📄 ধৈর্যের নিয়ত করা
আব্দুল ওহেদ বিন যায়েদ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ-র আনুগত্যের ওপর সবরের নিয়ত করবে, আল্লাহ তাকে সবর করার ক্ষমতা প্রদান করবেন ও অনেক শক্তি প্রদান করবেন। আর যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে বিমুখতায় সবরের নিয়ত করবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন ও পাপ থেকে পবিত্র রাখবেন।
টিকাঃ
৮৪ হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৬/১৬৩।
📄 কষ্ট লাঘবের বিশ্বাস করা
আল্লাহ প্রত্যেক কষ্টের সাথে স্বস্তি ও রহমত রাখেন। কাউকেই হরহামেশা কষ্টের সাগরে ডুবিয়ে রাখেন না। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا. إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا.
“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।”
আর আল্লাহ কষ্টের পরে স্বস্তি দেওয়ার ওয়াদা করেছেন, তিনি কখনো তার ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে-
فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَا يَسْتَخِفَّنَّكَ الَّذِينَ لَا يُوقِنُونَ.
"অতএব আপনি সবর করুন, আল্লাহর ওয়াদা সত্য। আর যারা বিশ্বাসী নয় তারা যেন আপনাকে বিচলিত করতে না পারে।"
রাতের আধাঁর কেটে ফজর আসবেই। সবসময় পৃথিবি রাতের কালো চাদরে ঢাকা থাকে না। একদিনতো ভোর হয়। (অবশ্যই কষ্টের পাহাড় থেকে একদিন স্বস্তির পাহাড় আসবেই। দুঃখের কালো মেঘ একদিন সরে যাবে। শুধু শর্ত হলো ধৈর্যধারণ করতে হবে। ধৈর্য হারানো যাবে না।)
কবি আবৃত্তি করেছেন- আমার কষ্ট আরো বেড়ে গেছে, আর তোমার সূর্য প্রভাত হওয়ার প্রান্তে।
ইয়াকুব তার প্রিয় পুত্র ইউসুফ ও বিন ইয়ামিনকে হারিয়ে ধৈর্যধারণ করেছেন, পরবর্তীতে আল্লাহ তার সব সন্তানকে তার বুকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে-
قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنفُسُكُمْ أَمْرًا فَصْبْرٌ جَمِيلٌ عَسَى اللَّهُ أَن يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ.
“তিনি (ইয়াকুব আলাইহিস সালাম) বলতে লাগলেন, কিছুই না। এরা মনগড়া একটি কথা নিয়ে এসেছে, এখন ধৈর্যধারণই উত্তম। সম্ভবত: আল্লাহ তাদের সবাইকে একসঙ্গে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবেন, তিনি সুবিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
ইয়াকুব তার সব দুঃখকে আল্লাহ-র সমীপেই পেশ করলেছিলেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ.
“তিনি বললেন, আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি।”
ইয়াকুব তার বুকে বয়ে যাওয়া কষ্টের কথা পৃথিবীর কোনো ব্যক্তিকে প্রকাশ করেননি। নীরবে বুকে লালন করেছেন সন্তানহারা কষ্ট। পরবর্তীতে আল্লাহ তার সব সন্তানকে তার ভালোবাসার পরশে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
টিকাঃ
৮৫ সুরা আলাম নাশরাহ: ৫-৬।
৮৬ সুরা রুম : ৬০।
৮৭ সুরা ইউসুফ: ৮৩।
৮৮ সুরা ইউসুফ: ৮৬।
📄 প্রভুর সাহায্য কামনা করা
কষ্টের ঝড়ো হাওয়া বুকে বয়ে গেলে প্রভুর কাছেই আশ্রয় চাওয়া ও প্রভুর কাছে সাহায্য কামনা করা হলো সবরের সিঁড়িতে পা রাখার অন্যতম মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ.
