কোন নারী নিজের অধিকার থেকে সরে আসে তবে তা তার জন্য বৈধ। যেমন স্বামীর সন্তুষ্টি সাপেক্ষে নিজের পাওনা দিনটিকে অন্য একজন সতীনকে দান করে দিতে পারে।
সকল স্ত্রীদের জন্যে সম্মিলিত সময় ছিল আসরের পরের সময়টি। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসর সালাত আদায় করে স্ত্রীদের সান্নিধ্যে যেতেন。
গ্রন্থকার বলেন, আমার শায়েখ ইবনে বায রহ. কে বলতে শুনেছি, এ হাদীসটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তম চরিত্রের প্রতি দিক-নির্দেশ করে। তিনি ছিলেন স্বীয় পরিবারের নিকট সর্বোত্তম ব্যক্তি。
তিনি প্রতিদিন আসর সালাতের পর স্ত্রী গণের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের খোঁজ খবর নিতেন। তবে তিনি ঐ সময় তাদের সাথে মেলামেশা করতেন না। অবশ্য কখনও কখনও সকলের সাথে মেলামেশা শেষ করে একবার গোসল করতেন, যেমনটি আনাস রা. এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তবে এটি ছিল বিরল。
আয়েশা রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীস ও আনাস রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের মধ্যে এভাবে সমাধান করা যায় যে, সকল স্ত্রীর সাথে মেলামেশা শেষ করে একবার গোসল করার বিষয়টি খুব কম সময়ই হয়েছিল。
আনাস রা. এর বর্ণনা নিরূপ:
'নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে ও দিনে একই সময়ে এগারো জন স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করতেন, আনাস রা. কে জিজ্ঞেস করা হল, 'এটা কি করে সম্ভব?' তিনি বললেন, 'আমরা জানি, তাকে ত্রিশজন পুরুষের শক্তি দেয়া হয়েছে।' সাঈদ রহ. কাতাদার বরাত দিয়ে আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, তাতে নয়জন বিবির উল্লেখ রয়েছে।'
হাফেয ইবনে হাজার রহ. এর সমাধানে বলেছেন, স্ত্রীর সংখ্যা নয়জনই ছিল, তবে মারিয়া ও রায়হানা নামে দুইজন বাঁদীকেও নয়জনের সাথে যোগ করে দেয়া হয়েছে। আমার উস্তাদ ইবনে বায রহ. থেকে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'এটি একটি আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি। কারণ নয়জন বিবি, তার উপর আবার মারিয়া ও রায়হানা নামে দু'জন বাঁদী। এর দ্বারা বুঝা গেল এক ব্যক্তি একাধিক স্ত্রীর সাথে তাদের যৌথ সময়ের মধ্যে মেলামেশা করতে পারে, এটি শুধু জায়েয ই নয়, বরং এটি সুন্নত। এটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ।
আনাস রা. এর হাদীসে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নয়জন স্ত্রীর জন্য দিন ভাগ করা ছিল। তিনি প্রথম স্ত্রীর নিকট নয়দিন পরই যেতেন। তিনি যেদিন সকলের সাথে মেলামেশা করতেন সেদিন সবাই এক বাড়িতে একত্রিত হত।'
আমার উস্তাদ ইবনে বায রহ. বলতেন, প্রতিদিন আসর বাদ সবার সাথে দেখা করতেন সেটি ভিন্ন ব্যাপার। এভাবেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে সম্প্রীতি ও ভালবাসার সৃষ্টি করতেন এবং সকল প্রকার বৈরী ভাব দূর করতেন। কেননা সতীনদের মাঝে দূরত্ব থাকাটাই স্বাভাবিক। রাতের বেলা সকলে একত্রিত হলে নিজেদের মধ্যে মুহাব্বত বাড়ে। স্ত্রীদের মাঝে ইনসাফ ঠিক রাখার জন্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন তাদের মাঝে লটারীর ব্যবস্থা করতেন। লটারীতে যার নাম উঠত, সেই তার সাথে সফরে যেত。
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইনসাফ ও উত্তম আখলাকের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আনাস রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে সুস্পষ্ট হয়, যা নিরূপ:
একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক স্ত্রীর ঘরে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় অন্য আরেক স্ত্রী পেয়ালায় করে কিছু খাদ্য-দ্রব্য পাঠালেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার ঘরে অবস্থানরত, তিনি খাদেমের হাত থেকে পেয়ালা ফেলে দিয়ে তা ভেঙ্গে দেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাঙ্গা পেয়ালার টুকরো জমা করে তাতে খাবার উঠাতে লাগলেন এবং বললেন, 'তোমাদের মা রাগ করেছে।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদেমকে আটকে রেখে ওর ঘর থেকে একটি ভাল পেয়ালা নিয়ে, যার পেয়ালা ভাঙ্গা হয়েছে তার ঘরে পাঠিয়ে দিলেন, আর ভাঙ্গাটি এ ঘরে রেখে দিলেন。
অত্র হাদীসমূহের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চরিত্রের সুমহান দিকগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরা হলো।
টিকাঃ
১ সহীহ আল বুখারী ৬৬০, সহীহ মুসলিম ১০৩১ ২ সহীহ মুসলিম ১৮২৭
২ সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম কিতাবুল হুদুদ ৩ সূরা আল আনআম ১৫২ * সূরা আন-নিসা ৫৮
৩ সূরা আল-বাকারা: ২৮৬ ৪ সূরা আত-তাগাবুন:১৬ * সূরা আন-নিসা: ১২৯
৪ সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম * সহীহ মুসলিম * সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম
📄 বিনয় ও নম্রতা
নম্রতা একটি মহৎ গুণ, এ কারণেই আল্লাহ তাআলা নম্র লোকদের প্রশংসা করেছেন। এরশাদ হচ্ছেঃ
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا ﴿٦٣﴾ الفرقان "রহমানের বান্দাগণ যখন যমীনের উপর চলে, তখন তারা খুব নম্র হয়ে চলে। আর যখন মুর্খ লোকেরা তাদেরকে সম্বোধন করে, তখন তাদেরকে শান্তির বাণী শুনিয়ে দেয়।"
মুসলমান বিনয়ী হলে, আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে মর্যাদার আসনে উন্নীত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সদকা করলে সম্পদ কমে না, ক্ষমা করলে আল্লাহ তাআলা সম্মান বাড়িয়ে দেন, আর বিনয়ী হলে মর্যাদা উঁচু করে দেন।'
