📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বংশে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

📄 সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বংশে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম


এখানে তার পিতৃপুরুষগণের নাম উল্লেখ করা হল। আরবী ভাষায় 'বিন' শব্দের অর্থ ছেলে। বিন শব্দের পূর্বে যার নাম তিনি হলেন ছেলে। বিন শব্দের পরে যার নাম তিনি হলেন পিতা। এ নিয়মেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশ-পরিক্রমা উল্লেখ করা হল。
তিনি হলেন, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব বিন হাশেম বিন আবদে মানাফ বিন কুসাই বিন কিলাব বিন মুররাহ বিন কাআব বিন লুআই বিন গালেব বিন ফেহার বিন মালেক বিন নদর বিন কেনানাহ বিন খুযাইমা বিন মুদরেকা বিন ইলিয়াস বিন মুদার বিন নাযার বিন মুইদ বিন আদনান।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ বংশ পরিচয় সম্পর্কে বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা ইসমাঈলের সন্তানদের মধ্য থেকে কেনানাহকে নির্বাচন করেছেন। কেনানাহ থেকে নির্বাচন করেছেন কুরাইশকে। কুরাইশ থেকে নির্বাচন করেছেন বনু হাশেমকে, আর বনু হাশেম থেকে নির্বাচন করেছেন আমাকে।'
রাসূলুল্লাহ কুরাইশ বংশের, কুরাইশ হল আরবদের অন্তর্ভুক্ত। আর আরব হল নবী ইবরাহীম আ. ছেলে ইসমাঈল আ. এর বংশধর।
তিনি মক্কায় প্রচলিত হস্তী সনের রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার দিন ৫৭১ খৃষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। তেষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। নবুওতের পূর্বে চল্লিশ বছর আর নবুওত লাভের পর তেইশ বছর, এই তেষট্টি বছর সময়কাল তিনি পৃথিবীতে কাটান। তিনি তেইশ বছর নবুওয়ত ও রেসালাতের দায়িত্ব পালন করেন। সূরা আল-আলাক নাযিল করে তাকে নবুওয়তের দায়িত্বে ভূষিত করা হয়, ও সূরা মুদ্দাসসির নাযিলের মাধ্যমে তাকে রেসালাতের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। মক্কা তার জন্মভূমি। মদীনা হিজরতের স্থল। শিরক থেকে সতর্ক করা ও তাওহীদের দাওয়াতের উদ্দেশে তাকে প্রেরণ করা হয়। প্রথম দশ বছর তিনি একত্ববাদের দাওয়াতে আত্মনিয়োগ করেন। দশ বছর এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর ইসরা ও মিরাজ সংঘটিত হয়। এ সময় থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। মক্কাতে তিনি তিন বছরকাল নামাজ আদায় করেছেন। মোট তেরো বছর মক্কায় কাটান। এরপর মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ আসে। হিজরত পরবর্তী সময়ে মদীনায় কর্তৃত্ববান হলে ইসলামী শরীয়তের অন্যান্য বিধান তার উপর অবতীর্ণ হতে শুরু করে। যেমন, যাকাত, সিয়াম, হজ, জিহাদ, আজান, সৎকাজের আদেশ, অন্যায় কাজ হতে বারণ। মদীনা-জীবনের দশ বছর কাটানোর পর তিনি ইন্তেকাল করেন। তার প্রচারিত দীন থেকে গেছে অজর-অক্ষয় রূপে, থাকবে অবিকৃত আকারে চিরকাল। মঙ্গল ও কল্যাণের সকল বিষয়ে তিনি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। যা কিছু অনিষ্টকর, অশিষ্ট, অন্যায়-কর্ম ও ক্ষতির কারণ সেসব থেকে তিনি সতর্ক করেছেন স্পষ্ট ভাষায়। তিনি সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তার তিরোধানের মাধ্যমের নবুওত ও রেসালতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। তার পরে আর কোন নবী বা রাসূল আগমন করবেন না, আগমনের প্রয়োজনও হবে না। আল্লাহ তাআলা তাকে সকল মানুষের কাছেই পাঠিয়েছেন। তিনি সকল মানব ও জিনের জন্য তার অনুসরণ বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি তার অনুসরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তার অনুসরণ করবে না তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।
এ পরিচ্ছেদের সারকথা ও শিক্ষণীয় বিষয়: ১- নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশ্রেষ্ঠ বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি বংশ পরিচয়, চারিত্রিক গুণমাধুরি, ও উত্তম আদর্শের বিচারে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। তিনি অতীত ও বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক আলোচিত ব্যক্তিত্ব। সকল নবীর চেয়ে তার অনুসারীদের সংখ্যা বেশি হবে কেয়ামত দিবসে।
২- প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখে মীলাদুন্নবী উদযাপন একটি নিন্দনীয় বেদআত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জীবনে কখনো এ ধরনের উৎসব পালন করেননি, তার সাহাবায়ে কেরামগণও কখনো মীলাদুন্নবী পালন করেননি, তাদের পর অনুসরণীয় কোন যুগে এর আমল দেখা যায় না。
অপরদিকে রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখে তার জন্ম হয়েছে বলে ধরে নেয়া ঠিক নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আমাদের এ ধর্মে নতুন কিছুর প্রচলন করবে তা প্রত্যাখ্যাত হবে।'
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে 'যে ব্যক্তি এমন আমল করল, যার উপর আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।'
৩- নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দায়িত্ব কর্তব্য ছিল, মানুষকে তাওহীদের পথে আহ্বান করা ও শিরকের অন্ধকার থেকে মানুষকে বের করে তাওহীদের আলোতে নিয়ে আসা। পাপাচারের অন্ধকার পথ থেকে আল্লাহর আনুগত্যের আলোতে নিয়ে আসা, অজ্ঞতা ও মুর্খতা থেকে মুক্ত করে জ্ঞান ও শিক্ষার দিকে নিয়ে আসা।

টিকাঃ
১ সহীহ আল বুখারী, মাবআসি ন্নবী অধ্যায় ২ সহীহ মুসলিম -২২৭৯ * বিস্তারিত জানতে দেখুন, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, সীরাতে ইবনে হিশাম, যাদুল মাআদ * দেখুন আর-রহীকুল মাখতুম

