📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 শারীরিক ও চারিত্রিক গুণাবলি

📄 শারীরিক ও চারিত্রিক গুণাবলি


নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন স্বভাব ও দৈহিক অবয়ব, উভয় দিক থেকেই সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি ছিলেন নম্র, বিনয়ী, সৌরভমন্ডিত, বিবেক-বুদ্ধির দিক থেকে পরিপূর্ণ, এবং আচার-আচরণের বিবেচনায় সুন্দরতম মানুষ। তিনি ছিলেন আল্লাহ সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী। আল্লাহ-ভীতি অবলম্বনে তিনি ছিলেন সর্বাগ্রে。
সাহসিকতায় তিনি ছিলেন সবার থেকে নির্ভীক। মহানুভবতায় শ্রেষ্ঠতম। দানশীলতায় সকলের ঊর্ধ্বে। ন্যায় বিচারে সর্বশ্রেষ্ঠ। আচার-আচরণে উদারতম। তিনি ছিলেন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী চর্চায় অধিক পরিশ্রমী। যুলুম-নির্যাতন বরদাশত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ধৈর্যশীল। সৃষ্টি-জীবের প্রতি সবচেয়ে বেশি দয়াশীল। মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লজ্জার অধিকারী। ব্যক্তিগত ইস্যুতে তিনি কখনো প্রতিশোধ নিতেন না, কাউকে শাস্তি দিতেন না, কারো প্রতি রাগ করতেন না। কিন্তু আল্লাহর ব্যাপারে তিনি রাগান্বিত হতেন, প্রতিশোধ নিতেন। তিনি যখন আল্লাহর স্বার্থে রাগ করতেন, তখন তার ক্রোধের সাথে অন্য কারো ক্রোধের তুলনা হত না। অধিকার ও সম্মানের ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্র, নিকট-পর, স্ব-বংশীয়-পরবংশীয় সকলে তার কাছে ছিল সম-মর্যাদার। কোন খাবার অপছন্দ হলেও তিনি তাতে খুঁত ধরতেন না। খাবার অপছন্দ হলে তিনি তা ত্যাগ করতেন। হালাল খাদ্য যা পেতেন, খেতেন। তিনি উপহার গ্রহণ করতেন। উপহারের বিনিময়ে উপহার দিতেন। নিজ বা পরিবারের জন্য দান-ছদকা গ্রহণ করতেন না। জুতা ও পোশাক নিজেই পরিষ্কার করতেন। পরিবার-পরিজনকে তাদের কাজ-কর্মে সাহায্য করতেন। তিনি বকরীর দুধ দোহন করতেন। নিজের কাজ নিজে করতেন। তিনি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বিনয়ী ছিলেন। ধনী-দরিদ্র, ভদ্র-অভদ্র সকলের আহবানেই তিনি সাড়া দিতেন। তিনি দরিদ্রদের ভাল বাসতেন। রোগ-শোকে তাদের সেবা করতেন, খোঁজ-খবর নিতেন। তাদের মৃতদের দাফন-কাফনে অংশ নিতেন। দারিদ্রতার কারণে তিনি কাউকে অবজ্ঞা করতেন না। রাজত্বের কারণে কাউকে অত্যধিক সম্মান দিতেন না। তিনি ঘোড়া, গাধা, খচ্চর, উট সবকিছুর পিঠে আরোহণ করতেন। আরোহণের সময় সাথে অন্যকে বসাতেন। এ সকল বিষয়ে তিনি নিজের মান-সম্মানের দিকে তাকিয়ে কখনো সংকোচ বোধ করতেন না। তিনি রুপার আংটি পরিধান করতেন ডান হাতের অনামিকা অঙ্গুলে। কখনো কখনো বাম হাতেও পরিধান করতেন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটে পাথর বাঁধতেন। অবশ্য পরে আল্লাহ তাকে পার্থিব সকল সম্পদ দান করেন। কিন্তু তিনি আখিরাতকে বেছে নিয়েছেন。
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যধিক দীর্ঘকায় ছিলেন না আবার বেটেও ছিলেন না। তিনি অতি সাদা ছিলেন না আবার বাদামি ছিলেন না। তার চুলগুলো খুব কোঁকড়ানো ছিল না আবার একে বারে সোজাও ছিল না। তার পদ-যুগল ছিল মাংসল, চেহারা ছিল সুন্দর। তার চেহারা ছিল উজ্জ্বল ও লাবণ্যময়। তার বক্ষ ছিল প্রশস্ত। কানের লতি অবধি দীর্ঘ কেশমালার অধিকারী ছিলেন তিনি, কখনো কখনো তা বৃদ্ধি পেয়ে কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছে যেত আবার কখনো তা থাকত কানের মাঝামাঝি পর্যন্ত। দাড়ি ছিল ঘন। হাত ও পায়ের অঙ্গুলি ছিল পুষ্ট। মাথা ছিল বড় আকারের। বুকের সরু কেশমালা ছিল পাতলা। যখন হাঁটতেন সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটতেন। তার মুখমণ্ডল ছিল বড়। চোখের পলক ছিল লম্বা। তার চেহারা ছিল খুবই সুন্দর। পিছনে দু চুটের মধ্য খানে ছিল নবুওয়তের সীল-মোহর। তা ছিল কবুতরের ডিম আকৃতির লাল রংয়ের। তিনি মাথার কেশ বিন্যাস করতেন, তেল ব্যবহার করতেন। দাড়ি অকর্তিত অবস্থায় রেখে দিতেন। দাড়িতে চিরুনি ব্যবহার করতেন。
তার দাড়ি ও চুলে কম সংখ্যক সাদা কেশ ছিল। যখন তেল ব্যবহার করতেন তখন এ সাদা চুলগুলো দেখা যেত না। তিনি পাগড়ি ব্যবহার করতেন ও লুঙ্গি পড়তেন। তিনি সুগন্ধি ভাল বাসতেন। তিনি বলতেন, 'পুরুষদের জন্য উত্তম সুগন্ধি হল যার গন্ধ পাওয়া যায়, রং দেখা যায় না। আর মেয়েদের জন্য উত্তম সুগন্ধি হল যার রং প্রকাশিত হয় গন্ধ গোপন থাকে।'
তিনি ঈদের সময় সাজ-সজ্জা অবলম্বন করতেন। কোন মেহমান আসলে তাদের সাথে সাক্ষাতের সময়ও সাজ সজ্জা গ্রহণ করতেন। তিনি সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতেন। তার সম্মানে কেউ দাঁড়াবে এটা তিনি পছন্দ করতেন না। সাহাবায়ে কেরাম তার সম্মানে কখনো দাঁড়াতেন না। তারা রাসূলুল্লাল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপছন্দের কথা জানতেন。
তিনি সর্বদা মেছওয়াক করা পছন্দ করতেন। যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, যখন রাতে জাগ্রত হতেন, যখন অজু করতেন তখন মেছওয়াক করতেন। তিনি রাতের বেলায় তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তেন। শেষ রাতে দীর্ঘ সময় সালাতে কাটাতেন। দীর্ঘক্ষণ নামাজে থাকার কারণে অনেক সময় তার পা ফুলে যেত। তিনি বেতর নামাজ আদায় করতেন রাতের সকল নামাজের শেষে ফজরের ওয়াক্তের পূর্বে। তিনি অন্যের কণ্ঠে কুরআন পাঠ শুনতে ভাল বাসতেন。
তার রয়েছে বিভিন্ন নাম। যেমন তিনি বলেছেন, 'আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমদ, আমি মাহী (নিশ্চিহ্নকারী) আমাকে দিয়ে আল্লাহ কুফরকে নিশ্চিহ্ন করবেন। আমি হাশের (জমায়েতকারী) কারণ মানুষ আমার পিছনে জমায়েت হবে। আমি আকেব (সর্বশেষ) কারণ আমার পরে কোন নবী বা রাসূল নেই।'
তিনি আরো বলেন, 'আমি মুকাফফি (ধারাবাহিকতা রক্ষাকারী) আমি তাওবার নবী, রহমতের নবী।” তার উপনাম আবুল কাসেম। তাকে চারিত্রিক উৎকর্ষতার পূর্ণতা দেয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের কয়েকটি স্থানে তার নাম উল্লেখ করেছেন। যেমন
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ
"মুহাম্মাদ তো কেবল আল্লাহর রাসূল, তার পূর্বে রাসূলগণ অতিবাহিত হয়েছেন।” আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ
"মুহাম্মাদ তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নয়, কিন্তু সে আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী।” মহান আল্লাহ আরো বলেন,
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَهُوَ الحُقُّ مِنْ رَبِّهِمْ
"যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, এবং আরো ঈমান এনেছে তার প্রতি যা মুহাম্মাদের উপর নাযিল হয়েছে, আর এটাই তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য।”
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,
مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ
"মুহাম্মাদ হল আল্লাহর রাসূল।” আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঈসা আ. এর বক্তব্য উল্লেখ করেন,
وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
"আমি একজন রাসূলের সুসংবাদ দিচ্ছি যে আমার পরে আসবে, তার নাম হল আহমাদ।"
তিনি অধিক পরিমাণে জিকির করতেন। সর্বদা চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করতেন। দীর্ঘ সালাত আদায় করতেন। খুতবা সংক্ষেপ করতেন। তিনি মুচকি হাসতেন। কখনো কখনো প্রয়োজনে এমন হাসতেন যে তার দাঁত দেখা যেত。
সাহাবী জরীর রা. বলেন, 'আমি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দূরে রাখেননি। তার চেহারায় আমি সর্বদা মুচকি হাসি দেখেছি। আমি তার কাছে আমার অক্ষমতার অভিযোগ করে বললাম, 'আমি ঘোড়ার পিঠে স্থির থাকতে পারি না।' তিনি আমার বুকে থাপর দিয়ে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! তাকে স্থির রাখো, তাকে সঠিক পথ অবলম্বনকারী ও সঠিক পথের প্রদর্শক বানাও।'
তিনি হাসি-তামাশা করতেন তবে তা সত্য কথার মাধ্যমে। কাউকে কথার দ্বারা খাটো করতেন না। কেহ কোন ওজর-আপত্তি পেশ করলে তা গ্রহণ করতেন। তিনি তিন আঙুল দ্বারা খেতেন, আঙুল চেটে খেতেন। পানি খাওয়ার সময় পাত্রের ভিতরে শ্বাস ছাড়তেন না। তিনি অতি সংক্ষেপে কিন্তু ব্যাপক অর্থবোধক ভাষায় কথা বলতেন। কথা বলতেন স্পষ্ট ও যথেষ্ট বোধগম্য ভাষায়, যাতে শ্রোতাদের কথা স্মরণ রাখতে সহজ হয়। বুঝানোর জন্য একটি কথা তিন বার বলতেন। প্রয়োজন ব্যতীত কথা বলতেন না। তিনি বিনয়-নম্রতার জন্য নির্দেশ দিতেন। উগ্রতা ও চরমপন্থা অবলম্বন করতে নিষেধ করতেন। ক্ষমা, উদারতা, ধৈর্য, সহনশীলতা, ধীরস্থিরতা, উত্তম চরিত্র অবলম্বনে উৎসাহ দিতেন। তিনি সর্বদা ডান পন্থা অবলম্বন করতেন। অর্থাৎ সকল কাজ ডান দিকে দিয়ে শুরু করতেন। এমনকি, জুতা পরিধান, কেশবিন্যাসের ক্ষেত্রেও। বাম হাত দিয়ে শৌচ কর্ম ও পরিচ্ছন্নতার কাজ সম্পাদন করতেন। যখন শুতেন ডান কাতে শুতেন, ডান হাত ডান গালের নীচে রাখতেন। তার বৈঠক ছিল জ্ঞান চর্চার পাঠশালা। যাতে অনুশীলন হত সহনশীলতা, লজ্জা, আমানতদারী, ধৈর্য, প্রশান্তি, সহমর্মিতা, অন্যকে সম্মান ও মর্যাদা দান, তাকওয়া, বিনয়, বড়কে সম্মান করা, ছোটদের প্রতি স্নেহ ও মমতা, অভাবীকে তার প্রয়োজন পূরণে অগ্রাধিকার, ভাল কাজের আদেশ, সকল প্রকার প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ, ক্ষুধার্তকে অন্ন দান, ইয়াতীম- অনাথকে আশ্রয় দান, অসুস্থকে সেবা দান, দরিদ্রকে পুনর্বাসন প্রভৃতি বিষয়গুলো। তিনি মাটির উপরে বসতেন, মাটির উপর বসে পানাহার করতেন। বিধবা, অসহায়, দাসদের সাথে বের হতেন তাদের সাহায্য করার জন্য। খেলাধূলারত শিশুদের কাছে আসতেন তাদের সালাম দিতেন। আপনজন ছাড়া অন্য নারীদের সাথে করমর্দন করতেন না। নিজের সাথিদের সর্বদা খোঁজ খবর নিতে, কাউকে না দেখলে তার খোঁজে বের হতেন। সকল সম্প্রদায়ের নেতাদের সম্মান করতেন। অধীনস্থদের সাথে সুন্দর আচরণ করতেন। সাহাবী আনাস রা. বলেন, 'আমি দশ বছর তার কাজ করেছি। তিনি কখনো আমার প্রতি বিরক্ত হননি, কখনো বলেননি এটা কেন করেছ, এটা কেন করলে না? তিনি স্বর্ণ ব্যবহার করতেন না, রেশমী কাপড় পরিধান করতেন না। তার ঘামের চেয়ে সুগন্ধময় কোন সৌরভ ছিল না।'
