📄 ইবরাহিম -এর ধৈর্য
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম হাজারো কষ্ট সহ্য করেছেন, তবুও তিনি আল্লাহ ﷻ-এর পথে অবিরত দাওয়াত দিয়েছিলেন। কাফিররা চেয়েছে তার বুক থেকে ইসলামের দেদীপ্যমান আলো একেবারেই মুছে দিতে। তাঁর অপরাধ ছিলো তিনি একত্ববাদে বিশ্বাসী। একথা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম -এর অন্তর থেকে মুছে দিতে প্রজ্জলিত আগুনে তাকে নিক্ষেপ করেছিল কাফিররা। তবুও তিনি অটল ছিলেন, তাকে বলা হলো মূর্তির সামনে সিজদা করতে; তাহলে তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু না; তিনি এক কথায় জবাব দিলেন— না, কখনোই স্বহস্তে তৈরী মাটির প্রতিমার সামনে শির নত করবো না। আমি শির নত করব একমাত্র আল্লাহ ﷻ-এর সামনে।
"আমার আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট।”৯৪
আল্লাহ ইবরাহিম-কে স্বীয় সন্তান ইসমাইলের মাধ্যমে পরীক্ষা করলেন। একদিন আল্লাহ-র পক্ষ থেকে আদেশ আসলো প্রিয় সন্তান ইসমাইলকে কুরবানি করতে হবে, ইবরাহিম আল্লাহ-র এ আদেশে সাড়া দিলেন। ইবরাহিম-এর দু'চোখ ছাপিয়ে বেরিয়ে এলো বিচ্ছেদের চিহ্ন। তবুও তিনি একটুও পিছপা হননি। সন্তানকে জমিনে রেখে ছুরি চালাতে শুরুও করেছিলেন। তিনি অধৈর্য হননি। অতঃপর রবের পক্ষ থেকে আদেশ আসলো হাজেরা ও শিশু ইসমাইলকে জনমানবশূন্য মরুভূমিতে রেখে চলে যেতে হবে। তিনি প্রিয়তমা জীবনসঙ্গিনীকে ও প্রাণপ্রিয় ইসমাইলকে রেখে চলে গেলেন। ইবরাহিম-এর কোন সন্তান ছিলে না। অনেক বছর পর আল্লাহ শিশু ইসমাইলকে দান করলেন। নয়নের মনি ইসমাইলের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা ছিলো। কিন্তু জীবনের সব কিছু তিনি বিলিয়ে দিয়েছেন প্রভুর ভালোবাসায়। উৎসর্গ করেছেন স্ত্রী-পরিজন, ধন-সম্পদ। তবুও তিনি অধৈর্য হননি।
শিশু ইসমাইল ও প্রিয় বিবি হাজেরাকে সদূর ভূমিতে রেখে আল্লাহ-র ডাকে সাড়া দিয়ে রওয়ানা করলেন ইবরাহিম। চলার পথে প্রিয়তমা বিবি হাজেরা জিজ্ঞেস করলেন-
'ওগো! আমাদেরকে এই জনমানবশূন্য জায়গায় রেখে কোথায় যাচ্ছো? এভাবে হাজেরা কয়েকবার বললেন। কিন্তু ইরবরাহিম সেদিকে তাকালেন না। তিনি চলছেন তো চলছেন। হাজেরা ইবরাহিমকে জিজ্ঞেস করছিলেন-
“তোমাকে আল্লাহ সেখানে যেতে আদেশ করেছেন?"