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 জন্ম ও শৈশব

📄 জন্ম ও শৈশব


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াতীম হিসাবে জন্ম গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাকে আশ্রয় দিলেন। তিনি ছিলেন নিঃস্ব। মহান আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত করলেন। তার পিতা আব্দুল্লাহ যখন ইন্তেকাল করলেন তখন তিনি তার মায়ের গর্ভে। আবু লাহাবের দাসী সুআইবা শুরুতে তাকে কয়েকদিন দুধ পান করিয়েছেন। এরপর হালীমা সাদীয়া তাকে দুধ পান করান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময় প্রায় চার বছর বনু সাআদ গোত্রে কাটিয়েছেন। তখন তার বক্ষ বিদারণ করা হয়। সাহাবী আনাস রা. থেকে বর্ণিত, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের সাথে খেলছিলেন। তখন জিবরীল এসে তাকে নিয়ে যান। তার হৃদপিন্ড বের করে সেখান থেকে একটি রক্তের চাকা ফেলে দেন। এ সময় জিবরীল বলেন, 'এটি হল শয়তানের অংশ।' হৃৎপিণ্ড বের করে তা একটি স্বর্ণের তশতরিতে ধৌত করলেন। ধৌত করলেন যমযমের পানি দিয়ে। এরপর তা যথাস্থানে স্থাপন করলেন ও তাকে তার জায়গায় রেখে দিলেন। অপরদিকে তার সাথিরা দৌড়ে এসে মা হালীমাকে খবর দিল যে, মুহাম্মাদকে হত্যা করা হয়েছে। সকলে তার দিকে ছুটে গেল। তারা তাকে গায়ের রং পরিবর্তিত অবস্থায় পেল。
আনাস রা. বলেন আমি তার বুকে সেলাইয়ের চিহ্ন দেখেছি। এ ভয়াবহ ঘটনার পর হালীমা ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি তাকে তার মাতা আমেনা বিনতে ওহাবের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন。
মা আমেনা তাকে নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। উদ্দেশ্য সন্তানকে তার মামাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। মদীনার কাজ শেষে তিনি মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে আবওয়া নামক স্থানে তিনি ইন্তেকাল করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স মাত্র ছয় বছর তিন মাস দশ দিন。
মায়ের ইন্তেকালের পর তার দায়িত্ব নেন দাদা আব্দুল মুত্তালিব। তার বয়স যখন আট বছর তখন দাদা আব্দুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করলেন। মৃত্যুকালে তিনি আবু তালেবকে অসীয়ত করে গেলেন তার লালন পালনের দায়িত্ব নিতে। আবু তালেব ছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিতা আব্দুল্লাহর সহোদর ভাই।
আবু তালেব শিরকে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও আজীবন মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদর-যত্নে, স্নেহ-মমতায় আগলে রেখে লালন পালন করে গেলেন। মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর রাসূলের ভাল বাসায় তিনি ছিলেন অটল, অবিচল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফাআতে তার শাস্তি হালকা করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, 'সে (আবু তালেব) এখন অগ্নির কিনারায় রয়েছে। আমি যদি না থাকতাম তাহলে তার অবস্থান হত জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থানে।' অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'কেয়ামতের দিন আমার শাফাআত তার কাজে লাগবে। তারপরেও তাকে রাখা হবে অগ্নির কিনারায়। অগ্নি তার পায়ের গোড়ালি স্পর্শ করবে। এর ফলে তার মগজ ফুটতে থাকবে।'
তিনি তার চাচা আবু তালেবের সাথে বাণিজ্যের উদ্দেশে সিরিয়া সফর করেন। তার বয়স তখন বারো বছর। নিঃসন্দেহে এটা তার প্রতি আবু তালেবের মমতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি মনে করেছিলেন, তাকে যদি মক্কায় রেখে যাই তাহলে কে তাকে আদর-যত্ন করবে। এ সফরে আবু তালেব ও তার সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অনেক অলৌকিক বিষয় প্রত্যক্ষ করেছে। এ কারণে তার প্রতি আবু তালেবের আদর-যত্ন আরো বেড়ে যায়।
আবু মূছা আল-আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু তালেব তাকে নিয়ে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। তাদের কাফেলায় ছিল কুরাইশদের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি। যখন তারা খ্রিস্ট ধর্মের এক যাজকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন তখন সে নিজেই কাফেলার কাছে এলেন। তবে ইতিপূর্বে তিনি এভাবে কখনো কোন কাফেলার কাছে আসেননি। কোন কাফেলার প্রতি নজর দিয়ে দেখেননি। তাকে দেখে গোটা কাফেলা দাঁড়িয়ে গেল। তিনি সকলকে দেখতে লাগলেন। যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলেন, তখন তার হাত ধরলেন। বললেন, এ তো সকল বিশ্ববাসীর নেতা, জগৎসমূহের প্রতিপালকের রাসূল। আল্লাহ তাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন। কুরাইশের প্রবীণ লোকগুলো বলল, 'আপনি তা জানলেন কীভাবে?' তিনি বললেন, 'তোমরা যখন পর্বতের ঘাঁটিগুলো অতিক্রম করেছিলে আমি দেখতে পেলাম, প্রতিটি গাছ ও পাথর তাকে সেজদা করছে। আর এরা কোন নবী ব্যতীত অন্য কাউকে সেজদা করে না। আমি তার পৃষ্ঠদেশে নবুওয়তে সীল দেখে চিনতে পেরেছি। যা দেখতে আপেলের মত....।' (আল-হাদীস)
এ বর্ণনায় আরো এসেছে, সফরকালে মেঘ তাকে ছায়া দিত। আর বৃক্ষসমূহ তাকে ছায়া দিতে ঝুঁকে পড়ত。
খ্রিস্টান এ ধর্ম যাজক আবু তালেবকে বললেন, 'মক্কায় ফিরে যাওয়ার পথে ইহুদীরা যেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে না ফেলে, কেননা ইহুদীরা দেখলে তার ক্ষতি করবে।' তাই আবু তালেব তাকে মক্কাতে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। এরপর খাদিজা বিনতে খুআইলিদ নিজ কর্মচারী মাইসারার সাথে তার ব্যবসা পরিচালনার জন্য তাকে সিরিয়ায় পাঠালেন। এ ব্যবসায় খাদিজা খুবই লাভবান হলেন। মাইসারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যা কিছু দেখেছে তার সবই খাদিজাকে খুলে বলল। খাদিজা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিয়ে করতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিয়ে করলেন। তখন তার বয়স ছিল পঁচিশ বছর। আর খাদিজার বয়স চল্লিশ।
আল্লাহ রাববুল আলামীন শৈশব থেকেই তাকে সকল প্রকার জাহেলী অপবিত্রতা থেকে মুক্ত রেখেছেন। তিনি কখনো কোন প্রতিমাকে সম্মান দেখাননি। কাফেরদের কোন উৎসবে উপস্থিত হননি। উপস্থিত হতে বললেও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আল্লাহই তাকে রক্ষা করেছেন。
তিনি কখনো মদ্য-পান করেননি। কখনো কোন অশ্লীল কাজ করেননি। কখনো আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করেননি। কোন অসার মজলিসে অংশ গ্রহণ করেননি। তার সম্প্রদায়ের মানুষেরা যে সকল অন্যায় ও অপকর্ম করতো, তিনি তা থেকে সর্বদা দূরে থাকতেন। তিনি এমন সমাজে লালিত পালিত হয়েছিলেন যেখানে পাপাচার, অন্যায় অপকর্ম আর অশ্লীলতার ছিল ছড়াছড়ি। কোন অপকর্মটি ছিল না সে সমাজে? আল্লাহর সাথে শিরক, আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের কাছে প্রার্থনা, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা, জুলুম-অত্যাচার, জুয়া, মদ্য-পান, ডাকাতি, পতিতাবৃত্তি, গণব্যভিচার, ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যভিচার, জোর- জবরদস্তি করে বিবাহ, রক্তপাত, মানহানী, অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস সবই ছিল সে সমাজে। ইসলাম-পূর্ব এ সমাজে এগুলো চলতো অবাধে। কেহ এসবের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করত না। কোন দল এর বিরুদ্ধে লড়াই করত না। এর সাথে সাথে তারা দারিদ্রতার ভয়ে কন্যা সন্তানদের জীবিত কবর দিত। কন্যা সন্তানকে তারা নিজেদের জন্য লজ্জা ও অপমানের বিষয় মনে করত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল বিষয়ে কখনো কোনভাবে জড়িত হননি। তার প্রভু তাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন, তার শিষ্টাচার উত্তম হয়েছে। তার সম্প্রদায় তাকে ভালভাবে চিনত বলেই তাকে উপাধি দিয়েছিল 'আল- আমীন' বা সত্যবাদী।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স যখন পঁয়ত্রিশ বছর, তখন কুরাইশগন কাবা শরীফ পুনর্নিমাণে হাত দিল। যখন হাজারে আসওয়াদ যথাস্থানে স্থাপনের সময় আসল, তখন তাদের মধ্যে বিবাদ দেখা দিল। কোন গোত্রের লোকেরা এটি যথাস্থানে স্থাপন করার সৌভাগ্য ও কৃতিত্ব অর্জন করবে তা-ই ছিল বিবাদের মূল কারণ। এ নিয়ে গৃহযুদ্ধ বাধার মত অবস্থা সৃষ্টি হল। তারা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিল; যে ভোর বেলায় সেখানে প্রথম প্রবেশ করবে সে এ বিষয়ে ফয়সালা দেবে। দেখা গেল ভোর বেলায় সবচেয়ে প্রথমে যিনি আসলেন তিনি হলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সকলে খুশি হল। বলে উঠল, 'এসেছে আল-আমীন'। তাকে সকলেই বিচারক হিসাবে মেনে নিল। তিনি একটি চাদর বিছিয়ে হাজরে আসওয়াদ সেখানে রেখে বললেন, 'প্রত্যেক গোত্রের একজন করে চাদরের কিনারা ধরে হাজরে আসওয়াদ বহন করে যথাস্থানে নিয়ে যাবে।' সকলে তাই করল। এরপর তিনি নিজ হাতে পাথরটি উঠিয়ে যথাস্থানে রাখলেন। বিবাদ মিটে গেল। সকলেই খুশি হল。