কখনো অশ্লীল কাজ বা আচরণ করতেন না। অশ্লীলতা পছন্দ করতেন না। খারাপ কাজের প্রতিকার খারাপ দিয়ে করতেন না, বরং ক্ষমা ও উদারতার দ্বারা খারাপ কাজের প্রতিকार করতেন। কখনো কোন কর্মচারী, স্ত্রী, শিশুদের প্রহার করেননি। তবে যুদ্ধ ও বিচারের বিষয়টি আলাদা। দুটো বিষয় বা কাজের মধ্যে যেটি সহজতর সর্বদা সেটিকে বেছে নিতেন。
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সকল উত্তম স্বভাব, চমৎকার আচরণ, সুন্দর চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন শুধু তারই সত্বায়। দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তি ও সফলতার উপাদান পাওয়া যাবে শুধু তারই চরিত্রে। বিশ্বের অন্য কোন মানুষের চরিত্রে এগুলো একত্রে কখনো পাওয়া যায়নি আর যাবেওনা। তিনি ছিলেন নিরক্ষর, পড়তে ও লেখতে জানতেন না। তার কোন মানব শিক্ষক ছিল না। তিনি পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত সকল মানুষ ও জিনের নিকট প্রেরিত ও তাদের কল্যাণে নির্বাচিত। তার প্রতি অগণিত সালাত ও সালাম নিবেদিত হোক মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে। আল-কুরআনই হল তার চরিত্র。
আমাদের জন্য করণীয় হল তার অনুসরণ করা জীবনের সকল ক্ষেত্রে- সকল কথা ও কাজে, সকল চিন্তা ও চেতনায়, সকল দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনায়। তিনি বলেছেন, 'আমি তোমাদের যা নিষেধ করেছি তা থেকে ফিরে থাকবে। আর যা আদেশ করেছি সাধ্য মত তা অনুসরণ করবে।'

টিকাঃ
১ সহীহ আল বুখারী-৫৯০৮ * সহীহ মুসলিম-২৩৪০
২ মুখতাছার শামায়েলুত তিরমিজী, ১৮৮ ৩ আহমদ ১৩৪/৩ ৪ সহীহ আল-বুখারী ৩৫৩২, সহীহ মুসলিম ২৩৫৪ * সহীহ মুসলিম ২৩৫৫ ৫ সহীহ আল-বুখারী ৩৫৩৭, সহীহ মুসলিম ১৬৮২/৩ * সূরা আলে ইমরান: ১৪৪ * সূরা আল-আহযাব: ৪০

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 আল্লাহর ইবাদত ও জিহাদে আত্ম-নিয়োগ

📄 আল্লাহর ইবাদত ও জিহাদে আত্ম-নিয়োগ


১- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আদর্শ, অনুসরণযোগ্য ইমাম যাকে সর্বদা অনুসরণ করা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
"তোমাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মধ্যে সর্বোত্তম আদর্শ। যে আল্লাহ ও আখেরাতকে চায় ও বেশি বেশি স্মরণ করে আল্লাহকে।”
২- তিনি রাতে এগারো রাকআত নামাজ আদায় করতেন। অনেক সময় তের রাকআত নামাজ আদায় করতেন。
দিনের হিসাবে দিনে তিনি মোট বার রাকআত, কখনো দশ রাকআত আদায় করতেন। চাশতের নামাজ হিসাবে তিনি চার রাকআত, কখনো তার বেশি আদায় করতেন। তিনি রাতের তাহাজ্জুদ এত দীর্ঘ সময় আদায় করতেন যে, এক রাকআতে পাঁচ পারার মত পাঠ করা যেত。
তিনি দিনে রাতে প্রায় চল্লিশ রাকআত নামাজ আদায় করতেন, এর মধ্যে ফরজ হল সতের রাকআত।
৩- রমজান মাস ব্যতীত তিনি প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখতেন। সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখতেন। অল্প কয়েক দিন ব্যতীত তিনি শাবান মাস জুড়ে রোযা রাখতেন। শওয়াল মাসে ছয়টি রোযা রাখতে উৎসাহ দিতেন। কখনো এমন ভাবে রোযা রাখতে থাকতেন মনে হতো তিনি আর রোযা ছাড়বেন না। আবার কখনো রোযা পরিহার করতেন মনে হতো তিনি আর নফল রোযা রাখবেন না। তিনি আশুরাতে রোযা রাখতেন। জিলহজ মাসের নবম তারিখেও তিনি রোযা রাখতেন। তিনি বিরতিহীন ভাবে রোযা রাখতে নিষেধ করতেন। তিনি বলতেন আমার উম্মত আমার মত নয়। আমাকে আমার প্রতিপালক পানাহার করিয়ে থাকেন。
আল্লাহর কাছে সালাত ও মুনাজাত ছিল তার কাছে সর্বাধিক প্রিয়। তাই তো তিনি বেলালকে বলতেন, 'হে বেলাল! সালাতের মাধ্যমে আমাদের প্রশান্তি দাও।'
তিনি আরো বলতেন, 'সালাতের মধ্যে আমার চোখের প্রশান্তি রাখা হয়েছে।'
৪- তিনি বেশি করে ছদকাহ করতেন। তিনি ছিলেন সকল সৃষ্টি জীবের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দানশীল। তিনি মানুষকে এমনভাবে দান করতেন যে, দান গৃহী তা কখনো অভাব বোধ করতো না। যেমন তিনি এক ব্যক্তিকে বকরীর বিশাল এক পাল দান করলে সে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো, কারণ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত বড় দানশীল যে, সে কাউকে দান করলে জীবনে সে দারিদ্রতাকে ভয় করে না।'
তিনি যেমন ছিলেন সুন্দরতম মানুষ, তেমনি ছিলেন সকলের চেয়ে দানশীল। সকল মানুষের চেয়ে বেশি সাহসী, সবচেয়ে বেশি দয়ার্দ্র, সকলের চেয়ে বেশি বিনয়ী, ন্যায়পরায়ণ, ধৈর্যশীল, নম্র, ক্ষমাশীল, সহনশীল, লজ্জাশীল ও সত্যের প্রতি অটল, অবিচল।
৫- তিনি সকল জিহাদের ময়দানে উপস্থিত থেকে যুদ্ধ করেছেন। কুপ্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করেছেন। এর চারটি স্তর রয়েছে এগুলো হল: দীনের বিষয়াবলী শিক্ষা, সে মোতাবেক আমল করা, জেনে বুঝে তার দিকে মানুষকে আহবান করা, দাওয়াতের ক্ষেত্রে যুলুম-নির্যাতন, দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য অবলম্বন。
শয়তানের সাথে জিহাদ করার স্তর হল দুটো : শয়তান যে সকল সংশয় - সন্দেহ সৃষ্টি করে সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করা, যে সকল কুমন্ত্রণা দেয় তা প্রতিরোধ করা।
কাফেরদের সাথে জিহাদ করার স্তর হল চারটি: অন্তর দিয়ে জিহাদ, মুখ বা বাকশক্তি দিয়ে জিহাদ, সম্পদ দিয়ে জিহাদ ও হাত দিয়ে জিহাদ。
যালেমদের বিরুদ্ধে জিহাদের স্তর হল তিনটি হাত দিয়ে অতঃপর মুখ দিয়ে এরপর অন্তর দিয়ে।
এ হল জিহাদের মোট তেরোটি স্তর। এ সবকটি স্তরে জিহাদ করার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এ জন্য তিনি বিশ্বের মানব সমাজে সর্বকালের সব চেয়ে বেশি আলোচিত ব্যক্তি। আল্লাহ রাববুল আলামীন তাকে এ সম্মান দান করেছেন。
তিনি তাওহীদ- আল্লাহর একত্ববাদ বিরোধীদের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন সরাসরি। এ সকল যুদ্ধের সংখ্যা হল সাতাশ। এর মধ্যে মাত্র নয়টিতে লড়াই সংঘটিত হয়েছিল। আর যে সকল অভিযান তাঁর নির্দেশে হয়েছে, কিন্তু তিনি সরাসরি তাতে অংশ নেননি, এমন অভিযানের সংখ্যা হল ছাপ্পান্ন।
৬- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সাথে মুআমালা- লেনদেনের ক্ষেত্রে ছিলেন সকল মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। তিনি একদিন এক ব্যক্তি থেকে একটি উট ধার নিয়েছিলেন। কথা ছিল এর পরিবর্তে অন্য একটি সমমানের উট তাকে দেয়া হবে। সময় মত যখন উটের পাওনাদার উট নিতে আসল, তখন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সে কথা-বার্তায় কঠোর আচরণ করল। সাহাবায়ে কেরাম রাগ হয়ে তাকে বুঝাতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, 'তাকে ছেড়ে দাও! তার কথার প্রতিবাদ করনা। পাওনাদারের কথা বলার অধিকার আছে। তার উটের মত উট তাকে দিয়ে দাও।' সাহাবীগণ বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! তার উটের চেয়ে ভাল উট আছে, কিন্তু সমমানের উট নেই। তিনি বললেন, 'সেটাই তাকে দিয়ে দাও!' লোকটি তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'আপনি আমার অধিকার পরিপূর্ণ ও সুন্দরভাবে আদায় করেছেন। আল্লাহ আপনাকে সুন্দরভাবে দান করুন।' তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'যে সুন্দর বিচার করে সে আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে উত্তম।'
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. কে বললেন, 'আমি তোমার উটটি কিনব, সে উট নিয়ে এল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উটের দাম দিলেন ও উট ফেরত দিয়ে বললেন, 'নাও! তোমার উট ও তার মূল্য।'
৭- চরিত্রের দিকে দিয়ে তিনি সকল মানুষের মধ্যে ছিলেন শ্রেষ্ঠতম। যেমন আয়েশা রা. বলেন, 'তার চরিত্র ছিল আল-কুরআন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বলেছেন, 'আমাকে উত্তম চরিত্রের উৎকর্ষতাকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।'
৮- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম যাহেদ-দুনিয়া বিমুখ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি খেজুরের চাটাইতে শয়ন করতেন। শরীরে চাটাইয়ের দাগ পড়ে যেত। একদিন উমার রা. তার কাছে আসলেন। তিনি তার শরীরে চাটাইয়ের দাগ দেখে বললেন, 'যদি আপনি বিছানা ব্যবহার করতেন তাহলে শরীরে দাগ পড়তোনা।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বললেন, 'দুনিয়ার সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমার আর এ দুনিয়ার দৃষ্টান্ত হল, এক সওয়ারী, যে গরমের দিন পথ চলতে গিয়ে বিশ্রামের জন্য গাছের তলায় একটু শুয়ে নিল। তারপর আবার চলতে শুরু করল।'
তিনি আরো বলতেন, 'যদি আমার কাছে উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকত তাহলে আমি তা তিন দিন আমার কাছে থাকুক তা পছন্দ করতাম না। তবে দ্বীনের জন্য কিছু রাখলে তা হত অন্য কথা।'
আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনে তার পরিবার কখনো তিন দিন পেট ভরে খাবার গ্রহণ করতে পারেনি।
অর্থাৎ একাধারে তিনদিন তারা পেট ভরে খেতে পারেননি। কারণ খাদ্যের অভাব। তাদের কাছে কোন খাদ্য-খাবার আসলে অভাবী মানুষকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দিয়ে তাদের দান করে দিতেন। তারা নিজেরা না খেয়ে তা অন্যকে দিয়ে দিতেন。
আয়েশা রা. বলেন, 'নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে চলে গেলেন কিন্তু জীবনে কখনো পেট ভরে আটার রুটি খেলেন না।
তিনি আরো বলেন, 'তিনটি নতুন চাঁদ আমরা দেখতাম, দু মাস অতিবাহিত হত কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গৃহসমূহে চুলায় আগুন জ্বলতো না।' উরওয়া (আয়েশা রা. এর বোনের ছেলে) জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে আপনারা কি খেয়ে জীবন কাটাতেন।' তিনি বললেন, 'দুটি কালো বস্তু; খেজুর ও পানি।'
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিছানা ছিল গাছের আশ দিয়ে তৈরি চট।
৯- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচেয়ে বেশি পরহেযগার-সতর্ক, তিনি বলেন, 'আমি যখন ঘরে আসি তখন অনেক সময় বিছানায় বা ঘরের কোথাও দেখতে পাই যে, খেজুর পড়ে আছে। আমি তা খাওয়ার জন্য উঠিয়ে নেই। কিন্তু পর ক্ষণে চিন্তা করি, হতে পারে এটি ছদকার খেজুর (যা আমার জন্য বৈধ নয়) পরে তা ফেলে দেই।'
তার নাতি হাসান ইবনে আলী রা. একবার ছদকার খেজুর থেকে একটি খেজুর মুখে দিলেন। তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'ছি! ছি! ফেলে দাও! তুমি কি জান না, আমরা ছদকা খাই না?'
১০- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত বেশি ও বড় বড় কাজ করা সত্ত্বেও বলতেন, 'তোমরা সামর্থ্য অনুযায়ী আমল করো। জেনে রাখ! আল্লাহ বিরক্ত হন না, যতক্ষণ না তোমরা কাজ করতে করতে বিরক্ত হও। আল্লাহর কাছে প্রিয় আমল হল যা সর্বদা করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়।' আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবী ও পরিজনেরা যখন কোন আমল করতেন, তার উপর অবিচল থাকতেন。
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন সালাত আদায় করতেন তা অব্যাহত রাখতেন।
একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কয়েকজন সাহাবী তার ইবাদত সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। তারা বলছিলেন, ইবাদতের ক্ষেত্রে আমরা কোথায় আর আল্লাহর নবী কোথায়? আমাদের ইবাদতের সাথে তার ইবাদতের কোন তুলনা হয়? অথচ আল্লাহ তার পিছনের ও সামনের সকল পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাদের একজন বলল, আমি রাতব্যাপী নফল সালাত আদায় করব। আরেক জন বলল, আমি সর্বদা রোযা রাখব কখনো রোযা ত্যাগ করব না। অন্য একজন বলল, আমি কখনো নারী স্পর্শ করব না ও বিবাহ করব না। আরেক জন বলল, আমি কখনো গোস্ত খাব না। তাদের এ আলোচনা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনছিলেন। তিনি তাদের কাছে এসে বললেন, 'তোমরাই তো এ রকম কথা-বার্তা বলছিলে, তাই না? সাবধান! আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি ও তোমাদের চেয়ে বেশি মুত্তাকী-পরহেযগার। কিন্তু দেখ, আমি রোযা রাখি আবার তা পরিত্যাগ করি। আমি নামাজও পরি আবার নিদ্রা যাই। আমি নারীদের বিবাহ করি। অতএব যে আমার সুন্নাতে অনীহা দেখায় সে আমার থেকে নয়।'
এখানে সুন্নাত দ্বারা তার আদর্শ ও জীবন যাপন পদ্ধতি উদ্দেশ্য। তিনি এত কঠিন, কঠোর ও অত্যধিক আমল করার পরও বলতেন, 'সহজ করো, ধীরে সুস্থে কাজ করো, তোমরা জেনে রাখো, কেহ আমলের বিনিময়ে মুক্তি পাবে না।' সাহাবীগন বলল, হে রাসুল! 'আপনিও কি আমলের বিনিময়ে মুক্তি পাবেন না?' তিনি বললেন, 'আমিও নই, তবে আল্লাহ যদি নিজ অনুগ্রহে আমার প্রতি রহম করেন, আমার প্রতি দয়া করেন।'
তিনি এ বলে আল্লাহর কাছে দুআ করতেন, 'হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দীনের উপর অটল রাখেন।'

টিকাঃ
১ সূরা আল-আহযাব: ২১ ২ সহীহ আল - বুখারী ১১৪৭, সহীহ মুসলিম ৭৩৭ * সহীহ মুসলিম ৭৯১ 'সহীহ মুসলিম ৭৭২ * কিতাবুস সালাত: ইবনুল কায়্যিম * সহীহ মুসলিম ১১৬০ ' তিরমিজী ৭৪৫, নাসায়ী ২০২/৪ * সহীহ আল - বুখারী ১৯৬৯, সহীহ মুসলিম ১১৫৬
২ সহীহ আল - বুখারী- ৬০৩৮, সহীহ মুসলিম ২৩০৯ * সহীহ আল - বুখারী ৭২৮৮, সহীহ মুসলিম ২৬১৯
৩ সহীহ মুসলিম ১১৬৪ ৪ সহীহ আল - বুখারী ১৯৭১, সহীহ মুসলিম ১১৫৬ * সহীহ আল - বুখারী ২০০০, সহীহ মুসলিম ১১২৫ * সহীহ নাসায়ী ২২৩৬ * সহীহ আল - বুখারী ১৯৬১-১৯৬৪, সহীহ মুসলিম ১১০২-১১০৩ ৬ আবু দাউদ ৮৫৪৯ * নাসায়ী ৬১/৭ ৮ সহীহ মুসলিম ১৮০৬
৪ ফাতহুল বারী
৫ সুনানে তিরমিজী ২৮০/২ ৬ সহীহ আল - বুখারী ২৩৮৯, সহীহ মুসলিম ৯৯১ ৭ সহীহ আল - বুখারী ৫১৭/৯ ৮ সহীহ আল - বুখারী, ৫৪১৬ ৯ সহীহ আল - বুখারী ৫১৭/৯

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 সৃষ্টিকুলের জন্য রহমত তিনি

📄 সৃষ্টিকুলের জন্য রহমত তিনি


প্রথমত: তিনি মানবকুল, জিন, মুমিন, কাফের জীবজন্তু সকলের জন্য করুণা
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ . (الأنبياء : ۱۰۷)
"আমি তো তোমাকে বিশ্ব জগতের প্রতি শুধু রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি।”
যারা ঈমান এনেছে তারা এ রহমত-অনুগ্রহকে গ্রহণ করেছে। এ জন্য আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করেছে। কিন্তু অন্যেরা প্রত্যাখ্যান করেছে। আল্লাহর এ অনুগ্রহকে কুফরী দ্বারা পরিবর্তন করেছে। আল্লাহর নেআমাত ও রহমতকে অস্বীকার করেছে।
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান আনল, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার জন্য রহমত-করুণা লিখে দিলেন। আর যে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনল না তারা অতীতে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর ন্যায় শাস্তি ও দুর্যোগ ভোগ করবে।'
ইমাম তাবারী রহ. বলেন, 'উপরে উল্লেখিত দু'টো বক্তব্যের মধ্যে প্রথম বক্তব্যটি অধিকতর সঠিক, যা ইবনে আব্বাস রা. বলেন, 'আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসেবে ও সৃষ্টিকুলের জন্য করুণা হিসেবে প্রেরণ করেছেন। মুমিন ও কাফের সকলের জন্য। মুমিনগনকে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ এর মাধ্যমে পথ প্রদর্শন করলেন। তাদের ঈমানে প্রবেশ করালেন, আমলের তাওফীক দিলেন। ফলে তারা জান্নাত লাভ করবে। আর যারা তাকে অস্বীকার করল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কারণে তাদের উপর আল্লাহর গজব ও শাস্তি বিলম্বিত হয়েছে। এদিক বিবেচনায় রাসূলুল্লাহ হলেন কাফিরদের জন্য রহমত। কেননা অন্যান্য নবী ও রাসূলগনকে অস্বীকার করার শাস্তি সংশ্লিষ্ট নবী রাসূলদের জীবদ্দশায় হয়েছিল। কিন্তু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের জন্য রহমত হিসেবে আসার কারণে কাফেরদের উপর শাস্তি বিলম্বিত হয়েছে।'
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রহমত ছিল সার্বজনীন ও ব্যাপক। যেমন আবু হুরাইরা রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হল, 'হে রাসূল! মুশরিকদের বিরুদ্ধে দুআ করুন!' উত্তরে তিনি বললেন, 'আমাকে অভিসম্পাতকারী হিসেবে প্রেরণ করা হয়নি। আমাকে রহমত- দয়া ও করুণা হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে।'
সাহাবী হুজাইফা রা. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, 'আমি যদি রাগ করে আমার উম্মতের কাউকে গালি দেই বা লা'নত করি তবে তোমরা জেনে রাখ আমি একজন মানব সন্তান। তোমরা যেমন রাগ করে থাকো আমিও তেমনি রাগ করে থাকি। কিন্তু আমাকে তো সৃষ্টিকুলের জন্য রহমত-করুণা হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। কেয়ামত দিবসে আমার এ গালি বা লানতকে তাদের জন্য রহমতে পরিণত করে দেব।'
তিনি আরো বলেছেন, 'আমি মুহাম্মাদ, আহমদ, আল-মুকাফফী, আল-হাশের, তাওবার নবী ও রহমত-করুণার নবী।'
দ্বিতীয়ত: এ প্রসঙ্গে বাস্তব ঘটনাবলী ও তার প্রকার:
প্রথম প্রকার: তার শত্রুদের প্রতি দয়া ও করুণা
প্রথম দৃষ্টান্ত: নিজ শত্রুদের জন্য তার রহমত ও করুণা:
তার রহমত- করুণা থেকে তার শত্রুরাও বঞ্চিত হয়নি। এমনকি তাদের সাথে যুদ্ধ, লড়াই ও জিহাদ করার সময়েও তাদের প্রতি দয়া-রহমত ও করুণার প্রমাণ দিয়েছেন。
ইসলামে আল্লাহর পথে জিহাদের ব্যাপারে মূলনীতি রয়েছে। যারা জিহাদে নিয়োজিত থাকে তাদের এ সকল মূলনীতি অবশ্যই মানতে হবে। কারণ আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেন,
وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
"তোমরা সীমা লঙ্ঘন করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।"
এ আয়াতের আলোকে জিহাদে যে সকল বিষয় নিষিদ্ধ তা হল: মৃত দেহে কোন রকম আঘাত করা বা কাটা, সম্পদ আত্মসাত-লুট-পাট, নারী শিশু বৃদ্ধদের হত্যা করা, যে সকল বৃদ্ধরা যুদ্ধে কোন ভূমিকা রাখে না তাদের হত্যা করা। এমিনভাবে পাদ্রী, ধর্ম যাজক, অসুস্থ, অন্ধ, গির্জা, চার্চ, মন্দিরের অধিবাসীদের হত্যা করা নিষেধ। যদি তারা যুদ্ধে অংশ নেয় তখন ভিন্ন কথা。
এমনিভাবে প্রাণী হত্যা, গাছ-পালা বৃক্ষ নষ্ট করা, শস্য ক্ষেত্র ফল-ফলাদির বাগান নষ্ট করা, নলকূপ, পুকুর, পানির ব্যবস্থা ও গৃহ ধ্বংস করা নিষিদ্ধ।
কোন এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ ক্ষেত্রে এক নারীর লাশ দেখতে পেলেন। তখনই তিনি যুদ্ধের সময় নারী ও শিশুদের হত্যা নিষিদ্ধ করে দিলেন।