"আপনি সবর করবেন। আপনার সবর আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য হতে পারে না।"
ইবনে কাসির বলেন, উপরোক্ত আয়াতে এমন সংবাদ প্রদান করা হয়েছে যে, প্রভুর ইচ্ছা ছাড়া কখনো ধৈর্যধারণ করা সম্ভব নয়, আল্লাহ-র সাহায্য অবশ্যই আবশ্যক। তাই ধৈর্য্যের ক্ষেত্রে প্রভুর কাছে সাহায্য কামনা করা চাই।
টিকাঃ
৮৯ সুরা নাহল: ১২৭।
৯০ তাফসিরে ইবনু কাসির: ২/৭৮১।
📄 ধৈর্যকে সৌভাগ্য মনে করা
ধৈর্যের উপর নিজেকে স্থীর রাখার আরেকটি মাধ্যম হলো, কোনো বিপদ চলে আসলে সেটাকে সৌভাগ্য মনে করা। এমন বলা যে, এটা আমার কপালে প্রভুর পক্ষ থেকে এমনই লিখিত ছিলো তাই এমন হয়েছে। আর আল্লাহ-র লিখন বা নির্ধারণকে কখনো ঠেকানো যায় না। আল্লাহ-র বিধানকে কখনো কোনো কৌশলেও দূর করা যাবে না। তার লিখন পরিবর্তন ও পরিবর্ধনও করা যায় না। তাহলে দেখবেন আপনার ভেতরে সবরের একটা সাহস আসবে। পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে-
مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَا إِنَّ ذُلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرُ.
“পৃথিবিতে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর কোনো বিপদ আসেনা; বরং তা জগত সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।"
কোনো মুসিবত আসলেই হৈ-চৈ, চিৎকার-চেঁচামেচি, জামা-কাপড় ইত্যাদি ছিঁড়ে ফেলা হলো একদম মূর্খতার পরিচয়। কারণ এগুলো করলে আপনার হারিয়ে যাওয়া কোনো কিছু আর ফিরে আসবে না এবং এসব করার দ্বারা কিছু অর্জিতও হবে না। নীরবে মুসিবতকে সহ্য করা হলো জ্ঞানীর পরিচয়।
তাছাড়া এটাও তো বুঝা দরকার যে, এখনতো ধৈর্যধারণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তাহলে এসব করবো কেন? কিন্তু মূর্খরা বিপদের কোন কথা শোনা মাত্রই একেবারে হৈ-হুল্লোড় করা শুরু করে দেয়, যখন দেখে এগুলো করে কোনো লাভ নেই, তখন ধৈর্যধারণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু যদি সে এ ধৈর্যধারণটা প্রথম ধাক্কায় করতো তাহলে কত ভালো হতো..।
বিপদে ধৈর্যধারণের আরেকটি মাধ্যম হলো, অন্তরে এ বিশ্বাস গেঁথে নেওয়া যে, আল্লাহ বান্দাকে তার সালাহিয়্যাত বা ভারসাম্যতা অনুযায়ী মুসিবতে পতিত করেন।
সা'দ থেকে বর্ণিত—তিনি বলেন, রাসুল-কে জিজ্ঞাসা করা হলো—'হে আল্লাহর রাসুল! সবচেয়ে বেশী কারা মুসিবতে পতিত হয়েছে?' তখন রাসুল বলেন—সবচেয়ে বেশী মুসিবতে পতিত হয়েছেন নবিরা। এরপরে তার মতো যারা তারা। এরপরে যার ঈমান যত শক্তিশালী সে তত মুসিবতে পতিত হয়েছে। আর যদি দ্বীনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী হয়ে থাকে, তাহলে সে কঠিন মুসিবতে পতিত হয়েছে। আর যদি দ্বীনের ক্ষেত্রে তার দুর্বলতা থাকে, তাহলে সে অনুযায়ী মুসিবতে পতিত হয়েছে। দুঃখ-কষ্ট, মুসিবত বান্দার সাথে থাকবেই। বান্দা থেকে কষ্ট ততক্ষণ পর্যন্ত দূর হবে না যতক্ষণ সে দুনিয়ার জমিনে চলাফেরা করে।
টিকাঃ
৯১ সুরা আল হাদিদ: ২২।
১২ সুনান তিরমিযি: ২৩৮৯।