এরপর আল্লাহ তার কাছে নির্জনতা অবলম্বন প্রিয় করে দিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদতের জন্য মানুষদের থেকে অনেক দূরে চলে যেতেন। হেরা পর্বতের এক গুহায় যেয়ে তিনি ইবরাহীমি ধর্ম অনুসারে ইবাদত-বন্দেগী করতে লাগলেন। এমনি করে যখন তার বয়স চল্লিশ বছরে পৌঁছল তখন তাকে আল্লাহ নবুওয়ত দানে ধন্য করলেন। এতে কারো দ্বিমত নেই যে, সোমবার দিন তাকে নবুওয়ত দেয়া হয়েছিল। অধিকাংশের মতে মাসটি ছিল হস্তী বর্ষের একচল্লিশ সনের রবিউল আউয়াল মাস।
জিবরীল ফেরেশতা হেরা গুহায় আসলেন। তিনি তাকে বললেন, 'পাঠ কর!' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি পড়তে জানি না।' তিনি আবার বললেন, 'পাঠ কর!' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি পড়তে জানি না।' এরপর জিবরীল তাকে আলিঙ্গন করলেন। তিনি কষ্ট অনুভব করলেন। তিনি আবার তাকে বললেন, 'পাঠ কর!' তিনি উত্তরে বললেন, 'আমি পড়তে জানি না।' তিনি বললেন,
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ﴿١﴾ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ ﴿۲﴾ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ ﴿٣﴾ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ﴿٤﴾ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ ﴿٥﴾
"পড়! তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে এক রক্তপিণ্ড থেকে। পড় মহান প্রভুর নামে, যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলম দিয়ে। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জান তো না।"
এ সূরার মাধ্যমেই তিনি নবী হিসেবে দায়িত্ব পেলেন。
তিনি এ ঘটনার পর খাদিজার কাছে গেলেন। তিনি ভীষণ ভয় পেলেন। খাদিজাকে বললেন 'আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও! আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও!' তাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দেয়া হল। তার ভয় যখন কিছুটা কেটে গেল তখন খাদিজাকে সকল ঘটনা শুনালেন। খাদিজা ঘটনা শুনে বললেন, 'আল্লাহ আপনাকে কখনো অসম্মান করবেন না। আপনিতো আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখেন। অসহায়কে সাহায্য করেন। সম্বলহীনকে দান করেন। অতিথিকে মেহমানদারী করেন। সত্য ও ন্যায়ের পথে সহযোগিতা করেন।
এরপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা আল-মুদ্দাস্সির নাযিল করার মাধ্যমে তাকে রাসূল হিসাবে দায়িত্ব দিলেন। আল্লাহ বললেন,
يَا أَيُّهَا المُدَّثِّرُ ﴿۱﴾ قُمْ فَأَنْذِرُ ﴿۲﴾ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ ﴿٣﴾ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ ﴿٤﴾ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ ﴿٥﴾
"হে কম্বল আবৃতকারী! উঠে দাঁড়াও। সতর্ক কর। তোমার প্রতিপালকের মহত্ত্ব ঘোষণা কর। আর তোমার পোশাক পবিত্র কর এবং অপবিত্রতা বর্জন কর।"
এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে ওহী আসতে শুরু করল। এ সূরা নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। অগ্রবর্তীগণ তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করলেন। যিনি প্রথম ইসলাম গ্রহণ করলেন তিনি হলেন খাদিজা রা., তারপরে ইসলাম গ্রহণ করেন যায়েদ বিন হারেসা, এরপর আবু বকর রা. অতঃপর এক জনের পর একজন করে মক্কার অনেকে ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরপর আল্লাহ তাআলা প্রকাশ্যে দাওয়াত দিতে আদেশ করলেন। তিনি বললেন:
وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ ﴿٢١٤﴾ وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ المُؤْمِنِينَ ﴿٢١٥﴾ فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تَعْمَلُونَ ﴿٢١٦﴾
"তোমার নিকট আত্মীয়বর্গকে সতর্ক কর। এবং যারা তোমার অনুসরণ করে সে সকল মু'মিনদের প্রতি বিনয়ী হও। তারা যদি তোমার অবাধ্য হয় তবে তুমি বলো, তোমরা যা কর তা থেকে আমি মুক্ত।”
তিনি তাদের আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলেন। সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গোত্রের নাম ধরে ধরে সকলকে একত্রিত করলেন। যখন সকলে জমায়েত হল, তিনি প্রশ্ন করলেন, 'আমি যদি বলি যে এ উপত্যকার পিছনে একটি বাহিনী আছে যা তোমাদের উপর হামলা করবে, তাহলে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?'
সকলে উত্তর দিল, 'হ্যাঁ, কারণ আমরা তোমাকে কখনো মিথ্যা বলতে দেখিনি।'
তিনি বললেন, 'আমি তোমাদের একটি কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করছি।'
কুরাইশ নেতারা তার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করল। তারা ক্রোধে অগ্নিশর্মা হল। কিন্তু তারা কেহ তাকে মিথ্যা বলার অপবাদ দিতে পারল না। আল্লাহ তাআলা বলেন: فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَكِنَّ الظَّالِمِينَ بِآيَاتِ اللَّهَ يَجْحَدُونَ. (الشعراء : ٣٣)
"তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে না, বরং এ যালিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করছে।”
তারা তাকে এমন কোন গালি দেয়নি যাতে বুঝে আসে তিনি বিগত চল্লিশ বছরে খারাপ ছিলেন। এক আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়ায় তারা তাকে 'পাগল' বলেছে, 'জাদুকর' বলেছে, 'কবি' বলেছে। সকলে জানে এগুলো এমন বিশেষণ যা স্বভাবগত নয় বা চরিত্রের অংশ নয়। তার দাওয়াতের কারণে ছেলে-পিতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ দেখা দিয়েছে。
তিনি বিভিন্ন মৌসুম বা পর্বকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে দাওয়াতি কর্মসূচী চালিয়েছেন। বাজারে দাওয়াত দিয়েছেন। তায়েফে গিয়েছেন দাওয়াত দিতে। তায়েফ থেকে ফেরার পথে জিনদের একটি দল তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছে। দাওয়াত দিতে যেয়ে তিনি নির্যাতন- নিপীড়ন, দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করেছেন। ধৈর্য ধারণ করেছেন। এরপর আল্লাহ তাকে বাইতুল মুকাদ্দাস ভ্রমণ করিয়েছেন। মিরাজে নিয়েছেন। মিরাজ গমনের পূর্বে জিবরীল এসে তার বক্ষ বিদারণ করেছেন। যমযমের পানি দিয়ে ধৌত করেছেন। হাফেজ ইবনে হাজর বলেন, 'জীবনে তিনবার তার বক্ষ বিদারণ করা হয়েছে। প্রথমবার ছোট বয়সে, দ্বিতীয়বার নবুওয়তের সময়, তৃতীয়বার ইসরা ও মিরাজে গমনের প্রাককালে।'
মিরাজে তিনি সপ্তম আকাশে গমন করেন। সেখানে নামাজ ফরজ করা হয়। নবীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি দু' রাকাআত নামাজও আদায় করেছেন। সকাল হওয়ার পূর্বেই তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। তিনি তাওহীদের দাওয়াত অব্যাহত রাখেন। হিজরতে পূর্বে মক্কায় তিনি তিন বছরকাল নামাজ আদায় করেন। যখন কুরাইশদের যুলুম-নির্যাতন বেড়ে যায়, এবং আল্লাহর একত্ববাদ-কেন্দ্রিক তেরো বছরের দাওয়াতী জীবন শেষ হয়, তখন তিনি মদীনায় হিজরত করে যাওয়ার অনুমতি পান। মদীনা-জীবনের দশ বছর সময়কালে তার কাছে ইসলামী শরীয়তের অন্যান্য বিধি-বিধান অবতীর্ণ হয়।