এ কারণে যখন তিনি কোন অভিযান প্রেরণ করতেন, তখন তার সেনাপতিকে নির্দেশ দিতেন সকল বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করতে, অধীনস্থদের সাথে ভাল আচরণ করতে। অতঃপর বলতেন, 'আল্লাহর নামে আল্লাহর পথে লড়াই করবে। যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। যুদ্ধ করবে কিন্তু বাড়াবাড়ি করবে না, লুট-পাট করবে না, মৃত দেহ বিকৃত করবে না, শিশুদের মারবে না। যখন শক্রের মুখোমুখি হবে তখন তাদের তিনটি বিষয়ে আহবান করবে...। অতঃপর তিনি বিষয় তিনটি বললেন,
(ক) ইসলাম ও হিজরতের প্রতি আহ্বান করবে অথবা হিজরত ব্যতীত শুধু ইসলামের দিকে আহবান করবে। শুধু ইসলাম গ্রহণ করলে তারা বেদুইন মুসলমানদের মধ্যে গণ্য হবে。
(খ) যদি ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করে তখন তাদের জিযিয়া কর দিতে বলবে。
(গ) যদি এ দুটোর কোনটা না শুনে তাহলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাবে ও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: নিজ শত্রুদের সাথে প্রতিশ্রুতি পালন
জিহাদের গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতির একটি হল ওয়াদা রক্ষা করা খেয়ানত না করা। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِمَّا تَخَافَنَّ مِنْ قَوْمٍ خِيَانَةً فَانْبِذْ إِلَيْهِمْ عَلَى سَوَاءٍ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الخَائِنِينَ
"যদি তুমি কোন সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ভঙ্গের আশঙ্কা করো, তবে তোমার চুক্তিকেও প্রকাশ্যভাবে তাদের সামনে নিক্ষেপ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বাস ভঙ্গকারীদের পছন্দ করেন না।"
যদি কাফের ও মুসলিমদের মধ্যে কোন চুক্তি থাকে বা নিরাপত্তা দেয়ার কথা থাকে, তখন আক্রমণ করা মুসলিমদের জন্য বৈধ নয়। অবশ্যই মুসলিমগন চুক্তি রক্ষা করবে। যদি কাফেরদের পক্ষ থেকে চুক্তি ভঙ্গের আশঙ্কা দেখা দেয় তখন মুসলিমগণ তাদের এ বিষয়ে সংবাদ দেবে যে, 'তোমরা যদি চুক্তি ভঙ্গ করতে চাও আমরা তাহলে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেব।'
এ আয়াত দ্বারা স্পষ্ট বুঝে আসে যদি কাফের বা শত্রুদের পক্ষ থেকে চুক্তি ভঙ্গের ভয় না থাকে তাহলে মুসলিমদের জন্য চুক্তি রক্ষা করা অপরিহার্য হয়ে যাবে。
তাইতো আমরা দেখতে পাই, সালীম ইবনে আমের বলেন, মুআবিয়া ও রোম সাম্রাজ্যের মধ্যে চুক্তি ছিল। তিনি রোমের দিকে এ উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন যে, যখন চুক্তি শেষ হয়ে যাবে তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ শুরু করবেন। তখন দেখা গেল ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে এক ব্যক্তি এসে বলল, 'আল্লাহু আকবর, চুক্তি রক্ষা করা উচিত, ভঙ্গ করা নয়।' লোকেরা তার দিকে তাকাল, দেখা গেল সে আমর ইবনে আবাসা রা.। মুআবিয়া রা. তার কাছে লোক পাঠিয়ে বিষয়টি জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলতেন, 'যদি কোন সম্প্রদায়ের সাথে চুক্তি থাকে তবে তার গিঁট শক্ত করবে না ও খুলেও ফেলতে চাবে না। যতক্ষণ না তার মেয়াদ শেষ হয়ে যায় অথবা উভয় পক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে।' এ কথা শুনে মুআবিয়া রা. তার বাহিনী নিয়ে ফিরে গেলেন। কেননা এ ধরনের তৎপরতা চুক্তি ভঙ্গের চেষ্টা করার নামান্তর।
তৃতীয় দৃষ্টান্ত: নিজ শত্রুদের উপর শাস্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
এ বিষয়ে সুন্দর দৃষ্টান্ত হল, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুশরিকরা প্রস্তর আঘাতে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল তখন পাহাড়-পর্বত সমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তা এসে বলল, 'হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ আপনার জাতির কথা শুনেছেন, যা তারা আপনাকে বলেছে। আমি হলাম পাহাড়ের দায়িত্বশীল। আমার প্রতিপালক আমাকে আপনার খেদমতে পাঠিয়েছেন। আপনি আমাকে এ ব্যাপারে যে কোন নির্দেশ দিতে পারেন। যদি আপনি চান আমি দু আখবাশ একত্র করে তাদের পিষে দেই।' (আখবাস হল মক্কার দু পাশের দু পাহাড়। যার মাঝে মক্কা নগরী অবস্থিত) এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাহাড়ের ফেরেশতাকে বললেন, 'আমি আশা করি এদের থেকে আল্লাহ তাআলা এমন প্রজন্ম বের করবেন যারা এক আল্লাহরই ইবাদত করবে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।'
চতুর্থ দৃষ্টান্ত: রাসূলুল্লাহর উদার মানসিকতা ও ইহুদীদের কল্যাণ কামনা
এর সুন্দর দৃষ্টান্ত হল আনাস রা. এর হাদীস, তিনি বলেন, 'এক ইহুদী যুবক ছিল যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমত করতো। সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। রাসূলুল্লাহ তাকে দেখতে এলেন। তার মাথার কাছে বসলেন। তাকে বললেন, 'তুমি ইসলাম গ্রহণ করো।' এ কথা শুনে সে তার বাপের মুখের দিকে তাকাল। বাপ তাকে বলল, 'আবুল কাসেম (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা বলে তা শোনো।' সে তৎক্ষণাৎ ইসলাম কবুল করল। (নাসায়ীর বর্ণনায় সে ঘোষণা দিল, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছ থেকে বের হওয়ার সময় বললেন, 'প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি ছেলেটাকে আগুন থেকে মুক্তি দিলেন।'
দ্বিতীয় প্রকার: মুমিনদের প্রতি তার করুণা-রহমত
আল্লাহ তাআলা বলেন, لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ "তোমাদের নিকট আগমন করেছে তোমাদেরই মধ্যকার এমন একজন রাসূল। যার কাছে তোমাদের ক্ষতিকর বিষয় অতি কষ্টদায়ক মনে হয়। সে হচ্ছে তোমাদের খুবই হিতাকাংখী, মুমিনদের প্রতি বড়ই স্নেহশীল, করুণাপরায়ন।”
আল্লাহ এ নবীকে পাঠিয়েছেন সাধারণভাবে সকল মানুষের জন্য আর বিশেষভাবে মুমিনদের জন্য। যারা তাকে চিনে, তার থেকে উপকার নিতে জানে। তিনি মুমিনদের কল্যাণ কামনা করেন সর্বদা। তাদের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য সর্বদা প্রচেষ্টা চালান। তাদের উপর কোন বিপদ আসলে তিনিও তাতে আহত হন। তাদের ঈমানের দিকে পথ চলাতে সর্বদা আগ্রহী থাকেন। তাদের জন্য যে কোন ধরনের ক্ষতি তিনি অপছন্দ করেন। পিতা-মাতারা সন্তানকে যেভাবে ভালবাসে তিনি ঈমানদারদেরকে তার চেয়ে বেশি বেশি ভালোবাসেন। এ জন্যই তার হক সকলের চেয়ে বেশি। উম্মতের জন্য অবশ্য কর্তব্য হল তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। তাকে সম্মান করা। তাকে সাহায্য করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ "নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর এবং তার স্ত্রীরা তাদের মাতা।” তাই নিজের চেয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বেশি ভালোবাসতে হবে। যদি নিজের কোন সিদ্ধান্তের সাথে নবীর সিদ্ধান্ত বিরোধী হয় তখন নিজের মতামত বাদ দিয়ে নবীর মতামত বা সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরো বলেন, فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهَ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ المُتَوَكِّلِينَ "অতএব আল্লাহর অনুগ্রহ এই যে, তুমি তাদের প্রতি কোমল চিত্ত; আর তুমি যদি কর্কশভাষী, কঠোর হৃদয় হতে, তবে নিশ্চয় তারা তোমার সঙ্গ হতে দূরে সরে যেত অতএব তুমি তাদের ক্ষমা করো ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং কার্য সম্পর্কে তাদের সাথে পরামর্শ করো; যখন তুমি সংকল্প করো তখন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করো। যারা তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমি মুমিনদের অতি নিকটবর্তী তাদের নিজেদের চেয়েও। অতএব যে ইন্তেকাল করে ও তার উপর ঋণ থাকে, সেই ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্ব আমার। আর যদি সে সম্পদ রেখে যায়, তা তার উত্তরাধিকারদের প্রাপ্য।"
তৃতীয় প্রকার: তার করুণা ও ভালোবাসা সকল মানুষের জন্য
১- সাহাবী জরীর ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে মানুষের প্রতি দয়া করে না আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।'
২- আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, 'আমি আবুল কাসেম (রাসূলুল্লাহ) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন 'হতভাগ্য ব্যতীত অন্য করো থেকে রহমত-দয়ার চরিত্র উঠিয়ে নেয়া হয় না।'
৩- সাহাবী আমর ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যারা অন্যের প্রতি দয়া-করুণা করে দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন। যারা পৃথিবীতে আছে তাদের প্রতি তোমরা দয়া করো তাহলে যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। দয়া-রহমত হল দয়াময় আল্লাহর নৈকট্য, যে এতে পৌছতে পারল সে আল্লাহর কাছে পৌছে গেল, আর যে এটা কেটে ফেলল সে তার সাথে সম্পর্ক কেটে ফেলল।'
চতুর্থ প্রকার: শিশুদের প্রতি তার দয়া ও মমতা
১- আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, এক বৃদ্ধ লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসল, লোকেরা তাকে জায়গা করে দিতে দেরি করল। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'যে ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা দেখায় না ও প্রবীণদের সম্মান করে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।'