আর এটি একজন মুসলমানের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষের অন্তর প্রশস্ত করে দেয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। নম্র হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলাই দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষের মাঝে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। অপরদিকে যে ব্যক্তি মানুষের উপর অহংকার করে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে তাকে অপদস্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন আবু হুরাইরা রা. ও আবু সায়ীদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অহংকার আল্লাহর পরিচ্ছদ, গর্ব তার চাদর, আল্লাহ বলেন, "যে ব্যক্তি আমার হক নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে, আমি তাকে কঠিন শাস্তি দেব।"
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অধিক মাত্রায় বিনয়ী। তার বিনয়ের কতিপয় দৃষ্টান্ত নিম্নে উল্লেখ করা হল:
(১) আদবা নামক উষ্ট্রীর ঘটনা: আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর 'আদবা' নামে একটি উষ্ট্রী ছিল। তাকে কখনও পরাজিত করা যেত না, একদা কোন এক গ্রাম্য ব্যক্তি তার একটি বাহন এনে সেটিকে পরাজিত করে ফেলল, বিষয়টি মুসলমানদের অনুভূতিকে মারাত্মকভাবে আহত করল, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আল্লাহ কোন বস্তু দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেয়ার পূর্বে সেটিকে নিচু করে দেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই হলেন আমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ। তিনি মানুষকে দাওয়াত দেয়ার সময় নম্রতা অবলম্বন করতেন।
(২) আবু মাসউদ রা. কর্তৃক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিনয়ের বর্ণনা: আবু মাসউদ রা. বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে কথা বলার সময় ভয়ে কাপতেছিল। রাসূল তাকে বললেন, 'তুমি স্বাভাবিক হয়ে কথা বল, কেননা আমি এমন এক মহিলার ছেলে, যে শুকনো গোস্ত টুকরো টুকরো করে খেয়ে জীবন ধারণ করতো।' হাকেম রহ. জরীর রা. এর বর্ণনায় কিছুটা বাড়িয়ে বলেছেন, তাহল, অতঃপর জরীর রা. এই আয়াত পাঠ করেছেন:
وَمَا أَنْتَ عَلَيْهِمْ بِجَبَّارٍ فَذَكِّرْ بِالْقُرْآنِ مَنْ يَخَافُ وَعِيدِ "তুমি তাদের প্রতি জোর-জবরদস্তিকারী নও। যে আমার শাস্তির ভয় করে তাকে তুমি কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও।”
অতএব, সকল মানুষকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ করা অতীব জরুরী। তিনি দাওয়াতী ময়দানে ছিলেন খুবই বিনয়ী। তিনি শিশুদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে তাদেরকে সালাম দিতেন। ছোট্ট বালিকা তার হাত ধরে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারত। তিনি ঘরে থাকা অবস্থায় পরিবারের খেদমত করতেন। ব্যক্তিগত কারণে কারো উপর প্রতিশোধ নিতেন না। জুতা সেলাই করতেন। কাপড়ে তালি লাগাতেন। বকরী দোহন করতেন। উটকে ঘাস খাওয়াতেন। চাকর-বাকরদের সাথে খাবার খেতেন। মিসকীনদের সাথে উঠাবসা করতেন। বিধবা ও এতিমের সাথে তাদের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য হাটতেন। কারো সাথে সাক্ষাৎ হলে প্রথমেই সালাম দিতেন। কেউ দাওয়াত দিলে তা অল্প হলেও গ্রহণ করতেন। মোটকথা তিনি নিজেকে অপদস্ত না করে ছিলেন বিনয়ী। অপচয় না করে ছিলেন দানশীল। ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী, মুমিনদের সামনে আপন বাহুকে ঝুকিয়ে দিতেন।'
(৩) অন্য নবীগণকে নিজের উপর মর্যাদা দেয়া: এক ব্যক্তি তাকে বলল: يَا خَيْرَ الْبَرِيَّةِ (হে সৃষ্টির সেরা), একথা শুনে তিনি বললেন, 'তিনি ছিলেন ইব্রাহীম আ.।" কারো একথা বলা উচিত নয় যে, আমি ইউনুসের চেয়ে উত্তম।" তিনি নবী রাসূলগনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। সকল মানুষের নেতা এতে কোন সন্দেহ নেই। তিনি নিজেই বলেন: أنا سيد الناس يوم القيامة 'কিয়ামত দিবসে আমি হবো মানবজাতির নেতা।' তা সত্ত্বেও তিনি বিনয় প্রদর্শন করতে যেয়ে এ কথাগুলো বলেছেন。
তার বিনয়ী হওয়ার আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো, তার দরজায় কোন দারোয়ান থাকতনা, তিনি রুগ্ন ব্যক্তিদের ঝাড়-ফুঁক করতেন, তাদের আরোগ্যের জন্যে দুআ করতেন, ছোট শিশুর মাথায় হাত বুলাতেন, তাদের জন্যে দুআ করতেন, তিনি তার সাহাবীদের জন্যে সুপারিশ করতেন, এবং তিনি বলতেন, 'তোমরা সুপারিশ কর, প্রতিদান পাবে, আর আল্লাহ তার নবীর যবানে যা চাইবেন তা-ই ফয়সালা করবেন।'
আনাস রা. কে তিনি আদর ও স্নেহ করে يا بني (হে ছেলে) বলে ডাক দিতেন।'
তার বিনয়ী হওয়ার আরেকটি উদাহরণ হলো: এক মহিলা মসজিদ ঝাড়ু দিত। এক রাতে সে মারা গেলে লোকজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তাকে দাফন করে ফেলল। আল্লাহর রাসূল তার মৃত্যুর কথা শুনতে পেয়ে বললেন, 'আমাকে তার কবর দেখিয়ে দাও' অতঃপর তিনি বললেন, 'নিশ্চয়ই এ সকল কবরসমূহ কবর বাসীর জন্যে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আমার দুআর মাধ্যমে তাদের কবর আলোকিত করে দেন।'
আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, 'আমি একটানা দশ বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে ছিলাম, কখনও তিনি আমার কাজে উহ! শব্দও উচ্চারণ করতেন না। যেটি করে ফেলেছি সেটির ব্যাপারে বলতেন না, 'কেন করেছ?' আর যেটি করিনি সেটির ব্যাপারে বলতেন না, 'কেন করনি?' তিনি ছিলেন মানুষের মাঝে উত্তম চরিত্রের অধিকারী।"
টিকাঃ
১ সূরা আল-ফুরকান: ৬৩ ২ সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮ • শরহে নববী (সহীহ সহীহ মুসলিম এব ব্যাখ্যা গ্রন্থ): ১৬/১৪২ * সহীহ মুসলিম: ২৬২০
২ মাদারিজুস সালেকীন: ২/৩২৮ ৩ সহীহ মুসলিম: ১৩৬৯ * সহীহ আল-বুখারী: ৪৬৩০, সহীহ মুসলিম: ২৩৭৬ * সহীহ আল-বুখারী: ৩৩৪০, সহীহ মুসলিম: ১৯৪ * সহীহ আল-বুখারী: ১২৮৩ * সহীহ আল-বুখারী: ৭২১০ * সহীহ আল-বুখারী: ১৪৩২, সহীহ মুসলিম: ২৬২৭
📄 সহনশীলতা ও ক্ষমা
আল্লাহর পথে আহবান করতে গিয়ে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। নিম্নে কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হলোঃ
এক: যে ব্যক্তি বলেছিল, এ বণ্টনে ইনসাফ করা হয়নি, তার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ:
ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, হুনাইনের যুদ্ধের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু লোককে বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিলেন। আকরা ইবনে হাবেস রা.কে একশত উট, উয়াইনাকেও তদ্রুপ দিলেন। আরবের কিছু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গকেও সেদিন বেশি দেয়া হয়েছিল। তখন এক ব্যক্তি এই বলে মন্তব্য করল যে, 'এ বণ্টনে ইনসাফ করা হয়নি। এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য ছিল না।' আমি মনে মনে বললাম, 'আল্লাহর কসম আমি এ সংবাদটি অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানিয়ে দেব।' আমি সংবাদ দিলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আল্লাহ ও তার রাসূল ইনসাফ না করলে আর কে আছে ইনসাফ করবে? মূসার উপর আল্লাহ দয়া করুন, তাকে এর চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন।' এটি দাওয়াতী ময়দানে ধৈর্য ধারণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিকমত এই ছিল যে, গণীমতের মালসমূহ দুর্বল ঈমানদারদের মাঝে বণ্টন করা, আর মজবুত ঈমানদারদেরকে তাদের ঈমানের উপর সোপর্দ করা।
দুই: যে বলেছিল আমরাই এর বেশি উপযুক্ত, তার ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ:
আবু সায়ীদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, আলী ইবনে আবু তালেব রা. ইয়েমেন থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে চামড়ার থলে ভর্তি কিছু স্বর্ণ পাঠালেন। সেগুলো তিনি চার জনের মাঝে বণ্টন করলেন; উআইনা ইবনে বদর, আকরা ইবনে হাবেস, যায়েদ আল-খাইল,' চতুর্থ জন আলকামা অথবা আমের ইবনে তুফায়েল। এক সাহাবী মন্তব্য করলো, 'আমরা তাদের তুলনায় অধিক হকদার।' কথাটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কানে পৌঁছলে, তিনি বললেন, 'তোমরা কি আমাকে বিশ্বস্ত মনে কর না? আমি আসমান- যমীনের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি। আমার নিকট সকাল-সন্ধ্যায় আসমানের সংবাদ আসে।' তখন এক ব্যক্তি দাঁড়াল, যার চোখ দুটো গর্তে ঢুকানো, গাল দুটো উঁচু, কপালটি বহির্গত, ঘন দাড়িযুক্ত, মাথা মুণ্ডানো, লুঙ্গি উপরে তোলা। সে বলল, 'হে রাসূল! আল্লাহকে ভয় করুন! রাসূল বললেন, 'এই হতভাগা, আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে আমি কি যমীনবাসীর মধ্যে অধিক অগ্রগামী নই।' বর্ণনাকারী বলেন, 'অতঃপর সে ব্যক্তি চলে গেলো, খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি তার গর্দান উড়িয়ে দেব না?' তিনি বললেন, 'না, সম্ভবত লোকটি নামাজ পড়ে।' খালেদ রা. বললেন, 'এমন অনেক নামাজী আছে, যারা মনে যা নেই তা মুখে বলে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'মানুষের অন্তর ও পেট ছিঁড়ে দেখার জন্যে আমি আদিষ্ট হইনি।' অতঃপর তিনি লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এই ব্যক্তির বংশ থেকে এমন এক জাতির আবির্ভাব ঘটবে, যারা আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করবে, কিন্তু কুরআন তাদের অন্তরে প্রবেশ করবে না। তারা দীন থেকে বের হয়ে যাবে, তীর যেভাবে ধনুক থেকে বের হয়ে আসে। আমি যদি তাদেরকে পাই, তাহলে আদ জাতির মত তাদের হত্যা করে ফেলব।'
এটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহনশীলতার একটি উত্তম দৃষ্টান্ত। তিনি বাহ্যিক অবস্থা দৃষ্টে বিচার করেছেন, অন্তরে কি আছে তা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেননি। লোকটি হত্যাযোগ্য অপরাধ করেছে, কিন্তু তবুও তাকে হত্যা করেননি। যাতে করে মানুষ এ সমালোচনা করার সুযোগ না পায় যে, মুহাম্মাদ তার সাথিদেরকে হত্যা করে, বিশেষ করে লোকটি যখন নামাযী।
তিন: আমের ইবনে তোফাইল রা. এর সাথে আচরণ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমের ইবনে তোফাইল দাউসী রা. এর সাথে সহনশীলতার যে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন, তা অবিস্মরণীয়। তিনি হিজরতের পূর্বে মক্কা নগরীতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। অতঃপর তিনি আপন জাতির নিকট গিয়ে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। তিনি সর্বপ্রথম তার পরিবারের মধ্যে দাওয়াত শুরু করলেন, ফলে তার বাবা ও স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করলো। অতঃপর তার বংশ ও গোত্রের অন্যান্য লোকজনকে দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন। কিন্তু কেউই ঈমান গ্রহণ করেনি। তোফাইল রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললো, 'হে আল্লাহর রাসূল! দাউস গোত্র ধ্বংস হয়েছে, তারা কুফরী করেছে।'
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তোফাইল ইবনে আমর দাওসী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বললেন, 'দাউস গোত্র অস্বীকার করেছে, সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দুআ করুন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিবলামুখী হয়ে দু'হাত তুলে দুআ করলেন। লোকজন বলল, 'তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে আল্লাহ! তুমি দাউস গোত্রকে হেদায়েত দান কর এবং তাদেরকে আমার কাছে হাজির করে দাও।'
এ কাজটি দাওয়াতী মিশনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ধৈর্য ও সহনশীলতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত। তিনি দাওয়াত অস্বীকারকারীকে শাস্তি প্রদান কিংবা তাদের বিরুদ্ধে বদ-দুআ করার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করেননি। বরং তাদের হেদায়েতের জন্যে দুআ করেছেন। আল্লাহ তার দুআ কবুল করেছেন এবং তিনি স্বীয় ধৈর্য, সহনশীলতা ও তাড়াহুড়া না করার পূর্ণ প্রতিফল পেয়েছেন। ফলে তোফাইল রা. তার গোত্রের লোকজনের নিকট ফিরে গেলেন। নরম ভাষায় তাদেরকে দাওয়াত দেয়ার ফলে বহু লোক তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করলো। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বর থাকা অবস্থায় তোফাইল তার নিকট আসলেন। পরবর্তীতে দাউস গোত্রের আশি থেকে নব্বইটি পরিবার নিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য মুসলমানদের সাথে তাদের জন্যেও বরাদ্দ করলেন।” আল্লাহু আকবার।