টিকাঃ
১ যাদুল মাআদ
২ সূরা আল-আলাক- ১-৫ * সহীহ আল-বুখারী-৩, সহীহ মুসলিম ১৬০ * সূরা আল-মুদ্দাসসির: ১-৫
৩ সূরা আশ-শুআরা: ২১৪-২১৬ ৪ সহীহ আল - বুখারী ৪৯৭১, সহীহ মুসলিম ১৯৪
৫ সূরা আশ-শুআরা: ৩৩ ৬ ফতহুল বারী

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 শারীরিক ও চারিত্রিক গুণাবলি

📄 শারীরিক ও চারিত্রিক গুণাবলি


নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন স্বভাব ও দৈহিক অবয়ব, উভয় দিক থেকেই সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি ছিলেন নম্র, বিনয়ী, সৌরভমন্ডিত, বিবেক-বুদ্ধির দিক থেকে পরিপূর্ণ, এবং আচার-আচরণের বিবেচনায় সুন্দরতম মানুষ। তিনি ছিলেন আল্লাহ সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী। আল্লাহ-ভীতি অবলম্বনে তিনি ছিলেন সর্বাগ্রে。
সাহসিকতায় তিনি ছিলেন সবার থেকে নির্ভীক। মহানুভবতায় শ্রেষ্ঠতম। দানশীলতায় সকলের ঊর্ধ্বে। ন্যায় বিচারে সর্বশ্রেষ্ঠ। আচার-আচরণে উদারতম। তিনি ছিলেন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী চর্চায় অধিক পরিশ্রমী। যুলুম-নির্যাতন বরদাশত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ধৈর্যশীল। সৃষ্টি-জীবের প্রতি সবচেয়ে বেশি দয়াশীল। মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লজ্জার অধিকারী। ব্যক্তিগত ইস্যুতে তিনি কখনো প্রতিশোধ নিতেন না, কাউকে শাস্তি দিতেন না, কারো প্রতি রাগ করতেন না। কিন্তু আল্লাহর ব্যাপারে তিনি রাগান্বিত হতেন, প্রতিশোধ নিতেন। তিনি যখন আল্লাহর স্বার্থে রাগ করতেন, তখন তার ক্রোধের সাথে অন্য কারো ক্রোধের তুলনা হত না। অধিকার ও সম্মানের ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্র, নিকট-পর, স্ব-বংশীয়-পরবংশীয় সকলে তার কাছে ছিল সম-মর্যাদার। কোন খাবার অপছন্দ হলেও তিনি তাতে খুঁত ধরতেন না। খাবার অপছন্দ হলে তিনি তা ত্যাগ করতেন। হালাল খাদ্য যা পেতেন, খেতেন। তিনি উপহার গ্রহণ করতেন। উপহারের বিনিময়ে উপহার দিতেন। নিজ বা পরিবারের জন্য দান-ছদকা গ্রহণ করতেন না। জুতা ও পোশাক নিজেই পরিষ্কার করতেন। পরিবার-পরিজনকে তাদের কাজ-কর্মে সাহায্য করতেন। তিনি বকরীর দুধ দোহন করতেন। নিজের কাজ নিজে করতেন। তিনি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বিনয়ী ছিলেন। ধনী-দরিদ্র, ভদ্র-অভদ্র সকলের আহবানেই তিনি সাড়া দিতেন। তিনি দরিদ্রদের ভাল বাসতেন। রোগ-শোকে তাদের সেবা করতেন, খোঁজ-খবর নিতেন। তাদের মৃতদের দাফন-কাফনে অংশ নিতেন। দারিদ্রতার কারণে তিনি কাউকে অবজ্ঞা করতেন না। রাজত্বের কারণে কাউকে অত্যধিক সম্মান দিতেন না। তিনি ঘোড়া, গাধা, খচ্চর, উট সবকিছুর পিঠে আরোহণ করতেন। আরোহণের সময় সাথে অন্যকে বসাতেন। এ সকল বিষয়ে তিনি নিজের মান-সম্মানের দিকে তাকিয়ে কখনো সংকোচ বোধ করতেন না। তিনি রুপার আংটি পরিধান করতেন ডান হাতের অনামিকা অঙ্গুলে। কখনো কখনো বাম হাতেও পরিধান করতেন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটে পাথর বাঁধতেন। অবশ্য পরে আল্লাহ তাকে পার্থিব সকল সম্পদ দান করেন। কিন্তু তিনি আখিরাতকে বেছে নিয়েছেন。
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যধিক দীর্ঘকায় ছিলেন না আবার বেটেও ছিলেন না। তিনি অতি সাদা ছিলেন না আবার বাদামি ছিলেন না। তার চুলগুলো খুব কোঁকড়ানো ছিল না আবার একে বারে সোজাও ছিল না। তার পদ-যুগল ছিল মাংসল, চেহারা ছিল সুন্দর। তার চেহারা ছিল উজ্জ্বল ও লাবণ্যময়। তার বক্ষ ছিল প্রশস্ত। কানের লতি অবধি দীর্ঘ কেশমালার অধিকারী ছিলেন তিনি, কখনো কখনো তা বৃদ্ধি পেয়ে কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছে যেত আবার কখনো তা থাকত কানের মাঝামাঝি পর্যন্ত। দাড়ি ছিল ঘন। হাত ও পায়ের অঙ্গুলি ছিল পুষ্ট। মাথা ছিল বড় আকারের। বুকের সরু কেশমালা ছিল পাতলা। যখন হাঁটতেন সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটতেন। তার মুখমণ্ডল ছিল বড়। চোখের পলক ছিল লম্বা। তার চেহারা ছিল খুবই সুন্দর। পিছনে দু চুটের মধ্য খানে ছিল নবুওয়তের সীল-মোহর। তা ছিল কবুতরের ডিম আকৃতির লাল রংয়ের। তিনি মাথার কেশ বিন্যাস করতেন, তেল ব্যবহার করতেন। দাড়ি অকর্তিত অবস্থায় রেখে দিতেন। দাড়িতে চিরুনি ব্যবহার করতেন。
তার দাড়ি ও চুলে কম সংখ্যক সাদা কেশ ছিল। যখন তেল ব্যবহার করতেন তখন এ সাদা চুলগুলো দেখা যেত না। তিনি পাগড়ি ব্যবহার করতেন ও লুঙ্গি পড়তেন। তিনি সুগন্ধি ভাল বাসতেন। তিনি বলতেন, 'পুরুষদের জন্য উত্তম সুগন্ধি হল যার গন্ধ পাওয়া যায়, রং দেখা যায় না। আর মেয়েদের জন্য উত্তম সুগন্ধি হল যার রং প্রকাশিত হয় গন্ধ গোপন থাকে।'
তিনি ঈদের সময় সাজ-সজ্জা অবলম্বন করতেন। কোন মেহমান আসলে তাদের সাথে সাক্ষাতের সময়ও সাজ সজ্জা গ্রহণ করতেন। তিনি সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতেন। তার সম্মানে কেউ দাঁড়াবে এটা তিনি পছন্দ করতেন না। সাহাবায়ে কেরাম তার সম্মানে কখনো দাঁড়াতেন না। তারা রাসূলুল্লাল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপছন্দের কথা জানতেন。
তিনি সর্বদা মেছওয়াক করা পছন্দ করতেন। যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, যখন রাতে জাগ্রত হতেন, যখন অজু করতেন তখন মেছওয়াক করতেন। তিনি রাতের বেলায় তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তেন। শেষ রাতে দীর্ঘ সময় সালাতে কাটাতেন। দীর্ঘক্ষণ নামাজে থাকার কারণে অনেক সময় তার পা ফুলে যেত। তিনি বেতর নামাজ আদায় করতেন রাতের সকল নামাজের শেষে ফজরের ওয়াক্তের পূর্বে। তিনি অন্যের কণ্ঠে কুরআন পাঠ শুনতে ভাল বাসতেন。
তার রয়েছে বিভিন্ন নাম। যেমন তিনি বলেছেন, 'আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমদ, আমি মাহী (নিশ্চিহ্নকারী) আমাকে দিয়ে আল্লাহ কুফরকে নিশ্চিহ্ন করবেন। আমি হাশের (জমায়েতকারী) কারণ মানুষ আমার পিছনে জমায়েت হবে। আমি আকেব (সর্বশেষ) কারণ আমার পরে কোন নবী বা রাসূল নেই।'