২- আমর ইবনে শুআইব তার পিতা থেকে, তার পিতা তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ছোটদের প্রতি স্নেহ মমতার আচরণ করে না, আমাদের বড়দের সম্মান বুঝে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।'
পঞ্চম প্রকার: কন্যা সন্তানদের প্রতি তার দয়া-মমতা:
১- আবু সায়ীদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে কোন ব্যক্তির তিনটি কন্যা বা তিনটি বোন অথবা দুটি কন্যা বা দুটি বোন থাকে। তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে এবং তাদের সাথে উত্তম আচরণ করে আল্লাহ অবশ্যই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।'
২- আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি দুটি কন্যা বা তিনটি কন্যা লালন-পালন করবে, অথবা দুটি বোন বা তিনটি বোন লালন-পালন করবে বিবাহ দেয়া পর্যন্ত বা মৃত্যু পর্যন্ত। সে ব্যক্তি ও আমি জান্নাতে এক সঙ্গে থাকব।'
ষষ্ঠ প্রকার: ইয়াতীমদের প্রতি তার দয়া ও ভালোবাসা
১- আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমি ও ইয়াতীমের লালন-পালনকারী জান্নাতে এমনভাবেই থাকব।' একথা বলে তিনি তার তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করেছেন। (অর্থাৎ একত্রে থাকব)
২- আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে নিজ অন্তরের কঠোরতা সম্পর্কে অভিযোগ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলাও, অভাবীকে আহার দাও।'
সপ্তম প্রকার: নারী ও দুর্বলদের প্রতি তার দয়া-মমতা:
১- আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'হে আল্লাহ! আমি দুই দুর্বলের অধিকারের ব্যাপারে ভয় করি; ইয়াতীমের অধিকার ও নারীর অধিকার।'
২- আমের ইবনুল আহওয়াছ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বিদায় হজে অংশ নিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সানা ও প্রশংসা করলেন, ওয়াজ করলেন, স্মরণ করিয়ে দিলেন। অতঃপর এক পর্যায়ে বললেন, 'আমি নারীদের সাথে সুন্দর আচরণের জন্য তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছি। তারা তোমাদের জীবন সাথি। তোমরা এ (সাহচর্য) ছাড়া তাদের আর কিছুর মালিক নও।'
৩- আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে নিজের স্ত্রীদের ও উম্মে সুলাইমের ঘর ছাড়া অন্য কোন নারীর ঘরে প্রবেশ করতেন না। তাকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, 'আমি তার প্রতি দয়া-মমতার কারণে তাকে (উম্মে সুলাইমকে) দেখতে যাই। কারণ তার ভাই আমার সাথে থেকে নিহত হয়েছে।'
অষ্টম প্রকার: ইয়াতীম ও বিধবাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দয়া-মমতা
১- আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'বিধবা ও অভাবী লোকদের জন্য যে প্রচেষ্টা চালায়, সে মর্যাদায় আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের ন্যায় অথবা ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে সারা রাত সালাতে কাটায় ও দিবসে রোযা রাখে।'
২- আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আওফা রা. বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক পরিমাণে জিকির করতেন। অনর্থক বিষয় পরিহার করতেন। সালাত দীর্ঘ করতেন। খুতবা সংক্ষেপ করতেন এবং বিধবা ও অভাবী লোকদের প্রয়োজন পূরণে বের হতে দেরি করতেন না।'
উল্লেখিত হাদীসগুলো পাঠ করে আমরা দেখলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধবা ও অভাবী লোকদের সাহায্য করতে তাদের প্রয়োজন পূরণে কতটা দয়ার্দ্র ও মমতাময়ী ছিলেন。
নবম প্রকার: জ্ঞান অন্বেষনকারী ছাত্রদের প্রতি রাসূলুল্লাহর দয়া ও স্নেহ
১- আবু সায়ীদ খুদরী হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'জ্ঞান অর্জনের জন্য তোমাদের কাছে অনেক সম্প্রদায় আসবে। যখন তোমরা তাদের দেখবে স্বাগত জানিয়ে বলবে, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশক্রমে তোমাদের স্বাগত জানাই।' এবং তাদের শিক্ষা দেবে। শিক্ষায় সাহায্য করবে।'
২- মালেক ইবনে হুয়াইরিস রা, বলেন, 'আমরা সমবয়সী কয়েকজন যুবক নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে আসলাম। বিশ দিন বিশ রাত কাটালাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আমাদের প্রতি খুবই দয়ার্দ্র ও স্নেহময়ী। যখন তিনি বুঝতে পারলেন, আমরা আমাদের পরিবারের কাছে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠেছি, তখন তিনি আমাদের সকলের কাছ থেকে জেনে নিলেন আমরা বাড়িতে কাদের রেখে এসেছি। তিনি বললেন, 'তোমরা তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও। তাদের কাছে অবস্থান করো। তাদের শিক্ষা দাও।আর আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখেছ তোমরা সেভাবে সালাত আদায় করবে। যখন সালাতের সময় আসবে তোমাদের একজন আজান দেবে, তোমাদের মধ্যে বয়োজেষ্ঠ ব্যক্তি ইমামতি করবে।'
দেখুন জ্ঞান অর্জনে নিয়োজিত ছাত্রদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত দয়ালু ও স্নেহময়ী ছিলেন。
দশম প্রকার: বন্দি ও কয়েদীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর দয়া ও মমতা
আবু মূছা আল-আশআরী রা. বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'বন্দিদের মুক্ত করে দাও। ক্ষুধার্তকে আহার দাও। অসুস্থদের সেবা করো।'
এ হাদীসে মুসলিম বন্দিদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দয়া ও রহমতের প্রমাণ আমরা পাই। তিনি বন্দিদের মুক্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর ক্ষুধার্তকে অন্ন দিতে ও রোগীর সেবা করতে আদেশ করেছেন。
একাদশ প্রকার: রোগীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দয়া ও মমতা -
১- আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'মুসলমানদের প্রতি মুসলমানদের ছয়টি অধিকার রয়েছে।' জিজ্ঞেস করা হল, 'হে আল্লাহর রাসূল সেগুলো কি?' তিনি বললেন, 'যখন দেখা হবে সালাম দেবে। যখন সে তোমাকে দাওয়াত দেবে, তুমি সাড়া দেবে। যখন সে পরামর্শ চাবে তাকে পরামর্শ দেবে। যখন সে হাঁচি দিয়ে আল- হামদুলিল্লাহ বলবে তার উত্তর দেবে। যখন সে অসুস্থ হবে তখন তার দেখাশুনা করবে এবং যখন সে মৃত্যু বরণ করবে তখন তার দাফন কাফনে অনুগামী হবে।'
২- আলী রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'যখন কোন মুসলমান এক অসুস্থ মুসলমানকে সকাল বেলায় সেবা করতে আসে তখন সত্তর হাজার ফেরেশতা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য দুআ করতে থাকে। আর যখন রাতের বেলা সেবা করতে আসে তখন সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দুআ করে থাকে। আর জান্নাতে তার জন্য একটি বাগান তৈরি করা হয়。
৩- ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি মৃত্যুপথ যাত্রী নয় এমন রোগীকে দেখতে যাবে এবং তার কাছে বসে সাত বার যদি এ দুআটি পড়ে
أسألك الله العظيم رب العرش العظيم أن يشفيك
(আমি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, যিনি মহান আরশের প্রভু তিনি যেন তোমাকে সুস্থ করে দেন।) তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে সুস্থ করে দেবেন।'
এ সকল হাদীস আমাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগাক্রান্ত অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রতি কত বড় দয়ালু-মেহেরবান ছিলেন। শুধু তিনি দয়ালু ছিলেন তাই নয়। বরং তিনি উম্মতকে শিখিয়েছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন রোগাক্রান্ত মানুষকে সেবা করার জন্য, তাদের প্রতি দয়া-করুণা প্রদর্শন করার জন্য。
দ্বাদশ প্রকার: জীবজন্তু, পাখ-পাখালী ও পোকা-মাকড়ের প্রতি রাসূলুল্লাহর দয়া-
১- আবু হুরাইরা রা. বর্ণিত হাদীসে এসেছে, এক ব্যক্তি দেখল একটু কুকুর পিপাসায় কাঁদা খাচ্ছে,। লোকটি কুকুরটিকে পানি পান করাল। পানি পান করে সে আল্লাহর শোকর আদায় করল। এ কারণে সে ব্যক্তিকে আল্লাহ ক্ষমা করে জান্নাতে প্রবেশ করালেন। এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! জন্তু জানোয়ারের ব্যাপারেও আমাদের জন্য পুরস্কার আছে?' তিনি উত্তর দিলেন, 'প্রতিটি আদ্র কলিজার অধিকারী (প্রাণী) র প্রতি দয়া-মমতায় তোমাদের জন্য পুরস্কার আছে।'
২- আবু হুরাইরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করেন যে, 'এক ব্যভিচারী নারী পিপাসার কারণে মৃত মুখে পতিত এক কুকুর দেখতে পেল। সে নিজের পায়ের মোজা খুলে তাতে নিজের ওড়না লাগিয়ে কূপ দিয়ে পানি উঠিয়ে কুকুরটিকে পান করাল। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন।'
৩- আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'জনৈক মহিলা একটি বিড়ালকে বেধে রেখেছিল। ফলে সে না খেয়ে মারা গেল। আল্লাহ এ কারণে মহিলাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেন। কেন সে বিড়ালটিকে খাবার না দিয়ে আটকে রাখল? সে তাকে ছেড়ে দিত, যমীন থেকে সে খাবার সংগ্রহ করে নিত।'
৪- আনাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে কোন মুসলমান কোন বৃক্ষ রোপণ করে, কোন শস্য চাষ করে। অতঃপর তা থেকে কোন পাখি বা মানুষ অথবা কোন জন্তু-জানোয়ার খাবার খায়, তাহলে এটা তার জন্য ছদকাহ হিসেবে আল্লাহর কাছে গ্রহণ করা হয়।'
৫- ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বকরী জবেহ করার জন্য শুইয়ে দিল। তারপর চাকু ধারালো করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে বললেন, 'তুমি কি বকরীটিকে কয়েকবার মৃত্যুর কষ্ট দিতে চাও? কেন তাকে শোয়ানোর পূর্বে চাকু ধারালো করলে না?'