অতএব, দায়ী ভাইদের ধৈর্য ও সহনশীলতার দিকটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা দরকার। আর তা একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ, অতঃপর নবী-আদর্শের পূর্ণ অনুশীলন ব্যতীত সম্ভব নয়।
চার: যে তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল তার সাথে
সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিমে জাবের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা নজদ অভিমুখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে অভিযানে বের হলাম। আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রচুর কাটাযুক্ত বৃক্ষ সম্বলিত উপত্যকায় অবস্থান করলাম। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাছের নীচে অবতরণ করলেন। তিনি তার তলোয়ারটি গাছের কোন এক ডালে ঝুলিয়ে রাখলেন। আমাদের কাফেলার লোকজন উপত্যকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন গাছের নীচে বিশ্রাম গ্রহণ করতে শুরু করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। এক ব্যক্তি এসে আমার তলোয়ার হাতে নিয়ে নেয়। সাথে সাথে আমি জাগ্রত হলাম, উঠে দেখি, সে আমার মাথার উপর কোষমুক্ত তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতঃপর সে বলল, 'কে তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাবে?' আমি বললাম, 'আল্লাহ।' অতঃপর দ্বিতীয়বার সে বলল, 'কে তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাবে?' আমি বললাম, 'আল্লাহ।' একথা শুনে সে তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে ফেললো, এবং বসে পড়লো। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছু বললেন না।
আল্লাহু আকবার, এটি কত বড় মহানুভবতা! এটি অন্তরে কত বড় প্রভাব ফেলে! একজন বেদুইন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে চেয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাকে ঐ ব্যক্তির হাত থেকে বাঁচালেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও ক্ষমা করে দিলেন! নিশ্চয় এটি একটি মহান চরিত্র। আল্লাহ সত্যিই বলেছেন, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন:
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
"আর নিশ্চয় তুমি মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এহেন আচরণ লোকটির জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলল, এবং পরবর্তীতে সে মুসলমান হয়েছে এবং তার মাধ্যমে অনেক মানুষ উপকৃত হয়েছে।
পাঁচ: পাদ্রী যায়েদের সাথে তার আচরণ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিশোধ গ্রহণের শক্তি থাকা সত্ত্বেও মানুষকে ক্ষমা করে দিতেন। রাগের সময় তিনি ধৈর্যধারণ করতেন। দুর্ব্যবহারকারীর সাথে ভাল ব্যবহার করতেন। উল্লেখিত উঁচুমানের চরিত্রগুলোই তার দাওয়াত কবুল করা, তার প্রতি ঈমান আনার বিষয় সুগম করে দিয়েছে। ইহুদীদের একজন বড় আলেম যায়েদ ইবনে সা'নার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আচরণ দেখিয়েছিলেন তা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।'
একদিন যায়েদ ইবনে সা'না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে তার পাওনা তাগাদা দেয়ার জন্য আসলো। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাদর ও জামা ধরে সজোড়ে টান মারলো এবং তার সাথে কঠিন ভাষা প্রয়োগ করলো। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে রূঢ় চেহারায় তাকালো, এবং বললো, 'হে মুহাম্মাদ, আমার পাওনা পরিশোধ কর, তোমরা আব্দুল মুত্তালিবের বংশধর আসলেই টাল-বাহানাকারী গোষ্ঠী।' সাহাবী উমার রা. তার দিকে তাকালেন, তার চোখদুটো ঘূর্ণায়মান নক্ষত্রের মত ঐ ব্যক্তির মাথার উপর ঘুরছে। অতঃপর তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর দুশমন! তুমি রাসূলকে যা বলেছো আমি তা শুনেছি এবং তুমি তার সাথে যা আচরণ করেছো, তা আমি দেখেছি। ঐ সত্বার কসম! যিনি তাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তিনি আমাকে ভর্ৎসনা করবেন এই ভয় না থাকলে আমি তলোয়ার দিয়ে তোমার মাথা আলাদা করে ফেলতাম। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমার রা. এর দিকে স্থিরতার সাথে মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, 'হে উমার! আমি ও সে তোমার নিকট থেকে এমন কথা শুনতে প্রস্তুত ছিলাম না। তুমি বরং আমাকে সুন্দরভাবে আদায় করার, এবং তাকে সুন্দরভাবে তাগাদা দেয়ার পরামর্শ দিতে পারতে। হে উমার! তাকে নিয়ে যাও এবং তার পাওনা পরিশোধ করে অতিরিক্ত আরো বিশ সা' খেজুর দিয়ে দাও।'
এ কাজটিই তাকে ইসলাম গ্রহণ করার উৎসাহ দিয়েছে। অতঃপর সে ঘোষণা দিল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।'
এ ঘটনার পূর্বে যায়েদ বলত, 'নবুয়্যতীর আলামতসমূহ থেকে কোন একটি আলামত তার চেহারায় ফুটে উঠতে দেখা বাকি ছিল না, তবে দুটি আলামত সম্পর্কে তখনও আমি অবগত হতে পারিনি। এক: তার অজ্ঞতার তুলনায় জ্ঞান-গরিমাই বেশি হবে। দুই: তার সাথে মূর্খতাসূলভ ব্যবহার তার সহনশীলতা বাড়িয়ে দেবে।'
সে এই ঘটনার মাধ্যমে তা পরীক্ষা করে, এবং তার সম্পর্কে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তেমনটিই পেয়েছে। অতঃপর সে ঈমান আনলো এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে অনেক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করলো, এবং তাবুকের যুদ্ধে অভিযানে শহীদ হল। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সত্যবাদিতা ও তিনি যে দিকে আহবান করছেন তা যে সত্য, এ দুই বিষয়ের উপর আখলাকের মাধ্যমে অনেক প্রমাণ পেশ করেছেন।