তিনি আরো বলেন, 'আমি মুকাফফি (ধারাবাহিকতা রক্ষাকারী) আমি তাওবার নবী, রহমতের নবী।” তার উপনাম আবুল কাসেম। তাকে চারিত্রিক উৎকর্ষতার পূর্ণতা দেয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের কয়েকটি স্থানে তার নাম উল্লেখ করেছেন। যেমন
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ
"মুহাম্মাদ তো কেবল আল্লাহর রাসূল, তার পূর্বে রাসূলগণ অতিবাহিত হয়েছেন।” আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ
"মুহাম্মাদ তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নয়, কিন্তু সে আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী।” মহান আল্লাহ আরো বলেন,
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَهُوَ الحُقُّ مِنْ رَبِّهِمْ
"যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, এবং আরো ঈমান এনেছে তার প্রতি যা মুহাম্মাদের উপর নাযিল হয়েছে, আর এটাই তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য।”
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,
مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ
"মুহাম্মাদ হল আল্লাহর রাসূল।” আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঈসা আ. এর বক্তব্য উল্লেখ করেন,
وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
"আমি একজন রাসূলের সুসংবাদ দিচ্ছি যে আমার পরে আসবে, তার নাম হল আহমাদ।"
তিনি অধিক পরিমাণে জিকির করতেন। সর্বদা চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করতেন। দীর্ঘ সালাত আদায় করতেন। খুতবা সংক্ষেপ করতেন। তিনি মুচকি হাসতেন। কখনো কখনো প্রয়োজনে এমন হাসতেন যে তার দাঁত দেখা যেত。
সাহাবী জরীর রা. বলেন, 'আমি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দূরে রাখেননি। তার চেহারায় আমি সর্বদা মুচকি হাসি দেখেছি। আমি তার কাছে আমার অক্ষমতার অভিযোগ করে বললাম, 'আমি ঘোড়ার পিঠে স্থির থাকতে পারি না।' তিনি আমার বুকে থাপর দিয়ে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! তাকে স্থির রাখো, তাকে সঠিক পথ অবলম্বনকারী ও সঠিক পথের প্রদর্শক বানাও।'
তিনি হাসি-তামাশা করতেন তবে তা সত্য কথার মাধ্যমে। কাউকে কথার দ্বারা খাটো করতেন না। কেহ কোন ওজর-আপত্তি পেশ করলে তা গ্রহণ করতেন। তিনি তিন আঙুল দ্বারা খেতেন, আঙুল চেটে খেতেন। পানি খাওয়ার সময় পাত্রের ভিতরে শ্বাস ছাড়তেন না। তিনি অতি সংক্ষেপে কিন্তু ব্যাপক অর্থবোধক ভাষায় কথা বলতেন। কথা বলতেন স্পষ্ট ও যথেষ্ট বোধগম্য ভাষায়, যাতে শ্রোতাদের কথা স্মরণ রাখতে সহজ হয়। বুঝানোর জন্য একটি কথা তিন বার বলতেন। প্রয়োজন ব্যতীত কথা বলতেন না। তিনি বিনয়-নম্রতার জন্য নির্দেশ দিতেন। উগ্রতা ও চরমপন্থা অবলম্বন করতে নিষেধ করতেন। ক্ষমা, উদারতা, ধৈর্য, সহনশীলতা, ধীরস্থিরতা, উত্তম চরিত্র অবলম্বনে উৎসাহ দিতেন। তিনি সর্বদা ডান পন্থা অবলম্বন করতেন। অর্থাৎ সকল কাজ ডান দিকে দিয়ে শুরু করতেন। এমনকি, জুতা পরিধান, কেশবিন্যাসের ক্ষেত্রেও। বাম হাত দিয়ে শৌচ কর্ম ও পরিচ্ছন্নতার কাজ সম্পাদন করতেন। যখন শুতেন ডান কাতে শুতেন, ডান হাত ডান গালের নীচে রাখতেন। তার বৈঠক ছিল জ্ঞান চর্চার পাঠশালা। যাতে অনুশীলন হত সহনশীলতা, লজ্জা, আমানতদারী, ধৈর্য, প্রশান্তি, সহমর্মিতা, অন্যকে সম্মান ও মর্যাদা দান, তাকওয়া, বিনয়, বড়কে সম্মান করা, ছোটদের প্রতি স্নেহ ও মমতা, অভাবীকে তার প্রয়োজন পূরণে অগ্রাধিকার, ভাল কাজের আদেশ, সকল প্রকার প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ, ক্ষুধার্তকে অন্ন দান, ইয়াতীম- অনাথকে আশ্রয় দান, অসুস্থকে সেবা দান, দরিদ্রকে পুনর্বাসন প্রভৃতি বিষয়গুলো। তিনি মাটির উপরে বসতেন, মাটির উপর বসে পানাহার করতেন। বিধবা, অসহায়, দাসদের সাথে বের হতেন তাদের সাহায্য করার জন্য। খেলাধূলারত শিশুদের কাছে আসতেন তাদের সালাম দিতেন। আপনজন ছাড়া অন্য নারীদের সাথে করমর্দন করতেন না। নিজের সাথিদের সর্বদা খোঁজ খবর নিতে, কাউকে না দেখলে তার খোঁজে বের হতেন। সকল সম্প্রদায়ের নেতাদের সম্মান করতেন। অধীনস্থদের সাথে সুন্দর আচরণ করতেন। সাহাবী আনাস রা. বলেন, 'আমি দশ বছর তার কাজ করেছি। তিনি কখনো আমার প্রতি বিরক্ত হননি, কখনো বলেননি এটা কেন করেছ, এটা কেন করলে না? তিনি স্বর্ণ ব্যবহার করতেন না, রেশমী কাপড় পরিধান করতেন না। তার ঘামের চেয়ে সুগন্ধময় কোন সৌরভ ছিল না।'
কখনো অশ্লীল কাজ বা আচরণ করতেন না। অশ্লীলতা পছন্দ করতেন না। খারাপ কাজের প্রতিকার খারাপ দিয়ে করতেন না, বরং ক্ষমা ও উদারতার দ্বারা খারাপ কাজের প্রতিকार করতেন। কখনো কোন কর্মচারী, স্ত্রী, শিশুদের প্রহার করেননি। তবে যুদ্ধ ও বিচারের বিষয়টি আলাদা। দুটো বিষয় বা কাজের মধ্যে যেটি সহজতর সর্বদা সেটিকে বেছে নিতেন。
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সকল উত্তম স্বভাব, চমৎকার আচরণ, সুন্দর চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন শুধু তারই সত্বায়। দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তি ও সফলতার উপাদান পাওয়া যাবে শুধু তারই চরিত্রে। বিশ্বের অন্য কোন মানুষের চরিত্রে এগুলো একত্রে কখনো পাওয়া যায়নি আর যাবেওনা। তিনি ছিলেন নিরক্ষর, পড়তে ও লেখতে জানতেন না। তার কোন মানব শিক্ষক ছিল না। তিনি পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত সকল মানুষ ও জিনের নিকট প্রেরিত ও তাদের কল্যাণে নির্বাচিত। তার প্রতি অগণিত সালাত ও সালাম নিবেদিত হোক মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে। আল-কুরআনই হল তার চরিত্র。
আমাদের জন্য করণীয় হল তার অনুসরণ করা জীবনের সকল ক্ষেত্রে- সকল কথা ও কাজে, সকল চিন্তা ও চেতনায়, সকল দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনায়। তিনি বলেছেন, 'আমি তোমাদের যা নিষেধ করেছি তা থেকে ফিরে থাকবে। আর যা আদেশ করেছি সাধ্য মত তা অনুসরণ করবে।'

