📄 আহমাদ বিন হাম্বল -এর ধৈর্য
সালাফদের আরেকজন ব্যক্তি হলো আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)। খলিফা মামুন প্রথমে মহাম্মাদ বিন নুহ -কে বন্দি করতে আদেশ করলেন। অতঃপর তাকে বন্দি করে খলিফার দরবারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো, তখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল-কে অসিয়ত করে গেলেন, যেন তিনি খলকে কুরআনের মাসাআলার ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করেন। এরপর মুহাম্মাদ বিন নুহ (রহঃ) রাস্তাতেই এ ক্ষণস্থায়ী মুসাফিরখানার সমস্ত লেনদেন চুকিয়ে পাড়ি জমান পরপারে।
এবার ইমাম আহমাদের পালা। খলকে কুরআনের মাসালায় খলিফার মতের বিপরীত হওয়ার কারণে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল-কে হাত-পা বেঁধে নিয়ে আসা হলো খলিফার দরবারে। লোকেরা ইমাম আহমাদকে খলকে কুরআনের ব্যাপারে ফতোয়া পরিবর্তন করতে বললেন, কিন্তু আহমাদ (রহঃ) তাদেরকে বললেন, তোমরা কি খাব্বার-র ধৈর্য সম্পর্কে জানো না?
হযরত খাব্বাব (রাঃ) একদা রাসুল -এর কাছে এসে বললো-হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের কষ্ট ও দুঃখের ব্যাপারে আপনি আল্লাহ-র কাছে দোয়া করুন; যাতে আল্লাহ আমাদেরকে কষ্ট থেকে মুক্তি দেন। এ কথার উত্তরে রাসুল বলেন, “তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের কথা কি ভুলে গেছো? তোমাদের পূর্বে এমন লোক অতিবাহিত হয়েছে; যাদেরকে জমিনে কূপ খনন করে তার মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে, অতঃপর তাকে এনে করাত দিয়ে তার মাথাকে দু'খন্ড করা হয়েছে। তবুও তাকে দ্বীন থেকে ফেরাতে পারেনি। এমনিভাবে লোহার চিরুনী দিয়ে তার শরীরের গোস্তকে আঁচড়িয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তবুও সে ব্যক্তি ইমানের উপর অটল ছিলো। কোন নির্যাতনই তাকে দ্বীন থেকে ফিরাতে পারেনি।”১০১
সে কষ্টকে সহ্য করে তাতে ধৈর্যধারণ করেছে। ইমাম আহমদের এরকম জ্বলন্ত বক্তব্য শুনে লোকেরা তাকে নসিহত করার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে চলে গেলেন।
ইমাম আহমাদ আল্লাহ-র দরবারে মুনাজাতে বলেছিল, “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে খলিফা মামুনের চেহারা দেখাবেন না।”
আল্লাহ তার দু'আকে কবুল করে নিয়েছেন। ব্যস, সাথে-সাথেই খলিফা মামুন এই লোভাতুর দুনিয়া ত্যাগ করলেন, সে আর ইমাম আহমাদ-কে চেহারা দেখাতে পারেনি। তারপরের খলিফা নিযুক্ত হলো। লোকেরা আহমাদ -কে উদ্দেশ্য করে উপদেশ দিচ্ছিলো-মুহতারাম! খলকে কুরআন তথা "কুরআন সৃষ্ট” এরকম ফতোয়া প্রদান করে এই জালেম বাদশাহ থেকে মুক্তি পেয়ে যান। আপনি তো জানেন এ বাদশাহ খুব খারাপ মানুষ। আপনাকে সে তলোয়ারের মাধ্যমে হত্যা করবে। কিন্তু ইমাম আহমাদ-এর বুকে ছিলো ইমানের হিমালয়। তিনি একদম শক্ত ছিলেন, হৃদয়ে গেঁথেছেন ধৈর্যের খুঁটি। তিনি লোকদের কোনো কথাই শুনলেন না।
একদিন খলিফা তাকে জিজ্ঞাসা করলো—'বেটা! তুমি বোধ হয় আমাকে ভালো করে চিনতে পেরেছো? আমি কিন্তু সালেহ আর রশিদকে হত্যা করেছি। সে আমার অনুগামী ছিলো না। এই খলকে কুরআনের মাসআলার ব্যাপারে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু সে এর উল্টো জবাব দিয়েছিলেন, তাই তাকে হত্যা করেছি। এবার তাহলে বলো খলকে কুরআনের মাসআলায় তোমার মতামত কি? ইমাম আহমাদ বললেন, আমি কুরআনকে “মাখলুক বা সৃষ্ট” বলবো না। অতঃপর শুরু হলো নির্দয় আচরণ। জল্লাদ চাবুকের আঘাতে আহমাদ-কে রঞ্জিত করতে লাগলো। কিল, ঘুষি, লাথি যে যেমন পারছে দিচ্ছে। তারপর সব জল্লাদরা তাকে তিরস্কার করতে লাগলো। ওরা মারতে মারতে ক্লান্ত আর আহমাদ ধৈর্যধারণ করে যাচ্ছেন অবিরত। কী নির্মম দৃশ্য। সহ্য করার মত না। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল হয়ে পড়লেন জীবন্ত মরা লাশ।
খলিফা ইমাম আহমাদ-কে বললো, তুমি নিজেকে হত্যা করে ফেলে দিয়ো না। তুমি শুধু বলো যে, কুরআনুল কারিম “সৃষ্ট” তাহলে তোমাকে এ কষ্ট থেকে মুক্ত করে দেওয়া হবে। অতঃপর একজন জল্লাদ তলোয়ার নিয়ে আহমাদ -র মাথার কাছে গিয়ে বললো – হে আহমাদ! তুমি ধ্বংস হও। তুমি এমন জবাব দাও, যাতে তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু না, তিনি খলকে কুরআনের মাসায়ালায় ছিলেন ইস্পাত লোহার মতো শক্ত। তিনি উত্তরে বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! তাহলে আপনার মতের স্বপক্ষে কেবল একটা দলিল দেখান। তাহলে আমি সব মেনে নিব। এরপরই এক জল্লাদ আবারো মারতে শুরু করলো। চামচাদের থেকে একজন বলে উঠলো, ওর চেহারাকে উল্টো করে রাখো ও শরীরকে মাটিতে বিছিয়ে দাও, আমরা পদদলিত করবো। তবুও ইমাম আহমাদ বলেন, না, আমার কোন ভয় নেই। অতঃপর ইমাম আহমাদ অনেক কাল কারাগারে বন্দি ছিলেন। প্রায় আটাশ মাস পর্যন্ত বন্দি ছিলেন।
সালাফদের একজন বলেছিলেন, ইমাম আহমাদ নিজের জীবনকে দ্বীনের রাস্তায় উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। যেমন বেলাল হাবশি নিজের জীবনকে দ্বীনের জন্য উৎসর্গ করেছেন। যদি ইমাম আহমাদ না হতো তাহলে দ্বীন চলে যেত। ১০২
টিকাঃ
১০১ সহিহ বুখারি: ৩৬১২।
১০২ হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৯/১৭১-২০৩।