ষষ্ঠ: মুনাফিক নেতাদের সাথে তার আচরণ:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করলেন, এদিকে আউস ও খাযরাজ গোত্র আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে নেতা বানানোর ব্যাপারে একমত হয়েছিল। এমনকি দুইজন ব্যক্তিও তার মর্যাদার ব্যাপারে মতবিরোধ করেনি। ইতিপূর্বে আউস ও খাযরাজ গোত্র কোন সময় দু'গ্রুপের কারো ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছোতে পারেনি। তারা তাকে মালা পড়িয়ে নেতা বানানোর সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করল। ঠিক এমন সময় আল্লাহ তাআলা তাদের সম্মুখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উপস্থিত করলেন। যখন মুনাফিক নেতার স্বজাতি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে ইসলামের দিকে ধাবিত হতে শুরু করল, তখন তার অন্তর হিংসা-বিদ্বেষে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। এবং সে দেখল তার রাজত্ব ও ক্ষমতা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে চলে যাচ্ছে। সে যখন দেখল, তার স্বজাতি ইসলামে প্রবেশ করছে, তখন সে অপছন্দ করা সত্ত্বেও কপটতা নিয়ে, হিংসা ও বিদ্বেষসহ ইসলামে প্রবেশ করল। সে ইসলাম থেকে মানুষকে বিমুখ করা, মুসলিম জামাআতে ফাটল সৃষ্টি করা ও ইহুদীদের সহযোগিতা করার ব্যাপারে কোন প্রকার ত্রুটি করল না।
ইসলামী দাওয়াতের ব্যাপারে তার বিদ্বেষের বিষয়টি ছিল সুস্পষ্ট। কিন্তু তা ছিল সম্পূর্ণ মুনাফেকী অবস্থায়। নবী করীম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিষয়টি ধৈর্য, সহনশীলতা ও ক্ষমার দৃষ্টিতে গ্রহণ করে নিতেন। কেননা সে ইসলাম প্রকাশ করেছিল। তাছাড়া তার অনেক মুনাফিক সাথি-সঙ্গী ছিল। সে ছিল তাদের নেতা। আর তারা ছিল তার অনুসারী। নবী করীম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা ও কাজে তার প্রতি অনুগ্রহ করতেন, এবং অনেক সময় তার দুর্ব্যবহারকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখতেন। নিম্নে এ রকম কয়েকটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হল:
১- ইহুদী সম্প্রদায় বনু কুরাইযা অঙ্গীকার ভঙ্গ করার পর তাদের জন্য সুপারিশ করা
বদর যুদ্ধের পর বাজারে জনৈক মুসলিম মহিলার পোশাক খুলে ফেলা উন্মুক্ত এবং এ মহিলাকে সাহায্য করার কারণে একজন মুসলমানকে খুন করার মাধ্যমে বনু কুরাইযা অঙ্গীকার ভঙ্গ করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের বিশ মাস পর শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি শনিবার তাদের কাছে গেলেন, তাদেরকে পনেরো দিন বন্দি করে রাখলেন এবং তারা তাদের দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করল। তিনি খুব কঠিনভাবে তাদেরকে অবরোধ করলেন। আল্লাহ তাদের অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিদ্ধান্ত মেনে নেমে আসল। রাসূলের নির্দেশে তাদের উভয় হাত পিছনে বেধে দেয়া হল। তারা ছিল সাত শত জন যোদ্ধা। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হাজির হয়ে বলল, 'হে মুহাম্মাদ আমার গোলামদের উপর দয়া কর।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিতে দেরি করলে সে আবার বলল, 'হে মুহাম্মাদ তুমি তাদের উপর দয়া কর।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে, সে রাসূলের বর্ম-পোশাকের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল এবং বলল, যতক্ষণ তুমি আমার লোকদের উপর দয়া না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাকে ছাড়ব না। (তাদের মধ্যে চার শত জন ছিল বর্ম পোশাক বিহীন, আর তিন শত জন বর্ম-পোশাক পরিহিত।) তারা আমাকে লাল ও কালো জাতি থেকে হেফাযত করেছে। আর তুমি তাদেরকে এক সকালেই আমার থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাও? আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি অশুভ পরিণতির ভয় করছি। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার খাতিরে তাদেরকে ছেড়ে দিলেন।' তাদেরকে মদীনা থেকে বের হওয়ার এবং এর নিকটে বসবাস না করার আদেশ করলেন। ফলে তারা সিরিয়ার আযরাআতে চলে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাল সম্পদ গণীমত হিসাবে তার এক পঞ্চমাংশ আয়ত্ব করে নিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এহেন সুপারিশের দরুন তাকে কোন শাস্তি দিলেন না। বরং ক্ষমা করে দিলেন।
২- উহুদ যুদ্ধে রাসূলের সাথে তার আচরণ :
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধে বের হলেন। তিনি যখন মদীনা ও ওহুদের মাঝামাঝি পৌঁছলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এক তৃতীয়াংশ সেনা নিয়ে আলাদা হয়ে গেল, এবং তাদেরকে নিয়ে মদীনায় চলে আসল। জাবের রা. এর পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম তাদের পিছনে পিছনে গেলেন। অতঃপর তাদেরকে ভর্ৎসনা করলেন ও পুনরায় ফিরে যাওয়ার জন্যে উৎসাহ দিলেন। এবং তিনি বললেন, 'চলে এসো এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর। অথবা শত্রুদেরকে প্রতিহত কর।' তারা বলল, 'আমরা যদি জানতাম তোমরা অবশ্যই যুদ্ধ করবে, তাহলে ফিরে যেতাম না।' অতঃপর তাদেরকে নিন্দাবাদ করে তাদেরকে রেখে ফিরে এলেন।' এত বড় অপরাধ সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোন শাস্তি দিলেন না।
৩- আল্লাহর প্রতি আহবান করা থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাধা প্রদান:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা'দ ইবনে উবাদা রা. কে দেখতে গেলেন। পথিমধ্যে আল্লাহর শত্রু আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথে তার সাক্ষাৎ হল। তখন তার সাথে স্বীয় কওমের লোকজন উপস্থিত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহন থেকে নামলেন এবং সালাম করলেন। অতঃপর কিছুক্ষণ বসলেন। তিনি কুরআন তেলাওয়াত করে তাদেরকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিলেন। আল্লাহর কথা স্মরণ করালেন। ভয় দেখালেন ও সুসংবাদ দিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কথা শেষ করলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই দাঁড়িয়ে বলল, 'হে ব্যক্তি (নবী) আমি তোমার কথাগুলো ভালভাবে মেনে নিতে পারছি না। এগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে তুমি বাড়িতে বসে থাকলেই তো চলে। তোমার কাছে যারা আসে শুধুমাত্র তাদেরকেই এগুলো বয়ান করে শুনাও। তোমার কাছে যে আসে না, তাকে তুমি বিরক্ত কর না। কারো মজলিসে এমন কিছু নিয়ে এসো না যা সে অপছন্দ করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাজেও তাকে পাকড়াও করলেন না। বরং ক্ষমা করে দিলেন।