টিকাঃ
১ সহীহ আল বুখারী-৫৯০৮ * সহীহ মুসলিম-২৩৪০
২ মুখতাছার শামায়েলুত তিরমিজী, ১৮৮ ৩ আহমদ ১৩৪/৩ ৪ সহীহ আল-বুখারী ৩৫৩২, সহীহ মুসলিম ২৩৫৪ * সহীহ মুসলিম ২৩৫৫ ৫ সহীহ আল-বুখারী ৩৫৩৭, সহীহ মুসলিম ১৬৮২/৩ * সূরা আলে ইমরান: ১৪৪ * সূরা আল-আহযাব: ৪০

📘 দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী > 📄 আল্লাহর ইবাদত ও জিহাদে আত্ম-নিয়োগ

📄 আল্লাহর ইবাদত ও জিহাদে আত্ম-নিয়োগ


১- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আদর্শ, অনুসরণযোগ্য ইমাম যাকে সর্বদা অনুসরণ করা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
"তোমাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মধ্যে সর্বোত্তম আদর্শ। যে আল্লাহ ও আখেরাতকে চায় ও বেশি বেশি স্মরণ করে আল্লাহকে।”
২- তিনি রাতে এগারো রাকআত নামাজ আদায় করতেন। অনেক সময় তের রাকআত নামাজ আদায় করতেন。
দিনের হিসাবে দিনে তিনি মোট বার রাকআত, কখনো দশ রাকআত আদায় করতেন। চাশতের নামাজ হিসাবে তিনি চার রাকআত, কখনো তার বেশি আদায় করতেন। তিনি রাতের তাহাজ্জুদ এত দীর্ঘ সময় আদায় করতেন যে, এক রাকআতে পাঁচ পারার মত পাঠ করা যেত。
তিনি দিনে রাতে প্রায় চল্লিশ রাকআত নামাজ আদায় করতেন, এর মধ্যে ফরজ হল সতের রাকআত।
৩- রমজান মাস ব্যতীত তিনি প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখতেন। সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখতেন। অল্প কয়েক দিন ব্যতীত তিনি শাবান মাস জুড়ে রোযা রাখতেন। শওয়াল মাসে ছয়টি রোযা রাখতে উৎসাহ দিতেন। কখনো এমন ভাবে রোযা রাখতে থাকতেন মনে হতো তিনি আর রোযা ছাড়বেন না। আবার কখনো রোযা পরিহার করতেন মনে হতো তিনি আর নফল রোযা রাখবেন না। তিনি আশুরাতে রোযা রাখতেন। জিলহজ মাসের নবম তারিখেও তিনি রোযা রাখতেন। তিনি বিরতিহীন ভাবে রোযা রাখতে নিষেধ করতেন। তিনি বলতেন আমার উম্মত আমার মত নয়। আমাকে আমার প্রতিপালক পানাহার করিয়ে থাকেন。
আল্লাহর কাছে সালাত ও মুনাজাত ছিল তার কাছে সর্বাধিক প্রিয়। তাই তো তিনি বেলালকে বলতেন, 'হে বেলাল! সালাতের মাধ্যমে আমাদের প্রশান্তি দাও।'
তিনি আরো বলতেন, 'সালাতের মধ্যে আমার চোখের প্রশান্তি রাখা হয়েছে।'
৪- তিনি বেশি করে ছদকাহ করতেন। তিনি ছিলেন সকল সৃষ্টি জীবের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দানশীল। তিনি মানুষকে এমনভাবে দান করতেন যে, দান গৃহী তা কখনো অভাব বোধ করতো না। যেমন তিনি এক ব্যক্তিকে বকরীর বিশাল এক পাল দান করলে সে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো, কারণ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত বড় দানশীল যে, সে কাউকে দান করলে জীবনে সে দারিদ্রতাকে ভয় করে না।'
তিনি যেমন ছিলেন সুন্দরতম মানুষ, তেমনি ছিলেন সকলের চেয়ে দানশীল। সকল মানুষের চেয়ে বেশি সাহসী, সবচেয়ে বেশি দয়ার্দ্র, সকলের চেয়ে বেশি বিনয়ী, ন্যায়পরায়ণ, ধৈর্যশীল, নম্র, ক্ষমাশীল, সহনশীল, লজ্জাশীল ও সত্যের প্রতি অটল, অবিচল।
৫- তিনি সকল জিহাদের ময়দানে উপস্থিত থেকে যুদ্ধ করেছেন। কুপ্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করেছেন। এর চারটি স্তর রয়েছে এগুলো হল: দীনের বিষয়াবলী শিক্ষা, সে মোতাবেক আমল করা, জেনে বুঝে তার দিকে মানুষকে আহবান করা, দাওয়াতের ক্ষেত্রে যুলুম-নির্যাতন, দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য অবলম্বন。
শয়তানের সাথে জিহাদ করার স্তর হল দুটো : শয়তান যে সকল সংশয় - সন্দেহ সৃষ্টি করে সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করা, যে সকল কুমন্ত্রণা দেয় তা প্রতিরোধ করা।
কাফেরদের সাথে জিহাদ করার স্তর হল চারটি: অন্তর দিয়ে জিহাদ, মুখ বা বাকশক্তি দিয়ে জিহাদ, সম্পদ দিয়ে জিহাদ ও হাত দিয়ে জিহাদ。
যালেমদের বিরুদ্ধে জিহাদের স্তর হল তিনটি হাত দিয়ে অতঃপর মুখ দিয়ে এরপর অন্তর দিয়ে।
এ হল জিহাদের মোট তেরোটি স্তর। এ সবকটি স্তরে জিহাদ করার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এ জন্য তিনি বিশ্বের মানব সমাজে সর্বকালের সব চেয়ে বেশি আলোচিত ব্যক্তি। আল্লাহ রাববুল আলামীন তাকে এ সম্মান দান করেছেন。
তিনি তাওহীদ- আল্লাহর একত্ববাদ বিরোধীদের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন সরাসরি। এ সকল যুদ্ধের সংখ্যা হল সাতাশ। এর মধ্যে মাত্র নয়টিতে লড়াই সংঘটিত হয়েছিল। আর যে সকল অভিযান তাঁর নির্দেশে হয়েছে, কিন্তু তিনি সরাসরি তাতে অংশ নেননি, এমন অভিযানের সংখ্যা হল ছাপ্পান্ন।
৬- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সাথে মুআমালা- লেনদেনের ক্ষেত্রে ছিলেন সকল মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। তিনি একদিন এক ব্যক্তি থেকে একটি উট ধার নিয়েছিলেন। কথা ছিল এর পরিবর্তে অন্য একটি সমমানের উট তাকে দেয়া হবে। সময় মত যখন উটের পাওনাদার উট নিতে আসল, তখন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সে কথা-বার্তায় কঠোর আচরণ করল। সাহাবায়ে কেরাম রাগ হয়ে তাকে বুঝাতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, 'তাকে ছেড়ে দাও! তার কথার প্রতিবাদ করনা। পাওনাদারের কথা বলার অধিকার আছে। তার উটের মত উট তাকে দিয়ে দাও।' সাহাবীগণ বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! তার উটের চেয়ে ভাল উট আছে, কিন্তু সমমানের উট নেই। তিনি বললেন, 'সেটাই তাকে দিয়ে দাও!' লোকটি তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'আপনি আমার অধিকার পরিপূর্ণ ও সুন্দরভাবে আদায় করেছেন। আল্লাহ আপনাকে সুন্দরভাবে দান করুন।' তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'যে সুন্দর বিচার করে সে আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে উত্তম।'
