📄 খুবাইব
প্রিয় পাঠক! খুবাইব -কে শহিদ করার ঘটনাটি ছিলো খুবই নির্মম। তাই একটু বিস্তারিত উল্লেখ করা হলো, এ ঘটনাটি মূল বইতে বিস্তারিত নেই। (অনুবাদক)
মূল ঘটনা ছিলো খুবাইব -কে এক যুদ্ধে বন্দি করে এনেছিলো কাফিররা। অনেকদিন তাদের কাছে বন্দি থাকার পরে তারা তাকে হত্যা করার মনস্থ করলো। কিন্তু এইসব কাফেররা তাকে অনেক কষ্ট দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যা করেছে। একদিন হত্যার জন্য তাকে উন্মুক্ত মাঠে নিয়ে আসা হলো।
তখন জাহান্নামের কীটগুলো হাসাহাসি করে তাকে নিয়ে উপহাস করছিলো। হযরত খুবাইব -কে শিকলে বেঁধে হাজির করা হয়েছে। উম্মুক্ত খোলা মাঠ; অজস্র তীরন্দাজ ধনুকে তীর গেঁথে দাঁড়িয়েছিলো চর্তুদিকে। শূল প্রস্তুত; আনন্দে মেতে উঠেছিলো কাফিররা। ঘটনাস্থলে হাজার মানুষের ভীড়। খুবাইব -র কোন ভয় নেই। ইসলামের জন্য নিজের প্রাণকে উৎসর্গ করতে পেরে তিনি আনন্দিত।
প্রথমে খুবাইবের অঙ্গ-প্রতঙ্গ একেক করে কাটা হবে। তারপর শূলে চড়িয়ে হত্যা করা হবে। মৃত্যুর মুখে দাঁড়ালেন খুবাইব । কাফিরদের কাছে কিছু সময় চাইলেন, জীবনের এই শেষ মূহুর্তে পরম প্রভুর সমীপে অবনত মস্তক নিবেদন করার জন্য। প্রেম নিবেদন করবেন প্রেমময় প্রভুর সাথে। হতভম্ব হয়ে গেলো কাফিররা। খুবাইব ইসলামের জন্য জীবন দান করবেন বলে মহা খুশী। তিনি অধৈর্য হয়ে পড়েননি। অনুমতি দিলেন কাফিররা; মাত্র দু'রাকাত সালাত। আর বেশী সময় নয়। কাফিররা ধমকের সুরে বললো-
"যাও, তোমার আল্লাহ -র সাথে কথা বলো।"
সালাতে দাঁড়ালেন তিনি। অনুমতি নেয়া সময়টুকুকে নিবেদন করলেন প্রভুর নিকট। মনে খুশির ঢেউ। সালাত শেষ করার পর কাফিরদের দিকে তাকিয়ে বিদ্রোহী কন্ঠে বললেন-
"আমি দু'রাকাতের চেয়েও আরো বেশী সময় নিতাম-কিন্তু নেইনি। কারণ তোমরা মনে করতে পারো আমি মৃত্যুকে ভয় করি। আমি কখনো এই নির্মম মৃত্যুকেও ভয় করি না।”
এরপর তাঁদের দিকে শক্ত কণ্ঠে কিছু কবিতা আবৃত্তি করলেন। তাঁর সেই কবিতা সাহসি, কালজয়ী। জানি সে কবিতার আসল উদ্দেশ্য অনূদিত ভাষায় কখনই বুঝানো যাবে না। তবুও....
নেই কোন পরওয়া আমার, আমিতো কেবল মুসলমান।
হাজারো কষ্ট হোক না আমার, এ জীবনতো প্রেমময়ের জন্যই দান।
যদি চায় আমার প্রেমময় প্রভু, প্রত্যেক কর্তিত অঙ্গে করবে বরকত দান।
আর দেরী নয়, শুরু হলো খুবাইব-র উপর ইতিহাসের নিষ্ঠুর নির্মম নির্যাতন। একেক করে কাটা হচ্ছে খুবাইবের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। রক্তের ঝর্ণা যেন শত ধারায় প্রবাহিত হয়ে চলছে। তবুও তিনি স্থির, অবিচল ছিলেন ইস্পাত লোহার মতো। তারপর শুরু হলো তীর নিক্ষেপ। চতুর্দিকের তীরন্দাজের নিক্ষিপ্ত তীর ঝাঁকে-ঝাঁকে আসতে লাগলো। বৃষ্টির মতো বিদ্ধ হতে লাগলো তার স্বচ্ছ গায়ে। আহ! কী নিষ্ঠুরতা! আসলে এরাতো আদতে কোন মানুষ নয়। বাস্তবে পশু। তাই এরকম পশুর মত আচরণ তাদের দ্বারাই সম্ভব। কারণ ঈমানের আলো দ্বারা আলোকিত নয় এই পশুগুলোর হৃদয়। তাদের নির্মম, বর্বর আচরণ দেখে নিরবে কাঁদলো আকাশ। থমকে দাঁড়ালো বাতাস।
খুবাইব আকাশের দিকে তাকান, বিনীতসুরে ফরিয়াদ জানান রবের কাছে হে আল্লাহ! এখানের সবাই আমার শত্রু। কেউ আমার আপন নয়, বন্ধু নয়, প্রিয় নয়। আমার শেষ সালামটুকু আপনার প্রিয় বন্ধু প্রিয়নবি রাসুল-কে পৌঁছে দিন।
ধীরে-ধীরে ঢলে পড়লেন খুবাইব। নিস্তেজ হয়ে গেলো তাঁর দেহ। এখানেই ক্ষান্ত নয়। পাষণ্ড, হৃদয়হীনরা তাঁর কর্তিত লাশকে শূলে ঝুলিয়ে রাখলো। আর নামালো না। রাসুল তখনও মদিনায়। বসে আছেন আলোর আসরে। সাহাবায়ে কেরাম-কে সামনে নিয়ে। ওহি আসলো। হযরত জিবরাঈল বললেন-হে আল্লাহর রাসুল! পিয়ারা হাবিব! আপনার প্রিয় সাহাবা খুবাইব শহিদ হয়েছেন এবং তাঁর সাথে আরো কয়েকজন। তাঁকে শূলে চড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে; শহিদ হওয়ার সময় খুবাইব আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। রাসুল তাঁর সালামের উত্তর দিলেন। পুরো ঘটনা খুলে বললেন সাহাবায়ে কেরামকে। কষ্টে হাহাকার করে উঠলো রাসুল-এর বুক। দুঃখের পতাকা পত্পত করে উড়তে লাগলো তার হৃদয়াকাশে। কেঁদে উঠলো তার অন্তর। দুঃখে রাসুল ও সাহাবায়ে কেরামের বুকের জমিন চৌচির হলো। তাঁরা কাঁদতে লাগলেন। কান্নার ঢেউ প্রবাহিত হতে লাগলো তাঁদের গাল বেয়ে। কষ্টে তাদের ভেতরটা ভেঙ্গে যায়। চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। কষ্টের টুকরোগুলো এক-এক করে জমা হতে থাকে তাদের হৃদয়ে। কষ্টের ঝড়ে হৃদয়ে প্লাবন তোলে। দু'চোখে বয়ে চললো অশ্রুনদী। রাসুল তাদেরকে শান্তনা দিলেন। কখনো ভেবে দেখেছেন বড়দের ধৈর্যধারণের ব্যাপারে।
টিকাঃ
৯৮ সহিহ বুখারি: ৩৯৮৯।