৪- বনী নযীরকে আপন ভূমিতে বহাল রাখার চেষ্টা করা:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার ইচ্ছা করে বনু নযীর যখন অঙ্গীকার ভঙ্গ করল, তখন তিনি তাদের নিকট মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে এই আদেশ দিয়ে প্রেরণ করলেন যে, তারা যেন এ শহর ছেড়ে চলে যায়। এদিকে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নেতৃত্বে মুনাফিকরা বলে পাঠাল, তোমরা আপন জায়গায় থাক। নিশ্চয় আমরা তোমাদেরকে শত্রুর হাতে সোপর্দ করব না। যদি তোমরা যুদ্ধের সম্মুখীন হও, তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করব। যদি তোমাদেরকে বের কের দেয়া হয়, তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে বের হয়ে যাব। ফলে ইহুদীদের মনোবল আরো চাঙ্গা হয়ে গেল। তারা চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিরোধিতা করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট গেলেন এবং তাদেরকে অবরোধ করলেন। অতঃপর আল্লাহ তাদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করলেন এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দেশান্তর করলেন। তারা খায়বর গিয়ে আশ্রয় নিল। আর তাদের কেউ কেউ সিরিয়ায় চলে গেল।' নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের এহেন নিকৃষ্ট তৎপরতার কোন শাস্তি দিলেন না।
৫- মুরাইসি যুদ্ধে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানেদের সাথে চক্রান্ত ও বিশ্বাস ঘাতকতাঃ
এ যুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এমন একটি অপমানজনক কাজ করেছে, যার কারণে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হয়ে যায়:
প্রথমত: মুনাফিকরা এ যুদ্ধে আয়েশা রা. এর প্রতি অপবাদ রচনা করে। যার নেতৃত্বে ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল।
দ্বিতীয়ত: এ যুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যা বলেছিল আল-কুরআনে তা উল্লেখ করা হয়েছে: يَقُولُونَ لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى المُدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ
‘তারা বলে, যদি আমরা মদীনায় ফিরে যাই তাহলে, আমাদের মধ্যে সম্মানিত লোকেরা লাঞ্ছিতদের বের করে দেবে।”
তৃতীয়ত: এ যুদ্ধে আল্লাহর দুশমন যা বলেছিল আল-কুরআনে তা উল্লেখ করা হয়েছে:
لَا تُنْفِقُوا عَلَى مَنْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ حَتَّى يَنْفَضُّوا
"আল্লাহর রাসূলের নিকট যারা রয়েছে তাদের জন্য তোমরা খরচ কর না, যতক্ষণ না তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।”
এর অনেক পর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্ম-কৌশল আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হল। আর উদ্ভাসিত হল ফেৎনার আগুন নিভিয়ে ফেলা ও অকল্যাণের মূলোৎপাটনের ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শিক রাজনীতি। সন্দেহ নেই, আল্লাহর অনুগ্রহ, আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের ব্যাপারে তার দূরদর্শিতা, তার প্রতি তাঁর সহনশীলতা, তার প্রতি অনুগ্রহ এবং অপমানকর অবস্থানের মোকাবিলায় মুনাফিক নেতাকে ক্ষমা করে দেয়া এ সবগুলোর পিছনে ছিল নানাবিধ হিকমত ও কৌশল।
আর তা হলো: এ ব্যক্তির অনেক ভক্ত ছিল, ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাদের পক্ষ থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ভয় ছিল। তাছাড়া সে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুসলমান ছিল, আর এ কারণেই যখন উমার ইবনে খাত্তাব রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে সুযোগ দিন, আমি এ মুনাফিক সর্দারের মাথা উড়িয়ে দিই।' তখন তিনি তাকে বলেছিলেন, 'তাকে ছেড়ে দাও, যাতে করে লোকেরা বলাবলি করতে না পারে যে, মুহাম্মাদ নিজ সাথিদের হত্যা করে।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তাকে হত্যা করতেন তাহলে সেটি লোকদের ইসলামে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে আতঙ্ক সৃষ্টি করত। কারণ লোকেরা আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে মুসলিম বলেই জানত। তখন তারা বলত, মুহাম্মাদ মুসলমানদের হত্যা করে। তাতে করে নতুন ভাবে বিশৃঙ্খলার জন্ম নিত আর জাতীয় স্বার্থ ব্যাহত হত।
এখানে চিন্তা করলে দেখা যাবে নবীজীর পক্ষ থেকে ইসলামের ঐক্য ও শক্তি সুদৃঢ় রাখার প্রত্যয়ে এবং বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশংকায় ছোট খাট সমস্যার ক্ষেত্রে ধৈর্য ও প্রজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে। তাছাড়া তাকে প্রকাশ্য অবস্থার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর ভিতরগত বিষয়গুলো আল্লাহ তাআলার উপর ন্যস্ত করতে আদেশ দিয়েছেন।
আব্দুল্লাহ বিন উবাইকে হত্যা না করার তাৎপর্য কি, এটি উমার রা. প্রথম প্রথম বুঝতে পারেননি, তবে কিছুদিন পরে বুঝে আসে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ করে বলছি, বিষয়টি আমি বুঝতে পেরেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্ত অবশ্যই আমার সিদ্ধান্ত অপেক্ষা অধিক বরকতময় ও কল্যাণকর।'
এভাবেই আল্লাহর পথে প্রত্যেক দাওয়াত-কর্মীকে নিজ নিজ দাওয়াতী কর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করে হিকমত ও প্রজ্ঞার রাস্তা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়।
সপ্তম দৃষ্টান্ত: ছুমামাহ বিন উসালের সাথে:
ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. সাহাবী আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল অশ্বারোহীকে নজদ অভিমুখে অভিযানে প্রেরণ করেন। তারা বনী হানীফের একলোককে ধরে নিয়ে আসল। যার নাম ছিল, 'ছুমামাহ বিন উসাল।' সে ছিল ইয়ামামাবাসীদের নেতা। তারা তাকে মসজিদের একটি খুটিতে বেঁধে রাখল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট আসলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে ছুমামাহ! আমাদের সম্পর্কে তোমার ধারণা কি?' সে বলল, 'হে মুহাম্মাদ! আমার নিকট আপনাদের সম্পর্কে ভাল ধারণাই আছে। যদি আপনি হত্যা করেন, তাহলে হত্যাপোযুক্ত লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ লোককেই অনুগ্রহ করবেন। আর আপনি যদি অর্থকড়ি নিতে চান তাহলে বলুন, আপনার ইচ্ছানুযায়ী প্রদান করা হবে।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রেখে চলে গেলেন। যখন পরের দিন আবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে ছুমামাহ! আমাদের সম্পর্কে তোমার কি ধারণা?' উত্তরে সে বলল, 'আগে যা বলেছি তা-ই, যদি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি হত্যা করেন তাহলে হত্যাযোগ্য লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অর্থ-কড়ি নিতে চান তাহলে বলুন, আপনার ইচ্ছানুযায়ী প্রদান করা হবে।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রেখে চলে গলেন। যখন পরের দিন আসল, তখন বললেন, 'হে ছুমাহ আমাদের সম্পর্কে তোমার কি ধারণা?' উত্তরে সে বলল, 'আগে যা বলেছি তা-ই, যদি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি হত্যা করেন, তাহলে হত্যাযোগ্য লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অর্থকড়ি নিতে চান তাহলে বলুন, আপনার ইচ্ছানুযায়ী প্রদান করা হবে।'
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা ছুমামাহকে মুক্ত করে দাও।' মুক্তি পেয়ে সে মসজিদের নিকটস্থ একটি খেজুর বাগানে গিয়ে গোসল করল। অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করে বলল, 'আশহাদু আল লা ইলাহা... আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোন মা'বুদ নাই আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা এবং রাসূল। হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর শপথ করে বলছি, পৃথিবীর বুকে আমার নিকট আপনার চেহারার চেয়ে অধিক ঘৃণিত কোন চেহারা ছিল না। আর এখন আপনার চেহারা অন্য সকল চেহারা অপেক্ষা আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হয়ে গেছে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার নিকট আপনার ধর্ম অপেক্ষা অধিক ঘৃণিত আর কোন ধর্ম ছিলনা, আর এখন আপনার ধর্ম অন্য সকল ধর্ম থেকে আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হয়ে গেছে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনার শহরই আমার নিকট ছিল সর্বাধিক ঘৃণিত শহর। আর এখন সেটিই আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হয়ে গেছে। আপনার প্রেরিত অশ্বারোহী বাহিনী যখন আমাকে গ্রেফতার করেছে তখন আমি উমরা পালনের নিয়ত করেছিলাম। আপনি এ বিষয়ে কি নির্দেশনা দেবেন? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সুসংবাদ দান করলেন এবং উমরা পালনের নির্দেশ দিলেন। তিনি মক্কায় আগমন করলে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, 'তুমি কি ধর্মত্যাগী হয়ে গেলে?' উত্তরে সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম বরং আমি রাসূলুল্লাহর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, 'এখন থেকে রাসূলুল্লাহর অনুমোদন ব্যতীত ইয়ামামাহ থেকে তোমাদের কাছে এক দানা গমও আর আসবে না।'
অতঃপর তিনি ইয়ামামায় চলে যান এবং ইয়ামামাবাসীকে মক্কায় কিছু রপ্তানি করতে নিষেধ করে দেন। এ অবস্থা দেখে মক্কাবাসীরা রাসূলুল্লাহর নিকট লিখল যে, 'তুমি আত্মীয়তা রক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে থাক, অথচ সে তুমিই আমাদের সাথে বন্ধন ছিন্ন করে দিলে। তুমি আমাদের পিতৃপুরুষদের তলোয়ার দ্বারা হত্যা করেছ। আর আমাদের সন্তানদের মারছ অনাহারে।' চিঠি পেয়ে রাসূলুল্লাহ ছুমামাহকে খাদ্য রপ্তানির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার নির্দেশ পাঠালেন।
আল্লামা ইবনে হাজার রহ. উল্লেখ করেছেন:
ইবনে মাজাহ নিজ সনদে ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, 'ছুমামাহর ইসলাম গ্রহণ, ইয়ামামায় প্রত্যাবর্তন, কুরাইশদের নিকট রসদ-সামগ্রী প্রেরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ সম্পর্কেও আল্লাহ তাআলার নিণেক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেছেনঃ
وَلَقَدْ أَخَذْنَاهُمْ بِالْعَذَابِ فَمَا اسْتَكَانُوا لِرَبِّهِمْ وَمَا يَتَضَرَّعُونَ
"আমি তাদের আজাবের মাধ্যমে পাকড়াও করলাম। কিন্তু তারা তাদের পালনকর্তার তরে নত হলো না এবং কাকতি মিনতিও করল না।" (সূরা মুমিনূন: ৭৬}
ইয়ামামাহ বাসীরা যখন স্বধর্মত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তখন ছুমামাহ রা. নিজ ধর্ম ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি এবং তার সম্প্রদায়ের যারা তার অনুসরণ করেছিল, তারা ইয়ামামাহ ছেড়ে এসে আলী আল - হাদরামীর সাথে মিশে বাহরাইনের মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
'আল্লাহু আকবার' কি চমৎকার সহনশীলতা ছিল নবী মুহাম্মাদের! কত উর্দ্ধে ছিল তার চিন্তা-চেতনা ও অবস্থান। তিনি অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর লোকদের মধ্যে যাদের ইসলাম ও হেদায়াত কামনা করতেন। তাদের মন রক্ষার চেষ্টা করতেন। তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ অব্যাহত রাখতেন। যাতে তাদের ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার মাধ্যমে তাদের অনুসারীবৃন্দও ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী হয় এবং ক্রমাগত ইসলামে দীক্ষিতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
এমনি করেই প্রত্যেক দাওয়াত কর্মীর কর্তব্য হবে সহনশীলতা ও অন্যায়কারীকে ক্ষমা করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা। কেননা ছুমামাহ শপথ করে বলেছে তার ঘৃণা মুহুর্তের মধ্যে ভালোবাসায় রূপান্ত রিত হয়ে গেছে। যখন সে দেখল, নবীজী তার সামনে কত সুন্দর করে সহনশীলতা, ক্ষমা ও বিনিময় বিহীন অনুগ্রহের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