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. কে বললেন, 'আমি তোমার উটটি কিনব, সে উট নিয়ে এল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উটের দাম দিলেন ও উট ফেরত দিয়ে বললেন, 'নাও! তোমার উট ও তার মূল্য।'
৭- চরিত্রের দিকে দিয়ে তিনি সকল মানুষের মধ্যে ছিলেন শ্রেষ্ঠতম। যেমন আয়েশা রা. বলেন, 'তার চরিত্র ছিল আল-কুরআন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বলেছেন, 'আমাকে উত্তম চরিত্রের উৎকর্ষতাকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।'
৮- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম যাহেদ-দুনিয়া বিমুখ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি খেজুরের চাটাইতে শয়ন করতেন। শরীরে চাটাইয়ের দাগ পড়ে যেত। একদিন উমার রা. তার কাছে আসলেন। তিনি তার শরীরে চাটাইয়ের দাগ দেখে বললেন, 'যদি আপনি বিছানা ব্যবহার করতেন তাহলে শরীরে দাগ পড়তোনা।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বললেন, 'দুনিয়ার সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমার আর এ দুনিয়ার দৃষ্টান্ত হল, এক সওয়ারী, যে গরমের দিন পথ চলতে গিয়ে বিশ্রামের জন্য গাছের তলায় একটু শুয়ে নিল। তারপর আবার চলতে শুরু করল।'
তিনি আরো বলতেন, 'যদি আমার কাছে উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকত তাহলে আমি তা তিন দিন আমার কাছে থাকুক তা পছন্দ করতাম না। তবে দ্বীনের জন্য কিছু রাখলে তা হত অন্য কথা।'
আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনে তার পরিবার কখনো তিন দিন পেট ভরে খাবার গ্রহণ করতে পারেনি।
অর্থাৎ একাধারে তিনদিন তারা পেট ভরে খেতে পারেননি। কারণ খাদ্যের অভাব। তাদের কাছে কোন খাদ্য-খাবার আসলে অভাবী মানুষকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দিয়ে তাদের দান করে দিতেন। তারা নিজেরা না খেয়ে তা অন্যকে দিয়ে দিতেন。
আয়েশা রা. বলেন, 'নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে চলে গেলেন কিন্তু জীবনে কখনো পেট ভরে আটার রুটি খেলেন না।
তিনি আরো বলেন, 'তিনটি নতুন চাঁদ আমরা দেখতাম, দু মাস অতিবাহিত হত কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গৃহসমূহে চুলায় আগুন জ্বলতো না।' উরওয়া (আয়েশা রা. এর বোনের ছেলে) জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে আপনারা কি খেয়ে জীবন কাটাতেন।' তিনি বললেন, 'দুটি কালো বস্তু; খেজুর ও পানি।'
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিছানা ছিল গাছের আশ দিয়ে তৈরি চট।
৯- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচেয়ে বেশি পরহেযগার-সতর্ক, তিনি বলেন, 'আমি যখন ঘরে আসি তখন অনেক সময় বিছানায় বা ঘরের কোথাও দেখতে পাই যে, খেজুর পড়ে আছে। আমি তা খাওয়ার জন্য উঠিয়ে নেই। কিন্তু পর ক্ষণে চিন্তা করি, হতে পারে এটি ছদকার খেজুর (যা আমার জন্য বৈধ নয়) পরে তা ফেলে দেই।'
তার নাতি হাসান ইবনে আলী রা. একবার ছদকার খেজুর থেকে একটি খেজুর মুখে দিলেন। তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'ছি! ছি! ফেলে দাও! তুমি কি জান না, আমরা ছদকা খাই না?'
১০- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত বেশি ও বড় বড় কাজ করা সত্ত্বেও বলতেন, 'তোমরা সামর্থ্য অনুযায়ী আমল করো। জেনে রাখ! আল্লাহ বিরক্ত হন না, যতক্ষণ না তোমরা কাজ করতে করতে বিরক্ত হও। আল্লাহর কাছে প্রিয় আমল হল যা সর্বদা করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়।' আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবী ও পরিজনেরা যখন কোন আমল করতেন, তার উপর অবিচল থাকতেন。
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন সালাত আদায় করতেন তা অব্যাহত রাখতেন।
একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কয়েকজন সাহাবী তার ইবাদত সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। তারা বলছিলেন, ইবাদতের ক্ষেত্রে আমরা কোথায় আর আল্লাহর নবী কোথায়? আমাদের ইবাদতের সাথে তার ইবাদতের কোন তুলনা হয়? অথচ আল্লাহ তার পিছনের ও সামনের সকল পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাদের একজন বলল, আমি রাতব্যাপী নফল সালাত আদায় করব। আরেক জন বলল, আমি সর্বদা রোযা রাখব কখনো রোযা ত্যাগ করব না। অন্য একজন বলল, আমি কখনো নারী স্পর্শ করব না ও বিবাহ করব না। আরেক জন বলল, আমি কখনো গোস্ত খাব না। তাদের এ আলোচনা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনছিলেন। তিনি তাদের কাছে এসে বললেন, 'তোমরাই তো এ রকম কথা-বার্তা বলছিলে, তাই না? সাবধান! আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি ও তোমাদের চেয়ে বেশি মুত্তাকী-পরহেযগার। কিন্তু দেখ, আমি রোযা রাখি আবার তা পরিত্যাগ করি। আমি নামাজও পরি আবার নিদ্রা যাই। আমি নারীদের বিবাহ করি। অতএব যে আমার সুন্নাতে অনীহা দেখায় সে আমার থেকে নয়।'
এখানে সুন্নাত দ্বারা তার আদর্শ ও জীবন যাপন পদ্ধতি উদ্দেশ্য। তিনি এত কঠিন, কঠোর ও অত্যধিক আমল করার পরও বলতেন, 'সহজ করো, ধীরে সুস্থে কাজ করো, তোমরা জেনে রাখো, কেহ আমলের বিনিময়ে মুক্তি পাবে না।' সাহাবীগন বলল, হে রাসুল! 'আপনিও কি আমলের বিনিময়ে মুক্তি পাবেন না?' তিনি বললেন, 'আমিও নই, তবে আল্লাহ যদি নিজ অনুগ্রহে আমার প্রতি রহম করেন, আমার প্রতি দয়া করেন।'
তিনি এ বলে আল্লাহর কাছে দুআ করতেন, 'হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দীনের উপর অটল রাখেন।'

