📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ না করার উপর ধৈর্যধারণ
আল্লাহ প্রবৃত্তির অনুসরণ না করার উপর ধৈর্যধারণ করতে আদেশ করেন। পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ.
“হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয় তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।"৫৮
আব্দুর রহমান ইবনু আওফ থেকে বর্ণিত-তিনি বলেন, আমরা নবি -এর সাথে যে কোন বিপদে আক্রান্ত হলেই ধৈর্যধারণ করেছি। অতঃপর আমাদের সুখ-সমৃদ্ধির মাধ্যমে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে, কিন্তু আমরা তাতে ধৈর্যধারণ করতে পারিনি (আমরা অনেকে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে ফেলেছি)। ৫৯
পৃথিবীর কিছু মানুষ এমন আছে যাদেরকে জেল-হাজতে পাঠালে তারা তাতে ধৈর্যধারণ করে, কিন্তু এরপরে যখন ঐ ব্যক্তিকেই ধন-সম্পদ, সন্তানাদি, সুখ-সমৃদ্ধে ডুবিয়ে পরীক্ষা করা হয়; তখন সে আর ধৈর্যধারণ করতে পারে না; সে অধৈর্য হয়ে ব্যর্থ হয়। জগতের সব মানবই ধৈর্যধারণের ক্ষেত্রে একই ধরণের। তাই তো কবি আবৃত্তি করেছেন-
বালা-মুসিবতে করতে পারে ধৈর্য যদিও কাফের ও মুমিন হয়। তবে সুখ-সমৃদ্ধিতে করে ধৈর্য এতে সিদ্দিক-ই কেবল রয়। ৬০
টিকাঃ
৫৮ সুরা মুনাফিকুন: ৯।
৫৯ সুনানু তিরমিযি: ২৪৬৪।
৬০ তাসলিয়াতু আহলিল মাসায়িব: ১৮৫।
📄 প্রবৃত্তির উপর ধৈর্যধারণ করতে চাইলে কয়েকটি কাজ করতে হবে
১. মনোবাসনা ও প্রবৃত্তি পূরণের জন্য নিজেকে একদম ডুবিয়ে দিবে না।
২. হৃদয়ের চাহিদাকে খুঁজে পেতে যথার্থ চেষ্টা-প্রচেষ্টা করবে না। পৃথিবীর অনেক লোক আছে যারা নিজেদের চাহিদা মোতাবেক সম্পদ জোগাতে সভা, মিটিং ও বিভিন্ন কনফারেন্সে এতই ব্যস্ত থাকে যে, আল্লাহ-র বিধানটুকু পালন করার সময় খুঁজে পায় না। আবার অনেক চাকুরিজীবি আছে যারা উন্নত চাকুরি করতে গিয়ে হাজারো কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকে, তখন মালিকের কদমে দুটো সিজদা দিতেও সময় মিলে না। ধীরে-ধীরে তারা আমল থেকে দূরে থাকতে-থাকতে এক সময় একেবারেই আল্লাহবিমুখ হয়ে যায়। যেমন ব্রিটেনে ইংরেজি চাকুরিজীবিদের অবস্থা। তাদের নিয়ম হলো চাকুরিজীবিরা সপ্তাহে ছয়দিনই ব্যাংকে চাকুরি করবে এবং সপ্তাহে কেবল একদিন মন্দিরে বা মসজিদে ইবাদত করতে পারবে। (আমাদের দেশেও তেমনি সপ্তাহে কেবল শুক্রবার পুরো মসজিদ মুসল্লিদের মাধ্যমে টইটুম্বুর থাকে আর পরে এসব মুসল্লিদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আল্লাহ আমাদেরকে তার প্রতিটি বিধান সময় মতো পালন করার তাওফিক দান করুন।)
৩. আল্লাহ-র হুকুকগুলো আদায়ের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করা; যেমন সদকা, ফিতরা প্রভৃতি।
৪. হারাম কাজে ব্যয় না করা। তাহলেই ইনশাআল্লাহ ধৈর্যধারণ করা সহজ হয়ে যাবে।
📄 ধৈর্যধারণের আরো ক্ষেত্র
আর সন্তান-সন্ততি ও সম্পদের দিকে একেবারেই নিমজ্জিত না হওয়া। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى.
"আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোকদেরকে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে সব উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেই সব বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না। আপনার পালনকর্তার দেয়া রিজিক উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।”৬১
দুনিয়ার সম্পদ তোমাকে পরীক্ষার জন্য দেওয়া হয়েছে এজন্য যে, আসলেই কি তুমি এগুলোকে নিয়ামত মনে করো কিনা? নাকি অধৈর্য হয়ে সম্পদের প্রাচুর্যতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে মালিককে ভুলে যাও! আর পৃথিবিতে হাজারো কারুনের দল আছে, যারা অনেক সম্পদ অর্জন করেও তাতে ক্ষ্যান্ত থাকে না বরং আরো চাই, আরো চাই করে। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ.
"অতঃপর কারুন জাঁকজমক সহকারে তার সম্প্রদায়ের সামনে বের হলো। যারা পার্থিব জীবন কামনা করতো তারা বলতে লাগলো, হায়! কারুন যা প্রাপ্ত হয়েছে আমাদেরকে যদি তা দেয়া হতো।"৬২
আর অনেক সাহাবায়ে কেরাম আছেন, যারা অর্জিত সম্পদকে আল্লাহ -র রাস্তায় ব্যয় করেন। পবিত্র কুরআনুল কারিমে তাদের কথা আল্লাহ ইরশাদ করেন-
أَيَحْسَبُونَ أَنَّمَا نُمِدُّهُم بِهِ مِن مَّالٍ وَبَنِينَ. نُسَارِعُ لَهُمْ فِي الْخَيْرَاتِ بَل لَّا يَشْعُرُونَ.
"তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে যাচ্ছি। তাতে করে তাদেরকে দ্রুত মঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। বরং তারা বোঝে না।"৬৩
টিকাঃ
৬১ সুরা ত্বোহা: ১৩১।
৬২ সুরা আল কাসাস: ৭৯।
৬৩ সুরা আল মুমিনুন: ৫৫-৫৬।
📄 রবের কাছে দুআর উপর ধৈর্যধারণ
আজকাল মানুষেরা দুআর উপর ধৈর্যধারণ করতে অধৈর্য হয়ে পড়ছে। অথচ দুআর উপর ধৈর্যধারণ করা হলো ধৈর্যের বিশেষ ক্ষেত্র। তাই তো দ্বীন থেকে তারা ধীরে-ধীরে সরে যাচ্ছে, আর এ দূরত্বটা তাকে অনেক বড় গুনাহ ও পাপ করতে বাঁধা দেয় না।
হযরত নূহ প্রায় সাড়ে নয়শত বছর দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছে, তবুও সে মালিকের দরবারে শুধু দুআ করতেন ও ধৈর্যধারণ করতেন। তিনি অধৈর্য হয়ে দোয়া করাকে ছেড়ে দেননি। পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَائِي إِلَّا فِرَارًا.
"সে বলল-হে আমার পালনকর্তা! আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবা-রাত্রি দাওয়াত দিয়েছি, কিন্তু আমার দাওয়াত তাদের পলায়নই বৃদ্ধি করেছে।"৬৪
দু'আর ক্ষেত্রে কষ্ট কেবল দেহে নয় বরং মনেও ধৈর্যধারণ করবে অর্থাৎ মনে কোনো আক্ষেপ করবে না। আর শত্রুর পক্ষ থেকে যত বদদোয়া আসুক না কেন তাতেও কোনো পরোয়া করবে না। তখনও মুমিন বান্দা ধৈর্য হারাবেন না। আল্লাহ্ ইরশাদ করেন-
لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنفُসِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذُلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ.
"অবশ্যই ধন-সম্পদ ও জনসম্পদে তোমাদের পরীক্ষা করা হবে। আর তোমরা আহলে কিতাব কাফিরদের কাছ থেকে অনেক বড় অশোভন উক্তি শুনবে। যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো এবং পরহেযগারী অবলম্বন করো, তবে তা তোমাদের একান্ত সৎ সাহসের ব্যাপার।"৬৫
পবিত্র কুরআনুল কারিমে আরো ইরশাদ হয়েছে-
وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا يَقُولُونَ وَاهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا.
"কাফেররা যা বলে সেগুলোর উপর আপনি ধৈর্যধারণ করুন এবং সুন্দরভাবে তাদেরকে পরিহার করে চলুন।”৬৬
وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَىٰ مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا حَتَّىٰ أَتَاهُمْ نَصْرُنَا.
“আপনার পূর্ববর্তী অনেক নবিকে মিথ্যা বলা হয়েছে। আমার সাহায্য আসা পর্যন্ত তারা এতে ধৈর্যধারণ করেছেন।”৬৭
আল্লাহ -র পক্ষ থেকে শান্তি আসা পর্যন্ত দুআকে চালু রাখবেন, দুআকে বন্ধ করে দিবেন না এবং তার সাহায্য-সহযোগিতা আসার প্রহর গুণেই ধৈর্যধারণ করবেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّىٰ يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَىٰ نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرُ اللَّهِ قَرِيبٌ.
"তোমাদের কি এ ধারণা যে, তোমরা জান্নাতে যাবে অথচ তোমরা সে লোকদের অবস্থা অতিক্রম করোনি-যারা পূর্বে অতীত হয়েছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। তখন তারা এমনিভাবে শিহরিত হয়েছে যাতে নবি ও তার প্রতি যারা ঈমান এনেছিলো তাদের পর্যন্ত এ কথা বলতে হয়েছে যে, কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য? তোমরা শোনে নাও-আল্লাহর সাহায্যই নিকটবর্তী।"৬৮
হৃদয়ে এ বিশ্বাস স্থাপন করতেই হবে যে আল্লাহ-র পক্ষ থেকে সাহায্য আসবেই। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
حَتَّى إِذَا اسْتَيْأَسَ الرُّسُلُ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ قَدْ كُذِبُوا جَاءَهُمْ نَصْرُنَا فَنُجِّيَ مَن نَّشَاءُ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُنَا عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ.
"যখন পয়গম্বরগণ নিরাশ হয়ে যেতেন, এমনকি এরূপ ধারণা করতেন যে, তাদের অনুমান বুঝি মিথ্যায় পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো; তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছে। অতঃপর আমি যাদের চেয়েছি উদ্ধার করেছি। আমার শাস্তি অপরাধী সম্প্রদায় থেকে প্রতিহত হয় না।”৬৯
যে মুমিন বান্দা সত্যের উপর থাকবে ও সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে। তখন তার কষ্ট সহ্য করতে হবেই। আর এ কষ্ট-ক্লেশের ঔষধ একমাত্র ধৈর্যধারণ। অধৈর্য না হয়ে আল্লাহ-র কাছে সাহায্য কামনা ও তার দরবারের দিকে ফিরে যাওয়া।
টিকাঃ
৬৪ সুরা নূহ: ৫-৬।
৬৫ সুরা আলে ইমরান: ১৮৬।
৬৬ সুরা মুযযাম্মিল: ১০।
৬৭ সুরা আল আনআম: ৩৪।
৬৮ সুরা বাকারা: ২১৪।
৬৯ সুরা ইউসুফ: ১১০।