উত্তরে বুঝিয়ে দিলেন-'হ্যাঁ, আল্লাহ-র নির্দেশ। (চলছি হে প্রিয়তমা, জানি না ক্ষণস্থায়ী মুসাফিরখানায় তোমার সাথে আর দেখা হবে কিনা? চলছি হে প্রিয়তমা! আল্লাহ-র রাহে।) তখন হাজেরা বললেন-তাহলে আল্লাহ আমাদের অপদস্থ করবেন না। তিনি ধৈর্যধারণ করেন। শিশু ইসমাইলকে নিয়েই এই মরুভূমিতে বাস করতে লাগলেন। মায়ের মমতার আঁচলে শিশু ইসমাইলের জীবন চলছিলো নদীর স্রোতের মতো। এখন বিবি হাজেরাই তার মা, আবার হাজেরাই তার বাবা।
ইবরাহিম শামের দিকে ফিরে এলেন। আল্লাহ ইবরাহিমের ধৈর্য্যের কারণে তাকে বিবি সারা ও ইসহাক -কে দান করলেন। আর আল্লাহ হাজেরা -এর ধৈর্যের কারণেই তাদের যমযম কূপসহ অসংখ্য নিয়ামত দান করলেন।
টিকাঃ
৯৪ সহিহ বুখারি: ৪২৮৮।
📄 মুসা -এর ধৈর্য
মুসা তার জাতিকে একত্ববাদের দাওয়াত দিলেন অনেক বছর। কিন্তু ঐ জাহান্নামের কীটগুলো মুসা নবিকে হাজারো কষ্ট দিয়েছিলো। তবুও তিনি তাদের কষ্টকে উপেক্ষা করে তাদেরকে এক আল্লাহ-র পথেই ডেকেছেন। তিনি তাদের কষ্টের কাছে হেরে যাননি, অধৈর্যও হননি। ফেরআউন জাতিও তাকে খুব কষ্ট দিয়েছে। তিনি তাতে ধৈর্যধারণ করেছেন, অবশেষে আল্লাহ এ জাতিকে ধ্বংস করে দেন। এরপর বনি ইসরাইলরা খুব কষ্ট দিয়েছিলো, তাতেও তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন। অধৈর্য হননি একটুও।
রাসুল যখন মাঝে-মাঝে নবিদের ধৈর্যধারণের কথা আলোচনা-পর্যালোচনা করতেন, তখন মুসা নবির ধৈর্যধারণের কথা বলতেন।
يرحم الله موسى، قد أوذي بأكثر من هذا فصبر.
"আল্লাহ তা'আলা মুসার প্রতি রহম করুন! তাকে এর থেকেও অনেক কষ্ট দেওয়া হয়েছে। তিনি কত কষ্ট সহ্য করেছেন।”১৫
কবি আরো সুন্দর করে বলেছেন-
সয়েছে মুসা ফেরাউনজাতির কত অত্যাচার,
ধৈর্যের ফলে নীল নদ জলে রাস্তায় হলো পার। [সংযুক্ত]
টিকাঃ
৯৫ সহিহ বুখারি: ৩৪০৫।
📄 ঈসা -এর ধৈর্য
ঈসা নবিকে তার জাতি জারজ ইত্যাদি বলে কত কষ্ট দিয়েছেন। তবুও তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো-ঈসা নবিকে হত্যা করে ফেলবে। কিন্তু আল্লাহ তার প্রিয় বন্ধু ঈসা নবিকে তার কাছে উঠিয়ে নিলেন।
📄 মুহাম্মদ -এর ধৈর্য
মক্কার জাহান্নামের কীটগুলো রাসুল-কে কত কষ্ট দিয়েছে। ঐ জাতি রাসুল-কে পাগল, জাদুকর, মিথ্যুক, ধোঁকাবাজসহ সব ধরনের অপবাদ আরোপ করেছিল, তবুও রাসুল তাতে ধৈর্যধারণ করেছেন। অথচ তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড় জ্ঞানী, সবচেয়ে বড় সত্যবাদী, সবচেয়ে বড় আমানতদারী। তার মতো সুন্দর ও উত্তম আদর্শের আর কোনো লোক পৃথিবীতে ছিলো না। তাদের কষ্টে রাসুল তার মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যান দূর দেশ মদিনায়। ছেড়ে যান শিশু বেলার মক্কা। ছেড়ে যান সকল স্বজনদের। ঐ কাফিরগুলো তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলো। পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ.
“আর কাফেররা যখন প্রতারণা করতো আপনাকে বন্দি বা আপনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে কিংবা আপনাকে মক্কা থেকে বের করে দেওয়ার জন্য, যেমন ছলনা করেছিলো ঠিক তেমনি আল্লাহও তাদের সাথে ছলনা করেছে, বস্তুতঃ আল্লাহর ছলনা সবচেয়ে উত্তম।”
তায়েফে নরাধম কাফেরদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে পাথরের আঘাতে নবির শরীর মোবারককে রক্তে রঞ্জিত করেছিল ঐ জাহান্নামের কীটগুলো। উহুদ যুদ্ধে রাসুল-এর দাঁত মোবারক শহিদ করে দিয়েছিলেন ঐ কাফেররা, তবুও তিনি বিনীত সুরে বললেন, ওরা বুঝে না। তিনি অধৈর্য হয়ে পড়েননি।
রাসুল-এর অনেক সাহাবাকে হত্যা করেছেন ঐসব কাফিররা। আবার অনেক সাহাবায়ে কেরামকে নির্মম কষ্ট দিয়েছিল তারা। যখন সাহাবাদেরকে রাসুল -এর সামনে নির্মম কষ্ট দিত তখন তিনি খুব ব্যথিত হতেন, যা বলার মত নয়।
টিকাঃ
৯৬ সুরা আনফাল: ৩০।