আর এ ক্ষমা ও উদারতা ছুমামার জীবনে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা ও ইসলামের প্রতি অন্যদেরকে দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করেছিল।' এজন্যেই তিনি বলেছিলেন:
أهم بترك القول ثم يردني - إلى القول إنعام النبي محمد رأيت خيالا من حسام مهند - شكرت له فكي من الغل بعدما
'কথা বলব না বলে পণ করি আমি তবে মুহাম্মাদী করুণা সংকল্প ভাংতে বাধ্য করে মোরে। ভারতে তৈরি ধারালো তলোয়ার দেখে, ছায়ামূর্তি (মৃত্যু) প্রত্যক্ষ করলাম, বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ায় আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।'
অষ্টম দৃষ্টান্তঃ যে বেদুইন রাসূলুল্লাহকে চাদরসহ টান মেরেছিল তার সাথে তাঁর সহনশীল আচরণ
সাহাবী আনাস রা. বলেন, 'আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে চলছিলাম, তার গায়ে গাঢ় পাড় বিশিষ্ট একটি নাজরানী চাদর ছিল। পথিমধ্যে এক বেদুইন তাকে কাছে পেয়ে চাদর ধরে প্রচণ্ড জোরে টান মারল। আমি তাকিয়ে দেখলাম, টানের তীব্রতার কারণে চাদরের পাড়ের মোটা অংশ তার কাঁধে দাগ সেঁটে দিয়েছে। অতঃপর সে বলল, 'হে মুহাম্মাদ! তোমার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত যে সম্পদ রয়েছে তা থেকে আমাকে কিছু দিতে বল।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। অতঃপর তাকে কিছু দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
এটিই হচ্ছে নবীজীর চমকপ্রদ ও উৎকর্ষপূর্ণ সহনশীলতা, উন্নততর চরিত্র, উত্তম ক্ষমা প্রদর্শন, নিজ জীবন ও সম্পদে আপতিত বিপদে ধৈর্য ধারণ এবং ইসলামপ্রিয় সহজ সরল ব্যক্তিবর্গের সাথে মার্জনাপূর্ণ অনুকরণীয় আদর্শের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াতকর্মীদের এ আদর্শের অনুকরণ একান্ত জরুরী। আরো জরুরী হচ্ছে তার সহনশীলতা, মার্জনাপূর্ণ সদাচরণ, ক্ষমা, উদারতা, প্রসন্ন মানসিকতা এবং দীন ইসলামের উপর আপতিত আঘাত উত্তম পদ্ধতিতে প্রতিহত করা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
নবম দৃষ্টান্ত: হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করে দাও, কারণ তারা বুঝে না
তার সহনশীলতার অন্যতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে, তাকে যারা বিভিন্নভাবে কষ্ট দিয়েছে, অকথ্য নির্যাতন করেছে তাদের বিরুদ্ধে বদ-দু'আ করেননি। তাদের বিরুদ্ধে বদ-দু'আ করার পূর্ণ স্বাধীনতা তার ছিল এবং এতে আল্লাহ তাআলা তাদের ধবংস করে দিতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন সহনশীল, প্রজ্ঞাময়। দূরদর্শী চিন্তা চেতনা নিয়ে কাজ করতেন। উদ্দেশ্য ছিল সুদূর প্রসারী। আর সেটি হচ্ছে তাদের অথবা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ইসলাম গ্রহণের আকাংখা। এ জন্যেইতো আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন,
'আমি যেন এখনো রাসূলুল্লাহ পানে তাকিয়ে আছি। তিনি জনৈক নবীর ঘটনা বর্ণনা করছেন, তার কওম তাকে প্রহার করে রক্তাক্ত করে ফেলেছে আর তিনি নিজ মুখাবয়ব থেকে রক্ত মুছছেন আর বলছেন,
اللهم اغفر لقومي فإنهم لا يعلمون 'হে আল্লাহ আমার জাতিকে ক্ষমা করে দিন, কারণ তারা জানে না।"
নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও সহনশীলতার প্রশংসা করেছেন এবং তাকে অনেক বড় করে দেখেছেন। যেমন সাহাবী আশজ্জ আব্দুল কায়সকে বলেন:
إن فيك خصلتين يحبهما الله : الحلم والأناة . 'নিশ্চয়ই তোমার মধ্যে এমন দু'টো স্বভাব বিদ্যমান যা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন: সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা'।’
অন্য রেওয়ায়াতে এসেছে: আশজ্জ জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ উক্ত সভাবদ্বয় কি আমিই অর্জন করেছি, না আল্লাহ আমার স্বভাবে প্রোথিত করে দিয়েছেন?' তিনি উত্তরে বললেন, 'বরং আল্লাহ তাআলাই তোমার স্বভাবে সেগুলো জুড়ে দিয়েছেন।' তখন তিনি বললেন, সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমার মধ্যে এমন দু'টো স্বভাব জুড়ে দিয়েছেন, যেগুলো আল্লাহ ও তার রাসূল পছন্দ করেন।'
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সহনশীলতা পছন্দ করতেন এবং তা নিজের মধ্যে তা লালন করতেন।
দশম দৃষ্টান্তঃ যে ইহুদী তাকে যাদু করেছিল তাকে তাকে ক্ষমা করে দেয়া
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ক্ষমা প্রদর্শনের অন্যতম একটি দৃষ্টান্ত হল, যাদুকারী ইহুদীর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন। যে তাঁকে যাদু করেছিল। তিনি কখনোই সে ইহুদীকে এ সম্পর্কে কিছু বলেননি এবং সেও তার চেহারায় মৃত্যু-পূর্ব পর্যন্ত কখনো কোন (বিরক্তিকর) কিছু দেখতে পায়নি。
টিকাঃ
১ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/২১৬, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/১৫৭। ২ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪২৭, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৪।
২ সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪২৮, বিদায়া-নিহায়া: ৪/৪। * যাদুল মাআদ: ৩/১২৬।
৩ যাদুল মাআদ: ৩/১৯৪, সীরাতে ইবনে হিশাম ৩/৮, বিদায়া-নিহায়া: ৪/৫১। ৪ সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২১৮।
৪ সীরাতে ইবনে হিশাম ৩/১৯২, আল বিদায় ওয়ান নিহায়া ৪/৭৫, যাদুল মাআদ ৩/১২৭। * সহীহ আল বুখারী: ৪১৪১, সহীহ মুসলিম ২৭৭০, যাদুল মাআদ: ৩/২৫৬।
৫ সূরা মুনাফিকুন: ৮। ৬ সূরা মুনাফিকুন: ৭। ৭ সহীহ আল-বুখারী, হাদীস নং (৪৯০৫) ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং (২৫৮৪)।
৬ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/১৮৫, শরহে নববী ১৬/১৩৯।
৭ ফাতহুল বারী ১০/৫০৬ শারহু সহীহ মুসলিম লিন নববী ৭/১৪৬,১৪৭ ৮ সহীহ আল - বুখারী (৩৪৭৭) ও সহীহ মুসলিম (১৭৯২)
৮ সহীহ মুসলিম (১৭/২৫) ৯ বর্ণনায় আবু দাউদ, হাদীস নং (৫২২৫) এবং আহমদ (৪/২০৬ ও ৩/২৩) * বর্ণনায় আহমাদ (১৯২৮৬)