টিকাঃ
১ সূরা আল-আহযাব: ২১ ২ সহীহ আল - বুখারী ১১৪৭, সহীহ মুসলিম ৭৩৭ * সহীহ মুসলিম ৭৯১ 'সহীহ মুসলিম ৭৭২ * কিতাবুস সালাত: ইবনুল কায়্যিম * সহীহ মুসলিম ১১৬০ ' তিরমিজী ৭৪৫, নাসায়ী ২০২/৪ * সহীহ আল - বুখারী ১৯৬৯, সহীহ মুসলিম ১১৫৬
২ সহীহ আল - বুখারী- ৬০৩৮, সহীহ মুসলিম ২৩০৯ * সহীহ আল - বুখারী ৭২৮৮, সহীহ মুসলিম ২৬১৯
৩ সহীহ মুসলিম ১১৬৪ ৪ সহীহ আল - বুখারী ১৯৭১, সহীহ মুসলিম ১১৫৬ * সহীহ আল - বুখারী ২০০০, সহীহ মুসলিম ১১২৫ * সহীহ নাসায়ী ২২৩৬ * সহীহ আল - বুখারী ১৯৬১-১৯৬৪, সহীহ মুসলিম ১১০২-১১০৩ ৬ আবু দাউদ ৮৫৪৯ * নাসায়ী ৬১/৭ ৮ সহীহ মুসলিম ১৮০৬
৪ ফাতহুল বারী
৫ সুনানে তিরমিজী ২৮০/২ ৬ সহীহ আল - বুখারী ২৩৮৯, সহীহ মুসলিম ৯৯১ ৭ সহীহ আল - বুখারী ৫১৭/৯ ৮ সহীহ আল - বুখারী, ৫৪১৬ ৯ সহীহ আল - বুখারী ৫১৭/৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00