৬- শাদ্দাদ ইবনে আওস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ সকল কিছুর ব্যাপারে সুন্দর ও কল্যাণকর আচরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব যখন তোমরা কোন কিছু হত্যা করবে তখন সুন্দরভাবে তা সম্পাদন করবে। যখন কোন কিছু খাওয়ার জন্য জবেহ করবে, তখন সুন্দরভাবে তা করবে। তোমরা চাকু ধারালো করে নিবে। জবেহ করা জন্তুটিকে প্রশান্তি দেবে।'
৭- ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে যথাযথ কারণ ব্যতীত কোন পাখিকে হত্যা করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার হিসাব নেবেন।' জিজ্ঞেস করা হল, 'হে রাসূল! যথাযথ কারণ বলতে কি বুঝায়?' তিনি বললেন, খাওয়ার জন্য জবেহ করা। এমন যেন না হয় যে অযথা জবেহ করে ফেলে দিলে।'
৮- একবার ইবনে উমার রা. কুরাইশ গোত্রের কয়েকজন ছেলেকে দেখলেন তারা একটি পাখি বা মুরগীকে বেঁধে তাকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করছে। তারা যখন ইবনে উমার রা. কে দেখল তখন সরে পড়ল। ইবনে উমার জিজ্ঞেস করলেন, 'কে এমন কাজ করেছে? যারা এ রকম কাজ করে তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। যার প্রাণ আছে, এমন কোন কিছুকে যে লক্ষ্যস্থল করে (তীর বা গুলির জন্য) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অভিসম্পাত করেছেন।'
৯- আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা এক সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। আমরা একটা প্রয়োজনে দুরে গেলাম। দেখলাম একটি লাল পাখি তার সাথে দুটো বাচ্চা। আমরা বাচ্চা দুটো কে ধরে নিয়ে আসলাম। তখন মা পাখিটি চলে আসল। বাচ্চা দুটোর কাছে আসার জন্য পাখিটি মাটির কাছে অনবরত উড়তে লাগল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে পড়লেন। তিনি এ অবস্থা দেখে বললেন, 'কে এ বাচ্চা এনে তাদের মাকে কষ্ট দিচ্ছে? বাচ্চা তার মায়ের কাছে রেখে এসো।' তিনি দেখলেন, আমরা এক পিঁপড়ার ঝাঁককে পুড়িয়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কে এদের আগুন দিয়ে পুড়েছে? উত্তরে বললাম, 'আমরা পুড়েছি।' তিনি বললেন, 'তোমাদের এটা উচিত হয়নি। আগুন দিয়ে শাস্তি দেবেন শুধু আগুনের স্রষ্টা।'
১০- জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাধার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার মুখমণ্ডলে লোহা পুড়ে দাগ দেয়া ছিল। তিনি বললেন, 'যে লোহা দিয়ে দাগ দিয়েছে তার উপর আল্লাহর অভিসম্পাত।'
১১- জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্তু জানোয়ারের মুখমণ্ডলে আঘাত করতে ও লোহা দিয়ে দাগ দিতে নিষেধ করেছেন。
১২- আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাকে পিছনে বসালেন। আমাকে নিয়ে তিনি এক আনসারী সাহাবীর আঙিনায় প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি উট ছিল। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে ঢুকরে কেঁদে উঠল ও তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। উটটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘাড়ে হাত বুলালে সে কান্না থামাল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, 'এ উটটির মালিক কে?' এক আনসারী যুবক এসে বলল, 'উটটি আমার ইয়া রাসূলাল্লাহ!' তিনি বললেন, 'তুমি কি জন্তু জানোয়ারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে না, যিনি তোমাকে এর মালিক বানিয়েছেন? উটটি আমার কাছে নালিশ করছে তুমি তাকে কষ্ট দাও ও সাধ্যের চেয়ে বেশি কাজ চাপিয়ে দাও।'
এগুলো হল কয়েকটি নমুনা মাত্র। যাতে দেখা গেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ শত্রুদের প্রতি, বন্ধুদের প্রতি, মুসলমানের প্রতি, অমুসলিমের প্রতি, পুরুষের প্রতি, নারীর প্রতি, ছোটদের প্রতি, বড়দের প্রতি, জন্তু-জানোয়ারের প্রতি, পাখিদের প্রতি, পিঁপড়া ও পোকা মাকড়ের প্রতি কীভাবে দয়া, করুণা, মমতা ও ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন। যতদিন রাত দিবস আবর্তিত হতে থাকবে, ততদিন আল্লাহ তার উপর শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন। আমাদের পক্ষ থেকে হাজারো সালাত ও সালাম তার জন্য নিবেদিত হোক।
ত্রয়োদশ প্রকার: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্তরের কোমলতা ও বিভিন্ন সময়ে কান্নাকাটি করা-
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো উচ্চ শব্দে কান্নাকাটি করতেন না। যেমনিভাবে তিনি অট্টহাসি হাসতেন না। কিন্তু কান্নার সময় তার চোখে অশ্রু দেখা যেত ও বুকের মধ্যে মৃদু আওয়াজ অনুভূত হতো। কখনো তিনি কেঁদেছেন মৃত ব্যক্তির প্রতি দয়ার্দ্র হয়ে, কখনো কেঁদেছেন তার উম্মতের প্রতি ভয় ও তাদের প্রতি স্নেহ মমতার কারণে। কখনো কেঁদেছেন আল্লাহ তাআলার ভয়ে। আবার কখনো কেঁদেছেন আল্লাহর কালামের তেলাওয়াত শুনে। আর সে ক্রন্দন ছিল আল্লাহ তাআলার প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর মহত্ত্ব অনুভবে。
যে সকল অবস্থায় তিনি ক্রন্দন করেছেন তার কিছু দৃষ্টান্ত:
১- রাতের তাহাজ্জুদ নামাজে আল্লাহ তাআলার ভয়ে কান্নাকাটি করেছেন অনেক সময়। বেলাল রা. বলতেন, 'হে রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ তো আপনার পূর্বাপর সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন।' তিনি বললেন, 'আমি কি তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না? রাতে আমার উপর একটি আয়াত অবতীর্ণ হলো, দুর্ভাগ্য তার, যে তা পাঠ করলো কিন্তু তাতে চিন্তা করলো না। আয়াতটি হল:
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ
"নিশ্চয় আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শনা বলী রয়েছে বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের জন্য।"
২- সালাত আদায়ের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে শিখখির রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসলাম, দেখলাম তিনি সালাত আদায় করছেন, আর তার বুক থেকে ধুকে ধুকে কান্নার আওয়াজ বের হচ্ছে。
৩- কুরআন তেলাওয়াত শ্রবণের সময় রাসূলের কান্না: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, 'তুমি আমাকে কুরআন পাঠ করে শুনাও।' আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে কুরআন শুনাবো অথচ কুরআন আপনার উপর নাযিল হয়েছে? তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, অন্যের থেকে শুনতে আমার ভাল লাগে।' ইবনে মাসউদ বলেন, 'আমি সূরা নিসা তেলাওয়াত শুরু করে দিলাম। যখন এ আয়াতে পৌঁছে গেলাম
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا
"যখন আমি প্রত্যেক উম্মত হতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করবো এবং তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত দাঁড় করাবো তখন কী অবস্থা হবে?"' দেখলাম তার দু চক্ষু দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে。
৪- প্রিয়নজনকে হারানোর বেদনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেঁদেছেন। নিজ সন্তান ইবরাহীমের ইন্তেকালে তিনি কেঁদেছেন। তার দু চক্ষু দিয়ে অশ্রু গড়িয়েছে। আব্দুররহমান ইবনে আউফ তা দেখে বললেন, 'হে রাসূল! আপনিও কাঁদছেন?' তিনি বললেন, 'হে আউফের ছেলে! এটা হল দয়া-মমতা ...... চোখ অশ্রু প্রবাহিত করে, অন্তর দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়, কিন্তু আমরা এমন কথাই বলবো যাতে আমাদের প্রতিপালক সন্তুষ্ট হন। হে ইবরাহীম! তোমাকে হারানোর বেদনায় আমরা দুঃখে ও শোকে ভারাক্রান্ত হয়ে গেছি।'
৫- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মেয়ে- উসমান রা. এর স্ত্রী- উম্মে কুলসূম রা. এর ইন্তেকালের কারণে কেঁদেছেন। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কবরের কাছে বসলেন, দেখলাম তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ছে。
৬- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আরেক মেয়ের মৃত্যুতে কেঁদেছেন। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার একটি মেয়ে যখন মৃত্যু শয্যায় তখন তাকে কোলে তুলে নিলেন। তার কোলেই সে ইন্তেকাল করল। উম্মে আইমান চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'তুমি আল্লাহর রাসূলের কাছে বসে চিৎকার করে কাঁদছো!' সে বলল, 'আমি কি আপনাকে কাঁদতে দেখছি না?' তিনি বললেন, 'আমি আসলে তোমার মত কাঁদছিনা। বরং এটা হল দয়া- মমতার প্রকাশ।
৭- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক নাতীর ইন্তে কালে কেঁদেছেন। উসামা বিন যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে তার মেয়ের মাধ্যমে খবর পাঠালাম যে, আমার ছেলে মৃত্যু শয্যায়, আপনি আমাদের কাছে একটু আসুন। তিনি আমাকে সালাম পাঠিয়ে বললেন, 'যা আল্লাহ নিয়েছেন তা তাঁরই, তিনি যা দিয়েছেন তাও তাঁর। সকল বিষয়ে তাঁর কাছে রয়েছে একটি নির্ধারিত মেয়াদ।' এরপর তিনি আসলেন। তার সাথে ছিল সাআদ বিন উবাদা, মুআজ বিন জাবাল, উবাই বিন কাআব, যায়েদ বিন সাবেত ও অন্যান্য অনেক সাহাবী। ছেলেটিকে তার কোলে দেয়া হল, তিনি কোলে বসালেন। এমন সময় সে হেঁচকি দিয়ে উঠল, মনে হল সে বিদায় নিল। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চক্ষু দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হল। সাআদ বিন উবাদা দেখে বলে উঠলেন, 'হে রাসূল! এটা কী? (কাঁদছেন কেন) তিনি বললেন, 'এটা হল রহমত-দয়া। যা আল্লাহ মানুষের মধ্যে যাকে চান তার হৃদয়ে দিয়ে থাকেন। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যারা দয়াশীল তিনি তাদের প্রতি দয়া করেন।'
৮- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সঙ্গী-সাথিদের ইন্তেকালে কেঁদেছেন। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'উসমান ইবনে মাজউন ইন্তেকাল করার পর রাসূলুল্লাহ তাকে চুমো দিলেন। আমি দেখলাম তার চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে।' তিরমিজীর বর্ণনায় এসেছে, উসমান ইবনে মাজউন মৃত্যু বরণ করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চুমো দিলেন ও কাঁদলেন। তার দু চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল।'
৯- মুতার যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য কেঁদেছেন। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদ ও জাফরের প্রশংসা করেছেন, তাদের শাহাদাতের খবর আসার পূর্বেই। তিনি বললেন, 'যায়েদ ইবনে হারেসা পতাকা হাতে নিল সে আক্রান্ত হলো। এরপর জাফর পতাকা তুলে নিল সেও আক্রান্ত হল। এরপর আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা পতাকা হাতে তুলে নিল সেও আক্রান্ত হল- কথাগুলো বলার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল- শেষে আল্লাহর এক তরবারি সাইফুল্লাহ পতাকা হাতে তুলে নিল, বিজয় হল।'
১০- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মায়ের কবর যিয়ারতের সময় ক্রন্দন করেছেন। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মায়ের কবর যিয়ারত করলেন, তখন কাঁদলেন। তার সাথে যারা ছিল তারাও কাঁদল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমি আমার প্রতিপালকের কাছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলাম, অনুমতি পাওয়া যায়নি। তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলাম, অনুমতি দেয়া হল। তোমরা কবর যিয়ারত কর, তা তোমাদের মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।'
১১- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাআদ বিন উবাদার মৃত্যু শয্যায় অসুস্থতা দেখতে যেয়ে কেঁদেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, 'সাআদ বিন উবাদা রা. রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে আসেন। তার সাথে আরো ছিলেন আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.। যখন তার কাছে পৌছলেন দেখলেন তার পরিবার-পরিজন তার খেদমতে ব্যস্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, 'ইন্তেকাল হয়ে গেছে নাকি?' তারা বলল, না, হে রাসূল! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁদতে শুরু করলেন। অন্যেরা তার কান্না দেখে কান্নাকাটি জুড়ে দিল। তিনি বললেন, 'তোমরা শুনে রাখো! আল্লাহ তাআলা চোখের অশ্রুর কারণে কাউকে শাস্তি দেবেন না। কিন্তু তিনি শাস্তি দেবেন এর কারণে।' এ বলে তিনি, মুখের দিকে ইশারা করলেন।'
১২। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরের নিকট কেঁদেছেন। এ ব্যাপারে বারা বিন আযেব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা এক জানাযায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ছিলাম। তিনি একটি কবরের কিনারায় বসলেন। অতঃপর তিনি এত কাঁদলেন যে মাটি পর্যন্ত সিক্ত হয়ে গেল। তারপর বললেন, 'হে আমার ভ্রাতাগণ! তোমরা এ কবরের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর।'
১৩। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদর যুদ্ধের রাত্রিতে নামাজ পড়ে প্রভুর সাথে গোপন আলাপ ও দু'আ করতে করতে সকাল পর্যন্ত কেঁদেছেন। এ ব্যাপারে আলী বিন আবু তালেব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন বদর যুদ্ধে ছিলাম, আমি দেখলাম যে, আমাদের সকলে ঘুমন্ত কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গাছের নীচে সকাল পর্যন্ত নামাজ পড়ছেন আর কেঁদেছেন。
১৪। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূর্য গ্রহণের নামাজে কেঁদেছেন। এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়ে সূর্য গ্রহণ লাগল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ পড়তে দাঁড়ালেন। তারপর সেজদা করলেন। অতঃপর তিনি তখনও মাথা উত্তোলন করেননি এর মধ্যে তিনি ফুঁক দিতে লাগলেন এবং কাঁদতে লাগলেন। বর্ণনাকারী বলেন যে, নামাজ শেষে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়ালেন এবং আল্লাহ তাআলার প্রশংসা, স্তুতি গাইলেন। অতঃপর বললেন যে, জাহান্নাম আমার সামনে পেশ করা হল তখন আমি তাতে ফুঁক দিতে লাগলাম এবং আশংকা করলাম যে, তা তোমাদের গ্রাস করে নেবে। এ ব্যাপারে আরো বর্ণনা আছে যে, তিনি বলেন হে প্রভু! তুমি কি আমাকে প্রতিশ্রুতি দাওনি যে, তুমি তাদের শাস্তি দেবে না।'
১৫। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদর যুদ্ধের বন্দিদের মুক্তিপণ গ্রহণ করার কারণে কেঁদেছেন। এ বিষয়ের হাদীস আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. উমার বিন খাত্তাব রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, যখন তারা বন্দিদের কয়েদ করল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর রা. ও উমার রা. কে বললেন তোমরা এদের ব্যাপারে কি বল? আবু বকর বলল, 'হে আল্লাহর নবী! তারা তো আপনার চাচার বংশধর ও আপনার গোত্রের লোক, তাই আমি মনে করি যে, আপনি তাদের থেকে মুক্তিপণ নিয়ে নেন। যা দিয়ে আমরা কাফেরদের বিরুদ্ধে শক্তি যোগাব। আশা করা যায় যে, আল্লাহ তাআলা তাদের ইসলামের হেদায়েত দান করবেন।' তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে উমার! তোমার মতামত কি? তিনি বললেন যে, 'আমি বললাম 'না, আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর রাসূল! আবু বকর যে মতামত দিয়েছে আমি তার সাথে একমত নই। তবে আমি মনে করি যে, আপনি আমাকে সুযোগ করে দেবেন, আর আমি তাদের গর্দান উড়িয়ে দেব। সুতরাং আলীকে সুযোগ করে দেবেন আকীলকে হত্যা করার, এবং আমাকে অমুক ব্যক্তি যে আমার আত্মীয় তাকে হত্যা করার সুযোগ করে দেবেন। নিশ্চয় তারা কাফেরদের নেতা ও তাদের সরদার।' পরিশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকরের সিদ্ধান্ত পছন্দ করলেন। আর আমার সিদ্ধান্ত পছন্দ করেননি। পরের দিন যখন আমি আসলাম, তখন দেখলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রা. উপবিষ্ট অবস্থায় কাঁদছেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে বলুন কেন আপনি ও আপনার বন্ধু কাঁদছেন? যদি আমি কাঁদতে পারি তাহলে কাঁদব আর যদি কাঁদতে না পারি তাহলে আপনাদের ক্রন্দনের মত করে নিজেকে পেশ করব।' আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'যে মুক্তিপণ গ্রহণের কথা তোমার সাথিরা পেশ করেছে তার জন্য কাঁদছি।' অবশ্যই তাদের শাস্তি আমার সামনে পেশ করা হয়েছে এই গাছের থেকে আরো নিকটবর্তী করে যে গাছটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকটে ছিল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।
رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَحِيمٌ "হে প্রভু! নিশ্চয় তারা অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছেন। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলের আর যে আমার অবাধ্য হবে নিশ্চয় তুমি ক্ষমাশীল, করুণাময়।" সূরা ইবরাহীম: ৩৬ এবং নবী ঈসা আ. বলেছেন।
مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُشْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴿٦٧﴾ لَوْلَا كِتَابٌ مِنَ اللَّهَ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴿٦٨﴾ فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَالًا طَيِّبًا. "দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা নবীর জন্য সঙ্গত নয়। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ আর আল্লাহ চান আখেরাত। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ব বিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ তার জন্য তোমাদের উপর আপতিত হত মহা-শাস্তি। সুতরাং যুদ্ধে তোমার যা লাভ করেছ তা বৈধ ও উত্তম হিসাবে গ্রহণ কর।" সূরা আল-আনফাল ৬৭-৬৯ এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য গণীমত হালাল করে দিলেন।
১৬। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতের প্রতি স্নেহপরবশ হয়ে কেঁদেছেন এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইব্রাহীম আ. সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াতখানা আবৃত্তি করলেন:
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الحُكِيمُ "যদি আপনি তাদের শাস্তি দেন তাহলে তারা আপনার বান্দা। আর যদি ক্ষমা করে দেন, তাহলে নিশ্চয়ই আপনি শক্তিশালী প্রজ্ঞাময়”। সূরা আল-মায়েদা: ১১৮
অতঃপর উভয় হাত উত্তোলন করলেন এবং বললেন, 'হে আল্লাহ! আমার উম্মত! আমার উম্মত!' এবং কাঁদলেন। আল্লাহ তাআলা বললেন: "হে জিবরীল তুমি মুহাম্মাদের কাছে যাও আর তোমার প্রভু তার ব্যাপারে অধিক জ্ঞাত। তারপর তাকে সালাম দাও এবং বল আপনি কেন কাঁদছেন?" জিবরীল তার নিকট আসলো এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলে দিলেন যা তিনি বলেছেন, আর আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে বেশি জ্ঞাত। আল্লাহ তাআলা বললেন: “হে জিবরীল! মুহাম্মাদের নিকট যাও এবং বল অবশ্যই আমি তোমাকে তোমার উম্মতের ব্যাপারে খুশি করব তোমাকে কষ্ট দেয় এমন কিছু করব না।”

টিকাঃ
১ তাফসীর ইবনে কাসীর: ২২৭/১ ২ সহীহ আল বুখারী ৩০১৪ম ৩০১৫ • সহীহ মুসলিম, জিহাদ অধ্যায় * সহীহ মুসলিম, জিহাদ অধ্যায়
২ আবু দাউদ, ১৫৮০ জিহাদ অধ্যায় * সহীহ আল বুখারী ৩২৩১, সহীহ মুসলিম ১৭৯৫
৩ সসহীহ আল-বুখারী ১৩৫৬ ৪ সূরা আত-তাওবা ১২৮ * তাইসীরুল কারিম আর-রাহমান
৪ সূরা আল-আহযাব: ৬ ৫ সূরা আল-আলে ইমরান: ১৫৯ * সহীহ আল-বুখারী ৬৭৩১, সহীহ মুসলিম ১৬১৯
৫ সহীহ আল - বুখারী ২৩৩৪, সহীহ মুসলিম ২৪৮৩ ৬ সহীহ মুসলিম ১৭৩ ৭ সহীহ মুসলিম ২৪৮৩ ৮ তিরমিজী ২৪১৭, আহমাদ
৬ সূরা আলে ইমরান ১৯০, সহীহ ইবনে হিব্বান ৬২০ ৭ আবু দাউদ ৯০৪, ও সহীহ মুখতাছার শামায়েলে তিরমিজী ২৭৬
৭ সূরা আন-নিসা: ৪১ ৮ সহীহ আল - বুখারী ৪৫৮২, সহীহ মুসলিম ৮০০ * সহীহ আল - বুখারী ১৩০৩, সহীহ মুসলিম ২৩১৫ * সহীহ আল - বুখারী ১২৮৫
৮ আহমদ ২৬৮/১ ৯ সহীহ আল - বুখারী ১২৮৪, সহীহ মুসলিম ৯২৩ ১০ সহীহ সুনানে আবু দাউদ ২৮৯/২, তিরমিজী ৯৮৯, ইবনে মাজা ১৪৫৬
৯ সহীহ আল - বুখারী ৪২৬২ ১০ সহীহ মুসলিম ১০৮
১০ সহীহ মুসলিম ১৭৬৩
১১ সহীহ মুসলিম ২০২

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 শিশুদের সাথে তাঁর প্রেমময়ী আচরণ ও তাদের আনন্দ দান

📄 শিশুদের সাথে তাঁর প্রেমময়ী আচরণ ও তাদের আনন্দ দান


নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল ক্ষেত্রে মানবতার পূর্ণ শিখরে উপনীত হয়েছেন এই মহৎগুণের মধ্যে রয়েছে শিশুদের প্রতি তার সুন্দর ব্যবহার, যাতে রয়েছে সকলের জন্য আদর্শ। এ পর্যায়ে সাধারণত কেউ উপনীত হতে পারে না। মনোবিজ্ঞানীরাও না, তবে এ সত্ত্বেও মুসলমানের উচিত যতটুকু সম্ভব তার আদেশের অনুকরণ করা। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সোহাগ ও কৌতুক করা। এগুলোর কিছু দৃষ্টান্ত স্বরূপ ও সংক্ষিপ্ত আকারে নিম্নে তুলে ধরা হলো:
প্রথম দৃষ্টান্ত: মাহমুদ বিন রুবাই এর সাথে তার কৌতুক:
মাহমুদ রা. বলেন আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এক বারের পানি ছিটানোর কথা; 'তিনি আমার চেহারায় বালতি থেকে পানি ছিটিয়েছেন তখন আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর যা আমার এখনো মনে আছে।'
তিনি এটা করেছেন কৌতুকরত বা বরকত স্বরূপ, যেমনটি তিনি সাহাবীদের সন্তানদের সাথে করতেন। শেখ বিন বায বলেন, 'এটা কৌতুক ও উত্তম চরিত্রের অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।'
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত : শিশুদের সাথে তার সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও কৌতুক:
জাবের বিন সামুরাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলের সাথে ফজরের নামাজ পড়লাম অতঃপর তিনি বাড়ির দিকে বের হলেন আমিও তার সাথে বের হলাম। পথিমধ্যে তার সাথে কিছু বাচ্চাদের সাক্ষাৎ হল। তিনি তাদের এক এক করে প্রত্যেকের উভয় গালে হাত বুলাতে লাগলেন।' মাহমুদ রা. বলেন, 'তিনি আমার উভয় গালে হাত বুলালেন আমি তার হাতের হিম শীতল সুগন্ধি উপলব্ধি করলাম। যেন তার হাতের সাথে সুগন্ধি ব্যবসায়ীর সামগ্রীর ছোঁয়া লেগেছে।'
তৃতীয় দৃষ্টান্তঃ বিভিন্ন সময় হাসান ও হুসাইন এর সাথে তার আদর পূর্ণ ব্যবহার:
১। আবু হুরাইরাহ রা. বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান বিন আলীকে চুম্বন করেন তখন তার নিকট আকরাহ বিন হাবেস তামীমী বসা ছিলো। আকরাহ বলল, 'আমার দশটি সন্তান রয়েছে তাদের কাউকে আমি চুম্বন করি না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, 'যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।'
২। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, 'এক গ্রাম্য লোক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট আসল এবং বলল তোমরা তোমাদের বাচ্চাদের চুমো খাও আমরা তাদের চুমো খাই না।' নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার অন্তরে দয়া উদ্রেক করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, যদি আল্লাহ তাআলা তা ছিনিয়ে নিয়ে থাকেন।'
৩। হাসান ও হুসাইন রা. রাসূলের সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিলেন। এ ব্যাপারে ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের সম্পর্কে বলতে শুনেছি, 'তারা আমার পৃথিবীর সুগন্ধিময় দুটি ফুল।'
অর্থাৎ- আল্লাহ তাআলা আমাকে তাদের দান করেছেন এবং তাদের দিয়ে সম্মানিত করেছেন। সন্তানদেরকে চুম্বন করা হয় এবং সুঘ্রাণ নেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে সুগন্ধময় ফুলের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
৪। আবু বকরাহ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, 'আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিম্বারে আরোহণ অবস্থায় তার খুতবা শুনেছি, আর হাসান তার পাশে ছিল। তিনি একবার মানুষের দিকে তাকাচ্ছেন আরেকবার তার দিকে তাকাচ্ছেন এবং বলেছেন, 'নিশ্চয়ই আমার এ সন্তান হল নেতা। সম্ভবত আল্লাহ তাআলা তাকে দিয়ে مسلمانوں বিশাল দু দলের মাঝে মীমাংসা করে দেবেন।'
পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা তাকে দিয়ে মুআবিয়া ও তার সাথিদের এবং আলী বিন আবু তালেব রা. এর অনুসারীদের ও তার সাথিদের মাঝে মীমাংসা করেন। অতএব তিনি খেলাফত মুআবিয়ার জন্য ছেড়ে দেন। ফলে আল্লাহ তাআলা তার দ্বারা মুসলমানদের রক্ত হেফাযত করেন।
৫। বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, 'আমি হাসান বিন আলীকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাঁধে দেখেছি এবং বলতে দেখেছি, 'হে আল্লাহ আমি তাকে ভালোবাসি। অতএব আপনিও তাকে ভালোবাসবেন।'
চতুর্থ দৃষ্টান্ত: সেজদা অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিঠে বাচ্চার আরোহণ:
শাদ্দাদ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হলেন মাগরিব বা এশার নামাজ পড়ানোর জন্য। হাসান বা হুসাইনকে তিনি বহন করছিলেন। অতঃপর তিনি সামনে গেলেন এবং তাকে রাখলেন। এরপর তিনি নামাজের মধ্যে একটি দীর্ঘ সেজদা করলেন। আমার পিতা বলেন যে, 'আমি আমার মাথা উত্তোলন করলাম আর দেখতে পেলাম সেজদাহরত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাঁধে একটি শিশু। আমি আমার সেজদায় ফিরে আসলাম। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ সম্পন্ন করলেন তখন লোকেরা বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয়ই আপনি নামাজের মধ্যে একটা দীর্ঘ সেজদা করেছেন, যে কারণে আমরা মনে করলাম হয়তো কোন কিছু হয়েছে অথবা আপনার কাছে ওহী আসছে।' তিনি বললেন, 'এগুলোর কোনটাই হয়নি। তবে আমার একটি সন্তান আমার পিঠে আরোহণ করেছিলো, তাই আমি তার প্রয়োজন পূরণ না করে তাড়াহুড়ো করতে অপছন্দ করলাম।'
পঞ্চম দৃষ্টান্ত: উসামার প্রতি তার ভালোবাসা:
উসামা বিন যায়েদ রা. বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ধরে তার এক রানে বসাতেন আর হাসানকে বসাতেন অন্য রানে। অতঃপর তাদের একত্র করতেন এবং বলতেন,
'হে আল্লাহ! তুমি তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করো, কেননা আমি তাদের প্রতি দয়া করি।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে 'হে আল্লাহ! আমি তাদের ভালোবাসি সুতরাং আপনিও তাদের ভালোবাসুন।'
ষষ্ঠ দৃষ্টান্ত : নামাজরত অবস্থায় যয়নব রা. এর মেয়েকে কোলে তুলে নেয়া:
আবু কাতাদাহ থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ পড়া অবস্থায় উমামা বিনতে যয়নবকে বহন করছিলেন, যখন তিনি সেজদা করতেন তখন তাকে রেখে দিতেন। আর যখন দাঁড়াতেন তখন তাকে কোলে তুলে নিতেন।
সপ্তম দৃষ্টান্ত : উম্মে খালেদের সাথে হাবশী ভাষায় কৌতুক :
এ ব্যাপারে উম্মে খালেদ বিনতে খালেদ বিন সাঈদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন। আমি আমার বাবার সাথে রাসূলের নিকট আসলাম, তখন আমার গায়ে হলুদ বর্ণের জামা ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "ছানাহ! ছানাহ!" এটি হাবশী ভাষার শব্দ যার অর্থ: চমৎকার! চমৎকার! তিনি বলেন- 'অতঃপর আমি নবুওয়তের মোহর নিয়ে খেলা করতে গেলাম। আমাকে আমার পিতা ধমক দিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তাকে ধমক দিও না।' অতঃপর বলেন 'ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর, অতঃপর ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর, অতঃপর আবার ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর।' আব্দুল্লাহ বলেন অতঃপর সে যতদিন জীবিত ছিল ততদিন বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ বর্ণনাকারী তার দীর্ঘ জীবনের কথা বুঝিয়েছেন। অনেকে বলেছেন, উম্মে খালেদের মত আর কেহ এত দীর্ঘ জীবন লাভ করেনি।
অষ্টম দৃষ্টান্ত : শিশু বাচ্চারা কাঁদার সময় তার নামাজ পড়া সংক্ষিপ্ত করা:
তিনি কোন শিশু বাচ্চার কাঁদার আওয়াজ শুনলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন। এ ব্যাপারে আবু কাতাদাহ তার পিতা হতে ও তার পিতা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যখন আমি নামাজে দাঁড়াই ইচ্ছা থাকে নামাজ দীর্ঘ করব। কিন্তু যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি, তখন তার মায়ের কষ্ট হবে ভেবে আমি নামাজ সংক্ষেপ করি।
নবম দৃষ্টান্ত: শিশু বাচ্চাদের তার সালাম দেয়া:
আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি শিশু বাচ্চাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাদের সালাম দিতেন। এবং বলতেন, 'নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটি করতেন।'
দশম দৃষ্টান্তঃ আবু উমায়ের সাথে তার কৌতুক :
আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে প্রিয় ছিল আমার এক ভাই, তার নাম আবু উমায়ের। আমার মনে আছে, সে যখন এমন শিশু যে মায়ের বুকের দুধ ছেড়েছে মাত্র। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে আসতেন এবং বলতেন 'হে আবু উমায়ের! কি করেছে তোমার নুগায়ের?' নুগায়ের হল এমন একটি ছোট পাখি যার সাথে আবু উমায়ের খেলা করত। নুগায়ের মারা গিয়েছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নুগায়েরের জন্য চিন্তিত দেখলেন এবং তার সাথে খেলা করলেন।
একাদশ দৃষ্টান্ত: তার ডান পার্শ্বে অবস্থানের কারণে বড়দের পূর্বে শিশুদের প্রদান করা:
তার ডান পাশের শিশু ছেলেকে বড়দের আগে শরবত দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সাহল বিন সাআদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এক পেয়ালা শরবত আনা হল। তার থেকে তিনি শরবত পান করলেন এবং তার ডান পাশে ছিল দলের সবচেয়ে ছোট একটি ছেলে, আর বড়রা ছিল তার বাম পার্শ্বে। তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে ছেলে তুমি কি আমাকে অনুমতি দেবে যে, আমি তা বড়দের আগে দেব?'
ছেলেটি বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার অনুগ্রহ লাভের ব্যাপারে আমি অন্য কাউকে আমার উপর প্রাধান্য দেব না।' অতএব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দিলেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'তুমি কি আমাকে অনুমতি দেবে এদের দেয়ার।' ছেলেটি বলল, 'না। আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছ থেকে কিছু লাভ করার ব্যাপারে অন্য কাউকে প্রাধান্য দেব না। বর্ণনাকারী বলেন অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার হাত ভরে দিলেন।
দ্বাদশ দৃষ্টান্ত: রাসূলের কোলে শিশুদের প্রস্রাব
উম্মে কায়স বিনতে মিহসান থেকে বর্ণিত, তিনি তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে রাসূলের দরবারে আসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তার কোলে রাখলেন, সে তার কোলে প্রস্রাব করে দিল। তারপর তিনি পানি নিয়ে আসতে বললেন এবং পানি ছিটিয়ে দিলেন এবং তা ধৌত করেননি।
এ ছাড়াও আরো অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যা দ্বারা শিশুদের সাথে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উত্তম আচরণ, সুন্দর ব্যবহারের বিষয়গুলোর বর্ণনা রয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00